Role of Bengalies Living Abroad and Other Countries in Our War of Independence
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সৈন্যদের নারকীয় তাণ্ডব এবং তাদের দোষরদের লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতায় বিশ্ব বিবেক থমকে দাঁড়ায়। বিশ্বের বিবেকবান প্রতিটি মানুষ ও বিভিন্ন দেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এগিয়ে আসে, আবার কিছু কিছু দেশ বিরোধিতা করে। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম প্রহরে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তাতে প্রবাসী বাঙালিরা ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। প্রবাসী বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়ে সহযোগিতার বিভিন্ন স্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে সদস্যদের নিকট আবেদন করা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে প্রেরণ এবং পাকিস্তান যাতে বহির্বিশ্ব থেকে আর্থিক সাহায্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে না পারে সে ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সরকারের নিকট আবেদনসহ জনমত গঠনে প্রবাসী বাঙালি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী বাঙালিদের এসব উদ্যোগের উদ্যোগের ফলে পাকিস্তানের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন দেশ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
জহির সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় তিনি বিশ্বের পরাক্রমশালী একটি দেশ ও একটি সংস্থার সমালোচনা করে বললেন, তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং যুদ্ধ বন্ধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়।
জহির সাহেব একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় তিনি বিশ্বের পরাক্রমশালী একটি দেশ ও একটি সংস্থার সমালোচনা করে বললেন, তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং যুদ্ধ বন্ধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়।
স্বাধীনতার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে সোহাগ বলল, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একটি দেশ বিবৃতিতে তথাকথিত বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের তীব্র সমালোচনা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এ নীতি পরিবর্তন করে।
Indian Government, People and Media in the War of Liberation of Bangladesh
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের ভূমিকা (Role of Indian Government of Liberation War in Bangladesh)
বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। এর পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসাম রাজ্য, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, উত্তরে ভারতের কুচবিহার রাজ্য এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। ভৌগোলিক দিক থেকেভারতের কোলঘেঁষে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ার কারণে একমাত্র ভারতই বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সংঘত কারণেই নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি। মানবিক কারণে ভারত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা অন্য কোনো দুঃসময়ে যেমন নীরব থাকতে পারে না তেমনি নীরব থাকতে পারেনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহাসংকটকালীন সময়ে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান অপরিসীম। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের কালরাতে গণহত্যা শুরুর পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার শরণার্থী ভারতে পাড়ি জমায়। এদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারত সরকার উদারতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কিন্তু ক্রমশ শরণার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে এত বড় সংখ্যক শরণার্থীর পুনর্বাসন ভারতের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ব্যতীত এ সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় ভারতের ছিল না। বিরাট সংখ্যক শরণার্থীর ভরণপোষণের জন্য স্বাভাবিকভাবেই ভারত বিশ্ব দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করল। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, এ সময় ভারত সরকার ৭৩টি দেশের কাছ থেকে সর্বমোট ২৬ কোটি ৪৪ লক্ষ ৯৬ হাজার ৪৬২ ডলার সাহায্য লাভ করে। সর্বোচ্চ সাহায্যের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম (৮ কোটি ৯১ লক্ষ ৫৭ হাজার ডলার), দ্বিতীয় স্থানে ব্রিটেন (৩ কোটি ৮১ লক্ষ ৮২ হাজার ১৩২ ডলার), তৃতীয় চতুর্থ সাহায্য দাতা ছিল যথাক্রমে কানাডা (২ কোটি ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৩০৭ ডলার) এবং সোভিয়েত রাশিয়া (২ কোটি ডলার)। ভারত কর্তৃক বিশ্ব দরবারে সাহায্য প্রার্থনায় ৩টি ফল হয়েছিল-
(১) প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে শরণার্থীদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
(২) মুক্তিযুদ্ধে ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।
(৩) বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর খবর বিশ্ববাসী জানতে পেরে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর সত্যিকার চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

ভারত সরকার কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বিশ্ব বিবেকের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের অজুহাতে বাংলাদেশে যে গণহত্যা চলছে তা প্রতিহত করা বাইরের শক্তির নৈতিক দায়িত্ব। ভারত মানবিক প্রেক্ষাপট হতেই বিষয়টি বিবেচনা করছে। এভাবে দেখা যায়, যুদ্ধের প্রথম দিক থেকেই ভারত বাঙালি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, খাদ্যের যোগানদিয়ে এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নির্বাসিত সরকার গঠন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন, মুক্তিবাহিনী গঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভারতের ব্যাপক সহায়তা রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বৈদ্যনাথতলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ব্যয়ের বড় অংশই ভারত বহন করত। কলকাতা রেডিও স্টেশনের একটি তলায় তাদের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে "স্বাধীন বাংলা বেতার" কেন্দ্রের অনুষ্ঠানাদি প্রচার করা সম্ভব হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের যোগান ভারত সরকার দিয়েছিল।