Regional History of Language Movement
ভাষা আন্দোলন বিশ্বের এক নজিরবিহীন ঘটনা। পৃথিবীতে এমন একটিও দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দেশের মানুষ মায়ের ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। একমাত্র বাংলাদেশেই মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। বাঙালি জাতিসত্তার মূলভিত্তি হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। বায়ান্নোর পথ ধরে চুয়ান্নোর সাধারণ নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তর সালের জাতীয় নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ধাপে ধাপে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। একুশ শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তাই একুশ মানে অহংকার, একুশ মানে প্রেরণা, একুশ মানে মাথা নত না করা।.
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালালে শহিদ হন সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার আরও অনেকে। পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার সংবাদ বাংলার শহর-গ্রাম-গঞ্জে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, ছাত্ররা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে থাকে। শ্রমজীবী মানুষও ঘরে বসে থাকেনি। ছাত্র হত্যার বিচারের দাবি গণ দাবিতে পরিণত হয়। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, যশোর, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন শহরে-বন্দরে ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষার দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এবং আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এখানে অতি সংক্ষেপে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল তার বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. চট্টগ্রাম অঞ্চল: তমদ্দুন মজলিশ, চট্টগ্রাম শাখা ভাষা-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। গ্রাম-গঞ্জে তখন তমদ্দুন মজলিশের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। মোমিন রোডস্থ চট্টগ্রাম শাখার তমদ্দুন মজলিশ অফিসে সে সময় প্রায়ই সভা হতো।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি আন্দরকিল্লাস্থ তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আহ্বায়ক হন সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হন আজিজুর রহমান। আন্দোলন শুরুর সময় মাহবুব-উল-আলম অসুস্থ থাকলে আজিজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। সকল শ্রেণি ও পেশাজীবী সংগঠন, কৃষক-শ্রমিক সংগঠন, আওয়ামী মুসলিম লীগ ও তমদ্দুন মজলিশের প্রতিনিধিদের এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংগ্রাম পরিষদের অন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ, ডা.
আনোয়ার হোসেন, চৌধুরী হারুন-অর-রশিদ, হাবিব উল্লা, নুরুজ্জামান, কৃষ্ণগোপাল সেন গুপ্ত, শামসুদ্দিন আহমদ, মফিজুল ইসলাম, রুহুল আমিন নিজামী, ফরিদ আহমদ, ইয়াহিয়াহ খালেদ, এম.এ মান্নান, এমদাদুল ইসলাম, আবু জাফর, ডা. সাইদুর রহমান প্রমুখ।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি দেশের অন্যান্য জেলার মতো সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে চট্টগ্রামে সর্বত্র হরতাল, মিটিং, মিছিল এবং লালদীঘি ময়দানে জনসভা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়। পাড়ায়, মহল্লায়, ক্লাব ও সংগঠনগুলোতে হরতাল সফল করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচির মধ্যে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ও আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ণহরতাল পালিত হয়। চট্টগ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালে অংশগ্রহণ করে। পুলিশের বাধাকে উপেক্ষা করে জনগণ হরতাল পালনে এগিয়ে আসে।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পৌঁছলে চট্টগ্রামের মানুষ ক্ষোভে ফেঁটে পড়ে এবং রাস্তায় নেমে আসে। বিকাল বেলা লালদীঘি ময়দান লোকপূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় গণপরিষদের সদস্য এ কে খান জনতার চাপে বলতে বাধ্য হন যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে না পারলে তিনি গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এসময় ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ শুনে তরুণ সাহিত্যিক এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী অসুস্থ অবস্থায় লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা "কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি"। এটিই ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত প্রথম কবিতা। কবিতাটি ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টায় লালদীঘি ময়দানের জনসভায় হারুন-অর-রশীদ পাঠ করেন। কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে কবিতাটি ছাপানোর ব্যবস্থা করা হলে পাকিস্তান সরকার প্রেসটি বাজেয়াপ্ত করে। প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমদকে গ্রেফতার করা হয়। একই সাথে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, চৌধুরী হারুন-অর-রশিদ এবং কামাল উদ্দিন আহমদ খানের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এ মামলা ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। বিচারে প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমদকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এভাবে দেখা যায় চট্টগ্রাম অঞ্চল বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পৃক্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে।
