শিল্প বিপ্লব (অধ্যায় ১)

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.6k

Industrial Revolution

জন কে (John Kay 1704-1779) (১৭০৪-১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দ): অষ্টাদশ শতকে যে আবিষ্কারসমূহ শিল্পজগতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য Flying Shuttle বা কলের মাকু, যার আবিষ্কারক জন কে। তিনি ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ই জুন ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষানবিস আবিষ্কারক হিসেবে তিনি হস্তচালিত তাঁতযন্ত্রে নলখাগড়ার পরিবর্তে ধাতুর ব্যবহার শুরু করেন, যা ইংল্যান্ডে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তিনি ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে মিহি কাপড়ের জন্য সুতা জড়ানোর যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কারসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো Flying Shuttle আবিষ্কার, যদিও তিনি নিজে এ আবিষ্কারকে বলতেন Wheeled Shuttle তার এ আবিষ্কারের ফলে বুনন যন্ত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়। তার জীবদ্দশায় তিনি অনেকগুলো আবিষ্কার করলেও পেটেন্ট পেতে ব্যর্থ হন। বিরোধীদের অপপ্রচার ও সরকারের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় তিনি আর্থিক কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেন।

তিনি আরও বেশি আবিষ্কার করতে সরকারের সমর্থনে ফ্রান্সেও যান। ধারণা করা হয়, ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান। মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তিনি ব্রিটিশদের কাছে জনপ্রিয় হন।

এডমুন্ড কার্টরাইট (Edmund Cartwright 1743-1823) (১৭৪৩-১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ): একজন ব্রিটিশ বিজলিচালিত তাঁতযন্ত্র আবিষ্কারক। তিনি ১৭৪৩
খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনকারী। প্রথম জীবন ধর্মযাজক হিসেবে পেশা শুরু করলেও পরবর্তীকালে তিনি আবিষ্কারক হন। তিনি রিচার্ড আর্করাইটের কারখানা পরিদর্শন করে বস্ত্রশিল্পের গতি ও গুণগত মানের উন্নতির জন্য নতুন যন্ত্র আবিষ্কারে অনুপ্রাণিত হন। জ্যাক ডিজকোহোফের সাথে তিনি ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে পাওয়ার লুম আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারটি বস্ত্র উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে এই আবিষ্কারের জন্য পার্লামেন্ট থেকে ১০,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি Royal Society-র সদস্য নির্বাচিত হন। ম্যানচেস্টারের একটি কোম্পানি ৪০০টি পাওয়ার লুম কিনলে সেখানকার শ্রমিকরা কাজ হারানোর ভয়ে কারখানায় আগুন দেয়।

এই ঘটনা অন্য কোম্পানির পাওয়ার লুম ক্রয়ে অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। পাওয়ার লুমের উন্নত সংস্করণ হলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তার অন্য আবিষ্কারসমূহ হলো- দড়ি তৈরির মেশিন, পশমি সুতা একত্রীকরণ মেশিন, পানির পরিবর্তে অ্যালকোহল ব্যবহৃত বাষ্প ইঞ্জিন ইত্যাদি। এডমুন্ড কার্টরাইট ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর সাসেক্সে মৃত্যুবরণ করেন।

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

১৫৪০- ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ
১৬৪০- ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ
১৭৫০- ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ
১৭৬০- ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ
ভূমি বিশেষজ্ঞ
কৃষি বিশেষজ্ঞ
পশু বিশেষজ্ঞ
যন্ত্র বিশেষজ্ঞ

শিল্প বিপ্লব কী?

জার্মান বংশোদ্ভূত ফরাসি কূটনীতিবিদ লুই গুইলার ওটো (Louis-Guillaume Otto) ১৭৯৯ সালের ৬ জুলাই লেখা এক পত্রে 'Industrial Revolution' শব্দদুগল ব্যবহার করে লিখেছেন যে, ফ্রান্স শিল্পের দৌড়ে প্রবেশ করেছে। ১৭৯০-এর দশকে কবি উইলিয়াম ব্লেইক (William Blake) এবং উইলিয়াম ওয়ার্ডসওর্থ (William Wordsworth) তাদের লেখায় উনিশ শতকে উত্তরণের কালকে শিল্প বিপ্লবের সময় বলে উল্লেখ করেছেন। যন্ত্র প্রযুক্তির ভিত্তিতে একটি সামাজিক ব্যবস্থার (Social Order) ধারণা হিসেবে শিল্প বিপ্লবকে উল্লেখ করেছেন সাউদে (Southey) এবং ওয়েন (wen)। তারা অবশ্য ১৮১১-১৮১৮ সময়কে এ পর্বের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত 'শিল্প বিপ্লব' নামক গ্রন্থে ফরাসি বিপ্লবী জেরম-এডলফ ব্লাঙ্ক (Jerome-Adolph Blanqui's) ১৮৩০-এর দশকের শেষের দিকে শিল্পে যন্ত্র-প্রযুক্তির ব্যবহারের ব্যাপকতা লক্ষ করে শিল্প বিপ্লবের সূচনা কাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস ১৮৪৪ সালে 'ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা' ও শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন "an Industrial revolution, a revolution which at the same time changed the whole of civil society" ("শিল্প বিপ্লব হচ্ছে একটি বিপ্লব যা একই সঙ্গে সমগ্র নাগরিক সমাজকেই পরিবর্তন করেছে")। তবে

আরনল্ড টয়েনবি। শিল্প বিপ্লবের আর্থ-সামাজিক ধারণাটি ব্যাপকভাবে প্রথম উপস্থাপন করেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আরনল্ড টয়েনবি (১৮৫২-১৮৮৩)। ১৮৮১ সালে এ বিষয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু বক্তৃতা প্রদান করেন। এতে তিনি শিল্প বিপ্লবের বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। জন ক্লাফম্যান (John Claphman) এবং নিকোলাস ক্রাফ্ট (Nicholas Craft) নামক ইতিহাসবিদগণ আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনকে সমাজের ধারাবাহিক বিকাশ হিসেবে দেখেছেন। কোনো বিপ্লবকে তারা নামকরণের ভুল প্রয়োগ (misnomer) বলেও আখ্যায়িত করেছেন। বস্তুত ইতিহাসবিদদের মধ্যে শিল্প বিপ্লব ধারণাটি এবং এর কাল পর্ব নিয়ে এখনও যথেষ্ট মতভেদ এবং বিতর্ক রয়েছে।

শিল্প বিপ্লবের কালপর্বসমূহ

শিল্পে যন্ত্র-প্রযুক্তির আবিষ্কার, ব্যবহারের পরিমাণ, উৎপাদন, মালিক ও শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব এবং অর্থনৈতিক বিকাশের পরিমাণকে পর্যালোচনা করে অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকগণ শিল্প বিপ্লবকে সাধারণভাবে নিম্নোক্ত পর্বে বিভক্ত করেছেন।

১। সূচনা-পর্ব: ১৭৩৩-১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই পর্বে বয়ন, যোগাযোগ, খনিজ দ্রব্য ইত্যাদি নতুন নতুন যন্ত্র প্রযুক্তির আবিষ্কার ঘটে, তবে বেশির ভাগ শিল্পই তখন ছিল ছোট থেকে মাঝারি আকারের, কম পুঁজি, মালিক শ্রমিকের সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত কম, বড়জোর মাঝারি আকার পর্যন্ত।
২। ভারী ও যৌথ শিল্পের যাত্রা: ১৮৩০-১৯৪০ এর দশক পর্যন্ত। এই সময় বেশ কিছু দেশে বড় বড় শিল্প-
কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, কয়েক হাজার থেকে লাখের অধিক শ্রমিক এক একটি শিল্প কারখানায় কাজ করে, শত শত টন পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে, যৌথ মালিকানায় রেল লাইন, বন্দর, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে অর্থনীতিতে শিল্পের অংশ দ্রুত প্রধান হয়ে উঠতে থাকে।
৩। বহুজাতিক কোম্পানির পর্ব (১৯৪৫- ১৯৭০): এই পর্বে উন্নত দেশগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময় উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন কোম্পানি অনুন্নত দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে ব্যাপক পুঁজির সঞ্চালন ঘটায়।

