# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
'ক' দেশের শাসক সে দেশে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে লবণ তৈরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু স্বরাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সে দেশে একটি আন্দোলন পরিচালিত হয়। এ আন্দোলনের কার্যক্রম হিসেবে আন্দোলনকারীরা সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে লবণ উৎপাদন করে।
'ক' দেশের শাসক সে দেশে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে লবণ তৈরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু স্বরাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সে দেশে একটি আন্দোলন পরিচালিত হয়। এ আন্দোলনের কার্যক্রম হিসেবে আন্দোলনকারীরা সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে লবণ উৎপাদন করে।
বিদেশি শাসক রাসেল সাহেব তার শাসিত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- হাঙ্গামার ভয়াবহতা লক্ষ করে বিচলিত হন এবং ঘোষণা করেন যে, আগামী ১ বছরের মধ্যে উক্ত অঞ্চলের লোেকদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
Indian Government Act 1858 and its Procedure
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন (Indian Government Act 1858) ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ জাতীয় নেতৃত্বের অভাবসহ নানা কারণে ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ মহাবিদ্রোহের পর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এই মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পারে যে, ভারতবর্ষের ন্যায় এত বড় একটি রাষ্ট্রের শাসন করার ভার একটি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই উপলব্ধি থেকেই ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়া এক ঘোষণা বলে ভারতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসন ব্যবস্থা স্বহস্তে গ্রহণ করেন। মহারানির এই ঘোষণার প্রায় একশ বছরে কোম্পানির দুঃশাসনের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় ব্রিটিশ শাসন। মহারানির এ রাজকীয় ঘোষণা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘোষণা দ্বারা মহারানি ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও জনসাধারণের ক্ষোভ প্রশমনের লক্ষ্যে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। এতদসংক্রান্ত মহারানির ঘোষণাই ইতিহাসে ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত।। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘোষণায় মহারানি বলেন-

১. ইতঃপূর্বে কোম্পানি তাদের শাসনামলে ভারতীয় শাসক ও রাজন্যবর্গের সাথে যেসব বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে সেগুলো সযত্নে পালিত হবে।
২. ব্রিটিশ প্রজাদের মতোই বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল ভারতীয় প্রজাকে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
৩. ভারতীয় জনসাধারণের স্ব-স্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা হবে। কোনো অবস্থায় খ্রিষ্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ ধর্মীয় ক্ষেত্রে ভারতীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
৪. মহাবিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ নরনারীকে হত্যার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি এবং যারা এখনও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে তাদের সকলের প্রতি রাজকীয় ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে।
৫. লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত সাম্রাজ্যবাদনীতি ও স্বত্ব বিলোপনীতি পরিত্যক্ত করা হবে ।
-৬. উক্ত ঘোষণায় ভারতীয়দের কল্যাণে এবং উন্নয়নে আরও বলা হয়, ভারতের জনগণের উন্নতিই সরকারের শক্তি বৃদ্ধি, ভারতীয়দের পরিতৃপ্তিই ব্রিটিশ সরকারের নিরাপত্তা, তাদের কৃতজ্ঞতাই ব্রিটিশ সরকারের জন্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হবে। মহারানি ভিক্টোরিয়ার উল্লিখিত আবেগময় ঘোষণায় ভারতীয় জনসাধারণের ক্ষোভ হ্রাস পায় এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে সম্পর্ক ক্রমশ উন্নয়ন ঘটে।
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এক আইন পাস করে ভারতের শাসনভার মহারানি ভিক্টোরিয়ার হস্তে অর্পণ করেন। যেহেতু রানির পক্ষে সরাসরি ভারতে শাসন করা সম্ভব ছিল না, সেহেতু ব্রিটিশ সিংহাসনের প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল পদে 'ভাইসরয়' বা রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। কোম্পানির পরিচালক বোর্ড অব কন্ট্রোলের পরিবর্তে ব্রিটিশ কেবিনেট মন্ত্রীদের মধ্যে থেকে একজনকে ভারত সচিবের পদে নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি ১৫ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিলের সাহায্যে ভারতের শাসনকার্য পরিচালনা করবেন স্থির হয়।

ভারত শাসন আইনের প্রক্রিয়া (Procedure of Indian Government Act)
মহারানির ঘোষণা এবং পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারতবর্ষে অবস্থানরত গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংই প্রথম রাজপ্রতিনিধি বা ভাইসরয় নিযুক্ত হন (১৮৫৮-১৮৬২)। রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করে লর্ড ক্যানিং উদার নীতির মাধ্যমে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। পাশাপাশি ভারতীয়দের শান্ত রাখতে বেশ কিছু সংস্কারের কাজে হাত দেন। যেমন-
(ক) আইন সংস্কার: তিনি ভারতীয় দেওয়ানি আদালত এবং নেজামত আদালত একত্রিত করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর আইন সচিব কর্তৃক ভারতীয় দণ্ডবিধি আইন প্রণীত হয়। লর্ড ক্যানিং ভারতীয় সিভিল অ্যাকট পাস করে ভারতীয়দের জন্য বেশ কয়েকটি উচ্চপদ সংরক্ষিত করে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের দ্বার উন্মুক্ত করেন।
(খ) সামরিক সংগঠন: লর্ড ক্যানিং কোম্পানির সময়ের সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে আবার নতুন করে সেনাবাহিনী গঠন করেন। সেনাবিভাগে তিনি ভারতীয় সেনা কম ভর্তি করে ইউরোপীয় সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। অস্ত্রাগারের দায়িত্ব। তিনি ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে ন্যস্ত করেন।
(গ) রাজস্ব সংস্কার: ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সংগ্রামে কোম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে লর্ড ক্যানিং ইংল্যান্ডের দুজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এ ব্যবস্থা অনুযায়ী আয়কর বৃদ্ধি, পথকর স্থাপন এবং কাগজের মুদ্রা প্রবর্তন করা হয়। তিনি সামরিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সক্ষম হন।
(ঘ) শিক্ষা সংস্কার: শিক্ষা ক্ষেত্রেও তার অবদান রয়েছে। ভারতবর্ষে শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কলকাতা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ে তিনি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি একদিকে উপমহাদেশের মহাবিদ্রোহ দমন করে তাঁর দেশবাসীর নিকট থেকে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন। অপরদিকে, ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজস্ব আইন প্রণয়ন করে জমিদারদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা, কাগজের মুদ্রা প্রচলন, ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বোচ্চ ক্ষমতাবিশিষ্ট আদালত 'হাইকোর্ট' প্রতিষ্ঠা এবং কলকাতা, মাদ্রাজ, মুম্বাইয়ে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ভারতবাসীর নিকট জনদরদি শাসকে পরিণত হন। ভারতের এই জনদরদি শাসক ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
লর্ড ক্যানিং-এর পর ধারাবাহিকভাবে নিম্ন বর্ণিত ভাইসরয়গণ ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে ভারতবর্ষ শাসন করেন। লর্ড এলগিন (১৮৬২-১৮৬৩ খ্রি.), স্যার জন লরেন্স (১৮৬৪-১৮৬৯ খ্রি.), লর্ড মেয়ো (১৮৬৯-১৮৭২ খ্রি.), লর্ড নর্থব্রুক (১৮৭২-১৮৭৬ খ্রি.), লর্ড লিটন (১৮৭৬-১৮৮০ খ্রি.), লর্ড রিপন (১৮৮০-১৮৮৪ খ্রি.), লর্ড দ্বিতীয় এলগিন (১৮৯৪-১৮৯৯ খ্রি.), লর্ড কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫ খ্রি.), লর্ড মিন্টো (১৯০৫-১৯১০ খ্রি.) ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । তন্মধ্যে লর্ড লিটন, লর্ড রিপন ও লর্ড কার্জনের নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Lord Lytton (1876–1880 AD.)
লর্ড নর্থব্রুক-এর পর ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড লিটন ভারতবর্ষের ভাইসরয় নিযুক্ত হন। তিনি তৎকালীন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডিজরেইলীর রাজনৈতিক শিষ্য এবং একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক ছিলেন। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পার্লামেন্টে "Royal Title Act" পাস হলে তিনি দিল্লিতে এক বিরাট সভায় মহারানি ভিক্টোরিয়াকে "কাইজার-ই-হিন্দ" বা "ভারত সম্রাজ্ঞী" উপাধিতে ভূষিত করেন।
ভারতে নানা কারণে লর্ড লিটনের শাসনকাল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কতগুলো দমনমূলক আইন পাস করেন এবং যুদ্ধবিগ্রহের দ্বারা ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ এবং ভারতবাসীর বিরাগভাজন হন। এ সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে-
প্রথমত, তিনি অস্ত্র আইন পাস করে বিনা লাইসেন্সে অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্র আইন পাস করে দেশীয় ভাষায় প্রচারিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন।
তৃতীয়ত, পূর্ববর্তী শাসকদের নিরপেক্ষ নীতি পরিত্যাগ করে অগ্রসর নীতি (Forward policy) অনুসরণ করেন।
লর্ড লিটনের আফগান নীতি (Afgan Policy of Lord Liton)
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের পর যে সমস্ত রাজপ্রতিনিধি ভারতে আসেন তাঁদের মধ্যে লর্ড লিটন ছিলেন অন্যতম। তিনি ভারতে আগমন করেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত তথা আফগানিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা নিয়ে জড়িয়ে পড়েন। তিনি রুশ অগ্রগতি প্রতিহত করার জন্য, পূর্ববর্তী শাসকদের নিরপেক্ষ নীতি পরিত্যাগ করে অগ্রসর নীতি (Forward policy) অনুসরণ করেন । তিনি আফগানিস্তান হিরাতে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট রাখার প্রস্তাব দিলে আফগানিস্তানের আমির শের আলী নিজেকে ব্রিটিশ মিত্র বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে লর্ড লিটন ক্রুদ্ধ হয়ে দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এখানে উল্লেখ্য যে লর্ড অকল্যান্ডের (১৮৩৬-১৮৪২) সময় প্রথম আফগানযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ বাহিনী আফগানিস্তান আক্রমণ করে রাজধানী কাবুল অধিকার করে। আমির শের আলী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তুর্কিস্তানে পলায়ন
করেন। অতঃপর শের আলীর পুত্র ইয়াকুব খানকে কাবুলের আমির পদে অধিষ্ঠিত করে তার সাথে 'গণ্ডামুখে' একটি সন্ধি স্বাক্ষর করেন। স্বাধীনতা প্রিয় আফগানগণ এই সন্ধি মেনে নিতে না পেরে বিদ্রোহী হন। ক্রুদ্ধ লিটন কাবুল থেকে কান্দাহারকে পৃথক করার নীতি গ্রহণ করেন। এ সময় ইংল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে রক্ষণশীল দলের পরাজয় ঘটলে উদারনৈতিক দলের প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোন লিটনের আফগান নীতির নিন্দা করেন। সে কারণেই ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল - মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Lord Ripon (1880-1884 AD.)
ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রেরিত ভাইসরয়ের তালিকার মধ্যে লর্ড রিপন এবং লর্ড কার্জনের নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোনের উদারনৈতিক দলের সদস্য লর্ড রিপন ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন। শান্তি, স্বাতন্ত্র্যবাদ ও স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাসী লর্ড রিপন ভারতবাসীর রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী নীতির ঘোরবিরোধী লর্ড রিপন বেশ কিছু সংস্কারের জন্য ভারতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর সংস্কারগুলো হলো-

রাজনৈতিক সংস্কার বেন্টিঙ্কের সময় যে মহীশূর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল তা ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড রিপন পুনরায় মহীশূর রাজবংশের হাতে ছেড়ে দিয়ে উদারতার পরিচয় দেন এবং দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটান।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান: পূর্ববর্তী ভাইসরয় লর্ড লিটন কর্তৃক প্রবর্তিত সংবাদপত্র আইন (Vernacular Press Act) রদ করে দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন।
শিক্ষা সংস্কার: শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে তিনি 'হান্টার কমিশন' নিয়োগ করেন। এই কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করেন।
স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রণয়ন: লর্ড রিপনের আমলে অবিস্মরণীয় ঘটনা হলো Bengla Municipal Act নামক স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রণয়ন। এ আইন দ্বারা স্থানীয় জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্থানীয় সরকার বিষয়ক দপ্তরগুলো পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করেন।
প্রজাস্বত্ব আইনের ভিত্তি স্থাপন: তিনি বঙ্গ ও অযোধ্যার রায়তদের অবস্থার উন্নতিকল্পে প্রজাস্বত্ব আইনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। পরবর্তীকালে এই আইনটি "Bengal Tenancy Act" নামে পাস হয়।
ফ্যাক্টরি আইন পাস : লর্ড রিপন শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্যাক্টরি আইন পাস করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন;; করেন। এই আইন দ্বারা শিল্প-শ্রমিকদের দিয়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার নিয়ম চালু হয়।
অবাধ বাণিজ্য নীতির প্রবর্তন: প্রজাসাধারণের উপকারার্থে তিনি লবণ ও অন্যান্য বাণিজ্য দ্রব্যের ওপর শুল্ক হ্রাস করেন এবং আয়কর রহিত করে অবাধ বাণিজ্য নীতির প্রবর্তন করেন। বেন্টিংকের সময় যে মহীশূর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল তা তিনি ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে মহীশূর রাজবংশের হাতে ফিরিয়ে দেন।
ইলবার্ট বিল: ইতঃপূর্বে কোনো ভারতীয় ম্যাজিস্ট্রেট ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না। বিচারক্ষেত্রে এ বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে লর্ড রিপন আইন সদস্য মি. ইলবার্টকে একটি বিল প্রণয়ন করতে বলেন। ইলবার্ট যথারীতি একটি বিল প্রণয়ন করেন এবং বিলটি ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পাস হয়। মি. ইলবার্টের নাম অনুযায়ী বিলটির নাম রাখা হয় 'ইলবার্ট বিল'। ইলবার্ট বিল প্রণয়ন করে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করার ক্ষমতা প্রদান করেন। অবশ্য পরে এই আইন কিছুটা সংশোধন করে ইউরোপীয় জুরি গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়।
গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক: লর্ড রিপন ইংল্যান্ডের রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। তিনি ভারতীয় জনসাধারণের রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি পূর্ণ সহানুভূতিশীল ছিলেন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে জনগণকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে তিনি গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে ভারতীয়দের হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে আছেন। তার শাসনামলে বিভিন্ন উন্নয়ন এবং সংস্কারমূলক কাজের জন্য তিনি আজও ভারতীয়দের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে কোম্পানির শাসনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব ব্রিটিশ শাসকগণ উন্নয়ন এবং সংস্কারমূলক কাজের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে লর্ড রিপন অন্যতম।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Lord Curzon (1899-1905 AD.)