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মস্কো গিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে সাময়িক হস্তক্ষেপের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্মতি নিশ্চিত করে। ৩০ নভেম্বর ভারতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য প্রত্যাহার করা না হলে সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে না। এ সময় ইন্দিরা গান্ধী তাঁর অল ইন্ডিয়া রেডিও'র এক ভাষণে বলেন, “গত মার্চ মাস থেকেই আমরা একটা ব্যাপক বিপদগ্রস্ত জনগণকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছি। তাদের দোষ ছিল যে তারা গণতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাদের সমস্যা আমাদেরকে ছুঁয়েছে- ভাবিয়েছেও বটে। চেষ্টা করেছি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের। কিন্তু বিশ্বসভা এর মূল সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাইরের দিকে সামান্য আলোচনায় এনেছে মাত্র। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই অবস্থার অবনতি হয়েছে। শৌর্যবান মুক্তিযোদ্ধারা জীবনকে যুদ্ধে বাজি রেখে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এক অসীম উন্মাদনায়। আমরা তাদের সম্মান করি।” ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে জাতিসংঘ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে যৌথবাহিনী গঠন করে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সর্বপ্রথম ভারতই স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর ভারতের নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য চূড়ান্ত আহ্বান জানালে ১৬ ডিসেম্বর যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এই যুদ্ধে ভারতের ৪ হাজার সৈন্যসহ অনেক বেসামরিক লোক নিহত হয়। প্রচুর অর্থ ও গোলাবারুদ ব্যয় হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ সীমান্তর্তী এলাকায় আর্থসামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সরকারের ত্যাগ অতুলনীয়।
ভারতীয় জনগণের ভূমিকা (Role of people in Indian)
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারের পাশাপাশি ভারতীয় জনগণ বিশেষ করে শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবদের ভূমিকা অনেক। বাংলাদেশকে সাহায্য করার জন্য ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিক সম্মিলিত হয়ে একটি সমিতি গঠন করে। এই সমিতির সভাপতি হন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮ এপ্রিল ভারতের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ রবি শংকর আমেরিকার লস এঞ্জেলসে বাংলাদেশ কনসার্টের' আয়োজন করে দশ লক্ষ ডলার সাহায্য দিয়েছিলেন শরণার্থী শিবিরের শিশুদের। মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রকাশ কর্মকার, শ্যামলাল দত্ত রায়, গণেশ পাইনের মতো খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ছবি এঁকে মুম্বাইয়ের রাস্তায় রাস্তায়, বিভিন্ন ফুটপাতে ঘুরে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্য ভারতীয় কবি-সাহিত্যিক বিশেষ করে অন্নদাশংকর, মৈত্রেয়ী দেবী, শান্তিময় রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তী, রমেন মিত্র প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে বাংলাদেশ তহবিলে পাঠিয়েছেন। শিল্পী বাঁধন দাস ছবি আঁকা ছেড়ে তার এক ডাক্তার বন্ধুকে নিয়ে শরণার্থী শিবিরে গিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্র খোলেন। শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন, গায়কেরা বাংলাদেশের জন্য গান গেয়েছেন, নাট্যকর্মীরা নাটক করেছেন, চলচ্চিত্রকাররা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এভাবে ভারতীয়রা যার যার পেশায় থেকে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে।
ভারতের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা (Role of media in Indian)
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা রেখেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অতুলনীয়। আগরতলায় এবং কলকাতায় অবস্থিত "স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র" মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত সংবাদ, গান, বীরত্বগাথা, চরমপত্র, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা তুলে ধরে একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন চাঙ্গা রেখেছে অন্যদিকে তেমনি বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। ভারতের রেডিও তাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান বাদ রেখে বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গান, সামরিক সংবাদ বার বার প্রচার করেছে। প্রিন্ট মিডিয়াও সমান অবদান রেখেছে। নিরীহ বাঙালির ওপর পাকবাহিনীর নির্মম আক্রমণ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা প্রভৃতি কারণগুলো প্রিন্ট মিডিয়া বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। যখন বাংলাদেশের ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র পাকবাহিনী বন্ধ করে দিয়েছে তখন ভারতের সংবাদপত্র- শরণার্থীদের সংবাদ, মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ, পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ প্রচার করে স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে অনন্য অবদান রেখেছে।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Role of Great Powers in War of Liberation
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা (Role of Soviet Union)
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে ভারতের পরেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিকোলাই পদগোর্নি ইয়াহিয়া খানকে এক পত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন ও রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানান। পাশাপাশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন পাকবাহিনী পর্যুদস্ত তখন পাকিস্তানের অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রিয়ার কাছে অবস্থানরত তাদের সপ্তম নৌবহর (বহরে ১৭টি যুদ্ধ জাহাজ) পাকিস্তানের সাহায্যের জন্য ভারত মহাসাগরে পাঠান। এ সংবাদে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত অষ্টম নৌবহরকে (বহরে ২৬টি যুদ্ধ জাহাজ) বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করে। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সাত দিন অপেক্ষা করে তাদের নৌবহর ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। পরাশক্তিদের মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারির ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিকট পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন তিনবার ভেটো দেয়। মুক্তিযুদ্ধের ব্যবহৃত অনেক অস্ত্রই সোভিয়েত ইউনিয়ন সরবরাহ করে। সোভিয়েতের পত্র-পত্রিকা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোও সোভিয়েত সরকারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে পাকবাহিনীর নির্লজ্জ বর্বরোচিত কাহিনী প্রচার করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে। ফলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কিউবা, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, যুগোশ্লোভাকিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মান প্রভৃতি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো আন্তরিকভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন জানায়।