৪। উচ্চতর প্রযুক্তি (Hi-tech) : ১৯৭০ পরবর্তী : এই সময়ে কম্পিউটার, মোবাইলসহ সর্বোচ্চ সুবিধা-নির্ভর প্রযুক্তির উদ্ভব ও ব্যবহারের ফলে পৃথিবীব্যাপী অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এখন উচ্চতর গুণাগুণ সম্পন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে মানুষ নানা বৈচিত্র্যের খাদ্য, ঔষধ, নির্মাণ সামগ্রী, যানবাহন, ভোগ্যপণ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কার, গবেষণা, শিক্ষাদীক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করছে। এর ফলে মানুষের জীবন ব্যবস্থায় অসীম সম্ভার নিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে চলছে। এ সবই শিল্প বিপ্লবের ক্রমবিকাশের অবিস্মরণীয় ধারা।

(ক) প্রাক-শিল্পবিপ্লব যুগে ব্রিটিশ অর্থনীতি
শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে ব্রিটেনের অর্থনীতি ছিল কৃষি-নির্ভর। তবে পাঁচ থেকে পনের শতক পর্যন্ত ব্রিটেনের কৃষি গ্রামের সমস্ত জমি নিয়ে এক একটি ম্যানর গড়ে উঠতো। নিজেদের প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ্য রেখে ম্যানরের, কার্যকর ছিল। সাধারণত মাধ্যমে চাষাবাদ করা হতো। অতিরিক্ত উৎপাদন করে অন্যত্র রপ্তানি তথা বাজার সৃষ্টির কোনো ধারণা তখন ছিল না মূলত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারাই সকলের লক্ষ্য ছিল। বিলাসী দ্রব্য অথবা লোহা ও ইস্পাতের মতো সামগ্রীর জন্যে গ্রামগুলোর নির্ভরতা ছিল শহরগুলোর ওপর। ম্যানরগুলোতে টাকার প্রচলন ছিল না, দ্রব্যের সঙ্গে ।ব্যের সরাসরি বিনিময় প্রথা ছিল। ম্যানরগুলোতে জমিদারদের কর্তৃত্ব ছিল। কিছু স্বাধীন কৃষকের কাছে কিছু জমি - চাষবাসের জন্যে ছিল- বাকি জমি ভূমিহীন তথা ভূমিদাসদের দিয়ে চাষাবাদ করানো হতো। তবে সমগ্র চৌদ্দ শতক - জুড়ে ব্রিটেনে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী লেগেই ছিল। ফলে পনের শতকে ম্যানের প্রথা ভেঙে যায়, কৃষি অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে। ষোল শতকে ব্রিটেনের কৃষি ব্যবস্থায় মৌলিক বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। ছোট আকারের বাদ দয়ে বড় এলাকা নিয়ে চাষাবাদ শুরু করা হয়। নিজেদের ছড়ানো ছিটানো জমিগুলো পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে একত্রীভূত করা হয়। এর ফলে কৃষিজ পণ্য উৎপাদন ছাড়াও ভেড়া চরানোর জমি পাওয়া গেল। বাণিজ্যিক শস্যের চাষও শুরু হয়। কৃষি অর্থনীতি বাজারমুখী হয়ে ওঠে। ফলে কৃষিজ পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। অনাবাদি জমিগুলো দ্রুত চাষাবাদের আওতায় চলে আসে। এটিকে কৃষি বিপ্লব বলা হয়। ষোল শতক থেকে এই বিপ্লব ব্রিটেনের কৃষি অর্থনীতির ভিত্তিকে মজবুত করতে থাকে-যা অচিরেই শিল্প বিপ্লবের পথ সুগম করে।

(খ) সামাজিক অবস্থা
শিল্প বিপ্লবের আগে ব্রিটেনের সমাজ ছিল সামন্তবাদী। সতের শতকের প্রথম ভাগে দেশের পাঁচ ভাগের চার ভাগ মানুষই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করতো। কৃষিই তাদের জীবিকার প্রধান উপায় ছিল। এ ছাড়া বাড়িতে তাঁতের কাজ, পরিজনসহ ভেড়ার চাষ ও লোম সংগ্রহ, শীত নিবারণের পোশাক তৈরি ইত্যাদি কাজে অনেকেই জড়িত ছিল। দেশের বেশির ভাগ জমির কর্তৃত্ব করতেন মাত্র কয়েক হাজার জমিদার। জমির এক অংশ থাকতো স্বাধীন কৃষকদের হাতে, বাকি অংশ ভূমিদাসদের দিয়ে চাষ করানো হতো। ষোল শতকে ভূমিদাসগণ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসতে থাকে। শহরগুলোতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বস্তিতে থেকে এরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মজুর ও শ্রমিকের কাজ করতো। তখন ইংল্যান্ডের শহর ও গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। মাথাপিছু আয় ছিল খুবই সীমিত। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব ধীরগতিসম্পন্ন ছিল। আবহাওয়া বৈরী থাকার কারণে ফসলহানি, খরা ও শীতে মৃত্যুর হার ছিল উদ্বেগজনক। বেশির ভাগ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল না, দারিদ্র্যের প্রকোপ স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ছিল। অন্যদিকে জমিদার, লর্ড ও শাসকশ্রেণি এবং শহরগুলোতে ডাক্তার, উকিল, ধনী ব্যবসায়িগণ অভিজাত হিসেবে পরিচিত ছিল। তারা প্রায় সকলেই স্বচ্ছল জীবন-যাপন করতেন। সাধারণ মানুষ এবং অভিজাতদের সামাজিক অবস্থানের মধ্যে বেশ বৈষম্য বিরাজ করতো। তবে অঞ্চলভেদে সামাজিক অবস্থানে বেশ তারতম্য ছিল। এর ফলে বৃহত্তর ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের আগে কোনো, জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে যোগাযোগ স্থাপনসহ নতুন সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্র তৈরি করে। এর ফলে ব্রিটেনের জাতিগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে সংহতি প্রতিষ্ঠার অধ্যায় শুরু হয়।

(গ) রাজনৈতিক অবস্থা
ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব শুরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক বিষয় ছিল অপেক্ষাকৃত অগ্রসর ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা। ১৬৪০-৪৮ সালের গৃহযুদ্ধ শেষে ইংল্যান্ড ১৬৮৮ সালে 'গৌরবময় বিপ্লব' নামে খ্যাত সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু করে। ব্রিটেন অতীতে নানা যুদ্ধে জড়ালেও সেগুলো সংঘটিত হয়েছিল ব্রিটেনের বাইরে। ফলে ইংল্যান্ডের ভূখন্ডে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। অধিকন্তু ব্রিটেনের নৌশক্তি তুখনকার সময়ে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। যে কারণে ইংল্যান্ড সেই সময়কার শক্তিশালী দেশ বলে পরিচিতি পায়। ফ্রান্স, স্পেন ও হল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয় ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক শক্তি তখন ততোটা জন্ম লাভ করে নি। ফ্রান্সের রাজতন্ত্র তখনো ব্রিটেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়ে যায় নি। জার্মান ভূখণ্ড ছিল ছিন্নভিন্ন রাজ শাসনে বিভক্ত। ইংল্যান্ডে সংসদ এবং রাজনৈতিক সংগঠন ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন শুরু করে। অন্যদিকে ব্রিটেনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আঠারো শতকে তেমন কোনো সংকট না থাকায় দেশের সরকার এবং বিকাশমান শ্রেণি-গোষ্ঠীসমূহ নতুন অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পরিপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরির ভিত্তি প্রশস্ত করে।

শিল্প বিপ্লবের শর্তসমূহ:
একটি দেশে শিল্প বিপ্লব হওয়ার জন্য কতগুলো অপরিহার্য শর্ত প্রয়োজন। যেমন-
১। কৃষি উদ্বৃত্ত
২। সামাজিক স্থিতিশীলতা বা ঐক্য
৩। শ্রমিক শ্রেণির উপস্থিতি
৪। বুর্জোয়া (শহরে বসবাস করা পুঁজিপতি) ব্যবসায়িক শ্রেণি
৫। কাঁচামালের সরবরাহ
৬। পণ্যের বাজারের নিশ্চয়তা।