২. রাজশাহী অঞ্চল: রাজশাহী অঞ্চলও ঢাকার আন্দোলনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৪৮
খ্রিষ্টাব্দ থেকেই এ কর্মসূচি পালন শুরু হয়। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার প্রতিবাদ দিবস ঘোষণা করা হলে তার অংশ হিসেবে ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর ভুবন মোহন পার্কে জনসভার আহ্বান করা হয়। জনাব মোহাম্মদ আনসার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় বক্তৃতা করেন ক্যাপ্টেন (অব.) শামসুল হক, মোসাদ্দারুল হক প্রমুখ। এ জনসভার ২ দিন পর অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ মোহাম্মদ আনসার আলীর নেতৃত্বে রাজশাহীতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। মোহাম্মদ আনসার আলী ছিলেন তমদ্দুন মজলিশের নেতা। তাঁর বাড়ি নওগাঁ জেলায় হওয়ায় তিনি রাজশাহী ও নওগা জেলায় ভাষা আন্দোলন জোরদার করেন। এজন্য তাকে কারাভোগ করতে হয়।
রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলননের কেন্দ্র ছিল রাজশাহী কলেজ। এ কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্নভাবে ভাষা আন্দোলনে সহযোগিতা করেন। এদের মধ্যে বাংলা বিভাগে মুহাম্মদ আবদুল হাই (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন), ড. মুহাম্মদ এনামুল হক (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন) এবং আরবি-ফারসি বিভাগের ড. গোলাম মকসুদ হিলালী প্রমুখ অন্যতম।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে সারা দিনব্যাপী হরতাল এবং বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে জনসভা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শাখায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ভুবন মোহন পার্কে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে হরতাল, মিছিল এবং জনসভা হয়। রাজশাহীর নিবিড় গ্রামেও ভাষা আন্দোলনের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
৩. খুলনা অঞ্চল: ভাষা আন্দোলনের প্রভাব খুলনা অঞ্চলেও পরিলক্ষিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে উত্থাপিত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি অগ্রাহ্য হলে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনার দৌলতপুর কলেজে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা আবদুল হামিদ এতে সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন, আমজাদ হোসেন মনসুর আলী, জগদীশ বসু প্রমুখ ছাত্র নেতারা। এসময় খাজা নাজিমুদ্দিনের নিন্দা এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে ১০ মার্চ ১৯৪৮ পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তার মধ্যে শৈলেশ ঘোষ, স্বদেশ বোস, মন্তোষ গুপ্ত, ধনঞ্জয় দাস, তাহমীদ উদ্দীন উল্লেখযোগ্য।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিকে সফল করতে খুলনার ভাষা কর্মীরা ২০ ফেব্রুয়ারি রাতের আধারে কে.ডি ঘোষ রোড, যশোর রোড সহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগায়। ২১ ফেব্রুয়ারি নেতৃবৃন্দ স্কুলে স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানান। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার সংবাদ খুলনাবাসীরা জানতে পারে ২২ ফেব্রুয়ারি। এ সংবাদে খুলনায় ভাষা আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে খুলনায় শান্তিপূর্ণ সফল হরতাল পালিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় দৌলতপুর বাজারে। এ সভার সভাপতিত্ব করেন আমজাদ হোসেন। মিউনিসিপ্যাল পার্কে অনুষ্ঠিত অপর এক জনসভায় প্রায় দশ হাজার লোক যোগদান করে। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির সফল নেতৃত্ব এবং আন্তরিক উদ্যোগে ৫ মার্চ খুলনা শহর ও শহরতলিতে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। এভাবে খুলনা অঞ্চল ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখে।
৪. বরিশাল অঞ্চল: ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে বরিশাল অঞ্চল এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই তমদ্দুন মজলিশ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ যুক্ত কমিটির আহ্বানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে বরিশাল মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ছদরুদ্দীনের সভাপতিত্বে ভাষাকে কেন্দ্র করে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখতার উদ্দীন আহমদ, এম ডব্লিউ লফিতুল্লাহ প্রমুখ এতে বক্তব্য রাখেন। সভা শেষে একটি মিছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বরিশাল টাউন হলে হাশেম আলী খাঁর সভাপতিত্বে অপর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। (সূত্র: দৈনিক আজাদ: ৫ মার্চ ১৯৪৮]১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে ঐ দিন বরিশালের স্কুল ও কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। বরিশালের মুসলিম ছাত্রলীগ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন কাজী বাহাউদ্দীন আহমদ। ঐ দিন অর্থাৎ ১১ মার্চ বরিশালের সকল সভাস্থল বন্ধ করে দেওয়া হলে কোথাও সভা করার জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে শহরে ফকির বাড়ি রাস্তার পাশে সভার আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যার পর পুলিশ কাজী বাহাউদ্দীন আহমদ, শামসুল হক চৌধুরী, আঃ রশিদ, মোহাম্মদ আর্শেদ ও এ.