বাংলাদেশের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের কারণ হিসেবে বলা যায়-প্রথমত, পাকিস্তানি সামরিক শাসকবর্গ ছিলেন অতি মাত্রায় ভারত বিরোধী এবং চীন ঘেঁষা। সেখানে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে ভারত ও মস্কো ঘেঁষা আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলে সোভি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে তৎপর হন। তাতে পাকিস্তান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক পাবে। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সোভিয়েত এবং চীনের মধ্যে চরম বৈরিতা বিরাজমান ছিল। অবঃ এমন ছিল যে, কোনো দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র হলে সে দেশটি চীনের শত্রুতে পরিণত হবে। আর এ কারু পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মিত্র হয়েছে। তবে একথা সত্য যে, ঐ স সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়তো আরও পিছিয়ে যেত।

গ্রেট ব্রিটেনের ভূমিকা (Role of Great Britain)
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন, গণহত্যা, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর করুণ অবস্থা, বাঙালিদের সংগ্রাম, অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ব জনমতকে জাগ্রত করে তুলতে ব্রিটেনের প্রচার মাধ্যম বিশেষ করে বিবিসি ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লন্ডন ছিল বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারের প্রধান কেন্দ্র। পাকিস্তানের বর্বরতার বিরুদ্ধে ব্রিটেন কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যের স্বাক্ষর গ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়। আগস্ট মাসে ব্রিটেনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ মিশন চালু হয়। লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সায়মন্ড ড্রিংস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকার গণহত্যার সংবাদ সর্বপ্রথম বিশ্বসভায় উপস্থাপন করেন। এছাড়া বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালী মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নিরলস পরিশ্রম করে গণহত্যা এবং রণক্ষেত্রের সংবাদ সংগ্রহ করে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন। লন্ডন টেলিভিশনের প্রতিনিধি শিলা, যিনি অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সাথে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের চিত্র সারা পৃথিবীতে প্রচার করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার মুক্তিযুদ্ধ কাল্পনিক কিছু নয়। এই নারী সাংবাদিক এক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় এক সপ্তাহ বাংকারে বসে যুদ্ধের ছবি তুলেছেন।

ন জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন নিউইয়র্ক শহরে ৪০ হাজার লোকের সমাগমে বাংলাদেশের বৃদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডভিত্তিক গণসংগীত পরিবেশন করে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
নি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা (Role of United States of America)
দেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার সরকারি নীতি ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে (পাকিস্তানের পক্ষে)। কিন্তু মার্কিন সভা, কংগ্রেস, সিনেটের অনেক সদস্য, মার্কিন পত্র-পত্রিকা, প্রচার মাধ্যম, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, জনগণ এবং কস্তানি কূটনৈতিক মিশনে কর্মরত বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। এই বৃহৎ অংশের চাপেই ভারতে অবস্থানরত লি শরণার্থীদের সর্বোচ্চ সাহায্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই করেছিল এবং পাকিস্তানের সামরিক সাহায্য বন্ধ করতে হয়েছিল।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের কিছুই করার নেই বলে অভিমত প্রকাশ করেন। এ সময় হেনরি কিসিঞ্জার 'বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি' বলেও উপহাস করেন। ১০ জুলাই, ১৯৭১-এর পর থেকে মার্কিন সরকার তাদের নিরপেক্ষ নীতি পরিহার করে হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করে। ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার জন্য আহ্বান জানান। পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্যের লক্ষ্যে ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর (পারমাণবিক অস্ত্রে সুসজ্জিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি জাহাজ সমন্বয়ে গঠিত নৌবহর) ভারত মহাসাগরে পাঠায়। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হুঁশিয়ারে সপ্তম নৌবহর দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের পরাজয়ের মুখে যুদ্ধ বিরতি ঘটিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভণ্ডুল করতেও জাতিসংঘে কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাধার মুখে সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। মার্কিন সরকারি নীতি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকলেও মার্কিন সংবাদ মাধ্যম এবং কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ছিল বাংলাদেশের পরম সুহৃদ। মার্কিন সংবাদপত্রসমূহের মধ্যে ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন ইভনিং স্টার, ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল ইত্যাদি সংবাদপত্র বাংলাদেশে পাকবাহিনীর তাণ্ডব এবং মুক্তিযুদ্ধের বিষয়সমূহ নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ পরিবেশন করে। 'ওয়াশিংটন পোস্ট' এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে স্বদেশের নাগরিক হত্যার জন্য ইয়াহিয়াকে দায়ী করে।
মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীগণও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। 'এসোসিয়েশন ফর এশিয়ান স্টাডিজ'-এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রায় দু'হাজার শিক্ষাবিদ অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধের জন্য আবেদন জানান। এ সম্মেলনে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে অনুরোধ করে। ৩০ জন বুদ্ধিজীবী দলবদ্ধভাবে ঘোষণা করেন যে, "পূর্ব পাকিস্তানে ন্যায়সংগত দাবিকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উপেক্ষা করার কোন অধিকার পাকিস্তানের নেই।" এছাড়া হার্ভার্ড ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ অত্যন্ত ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ কনসার্ট' ছিল মুক্তিযুদ্ধে এক বিরাট অনুপ্রেরণা। মার্কিন রাজনীতিবিদ বিশেষ করে সিনেটের এডওয়ার্ড কেনেডির অবদান প্রশংসনীয়। তিনি সরকারের বিপক্ষে গিয়ে ভারতে শরণার্থীর সমস্যা নিয়ে ২৮ জুন, ২২ জুলাই এবং ৩০ অক্টোবর তিনটি শুনানির ব্যবস্থা করেন। তার এবং কংগ্রেসম্যান হেনরির প্রচেষ্টাই নিক্সন প্রশাসন ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। আমেরিকার বাঙালি প্রবাসী সর্বতোভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করে। পাকিস্তানের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মরত বাঙালিরা এক পর্যায় বাংলাদেশের পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র আমেরিকানরা বাঙালিদের সাহায্য সমিতি প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গঠন করে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওপররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ মার্কিন প্রশাসনের নীতি নির্ধারক মহল ব্যতীত সাধারণ জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে। মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাহত করতে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উপমহাদেশের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দিতে পায়তারা করে। পাকিস্তানিদের সুনিশ্চিত পরাজয় জেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা জাতিসংঘের নিকট যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উপস্থাপন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই ব্রিটেন ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তার আপন ঠিকানায় পৌছে দিতে সহায়তা করেছে।
চীনের ভূমিকা (Role of China)
মার্কিন প্রশাসন নিক্সন-কিসিঞ্জারের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল গণচীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের বিপক্ষে থাকার কারণ হিসেবে বলা যায়। প্রথমত, পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার ওপর চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করত। তাই অখণ্ড পাকিস্তান রাখতে চীনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি চিয়াং কাইশেক পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। দ্বিতীয়ত, বাঙালি জাতি যদি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে ফেলে তাহলে সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চীনের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ হতে পারে। সুতরাং চীন তাদের জাতীয় স্বার্থরক্ষার জন্যই পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার নীতি গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকাকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে ৩ ডিসেম্বর ভারত মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়, ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ পর্যন্ত। প্রথম পর্যায়, ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চীন প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গোপনে ইয়াহিয়ার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে অন্ধের মতো সমর্থন দিয়ে সাহস যুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যার জন্য যে স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার অধিকাংশই চীন সরবরাহ করে (যার মূল্য ৪৫ মিলিয়ন ডলার)। সেপ্টেম্বর মাসে চীন পাকিস্তানকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, জাতীয় স্বার্থে চীন পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনা অনুসারী বিপ্লবী নকশালপন্থিরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। চীন নেপথ্যে এ নকশালিদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল।
দ্বিতীয় পর্যায়, ৩ ডিসেম্বর যখন ভারতের ওপর পাকিস্তান বিমান হামলা চালায় এবং ভারত যৌথবাহিনী গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তখন থেকে চীন জাতিসংঘে সরাসরি বাঙালি বিরোধী ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে ৫ ও ৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘে দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করলে চীন প্রস্তাব দুটির বিরুদ্ধে প্রথমত ভেটো প্রয়োগ করেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে চীন এক বিবৃতিতে তথাকথিত বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের তীব্র সমালোচনা করে। তবে পরবর্তীতে চীন তার নীতি পরিবর্তন করে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় (৩১ আগস্ট, ১৯৭৫ খ্রি.)।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Liberation War and Other Countries
২৫ মার্চ কালোরাত এবং তার পরবর্তী সময়ের গণহত্যা সম্পর্কে বিভিন্ন দেশ নিন্দা ও প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। এ সময় শক্তিশালী রাষ্ট্র ছাড়াও বেশ কিছু রাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। এ সকল রাষ্ট্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভুটান (দ্বিতীয় স্বীকৃতিকারী দেশ- ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১), নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ইরান, পশ্চিম জার্মান, ইতালি, জাপান এবং কানাডা। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যেমন- কিউবা, যুগোশ্লাভিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, চেকশ্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মান প্রভৃতি দেশগুলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিল।
বহির্বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গণচীন ছাড়া যে কয়টি দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল সে কয়টি দেশের মধ্যে সৌদি আরব, লিবিয়া জর্দান এবং উত্তর কোরিয়া অন্যতম। সৌদি আরব শুধু পাকিস্তানকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সাহায্য দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বেতার ও সংবাদপত্র মারফত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রচণ্ড বিরোধিতা করে এবং গণচীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নামে উত্তর কোরিয়া। নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করেছিল এই দেশটি।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Role of UNO and Other Organization in the War of Liberation
মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘ (UNO of the war of liberation)
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় লীগ অব নেশনের ব্যর্থতার পর ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘের জন্ম হয়। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাঙালি নিধনে ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এ সংস্থাটি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। রাশিয়া, পোল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধের জন্য জাতিসংঘের নিকট আবেদন জানালেও নীরব থাকে। পাকিস্তানের নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিকট যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের হুঁশিয়ারিতে সে প্রস্তাব নাকচ করে, কিন্তু জাতিসংঘের নিজস্ব ক্ষমতা বলে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করলেও জাতিসংঘ প্রতিবাদ করেনি। জাতিসংঘ ইয়াহিয়া খানের মতোই সমগ্র বিষয়টিকে পাক-ভারত সংঘর্ষরূপে আখ্যায়িত করতে চেয়েছিল। তাতে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