১। কৃষি উদ্বৃত্ত : ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডে উল্লেখিত শর্তগুলো পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। ইংল্যান্ডের মেনর প্রথার উচ্ছেদ করে সেখানে পরিকল্পিতভাবে কৃষিপণ্য চাষ করা হতো। বাণিজ্যিক শস্যের চাষের ফলে ইংল্যান্ডের কৃষি অর্থনীতি বাজারমুখী হয়। ফলে অতিরিক্ত মুনাফার জন্যে অনাবাদি জমিগুলো চাষের আওতায় চলে আসে এর ফলে কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। উদ্বৃত্ত কৃষি সম্পদ বাণিজ্যে ও শিল্পে নিয়োগ করে পুঁজি গঠন কর সম্ভব হয়।

২। সামাজিক স্থিতিশীলতা বা ঐক্য টিউডর আমলে ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শারি প্রতিষ্ঠিত হয়। রানি এলিজাবেথ ইংল্যান্ডে ধর্ম সংস্কার করে সমাজে ধর্মীয় হানাহানি বন্ধ করে। রাষ্ট্র সমাজের মধ্যদি শ্রেণিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ সাহায্য দিয়ে তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহিত করে। ফলে ইংল্যান্ডে ধী বণিক শ্রেণি গড়ে উঠে এবং অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই ইংরেজরা ইউরোপে দোকানদারের জাতি হিসেবে পরিচিতি লাঃ করে। ইংল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণি ব্যবসা বাণিজ্যে উৎসাহী ছিল।

৩। শ্রমিক শ্রেণির উপস্থিতি: শিল্পের জন্যে উদ্যোক্তা পুঁজি এবং শ্রম প্রদান ভূমিকা পালন করে। ইংল্যান্ডে সামন্ত প্রথ বিশেষ করে মেনর প্রথা বিলুপ্ত হলে ভূমিদাসরা শ্রমিকে পরিণত হয়। ফলে ইংল্যান্ডে শিল্পের জন্যে শ্রমিকের শ্রম সহজলভ্য ছিল। যেটি ইউরোপের অন্য দেশে তেমনভাবে ছিল না।

৪। বুর্জোয়া ও ব্যবসায়িক শ্রেণি: অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রাধান্য লাভ সম্ভব হয়। এই বুর্জোয়া শ্রেণি বিভিন্ন শহরে শিল্পের পুঁজি বিনিয়োগ করে শিল্পবিপ্লব সম্ভব করে ছিল। ইউরোপের অন্যান্য দেশে ইংল্যান্ডের মতো বুর্জোয়া শ্রেণির প্রাধান্য ছিল না।

৫। কাঁচামালের সরবরাহ ইংল্যান্ড অষ্টাদশ শতকের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সন্ধান পায়। এগুলো শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে তা শিল্প পণ্যে রূপান্ত রিত হয়।

৬। পণ্যের বাজারের নিশ্চয়তা: ইংল্যান্ড অষ্টাদশ শতকের মধ্যে আমেরিকা মহাদেশ এবং ভারতীয় উপমহাদেশকে তার পণ্যের বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এ নিয়ে ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ শুরু হলে সামুদ্রিক শক্তিতে বলিয়ান ইংল্যান্ড ফ্রান্সকে পরাজিত করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যবেশিক শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে ইংল্যান্ডের শিল্প পণ্যের বাজারে পরিণত করে। ইংল্যান্ড তার অধিকার উপনিবেশগুলো শোষণ করে প্রচুর পুঁজি গঠন করে। সেই পুজি শিল্প-অর্থনীতি বিনিয়োগ করে। এছাড়া ইংল্যান্ড আমেরিকা ও ভারত থেকে সোনা-রূপা ও মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ ইংল্যান্ডে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের যান্ত্রিক আবিষ্কার শিল্প বিপ্লবের সহায়ক ভূমিকা পালন করে ছিল। উল্লেখিত কারণে করে প্রচুর মূলধন গড়ে তোলে। এই মূলধনেই বণিক শ্রেণি ইংল্যান্ডে সবার আগে শিল্প বিপ্লব ঘটায়

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

শিল্প বিপ্লব প্রথম সংঘটিত হয় ইংল্যান্ডে। সময়টি ছিল আঠারো শতক। যে সব কারণে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল
তা নিম্নরূপ:

(১) অর্থনৈতিক আঠারো শতকের কিছু আগেই ব্রিটেনের সামন্তবাদী অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ে। পুরাতন *ভূমি ব্যবস্থার প্রতি কৃষক, ভূমিদাস ও প্রান্তিক চাষিরা আস্থা হারিয়ে ফেলে। জমিদারগণ বাজারমুখী কৃষিনীতি চালু করে। এর ফলে কৃষিতে উৎপাদন বেড়ে যায়। কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসে। ব্রিটেনের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে। ভারতবর্ষ থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি করে সেগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল অর্থোপার্জন করে ব্রিটেন। আঠারো শতকের শুরুতে ব্রিটেনের কৃষিতে উদ্বৃত্ত বেড়ে যায়। কেটে যায় দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। চাষিরা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে সাবলম্বী হয়ে ওঠে। ব্রিটেনে অনাবাদি জমিতে চাষাবাদের ফলে শস্য উৎপাদন বেড়ে যায়। শিল্প-উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এই অবস্থায় শিল্প বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়।

(২) সামাজিক পনের শতকের পর থেকে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক যে সব পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার ফলে সমাজ ব্যবস্থাতেও বেশ কিছু পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। ব্রিটেনের প্রথাগত সামন্ত ব্যবস্থাতেও জমিদার এবং কৃষক শ্রেণির আধুনিকায়ন ঘটতে থাকে। জমিদারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং হস্তচালিত এ শিল্পোদ্যোগের সঙ্গে জড়িত হতে থাকে, একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক এবং ভূমিদাসদের একটি অংশও নতুন এ সব বণিক এবং শিল্প মালিকের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে থাকে। কৃষি কাঠামোতে ধনী কৃষকের উদ্ভব ঘটে। আঠারো শতকে এসে কৃষিতে জমিদারতন্ত্র ভেঙে পুঁজিবাদী ধারার চাষাবাদের প্রবর্তন শুরু হয়। ফলে সমাজ 'ব্যবস্থায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদক শ্রেণির উদ্ভব ঘটতে থাকে। সমাজ ব্যবস্থায় সচ্ছল ও অসচ্ছল কৃষক, জমিদার, বণিক এবং শিল্প উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ ছাড়া শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও বস্তি বাসীর সংখ্যা উল্লেখ করার মতো বৃদ্ধি পায়। সমাজে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং ধনিক শ্রেণির অবস্থান বেশ স্পষ্ট হতে থাকে। নতুন এ সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সামাজিক শক্তি পুঁজিপতি, অর্থসংগ্রহকারী, সংগঠক, বণিক, পরিচালক, বিক্রেতা, উকিল, শিক্ষক, আমলা ও অভিজাত শ্রেণি ইত্যাদিরূপে ইংল্যান্ডের সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে সংগঠিত হতে থাকে। সংগঠক শ্রেণির উদ্যোগ দ্রুত প্রসারিত হয়। ফলে ইংল্যান্ড যেন তখন শ্রমজীবী শ্রেণির বিকাশের অপেক্ষায় ছিল। এর পথ ধরেই ইংল্যান্ড সব দেশের আগে শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।