লর্ড ডালহৌসির রাজনৈতিক শিষ্য নামে অভিহিত লর্ড কার্জন ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন। ভাইসরয়ের তালিকায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী এবং সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তিনি অপরিসীম কর্মশক্তি, বিদ্যা, বুদ্ধি, অদম্য উৎসাহ ও গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে এদেশের কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করেন। শত কর্মব্যস্ত তার মধ্যেও তিনি ৩টি বিখ্যাত গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ঐতিহাসিক পি. ই. রবার্টস বলেছেন, "ভালো বা মন্দ যাই হোক, লর্ড ডালহৌসির পর কোনো রাজপ্রতিনিধি তাঁর ন্যায় সমগ্র ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় এতদূর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।"

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ স্বার্থ ও অধিকার রক্ষাই ছিল তার বৈদেশিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য। ঐতিহাসিক পি. ই. রবার্টস-এর মতে, “লর্ড কার্জনের বৈদেশিক নীতি প্রধানত উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের উপজাতি, আফগানিস্তান, পারস্য ও তিব্বত সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত ছিল।" তিনি ভারতবর্ষে শান্তি স্থাপন এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন-
কৃষি সংস্কার: দেশের মেরুদণ্ড কৃষির উন্নয়নের জন্য লর্ড কার্জন সর্বপ্রথম 'সমবায় ঋণদান সমিতি' স্থাপন করেন। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মহাজনদের হাত হতে কৃষকদের রক্ষা করার মহান উদ্দেশ্যে 'পাঞ্জাব ভূমি হস্তান্তর আইন' বিধিবদ্ধ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে 'বিশ্ববিদ্যালয় আইন' পাস করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে
আনেন। এ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ। অবশ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব বৃদ্ধি
পাওয়ায় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এর ঘোর বিরোধিতা করেন। 'কার্জন হল' (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান
অনুষদ) তাঁর স্মৃতি বহন করছে। তিনি প্রাচীন কীর্তিসমূহ সংরক্ষণের জন্য 'প্রাচীন কীর্তি রক্ষা আইন' প্রবর্তন করে একটি
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ স্থাপন করেন। কলকাতার বিখ্যাত ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি (ন্যাশনাল লাইব্রেরি) তার একটি স্মরণীয় কীর্তি।
শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি: দেশীয় শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য লর্ড কার্জন একটি সরকারি শিল্প বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্র জনসাধারণের সুবিধার জন্য তিনি 'লবণ কর' এবং মধ্যবিত্তদের জন্য 'আয়কর' হ্রাস করেন।
সামরিক ও পুলিশ বিভাগের সংস্কার: ড. আর সি মজুমদার বলেছেন, "লর্ড কার্জনের ভাইসরয় থাকাকালীন সময় সামরিক বিভাগে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল।
উত্তর ভারত সীমান্ত নীতি: লর্ড কার্জন একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেই তিনি
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সমস্যা সমাধানে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি পূর্ববর্তী শাসকদের 'অগ্রসর নীতি' পরিহার করে সীমান্ত এলাকা থেকে সৈন্য 'প্রত্যাহার নীতি' গ্রহণ করেন। তিনি উপজাতিদের দ্বারা গঠিত সৈন্যবাহিনী সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন করার ব্যবস্থা করেন। তিনি ব্রিটিশ সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেন। সীমান্ত এলাকায় দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে রেল লাইন নির্মাণ করেন। তিনি পেশোয়ারে রাজধানী স্থাপন করে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করেন।
প্রশাসনিক সংস্কার: তিনি প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আলাদা আলাদা কমিশন গঠন করেন। তার প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে আর্থিক সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাস্তববাদী লর্ড কার্জন বুঝতে পেরেছিলেন, আর্থিক ভিত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভারতে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তিনি দুর্ভিক্ষ, ভূমি, রাজস্ব, সেচ ব্যবস্থা, কৃষি, রেলপথ, কর ইত্যাদি বিষয়ে আইন পাস করেন। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষে তিনি ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করেছিলেন। সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য তিনি ঝিলাম খাল খননসহ বেশ কতগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
ভূমি সংস্কার: ভূমি ব্যবস্থাপনায় লর্ড কার্জনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, সরকারি মালিকানাধীন খাস জমি চাষকারী কৃষকদের দেওয়া খাজনার পরিমাণ জমিদারির অধীন কৃষকদের দেওয়া খাজনার তুলনায় অনেক বেশি। এজন্য তিনি খাস জমির খাজনার পরিমাণ হ্রাস করেন। ভূমি ব্যবস্থায় তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান 'পাঞ্জাব ল্যান্ড এলিয়েনেশন অ্যাক্ট' আইনের লক্ষ্য ছিল- (১) ঋণের দায়ে কৃষককে জমি থেকে উৎখাত হওয়া থেকে রক্ষা করা। (২) অকৃষিজীবী মানুষকে জমি গ্রহণ থেকে বিরত রাখা। (৩) কৃষি ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক একটি কৃষি বিভাগ সৃষ্টি এবং কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে তিনি উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভারতীয়দের মন জয় করেছিলেন।
প্রত্নতত্ত বিভাগ, গ্রন্থগার ও ক্যাডেট কোর প্রতিষ্ঠা লর্ড কার্জন ভারতের প্রাচীন ঐতিহাসিক কীর্তিসমূহ আবিষ্কার, সংরক্ষণ এবং ব্যাপক ঐতিহাসিক গবেষণা চালানোর জন্য একটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। যা ঐতিহাসিকদের জন্য একটি গুরুত্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচ্য। তিনি কলকাতায় ভারতের বৃহত্তর গ্রন্থাগার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশীয় রাজন্যবর্গের পুত্রদের সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তিনি ইম্পেরিয়াল ক্যাডেট কোর প্রতিষ্ঠা করে সুনাম অর্জন করেন।
লর্ড কার্জনের ভারতীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল চিন্তা-ভাবনা এবং বিশাল কর্মপ্রবাহ এটাই প্রমাণ করে, লর্ড ডালহৌসির পর লর্ড কার্জনই ভারতের শ্রেষ্ঠ রাজপ্রতিনিধি। লর্ড কার্জনের শাসনামল অভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিখ্যাত।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Partition of Bengal-1905
লর্ড কার্জনের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্যে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে - অবিস্মরণীয় ঘটনা। প্রশাসনিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে লর্ড কার্জন রাজনৈতিক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গ বিভক্তি করেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ পূর্ব বাংলার মুসলমানদের স্বার্থের অনুকূলে হলেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের স্বার্থের প্রতিকূলে ছিল। ফলে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এক রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ বাতিল হয়।
বঙ্গভঙ্গের কারণ
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গের পেছনে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল। নিম্নে এ
সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
প্রশাসনিক কারণ: ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে বাংলা প্রেসিডেন্ট গঠিত
হয়েছিল; যার আয়তন ছিল ২ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫ শত ৮৪ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৫০ লক্ষ। এই বিশাল এলাকা এবং জনগোষ্ঠী একটি কেন্দ্র সুদূর কলকাতা থেকে একজন লে. গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে শাসন করা সম্ভব নয়। তা স্পষ্ট হয়েছিল ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষে। প্রশাসনিক অসুবিধার কারণে সেখানে সুষ্ঠু ত্রাণ সাহায্য পাঠানো সম্ভব হয়নি। এখানে উল্লেখ্য যে, শাসন কার্যের সুবিধার জন্য ১৮৫৩ সালে চার্লস গ্রান্ট বাংলা প্রদেশের আয়তন হ্রাসের সুপারিশ করেছিল। তার ফলেই ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে আসামকে, বিচ্ছিন্ন করা হয়। এটা ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রাথমিক পদক্ষেপ।
প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তি দেখানো হলেও এর পেছনে আরও কারণ ছিল-
অর্থনৈতিক কারণ: ব্রিটিশ শাসনের গোড়া থেকেই পূর্ব বাংলা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনুন্নত ও অবহেলিত।
এ অঞ্চলে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বিকাশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি পূর্বে হয়নি। অন্যদিকে, কলকাতা ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান কলকাতাই সর্বদা প্রাধান্য লাভ করে। কৃষি ছিল পূর্ব বাংলার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। কিন্তু এখানের কৃষি ও কৃষকদের উন্নতির জন্য কোনো সরকারি প্রচেষ্টা গৃহীত হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা চিরস্থায়ী হবার উপক্রম হয়। শিক্ষা, যোগাযোগ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে পার্থক্য ব্রিটিশ সরকারের জানা ছিল। সে কারণে তারা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার উন্নতিসাধনের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক কারণ: বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্যই লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ করেছিলেন। লর্ড কার্জন
লক্ষ করেছিলেন যে, বাঙালি মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীরা ক্রমশ জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠেছে। একথা ইতিহাস সম্মত যে, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল বাংলা ও বাঙালি জাতি। এ সময় চরমপন্থী নেতাদের প্রভাবে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের চরম অবস্থা। সেক্ষেত্রে লর্ড কার্জন 'বিভেদ ও শাসন নীতি' প্রয়োগ করে বাংলাকে বিভক্ত করতে চাইলেন। কেননা বাংলাকে ভাগ করা হলে বাঙালিরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং কলকাতা হতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র সরে যাবে। অন্যদিকে, ঐক্যবদ্ধ বাংলা ছিল এক বিরাট শক্তি এবং সেক্ষেত্রে বাংলার হিন্দু-মুসলমান মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের জন্য নিরাপদ নয়। বঙ্গ বিভাগ হলে পূর্ব বাংলার মুসলমান ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য হবে এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দুর্বল হবে।
বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়ন
লর্ড কার্জন ব্রিটিশ সরকারের নিকট পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, পূর্ব বাংলা অনগ্রসর, পশ্চিম বাংলা অগ্রসর। পূর্ব বাংলা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, পশ্চিম বাংলা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিম বাংলা উন্নত, পূর্ব বাংলা অনুন্নত। সুতরাং দুই বাংলাকে সমান করতে হলে বঙ্গভঙ্গ অত্যাবশ্যক। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন লর্ড কার্জনের উক্ত তথ্য সঠিক।
এরই প্রেক্ষাপটে ১৯০৩ সালে বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ১৯০৪ সালে লন্ডনের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এটি অনুমোদন করেন এবং ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়িত হয়। পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হলো এবং রাজধানী হলো ঢাকা। স্যার ব্যামফিল্ডফুলার নতুন লে. গভর্নর নিযুক্ত হন। এ নতুন প্রদেশের আয়তন দাঁড়ায় ১,০৬,০০০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লক্ষ। এর মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মুসলমান, ১ কোটি ২০ লক্ষ হিন্দু এবং বাকি ১০ লক্ষ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। পশ্চিমবঙ্গ পুরাতন বঙ্গ প্রদেশের অধীনে থেকে যায়। এর আয়তন দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৫ শত ৮০ বর্গ মাইল এবং লোকসংখ্যা ৫ কোটি ৪০ লক্ষ। এর মধ্যে ৪ কোটি ২০ লক্ষ হিন্দু, ৯০ লক্ষ মুসলমান এবং বাকি ৩০ লক্ষ অন্য ধর্মাবলম্বী।
নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় বঙ্গভঙ্গ
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা হলে উভয় বাংলার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনুন্নত ও - অবহেলিত পূর্ব বাংলার মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায় কিন্তু পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা এর বিরোধিতা করে। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের পক্ষ থেকে নব নিযুক্ত লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারকে ঢাকায় বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কংগ্রেস ঐ দিন (১৬ অক্টোবর) দেশব্যাপী শোক দিবস পালন করে। বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার উন্নয়নের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে এর বাস্তবায়নে বাংলার ভাগ্যাকাশে যে প্রাণ পুরুষের আবির্ভাব হয় তিনি হলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে স্যার সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫) রাজনীতিতে প্রবেশ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ব বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের তথা সমগ্র ভারতের নিপীড়িত ও অবহেলিত মুসলমানদের মুক্তির দিশারিরূপে আবির্ভূত হয়। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকার বিখ্যাত নবাব পরিবারে ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষগণ ব্যবসা উপলক্ষে এদেশে আসেন এবং জমিদারি ক্রয় করে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এই পরিবার জনহিতকর কাজের জন্য বেশ সুনাম অর্জন করে। যে কারণে সলিমুল্লাহ পিতামহ খাজা আবদুল গনি ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক 'নবাব' উপাধি লাভ করেন। এই উপাধিই তাদের বংশগত পদবিতে পরিণত হয়। খাজা আবদুল গনি তার পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামে ঢাকার ইসলামপুরে (১৮৫৯-১৮৭২) আহসান মঞ্জিল তৈরি করেন (২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২)। পরবর্তীতে এটিকে সরকারি জাদুঘরে পরিণত করা হয়। প্রতিদিন হাজার হজার দর্শনার্থী এটি দর্শন করে নবাবদের আভিজাত্য ও রুচিশীলতার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়।
১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে আহসানউল্লাহ মৃতুবরণ করলে পারিবারিক দায়িত্ব পুত্র সলিমুল্লাহর ওপর বর্তায়। তখন তার বয়স ৩০ বছর। এসময় তিনি ময়মনসিংহে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে কর্মরত ছিলেন। তার উদার পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়), মিটফোর্ট হাসপাতাল (বর্তমান সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ), সলিমুল্লাহ এতিমখানা, ঢাকা কলেজ হোস্টেল (বর্তমান সলিমুল্লাহ হল) প্রভৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা তার জনহিতকর কাজের স্বাক্ষর বহন করে। শুধুমাত্র তার প্রচেষ্টায় ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি সদিচ্ছা ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবকে দৃঢ়তার সাথে সমর্থন করেছিলেন। তিনি বলেন, "বঙ্গভঙ্গ আমাদেরকে নিষ্ক্রিয় জীবন থেকে জাগিয়ে তুলেছে এবং সক্রিয় জীবন ও সংগ্রামের পথে ধাবিত করেছে।" অন্যদিকে, নতুন প্রদেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নতির সুযোগ-সুবিধার সম্ভাবনা মুসলমানদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করে। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতার মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অপরদিকে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুরা নেমে আসে। রবিঠাকুরের পরামর্শে 'রাখি বন্ধন' আত্মশুদ্ধির জন্য 'গঙ্গাস্নান' অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়। বাঙালির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'বাংলার মাটি, 'বাংলার জল' গানটি রচনা করেন। বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করলেন বন্দে মাতারম গান, 'বাহুতে তুমি মা শক্তি/হৃদয় তুমি মা ভক্তি' এটাই ভারতের জাতীয় সংগীত। হিন্দু সম্প্রদায় সরকারি চাকরি ইস্তফা প্রদান, বিলাতি দ্রব্য বর্জন, স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে হিন্দু নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন- সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, অশ্বিনী কুমার দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল, রাসবিহারী ঘোষ, অরবিন্দু ঘোষ, মারাঠা নেতা বালগঙ্গাধর তিলক প্রমুখ। আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। এ সময় পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত ইংলিশম্যান, স্টেটম্যান, যুগান্তর, সন্ধ্যা, হিতবাদী প্রভৃতি পত্রিকায় ও বক্তৃতায় বঙ্গভঙ্গকে বাঙালি বিরোধী জাতীয়তাবাদ বিরোধী পদক্ষেপ এবং 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ' প্রভৃতি বিশেষণে আখ্যায়িত করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। হিতবাদী পত্রিকায় (৭-৭-১৯০৫) বলা হয়, গত ১৫০ বছরের মধ্যে বাঙালি জাতির সম্মুখে এরূপ বিপর্যয় আসেনি। হিন্দু নেতারা এটিকে 'জাতীয় দুর্যোগ' এবং বাঙালি (হিন্দু) জাতীয়তাবাদের সংকটময় মুহূর্ত বলে অভিহিত করেন।. মহারাজা মহীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর মতে, "নতুন প্রদেশের মুসলমানরা হবে সংখ্যাগুরু আর বাঙালি হিন্দুরা হবে সংখ্যালঘু। ফলে স্বদেশেই আমরা হব প্রবাসী।"
পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের বঙ্গ বিভাগের বিরোধিতার কারণ হিসেবে বলা যায়-
(ক) বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ভাগ্যের ব্যাপক উন্নয়ন হবে, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হবে। এর ফলে হিন্দু জমিদার ও বুদ্ধিজীবীরা মুসলমানদের ওপর তাদের কর্তৃত্ব হারাবে।
(খ) পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হিন্দুরা মেনে নিতে পারেনি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে তাদের মনে দারুণ ঈর্ষার উদ্রেক হয়। এ কারণে বঙ্গ বিভাগকে নানান রঙে রঙিন করে এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
(গ) ঢাকায় নতুন রাজধানী হলে এতদ্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পাবে, কলকাতার সমৃদ্ধি হ্রাস পাবে, সেখানের শিল্পপতি ও পুঁজিবাদীদের একচেটিয়া ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটবে।
(ঘ) কলকাতার আইনজীবীগণ মনে করেন, ঢাকায় নতুন হাইকোর্ট হলে তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়বে। কারণ অধিকাংশ মক্কেলই ছিল পূর্ববঙ্গের।
(ঙ) কলকাতার সাংবাদিকরা মনে করেন, নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে পত্রিকা বের হবে, সেক্ষেত্রে তাদের পত্রিকার চাহিদা কমে যাবে।
এভাবে শ্রেণিগত স্বার্থহানির আশঙ্কায় কলকাতায় হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।
বঙ্গভঙ্গ রদ
স্বদেশী আন্দোলন ও বৈপ্লবিক আন্দোলনের তীব্রতায় এবং হিন্দু ও মুসলিম পরস্পর বিরোধী আন্দোলন এমন চরম আকার ধারণ করে যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ বাতিল করতে বাধ্য হন। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের সম্রাট পঞ্চম জর্জের দিল্লিতে অভিষেক অনুষ্ঠানে বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করা হয়। শাসন ব্যবস্থা পূর্বের অবস্থানে ফিরে যায়। হিন্দু সম্প্রদায় খুশি হয়। বঙ্গভঙ্গ রদে সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হন নবাব সলিমুল্লাহ। মনের দুঃখে তিনি রাজনীতি থেকে সরে পড়েন। তার স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করার জন্য বড় লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় আসেন এবং মুসলমানদের আশ্বাস দেন যে, ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। বাংলার অনেক হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙালি জাতি বিভক্ত হয়ে পড়বে। তাছাড়া পূর্ব বাংলার প্রধানত কৃষিজীবী মুসলমানগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র থেকে কোনো উপকার পাবে কিনা সে বিষয় তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ সকল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। এতে নবাব সলিমুল্লাহ সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিরোধীদের নিন্দা করেন। অবহেলিত বাংলার এই অবিসংবাদিত নেতা ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে না ফেরার দেশে চলে যান। তার জীবদ্দশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি সত্য, কিন্তু তার মৃত্যুর ৬ বছরের মধ্যে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে; যারা পূর্ব বাংলার অধিকার আদায়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Swadeshi and Boycott Movement
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাস থেকে 'বয়কট ও স্বদেশী' কর্মপন্থা নিয়ে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাই স্বদেশী আন্দোলন নামে পরিচিত। এ আন্দোলন চারটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্যায়, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা ও প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো। দ্বিতীয় পর্যায়, বিলাতি পণ্যদ্রব্য বয়কট বা বর্জন। তৃতীয় পর্যায়, স্বদেশী পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার। চতুর্থ পর্যায়, বিপ্লববাদ বা সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা।-বয়কট আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল- (১) বিলাতি পণ্য ও শিক্ষা বর্জন। (২) স্বদেশী পণ্য ব্যবহার ও স্বদেশী শিক্ষা গ্রহণ। কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলনে শুধু বিলাতি সামগ্রী বয়কটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল না, শহর ও গ্রাম-গঞ্জে প্রকাশ্যে বিলাতি দ্রব্য পুড়িয়ে ফেলা হয়। ইংরেজদের খাবার তৈরিতে উড়িষ্যার পাচকরা অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি বিলাতি বস্ত্র, লবণ, চিনি প্রভৃতি সামগ্রী কোনো পূজা-পার্বণে ব্যবহার করলে পুরোহিতরা পূজা করতে অসম্মত হয়। এভাবে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে বয়কট আন্দোলন বেগবান হয়। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি এক বিবরণে দেখা যায় যে, বিলাতি সাবান, লবণ, সুতি কাপড় ও সিগারেট আমদানি হ্রাস পায়। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। স্বদেশী আন্দোলন শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের রূপ নেয়। এ আন্দোলনে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিলাতি পণ্য সংগ্রহ করে তা পুড়িয়ে ফেলা, দোকানে দোকানে পিকেটিং করে বিলাতি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বহু ছাত্রকে বহিষ্কার করলে জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ে। এ লক্ষ্যে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশালে জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে অরবিন্দ ঘোষকে অধ্যক্ষ করে জাতীয় কলেজ স্থাপিত করা হয়। স্বদেশী শিল্পের পুনরুজ্জীবন, নতুন শিল্প স্থাপন, কাপড়ের কল, ব্যাংক, বিমা, চিনি, লবণ ও ঔষধসহ বিভিন্ন কারখানা গড়ে ওঠে। ফলে বাংলায় এক ধুনিক শিল্পপতি শ্রেণির জন্ম হয়। এরা অধিকাংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। নব্য শিল্পপতিরা স্বদেশী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে মহাত্মা গান্ধী লিখেছেন, 'বঙ্গ-ভঙ্গের পরেই ভারতে প্রকৃত নবজাগরণ ঘটেছে'। এ আন্দোলনে জনমত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জেলায় সমিতি গঠন করা হয়। এসব সমিতির মধ্যে বরিশালের 'স্বদেশ বান্ধব', ফরিদপুরে 'ব্রতী', ময়মনসিংহে 'সাধনা' এবং ঢাকায় 'অনুশীলন' উল্লেখযোগ্য। কবি-সাহিত্যিকরাও এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, রজনীকান্ত উল্লেখযোগ্য। বরিশালের চারণ কবি মুকুন্দ দাস বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে 'পরোনা রেশমী চুড়ি, বঙ্গনারী, কভু হাতে আর পরো না'; রবীঠাকুর 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' (পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত) প্রভৃতি কবিতা, গান গেয়ে জনগণের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে তীব্র আবেগ সৃষ্টি করে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন বাংলার জমিদার শ্রেণি। তবে শেষ পর্যন্ত স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এর কারণ ছিল-
(ক) মুসলমানরা অংশগ্রহণ না করায় এ আন্দোলন জাতীয়রূপ লাভ করেনি
(খ) সরকারি দমন নীতি
(গ) বাংলার ব্যবসায়ী শ্রেণি অংশগ্রহণ না করা এবং
(ঘ) সন্ত্রাসবাদের পথ অনুসরণ করার ফলে এ আন্দোলন থেমে যায়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Revolutionary Movement