বি.এম *আশরাফ আলী খানকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা থানা ঘিরে ফেলে। বাধ্য হয়ে পুলিশ প্রশাসন গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দেয়।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এতে সভাপতি হন আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল মালেক খান। তিনি যুবলীগ সম্পাদক আবুল হাশেমকে আহ্বায়ক করে ২৫ জন সদস্য সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন। বরিশালের ভাষা আন্দোলনের অন্যান্য সংগ্রামী নেতাদের মধ্যে ছিলেন আলী আশরাফ, মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। বরিশালের ভাষা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বি.এম কলেজের ছাত্র/ছাত্রী বৃন্দ। তাঁরা পৃথক রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন চালায়। বি.এম. কলেজ শাখার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন কলেজের তৎকালীন ভি.পি. সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া। ঢাকার আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালে সকল বিদ্যালয় ও শহরে হরতাল পালিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ বরিশালে পৌঁছালে বরিশালবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ছাত্রদের সাথে সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। রাত ৯টায় শহরে মিছিল হয়। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে হরতাল ও মিছিল হয়। এ.কে স্কুল ও বি.এম কলেজের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে মিছিলসহ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তারা অশ্বিনী কুমার টাউন হল চত্বরে সমবেত হয়। এ.কে.এম আজহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে এক শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় এ.কে. স্কুল মাঠে শহিদ ছাত্রদের গায়েবোনা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে শহিদ মিনার নির্মাণ করে। শহিদ মিনারে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করে। -এভাবে বরিশাল অঞ্চলকে ভাষা আন্দোলনের সকল স্তরে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।
৫. সিলেট অঞ্চল: পত্র-পত্রিকায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্য দিয়ে সিলেট ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের আল-ইসলাহর আগস্ট সংখ্যায় সম্পাদকীয় লেখা হয়, বাংলা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। এর পর থেকেই সিলেটের মাসিক আল-ইসলাহ এবং সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় ভাষা আন্দোলনের ওপর সংবাদ কখনো আবার প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর সিলেটের মাদ্রাসা হলে মতিন উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হওয়া উচিত"। প্রধান আলোচক ছিলেন ড. সৈয়দ মুজতবা আলী। সমাবেশে হাজার হাজার লোক অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠান শুরুর এক পর্যায় মুসলিম লীগের কর্মীরা আক্রমণ চালিয়ে সভা বন্ধ করে দেয়। ফলে ড. সৈয়দ মুজতবা আলী তার বক্তব্য উত্থাপন করতে পারেননি। পরে কলকাতার চতুরঙ্গ ও সিলেটের আল-ইসলাহ পত্রিকায় তাঁর বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সরকারের সাথে ড. সৈয়দ মুজতবা আলীর মতবিরোধ ঘটে এবং তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এরপর ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিলেট অঞ্চল অনেক কর্মসূচি পালন করে। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পীর হাবিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে সিলেটে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ছাত্র হত্যার সংবাদ সন্ধ্যায় সিলেটে পৌঁছলে মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সিলেটবাসী। ২২ ফেব্রুয়ারি সিলেট শহরে হরতাল পালিত হয়। সমস্ত শহরে পোস্টার লাগানো হয়। হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি নওবেলাল পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করে। এদিন নারী সমাজ প্রতিবাদ সভা করে। বিকেলে জিন্নাহ হলে (বর্তমান শহীদ সুলেমান হল) নারী সমাজের আরও একটি সমাবেশ হয়। সিলেটে ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট শহরের বাইরেও চলতে থাকে বিশেষ করে গোপালগঞ্জ থানায়, বিশ্বনাথ থানায়, ফেঞ্চুগঞ্জ থানায়, বিয়ানী বাজার থানায় স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট হয়।