(৩) বাণিজ্য বিপ্লব: ইংল্যান্ডে ১৫০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আড়াইশ বছর ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভারে সম্প্রসারিত হয়। দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে এ সব বাণিজ্য ছড়িয়ে যেতে থাকে। বাণিজ্য প্রসারের জন্যে ইংল্যান্ডে বিভিন্ন পণ্যের বাৎসরিক মেলা বসতো। লন্ডন শহরে বাজার নিয়মিত হতে থাকে। অন্যান্য শহরে যদিও সাপ্তাহিক বাজার ছিল; তবে ক্রমে বাজারের চাহিদা পূরণে নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারে ইংল্যান্ড প্রধান ভূমিকা রাখে। ইংল্যান্ডে বিদেশি কোম্পানিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করার মাধ্যমে নিজেদের বাণিজ্যকে অবাধে বিকাশ লাভের সুযোগ করে দেয়। ইংল্যান্ডে গড়ে ওঠে দুই ধরনের কোম্পানি। এক. যৌথ মূলধনী, দুই. নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি। ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো মূলত যৌথ মূলধনে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৫৭খ্রিস্টাব্দে এটি যৌথ মূলধনী কোম্পানিতে পরিণত হয়। এক সময় এ কোম্পানিটি দক্ষিণ আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণে-অবস্থিত উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে অস্ট্রেলিয়ার 'পশ্চিমের ম্যাগেলান প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারতবর্ষে এই কোম্পানি সুরাট, মাদ্রাজ, কলকাতা ও বোম্বাইতে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। এক সময় এই কোম্পানিই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নেয়। এছাড়া ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে হাডসন বে কোম্পানি স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে ব্রিটেন কানাডাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মানুষ ধরে ধরে ক্রীতদাস হিসেবে ব্রিটেনে বিক্রি করা এবং চিনির জন্যে আখচাষের লক্ষ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রেরণ করার জন্যে রয়‍্যাল্ব আফ্রিকান কোম্পানিকে অধিকার দেওয়া হয়। তাদেরও দক্ষিণে একচেটিয়া বাণিজ্য করার জন্যে ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে সাউথ সি কোম্পানি সনদ লাভ করে। এসব কোম্পানি ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, আমেরিকা ও কানাডায় ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। ব্রিটেনের হাতে তার ফলে যথেষ্ট পুঁজির সঞ্চয় ঘটে। এভাবেই ব্রিটেনে অবাধ অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বণিকতন্ত্র বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে।

(৪) প্রযুক্তির উদ্ভাবন: ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব সাধনে প্রযুক্তির উদ্ভাবন সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। ষোল শতকের মধ্য
ভাগ থেকে ইংল্যান্ডের উৎপাদন ব্যবস্থায় পুজির অনুপ্রবেশ ঘটে। সতের ও আঠারো শতকে কুটিরের বদলে কারখানার সংযোজন ঘটে। নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন শুরু হয়। প্রধানত লোহা ও ইস্পাতের ব্যবহার, নতুন চালিকা শক্তির উৎসের আবিষ্কার, বস্ত্র শিল্পের যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে মানুষের কর্মশক্তি বৃদ্ধি, কারখানা প্রথা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন পদ্ধতিতে নতুন ধারা চালু, প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের গোপন ভাণ্ডারকে মানুষের জন্য উন্মোচন করা, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির ব্যবহারে গতিশীল শিল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে শিল্প বিপ্লবের মধ্যে ইংল্যান্ডের প্রবেশ অবধারিত হয়।

(৫) নবজাগরণ: পনের শতকের পর থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই রেনেসাঁসের (নবজাগরণ) প্রভাব
বাড়তে থাকে। মানুষ যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ হতে থাকে। এর আগে গির্জার একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা রুদ্ধ ছিল। শিক্ষাদীক্ষাও রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনোভাবেই প্রণোদনা পায় নি। তবে রেনেসাঁসের প্রভাবে ইংল্যান্ডে সতের-আঠারো শতকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের মতো শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়গুলো নিজস্ব জায়গা করে নেয়। এর ফলে শিল্প ও প্রযুক্তির তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক জ্ঞানের চর্চা নতুনভাবে গতি লাভ করতে থাকে।
উপরে উল্লিখিত কারণে অন্যান্য দেশের আগে ইংল্যান্ডে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ ঘটতে থাকে। ইংল্যান্ড শিল্প বিপ্লবের সূচনাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত হয়। এরই প্রভাব পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশে পড়ে।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

যে সব আবিষ্কারের ফলে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় বলে ধরা হয় তা নিম্নরূপ:

(ক ) বস্ত্রশিল্প: ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প বিপ্লব ঘটে বস্ত্রখাতে। ইংল্যান্ডের আবহাওয়াগত কারণে বস্ত্র উৎপাদনের
ব্যাপক তাগিদ ছিল। সুতাকাটা ও বয়নের জন্যে প্রথম যন্ত্রের ব্যবহারও তাই ঘটে। সে কারণেই হস্তচালিত পদ্ধতির যান্ত্রিকীকরণ অপেক্ষাকৃত আগে ঘটে। একটির পর একটি আবিষ্কার অল্পদিনের মধ্যেই বস্ত্রশিল্পে যথার্থ অর্থেই বিপ্লব ঘটাতে থাকে। ১৭৩৩ সালে জন কে (John Kay) নামক একজন তাঁতি 'উড়ন্ত' মাকু (Flying Shuttle) আবিষ্কার করেন। ১৭৬৪ খ্রি. জেমস হারগ্রিভস 'সুতাকাটা জেনি' (Spinning Jenny), ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড আর্করাইট' 'ওয়াটার ফ্রেম' এবং এডমান্ড কাটরাইটের 'পাওয়ার লুম' আবিষ্কার বয়ন শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুধু যন্ত্র আবিষ্কারই নয়, উৎপাদনে তা প্রয়োগের ফলে কারখানার প্রসার ঘটে বেশ দ্রুত। ব্রিটেনে অসংখ্য শ্রমিক বিভিন্ন কারখানায় যুক্ত হয়। ব্রিটেন দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য অন্যান্য দেশে রপ্তানি শুরু করে।

(খ) জল পরিবহন শিল্পোন্নতির চাহিদা মেটাতে কয়লা, লোহা ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের জন্যে জল পথ উন্মুক্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৭৬১ সালে ম্যানচেস্টার ও ওয়ার্সলের মধ্যে প্রথম খাল কাটা হয়। ১৭৭৭সালে ট্রেন্ট মার্সে খাল কাটা হয়। জাহাজ যাতায়াতের জন্যে খাল কাটা কালক্রমে নদ-নদী ড্রেজিং শিল্পে পরিণত হয়। ব্রিটেনে জাহাজ শিল্প বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। বাষ্পচালিত জাহাজ শিল্প বিপ্লবে নতুন সংযোজন ঘটায়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে জেমস ওয়াট (James Watt) প্রথম কার্যকরী বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর দ্বিগুণ-শক্তিসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করা হয়। ইংল্যান্ডে প্রথম স্টিমার তথা বাষ্পীয় জলপোত ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। অবশ্য ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ফুলটনের নির্মিত স্টিমবোট শিল্প বিপ্লবের গতিপ্রবাহকে বাড়িয়ে দেয়।

(গ) স্থল পথ ও পরিবহন শিল্প বিপ্লব ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে স্থলপথ ও পরিবহনের অগ্রগতি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তখনও পর্যন্ত কাঁচা ও সরু রাস্তার বেশি কিছু ছিল না। যানবাহনও ছিল মূলত মানুষ অথবা ঘোড়াবাহিত। শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে এ ধরনের রাস্তাঘাট ও পরিবহন মোটেও যথেষ্ট ছিল না। ফলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং যানবাহন তৈরি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আঠারো ও উনিশ শতকে রাস্তাঘাট নির্মাণ শিল্প পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। টেলফোর্ড এবং ম্যাকাডাম নামক দু'জন স্কট ইঞ্জিনিয়ার ব্রিটেনের রাস্তাঘাট নির্মাণের কিছু নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দ্রুতগামী পরিবহন হিসেবে ব্রিটেনে রেল পরিবহন সতের শতক থেকে শুরু হয়। তখন ছিল ঘোড়ায় টানা রেল। তরে-১৮২৫-খ্রিষ্টাব্দে স্টিফেনসন প্রথম রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার করলে যন্ত্রনির্ভর রেল পরিবহন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