স্বদেশী আন্দোলন ব্যর্থ হলে কংগ্রেসের চরমপন্থী দল 'স্বরাজ' ধধ্বনি তুলে বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে ইংরেজ সরকারের পতন ঘটানো। এ সময় বাংলার বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু '৩৫' সমিতি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ঢাকার 'অনুশীলন সমিতি' যায় প্রধান ছিলেন পুলিন বিহারী দাস, কলকাতার 'যুগান্তর পাটি যার প্রধান হিলেন রবীন্দ্র কুমার ঘোষ। এ সংগঠনের সদস্য হিল বাংলার যুবক সম্প্রদায়, যারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের পতন ঘটাতে চায়। এ সমিতির মুখপাত্র ছিল 'যুগান্তর' পত্রিকা। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্র ঘোষ, পুদিন দাস ও প্রতুল গাঙ্গুলী।
প্রথম পর্যায়: বিপ্লবীরা ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার গভর্নর এহু ফ্রেজার এবং পূর্ব বাংলা ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর বিপ্লবীরা টার্গেট করে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকি আলীপুরে কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ করে বোমা নিক্ষেপ করে। কিন্তু কিংসফোর্ড গাড়িতে ছিল না, ছিল অন্য এক ইংরেজ কর্মকর্তার স্ত্রী কেনেডি ও কন্যা। তারা নিহত হ্যা। ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন এবং তার ফাঁসি হয় (১৯০৮)। প্রফুল্ল চাকি নিজের পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ সময় ক্ষুদিরামকে কেন্দ্র করে রচিত হয় বিখ্যাত এই গান- "একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি-হাসি পড়ব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী। ১৯০৮-১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বহু ইংরেজ ও তাদের সহযোগীরা বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়। বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয় ১৯১২ সালে। এ আন্দোলন কলকাতা কেন্দ্রিক হলেও তা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে। এ সময় কলকাতায় গোপনে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। ১৯১২ সালের শেষের দিকে দিল্লিতে রাসবিহারী বসুর পরিকল্পনায় লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার জন্য বোমা হামলা চালানো হয়। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। ইতোমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এ সুযোগে বাংলার অনেক বিপ্লবী বিদেশ থেকে গোপনে অস্ত্র সংগ্রহের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ইংরেজ শক্তির সাথে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এঁদের মধ্যে ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতিন), ডা. যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ। সরকার গোপনে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে চিত্তপ্রিয় নামে একজন বিপ্লবী শহিদ হন। বাঘা যতিনের জেলখানাতেই মৃত্যু হয় এবং অপর দুই বিপ্লবীর ফাঁসি হয়। এতো জেল-জুলুম, হত্যা, ফাঁসি দিয়েও বিপ্লবীদের টলানো যায়নি। তাঁদের শক্তি ছিল 'বন্দেমাতরম' ধানি। বিপ্লবীরা চোরাগোপ্তা হামলা, বোমা নিক্ষেপ অব্যাহত রাখে। ১৯১৬ সালের ৩০ শে জানুয়ারি বিপ্লবীবা হত্যা করে পুলিশের ডেপুটি সুপার বসন্ত চট্টোপাধ্যায়কে। হত্যাকাণ্ড বাড়তে থাকলে গ্রেফতার বাড়তে থাকে। ১৯২২ সালে গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতার আরও বৃদ্ধি পায়। বিপ্লবীরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ১৯২৪ সালে অক্টোবর মাসে ইংরেজ সরকার বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স জারি করে। এ অর্ডিন্যান্স বলে বহু বিপ্লবী কারারুদ্ধ হয়। এর ফলে এ পর্বের আন্দোলনও স্থিমিত হয়ে পড়ে।
তৃতীয় পর্যায়: ১৯৩০ সালে মহাত্মা গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনের সাথে সাথে বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন আবার মাথাচারা দিয়ে ওঠে। এ সময় বিপ্লবীরা কঠিন থেকে কঠিতর হয়ে ওঠে। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে বাঙালি যুব সমাজ বারবার সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এসময় একজন দুঃসাহসী বিপ্লবী ছিলেন চট্টগ্রামের মাস্টারদা। তার আসল নাম সূর্য সেন (১৮৯৪-১৯৩৪) কলেজ জীবনে তিনি বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন। স্নাতক ডিগ্রি পাশের পর তিনি উমেতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন। তিনি একজন পরিপূর্ণ শিক্ষক হয়ে ওঠেন এবং সকলের কাছে মাস্টারদা নামে পরিচিত হন। এই মাস্টারদা সূর্য সেন অম্বিকা চক্রবর্তী, অনুরুপ সেন, নগেন সেনর সহযোগিতায় একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। তার সংগঠন বিভিন্ন কৌশলে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান। এজন্য তিনি গ্রেফতারও হন। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তিনি ছাড়া পান। চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ মুক্ত করতে তিনি চট্টগ্রাম বিপ্লবী বাহিনী গড়ে তোলেন। এটি একটি আত্মঘাতী বাহিনী। পরে এ বাহিনীর নাম হয় "চিটাগাং রিপাবলিকান আমি"। সূর্য সেনের বিপ্লবী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার বিপুল বাহিনী প্রস্তুত করে। জালালাবাদ শহরে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে বিপ্লবীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এ অভিযানে অনেক বিপ্লবীরা নিহত হন।

সূর্য সেনের বিপ্লবীদেন মধ্যে নারী যোদ্ধারা ছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বিপ্লবীদের পরিকল্পনা ছিল ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করা। চট্টগ্রাম শহরের উত্তর দিকে পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে এই ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড় ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে নিচ্ছিদ্র প্রহরীর ব্যবস্থা ছিল। এই ক্লাবে একমাত্র শ্বেতাঙ্গ (ব্রিটিশ) ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। ক্লাবের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, "ডগ এন্ড ইন্ডিয়ান প্রহিবিটেড" ( কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)। নির্দিষ্ট দিনের (২৩ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩২ খ্রি.) আট দিন আগে পুরুষ বেশে কল্পনা দত্ত পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব বর্তায় একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার ওপর। ২৩ শে সেপ্টেম্বর আক্রমণের দিন প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবি, চুল ঢেকে রাখার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি, পায়ে রাবার সেলের জুতা। ইউরোপীয় ক্লাবের সামনে পাঞ্জাবিদের কোয়ার্টার থাকায় প্রীতিলতার পাঞ্জাবি ছেলেদের মতো এরূপ ছদ্মবেশ। আক্রমণে অংশ নেওয়া অন্যান্যদের মধ্যে কালী কিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তীর পোশাক ছিল ধুতি আর শার্ট। সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় ৪০ জন ব্রিটিশ সে দিন ক্লাবে উপস্থিত ছিল। রাত ১০টায় সাথিদের নিয়ে প্রীতিলতা পূর্ব গেইট দিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। হাতে ছিল রিভলবর ও বোমা। অন্ধকারে আক্রমণের এক পর্যায় এক ইংরেজের পিস্তলের গুলি এসে লাগে প্রীতিলতার বাম পাঁজরে। সে অবস্থায় আক্রমণ সমাপ্ত করে বেরিয়ে পড়েন। মারাত্মক আহত অবস্থায় সঙ্গীদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজে ধরা দেন এবং ধরা দেওয়ার পূর্বে পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে আতত্মহত্যা করেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি হয়ে আছেন।
সূর্য সেন ১৯৩৩ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে পালাতে সক্ষম হন। তাঁকে ধরার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ চট্টগ্রামের গৈরলায় ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সূর্য সেন ও ব্রজেন সেনকে গ্রেফতার করে। পরের দিন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশ হয়, "চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে ফেরারি সূর্য সেন গত রাতে পটিয়া হইতে ৫ মাইল দূরে গৈরলা নামক স্থানে গ্রেফতার হইয়াছে।" ১৯৩৪ সালে সংক্ষিপ্ত ট্রাইব্যুনালে বিচারে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। চরম নির্যাতনের পর ঐ বছরের ১২ই জানুয়ারি তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাঁর মৃতদেহ আত্মীয়স্বজনদের কাছে হস্তান্তর না করে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে বুকে লোহা বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। দেশপ্রেমিক সূর্য সেনের নাম ইতিহাসে চির অম্লান।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Reform Movements
পলাশীর যুদ্ধের পর বাঙালি জাতি এক চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে বাঙালি জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়। বাঙালি জাতির এ চরম দুর্দিনে আবির্ভাব ঘটে কয়েকজন মনীষীর। যারা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে অধঃপতনে নিমজ্জিত বাঙালি জাতির মধ্যে নবজাগরণের সৃষ্টি করে। আর এই নবজাগরণের ফলেই বাংলার মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে সনদ আইন এবং ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাতের মধ্য দিয়ে এর পরিপূর্ণ অগ্রগতি লক্ষ করা যায়।
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) [Raja Ram Mohan Roy (1772-1833 AD)]
বাংলা তথা ভারতে নবজাগরণের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অপরিসীম। তিনি ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মে হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমার রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামকান্ত রায় জমিদার এবং মাতা তারিনী দেবী গৃহিণী। বাল্যকালে ফারসি ও আরবি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি তিব্বত গিয়ে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তিনি এক ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। হিন্দুধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী সমালোচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন।
সমাজের সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের নিয়ে ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে 'আত্মীয় সভা' গঠন করে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায় প্রমুখ উক্ত সভায় যোগদান করেন। ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পৌত্তলিকতা সম্পর্কে বিতর্কে জয়লাভ করেন। 'একেশ্বরবাদ হিন্দুশাস্ত্রসম্মত এবং ধর্মের সঙ্গে মানবতাবাদ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত'- এই মত রাজা রামমোহন রায় ঘোষণা করেন।

পিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্রহ্মসভা স্থাপন করেন। ব্রহ্মসভার দ্বারা সকল একেশ্বরবাদীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের মাধ্যমে হিন্দু সমাজের অমানবিক বর্বর প্রথা 'সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন' পাস করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। নারী মুক্তির লক্ষ্যে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার, বিধবাদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন।
সমাজ সংস্কারের পক্ষে মতামত প্রকাশের জন্য তিনি "সংবাদ কৌমুদী" পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ১ লক্ষ টাকা পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে অনুরোধ করেন। এভাবে দেখা যায়, নবজাগরণের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাতি তারকা রামমোহনের প্রভাব রয়েছে। এ কারণে তাকে "আধুনিক ভারতের জনক" বলা হয়।
রবীঠাকুর তাকে 'ভারত পথিক' আখ্যায়িত করেছেন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে এ মহান ব্যক্তির মৃত্যু হয়
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১ খ্রি.) [Pandit Ishwar Chandra Vidyasagar (1820-1891 AD)]
রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর শুকিয়ে যাওয়া সমাজ সংস্কারের হাল ধরেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বিদ্যাসাগর নামেই পরিচিত। তিনি কলকাতার মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্রী ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার একজন দোকান কর্মচারী। মাতা ভগবতী দেবী। গ্রামের পাঠশালায় পাঠ সমাপ্ত করে আট বছর বয়সে গ্রামের বাড়ি থেকে পিতার সঙ্গে পদব্রজে কলকাতায় গমন করেন। সেখানে ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন সরকারি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজে একাদিক্রমে বারো বছর অধ্যয়নকালে ব্যাকরণ, কাব্য, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়, অলঙ্কার 'ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে এসব বিষয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি 'বিদ্যাসাগর' উপাধি লাভ করেন। অধ্যয়ন শেষে ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে হেড পণ্ডিত পদে যোগদান করেন। এখানে পাঁচ বছর তিন মাস অধ্যাপনা করার পর ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪
এপ্রিল সংস্কৃত কলেজে সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন। পরে এ কলেজে তিনি সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক পদ গ্রহণ করেন (১৮৫০)। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উক্ত কলেজের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি শিক্ষা আবশ্যককরণ সহ শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (১৮৫১), ব্যাকরণ কৌমুদীর ৪টি খণ্ড (১৮৫৩-১৮৬২), বর্ণ পরিচয় (১৮৫৫) প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য তাকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের গদ্য সাহিত্য ও ছন্দে মাধুর্যের অভাব ছিল। বিদ্যাসাগরের হাতেই বাংলা গদ্যের মুক্তি সূচিত। তাঁর অন্যতম সংস্কার বিধবা বিবাহ চালু (১৮৫৬), বহু বিবাহ প্রথা বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ। দান-দাক্ষিণ্যের জন্যও তার সমান খ্যাতি রয়েছে। প্রবাসী মাইকেল মধুসূদনও তাঁর দানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Sir Syed Ahmed Khan and Aligarh Movement (1817-1898 AD.)
ব্রিটিশ শাসিত ভারতে যেসব মনীষী ও সমাজ সংস্কারক অধঃপতিত পশ্চাৎপদ মুসলমানদের অজ্ঞতা, অশিক্ষা, সামাজিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ খান অন্যতম। ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। লেখাপড়ায় তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। তিনি কোনো ইংরেজি শিক্ষা লাভও করেননি। মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছেন। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পড়াশুনা ত্যাগ করে কোম্পানির চাকরি গ্রহণ করেন। ১৮৪১-১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ফতেপুর সিক্রির মুন্সেফ বা সাব জজ পদে নিয়োগ পান। এই আট বছর তিনি ব্যাপক পড়াশুনা করেন। কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, উপমহাদেশে মুসলমানদের অধঃপতনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার বিকল্প নেই। এ কারণেই তিনি আলীগড়কে কেন্দ্র করে সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু করেন।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান একান্তভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মুসলমানদের দুর্দশার প্রধান কারণ দুটি। (১) পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি ঘৃণা ও (২) মুসলমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামি। ইংরেজরা মোগল তথা মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল সে কারণে মুসলমানরা ব্রিটিশদের প্রতি রুষ্ট। ইংরেজদের ধারণাও ছিল, ব্রিটিশ বিরোধী সকল আন্দোলন বিশেষ করে ওহাবি, ফরায়েজি এবং ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহের ইন্দনদাতা হচ্ছে মুসলমানরা। অপরদিকে মুসলমানদেরও ধর্মীয় কারণে ইংরেজদের পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণার ভাব ছিল। এর ফলে ব্রিটিশরা হিন্দু তোষণনীতি গ্রহণ করে। মুসলমানদের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। এই সুযোগে হিন্দুরা ইংরেজদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যায়। প্রশাসনের উচ্চ পদগুলোতে হিন্দুরা চাকরি গ্রহণ করে উন্নত জীবনের অধিকারী হয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রেই হিন্দুরা এগিয়ে যায় আর মুসলমানরা থাকে পিছিয়ে। মুসলমানদের এরূপ চরম দুর্দিনে ত্রাণকর্তারূপে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আবির্ভাব।
স্যার সৈয়দ আহমদ খানের কর্মকাণ্ড: মুসলমানদের অজ্ঞতা দূরীভূত করতে প্রথমে তিনি মুসলমানদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ ও ইংরেজ শাসকদের সাথে সহযোগিতা করার উপদেশ দেন। সিপাহি বিপ্লবে মুসলমানরা দায়ী ইংরেজদের এরূপ বদ্ধমূল ধারণা থেকে বের করে নিয়ে আসতে তিনি দুখানা বই লিখেন- (১) সিপাহী বিদ্রোহের কারণ (২) ভারতের রাজভক্ত মুসলমান।
ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর ভারতের গাজীপুরে একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজি বই অনুবাদ করার জন্য তিনি 'বিজ্ঞান সমিতি' নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। পাশ্চাত্যের ভাবাদর্শ ও শিক্ষা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য তিনি বিলেতে ভ্রমণ করেন এবং দেশে ফিরে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে 'তাহজীবুল আখলাক' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি তিনি 'ভারতীয় মুসলমানদের শিক্ষা উন্নয়ন সমিতি' নামে একটি সংস্থা গঠন করেন। তিনি কংগ্রেসী আন্দোলনকে 'অস্ত্রহীন গৃহযুদ্ধ' বলে বর্ণনা করে মুসলমানদের কংগ্রেস থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার '১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তাকে 'নাইট' উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পরলোকগমন করেন।
আলীগড় আন্দোলন (Aligarh movement)
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলে পাক-ভারতের মুসলমানদের জীবনে নেমে আসে দুর্যোগের ঘনঘটা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় মুসলমানদের সামাজিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা মোকাবিলা করে অধঃপতিত মুসলমানদের মর্যাদা সহকারে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ খান আলীগড়কে কেন্দ্র করে যে সংস্কারমূলক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তাই ইতিহাসে 'আলীগড় আন্দোলন' নামে পরিচিত। স্যার সৈয়দ আহমদ খান সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন আলীগড়কে কেন্দ্র করে।
ইংরেজরা মুসলমানদের নিকট থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তাই ইংরেজরা মুসলমানদের শাসন ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ও দাবিদার মনে করত। অন্যদিকে, মুসলমানরাও ইংরেজদের শত্রু মনে করত। ফলে উভয়ের মধ্যে অসহযোগিতা চলতে থাকে। এ সুযোগে হিন্দুরা ইংরেজদের সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে থাকে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান বাস্তব দৃষ্টিতে উপলব্ধি করলেন ইংরেজ-মুসলিম সু-সম্পর্ক স্থাপনই অধঃপতিত মুসলমানদের উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত।
আলীগড় আন্দোলনের লক্ষ্য: অধঃপতিত মুসলমানদের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা ও ভালো সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে আলীগড় আন্দোলন নিম্নবর্ণিত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে:
১। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অশিক্ষা, অজ্ঞতা এবং অধঃপতনের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করা।
২। মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশদের সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান করা।
৩। মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলন করা।
৪। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মুসলমানদের হিন্দুদের সমকক্ষ করে তোলা।
৫। মসলমানদের বিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের অনকল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
উপরিউক্ত লক্ষ্যার্জনের জন্য আলীগড় আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। নিম্নে এসকল কর্মসূচির সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রদান করা হলো-
১। তিনি The Loyal Mohammadans of India এবং The Causes of India Mutiny নামক গ্রন্থ প্রকাশ করে ইংরেজ ও মুসলমানদের মধ্যকার ভুল বুঝাবুঝির অবসানের চেষ্টা করেন এবং সিপাহি বিপ্লবের প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের আক্রোশ ও বিদ্বেষভাব দূর করার চেষ্টা করেন।
২। ১৮৬৪ সালে তিনি Scientific Society বা বিজ্ঞান সমিতি প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থাবলি অনুবাদের ব্যবস্থা করেন; যা পরবর্তীতে Literary and Scientific Society নামে পরিচিত হয়। এটি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচারের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
৩। মুসলমানদের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি 'তাহযিব উল আখলাক' পত্রিকা প্রকাশ করেন (Publication of the Tahzib-Ul-Akhlaov)। মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, নারী শিক্ষার উদাসীনতা প্রভৃতির কঠোর সমালোচনা পত্রিকার মাধ্যমে করা হয়।
৪। তিনি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে 'ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা উন্নয়ন সমিতি' (Society of Educational Progress of Indian Muslims) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতির মাধ্যমেই ১৮৭৫ সালের মে মাসে "Mohammadan Anglo Oriental College' স্থাপিত হয়। ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আলীগড় কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে এটি 'আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে' উপনীত হয়। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষা তথা পাশ্চাত্য শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে এ সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫। মুসলমানদের মধ্যে উন্নত চিন্তাধারা, ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি এবং গোঁড়ামি দূর করার লক্ষ্যে তিনি ১৮৮৬ সালে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' (Mohammadan Literary Society) গঠন করেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা হয়।
উল্লিখিত কার্যাবলি ছাড়াও আলীগড় আন্দোলন কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে। এ সকল পত্রিকার মধ্যে "ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন" এবং "আলীগড় ইনস্টিটিউট গেজেট" অন্যতম। এ সকল পত্রিকা একই সাথে উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হওয়ায় ব্রিটিশদের শাসন সম্পর্কে এদেশবাসী জানার সুযোগ লাভ করে।
আলীগড় আন্দোলনের প্রভাব (Impact of Aligarh movement)
অধিকার বঞ্চিত ও হতাশাগ্রস্ত মুসলিম সমাজে আলীগড় আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আলীগড় আন্দোলন মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়ে স্বাধিকার সংগ্রামে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করে। মুসলমানদের পৃথক ও একক স্বাধীন সত্তা লাভের পটভূমি রচনা করেছিল আলীগড় আন্দোলন। আলীগড় আন্দোলনের মাধ্যমে উদারপন্থী রাজনৈতিক নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান কতিপয় যে বাস্তবমুখী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তাতে ইংরেজ ও মুসলমানদের অনেক ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটে এবং ইংরেজ ও মুসলমানদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল সেক্ষেত্রে আলীগড় আন্দোলনের প্রভাব অপরিসীম।
আলীগড় আন্দোলনের অনুকরণেই এ সময় আরও কতিপয় মনীষী মুসলিম সমাজে নবজাগরণের সৃষ্টি করেন। এদের মধ্যে নওয়াব আবদুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলী অন্যতম।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Nawab Abdul Latif (1828-1891 AD.)
অধঃপতনে নিমজ্জিত বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়কে পুনরুদ্ধারে বাংলার ভাগ্যাকাশে যে সকল নেতাদের আবির্ভাব ঘটে তাদের মধ্যে নওয়াব আবদুল লতিফ এবং সৈয়দ আমির আলী অন্যতম। মুসলমান পুনর্জাগরণের অগ্রদূত আঃ লতিফ ফরিদপুর জেলার রাজপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু এবং শিক্ষকতা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ লাভ করেন। বিভিন্ন পদে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য 'খান বাহাদুর' (১৮৮৭), 'নওয়াব' (১৮৮০) উপাধিতে ভূষিত হন। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম মুসলিম হিসেবে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। 'মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি' বা মুসলিম সাহিত্য সমাজ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার ওপর জোর দেন। ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, "যদি ভারতে কোন ভাষা শিক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনকে উন্নত করতে পারে তবে তা হল ইংরেজি ভাষা।" মুসলিম পুনর্জাগরণের এই পথিকৃৎ ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে পরলোকগমন করেন।

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Sayid Amir Ali (1849-1928 AD.)