৬. কুমিল্লা অঞ্চল: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে গণপরিষদে উত্থাপিত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি অগ্রাহ্য হয়।
ধীরেন্দ্রনাথ কুমিল্লার সন্তান হওয়ায় এবং ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য হওয়ায় কুমিল্লায়ও ভাষা আন্দোলনের ঢেউ লাগে। ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের সকল পর্বে কুমিল্লার ভূমিকা ছিল অনন্য। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশির বর্বরতা ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা শহরের পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। কুমিল্লা শহর জনশূন্য হয়ে যায়। সমস্ত দোকানপাট বন্ধ থাকে। স্থানীয় টাউন হলের জনসভায় এক নজিরবিহীন জনসমাবেশ ঘটে। কুমিল্লার ইতিহাসে এরকম জনসভা কখনো ঘটেনি।
এভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগা, বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নাটোর, কুড়িগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, পঞ্চগড়, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ঢাকাকে অনুসরণ করে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয়।
ভাষার দাবিতে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি এখানে তুলে ধরা হলো:
১. ২২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত জনসভায় একটি "রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ" গঠিত হয় এবং একই দিনে বিকালে স্থানীয় টাউন হলে জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলার মুসলিম লীগ সভাপতি ফখরুদ্দীন আহমদ। এ সভায় গৃহীত প্রস্তাবে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদসহ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
২. ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলার সর্বত্র ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল, মিছিল ও জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
৩. ২৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের জনসভায় ছাত্র হত্যার এবং জনসাধারণের ওপর পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
৪. যশোর জেলায় শিরোলিস্তান গ্রামে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় গৃহীত প্রস্তাবে পুলিশি নির্যাতন এবং ছাত্র হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। এ জনসভা থেকে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। এ জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
শহিদ মিনারের ইতিকথা
শহিদ মিনার মহান ভাষা আন্দোলন ও বীর শহিদদের স্মৃতি চিরঅম্লান করে রাখার জন্য এবং বাঙালির প্রতিবাদের গৌরবোজ্জ্বল রক্তাক্ত ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দেওয়ার স্মৃতির মিনার। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা করার জন্য যেসকল ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছিলেন এবং যাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন তাদের স্মৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এবং অধিকার আদায়ে প্রেরণা জোগাতেই শহিদ মিনারের সৃষ্টি।
প্রথম শহিদ মিনার: ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা মেডিকেল ছাত্র হোস্টেলের বারো নম্বর শেডের পূর্বপ্রান্তে রাতারাতি প্রথম শহিদ মিনার তৈরি করেন। সেখানেই প্রথম শহিদ হয়েছিল রফিক উদ্দিন আহমেদ। শহিদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া। এর ডিজাইন করেন ডা. সাইদ হায়দার ও ডা. বদরুল আলম। তদারকিতে ছিলেন মির্জা মাজহারুল ইসলাম ও জি.এস শরফুদ্দিন। মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণের জন্য জমিয়ে রাখা ইট, বালু, সিমেন্ট এ কাজে ব্যবহার হয়। ভোর হওয়ার পর কাপড় দিয়ে মিনারটি ঢেকে দেওয়া হয়।

২৪শে ফেব্রুয়ারি শহিদ শফিউর রহমানের পিতা মাহবুবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারের উদ্বোধন করেন। শহিদ মিনার নির্মাণের খবর দৈনিক সংবাদগুলোতে পাঠানো হয়। "শহিদ বীরের স্মৃতি" শিরোনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহিদ মিনারের খবর। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় শহিদ মিনারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ঐ দিনই পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং রাতের মধ্যেই প্রথম শহিদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি প্রথম শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ রচনা করেন 'স্মৃতিস্তম্ভ' নামে এই কবিতাটি-
স্মৃতিস্তম্ভ
স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটিকা ধূলায় চূর্ণ যে-পদপ্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুন টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।
ইটের মিনার
ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার জাগরী
চারকোটি পরিবার
এ- কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু?
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং
এ- কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল?