(ঘ) খনিজ সম্পদ আহরণ: শিল্প বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে কয়লা, লোহা, ইস্পাতসহ নানা খনিজ পদার্থ উত্তোলন এবং এগুলোর ব্যবহার শুরুর মাধ্যমে। বিশেষত কলকারখানা নির্মাণে কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রেল লাইন নির্মাণে লোহার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে হামফ্রি ড্যাভি (Humphry Davy) খনিগর্ভে কাজ করার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এতে খনির কাজ সহজ হয়। লোহা গলানোর জন্য Blast Furnace নামক একটি বিশেষ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে-বেঞ্জামিন হেন্সম্যান এবং হেনরি কট (১৭৮৪ খ্রি.) ইস্পাত গলানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এ ছাড়া ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে বেসেমার কনভার্ট, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ওপেন হার্থ এবং বেসিক প্রসেস উদ্ভাবনের ফলে ইস্পাত উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঢালাই লোহার উৎপাদন ১৭২০-এ ১৮ হাজার টন এবং ১৮০২-তে ২৫০ হাজার টনে দাঁড়ায়। পাথুরে কয়লা উৎপাদন ১৭৫০-এ ৫ মিলিয়ন টন থেকে ঐ শতকের শেষ দিকে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ মিলিয়ন টনের বেশি হয়।

(ঙ) অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার: উনিশ শতকে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ এবং বিদ্যুৎ আবিষ্কার ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবকে
ব্যাপক অগ্রগতি প্রদানে ভূমিকা রাখে। গ্যাস, জুতা, আটা, ময়দা, মাদক দ্রব্য ইত্যাদির উৎপাদন বেড়ে যায়। গড়ে ওঠতে থাকে ছোট, মাঝারি ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন নতুন শিল্প শহর। ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লিভারপুল এবং স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহর এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডে বিপুল সংখ্যক ভারী শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশে পরিচিত হয়।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।

(ক) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন: শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে বাণিজ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি এবং পুঁজির লেনদেন বেড়ে যায়। বাণিজ্যিক মূলধন (Mercantile capital) শিল্প মূলধনে (Industrial capital) রূপান্তরিত হয়। ব্যবসায়ীরা বড় বড় শিল্প কারখানায় বিপুল মূলধন খাটিয়ে প্রচুর পণ্যসামগ্রী উৎপাদন শুরু করে। বড় বড় শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য তখন ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠতে থাকে। একক মালিকানায় যে সব বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না সেগুলো যৌথ মালিকানায় ও যৌথ মূলধনী কারবারে রূপান্তরিত হয়। ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেকগুণ বেড়ে যায়। ফলে ইংল্যান্ডে অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। ১৭৬০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের আমদানি ১২ গুণ, রপ্তানি ১৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। ইংল্যান্ডের শিল্পজাত দ্রব্য অনেক দেশে রপ্তানি হতে থাকে। ইংল্যান্ডকে এ জন্য "পৃথিবীর কর্মশালা" বা (Workshop of the World) বলে অভিহিত করা হতো। শিল্পাশ্রয়ী সভ্যতা বলে ইংল্যান্ডের নামকরণের পেছনে যুক্তি ছিল এই যে, দৈনন্দিন খুঁটিনাটি ব্যবহার্য জিনিসপত্র থেকে বড় বড় ভোগ্যপণ্য জিনিসও ব্রিটিশরা উৎপাদন করতে থাকে। ইংল্যান্ড গোটা উনিশ শতক, এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত পৃথিবীর প্রধান ধনী দেশ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভিত্তি এতই মজবুত ছিল যে, ১৮০৬ থেকে ১৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট মহাদেশীয় ব্যবস্থা (Continental system) প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক যে অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন তাতেও ইংল্যান্ডকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হয়নি। শিল্প বিপ্লবের ফলে শিল্পপতি ও কারখানার মালিকগণ প্রচুর সম্পদ ও অর্থের মালিক হন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও ইংল্যান্ডের কোষাগারে প্রচুর অর্থ সঞ্চিত হতে থাকে। এর ফলে ইংল্যান্ডের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যায় এবং সমাজ জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তবে ইংল্যান্ডের ধনী দরিদ্রের মধ্যে তখন বৈষম্যের ব্যবধানও ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শ্রেণিতে সংঘাত এবং দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায়। শিল্প বিপর অর্থনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে এর সাথে বেশ কিছু জটিল সমস্যাও এর অর্থনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় তৈরি হয় যা পরবর্তীকালে বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে।

(খ) সামাজিক পরিবর্তন: শিল্প বিপ্লবের অনিবার্য প্রভাব ইংল্যান্ডের সমাজ জীবনে পরিলক্ষিত হয়। কলকারখানা প্রতিষ্ঠার ফলে নতুন নতুন শিল্প-শহর গড়ে ওঠে। গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ দল বেঁধে কাজের সন্ধানে শহরে চলে আসে। গ্রামগুলো জনবিরল এবং শহরগুলো জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শহরগুলো এত মানুষকে আশ্রয় দিতে অক্ষম ছিল, কারখানাগুলোও তাদেরকে কাজ দিতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু গ্রামছাড়া মানুষদের ভিড়ে শহরগুলোকে যে হতন্ত্রী পরিবেশ প্রদান করে তা ইংল্যান্ডের ঐশ্বর্যকেই যেন পরিহাস করছিল। তবে ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থায় এর ফলে নতুন মেরুকরণও ঘটতে থাকে। আগে সমাজ যেখানে কৃষক ও লর্ড-জমিদার- এই দুই পরস্পর বিরোধী শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে বুর্জোয়া এবং শ্রমিক-কারিগর শ্রেণিরও অভ্যুদয় ঘটতে থাকে। বুর্জোয়াদের মধ্যেও ধনী, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মানুষ ছিলেন। অপরদিকে শ্রমিকদের জীবন বেশ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অধিক পরিশ্রম করেও একজন শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পেত না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বসবাস করে এবং নিম্নপুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে জীবনধারণের ফলে অনেক শ্রমিকই অকালে মৃত্যুবরণ করে। ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণি এসব শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছোট-বড় অনেক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। উনিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে চার্টিস্ট আন্দোলন শুধু শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসেই নয়, ইংল্যান্ডে গণতন্ত্রের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ফরাসি ও জার্মান সমাজ ব্যবস্থায় শিল্প বিপ্লব অনুরূপভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

(গ) রাজনৈতিক পরিবর্তন : শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেকগুলো পরিবর্তন নিয়ে আসে। দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ শিল্পপতি ও. বণিকদের হাতে চলে যেতে থাকে। শিল্পপতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে বড় অংশই শ্রমিক সত্তাকে অনুধাবন করত না। সস্তা মজুরির বিনিময়ে মালিকরা বালক-বালিকা ও নারীদেরকে কারখানায় নিয়োগ প্রদান করত, যখন-তখন তাদের আবার বরখাস্তও করত। তবে ক্রমান্বয়ে শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। যন্ত্রপাতির সাথে শ্রমিকদের পরিচয় এদেরকে কিছুটা শিক্ষিত হতে সাহায্য করে। জীবন-জীবিকার সংস্থানের তীব্র সংকট তাদেরকে অধিকতর রাজনীতি সচেতন করে তোলে। ইংল্যান্ডের চার্টিস্ট আন্দোলন (১৮৩২-৪৮ খ্রি.) এ ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে সমাজতন্ত্রের ভাবধারা বিস্তার লাভ করে। মজুরি নির্ধারণ ও বদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার শ্রমিক আন্দোলন, নির্বাচন প্রথার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন, কমন্স সভা সংস্কারের আন্দোলন, সর্বজনীন ভোটাধিকারের আন্দোলন- শিল্প বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের ফল। ইংল্যান্ডে জাতীয়তাবাদ, উদার গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রীয় ধারার আন্দোলন নতুন এই রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয়েরই ফসল। ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে এ সব ভাবধারার ক প্রভাব পড়ে। ফলে ইংল্যান্ড একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