মুসলমান সমাজের ত্রাণকর্তা নওয়াব আবদুল লতিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ আমীর আলী হুগলী জেলার চুঁচুড়া শহরে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ সাদ আলী ছিলেন একজন ঔষধ ব্যবসায়ী। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। কৃতিত্বের সহিত এন্ট্রান্স পাস করে হুগলী কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ এবং ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে এম. এ ডিগ্রি লাভকরেন। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে লিঙ্কসন ইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় আরম্ভ করেন। ১৮৭৭ সালে কলকাতায় Central National Mohammadan Association গঠন করেন। ১৮৯০-১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯০৯-১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমৃত্যু লন্ডনে প্রিপি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। স্যার সৈয়দ আমীর l

আলীও নওয়াব আবদুল লতিফের ন্যায় মনে করতেন একমাত্র ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমেই মুসলমানদের ভাগ্যের উন্নয়ন সম্ভব। তিনি শিক্ষার পাশাপাশি মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণে উদ্বুদ্ধ করেন। The Spirit of Islam এবং A Short History of the Saracens গ্রন্থ রচনা করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় তিনি মুসলমানদের উজ্জীবিত করেন। মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবি উত্থাপন করেন। মুসলমানদের গৌরবময় ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সৈয়দ আমীর আলীকে ইসলামি রেনেসার অন্যতম অগ্রদূত বলা হয়। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ আগস্ট লন্ডনে তিনি পরলোকগমন করেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Indian National Congress
"১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়"- আর সি মজুমদার।
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি
ব্রিটিশ শাসননীতির বিরুদ্ধে শিক্ষিত ভারতবাসীর মধ্যে ক্রমশ ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে থাকে, যা ক্রমশ জাতীয় চেতনায় রূপ নেয়। আর এ চেতনা থেকে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এর পূর্বে ও পরে ছোটখাটো অনেক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি'। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে স্যার সৈয়দ আহমদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন'। এই অ্যাসোসিয়েশনকে জাতীয় কংগ্রেসের পূর্বসূরী হিসেবে গণ্য করা হয়। এসকল সমিতি শিক্ষিত অভিজাত ও জমিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো বিধায় মধ্যবিত্ত বা সাধারণ জনগণ এর ধারেকাছে যেতে পারত না। যার ফলে এসকল সমিতির সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের অনুকরণে মুম্বাইয়েও সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে 'ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন' বা ভারত সভা নামে আর একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠনটি শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সংগঠনে পরিণত হয়। এ সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, রাজনৈতিক সচেতনতার সৃষ্টি হয় এবং চাকরিসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়সসীমা একুশ থেকে নামিয়ে উনিশে আনা হলে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আগ্রা, দিল্লি, আলীগড়, লাহোর, কানপুর, বেনারস ও অমৃতসরসহ ভারতে বিভিন্ন প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রতিবাদ সভা হয়। এ আন্দোলন যখন চলমান তখন ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার 'ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট' জারি করে দেশীয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা করলে এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন শুরু হয়। এসব অসন্তোষের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ইলবার্ট বিল নিয়ে শুরু হয় আর এক বিতর্ক। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে এক আইন বলে ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয় কোনো নাগরিকদের বিচার করতে পারত না। এ বৈষম্য দূর করার জন্য লর্ড লিটন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হয়ে (১৮৭৬-১৮৮০) আইন সদস্য মি. ইলবার্টের মাধ্যমে একটি বিল তৈরি করেন। যে বিলে ইউরোপীয় নাগরিকদের বিচার করার এখতিয়ার ভারতীয় বিচারকদের দেওয়া হয়। এই বিলের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে অবস্থানরত ইউরোপীয় নাগরিকরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভের মুখে এ বিলের কিছুটা সংস্কার করে বিচারকার্যে জুরির ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে অর্ধেক বিচারক ইউরোপীয় থাকবে। ভারতবর্ষের মাটিতে ইউরোপীয়দের বিক্ষোভভারতীয়দের মর্যাদায় আঘাত হানে। এমতাবস্থায় ভারতবাসী সর্বভারতীয় একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা একান্তভাবে উপলব্ধি করে। পূর্বের আন্দোলনের সাথে এ উপলব্ধি নতুন করে যুক্ত হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার কিছুটা চাপের মুখে পড়ে। এজন্য ভারতীয়দের দাবি ও আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করা এবং ভারতীয়দের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য মনোযোগী হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম-এর উদ্যোগে এবং ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সহযোগিতায় ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাই
শহরে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস) প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে একথাও সত্য যে, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক আহুত ভারতীয় জাতীয় সম্মেলনে - জাতীয় কংগ্রেস গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। ভারতীয় শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে শাসনতান্ত্রিক পথে পরিচালনা করার জন্য ইংরেজ আমলা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন জবরদস্ত ইন্ডিয়ান সিভিল সার্জন (আই.সি.এস কর্মকর্তা)। তিনি ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি নিযুক্ত হন ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। তিনি একনাগাড়ে ২৫ বছর সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ
ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয়দের দাবি-দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে প্রথম রাজনৈতিক দল হচ্ছে জাতীয় কংগ্রেস। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ হলো-
প্রথমত, ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করা। আই.সি.এস কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় হিউম তার অভিজ্ঞতা দ্বারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতে এক বড় ধরনের বিদ্রোহ আসন্ন। সুতরাং তিনি ভারতীয়দের অসন্তোষ প্রশমিত করার লক্ষ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের নিকট লিখিত এক পত্রে একটি স্থায়ী সংস্থা গঠনের উপদেশ দেন।
দ্বিতীয়ত, ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণের পর তিনি ভারতীয়দের স্বার্থ আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী হন।
তৃতীয়ত, সর্বোপরি তদানীন্তন ভারতের বড় লাট লর্ড ডাফরিনও এ সময় ভারত সরকারের সমালোচনার জন্য একটি বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
এভাবে ডাফরিন ও হিউম-এর যৌথ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টায় ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাই শহরে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয় কংগ্রেসের উদ্দেশ্য
মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কলকাতার খ্যাতনামা ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কংগ্রেসের ৪টি মূল উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করেন-
১। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে যোগসূত্র এবং সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা।
২। পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতা দূর করে জাতীয় ঐক্যের পথ প্রশস্ত করা।
৩। শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আলাপ-আলোচনার দ্বারা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলি চিহ্নিত করে তার সমাধানের পথ নির্ধারণ করা। এবং
৪। আগামী এক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা।
জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছিল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সংগঠন। দাদাভাই নওরোজী, গোপালকৃষ্ণ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বদরউদ্দীন তৈয়াবজী প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে দাদাভাই নওরোজীর সভাপতিত্বে দ্বিতীয় এবং ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বদরউদ্দীন তৈয়াবজীর সভাপতিত্বে তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়ে ব্রিটিশ সরকারের নিকট দাবি-দাওয়া উত্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ প্রতিষ্ঠান ভারতীয় অ্যাকটের বিলুপ্তিসাধন এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সভাগুলোতে সংস্কার ও সম্প্রসারণ দাবি সর্বোপরি কংগ্রেসের জনপ্রিয়তায় ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিরূপ মনোভাব গ্রহণ করেন। পর্যায়ক্রমে এতে চরমপন্থিদের অনুপ্রবেশ ঘটলে এ সংগঠন বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে। বিপিন চন্দ্র পাল, মতিলাল ঘোষ, বালগঙ্গাধর তিলক, লাল লাজপক্ষ রাও প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠলে মুসলমান নেতৃবৃন্দ হতাশ হয়ে পড়েন। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ২০ বছরের মধ্যে মুসলমানদের দাবি উপেক্ষিত বলে এতদিনে মুসলমানদের ঘুম ভাঙে। তারা অনুভব করল যে, কংগ্রেস মুসলমানদের সংগঠন নয় ও মুসলমানদের দাবির প্রতিও কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় লোকেরা শ্রদ্ধাশীল নয়। কংগ্রেসের কার্যক্রমে ব্রিটিশ সরকারও সন্তুষ্ট নয়। এখানে তারা ভেদাভেদনীতির সূত্র আবিষ্কার করে। মূলত কংগ্রেস নেতাদের কার্যকলাপে শঙ্কিত হয়ে কংগ্রেস আন্দোলনের মূলোচ্ছেদ করতে ব্রিটিশ সরকার সচেষ্ট হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Muslim League-1906
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি
১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট মুসলমানদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এমতাবস্থায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধীয় হিন্দু সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট করার জন্য ভারত সচিব লর্ড মর্লি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক বক্তৃতায় ভারতের আইন পরিষদে আরও প্রতিনিধি বৃদ্ধির ইঙ্গিত প্রদান করেন। এতে মুসলমানরা বিচলিত হয়ে পড়ে। অতঃপর আলীগড়পন্থি মুসলিম নেতা মহসিন উল-মূলকের নেতৃত্বে বড়লাটের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেন এবং একটি স্মারকলিপি প্রণয়ন করেন। মহামান্য আগাখানের নেতৃত্বে ৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় বড় লাট মিন্টোর সাথে সিমলায় সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের স্বার্থ সংবলিত স্মারকলিপিটি পেশ করেন। এরই প্রেক্ষিতে বড়লাট আশ্বাস দিয়ে বলেন, ভারত শাসন সংস্কার প্রবর্তিত হলে মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষা করা হবে। এ ঘটনা ইতিহাসে বিখ্যাত সিমলা ডেপুটেশন নামে পরিচিত। সিমলা ডেপুটেশনের অন্যতম দাবি ছিল, (১) কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদে এবং লোকাল বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি, জেলা বোর্ড ইত্যাদিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আসন সংরক্ষণ (২) স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথার প্রবর্তন (৩) স্বতন্ত্র মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। বড়লাট মুসলমানদের দাবিগুলো সহানুভূতির সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন। এতে মুসলমানদের নেতৃবৃন্দ ভীষণভাবে উৎসাহিত হন। হিন্দু নেতৃবৃন্দ এ ডেপুটেশনের তীব্র নিন্দা করে (১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনে পৃথক নির্বাচনের দাবি স্বীকৃত হলে সিমলা ডেপুটেশনের সফলতা বাস্তবে পরিণত হয়)।
হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কংগ্রেসের কিছু সংখ্যক নেতার সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে বালগঙ্গাধর তিলকের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণায় মুসলমানরা হতাশ হয়। তারা উপলব্ধি করতে থাকে, কংগ্রেসের মাধ্যমে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা হবে না। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের গণআন্দোলন ও মুসলমানদের জন্য পৃথক সংগঠনের প্রয়োজন একান্তভাবে অনুভব হয়। সর্বোপরি সিমলা ডেপুটেশনে লর্ড মিন্টোর আশ্বাসে মুসলমানরা উৎসাহিত হন। এ পরিস্থিতিতে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ঢাকায় 'নিখিল ভারত মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স' আহ্বান করেন। উক্ত কনফারেন্সে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। কনফারেন্সে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ প্রস্তাব করেন যে, যেহেতু ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, সেহেতু এ সভায় নিখিল ভারত মুসলিম সম্মেলন নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠন সম্পর্কে বিবেচনা করা হোক। মহসিন-উল-মূলক, এ.কে. ফজলুল হক, হাকিম আজমল, মওলানা মুহম্মদ আলি, মিয়া মোহাম্মদ সফি প্রমুখ বিশিষ্ট নেতৃবর্গ নবাব স্যার সলিমুল্লাহর প্রস্তাব সমর্থন করেন। তদনুযায়ী ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের নিজস্ব স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং এর নামকরণ হয় 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ' যা সাধারণত মুসলিম লীগ নামেই পরিচিত।
মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য
মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে ৩টি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়-
১। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আনুগত্যবোধ গড়ে তোলা এবং সরকার ও মুসলমানদের মধ্যে সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান করা।
২। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং সরকারের নিকট তা ব্যক্ত করা।
৩। এসব উদ্দেশ্য কোনো মতে ক্ষুণ্ণ না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা।
'সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের' প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মহামান্য আগাখান এবং যুগ্ম সম্পাদক হন যথাক্রমে নওয়াব মহসিন-উল-মূলক ও নওয়াব ভিখার-উল-মূলক।
বঙ্গভঙ্গ রদে হিন্দুদের অনমনীয়তা মুসলিম লীগকে মর্যাদার লড়াইয়ে অবতীর্ণ করে। বঙ্গভঙ্গ রদ রোধ করতে ১৯১০ এর পূর্বে মুসলিম লীগ ৪টি অধিবেশনে মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তন্মধ্যে আদালতসমূহে বিচারক নিয়োগ, চাকরিতে ন্যায্য অধিকার ও কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদসহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের জনসংখ্যানুপাতে আসন এবং তা মুসলমানদের দ্বারা স্বতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণের ব্যবস্থাসহ মুসলমানদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব দিয়ে মুসলমানদের শিক্ষা অর্জনের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলা হয়।
সিদ্ধান্ত আকারে গৃহীত সকল বিষয়াদি কার্যসূচির আওতায় নিয়ে এসে মুসলিম লীগ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে অচিরেই সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রাণের সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মুসলিম লীগ মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে ইংরেজদের সঙ্গে দরকষাকষি করে। ফলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মলাভ করে।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Morley-Minto Reform-1909
ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যে কিস্তিবন্দী শাসন সংস্কার প্রবর্তন করেন তার একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ হচ্ছে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন। যেহেতু এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভারত সচিব লর্ড মর্লি এবং বড় লাট লর্ড মিন্টোর মুখ্য ভূমিকা ছিল, সেহেতু তাদের নামানুসারে এই আইন 'মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন' নামে পরিচিত। এ আইন প্রণয়নের প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায়-
১। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয়দের দাবির প্রতি ব্রিটিশ সরকারের নমনীয় নীতি।
২। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের আইনে ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না হওয়া।
৩। ১৯০৯ সালের সিমলা ডেপুটেশন এবং কংগ্রেস দলের প্রত্যাশা পূরণ।
৪। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বয়কট, স্বদেশী ও বৈপ্লবিক আন্দোলনের তিব্রতা।
৫। ইংল্যান্ডে উদারনৈতিক দলের মন্ত্রিসভা গঠন।
ধারাসমূহ:
এ আইনের ধারাসমূহ নিম্নরূপ:
১। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বৃদ্ধি করে ৬৯ করা হয়। ৩৭ জন সরকারি ও ৩২ জন বেসরকারি হবে স্থির হয়। ৩২ জন বেসরকারির মধ্যে ২৭ জন নির্বাচিত বাকি ৫ জন গভর্নর জেনারেল কর্তৃক মনোনীত হবেন।
২। এ আইনে আইন পরিষদগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। পরিষদের সদস্যদের বাজেট সম্পর্কে আলোচনা, প্রস্তাব উত্থাপন করার এবং আলোচনা করার অধিকার দেওয়া হয়। অবশ্য প্রস্তাবগুলো মনঃপূত না হলে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
৩। এ আইনের দ্বারা মুম্বাই, মাদ্রাজ ও বাংলার শাসন পরিষদের সদস্য ৪ জন করা হয়।
৪। এ আইনে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নেওয়া হয়।
৫। এ আইনে সর্বপ্রথম বড়লাটের শাসন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয় ।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Lucknow Pact-1916
ভারতীয় উপমহাদেশে দুই বিরোধমান হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের ক্ষেত্রে ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। ব্রিটিশদের নির্যাতনমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে স্বাধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একমত হলে লক্ষ্ণৌ শহরে ১৯১৬ সালে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তাই ইতিহাসে লক্ষ্ণৌ চুক্তি নামে পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের মডারেট নেতারা ব্রিটিশদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে এই আশায় যে, এই সাহায্যের বিনিময়ে ব্রিটিশ সরকার ভারতকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিবে।
লক্ষ্ণৌ চুক্তির পূর্বেও ব্রিটিশদের কাছ থেকে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যের বহু প্রচেষ্টা চলছিল। ১৯১১ সালে মহামান্য আগাখানের নেতৃত্বে এলাহাবাদে একটি মুসলিম প্রতিনিধি দল হিন্দুদের সাথে আলোচনা করে ব্যর্থ হয়। ১৯১৩ সালে কায়দে আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগদান করলে এবং ১৯১৫ সালে লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দ্বার উন্মোচন হয়। কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে এই ধারণা জন্মে যে, ব্রিটিশদের কাছ থেকে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের মধ্যকার সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে হবে। তা না হলে ভারতবাসীর দাবি-দাওয়া কোনো দিনই পূরণ হবে না।
এমনই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য কংগ্রেসের সাথে আপস প্রস্তাবে ব্যর্থ হয়। অপরদিকে, কংগ্রেস নেতা বালগঙ্গাধরতিলক মুসলিম লীগের সঙ্গে আপস দ্বারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজি হয়। ফলে ১৯১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর লক্ষ্ণৌ শহরে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের এক যৌথ অধিবেশনে বসে। এই যৌথ অধিবেশনে কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে সম্প্রীতি ও সমঝোতা স্মারক লক্ষ্ণৌ চুক্তি ১৯১৬ সম্পন্ন হয়।
ধারাসমূহ (Provision of the act)
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর লক্ষ্ণৌ শহরে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ বার্ষিক সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সময় উভয় দলের নেতারা ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ চুক্তি প্রণয়ন করেন; যা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সমঝোতার মূল্যবান দলিল । এ চুক্তির প্রধান দিকসমূহ হলো-
১। প্রাদেশিক আইনসভাগুলোতে সদস্যদের অংশ নির্বাচিত, অংশ মনোনীত হবে।
২। প্রধান প্রদেশগুলোর আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১২৫ জন এবং ছোট প্রদেশগুলোর আইনসভার সদস্য সংখ্যা ৪০ থেকে ৭৫ জন হবে।
৩। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস সম্মিলিতভাবে ভারতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে।
৪। প্রাদেশিক আইন পরিষদে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা কংগ্রেস স্বীকার করে নিবে।
৫। যে যে প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সে প্রদেশে তারা জনসংখ্যা অনুপাতে প্রাপ্য আসন অপেক্ষা অধিক আসন এবং সংখ্যাগুরু প্রদেশে অনুপাত অপেক্ষা কম আসন লাভ করবে। মোট নির্বাচিত সদস্যের পাঞ্জাব ৫০%, যুক্ত প্রদেশ ৩০%, বাংলাদেশ ৪০%, বিহার ২৫%, মধ্য প্রদেশ ১৫%, মাদ্রাজ ১৫% এবং মুম্বাই ৩৩%। শর্ত থাকে যে, এসব নির্ধারিত আসন ছাড়া মুসলমানরা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অন্য কোনো আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
৬। যুদ্ধ, সামরিক, বৈদেশিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি পরিচালনা, শান্তি স্থাপন ও সন্ধিতে আবদ্ধ হওয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার আইনসভার থাকবে না।