২৫ মার্চের পূর্বে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব ড. উথান্ট ঢাকা থেকে সকল জাতিসংঘ কর্মীকে প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু এদেশে গণহত্যা বন্ধের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন জানালেও মূলত ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ জাতিসংঘের ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল তা নিম্নে প্রদত্ত হলো:
১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তৎপরতা।
২। যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ।
৩। মুজিবনগর সরকারের সাথে যোগাযোগ।
৪। শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের প্রশ্নে অবদান।
৫। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান প্রশ্নে জাতিসংঘ।
১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তৎপরতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তৎপরতা বিশেষ করে শরণার্থীদের ভরণপোষণে জাতিসংঘের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই শরণার্থী একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এটি অল্প সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংকট থেকে আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বাধীনতার প্রশ্নে আত্মরক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত জনগোষ্ঠী কখনো বাস্তুচ্যুত হয়নি। পাকবাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা, জাতিগত নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে থাকে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ভারতের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশের অবস্থান বিধায় একমাত্র ভারতই বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। তাই মানুষ দলে দলে শুধু ভারতেই আশ্রয়ের জন্য ছুটতে থাকে। ফলে ভারতে শরণার্থীদের চাপ বাড়তে থাকে। ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থীর খাদ্য, বস্ত্র, পানি, মাথা গোঁজার ঠাঁই, ঔষধপত্র ইত্যাদি ব্যবস্থা করতে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় জাতিসংঘ তার ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে এগিয়ে আসে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এর প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগাখান বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যাকে জাতিসংঘের এক মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন।
জাতিসংঘ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের জুন পর্যন্ত ভারতকে শরণার্থীর সাহায্যের জন্য ৯,৮০,০০,০০০ মার্কিন ডলার অর্থ প্রদান করে। জুনের পর এই সাহায্য বাড়তে থাকে। সর্ব সাকুল্যে জাতিসংঘের সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৫ মিলিয়ন ডলার; যা টাকার অঙ্কের হিসেবে শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সহায়তা ছিল সামান্য। সদরুদ্দিন আগা খানের বিবরণ থেকে তৎকালীন সময় জাতিসংঘ কর্তৃক সাহায্যের একটি তালিকায় দেখা যায়-
| ক্রমিক নং | সাহায্যের বিষয় | সাহায্যের পরিমাণ |
| ১. | খাদ্য সাহায্য | ৬২৬৭ টন |
| ২. | ঔষধ সামগ্রী | ৭০০ টন |
| ৩. | যানবাহন | ২২০০ টন |
| আশ্রয়স্থল তৈরির সরঞ্জাম | ৩০ লক্ষ শরণার্থীর প্রয়োজনীয় | |
| ৫. | নগদ অর্থ | ২১৫ মিলিয়ন ডলার |
সে সময় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সাথে বেসরকারিভাবে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করেছিল তাদের মধ্যে "ইউনিসেফ কেয়ার শিশু খাদ্য কর্মসূচি" অন্যতম। এই কর্মসূচির উদ্যোক্তাগণ পাক শাসকদের সাথে লিখিতভাবে চুক্তি করেন যে, স্কুলে উপস্থিতির পাশাপাশি অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের সাহায্য দেওয়া হবে। এর ফলে যেসব শিক্ষার্থীরা ভয়ে স্কুলে যেত না তাদেরও সাহায্য পাবার উপায় হয়।
২। যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ: যুদ্ধ বন্ধ ও রাজনৈতিক সমাধান প্রশ্নে জাতিসংঘ বেশ
কিছু অকার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত সংকটকে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রধানরা তাদের নিজস্ব এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে তৎপরতা চালায়। বৃহৎ শক্তির ইঙ্গিতে জাতিসংঘ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। যেমন- (ক) ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক মোতায়েন প্রস্তাব করে (১৯ জুলাই, ১৯৭১), যাতে সীমান্তে শরণার্থীদের তদারকি করা যায়। পাকিস্তান সরকার আনন্দের সাথে প্রস্তাব গ্রহণ করে কিন্তু ভারত ও মুজিবনগর সরকার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে জাতিসংঘের উদ্যোগ অকার্যকর হয়। (খ) সীমান্তে পর্যবেক্ষক মোতায়েন প্রস্তাব বাতিলের পরদিন অর্থাৎ ২০ জুলাই জাতিসংঘের মহাসচিব ৯৯ ধারা অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও সদস্য রাষ্ট্রসমূহের বরাবর একটি স্মারকপত্র প্রদান করেন। এ স্মারক পত্রে মহাসচিব বাঙালির গণহত্যার বিষয়টি পূর্ববর্তী শত্রুতার জের হিসেবে একটি আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেন। (গ) বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় যখন সুনিশ্চিত তখন জাতিসংঘ আর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেটা হলো যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ। ২০ অক্টোবর, ১৯৭১ জাতিসংঘের মহাসচিব উ-থান্ট ভারত ও পাকিস্তান সরকারের 'কাছে এক পত্রে তার' Good Office ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। মহাসচিব ড. উথান্ট এর পত্রের বিষয়বস্তু ছিল- তিনি সমগ্র ঘটনাটিকে পাক-ভারত সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের যে উদ্দেশ্য ছিল (মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধের রূপ দান) সেটাই জাতিসংঘের মহাসচিবের পত্রে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং দেখা যায়, ইয়াহিয়া ও জাতিসংঘের মহাসচিব উভয়ই সমস্যাটিকে দেখেছেন পাক-ভারত সমস্যা হিসেবে। আর এটা বাস্তবায়ন করতে পারলেই বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম অমীমাংসিত থেকে যেত।
৩। মুজিবনগর সরকারের সাথে যোগাযোগ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে মুজিবনগর সরকারের সাথে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ
কোনো যোগাযোগ ছিল না, তবে পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে যোগাযোগ বিস্তৃত হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের মূল লক্ষ ছিল মুজিবনগরের অসহায় মানুষদের সাহায্য করা। মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি দলের সাথে জাতিসংঘের সরাসরি পত্র যোগাযোগ হয় আগস্ট মাসে। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারে উদ্যোগী হলে ১৮ সেপ্টেম্বর মুজিবনগর সরকার জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের বরাবর এক পত্রে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে জনাব মওদুদ আহমেদ ঐ মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এর জবাবে ২৭ আগস্ট সহকারী মহাসচিবের অফিস থেকে জানানো হয় যে, আইনগত জটিলতার কারণে মওদুদকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করতে মহাসচিব তার Good Office ব্যবহার করতে পারছে না। এর জবাবে মওদুদ আহমেদ আবার চিঠি লিখে মহাসচিবকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে এ পত্রালাপ বেশি দূর অগ্রসর হয়নি।
৪। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের প্রশ্নে অবদান ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ আগস্ট পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের উদ্যোগী হলে জাতিসংঘের মহাসচিব সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তিনি স্পষ্টভাবে উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তিনি বিষয়টিকে শুধু পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থার এখতিয়ারাধীন বিষয় হিসেবে না ভেবে বরং এর রাজনৈতিক গুরুত্বসহ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে একটি ব্যতিক্রমী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। International commission of Jurist আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিকট প্রেরিত এক টেলিগ্রামে গোপন বিচারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ২৭ আগস্ট মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি মওদুদু আহমেদের নিকট এক পত্রে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের অফিসের ডিরেক্টর ব্রায়ান জানান যে, জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করছেন এবং পরিস্থিতি যাতে অবনতি না ঘটে সে চেষ্টা করছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'প্রহসনমূলক' বিচার বন্ধে জাতিসংঘের মহাসচিবের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ রক্ষা পায়।
৫। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান প্রশ্নে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নতুন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে স্বীকৃতি নিয়ে। মুজিবনগর সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল বিশ্ব জনমত সৃষ্টি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন। এজন্য মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজধানী এবং জাতিসংঘ ভবনে তৎপরতা চালায়। স্বীকৃতি শুধুমাত্র একটি আইনগত বিষয় নয় বরং এর সাথে রাজনৈতিক প্রশ্ন জড়িত থাকে। কখন একটি নতুন দেশকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে সমকালীন লেখকগণ মনে করেন, চূড়ান্ত স্বীকৃতি তখনই দেওয়া যায় যখন কোনো রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র গঠনের সকল শর্ত অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই ৪টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির উল্লিখিত ৪টি উপাদান সম্পূর্ণই ছিল। যুদ্ধকালীন নয় মাস মুজিবনগর সরকার হিলি, রৌমারীসহ কিছু কিছু এলাকা শাসন করে এবং বাংলাদেশের ভূমির ৮০ ভাগ মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে। এ সরকারের একটি নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে একটি বেতার যন্ত্র ছিল, রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল, যেখান থেকে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হতো। এছাড়া মুজিবনগর সরকার ছিল একটি সর্বদলীয় সরকার। একটি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার সকল যোগ্যতা (আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনবল, সরকার ও সার্বভৌমত্ব) থাকা সত্ত্বেও এবং মুজিবনগর সরকারের কূটনীতিবিদরা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনে যোগাযোগ করলেও জাতিসংঘ মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।
প্রকৃতপক্ষে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা ছিল না। তবে তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব বার্মার নাগরিক উ-থান্ট ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সহায়তা দেবার পক্ষে - ছিলেন। বাংলাদেশ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে।
সুতরাং দেখা যায় যে, ত্রাণকার্য পরিচালনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রশ্নে ভূমিকা রাখা ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধে অন্যান্য সংস্থা ( Other organization in the war of liberation)
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন সংস্থা সাহায্যে এগিয়ে আসে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে প্রাণ ভয়ে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এই বিশাল শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল বেশ কিছু সংস্থা। এসকল সংস্থার মধ্যে- মিশনারিজ অব চ্যারেটি, ভারত সেবা আশ্রয় সংঘ, নিখিল ভারত মারোয়ারী সম্মেলন, ভারত সেবা সমাজ, ভারত স্কাউট ও গাইডস, বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতি, বাস্তুহারা সহায়ক সমিতি, ভলানটিয়ার কোর, ইন্ডিয়ান রেডক্রস সোসাইটি, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন, রামকৃষ্ণ মিশন, নারী কল্যাণ সমিতি, চন্দ্রপাড়া সেবা সমিতি, কুচবিহার রিফ্রজি সার্ভিসেস, গুজরাট রিলিফ সোসাইটি, এছাড়া বিদেশি এনজিও যেমন- কাথলিক রিলিফ সার্ভিসেস, কো-অপারেটিভ আমেরিকা রিলিফ এভরিহোয়ার কেয়ার, কারিতাস, সেভ দ্যা চিলড্রেন অক্সফার্ম, টেরেডাস হোমস, সুইডিস মিশন, ইউনাইটেড রিলিফ সার্ভিসেস এবং ওয়ার অন ওয়ান্ট ইত্যাদি সংস্থা বাঙালি শরণার্থীদের সেবায় এগিয়ে আসে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির গ্রহণের কারণে বাংলাদেশ অতি সহজেই জাতিসংঘভুক্ত সদস্য দেশগুলোর সহানুভূতি অর্জন করে। ফলে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সদস্য পদ, ২২ জুন, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সদস্য পদ ১৯ অক্টোবর, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর সদস্য পদ, ১৭ মে, ১৯৯২ খিস্টাব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সদস্য পদসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Immigrant Bangalies and Foreign Personalities in Liberation War
মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা (The role of immigrant Bangaliess in liberation war)