শিল্প বিপ্লবের প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশে ক্রমে পড়তে থাকে। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, াযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতছানি থেকে ইউরোপের দেশগুলো বিচ্ছিন্ন থাকতে নি। তবে রাজনৈতিক পশ্চাদপদতা, বৈরী সম্পর্ক এবং সামন্ত সামাজিক ব্যবস্থার কারণেই আধুনিক শিল্প কে স্বাগত জানাতে ইউরোপীয় দেশগুলো অনেক বেশি বিলম্ব করেছিল। নিচে আলোচিত দেশগুলোতে শিল্প বর প্রভাবের চালচিত্র দেখানো হলো।

ফ্রান্স: ফ্রান্স ইংল্যান্ডের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ। ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের কারণে আধুনিক পুঁজিতন্ত্রের প্রসার তেমন ঘটতে পারে নি। ১৭৮৯-এর বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শিল্প বিপ্লবের প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি পড়েছে। তবে ফরাসি কৃষি অর্থনীতিও ছিল চরম পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক। ফলে এখানে শিল্পের প্রসার অত্যন্ত মন্থরগতিতে হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ফ্রান্সে শিল্প বিপ্লব প্রায় চোখেই পড়ে নি। বিপ্লব এবং যুদ্ধে ফ্রান্স ছিল ক্ষত-বিক্ষত। অধিকন্তু নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইংল্যান্ডের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক অব্যাহত রেখে ফ্রান্সকে আরো পিছিয়ে রেখেছিলেন। তাছাড়া ফ্রান্সে পর্যাপ্ত কয়লা ছিল না। তবে ফ্রান্সের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক উনিশ শতকে শহরকেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে শহরগুলো আধুনিক হওয়ার পূর্বশর্ত পূরণ করছিল। প্রায় ৩০ টির মতো ফরাসি শহর আধুনিক শিল্প-ভিত্তিক হয়ে ওঠে। বড় শিল্পকারখানা কম হলেও ছোট ছোট কারখানা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাড়তে থাকে। বিলম্বিত হলেও ১১৮৬০-৭০-এর পর থেকে ফ্রান্সে রেল, লোহা, ইস্পাত, কয়লার চুল্লি, অঙ্গারের চুল্লি, বস্ত্রশিল্প ইত্যাদি বৃদ্ধি পেতে থাকে। সূতী-বস্ত্রশিল্পের জন্যে ফ্রান্সে প্রথম বড় ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বিশেষভাবে আলসাস অঞ্চলে। ফ্রান্সের শিল্প বিপ্লবের প্রধান ক্ষেত্র ছিল বস্ত্রশিল্প। রপ্তানি পণ্যের অর্ধেকই ছিল বস্ত্রজাত পণ্য। আমদানির এক-তৃতীয়াংশ ছিল যন্ত্রপাতি। তবে উনিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে শিল্পায়ন এবংঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের চাহিদা থেকেই ফ্রান্স বহির্বাণিজ্যে মনোযোগী হয়। তারপরও ফ্রান্সে শিল্প বিশু অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের ছিল। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সামন্তবাদের ব্যাপক প্রভাবে থাকা ফরাসি জাজি মনোভাবে আভিজাত্য প্রবলভাবে থাকলেও আধুনিক যুগের বণিক হওয়ার মানসিকতা সেভাবে গড়ে ওঠে নি।

জার্মানি: ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের আগে জার্মানি ছিল তিন শতাধিক ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত। জার্মান ভূখণ্ড দি কৃষিপ্রধান। ১৮৪৮-এর পর জার্মানিতে অর্থনৈতিক রূপান্তর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হতে থাকে। শিল্প বিপ্লয়ে প্রভাবে জার্মানি দ্রুত আন্দোলিত হয়। জার্মানি দ্রুত ব্রিটিশ বিনিয়োগ, আবিষ্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদিয়ে আত্মস্থ করে ফেলে। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাণিজ্য, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স এবং জাহাজ ব্যবসায় জার্মানি ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৮৭০ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জামনি একটি কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে শিল্পায়িত বাণিজ্যিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাণিজ্যকরণ, শিল্প প্রতিষ্ঠান এর কোম্পানির বিস্তার অভাবনীয়ভাবে দেখা যায় দেশটিতে। জনস্ফীতি ও শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায়। খাদ্যে জার্মানি দ্রুত শিল্পায়িত দেশে পরিণত হয়। বস্ত্রশিল্পের আধুনিকীকরণ হয়। ঐক্যবদ্ধ জার্মানিতে ভারী শিল্প, শিল্প ও লগ্নিপুঁজির জন্যে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা। হয়। এ ছাড়া রেলপথ, জলপথ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত প্রসার ঘটে। একই সঙ্গে ইস্পাত শিল্পও গড়ে ওঠে। জার্মানিতে বড় শিল্পের খাত হিসেবে রেলপথ, বাণিজ, শহর এবং সমরাস্ত্রের কারখানা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ছাড়া মটরগাড়ি শিল্পের বিকাশ ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৮৯০- থেকে ১৯০২ এর মধ্যে বিদ্যুৎ শিল্প জার্মানির অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তি ওপর দাঁড় করায়। ১৮৭০ সালের পর জার্মানগণ শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হওয়ার পেছনে শিল্প বিপ্লঝে প্রসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৩,: ইতালি ইতালি একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। এ ছাড়া দেশটির বেশির ভাগ অঞ্চল ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের আগ `পর্যন্ত ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার অধীন ছিল। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে একত্রীকরণের পর অতি ধীরগতিতে সীমিত আকারে ইতালিতে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। জাহাজঘাট নির্মাণ, কারখানা স্থাপন, লোহা, ইস্পাত, বস্ত্রশিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শুরু হয়। ১৮৯৬-১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ সময়কে ইতালির শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়। এ সময়ে ইতালির শিল্পোৎপাদন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এই সময়ে ইতালিতে কৃষি উৎপাদন, রপ্তানিমুখী শিল্প এক বিদেশে থাকা ইতালিয়ানদের উপার্জিত অর্থ প্রেরণ বেশ কয়েকগুণ বাড়ে। তারপরও ইতালির শিল্পায়ন সতে াষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ইতালি ইউরোপের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়।

৪. স্পেন: ষোল শতকে স্পেন উপনিবেশ স্থাপনে এগিয়ে গেলেও সম্পদ আহরণ করার কোনো প্রয়াস স্পেনের ছিল না। ফলে শিল্প বিপ্লব ঘটানোর মতো আর্থ-সামাজিক ভিত্তি স্পেনে গড়ে ওঠেনি। স্পেনের রাজকোষে তাই অর্থ বাড়েনি। স্পেনের রাজশক্তি ইউরোপের বাজার থেকে ঋণ করতে বাধ্য হয়। স্পেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজার ঋণপত্র কিনে রাজাকেই ধার দিতো। যে সব ঋণদায়ী কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলো ছিল বণিকী ব্যাংক। ফলে শিল্প স্থাপনায় স্পেন খুব একটা অগ্রসর হতে পারেনি। উনিশ শতকে রেল শিল্পে বিদেশি কোম্পানি যথেষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করলেও পণ্য সরবরাহের অভাবে এ খাত ততোটা লাভজনক হতে পারেনি। তবে স্পেনে সত্যিকার শিল্পের প্রসার ঘটেছিল ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে। উর্বর জমি, পুঁজি এবং খনিজ সম্পদের অভাবই স্পেনে শিল্প বিপ্লবের প্রভাব না পড়ার অন্যতম কারণ বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন।