৭। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস পৃথক নির্বাচন মেনে নিবে।
গুরুত্ব (Importance)
ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে ৮ বছর স্থায়ী লক্ষ্ণৌ চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম-
১। লক্ষ্ণৌ চুক্তি হিন্দু ও মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটাই হচ্ছে ভারতের জন্য একটি সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়নের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। এর ফলেই হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে ব্রিটিশদের নিকট নিজেদের দাবি-দাওয়া পেশ করার সুযোগ হয়। এই চুক্তির ফলেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন অনেক দূরে এগিয়ে যায়।
২। মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন মেনে নেওয়া হয়। কংগ্রেস মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়। এই চুক্তিতে মুসলমানদের ৩টি সুবিধা হয়- (ক) বিভিন্ন আইনসভায় স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার (খ) মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশে তাদের ওপর গুরুত্ব আরোপ (গ) যেকোনো আইন পরিষদে মুসলমান সদস্যের অংশ কোনো বিলের ব্যাপারে আপত্তি জানালে সে বিল পাস না হওয়া। ৩ 8
৩। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কংগ্রেস মুসলমানদের সমর্থন পাওয়ায় কংগ্রেসের আন্দোলন আরও জোরদার হয়।
৪। লক্ষ্ণৌ চুক্তির অনেক নীতি ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে কিছু রদবদল সহকারে রূপদান করা হয়। এই চুক্তির সূত্র ধরে হিন্দু-মুসলিম সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সংঘটিত হয়।
৫। লক্ষ্ণৌ চুক্তি ৮ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এই স্বল্প সময় হলেও হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
৬। ১৯১৯ সালের মন্টেগু চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইন এবং ১৯৫৩ সালের ভারত শাসন আইন লক্ষ্ণৌ চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়। খালেকুজ্জামান বলেছেন, "লক্ষ্ণৌ চুক্তি হওয়ার ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।"
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Term of the Mont-Ford Reform-1919
১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন উপমহাদেশের জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। অতঃপর ভারত সচিব মন্টেগু ও বড়লাট চেমসফোর্ড-এর যৌথ উদ্যোগে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি সংস্কার আইন প্রণয়ন করা হয়। তাদের নামানুসারে এই সংস্কার আইনের নাম হয় মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন।
উদ্দেশ্য
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সচিব মন্টেগু ও বড়লাট চেমসফোর্ড কর্তৃক এ সংস্কার আইন প্রণয়নের কতগুলো উদ্দেশ্য ছিল। এ আইনের উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ-
১। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আইনের ত্রুটি: ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কার আইনে ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূরণ করা সম্ভব হয়নি, ভারতীয়দের বিক্ষোভের অবসানও ঘটাতে পারেনি। এই আইনে মুসলমানদের পৃথক সদস্য নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হলে কংগ্রেস প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
২। বঙ্গভঙ্গ রদ: ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করলে মুসলমানরা হতাশাগ্রস্ত হয়। ফলে উভয় জাতি ব্রিটিশ শাসনের প্রতি হয়ে
পড়ে ভীতশ্রদ্ধ।
৩। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ড জড়িয়ে পড়লে যুদ্ধ জয়ের জন্য উপমহাদেশের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ আইনের মাধ্যমে উপমহাদেশের অধিবাসীদের ব্রিটিশদের পক্ষে নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
৪। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের লক্ষ্ণৌ চুক্তি: এ চুক্তির ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপিত হলে ব্রিটিশ সরকারের ভেদ নীতি অচল হয়ে পড়ে। এই সময় ব্রিটিশ সরকার তুর্কি-ইতালি যুদ্ধে ইতালির পক্ষ নিলে মুসলিম জগতে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা উপলব্ধি করল, শীঘ্রই একটি ঘোষণা দ্বারা ভারতবাসীকে আশ্বস্ত করা দরকার। তারই একটি কার্যকরী উদ্যোগ ছিল মন্ট-ফোর্ট সংস্কার আইন-১৯১৯।
ধারাসমূহ
মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের প্রধান প্রধান ধারাসমূহ নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো-
১। ধাপে ধাপে ভারতে দায়িত্বশীল সরকার গঠন করা হবে। এই উদ্দেশ্যে আপাতত প্রশাসনের বিভিন্ন শাখায় ভারতীয়দের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে।
২। বিলাতে হাই কমিশনের পদ সৃষ্টি করে তার হাতে ভারত সচিবের কাজের কিছু দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়।
৩। ভারত সচিবের ক্ষমতা বাড়িয়ে ভারত সরকারের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করা হয়।
৪। বড়লাটের শাসন পরিষদের ৮ জন সদস্যদের মধ্যে ৩ জনকে ভারতীয় সদস্য হিসেবে বড়লাট মনোনয়নের অধিকার পান। এই সদস্যদের হাতে আইন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৫। এই আইনে সর্বপ্রথম ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
৬। কেন্দ্রে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদ গঠিত হয়। উচ্চ কক্ষের নাম হয় Council of State (রাষ্ট্র পরিষদ) এবং নিম্ন কক্ষের নাম হয় Legislative Asembly (ব্যবস্থাপকের সভা/আইন পর্ষদ)।
৭। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের কার্যকাল ৩ বছর এবং ব্যবস্থাপক পরিষদের কার্যকাল ৫ বছর করা হয়। ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আইনসভায় ভোট দানের অধিকার দেওয়া হয়।
৮। মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়। ক্ষেত্র বিশেষ শিখ, ইউরোপীয় অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও ভারতীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যেও সম্প্রসারণ করা হয়।
৯। এ আইনে দ্বৈতশাসন প্রবর্তন একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়াদিকে সংরক্ষিত এবং হস্তান্তরিত এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
১০। প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে বাংলায় ১৪০, মাদ্রাজে ১৩২, মুম্বাই ১৪৪, উত্তর প্রদেশে ১২৩ জন করা হয়। সদস্যদের মধ্যে অন্তত ৭০% নির্বাচিত হবেন। সরকারি কর্মচারী ২০% বাকি ১০% বেসরকারি মনোনীত।
১৯১৯ সালে মন্ট-ফোর্ড সংস্কার আইন ভারতীয় জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এ আইনটি মধ্যপন্থী এবং অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছাড়া সকল ভারতীয়দের মধ্যে গভীর অসন্তোষ এবং হতাশার সৃষ্টি করে। মিসেস বেশান্ত এ আইন সম্পর্কে তার 'New India' বইতে মন্তব্য করেন, The Scheme was Ungenerous for England to after and unworthy for Indian to accept. বালগঙ্গাধর তিলক এ আইন সম্পর্কে বলেছেন, "আইনটি একটি সূর্যলোকহীন প্রভাতের সৃষ্টি করে।" অবশ্য অধ্যাপক জি.এন সিং মন্তব্য করেছেন, The Constituted the first step on the road to self government. এ আইন ভারতীয়দের কতটুকু সন্তুষ্ট করেছিল সে প্রশ্নের মীমাংসা করতে হলে এই আইনের দোষ ও গুণ আলোচনা করতে হবে-
দোষসমূহ
মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের যথেষ্ট ত্রুটি লক্ষ করা যায়। যেমন-
১। কেন্দ্রে কোনো দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভার ব্যবস্থা এই আইনে ছিল না। বড়লাটের শাসন পরিষদের ৩ জন ভারতীয় সদস্যদের তিনি মনোনয়ন করায় তারা তার অনুগত হয়ে কাজ করেন। এই সদস্যদের ওপর কেন্দ্রীয় আইনসভার কোনো এখতিয়ার ছিল না।
২। বড়লাটের হাতে এত বেশি জরুরি ক্ষমতা দেওয়া হয় যে, এই ক্ষমতার জোরে তিনি আইনসভার সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য
করতে পারতেন। কোনো আইন প্রস্তাব আইনসভা নাকচ করলে তিনি অর্ডিন্যান্স ও সার্টিফিকেটের জোরে তা বৈধ করে নিতেন। সদস্যদের আলোচনার অধিকারও তিনি সীমাবদ্ধ করতে পারতেন।
৩। কেন্দ্রীয় আইনসভায় একমাত্র ধনবান লোকেরাই ভোট দিতে পারত। সুতরাং কেন্দ্রীয় আইনসভা প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভিত্তিতে গঠিত হয়নি।
৪। প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে আইন প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইন পরিষদের কোনো ক্ষমতা ছিল না। বাজেটের ৬০%-এর ওপর কোনো ভোটাভুটি করা চলত না। ৪০%-এর ওপর আইনসভা পাস না করলেও বড়লাট পাস করে নিতে পারতেন।
৫। কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে দপ্তর বণ্টনের সময় কেন্দ্রকে সিংহভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো দেওয়া হয়; যা ছিল খুব ত্রুটিপূর্ণ।
গুণসমূহ
মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের গুণ হিসেবে বলা যায়-
সম্প্রসারণ করা হয়। প্রথমত, এই আইন দ্বারা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের প্রথা প্রবর্তিত হয় এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণ।
দ্বিতীয়ত, আইনসভার নিকট দায়ী মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। যার মাধ্যমে দায়িত্বশীল সরকারের সূচনা হয়েছিল।
তৃতীয়ত, এই আইনের বলে জনসাধারণ রাজনৈতিক ও শাসন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়। টম্পসন ও গ্যারাটিও বলেছেন, "প্রদেশে ভারতীয়দের মন্ত্রী নিয়োগ করে সরকারের ভারতীয় করণের পথ প্রশস্ত করা হয়।"
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এই আইনের কাছ থেকে ভারতীয় জনগণ যতটুকু সাফল্য আশা করেছিল তা পূরণ হয়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, যখনই ব্রিটিশ সরকার কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে তখনই একটা সংস্কারের অজুহাত নিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কার আইন যে ভারতীয়দের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি তার বড় প্রমাণ ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত শাসন আইনের প্রয়োজনীয়তা। কংগ্রেসের চরমপন্থিরা এই আইনকে 'অসন্তোষজনক, অপ্রচুর ও হতাশাজনক' বলে সমালোচনা করেছেন।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Khilafat and the Non Co-operation Movement (1920-1924 AD.)
খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যুগপৎ এ আন্দোলনে ভারতের সর্বস্তরের জনসাধারণ বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিল। নানাবিধ কারণে এ আন্দোলন ব্যর্থ হয়, তথাপিও এ আন্দোলন পরবর্তীকালে ভারতে হিন্দু ও মুসলমানদের এক বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিল।
খিলাফত আন্দোলন (Khilafat movement)
তুরস্কের খিলাফত রক্ষার জন্য (১৯২০-১৯২৪ খ্রি.) ভারতবর্ষের মুসলমানদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল তাই ইতিহাসে খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত। খোলাফায়ে রাশেদীনের খলিফাগণ, উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসকবর্গ ১২৫৮ পর্যন্ত খিলাফত বজায় রাখেন। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি সুলতান প্রথম সেলিম মামলুক বংশ ধ্বংস করে আব্বাসীয় খলিফা আল মুতাওয়াক্কিলকে তুরস্কে নিয়ে এসে খিলাফতের সমস্ত ক্ষমতা ও মর্যাদা সেলিম গ্রহণ করেন। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক খিলাফত উচ্ছেদ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় তুরস্কের সুলতানকে 'খলিফা' বা ধর্মগুরু বলে শ্রদ্ধা করতেন। তাকে ইসলামের রক্ষক মনে করতেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের সুলতান জার্মানির পক্ষ অবলম্বন করলে ভারতের মুসলমানদের মধ্যে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কারণ একদিকে তারা তুরস্কের সুলতানের প্রতি ধর্মীয়ভাবে অনুগত ছিল, অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত ছিল। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত ভারতের মুসলমানরা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধাবসানে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ অবলম্বন করার অপরাধে ব্রিটিশ তথা মিত্র শক্তি 'সেভার্সের সন্ধি-১৯২০' দ্বারা তুরস্ককে খণ্ড-বিখণ্ড করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তারা খিলাফতের সম্মান ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। 'খিলাফত' আন্দোলনের কারণ হিসেবে 'রম্যা রল্যা' মন্তব্য করেছেন যে, ভারতীয় মুসলমানরা বিবেকের একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ সরকার তুরস্কের সুলতান বা খলিফার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রতিশ্রুতি দিলে, ভারতীয় মুসলমানগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় খিলাফত আন্দোলন শুরু হয় যাকে রম্যা রল্যা "খিলাফত বিদ্রোহ' বলে অভিহিত করেন।
মহাত্মা গান্ধীর পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। ঐ সময় হিন্দু নেতাগণ মসজিদে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিতও হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে বিশ্বাসী মহাত্মা গান্ধী খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং আন্দোলনে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। জুডিথ ব্রাউনের মতে, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি হতে গান্ধীজী প্রত্যক্ষভাবে খিলাফত আন্দোলনের সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ভারতীয় মুসলমানরাও গান্ধীজীর সমর্থনকে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করে। ২৩ নভেম্বর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় খিলাফত-সম্মেলনে মুসলমানরা গান্ধীজীকে সভাপতি নির্বাচিত করে। এ সম্মেলনে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, তুরস্কের প্রশ্নে মুসলমানদের পক্ষে সন্তোষজনক না হলে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বয়কট ও অসহযোগিতার অস্ত্র প্রয়োগ করা হবে।
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের অভিযোগগুলো তুলে ধরেন। কিন্তু ভাইসরয় তাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, জার্মানির পক্ষে অস্ত্র ধারণ করার জন্য তুরস্ককে ফলভোগ করতেই হবে। এ অবস্থায় মার্চ মাসে গান্ধীজী অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের এক ফতোয়া জারি করেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তুরস্কের সাথে মিত্রপক্ষের সেভার্সের শান্তি চুক্তি নামে কঠোর শর্তগুলো তুরস্কের ওপর চাপিয়ে দিলে মুসলমানদের মধ্যে দারুণ বিক্ষোভের সঞ্চার হয়। কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি মুসলমানদের দাবির পুনরাবৃত্তি করে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। জুন মাসে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা হয়-(১) সরকারি খেতাব ও অবৈতনিক পদ বর্জন করা (২) সরকারের বে-সামরিক পদগুলো হতে ইস্তফা দেওয়া (৩) পুলিশ ও
সেনাবাহিনী হতে পদত্যাগ করা (৪) খাজনা বন্ধ করা।

মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর খিলাফত দিবস পালিত হয়। ভারতবর্ষে এ খিলাফত আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনের সাথে মিলিত হয়ে দেশব্যাপী এক দুর্বার ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটায়। তুরস্কের মুসলিম জাহানের খিলাফত মর্যাদা রক্ষার জন্য এ আন্দোলন হয়েছিল বলে এটি খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত।খিলাফত আন্দোলনে ৪টি দাবি ছিল- (১) তুরস্কের অখণ্ডতা বজায় রাখা (২) ইসলাম ধর্মের স্বার্থ রক্ষা করা (৩) আরবীয় দ্বীপের উপর মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ ও (৪) পূর্বের ন্যায় খলিফারাই পবিত্র স্থানগুলো তদারকি করবে।
খিলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব: বিভিন্ন কারণে খিলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে খিলাফত আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
প্রথমত, এ আন্দোলন সর্বপ্রথম ভারতে হিন্দু-মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হতে প্রস্তুত করে।
দ্বিতীয়ত, ইংরেজ সরকারের 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতির বিরুদ্ধে ভারতবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়।
তৃতীয়ত, মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার সৃষ্টি হয়।
চতুর্থত, এ আন্দোলনই পরবর্তীতে ভারতের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহায়ক হয়।
পঞ্চমত, এ আন্দোলন নগরের শিক্ষিত মুসলিম যুব সম্প্রদায়ের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে যা তাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।
অসহযোগ আন্দোলন (Non-co-operation movement)
খিলাফত আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের গতি সঞ্চার হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ন্যায্য বিবেচনা লাভ করার সকল আশা যখন তিরোহিত তখন মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ শাসন কর্তৃপক্ষের প্রতি ভারতীয়দের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রত্যাহার করে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাজত্ব বিপন্ন করে তোলার জন্য যে কর্মসূচি গ্রহণ করেন তাই ইতিহাসে অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০) নামে পরিচিত।
অসহযোগ আন্দোলনের কারণ: অসহযোগ আন্দোলনের মূল কারণ ছিল-
(ক) রাওলাট আইন ১৯১৮: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন প্রতিহত
করার জন্য ব্রিটিশ সরকার কতগুলো দমনমূলক আইন চালু করেন। তন্মধ্যে রাওলাট আইন অন্যতম। এই কুখ্যাত আইন দ্বারা সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয় এবং যেকোনো লোককে যেকোনো মুহূর্তে কারণ না দর্শিয়ে গ্রেপ্তার বা বিনা বিচারে কারাদণ্ড কিংবা আটক রাখা যেত। এ আইনের সমালোচনা করে গান্ধীজী বলেছেন, "আপীল নেহি, দলিল নেহি, উকিল নেহি"। এ আইনের প্রতিবাদে গান্ধীজীর নেতৃত্বে দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়, যা অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়।

(খ) জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড: রাওলাট আইন প্রতিবাদের চরম পরিণতি ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড। পাঞ্জাবে কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে জনগণের শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় পুলিশ গুলি চালিয়ে কিছু লোককে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগের উদ্যানে ১০,০০০ মানুষ প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে পুলিশ উক্ত সভায় গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই ৩৭৯ জন নিহত এবং ১২০০ জন আহত হয়। এই ঘটনায় রবীঠাকুর ব্রিটিশদের দেওয়া 'নাইট' উপাধি বর্জন করেন। এ ঘটনা অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম কারণ।
(গ) ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের মন্ট-ফোর্ড সংস্কার আইন অসহযোগ আন্দোলনের আর একটি কারণ ছিল ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মন্ট-ফোর্ড সংস্কার আইন প্রবর্তন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মন্ট-ফোর্ড সংস্কার আইন ভারতবাসীকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলন মহাত্মা গান্ধী তথা কংগ্রেসকে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।
অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির মধ্যে ছিল- (১) বিদেশি পণ্য বর্জন ও স্বদেশী পণ্য ব্যবহার (২) খেতাব পদবি বর্জন (৩) সরকার মনোনীত ভারতীয় আসনসমূহ থেকে পদত্যাগ (৪) সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অসম্মতি (৫) স্কুল-কলেজ বর্জন (৬) নতুন কাউন্সিল নির্বাচন ও ভোট দান বর্জন।
বয়কটের নেতিবাচকের পাশাপাশি গান্ধীজী ইতিবাচক স্বদেশীর ওপর জোর দেন। গান্ধীজীর নেতৃত্বে আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল বর্জন থেকে শুরু করে যাবতীয় অফিস-আদালত বর্জনের হিড়িক পড়ে যায়। বিদেশি পণ্য বর্জন ও পুড়িয়ে ফেলা শুরু হয়। দেশব্যাপী এ ধরনের আন্দোলন দেখে শাসকগোষ্ঠী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ব্যাপক দমন নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। হাজার হাজার লোক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়, চলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ।
অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব: ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের অবসান ঘটে। প্রায় দু'বছর নিরস্ত্র ভারতবাসী অর্থ-সম্পদে ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান এক বিদেশি সরকারের বিরুদ্ধে অসম-সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। সংগ্রামী ভারতবাসীর একমাত্র অস্ত্র ছিল উদ্দীপনা। এ সংগ্রামকে গান্ধীজী "আত্মশক্তি" ও বৈষয়িক শক্তির মধ্যে সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছিলেন। এ আন্দোলন স্বরাজ অর্জনে ব্যর্থ হলেও ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়। অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব হিসেবে বলা যায়-
প্রথমত, এ আন্দোলনের ফলে ভারতের জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাগরণের সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে এ আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ ক তৃতীয়ত, এ আন্দোলনের ফলে জাতীয় কংগ্রেসের শক্তি ও প্রচার প্রসারিত হয় এবং কংগ্রেস সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মর্যাদা লাভ করে। নেহেরু বলেছেন, "অসহযোগ আন্দোলনটি ভারতীয় জাতীয়তাবোধের ক্ষেত্রে নব প্রাণের সঞ্চার কে
চতুর্থত, এ আন্দোলনে কংগ্রেস দুটি উপদলে বিভক্ত হয়। 'স্বরাজ পার্টি' নামে পৃথক একটি দলের সৃষ্টি হয়।
পঞ্চমত, হিন্দু-মুসলমান যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল তেমনি শেষ পর্যন্ত ঐক্য বিনষ্টও হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি ভারতবাসীর প্রতি ইংরেজদের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়।
যে কারণে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে
অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন দুটি পাশাপাশি পরিচালিত হয়। উভয় আন্দোলনই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্রমশ উভে হতে থাকে। আন্দোলন অহিংস থেকে সহিংস হয়ে ওঠে। যে কারণে মহাত্মা গান্ধী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১। চৌরি চৌরার ঘটনা আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় উত্তেজিত জনতা গোরখপুরের চৌরি চৌরা নামক থানায় অগ্নিস করে একজন দারোগাসহ ২৩ জন পুলিশকে পুড়িয়ে হত্যা করে। গান্ধীজী সম্পূর্ণ অহিংসভাবেই সংগ্রাম চালাবার ি দেওয়া সত্ত্বেও চৌরি চৌরার ঘটনায় তিনি মর্মাহত হন এবং ঘটনার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব অনুধাবন করে আন্দোলন প্রত্যা ঘোষণা দেন। যেহেতু খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন একত্রে পরিচালিত হয়েছিল সেহেতু গান্ধীজীর ঘোষণার আন্দোলন দুটি স্থমিত হয়ে যায় এ ঘোষণায় মতিলাল নেহেরু এবং লালা লাজপাতরায় মন্তব্য করেন যে, "একটি একটি জনতার পাপের জন্য গান্ধীজী সমগ্র দেশকে দণ্ডিত করেন।"
২। ব্রিটিশ সরকারের নিপীড়ন ও দমননীতি: ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও নিপীড়ন শুরু করে হাজার হাজার লোককে কারাগারে নিক্ষেপ করে। এক পর্যায় আন্দোলন স্তিমিত হয়।
৩। কামাল আতাতুর্কের খিলাফত বিলুপ্তি ঘোষণা: তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতায়
অধিষ্ঠিত হয়ে খিলাফত বিলুপ্ত করেন এবং তুরস্ককে আধুনিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে ঘোষণা দেন। ফলে খিলাফত আন্দোলনের মূল ভিত্তি নষ্ট হয় এবং এ আন্দোলন বলবৎ রাখার প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে খিলাফত আন্দোলন সম্পূর্ণ থেমে যায়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Bengal Pact-1923
খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হবার পর উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে আর মিলন সম্ভব হয়নি। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়। এ সময় বাংলার কয়েকজন প্রখ্যাত উদারনৈতিক নেতা সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপ শুরু করেন। এসব নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ফজলুল হক ও হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন কংগ্রেসের একজন জনপ্রিয় নেতা। অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের সাথে তার মতানৈক্য দেখা দেয়। কংগ্রেস দুই উপদলে বিভক্ত হয়। চিত্তরঞ্জন দাস মতিলাল নেহেরুকে সাথে নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক দল 'স্বরাজ পার্টি' গঠন করেন। স্বরাজ পার্টির উদার ও অসাম্প্রদায়িক নেতা চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হকের সহযোগিতায় দেশের স্বার্থে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। হিন্দু-মুসলমান স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খুব শীঘ্রই তাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাই এ চুক্তি বেঙ্গল প্যাক্ট নামে পরিচিত। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুন হঠাৎ চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু ঘটলে বেঙ্গল প্যাক্ট ও স্বরাজ পার্টির অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয় এবং বেঙ্গল প্যাক্ট অচল হয়ে পড়ে। যদিও হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত হিসেবে খ্যাত মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ঐক্য ধরে রাখার জন্য ঐকান্তিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন কিন্তু সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Simon Commission-1927 and Neheru Report-1928
সাইমন কমিশন-১৯২৭ (Simon Commission-1927)
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন ভারতবাসীর রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে এ আইনের বিরুদ্ধে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়। তার ওপর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে স্বরাজ দলের নেতা মতিলাল নেহেরু শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি জানান। এমতাবস্থায় প্রশাসন ও সংবিধানে উভয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার জন্য বড় লাট লর্ড আরউইন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কমিশন ভারতবর্ষে সুশাসন গঠনের ঘোষণা দেন। এ প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের দাবিদাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে উদারনৈতিক দলের সদস্য স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে লর্ড সভার ২ জন এবং কমন্স সভার ৪ জন মোট ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন প্রেরণ করেন। কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসন লাভ করার যোগ্যতা আছে কি-না তা তদন্ত করে দেখা। এই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় একে 'সাদা কমিশন' বলে বিদ্রূপ করা হয়। কেবল ইংরেজদের নিয়ে সাইমন কমিশন গঠিত হয় বলে ভারতে এর বিরুদ্ধে অসন্তোষ লক্ষ করা যায়।
কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, লিবারেল ফেডারেশন ও হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এ কমিশন গঠনের নিন্দা করে এবং সাইমন কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশন মুম্বাই-এ আগমন করলে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। সর্বত্র স্লোগান দেওয়া হয় "সাইমন ফিরে যাও"। কমিশনকে কালো পতাকা দেখানো হয়। এ অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে সাইমন কমিশন তাদের তদন্ত কাজ শেষ করে। এই কমিশন ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দু'খণ্ডে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্ট ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার পদ্ধতি এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব করা হয়।
দুটি কারণে এই কমিশনের প্রস্তাব ভারতবাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি। (১) কমিশনে ভারতীয় কোনো সদস্য না থাকা এবং (২) প্রস্তাবসমূহ ভারতবাসীর স্বার্থের অনুকূলে না হওয়া। কংগ্রেস এই কমিশনের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। মূলত এই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করা হয়।
নেহেরু রিপোর্ট-১৯২৮ (Neheru Report-1928)
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সাইমন কমিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সাইমন কমিশন স্বদেশে ফিরে যায়। তৎকালীন ভারত সচিব বার্কেনহেড ভারতীয় নেতাদের কাছে সর্বসম্মত একটি সংবিধান তৈরির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। ভারতীয় নেতারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। উপমহাদেশের সাংবিধানিক সংকট নিরসনের জন্য কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে একটি কমিটি ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ আগস্ট একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এটাই ইতিহাসে 'নেহেরু রিপোর্ট' নামে পরিচিত। এ রিপোর্টে বলা হয়-

১. সমগ্র ভারতে যুক্ত মিশ্র নির্বাচন হবে।
২. গণপরিষদে (কেন্দ্রীয় আইনসভা) কোনো আসন সংরক্ষিত থাকবে না তবে যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু তাদের জন্য এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হিন্দুদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে। এ ধরনের আসন সংরক্ষণ শুধু ঐসব প্রদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতে হবে যেখানে তারা সংখ্যালঘু এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অমুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতে। যেসব প্রদেশে হিন্দু বা মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে তারা ইচ্ছা করলে বাড়তি আসনের জন্যও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে।
৩. ক. পাঞ্জাব ও বাংলাদেশ কোনো সম্প্রদায়ের জন্য কোনো আসন সংরক্ষিত থাকবে না।
খ. পাঞ্জাব ও বাংলাদেশ ব্যতীত অন্যান্য প্রদেশে মুসলমান সংখ্যালঘুদের জন্য জনসংখ্যানুপাতে আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তৎসঙ্গে বাড়তি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকারও থাকবে।
গ. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অমুসলমানদের জন্য অনুরূপ আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তৎসঙ্গে বাড়তি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকারও থাকবে।
৪. যেসব প্রদেশে আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে তা সেখানে দশ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে।
৫. সিন্ধুকে বোম্বে থেকে পৃথক করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তরিত করা হবে, তবে অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করে আলাদা প্রদেশ কার্যকরী হবে।
৬. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং এ ধরনের গঠিত নতুন প্রদেশসমূহ অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় সরকার গঠন করবে।
এ রিপোর্টে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করা হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ দলমত নির্বিশেষে এ রিপোর্টের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মুসলিম লীগ, কংগ্রেসের একাংশ ও হিন্দু মহাসভা নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা করে, প্রকৃতপক্ষে নেহেরু রিপোর্ট ভারতে বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে ব্যর্থ হয়। এ রিপোর্ট প্রকাশে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ভেঙে পড়ে। ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধি পায়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Fourteen Points of Zinnah-1929 and Round Table Conference
জিন্নাহর চৌদ্দ দফা-১৯২৯ (Fourteen points of Zinnah-1929)
১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে নেহেরু রিপোর্ট কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত হলে কার্যত লক্ষ্ণৌ চুক্তি বাতিল এবং 'বেঙ্গল প্যাক্ট' ও 'দিল্লি, প্রস্তাব' পরিত্যক্ত হয়। নেহেরু রিপোর্টে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল এবং কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করায় মুসলমান নেতৃবৃন্দ বিক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত হন। মাওলানা মোহাম্মদ আলী নেহেরু রিপোর্টকে 'অশেষ দাসত্ব ও হিন্দু আধিপত্য' হিসেবে বর্ণনা করেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের মাধ্যমে নেহেরু রিপোর্টের বিকল্প হিসেবে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন; যা উপমহাদেশের ইতিহাসে জিন্নাহর বিখ্যাত চৌদ্দ দফা নামে পরিচিত।
দফাসমূহ ছিল-

১। ভারতীয় উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।
২। ভারতের প্রদেশসমূহে একইধরনের স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।
৩। সকল আইনসভায় মুসলমান সম্প্রদায়কে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ প্রদান করতে হবে।
৪। কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব এক তৃতীয়াংশের কম হবে না।
৫। সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা নীতি কার্যকর করতে হবে। তবে কোনো সম্প্রদায় ইচ্ছা করলে পৃথক নির্বাচন বাদ দিয়ে যুক্ত নির্বাচন গ্রহণ করতে পারবে।
৬। পাঞ্জাব, বাংলা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না।
৭। সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিচারে সকলের মৌলিক অধিকারসমূহ ভোগের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে।
৮। কোনো আইনসভায় কোনো সম্প্রদায়ের এক চতুর্থাংশ সদস্য কোনো বিলের বিরোধিতা করলে তা প্রত্যাহার করতে হবে।
৯। মুম্বাইয়ে প্রেসিডেন্সি হতে সিন্ধুকে পৃথক করতে হবে।
১০। অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সাংবিধানিক সংস্কার প্রবর্তন করতে হবে।
১১। মুসলমানদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, আইন ইত্যাদি সংরক্ষণ ও উন্নতি সাধন করতে হবে।
১২। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান সদস্য নিয়োগ করতে হবে।
১৩। প্রাদেশিক আইনসভার অনুমতি ব্যতীত সাংবিধানিক পরিবর্তন না করা।
১৪। নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য যথাযোগ্য পদ সংরক্ষণ করা।
জিন্নাহ প্রণীত ১৪ দফা দাবি ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
গোল টেবিল বৈঠক (Round Table Conference)
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কর্তৃক সাইমন কমিশন প্রত্যাখ্যান, নেহেরু রিপোর্টের পাল্টা হিসেবে জিন্নাহর ১৪ দফা দাবি উত্থাপন এবং নেহেরু রিপোর্ট ব্রিটিশ গ্রহণ না করায় ভারতব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে লন্ডনে এক গোল টেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান; যা ইতিহাসে গোল টেবিল বৈঠক নামে সুপরিচিত। নিম্নোক্ত ৩টি পর্যায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়:
প্রথম গোল টেবিল বৈঠক: ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ নভেম্বর লন্ডনে প্রথম গোল টেবিল বৈঠক শুরু হয়। এ বৈঠকে ৮৯ জন
প্রতিনিধির মধ্যে ভারতীয় ছিল ৫৭ জন। ভারতীয় প্রতিনিধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্, এ.কে. ফজলুল হক, তেজ বাহাদুর সপ্ত, ড. বি. আর আম্বেদকার ও চিন্তামণি প্রমুখ। কংগ্রেস এ বৈঠকে যোগদান করেনি। মি. জিন্নাহ এ বৈঠকে তার ১৪ দফা জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। এ নিয়ে হিন্দু প্রতিনিধিদের সাথে তীব্র বাদানুবাদ হয়। শেষ পর্যন্ত প্রথম গোল টেবিল বৈঠক ভেঙে যায় (১৯ জানুয়ারি, ১৯৩১ খ্রি.)।
দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠক: ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠক শুরু হয়। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মার্চ
গান্ধী-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মহাত্মা গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি দেন। এই সমঝোতার ফলে কংগ্রেসের পক্ষে মহাত্মা গান্ধী দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেন এবং প্রথম বৈঠকের অধিকাংশ সদস্য এ বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক চলে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। উপমহাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে গান্ধী-জিন্নাহর মধ্যে কোনো আপস না হওয়ায় এ বৈঠক ব্যর্থ হয়।
তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠক: তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠক বসে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর হতে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ভারতের কতিপয় প্রতিনিধি এ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করলেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ইংল্যান্ডের শ্রমিক দলের কোনো সদস্য এ অধিবেশনে যোগ দেয়নি। এ অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছুই অর্জিত হয়নি।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Communal Award-1932
ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে ১৯৩০ ও ১৯৩১ সালে লন্ডনে প্রথম ও দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠক সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকের সমাপনী ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডোনাল্ড সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, "ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে ভারতীয়রা মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে বাধ্য হবেন।" বাস্তবে হয়েছিল তাই। গোল টেবিল বৈঠকে দ্বিতীয় অধিবেশনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ সমস্যার যথাযথ সমাধানের জন্য ম্যাকডোনাল্ড-এর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এদিকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিরাও সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্বীয় উদ্যোগে এক রোয়েদাদ প্রদান করেন (১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট)। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের উক্ত ঘোষণা 'সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ' বা Communal Award (সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা) নামে পরিচিত।
সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের বিষয়সমূহ
ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনকল্পে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড যে রোয়েদাদ প্রদান করেছিলেন তার বিষয়সমূহ ছিল নিম্নরূপ-
১। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ প্রাদেশিক পরিষদে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আসন বণ্টন করে দেয়।
২। এ রোয়েদাদে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মেনে নেয়।
৩। বাংলা ও পাঞ্জাবে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
৪। সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিম প্রদেশে সংখ্যা অনুপাতে বেশি আসনদানের নীতি মেনে নেয়। অনুরূপভাবে পাঞ্জাবে শিখদের, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে হিন্দুদের এবং বাংলায় ইউরোপীয়দেরকে সেখানকার আইন পরিষদগুলোতে সংখ্যার তুলনায় বেশি আসন দান করা হয়।
৫। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়া বাকি সব প্রদেশগুলোর আইনসভায় মহিলাদের জন্য ৩% আসন সংরক্ষণ করা হয়।
৬। এ রোয়েদাদে শ্রমিক, কৃষক, শিল্পপতি, জমিদার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট আসন ও পৃথক নির্বাচনি তালিকা প্রদান করা হয়।
৭। সাম্প্রদায়িক এ রোয়েদাদে হরিজনদের সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হরিজনদের জন্য পৃথক আসন বরাদ্ধ করা হয়। এ রোয়েদাদে বলা হয়, সাধারণ নির্বাচনে তারা অন্যান্য ভোটারদের মতোই ভোট দিতে পারবে। হরিজনদের জন্য কিছু সংরক্ষিত আসন থাকবে। এই সংরক্ষিত আসনে শুধুমাত্র অনুন্নত শ্রেণির ভোটাররা ভোট দিতে পারবে। অর্থাৎ অনুন্নত শ্রেণি দুবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে।
৮। এ রোয়েদাদে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে মুসলমানদের সুযোগ-সুবিধা দান করবে।
সমালোচনা
সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ কঠোরভাবে সমালোচিত হয়। হিন্দুরা একে মুসলমান ঘেঁষা বলে আখ্যায়িত করে। শিখ সম্প্রদায় এর বিরোধিতা করে। হরিজন সম্প্রদায়কে পৃথক নির্বাচন প্রদান করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এছাড়া কেন্দ্রীয় আইনসভার আসনের ব্যাপারে এ রোয়েদাদে কিছু উল্লেখ ছিল না। এও সমালোচনা করা হয় যে, রোয়েদাদে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে মুসলমানদের এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে হিন্দুদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছে।
এ রোয়েদাদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান উভয়ই তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কংগ্রেস এর নিন্দা করে। কংগ্রেসের মতে, হিন্দু ও শিখদের প্রতি অন্যায় করা হয় এ রোয়েদাদের মাধ্যমে। মুসলমানরা যেসব প্রদেশে সংখ্যালঘু সেসব প্রদেশে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব সংখ্যানুপাতিক হার অপেক্ষা বেশি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রদেশে মুসলমানরা যে সুবিধা পায় শিখরা তা পায়নি।
গান্ধীজী উপলব্ধি করেন যে, সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা চালু হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐক্য ভেঙে পড়বে এবং রাজনৈতিক দিক হতে তাদের সর্বনাশ হবে। তিনি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ আগস্ট এক পত্রের মাধ্যমে ম্যাকডোনাল্ডকে জানান যে, তিনি ও রবিঠাকুর এ রোয়েদাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
পুনা চুক্তি
গান্ধীজী সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ রহিত করার জন্য কারাগারে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। গান্ধীজীর এ অনশন ধর্মঘটে ভারতের সর্বত্র গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও ব্রিটিশ সরকার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। গান্ধীজীর অমূল্য জীবন রক্ষায় হিন্দু ও অনুন্নত শ্রেণির নেতৃবৃন্দ জোর তাগিদ অনুভব করে। হরিজনরা তাদের দাবি পরিত্যাগ করতে সম্মত হয়। শেষ পর্যন্ত পুনা শহরে গান্ধীজী ও অনুন্নত শ্রেণির নেতা ড. আম্বেদকারের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটাই ঐতিহাসিক পুনা চুক্তি (Poona Pact) নামে খ্যাত।
এ চুক্তির মাধ্যমে স্থির হয় যে, হরিজনদের জন্য কিছু সংখ্যক আসন নির্দিষ্ট থাকবে, তবে তারা সাধারণ হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হবে। এভাবে কংগ্রেস এবং অন্যান্য হিন্দু নেতৃবৃন্দ সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদকে 'জাতির রাজনৈতিক সংহতি বিনাশের চক্রান্ত' বলে আখ্যায়িত করে এবং সুতীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Indian Government Act of 1935
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন ভারতের শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দলিল। ১৮৬১ থেকে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার ভারতের জন্য যে কয়টি আইন পাস করেন সেগুলোর মধ্যে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের সংস্কার আইন ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা আংশিকভাবেও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নেহেরু রিপোর্ট এবং মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে জিন্নাহর ১৪ দফা সবকিছু মিলিয়ে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করে। কংগ্রেসের 'আইন অমান্য আন্দোলন' প্রত্যাহার করলে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্ত কমিটি সম্পর্কিত প্রস্তাবাবলির যথোপযুক্ত রদবদল সাপেক্ষে রিপোর্ট প্রদান করেন। উক্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করেন।
উল্লেখযোগ্য ধারাসমূহ
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইনে যে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল তা ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের আইনের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা করা হয়। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল একটি দলিল।