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণ লেখায়
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নাম
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর।
দ্বিতীয় ধাপে শহিদ মিনার: বায়ান্ন সালে শহিদ মিনার ভাঙার দুই বছর পর ১৯৫৪ সালে একুশের শহিদদের স্মরণে নতুন শহিদ মিনার তৈরি করা হয়।
১৯৫৩ সাল থেকে প্রতিবছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে মহান ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতিরক্ষার্থে শহিদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টির মন্ত্রিসভার পতন ঘটলে ৬ই সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন করে শহিদ মিনারের কাজ শুরু হয় এবং একটানা কাজ চালিয়ে ১৯৫৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ভিত্তি, মঞ্চ এবং তিনটি স্তম্ভ তৈরি সমাপ্ত হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে শিল্পী হামিদুর রহমানকে শহিদ মিনার থেকে বের করে দেওয়া হয়। ফলে থেমে যায় শহিদ মিনারের নির্মাণ কাজ। অতঃপর ঐবছরের ২৭শে অক্টোবর জারি করা হয় সামরিক শাসন। আটান্ন থেকে বাষট্টি পর্যন্ত এই অসমাপ্ত শহিদ মিনারেই জনতা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে এবং সকল প্রকার অন্যায়ের প্রতিবাদের জন্য মিলিত হয়েছে এবং শপথ করেছে। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আজম খান শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য একটি কমিটি করে দেন। সেই কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের সাতান্ন সালের শহিদ মিনারের নকশা সুপারিশ করেন। সেই অনুযায়ী ১৯৬৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারির
মধ্যে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয় এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত এই শহিদ উদ্বোধন করেন শহিদ আবুল বরকতের ৭২ বছরের বয়স্ক মা হাসিনা বেগম। তেষট্টি থেকে একাত্তর এই নয় বছর ঐ শহিদ মিনারই ছিল বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের শপথ গ্রহণের পীঠ স্থান। আর তাই একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে গণহত্যা চালানোর পরে ২৬শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গোলাবর্ষণ করে শহিদ মিনারটি গুড়িয়ে দেয়।

বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আবার শহিদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু করে। উক্ত কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের পেশকৃত নকশা ও পরিকল্পনাই অনুমোদন করেন, যা ছিল সাতান্ন সালের নকশা ও পরিকল্পনা অনুরূপ। হামিদুর রহমানের নকশায় বর্তমানে শহিদ মিনার তিনস্তর বেদির ওপর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ৫টি স্তম্ভের মাঝখানে রয়েছে ঈষৎ অবনত সবচেয়ে বড় একটি স্তম্ভ। এর দুপাশে রয়েছে দুটি করে চারটি স্তম্ভ। মাঝখানের বড় ঈষৎ অবনত স্তম্ভটি স্নেহময়ী মা এবং দুপাশে ছোট স্তম্ভ চারটি সন্তানের প্রতীক হিসেবে শহিদ মিনারকে মনে করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত শহিদ মিনারটিই বর্তমানে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। অবিকল নকশায় দেশের সকল জেলা শহরে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার রয়েছে। দেশের বাইরে প্রথম শহিদ মিনার নির্মিত হয় জাপানে।
একুশের প্রথম গান ও কবিতা
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখে ছাত্ররা "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" স্লোগান দিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে এলে পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত ও অনেকে আহত হন। সেসময় ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকা মেডিকেলে যান এবং আউটডোরে তিনি মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একটি রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। লাশটি ছিল রফিক উদ্দীনের। লাশটি দেখে তার মনে হলো এটা যেন তার নিজের ভাইয়ের রক্তমাখা লাশ। তখনই তার মনে একটি গানের প্রথম দুই লাইন জেগে ওঠে, পরে তিনি গানটি শেষ করেন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রকাশিত লিফলেট "একটি একুশের গান" শিরোনামে প্রকাশিত হয়। গানটি গাওয়ার অপরাধে ঢাকা কলেজের ১১ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের ঘটনার পর 'একুশ' নিয়ে প্রথম গান রচনা করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নগ্ন পায়ে প্রভাতে এই গানটি গেয়ে আমরা শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে থাকি। গানটি হলো-
আমার' ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবৈশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভ আজ কাঁপুক বসুন্ধরা
দেশে সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি
সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পানে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভাইয়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহিদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে
দারুন ক্রোধের আগুন আবার জ্বালাবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি ।

গানটির প্রথম সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ। পরে করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে এসে ১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহমুদ আবার নতুন করে গানটিতে সুরারোপ করেন। সেই সুরেই গানটি হয়ে গেল একুশের প্রভাতফেরির গান। বর্তমানেও আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি গাওয়া হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তৎকালীন সরকার গানটি বাজেয়াপ্ত করে। জহির রায়হান তার "জীবন থেকে নেয়া" ছবিতে গানটি ব্যবহারের পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই গানটির সুনাম আরও বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে গানটি হিন্দি, মালয়, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ ও জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়। বিবিসি শ্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় এই গানটির অবস্থান তৃতীয়।
ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ১৯৫৪ সালে আবদুল লতিফ লেখেন "ভাষার গান"। গানটি হচ্ছে-
ওরা আমার মুখের ভাষা
কাইড়া নিতে চায়,
ওরা, কথায় কথায় শিকল পরায়
আমার হাতে পায়।
কইতো যাহা আমার দাদায়,
কইছে তাহা আমার বাবায়
এখন কও দেখি ভাই মোর মুখে কি
অন্য কথা শোভা পায়?