যে সকল বাংলাদেশি মা-বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী, সন্তান এবং নিকট আত্মীয়-স্বজন রেখে ব্যবসায়-বাণিজ্য কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে অবস্থান করে তারাই প্রবাসী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই প্রবাসীদের ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাঙালি প্রবাসীরা যে যে স্থানে ছিল সেখান থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধকে সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে যার যার অবস্থান অনুযায়ী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে প্রবাসী বাঙালিরা বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ অব্যাহত রাখা, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীদের খাদ্য, বস্ত্র ও ঔষধের ব্যবস্থা করা এবং পাকিস্তানের পক্ষে সামরিক সাহায্য বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতায় অবদান রাখে।
প্রবাসীদের ভূমিকার প্রশ্নে প্রথমেই আসে ব্রিটেন প্রবাসীর কথা। তখন ব্রিটেনে প্রায় ৭০ হাজার প্রবাসী বাঙালি ছিল। ব্রিটেনে ২০টি শহরে কমিটি, আঞ্চলিক কমিটি, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্বপ্রকার কর্মকাণ্ড মনিটরিং করার জন্য 'অ্যাকশন কমিটি ফর দি পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ' এবং 'স্টিয়ারিং কমিটি অব দি পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ' নামে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। লন্ডনে ১১ নং গোরিং স্ট্রিট ছিল এ কমিটিগুলোর সদর দপ্তর। মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য সংগ্রহের জন্য লন্ডনে হামরোজ ব্যাংকে 'বাংলাদেশ ফান্ড' নামে একটি একাউন্ট খোলা হয়। এই একাউন্টের অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র, খাদ্য, ঔষধ ক্রয় করে লন্ডন থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হতো। ১ আগস্ট, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনের ট্রাফলগার্ড স্কোয়ারে ৪০,০০০ লোকের এক সমাবেশের আয়োজন করে প্রবাসী বাঙালিরা। এসব কিছুর প্রধান ব্যক্তি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী [পরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (১২.০১.১৯৭২ ২৪.১২.১৯৭৩)]। -
এমনিভাবে ওয়াশিংটনে এম. আর সিদ্দিকের নেতৃত্বে, নিউইয়র্কে মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মিশন খুলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে প্রবাসীরা। নেদারল্যান্ডে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য জহির উদ্দিন এবং আমীর আলীর নেতৃত্বে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সবচেয়ে বৃহত্তম কর্মপরিষদ কমিটি গঠিত হয়েছিল ভারতের কলকাতায় এবং আগরতলায়।
মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি ব্যক্তিবর্গ (Foreign personalities in liberation war)
বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি জনতা সমর্থন দিয়েছিল। যুগিয়েছে আমাদের প্রেরণা, সৃষ্টি করেছে বিশ্বজনমত, দিয়েছে সেবা, দিয়েছে আর্থিক সাহায্য। ভারতে শরণার্থী শিবিরে যে মানুষটি নিজের জীবন বিপন্ন করে সেবা দিয়েছেন তিনি হলেন মাদার তেরেসা। তার মিশনারিজ অব চ্যারেটির সদস্যদের নিয়ে শরণার্থীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাদের চরম দুর্দশা দেখেছেন খুব কাছ থেকে এবং বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। মাদার তেরেসা বলেছেন, এ সমস্যা কেবল ভারতের সমস্যা নয়, গোটা পৃথিবীর এ সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, সানডে টাইমসের নিকোলাস টোমালিন, দ্য ডেইলি টেলিগ্রামের সাংবাদিক ক্লেয়ার ইলিং ওয়ার্থ। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পরে ভারতের যিনি সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন তিনি হলেন সমাজবাদী নেতা শ্রী জয় প্রকাশ নারায়ণ। পশ্চিম ইউরোপীয় ব্রিটিশ এম.পি স্যার লর্ড পিটার সোরের অবদানও কম নয়। । তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানে গিয়ে সরাসরি বাঙালির ওপর বর্বরতম গণহত্যা চালানোর জন্য নিন্দা জানিয়ে এসেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রয়েছে মার্কিন কবি অ্যানে গিন্সবার্গ-এর। কলমকেই তিনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৫১ লাইনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা তার বিখ্যাত কবিতা 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড' সর্বকালের সেরা কবিতা হয়ে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে। কবিতাটির লেখার সময়কাল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪-১৬ নভেম্বর। ফ্রান্সের অধিবাসী বিখ্যাত লেখক 'মশিয়ে আন্দে মালরোর' অবদানও ছিল অপরিসীম। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাড়া যুগিয়েছিলেন। তার মতো বিখ্যাত লোক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেখে পৃথিবী অবাক হয়।
Birth Name: William A. S. Ouderland
Born : December 6, 1917
Armsterdarm, Netherlands
Died : May 18, 2001 (Aged 83)
Perth, Western Australia
Battles/Wars:
World War II
Bangladesh Liberation War
Awards: Bir Protik

তার মতো আর একজন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন নেদারল্যান্ডের ডব্লিউ এ.এস ওদারল্যান্ড। তিনিই একমাত্র বিদেশি যাকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। তার জন্ম ১৯১৭ সালে। ১৯৩৬ সালে তিনি ডাচ ন্যাশনাল সার্ভিসে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এ কমান্ডো সেনা ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান নাৎসি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাটা সু কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে ছিলেন। পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা দেখে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অপারেশন সার্চলাইটের ভয়াবহ দৃশ্য তিনি রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে ক্যামেরাবন্দি করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠান। নিজের মানবিক তাড়নাতেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে লড়তে থাকেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। আগস্ট মাসে তিনি নিজ কর্মস্থল টঙ্গীতে বাটা সু কোম্পানির ভেতরে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। টঙ্গী এর আশেপাশে কয়েকটি গেরিলা হামলায় তিনি সাফল্য অর্জন করেন। বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত এই অকৃত্রিম বন্ধু ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে অস্ট্রিলিয়ার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান প্রসঙ্গে আর একজনের নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের এডওয়ার্ড কেনেডি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যখন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল সেই মুহূর্তে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আমেরিকান ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পাকবাহিনীর নৃশংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে বর্বর পাকিস্তান সরকারকে গোপনে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার জন্য সরাসরি অভিযুক্ত করেছিলেন। ভারতে অবস্থানরত এক কোটি বাঙালি শরণার্থীর চরম দুর্দশা নিজ চোখে দেখে তিনি আমেরিকার সিনেটের নিকট "ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া" নামে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। আমেরিকার সর্বোচ্চ ত্রাণ সাহায্যে কেনেডির অবদান অনেকখানি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মনোযোগ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তার জোর প্রচেষ্টা না থাকলে হয়তো নয় মাসে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হতো না।