সুবৃহৎ এই আইনে মোট ধারা ছিল ৩২১টি। নিম্নে এ আইনের প্রধান ধারাসমূহ বর্ণনা করা হলো-
১. যুক্তরাষ্ট্র গঠন: ভারতে প্রচলিত এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে ১১টি প্রদেশ ও যোগদানে ইচ্ছুক দেশীয় রাজ্যসমূহ নিয়ে সর্বপ্রথম ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
২. যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত প্রতিষ্ঠা: এ আইনে একজন প্রধান বিচারপতি এবং কয়েকজন সহযোগী বিচারপতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এ আদালতের কাজ ছিল সংবিধানের ব্যাখ্যা দান এবং কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে বিরাজমান বিবাদের মীমাংসা করা।
৩. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন একান্ত অপরিহার্য। এই আইনে দ্বৈত শাসন রহিত করা হয় এবং দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তন করা হয়।
৪. প্রাদেশিক আইনসভা গঠন এই আইনে বাংলা, বিহার, আসাম, মুম্বাই, মাদ্রাজ এবং যুক্ত প্রদেশকে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট এবং অন্য ৫টি প্রদেশে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা হয়।
৫. প্রত্যেক প্রদেশের জন্য গভর্নর পদ সৃষ্টি: এই আইনের মাধ্যমে প্রত্যেক প্রদেশের জন্য গভর্নর পদ সৃষ্টি করা হয়। গভর্নর প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতেন এবং উপেক্ষাও করতে পারতেন।
৬. নতুন প্রদেশের সৃষ্টি: এই আইনে সিন্ধু ও উড়িষ্যা নামে দুটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হয় এবং অন্যান্য প্রদেশের মতো সমমর্যাদা দেওয়া হয়। ব্রহ্মদেশকে ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
৭. কেন্দ্রীয় দ্বৈতশাসন প্রবর্তন কেন্দ্রীয় বিষয়সমূহকে সংরক্ষিত এবং হস্তান্তরিত এই দু'ভাগে ভাগ করা হয়। সংরক্ষিত বিষয়সমূহকে ৩ জন উপদেষ্টার সাহায্যে গভর্নর জেনারেল তার ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করতেন এবং হস্তান্তরিত বিষয়সমূহকে মন্ত্রিসভার সাহায্যে পরিচালনা করতেন।
৮. দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: এই আইনের দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার উচ্চ কক্ষের নাম রাষ্ট্রীয় পরিষদ এবং নিম্ন কক্ষের নাম ব্যবস্থা পরিষদ রাখা হয়।
৯. ক্ষমতা বণ্টন: আইনগুলোকে- (ক) কেন্দ্রীয় (খ) প্রাদেশিক এবং (গ) যুগ্ম এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল দেশরক্ষা, বৈদেশিক, মুদ্রা, ডাক যোগাযোগ সহ ৫৯টি। প্রাদেশিক বিষয় ছিল আইন, শৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশ সহ ৫৪টি এবং যুগ্ম বিষয় ছিল ফৌজদারি আইন, বিবাহ বিচ্ছেদ, উইলসহ ৩৬টি। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় সরকারের আওতাভুক্ত ছিল।
১০. ভারত সচিবের ক্ষমতা হ্রাস: এই আইনে ভারত সচিবের পরিদর্শন নির্দেশ প্রদান ও নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা উল্লেখ না থাকায় ক্ষমতা হ্রাস পায়।
১১. সাংবিধানিক সংশোধন সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা ভারতে কেন্দ্রীয় আইনসভার পরিবর্তে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
১২. গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা: এই আইনের বলে গভর্নর জেনারেল ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান নির্বাহী, ব্রিটিশ রাজার প্রতিনিধি। সুতরাং তার প্রচুর ক্ষমতা ও দায়িত্ব ছিল। ফলে এই আইনে শাসন বিভাগের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৩. মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন: এই আইনে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয় এবং কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে একতৃতীয়াংশ মুসলমান প্রতিনিধি প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়।
১৪. উপদেষ্টা সংস্থা গঠন: এই আইনের মাধ্যমে ভারত সচিবের কাউন্সিল বিলুপ্ত করা হয় এবং স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন উপদেষ্টা গঠন করা হয়।
১৫. রাজপ্রতিনিধির পদ সৃষ্টি: এই আইনে দেশীয় রাজ্যগুলোর ওপর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য রাজপ্রতিনিধির পদ সৃষ্টি করা হয়।
১৬. বার্মার পৃথকীকরণ: পূর্বে বার্মা ভারতের সাথে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু এই আইনের বলে বার্মাকে ভারতবর্ষ থেকে পৃথক করা হয়।
সমালোচনা
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন ব্রিটিশ কমনওয়েলথে ভারতের শাসনতান্ত্রিক মর্যাদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দান করেনি। এই আইন মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হয়নি। কংগ্রেস নেতা জওহর লাল নেহেরু এ আইনকে 'অবাঞ্ছিত, অগণতান্ত্রিক, জাতীয়তা বিরোধী এবং দাসত্বের নতুন সনদ' আখ্যায়িত করেন। রাজা গোপাল আচারিয়ার মতে, 'এ আইন দ্বৈতশাসন অপেক্ষাও খারাপ ছিল'। এ.কে. ফজলুল হক এই আইনকে 'না হিন্দুরাজ, না মুসলমানরাজ' বলে সমালোচনা করেন। এ আইন ছিল হতাশাব্যঞ্জক, এতে ডোমিনিয়ন মর্যাদার কথা পর্যন্ত বলা হয়নি। এতসত্ত্বেও এই আইন দাসত্বের নতুন সনদ নয় বরং ভারতবাসীর দাবি আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপের স্বাক্ষর বহন করে। ভারতের প্রদেশগুলোতে সীমাবদ্ধ আকারে হলেও দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে লেগেছিল।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Theory of Two Nation-1940
ভারতবর্ষের হিন্দুদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দুরভিসন্ধি এবং মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দানে অনীহার প্রেক্ষিতে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ দ্বি-জাতিতত্ত্বের ঘোষণা দেন। কংগ্রেস নেতা নেহেরু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ভারতে শুধুমাত্র দুটি দল আছে- একটি কংগ্রেস অপরটি ব্রিটিশ সরকার। কংগ্রেস নেতা নেহেরুর এই ঘোষণার প্রতিবাদে জিন্নাহ জোরের সাথে বলেন, "ভারতে তিনটি দল আছে- একটি মুসলিম লীগ, একটি কংগ্রেস এবং অন্যটি ব্রিটিশ সরকার।" পক্ষান্তরে উগ্র হিন্দুবাদীরা প্রচার চালায় ভারতে একটি মাত্র জাতি 'হিন্দু জাতির' বাস। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে ঘোষণা করেন, "যে কোন সংজ্ঞায় মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি, তাই তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকতে হবে। ভারত একটি দেশ নয়, বরং একটি উপমহাদেশ। এ উপমহাদেশে যে যে ভিত্তিতে হিন্দুরা একটি জাতি একই ভিত্তিতে মুসলমানরাও একটি জাতি।" মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষিত উক্ত তত্ত্বই ইতিহাসে দ্বি-জাতিতত্ত্ব নামে পরিচিত।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রবর্তক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, "মুসলমানদের কৃষ্টি স্বতন্ত্র, তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য স্বতন্ত্র, নাম ও পরিচয় আলাদা, সুতরাং জাতীয়তার যে কোন সংজ্ঞানুযায়ী মুসলমানরা একটি পৃথক জাতি। আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ীও মুসলনমানরা একটি পৃথক জাতি। হিন্দুদের জন্য আবাস ভূমি থাকলে মুসলমানদের জন্যও পৃথক আবাস ভূমি থাকতে হবে।" শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের মূল ভিত্তিই ছিল এই দ্বি-জাতি তত্ত্ব এবং এই তত্ত্বই পাকিস্তানের জন্ম দেয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Lahore Proposal-1940
লাহোর প্রস্তাব উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ১৯২৮ সালের নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশের সময় থেকে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনতান্ত্রিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য দলীয় অধিবেশন আহ্বান করা হয়। ২৩ মার্চ, ১৯৪০ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে বাংলার কৃতি সন্তান শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন তাই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বা 'পাকিস্তান' প্রস্তাব নামে খ্যাত। মূলত লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাসমূহে মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক স্বাধিকার, আত্মত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব অর্জনই ছিল লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য। সংবিধানে এসব রাষ্ট্রসমূহে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার বিধান রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করা হয় l

লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি (The Background of the Lahore Resolution)
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা পরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে বাতিল করার জন্য মুসলিম লীগ ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এ সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা চিরদিনের জন্য অগ্রহণযোগ্য একটি পরিকল্পনা। কারণ ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের আইনে বিভিন্ন জাতিকে নিয়ে গঠিত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সমগ্র জনগণের উপযোগী ছিল না। এ অবস্থায় মুসলিম নেতৃবৃন্দ এমন এক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যার ফলে ভারতীয় মুসলমানরা স্বীয় সংস্কৃতি ও জীবন ধারাকে অব্যাহত রেখে ভারতের বুকে মর্যাদার সাথে বসবাস করতে সক্ষম হবে। এ দৃঢ় সংকল্পের মূলে ছিল ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং কংগ্রেসের অসহিষ্ণু মনোভাব। ১৯৩৭খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে হিন্দু প্রধান দেশগুলোতে কংগ্রেস জয়ী হয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। মুসলমানরা পিছিয়ে পড়তে থাকে। এ অবস্থায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দাবি উঠতে থাকে মুসলমানরা কোনো সম্প্রদায় নয়, ভারতবর্ষে তারা এক স্বতন্ত্র জাতি। আন্তর্জাতিক সমাজে প্রত্যেক জাতির যেমন আত্মত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে তেমনি ভারতবর্ষের মুসলমানদের সে অধিকার রয়েছে। শুধু ধর্ম, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচারই তাদের স্বতন্ত্র নয়, এলাকার ভিত্তিতে কিছু অংশে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ সকল এলাকার সমন্বয়ে মুসলমানদের জন্য পৃথক এক রাষ্ট্র গঠন করা যেতে পারে।
এমতাবস্থায় ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মার্চ অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের দলীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করে। নিম্নে লাহোব প্রস্তাবের মূল বক্তব্য তুলে ধরা হলো:
লাহোর প্রস্তাব (The Lahore Resolution)
প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এ অধিবেশনের সুনিশ্চিত অভিমত এই যে, কোনো সাংবিধানিক পরিকল্পনা এদেশে কার্যকরী করা যাবে না বা মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তা নিম্নরূপ মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়। যথা:
ক. ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সন্নিহিত স্থানসমূহকে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
খ. এসব অঞ্চলকে প্রয়োজনমতো সীমা পরিবর্তন করে এমনভাবে গঠন করতে হবে যাতে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যে সকল স্থানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সে অঞ্চলসমূহে স্বাধীন রাষ্ট্র রাষ্ট্রসমূহ (Independant states) গঠন করতে পারে। এবং
গ. এ স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, এসব অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক এবং অন্যান্য অধিকার কার্যকরী ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে করতে হবে। ভারতবর্ষে মুসলমানরা যে সকল স্থানে সংখ্যালঘু সে সকল স্থানে তাদের ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক এবং অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তাদের সাথে পরামর্শ করে যথোপযুক্ত কার্যকরী ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে করতে হবে। লাহোর প্রস্তাবে আরও বলা হয় যে, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, যোগাযোগ ও প্রয়োজনমত অন্যান্য বিষয়ে সর্বক্ষমতা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।
লাহোর প্রস্তাবের বৈশিষ্ট্য (Feature of The Lahore Resolution)
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের লাহোর প্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে এর নিম্নলিখিত কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইনে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পরিহার করে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পাশাপাশি এলাকাসমূহকে পৃথক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
২। মুসলমানদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া আর কোনো সংশোধিত পরিকল্পনাও তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩। ভৌগোলিক দিক থেকে সংলগ্ন বা সন্নিহিত এলাকাগুলো পৃথক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
৪। ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।
৫। এই স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশগুলো হবে সম্পূর্ণরূপে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।
৬। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সংবিধানের কার্যকর ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৭। দেশের যেকোনো ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক পরিকল্পনায় উক্ত বিষয়গুলোকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
৮। অঞ্চল বা প্রদেশগুলো নিজেদের এলাকার প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র যোগাযোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে সকল ক্ষমতার অধিকারী হবে।
লাহোর প্রস্তাবের তাৎপর্য
লাহোর প্রস্তাব উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। লাহোর প্রস্তাবের ফলে মুসলমানদের পৃথক আবাসস্থলের পরিকল্পনা দানা বাঁধতে থাকে। যার পরিণতিতে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ লুকায়িত ছিল। এ প্রস্তাব এটা প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান সম্পূর্ণ পৃথক দুটি জাতি। এদের কৃষ্টি, কালচার, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আবার, ভারতের মুসলমানদের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা ও কৃষ্টিগত পার্থক্য থাকায় একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের জাতির জনক কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একাধিক রাষ্ট্রের কথা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা উল্লেখ করেন। ফলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
লাহোর প্রস্তাবের ফলেই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের পরিসমাপ্তির পথ রচিত হয়। যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ লাহোর প্রস্তাবে একাধিক রাষ্ট্রের কথা বাদ না দিতেন তাহলে হয়তোবা ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দেই মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্তস্নাত বায়ান্ন, ছেষট্টি, উনসত্তর এবং সর্বোপরি একাত্তর হয়তো বা সৃষ্টি হতো না। সে যাই হোক, এ কথা অবধারিত যে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পাকিস্তান সৃষ্টি এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টির পথ প্রশস্ত হয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Cripps Mission-1942
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠ সামরিক ঘাঁটি সিঙ্গাপুর, বার্মার রাজধানী রেঙ্গুন এবং মালয় জাপান দখল করলে উপমহাদেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার সন্দিহান হয়ে ওঠে। ভারতীয়দের সাহায্য-সহযোগিতা পাবার লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের অর্থমন্ত্রী স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে একটি প্রস্ত াব নিয়ে ১৯৪২ সালের ২২ মার্চ ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। স্যার ক্রিপসের নামানুযায়ী এই মিশনের নাম হয় 'ক্রিপস মিশন'। কংগ্রেস, লীগ ও অন্যান্য দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ৩০ মার্চ ক্রিপস তার শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা
প্রকাশ করেন:
১। আত্মত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের জন্য শীঘ্রই ভারতীয় ইউনিয়ন গঠন করা হবে এবং একে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়া হবে। এ ডোমিনিয়ন ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের সমমর্যাদা লাভ করবে।
২। যুদ্ধাবসানে ভারতীয় প্রতিনিধিগণকে নিয়ে একটি সংবিধান সভা গঠন করা হবে এবং এর ওপর নতুন শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। ব্রিটিশ সরকারের সহিত এই সংবিধান সভা চুক্তিবদ্ধ হবে এবং এই চুক্তি অনুসারে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া এই চুক্তিতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও অন্যান্য বিষয় সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি থাকবে।
৩। ভারতের কোনো প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য নতুন শাসনতন্ত্র গ্রহণে অস্বীকৃত হলে সে প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য নিজস্ব শাসনতন্ত্র রচনা করবে।
৪। সংবিধান সভার সদস্যরা প্রাদেশিক আইনসভা কর্তৃক নির্বাচিত হবেন।
৫। ভারতের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
৬। বড়লাটের কার্যনির্বাহক কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বড়লাটের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার থাকবে।
ক্রিপস মিশন ব্যর্থতার কারণ
ভারতকে স্বাধীনতাদানের কোনো প্রস্তাব উল্লেখ না থাকা, ভারতের প্রতিরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে না দেওয়া, প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারের ব্রিটিশ কেবিনেটের সমমর্যাদা ও ক্ষমতাদানের কোনো প্রতিশ্রুতি না থাকায় কংগ্রেস উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অপরদিকে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুটি পৃথক সংবিধান সভা গঠনের সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় মুসলিম লীগ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ক্রিস ব্যর্থ হয়ে স্বদেশে ফিরে যায়। ক্রিপস প্রস্তাব সম্পর্কে ড. পট্রভী বলেছেন, ‘ক্রিপস প্রস্তাবটি বিভিন্ন রুচির মানুষের জন্য বিচিত্র স্বাদে আকর্ষণীয়।’
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
The Quit India or August Movement-1942
ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর সমগ্র ভারতব্যাপী অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ভারতীয় রাজনীতিতে নেমে আসে হতাশার কালো ছায়া। এ অবস্থায় ভারতবর্ষে জাপানের আক্রমণের আশঙ্কায় নেতৃবৃন্দ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে গান্ধীজী 'হরিজন' পত্রিকায় অভিমত ব্যক্ত করেন যে, একমাত্র ব্রিটিশ ভারত ছাড়লে জাপান ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে পারে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছাড়ার পরও যদি জাপান আক্রমণ করে তা ভারতবাসী সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করবে। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত এলাহাবাদ সম্মেলনে গান্ধীজীর উক্ত অভিমতই 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সূচনা করে। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ আগস্ট মুম্বাই শহরে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে গান্ধীজীর নেতৃত্বে বিখ্যাত 'ভারত ছাড়' বা 'আগস্ট প্রস্তাব' গ্রহণ করা হয়। গান্ধীজী ঘোষণা দেন, আমি এখনই স্বাধীনতা চাই, স্বাধীনতা টপ করে আকাশ থেকে পড়বে না, আমরা লড়াই করে স্বাধীনতা আনব; আর এটাই হবে আমাদের জীবনের শেষ লড়াই। তিনি বলেন, We shall do or die (করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে)।
৮ আগস্ট মধ্যরাতে গান্ধীজীসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পুলিশ গ্রেফতার করে। নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং 'ভারত ছাড়' আন্দোলন সফল করতে জনতা বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, রেললাইন উৎপাটন, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের তার বিচ্ছিন্ন প্রভৃতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। পুলিশও ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের শেষে গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০,০০০ জন, কারাদণ্ড দেওয়া হয় ২৬,০০০ জন এবং পুলিশের হাতে নিহত হয় প্রায় ১০,০০০ জন। সরকারের সীমাহীন দমন-পীড়নের ফলে 'ভারত ছাড়' আন্দোলন ব্যর্থ হয়। ইংরেজরা ভারত ছাড়েনি তবে তারা বেশি দিন টিকেও থাকতে পারেনি। এ আন্দোলনে তাদের ভিত একেবারে নড়বড়ে হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশরা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Cabinet Mission Planing-1946
ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর সমগ্র ভারতব্যাপী তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে চার্চিলের রক্ষণশীল দলের শোচনীয় পরাজয় ঘটে এবং শ্রমিক দল নির্বাচনে জয়লাভকরে সরকার গঠন করে। ক্লেমেন্ট এটলি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন। নতুন সরকার উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে, ভারতবর্ষে তাদের পক্ষে বেশিদিন শাসন করা সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
১৯৪৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এটলি ঘোষণা করলেন যে, ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনার ব্যাপারে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ-আলোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতে একটি মন্ত্রী মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অতঃপর ব্রিটিশ সরকার তিন সদস্যের একটি মিশন ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। ভারত সচিব লর্ড প্যাথিক লরেন্সের নেতৃত্বে এ মিশনের অপর সদস্য দুজন হলেন-
(১) স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস
(২) এ. ভি. আলেকজান্ডার।