সইমু না আর সইমু না,
অন্য কথা কইমু না,
যায় যদি ভাই দিমু সাধের জান,
ঐ জানের বদলে রাখুম রে ভাই
বাপ-দাদার জবানের মান।
যে শুনাইছে আমার দেশের
গাঁও- গেরামের গান
নানান রঙের নানান রসে ভইরাছে তার প্রাণ।
ঢপ-কীর্তন, ভাসান জারি
গাজীর গীত আর কবি, সারি,
আমার এই বাংলাদেশের বয়াতিরা
নাইচা নাইচা কেমন গায়।
তারই তালে তালে হৈ
ঢোল, করতাল বাজে ঐ
বাঁশি কাঁসি খঞ্জিরি, সানাই
কোথায় গেলে দেখতে পাই।
প্রথম কবিতা
ঢাকার কেন্দ্রীয় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও চৌধুরী হারুনুর রশিদ এবং এম. এ. আজিজকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে চট্টগ্রামে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক চট্টগ্রামের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয় ৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন অর্থাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের সংবাদ চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সদস্য খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াছের নিকট পৌঁছে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে 'একুশ' নিয়ে প্রথম কবিতা লিখলেন চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। কবিতার নাম ছিল 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি'। কবিতাটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে।
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলে
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছোপ
সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি l
আজ আমি শোকে বিহ্বল নই
আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।
যে শিশু আর কোন দিন তার
পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার
সুযোগ পাবে না
যে গৃহবধূ আর কোন দিন তার
স্বামীর প্রতীক্ষায় আঁচলে প্রদীপ
ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়ায়ে থাকবে না
যে জননী খোকা এসছে বলে
উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর
বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না
যে তরুণ মাটির কোলে লুটিয়ে
পড়ার আগে বার বার একটি
প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে
চেষ্টা করেছিল
সে অসংখ্য ভাই বোনের নামে
আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত
যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত
সেই ভাষা ও স্বদেশের নামে
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে
আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি
যারা আমার অসংখ্য ভাই বোনকে
নির্বিচারে হত্যা করেছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
একুশের চেতনার দিপশিখা এতটাই উজ্জ্বল যে এর বিস্তৃতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের সীমানা ডিঙিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাতে মাতৃভাষার জন্য ১৯৫২'র একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালিরাই জীবন দিয়েছে, এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ইউনেস্কো ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন বাঙালির পরিচয় বিশ্বব্যাপী। এসব কিছু অর্জন হয়েছে একুশ সৃষ্টির ফলেই। একুশে চেতনার অগ্রযাত্রা আজও থেমে যায়নি। দেশ থেকে দেশান্তরে সাফল্যগাথা নিয়ে ছুটে চলাই যেন একুশের ধর্ম।
একুশ যেভাবে হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯২: বায়ান্নর একুশের রক্তদান অবিস্মরণীয়
করে রাখতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বাংলাভাষীরা ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে বেসরকারিভাবে 'বাংলা ভাষা' দিবস হিসেবে পালন শুরু করে। [সূত্র: ডা. মোহাম্মদ হান্নান লিখিত 'একুশ যেভাবে হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, অন্তর্গত পাক্ষিক অবলোকন ২ বর্ষ ১ সংখ্যা: ঢাকা ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১১ই মার্চ ২০০২ পৃ ১৬]। এপ্রিল ১৯৯৪।
৯ই জানুয়ারি ১৯৯৮: এদিন কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম তাদের প্রতিষ্ঠিত The mother language love the world সংগঠনের মাধ্যমে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে এক পত্র প্রেরণ করেণ। পত্রের মূল বিষয় ছিল বিশ্বের প্রতিটি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস প্রতিবছর পালন করা হোক এবং যেহেতু পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে সেজন্য ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হোক (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