নিউইয়র্ক স্কোয়ার গার্ডেনে ভারতের ওস্তাদ রবি শংকরের উদ্যোগে ওপেন কনসার্টে লাখো মানুষের সামনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের নিয়ে "বাংলাদেশ" নামে গান পরিবেশন করে যিনি বিশ্ববাসীকে চমক দেখিয়েছেন এবং প্রাপ্ত অর্থ শরণার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি হলেন আমেরিকার বিখ্যাত গায়ক জর্জ হ্যারিসন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ভোলার নয়। এভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহস্র ব্যক্তি সহস্র দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তথা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে নিঃস্বার্থ অবদান রেখেছেন। তাদের সকলের সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা যায় না। আমরা তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Honour of the Foreign Personalities
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অসামান্য অবদানের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানায়। এই সম্মাননা প্রক্রিয়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: ১। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা ২। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা ও ৩। মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা। প্রথমটি দেওয়া হয়েছে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে এ সম্মাননা গ্রহণ করেন তার পুত্রবধূ ও ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। আর এ সম্মাননা তুলে দেন বাংলাদেশের পক্ষে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলুর রহমান। অন্য দুটি দেওয়া হয় বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনকে।
সম্মাননা প্রাপ্ত দেশগুলো হলো- ভারত, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, সাবেক যুগোশ্লাভিয়া, ইতালি, জাপান, নেপাল, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, নেদারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া 'ও কানাডা।
সম্মাননা প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ভারতের সিদ্ধার্থ শংকর রায়, বিচারপতি স'দাত আবুল মাসুদ, মহারানী বিভা কুমারী দেবী, সমর সেন, পণ্ডিত রবিশংকর, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁন, অভিনেতা সুনীল দত্ত, অন্নদাশংকর রায়, ভুপেন হাজারিকা, লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা প্রমুখ। রাশিয়ার নিকোলাই পদগোর্নি, আন্দে গোমিকো, ইয়াকভ মালিক, অধ্যাপক ভ্লাদিমির স্ট্যানিস, লিওনিদ বেজনেভ প্রমুখ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড টেইলর, সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, রবার্ট ডফম্যান প্রমুখ। গ্রেট ব্রিটেনের অ্যাডওয়ার্থ হীথ, হ্যারল্ড উইলসন, পিটর ডেভিড শোর, মাইকেল বার্নস, সায়মন ড্রিংক, গায়ক জর্জ হ্যারিসন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে উক্ত সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
সারসংক্ষেপ
শরণার্থী: কোনো দেশের জনসাধারণ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য যখন অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেয় তখন তাদের শরণার্থী বলা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সীমাহীন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। ইতিহাসে এরাই শরণার্থী নামে পরিচিত। ভারত সরকার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দেশের সহায়তায় শরণার্থীদের থাকা, খাওয়া ও ঔষধপত্রের সংস্থান হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন: বর্তমান রাশিয়ার পূর্ব নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী জার শাসকদের পতন ঘটিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একইসাথে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়। পরবর্তীতে পুঁজিবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহিত স্নায়ুযুদ্ধে সমাজতন্ত্রের পতন হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি প্রদেশের একটির নাম রাশিয়া।
ব্রিটেন: ব্রিটিশ জাতিগোষ্ঠীর ভূখণ্ডই হচ্ছে ব্রিটেন বা ইংল্যান্ড। এটি একটি যুক্তরাজ্য। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বৃহৎ শক্তির মধ্যে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পরেই ব্রিটেনের অবদান। ব্রিটেন ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় শরণার্থীদের সাহায্য, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা প্রচার করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে বাংলাদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
প্রবাসী বাঙালি: যে সকল বাঙালি জীবন ও জীবিকার তাগিদে দেশের মায়া ত্যাগ করে দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে তাদের সাধারণত প্রবাসী বলা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালিরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিপুল পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ব্রিটেন প্রবাসীরা। তখন ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।...
মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বহু বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অকৃত্রিমভাবে বাংলাদেশকে সাহায্য করছে। তাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনেকটা সহজ হয়েছে। এ সকল ব্যক্তিবর্গের অবদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানিয়েছে। এ সম্মাননাকে ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। যথা:
(১) বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা (২) বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা এবং (৩) মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
পাকিস্তানি আমলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ও এর গতি-প্রকৃতি-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই
Read more