তিনটি অংশে বিভক্ত এই মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনার সুপারিশসমূহ ছিল-
১। । ভবিষ্যৎ সংবিধান সম্পর্কিত সুপারিশ: সুপারিশ:
(ক) ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলো নিয়ে একটি সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হবে।
(খ) ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে ভারত ইউনিয়নের শাসন বিভাগ ও আইনসভা গঠিত হবে।
(গ) ইউনিয়নের হাতে প্রদত্ত বিষয়গুলো ছাড়া অন্যান্য সব বিষয় প্রদেশগুলোর হাতে সমর্পণ হবে।
(ঘ) ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশসমূহকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ক, খ ও গ এই তিনটি শাখায় বিভক্ত করা হয়। 'ক' শাখায় থাকবে ৬টি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, 'খ' শাখায় থাকবে উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ৩টি প্রদেশ ও 'গ' শাখায় থাকবে পূর্ব ভারতের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ২টি প্রদেশ।
(ঙ) ইউনিয়ন ও গ্রুপগুলোর সংবিধানে এমন শর্ত থাকবে যে, প্রাথমিকভাবে ১০ বছর এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্রতি ১০ বছর অন্তর যেকোনো প্রদেশ তার আইনসভার অধিকাংশ সদস্যদের সম্মতিক্রমে সংবিধানের ধারাসমূহ পুনর্বিবেচনা করতে পারবে।
২। গণপরিষদ সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ: সংবিধান রচনার জন্য একটি গণপরিষদ গঠিত হবে। এই গণপরিষদের সদস্যগণ জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হবেন।
৩। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন পরিচালনার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে কেন্দ্র একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবে।
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও দ্বন্দ্ব এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও অশান্তময় পরিস্থিতির মধ্যে মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Independence Act of India of 1947
ভারতীয়দের দীর্ঘ সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এটাই ইতিহাসে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন বা ভারত স্বাধীনতা আইন নামে বিখ্যাত। মুসলিম লীগ কর্তৃক মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর লর্ড ওয়াভেলের আহ্বানে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। উক্ত সরকারে প্রথমে মুসলিম লীগ যোগদান না করলেও পরে যোগদান করেন। কিন্তু উভয় দলের মধ্যে অসহযোগিতা ও মতানৈক্যের ফলে অন্ত বর্তীকালীন সরকারের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করে বলেন যে, "কংগ্রেস" ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করবে এবং পালটা সরকার গঠন করবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনো রাজস্ব প্রদান করবে না। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে কেন্দ্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। ১৬ আগস্ট,

১৯৪৬ মুসলমানরা ভারতের সর্বত্র হরতাল ও সভার আয়োজন করে "প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস" পালন করে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঐ দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন। কলকাতায় ঐ দিন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভার আয়োজন করা হয়। সভা আরম্ভ হবার আগে থেকেই কলকাতার স্থানে স্থানে দাঙ্গা শুরু হয়। ইস্পাহানি লিখেছেন, তিনি সভার আয়োজনে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় সাড়ে এগারোটায় সংবাদ পান যে, সার্কুলার রোডে ও করপোরেশন স্ট্রিটের সংযোগস্থলে হিন্দুগণ রাস্তার দুই পাশে বাড়িগুলো থেকে মুসলমানদের মিছিলের ওপর পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করে। বিকেল সাড়ে তিনটায় খবর আসে, ভবানীপুর এলাকায় শিখ ও হিন্দুগণ সেখানকার মুসলমান স্ত্রীলোক ও ছেলেমেয়েদের ওপর আক্রমণ করেছে। এ সময় আরও কয়েকটি এলাকা থেকে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের সংবাদ আসে। কলকাতায় দাঙ্গার জন্য ইস্পানি কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভাকে দায়ী করেন। অপরপক্ষে কংগ্রেস নেতাগণ দাঙ্গার জন্য বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ও লীগ নেতাদের দায়ী করেন। কলকাতায় এ দাঙ্গার বিবরণ দিয়ে স্টিফেনস লিখেছেন, "শ্যাম পুকুর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে মানুষের মৃতদেহের স্তূপ নিকটবর্তী বাড়িগুলোর দোতালার মেঝ বরাবর উঁচু হয়ে উঠেছিল।" তবে এটা অতিরঞ্জিত। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর হিসেব মতে প্রায় ৫০,০০০ লোক হতাহত হয়েছিল।
এরূপ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষণা দেন, ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের পূর্বেই ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের নিকট শাসনভার অর্পণ করবে। তিনি আরও ঘোষণা দেন, জুন মাসের মধ্যে সংবিধান পরিষদ সংবিধান রচনায় ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার নিজের ইচ্ছানুযায়ী ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দলের হস্তে কেন্দ্রের শাসন ভার অর্পণ করবে। এটাই এটলির ঘোষণা বা ফেব্রুয়ারি ঘোষণা নামে পরিচিত। এটলির ঘোষণায় ভারত বিভাগের ইঙ্গিত থাকায় মহাত্মা গান্ধী অনতিকালের মধ্যেই পূর্ণ ক্ষমতা বিনাশর্তে ভারতীয়দের হস্তে হস্তান্তরের জন্য সরকারকে অনুরোধ করেন।
এটলির ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লর্ড ওয়েভেল-এর স্থলে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের গভর্নর নিযুক্ত করা হয় (২৪ মার্চ, ১৯৪৬)। মাউন্টব্যাটেন ভি. পি. মেননের সহযোগিতায় তৎকালীন ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত বিভাগের একটি বাস্তব ও সর্বসম্মত পরিকল্পনা ব্রিটিশ সরকারের নিকট পেশ করেন। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন এ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এটাই ইতিহাসে ৩ জুনের পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার নিম্নবর্ণিত প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরা হয়:
১। এই পরিকল্পনায় ভারত ও পাকিস্তান নামে ২টি ডোমিনিয়ন গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
২। ভারত বিভক্তির নিম্নবর্ণিত রূপরেখা দেওয়া হয়:
(ক) পাঞ্জাব ও বাংলা প্রাদেশিক আইনসভার মুসলমান ও অমুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাসমূহের প্রতিনিধিগণ আলাদাভাবে ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা ভারত না পাকিস্তানে যোগ দেবে।
(খ) সিন্ধু প্রদেশের যোগদানের সিদ্ধান্ত সিন্ধু প্রাদেশিক আইনসভার ওপর দেওয়া হয়।
(গ) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও আসামের সিলেট জেলা গণভোটের মাধ্যমে যেকোনো ডোমিনিয়নে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেবে।
(ঘ) বেলুচিস্তানের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্মিলিতভাবে ভারতে বা পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেবে।
৩। বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা কার্যকর করার জন্য একটি সীমানা কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়।
৪। প্রস্তাবিত দুটি রাষ্ট্রের গণপরিষদ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্রিটিশ কমনওয়েলথে থাকা না থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
৫। দেশীয় রাজ্যগুলো নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো ডোমিনিয়নে যোগদান করতে বা স্বাধীন থাকতে পারবে।
৬। ভারত ও পাকিস্তানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে একটি ভারতীয় স্বাধীনতা বিল ব্রিটিশ আইন পরিষদে পেশ করা হবে।
এ পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ভারত স্বাধীনতা আইন পাস করে। এই আইনের উল্লেখযোগ্য ধারাসমূহ ছিল-
১। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তানের মধ্যে থাকবে সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ব বাংলা। অবশিষ্ট অংশ নিয়ে ভারত ইউনিয়ন গঠিত হয় (মুম্বাই, গুজরাট, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিম বাংলা, মাদ্রাজ, মধ্য প্রদেশ, আজমীর, কুর্গ এবং মুসলিম অধ্যুষিত শ্রীহট্ট ছাড়া আসাম)।
২। উভয় রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয় পরিচালনা করবে।
৩। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত একটি কমিশন দ্বারা স্থির করার ব্যবস্থা হয়।
৪। পাকিস্তান ও ভারত ইউনিয়ন ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত থাকবে কিনা তাও এদের ইচ্ছার অধীনে ছেড়ে দেওয়া হয়। সার্বভৌম গণপরিষদই এটা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার অধিকারী হলো।
৫। এ আইনে ভারত সচিবের (Secretary of state for India) পদের অবসান ঘটে। ভারত ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের সাথে সংযোগ রক্ষা করার জন্য কমনওয়েলথ সেক্রেটারির ওপর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
৬। উভয় ডোমিনিয়নের গণপরিষদ স্বাধীনভাবে তাদের শাসনতন্ত্র রচনা করবে। যতদিন নতুন শাসনতন্ত্র রচিত না হবে ততদিন দু'দেশ ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবে।
৭। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট হতে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর ওপর ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটবে। এই রাজ্যগুলোকে ভারতীয় ইউনিয়ন অথবা পাকিস্তানে যোগদান করার অথবা স্বাধীন থাকার অধিকার দেওয়া হয়। এ আইনের ফলে দেশীয় রাজ্যগুলোর সাথে ইংল্যান্ডের রাজার সকল সন্ধি বা চুক্তি বিলুপ্তি ঘটে।
৮। এ আইনের ফলে রাজকীয় মর্যাদা ও উপাধি হতে ভারত সম্রাট (Emperor of India) উপাধি বিলুপ্ত হয় এবং ভারতের শাসন সংক্রান্ত বিষয় হতে ব্রিটিশ সরকারকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
৯। পাকিস্তান ও ভারত ইউনিয়নের জন্য সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার নিম্নলিখিত পরিবর্তন ও সংশোধনের পর ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। যথা:
ক. গভর্নর জেনারেল বা প্রাদেশিক গভর্নরের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধিজনিত ক্ষমতা এবং বিশেষ দায়িত্ব প্রভৃতির অবসান ঘটবে এবং এখন হতে তাঁরা স্ব স্ব মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শমতো সকল অবস্থায় কার্য পরিচালনা করবেন।
খ. মন্ত্রিসভার পরামর্শমতো এখন হতে প্রত্যেক ডোমিনিয়নে গভর্নর জেনারেল ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক নিযুক্ত হবেন।
গ. মন্ত্রিসভার পরামর্শমতো গভর্নর জেনারেল প্রাদেশিক গভর্নরকে নিযুক্ত করবেন।
ঘ. ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইনের সাথে অসামঞ্জস্য এই অজুহাতে আইন পরিষদের কোনো আইন অচল এটা অপ্রচলিত হবে না। ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের গুরুত্ব (Importance of the Indian independence act of 1947)
১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নিম্নে ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
১। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সমস্যার সমাধান: ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সমস্যা সমাধানে এ
আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৭৫৭ সাল থেকে ভারত উপমহাদেশে যে রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যা চলছিল এ আইনের দ্বারা তার নিরসন হয়।
২। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এ আইনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে সুদীর্ঘ ১৯০ বছরের (১৭৫৭-১৯৪৭) ব্রিটিশ শাসনের
অবসান ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। বিনা রক্তপাতে এবং সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম ছাড়াই দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম বিশ্বের ইতিহাসে সত্যিই বিরল। এ দিক থেকে বিচার করলে ১৯৪৭সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের গুরুত্ব অনেক।
৩। সংসদীয় ও দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা: এ আইন দ্বারা গভর্নর জেনারেল ও গভর্নরের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, বিশেষ
ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধিজনিত ক্ষমতা বিলুপ্ত করায় ভারত ও পাকিস্তানে সংসদীয় ও দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। নতুন নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তাই ভারত ও পাকিস্তানে সংসদীয় ও দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।
৪। নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা: এ আইন ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের কৃষ্টি, সভ্যতা, সাহিত্য, রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত করে। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে Go নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সুতরাং এ আইন ভারত ও পাকিস্তানে নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Advent of Pakistan and India
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত স্বাধীনতা আইন পাস হয়। ২৫ জুলাই মাউন্টব্যাটেন দেশীয়
রাজাদের একটি সভা ডাকেন এবং ১৫ আগস্ট ভারতীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের অভিহিত করেন। ব্রিটিশ আধিপত্য শেষ
হবার পর রাজাদের সুবিধানুযায়ী এবং ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের পরামর্শ দেন।
তদানুযায়ী ৬০০ দেশীয় রাজ্যের অধিকাংশ ভারতের পক্ষে যোগ দেয় এবং বাকিরা পাকিস্তানের পক্ষে যোগ দেয়। তবে
হায়দারাবাদ ও কাশ্মীর তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে। সে যাই হোক, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ও ১৫
আগস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতীয় গণপরিষদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। উক্ত ক্ষমতা
হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের শাসন-শোষণের অবসান ঘটে। বহু প্রতিক্ষিত পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি
স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে অভিষিক্ত হলেন কায়দে
আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। অপরপক্ষে ব্রিটিশ ভারতবর্ষের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের
গভর্নর জেনারেল পদে অভিষিক্ত করা হলো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান এবং ভারতের
প্রধানমন্ত্রী হলেন পণ্ডিত জওহরলার নেহেরু।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত স্বাধীনতা আইন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের তালিকা
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে সকল নি
লিপিবদ্ধ করা হলো-
গভর্নরগণ
১। লর্ড ক্লাইভ (প্রথম বার) - ১৭৫৭- ১৭৬০ খ্রি.
(দ্বিতীয় বার) ১৭৬৫ – ১৭৬৭ খ্রি.
২। ভ্যান্সিটার্ট ১৭৬০- ১৭৬৫ খ্রি.
৩। ভেরিলেস্ট ১৭৬৭- ১৭৬৯ খ্রি.
৪। কার্টিয়ার ১৭৬৯ - ১৭৭২ খ্রি.
৫। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২- ১৭৭৪ খ্রি.
গভর্নর জেনারেলগণ
১। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৪ ১৭৮৫ খ্রি.
২। স্যার জন ম্যাকফারসন ১৭৮৫- ১৭৮৬ খ্রি.
৩। লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৬-১৭৯৩ খ্রি.
৪। স্যার জন শোর ১৭৯৩ – ১৭৯৮ খ্রি.
৫। স্যার এ. ক্লার্ক ১৭৯৮ খ্রি.
৬। লর্ড ওয়েলেসলী ১৭৯৮ - ১৮০৫ খ্রি.
৭। কর্নওয়ালিস (দ্বিতীয়বার) ১৮০৫ খি.
৮। স্যার জন মার্লো ১৮০৫ - ১৮০৭ খ্রি.
৯। লর্ড মিন্টো ১৮০৭ - ১৮১৩ খ্রি.
১০। লর্ড হেস্টিংস ১৮১৩ – ১৮২৩ খ্রি.
১১। স্যার জন অ্যাডাম ১৮২৩ খ্রি.
১২। লর্ড আমহার্স্ট ১৮২৩ – ১৮২৮ খ্রি.
১৩। উইলিয়াম বেইল ১৮২৮ খ্রি.
১৪। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৮ ১৮৩৫ খ্রি.
১৫। স্যার চার্লস মেটকাফ ১৮৩৫ খ্রি.
১৬। লর্ড অকল্যান্ড ১৮৩৬ – ১৮৪২ খ্রি.
১৭। লর্ড এলেনবরা ১৮৪২- ১৮৪৪ খ্রি.
১৮। উইলিয়াম বার্ড ১৮৪৪ খ্রি.
১৯। লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৫ – ১৮৪৮ খ্রি.
২০।লর্ড ডালহৌসী ১৮৪৮ – ১৮৫৬ খ্রি.
২১। লর্ড ক্যানিং ১৮৫৬- ১৮৫৮ খ্রি
ভাইসরয়গণ
১। লর্ড ক্যানিং ১৮৫৮ - ১৮৬২ খ্রি.
২। লর্ড এলগিন ১৮৬২- ১৮৬৩ খ্রি.
রবার্ট নেপিয়ার ভারপ্রাপ্ত
উইলিয়াম ভেনিসন ভারপ্রাপ্ত
৩। স্যার জন লরেন্স ১৮৬৩ -১৮৬৯ খ্রি.
৪। লর্ড মেয়ো ১৮৬৯ -১৮৭২খ্রি.
জন স্ট্যাচে ভারপ্রাপ্ত
লর্ড নেপিয়ার ভারপ্রাপ্ত
৫। লর্ড নর্থব্রুক ১৮৭২ - ১৮৭৬খ্রি.
৬। লর্ড লিটন লিটন ১৮৭৬- ১৮৮০ খ্রি.
৭। লর্ড রিপন ১৮৮০ -১৮৮৪ খ্রি.
৮। লর্ড ডাফরিন ১৮৮৪ - ১৮৮৮ খ্রি.
৯। লর্ড ল্যান্স ডাউন ১৮৮৮ -১৮৯৪ খ্রি
১০। লর্ড এলগিন (দ্বিতীয়) ১৮৯৪ - ১৮৯৯ খ্রি.
১১। লর্ড কার্জন ১৮৯৯ - ১৯০৫ খ্রি.
১২। লর্ড মিন্টো (দ্বিতীয়) ১৯০৫ – ১৯১০ খ্রি.
১৩। লর্ড হার্ডিঞ্জ (দ্বিতীয়) ১৯১০ - ১৯১৬ খ্রি.
১৪। লর্ড চেমসফোর্ড ১৯১৬ – ১৯২১ খ্রি.
১৫। লর্ড রিডিং ১৯২১ - ১৯২৬ খ্রি.
১৬। লর্ড আরউইন ১৯২৬- ১৯৩১ খ্রি.
১৭। লর্ড উইলিংডেন ১৯৩১- ১৯৩৬ খ্রি.
১৮। লর্ড লিনলিথগো ১৯৩৬- ১৯৪৩ খ্রি.
১৯। লর্ড ওয়াভেল ১৯৪৩- ১৯৪৫ খ্রি.
২০। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৫ - ১৯৪৭ খ্রি.
সারসংক্ষেপ
মহারানি ভিক্টোরিয়া: মহারানি ভিক্টোরিয়া ছিলেন ইংল্যান্ডের রানি। জন্ম ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জানুয়ারি। পিতা
এডওয়ার্ড। চাচা চতুর্থ উইলিয়ামের মৃত্যুর পর ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে ইল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানির অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলায় ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহ সৃষ্টি হলে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে রানি ভিক্টোরিয়া এক ঘোষণা বলে উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে। সে কারণেই রানি ভিক্টোরিয়া উপমহাদেশের একটি পরিচিত নাম। শুধু ভারতবর্ষেই নয় ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের কারণে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকা মহাদেশের বিশাল অংশ তার শাসনাধীনে ছিল। এ কারণেই তিনি হলেন মহারানি। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে তাকে ভারত সম্রাজ্ঞী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ মহারানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি বহন করছে।
ইলবার্ট বিল: ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে এক আইন বলে ভারতীয় বিচারক ইউরোপীয় কোনো নাগরিকদের বিচার করতে পারত না। বিচারক্ষেত্রে এ বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে লর্ড লিটন আইন সদস্য মি. ইলবার্টকে একটি বিল প্রণয়ন করতে বলেন। ইলবার্ট একটি বিল তৈরি করেন এবং তাতে ইউরোপীয়দের বিচার করার ক্ষমতা ভারতীয় বিচারকদের দেওয়া হয়। আইন সদস্য ইলবার্টের নাম অনুযায়ী বিলটির নামকরণ হয় "ইলবার্ট বিল"।
বৈপ্লবিক আন্দোলন এটি ভারতীয় উপমহাদেশে একটি স্বরাজ আন্দোলন। স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন ব্যর্থ হলে জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী সদস্যরা বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু করে। এটি এক ধরনের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। বিপ্লবীরা ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার গভর্নর এভু ফ্লেজার এবং ব্যামফিল্ড ফলারকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
ক্ষুদিরাম: ক্ষুদিরাম বৈপ্লবিক দলের সদস্য ছিলেন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ কিংসফোর্ডের গাড়ি অনুমান করে বোমা নিক্ষেপ করে। কিন্তু কিংসফোর্ড-এর গাড়ি না থাকায় অন্য এক ইংরেজ কর্মকর্তার স্ত্রী-কন্যা নিহত হয়। এই হত্যার অভিযোগে তার ফাঁসি হয়। ক্ষুদিরামের ফাঁসিকে কেন্দ্র করে বহু কবিতা ও গান রচিত হয়। তেমনি একটি গান, 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।'
আলীগড় আন্দোলন: স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) আলীগড়কে কেন্দ্র করে যে সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন তাই আলীগড় আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল অধঃপতনে নিমজ্জিত মুসলমান সমাজকে আধুনিক (ইংরেজি) শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। মুসলমানরা ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে ব্রিটিশদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইংরেজি শিক্ষা থেকে তারা দূরে থাকে। সে সুযোগ হিন্দুরা গ্রহণ করে এগিয়ে যায়। এই অবস্থায় স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের জাগ্রত করার জন্য উক্ত আন্দোলন শুরু করে।
লক্ষ্ণৌ চুক্তি: লক্ষ্ণৌ চুক্তি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি। উপমহাদেশের দুই বিবেধমান হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে লক্ষ্ণৌ শহরে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের ক্ষেত্রে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ চুক্তি ৮ বছর স্থায়ী হয়।
খিলাফত আন্দোলন: তুরস্কের খিলাফতকে রক্ষার জন্য আলী ভ্রাতৃত্বদ্বয় এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে (১৯২০-১৯২৪) ভারতীয় উপমহাদেশে যে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল সেটাই খিলাফত আন্দোলন। এ আন্দোলনটি অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে এবং কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের খিলাফত বাতিল করলে এ আন্দোলনে থেমে যায়।
সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ: ইংরেজিতে বলা হয় Communal Award. ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যা (হিন্দু-মুসলমান)
নিরসনকল্পে (১৯৩০-১৯৩২) লন্ডনে ২টি গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং উক্ত গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়। তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামজে ম্যাকডোনাল্ড সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে ভারতীয়রা মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে বাধ্য হবেন। সে মোতাবেক ভারতীয়রা মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ আগস্ট ম্যাক ডোনাল্ড নিজ উদ্যোগে যে রোয়েদাদ প্রদান করে তাই সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Read more