রাশিয়া: রাশিয়া ইউরোপের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া দেশ। ১৮৬১ সালে ভূমিদাস প্রথা রহিত করার পর দেশটিতে শিল্পের প্রসার শুরু হয়। প্রচুর খনিজ সম্পদ থাকার পরও সামন্ত জমিদার ও জারতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের কারণে দেশটি কৃষি ও শিল্পে প্রত্যাশিত উন্নতি ঘটাতে পারেনি। তবে ১৯২৮ সালে সোভিয়েত আমলে সরকার শিল্পায়নের নীতি দৃঢ়ভাবে প্রবর্তন করার পর দেশটিতে ভারী শিল্পের যাত্রা নতুনভাবে শুরু - হয়। ১৮৯০-এর দশকে রাশিয়ায় কয়লা, রেল, লোহা, পেট্রোল নিষ্কাশন, যন্ত্রশিল্প, শিল্প কারখানা ইত্যাদিতে দ্রুত প্রসারের গতি লক্ষ্য করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) আগ পর্যন্ত রাশিয়ায় শিল্পোৎপাদন ৫% হারে বৃদ্ধি পায়। রাশিয়াতে ঐ সময়ে বিদেশি বিনিয়োগও দ্রুত বিকাশ লাভ করে। ১৯২৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্পোৎপাদনে পৃথিবীতে পঞ্চম স্থানে ওঠে আসে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, গ্রেটব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন)। এর কারণ হচ্ছে, ১৯২৮ সালে শিল্পায়ন নীতি গ্রহণ করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ভারী শিল্পে আত্মনিয়োগ করে। অবশ্য ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পর পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতি গৃহীত হওয়ায় দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয়ভাবে চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সব খাতে পৃথিবীতে মহাকাশ শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময়ে পরাশক্তি হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়।

তবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন ঘটাতে না পারায় পুঁজিবাদী দুনিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, জনমানসে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। অথচ শিক্ষা, ক্রীড়া, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান চর্চায় দেশটি পশ্চিমা দুনিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থনীতি ও রাজনীতির অসম বিকাশ ১৯৯১ সালে দেশটিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। শিল্প বিপ্লব স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ (ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে), বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে প্রায় সমসাময়িক সময়েই শুরু হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগেও যাত্রা শুরু করেছিল। বস্ত্র, সিল্ক, ঘড়ি, জাহাজ, বৈদেশিক বাণিজ্য, যন্ত্রশিল্প, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি খুঁটিনাটি শিল্পে এই দেশগুলো আপন গতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশগুলো নীরবেই শিল্প বিপ্লবের ধারায় প্রবেশ করে এবং ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হয়।

ফলাফল: শিল্প বিপ্লব-উত্তর ইউরোপের আর্থ-সামাজিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। নিচে কয়েকটি খালে চিত্র তুলে ধরা হলো-ফলাফল: শিল্প বিপ্লব-উত্তর ইউরোপের আর্থ-সামাজিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। নিচে কয়েকটি খালে চিত্র তুলে ধরা হলো-

১।জনসংখ্যার বৃদ্ধি: শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে জনসংখ্যা দ্রুত হারে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দের আগে কোনো দেশে জনগণনা এবং ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের আগে জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্ট্রেশন হয় নি। শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। গ্রামে কৃষি এবং শহরে শিল্পসহ-শিং এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

২।অর্থনৈতিক অবস্থা: শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়ে থাকে। অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা, যোগাযোগ, যানবাহন ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠনের দ্রুত প্রসার ঘটতে থাকে। পুরাতন সামন্ত কৃষি অর্থনীতির মন্থর উন্নয়নের স্থলে বাজার ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি দ্রুত উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ধারা সূচনা করে। মাত্র দু'শ বছরে ইউরোপের অর্থনীতি পূর্ববর্তী হাজার বছরের সামন্ত অর্থনীতির চেয়ে অনেক বেশি উন্নতি নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

৩। সামাজিক অবস্থা: শিল্প বিপ্লব ইউরোপের দেশগুলোর সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। শিল্প বিপ্লবের ফলে বণিক, শিল্পপতি, শ্রমিক, কৃষক, কারিগর, শিক্ষক, উকিল, আমলাসহ নানা সামাজিক শ্রেণি ও গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এ সব শ্রেণি পেশার মানুষ গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে ব্যাপক বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। প্রতিটি দেশে শ্রমিক, কৃষক, বণিক, শিল্পপতিসহ নানা শ্রেণির উত্থান ও বিকাশ ঘটতে থাকে। ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়া কোনো কোনো দেশে বেশ কঠিন ছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া ও স্পেনে দরিদ্র ও ধনীর মধ্যে বৈষম্য ছিল ব্যাপক এবং কষ্টদায়ক। এজন্য ইংল্যান্ডে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে রানি এলিজাবেথ 'দরিদ্র আইন' (Poor Act) প্রবর্তন করেন। অন্যদিকে স্ক্যান্ডেনেভিয়ানসহ (উত্তর ইউরোপ) কয়েকটি দেশে তা ছিল অপেক্ষাকৃত মসৃণ। যেখানে কষ্টদায়ক হয়েছিল সেখানে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন, বিপ্লব ও বিদ্রোহ স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ সকল সামাজিক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে নানা সংগঠন, সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের বিকাশ সাধনে তৎপর হয়। আধুনিক যুগের রাজনৈতিক দল তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এসব দেশ যার যার অবস্থান তৈরি করে।

৪। শিক্ষা-বিজ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতি: শিল্প বিপ্লব ইউরোপের দেশসমূহের সকল স্তরে শিক্ষার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ফলে প্রতিটি দেশেই শিক্ষানীতি কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গৃহীত হয়। দু'শ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইউরোপের সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়, শতভাগ জনসাধারণ বাধ্যতামূলক স্কুল শিক্ষার আওতায় আসে, নারী শিক্ষা সমাজে পুরুষদের সঙ্গে সমানাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়। শিক্ষার সিংহভাগ দায়িত্ব বেশির ভাগ রাষ্ট্র বহন করতে শুরু করে। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা শিল্প বিকাশ ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্যে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইউরোপের সব দেশেই শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে শিক্ষা ও গবেষণা উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক চর্চা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হতে থাকে। ইউরোপের নগরগুলোতে থিয়েটার, চলচ্চিত্র, চিত্রকলাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন আয়োজন মানুষের জীবনকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবদান রাখে।:

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

অন্য জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড দখল করে যে পরদেশি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকেই উপনিবেশিক শাসন বলা হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগেও বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী অন্য ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে শাসন করতো। তবে ঐ সময়ের শাসন ছিল বিভিন্ন রাজা বা বাদশাহদের। তেমন কোনো বাণিজ্যিক বা পুঁজি গঠন বা সঞ্চয়ী পরিকল্পনা তাতে ছিল না। কেননা, সেই সময়ে বাণিজ্য ও পুঁজি তৈরির অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সচল ছিল না। তবে বিদেশি শাসন পনের-ষোল শতকের পর নতুন লক্ষ্য ও চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয় যখন দখলকৃত ভূখণ্ডের সম্পদ আহরণের মাধ্যমে দখলকারী দেশ ও শাসক গোষ্ঠীসমূহ নিজ দেশে পুঁজির বিকাশ সহজে ঘটাতে সক্ষম হয়। সেই লক্ষ্য নিয়ে সতের-আঠারো শতক পরবর্তী সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ প্রথমে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সেখানে শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয়। ইতিহাসে আধুনিক যুগের বিদেশি দখলদারী শাসনকেই উপনিবেশিক শাসন নামে অভিহিত করা হয়। নিজেদের নগরসমূহের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্যে পুঁজির আদি সঞ্চয়নের লক্ষ্যেই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে এসব উপনিবেশ স্থাপন করা হয়। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি ও ডেনমার্কের বণিকগণ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে প্রথমে বিভিন্ন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। হল্যান্ড ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাচ্যের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে। সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই কোম্পানি আফ্রিকা মহাদেশের রুয়ান্ডা, এলমিন ও কাভোকর্সো দখল করে। এ সময়ে পর্তুগিজ ও স্পেনিশগণও আফ্রিকা মহাদেশে ঘাঁটি স্থাপন করতে থাকে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে রানি এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