২৩শে জানুয়ারি ১৯৯৮ এদিন জাতিসংঘের মহাসচিবের পক্ষে ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনফরমেশন-এর অফিসার ইনচার্জ হাসান ফেরদৌস রফিকুল ইসলামের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার প্রস্তাবটি যেন কোনো সদস্য দেশ থেকে উত্থাপন করা হয় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ থেকে জানুয়ারি ১৯৯৯: একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাবটি নিয়ে এ পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং বাংলাদেশস্থ ইউনেস্কো অফিসে বেশ কয়েকটি পত্র লিখে এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন। কিন্তু কেউ তার পত্রের জবাব দেননি কিংবা কোনোরূপ উদ্যোগও গ্রহণ করেননি। এতে হতাশ না হয়ে রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এবং ইউনেস্কো সদর দপ্তরে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দা ওয়ার্ল্ড-এর পক্ষ থেকে পুনরায় ২৯শে মার্চ ১৯৯৮ তারিখে সাতটি ভাষাভাষী ফিলিপিনো, ইংরেজি, কানাডিস, মালয়, জার্মান, হিন্দি এবং বাংলাদেশি সাত জাতির ১০ জন লোকের স্বাক্ষর নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ইউনেস্কো সদর দপ্তরে একটি স্মারকলিপি প্রেরণ করেন।
এক পর্যায়ে প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রস্থ কানাডিয়ান এম্বেসিকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এম্বেসি কর্তৃপক্ষ উক্ত পত্রটি কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। এ পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম বেশ কয়েকবার কানাডিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে টেলিফোনে আলাপ করলেও তারা সিদ্ধান্ত দিতে অপারগ হয়। অতঃপর পত্রের অপর একটি কপি রফিকুল ইসলাম সরাসরি জাতিসংঘের মহাসচিবের বরাবরে প্রেরণ করেন। এমতাবস্থায় প্রায় আট মাসাধিককাল জাতিসংঘের তথ্য অধিদপ্তরের সাথে বিভিন্ন সময়ে ফোনে আলাপ করেন। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯-তে এসে উক্ত দপ্তরের হাসান "ফেরদৌস বিষয়টি নিয়ে ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করার উপদেশ দেন (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ হাসান ফেরদৌসের উপদেশ মতো রফিকুল ইসলাম পত্রটি ইউনেস্কোতে প্রেরণ করেন। এ "পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করেন। ভাষা বিভাগের পরিচালক এ বিষয়ে "খুবই উৎসাহ বোধ করেন। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
৮ই এপ্রিল ১৯৯৯: উদ্যোক্তারা ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ভাষা বিভাগের আন্না মারিয়া রফিকুল ইসলামকে ৮ই এপ্রিল, ১৯৯৯ সালে এক পত্রে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি রফিকুল ইসলামের নিকট প্রেরণ করেন।
সংক্ষেপে তথ্যগুলো হলো:
১. প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে হলে জেনারেল কনফারেন্সে তা উপস্থাপন করতে হবে। ৩০তম অধিবেশন এ বছরের নভেম্বর/ডিসেম্বরে হবে। ঐ সময় এ সুযোগ রয়েছে।
২. প্রস্তাবটি সমর্থন করে যেকোনো একটি দেশ তার নিজের প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করবে।
৩. এ ব্যাপারে ইউনেস্কো ন্যাশনাল কমিশন কোনো একটি দেশকে প্রস্তাবক হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করতে বলেন। দেশগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, কানাডা, ফিনল্যান্ড, ভারত এবং হাঙ্গেরি। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ১২ই ডিসেম্বর ১৯৯৯)।
মে হতে অক্টোবর ১৯৯৯: রফিকুল ইসলাম ৫টি দেশের সঙ্গে ব্যাপকভাবে যোগাযোগ করেন। ফলশ্রুতিতে ১৬ই আগস্ট
১৯৯৯ তারিখে হাঙ্গেরি থেকে প্রথম সমর্থনসূচক প্রস্তাবটি ইউনেস্কো এবং রফিকুল ইসলামের নিকট আসে। ফিনল্যান্ড জানায়, অন্য কোনো দেশ প্রস্তাব উত্থাপন করলে তারা সমর্থন দেবে। বহুবার যোগাযোগ ও ফোনে আলাপের পরে ভারত ও কানাডা সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ইতোমধ্যেই রফিকুল ইসলাম (জুন ১৯৯৯) সেক্রেটারি জেনারেল, ইউনেস্কো অব বাংলাদেশ এবং শিক্ষা সচিব কাজী রকিবউদ্দিনের সাথে আলাপ করেন। তিনি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং অতিসত্বর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেকের সাথে আলাপ করেন এবং সময়ের স্বল্পতা হেতু এক ব্যক্তিগত পত্রে বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব আগ্রহান্বিত হন এবং অতি দ্রুততার সাথে প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর দপ্তরে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ফলে প্রস্তাবটি জমাদানের সর্বশেষ দিনের আগের দিন নানান বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৭ লাইনের একটি প্রস্তাব ফ্যাক্সযোগে প্যারিসে প্রেরণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো'র সচিব কফিল উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবটি পেশ করেন। ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর ১৫৭তম অধিবেশনে এবং ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে বাংলাদেশে এ প্রস্তাব আসে। ১৬০তম অধিবেশনে তৎকালীন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এএইচকে সাদেক বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে জনমত সৃষ্টি করে।
কানাডা থেকে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য যে প্রস্তাব করেছে, বাংলাদেশ সেই উদ্ধৃতিসহ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। ২৬শে অক্টোবর থেকে ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯ তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এস এইচ কে সাদেক, স্পেশাল এ্যাডভাইজার টু দ্য ডিজি অব ইউনেস্কো তোজাম্মেল হক, রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, ইউনেস্কো সচিব কফিল উদ্দিন আহমদ এবং কাউন্সিলর ইশতিয়াক চৌধুরী এই প্রস্তাবটি পাশ করানোর জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। এর ফলে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটি বাংলাদেশের তরফ থেকে উত্থাপন করা হলে প্রস্তাবটি যেসব দেশ সমর্থন করেছিল সেগুলো হচ্ছে- ওমান, লেবানন, শ্রীলংকা, ইজিপ্ট, রাশিয়ান ফেডারেশন, বাহামা, ডমিনিক্যান রিপাবলিক, বেলারুস, দি ফিলিপিন্স, কোর্ট ডি ভয়্যার, ইন্ডিয়া, হন্ডুরাস, গাম্বিয়া, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, ভানুয়াটু, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ক্যামোরোস, পাকিস্তান, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান, লিথুয়ানিয়া, ইতালি এবং সিরিয়া।
১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯: এদিন প্যারিসে অনুষ্ঠিত UNESCO-এর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লেখ্য, উক্ত সম্মেলন ১৬ই নভেম্বর শুরু হলেও আলোচ্য সিদ্ধান্তটি হয় ১৭ই নভেম্বর। "প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নজিরবিহীন আত্মত্যাগের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি। ১৯৫২ সাল থেকে বাংলাদেশের মানুষ এবং ১৯৭১ সালে
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কতটা ভাবগম্ভীর পরিবেশে অদ্যাবধি দিবসটি পালন করছে তাও এ সম্মেলনে (প্যারিস সম্মেলনে) যথার্থ গুরুত্বের সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয়।" (সূত্র: বাংলাপিডিয়া, প্রথম খণ্ড: ঢাকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৩: পৃ ১৭৭)
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ১৮৮টি দেশ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' পালনের প্রস্তাবে সম্মত হয়। ইউনেস্কোর ঘোষণায় বলা হয়, "১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যাঁরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন তাঁদের স্মরণে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বব্যাপী পালনের জন্য 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হলো।" এভাবেই ২১শে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০০০ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ প্রথমবারের মতো এ দিবসটিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে পালন করে। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাতত্ত্বের এক সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ভারতবর্ষের সব ভাষা পণ্ডিতদের উপস্থিতিতে বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, "শুধু ভারতে নয় বাংলা ভাষার স্থান হবে এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চে।" একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কথাটি পরিপূর্ণ সার্থক হয়েছে। আজ বাংলা ভাষার স্থান শুধু এশিয়া মহাদেশে নয়, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। এটা সম্ভব হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি এবং বাংলা ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক গুণের জন্য। (সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২/২/২০১৯)
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Read more