রানি এলিজাবেথ

অনুমোদন দেন। এ কোম্পানি ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদ দখলের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইংরেজ কোম্পানির উপনিবেশ স্থাপন শুরু হয়। ইংরেজরা সতের শতকেই উপনিবেশ স্থাপনে ওলন্দাজদের পেছনে ফেলে দিতে সক্ষম হয়। মার্কিন মুল্লুকে তাদের উপনিবেশ স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফ্রান্সের বণিক সমিতির সঙ্গেও ইংরেজদের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ফরাসি উপনিবেশ ছিল। এ ছাড়া আফ্রিকা মহাদেশেও ফরাসিদের বাণিজ্যকুঠি ছিল। ফরাসি ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আঠারো শতকে ভারতে উপনিবেশ স্থাপনে সচেষ্ট ছিল। তবে ১৭৫৬-৬৩ খ্রিস্টাব্দের সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে ইংরেজরা ফরাসিদের পরাজিত করার মাধ্যমে উপনিবেশ বিস্তারে এগিয়ে যায়। উপনিবেশ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। বিশেষত ১৭৭৫ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ একদিকে শিল্প বিপ্লবের উত্থান, অন্যদিকে ইউরোপে সামন্ত-রাজনৈতিক শাসনের অস্তগামী অবস্থা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্থান, জার্মানি ও ইতালি রাষ্ট্রের একত্রীকরণ ইউরোপের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। যদিও ১৭৭৫-১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন মুল্লুকে ১৩টি কলোনিতে ব্রিটেনের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে, তথাপিও ব্রিটিশরা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে উপনিবেশের বিস্তার ঘটিয়ে তাদের শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। ক্যারিবীয় সাগর এবং ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ফরাসিদের বেশির ভাগ কলোনিই ইংরেজরা দখল করে নেয়। যে কারণে উনিশ শ শতকের শুরুকে ফরাসি উপনিবেশের পরিসমাপ্তি বলে অভিহিত করা হয়। ইংরেজরা হল্যান্ডের উপনিবেশগুলো দখল করে নেয়। উল্লেখযোগ্য উপনিবেশগুলো হচ্ছে শ্রীলংকা (১৭৯৫-৯৬), জাভা (১৮১১), দক্ষিণ আফ্রিকা (১৭৯৫-১৮০৬), ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। উনিশ শতকের শুরুর দিকে স্পেনের উপনিবেশ ছিল সবচেয়ে বেশি। স্পেনের

সামরিক ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ে উনিশ শতকের বিশের দশকেই। ব্রাজিলে পর্তুগিজ কলোনি ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। মাল্টা, শ্রীলংকা, মাওবিক, টগো ইংরেজদের হস্তগত হয়। এর ফলে উনিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি উপনিবেশে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। ফরাসি, ওলন্দাজ, স্পেন ও পর্তুগিজদের পেছনে ফেলে দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ তখন একচ্ছত্র হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ড এই সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে তাদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষতো তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। আফগানিস্তান, সিঙ্গাপুর (১৮১৯), দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অঞ্চল, চীন, জাপানেও প্রভুত্ব বিস্তারে সচেষ্ট ছিল ইংল্যান্ড। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু অঞ্চলে তাদের দখল অথবা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীর প্রায় ১২০ মিলিয়ন মানুষ ব্রিটিশ উপনিবেশে বসবাস করতো, ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীন ১১ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. জায়গা ছিল। এ কারণে ব্রিটেনে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে উপনিবেশ মন্ত্রণালয় নামে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় স্থাপন করা হয়। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের পর ফ্রান্স উপনিবেশ স্থাপনে আবার মনোযোগ দেয়। ত্রিশবর্ষ ব্যাপী রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে আলজেরিয়া দখল করা হয়। তিউনিস ও মরক্কোতে ফরাসি উপনিবেশ স্থাপিত হয়। ষাটের দশকে পশ্চিম আফ্রিকা, সত্তরের দশকে ইন্দোচীন অঞ্চল, ভিয়েতনাম (১৮৫৪-১৮৬৪) দখল করে ফ্রান্স। কম্পুচিয়াতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা, পলেনিজ দ্বীপপুঞ্জ (১৮৪২-৪৭); নতুন কালেডন (১৮৫৩) দ্বীপ দখল করা সম্ভব হয়। ১৮৬৯ সালে ফরাসিরা সুয়েজখাল খননের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগ সৃষ্টির ফলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ বিস্তার আরো সহজ হয়। ফ্রান্স উপনিবেশ বিস্তারে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে। ঐ সময়ে হল্যান্ড তার কলোনি পুনরুদ্ধারে ইন্দোনেশিয়া ও জাভা অঞ্চলে তৎপর হয়ে ওঠে। তবে ইংরেজদের প্রতিরোধের মুখে তা খুব একটা সফল হয়নি।

উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকা, চীন, জাপান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্ত ারে তৎপর হয়ে ওঠে। রাশিয়াও ঐ সময় উপনিবেশ বিস্তারে সক্রিয় হয়। নবগঠিত জার্মানি (১৮৭০) এবং ইতালি (১৮৭০) রাষ্ট্রদ্বয়ও ঐ সময় তাদের বাজার সৃষ্টির জন্যে উপনিবেশ খোঁজায় মনোনিবেশ করে। ফলে ইউরোপের চিরায়ত এবং নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার বেশির ভাগই কলোনি তথা উপনিবেশ স্থাপনে উনিশ শতকের শেষ দিকে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এর মূলে ছিল শিল্প বিপ্লবের যুগে এই সব দেশ অন্য ভূখণ্ড থেকে দাস ব্যবসা, কাঁচামাল সংগ্রহ, সম্পদের পাচার ও নিজেদের দেশে ব্যবহারের ফলে যে বিপুল পরিমাণ পুঁজি ও সম্পদ লাভের সুযোগ পায় তাতে বহির্বাণিজ্য তথা উপনিবেশ স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেশগুলো বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়েছে। এছাড়া কাঁচামালের পর্যাপ্ত যোগান, পণ্যদ্রব্যের বিক্রি, পুঁজির বিনিয়োগের ক্ষেত্র সৃষ্টি, অতিরিক্ত জনশক্তি, জীবিকা যোগানের ব্যবস্থা, নৌ ও জাহাজ শিল্পকে উৎপাদনশীল এবং লাভজনক করে তোলা, সোনা, রূপাসহ মূল্যবান সম্পদ লুটের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা, অসম বিনিময় হারের মাধ্যমে প্রভূত সম্পদের অধিকারী হওয়া ইত্যাদি উপায়ে ইউরোপীয় দেশগুলো, মূলত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিজেদের দেশের শিল্প ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। উপনিবেশগুলোর সম্পদ ও মানুষই সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানির বাজারও ছিল এ সব উপনিবেশ। যুদ্ধের অস্ত্র উৎপাদন, কেনাবেচাতেও এ সব উপনিবেশের জনসম্পদ এবং সম্পদ যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে ইউরোপের দেশগুলো উনিশ শতকে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশে তাদের উপনিবেশে স্থায়ীভাবে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) পর্যন্ত এই ব্যবস্থা অটুট ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে এশিয়া এবং আফ্রিকায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণ ঘটলে এক একটি দেশ স্বাধীনতা লাভকরতে থাকে, উপনিবেশবাদের পতন অনিবার্যভাবে ঘটতে থাকে। ইতিহাসে এটিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতার পর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব রাষ্ট্রসভায় আবির্ভূত হয়। এভাবে পৃথিবীতে প্রায় দেড় শতাধিক রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক অবস্থা থেকে মুক্তি লাভকরেছে। অবসান ঘটেছে উপনিবেশবাদের।

সারাংশ: আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে শিল্প বিপ্লব। এটি প্রথম শুরু হয় ইংল্যান্ডে। বয়ন শিল্পের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়। শিল্প বিপ্লব গোটা সামন্ত অর্থনীতির অবশিষ্টকে সমূলে উৎপাটনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবদান রাখে। বয়ন শিল্পের প্রসার স্থল, জল, রেল, টেলিফোন ব্যবস্থা, খনিজ পদার্থের উত্তোলন এবং পণ্য উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করেছে। ইংল্যান্ড থেকে শিল্প বিপ্লব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে ইউরোপের অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার, রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা এবং শিক্ষা সংস্কৃতিতে জ্ঞানের চর্চা, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ইউরোপকে দু'শ বছরেই অভাবনীয় উন্নতি দিতে পেরেছে। ইউরোপের প্রভাবে অন্যান্য মহাদেশেও আধুনিক আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিল্প বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...