Anglo Mysore War : Haydar Ali
অষ্টাদশ শতকের ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে অজ্ঞাত কুলশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, দুঃসাহসিক ব্যক্তিদের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। এদের মধ্যে মহীশূরের হায়দার আলী, পাঞ্জাবের রঞ্জিৎ সিংহ, বাংলার আলিবর্দী খান অন্যতম। হায়দার আলী ১৭২১ খ্রিষ্টাব্দে বুদিকোটে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফতে মোহাম্মাদ মহীশূরের এক সৈনিক ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর হায়দার আলীও এক ভাগ্যান্বেষী সৈনিক হিসেবে জীবন শুরু করেন। হায়দার আলী লেখাপড়া জানতো না। তবে তিনি অসীম সাহস, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। যে কারণে তিনি মহীশূরের সেনাপতি নঞ্জরাজের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি হায়দ্রাবাদ এবং ত্রিচিনী পল্লিতে ফরাসি যুদ্ধে অংশ নিয়ে ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী দিন্দিগুলের ফৌজদার পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। মূলত এখান থেকেই হায়দার আলীর ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ক্ষমতা গ্রহণ
মহীশূরের রাজ পরিবারের দুর্বলভার সুযোগে সেনাপতি নজবাজ ও তার প্রাতা দেবরাজ মহীশূরের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। রাজ্যের সবল ক্ষমতা তাদের হাতে কুক্ষিগত হয়। তাদের দুঃশাসনে জনসাধারণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তার ওপর মারাঠা আক্রমণে মহীশূরের আচল অবস্থা সৃষ্টি করে। এই সুযোগে হায়দার আলী তার অশ্রয়দাতা নজরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হায়দার আলী তার প্রশাসনিক দক্ষতাবলে শীগ্রই রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যসমূহের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেদনুর, সুজা, কানারা, সাভানুর অঞ্চল দখল করে। এ সময় মারাঠা ও নিজাম রাজ্যের কিছু অংশ দখল করলে মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালীর নিকট মারাঠারা পরাজিত হলেও একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। মারাঠাদের পানির সাথে তুলনা করা যায়। পানিতে আঘাত করলে যেমন প্রতিগাত করে না, আঘাতের চিহ্নও থাকে না। সুতরাং মারাঠারা আবার মাধব রাও-এর নেতৃত্বে পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে বাধা ছিল মহীশূর রাজ্য এর শাসক হায়দার আলী সঙ্গত কারণেই মারাঠারা দক্ষিণ ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গেলেই হায়দার আলীর সাথে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ
দক্ষিণ ভারতে পতনশীল মোগল সাম্রাজ্যের আধিপত্য নিয়ে ইংরেজ, ফরাসি, হায়দারাবাদের নিজাম, মারাঠা ও মহীশূর এই পঞ্চশক্তির মধ্যে শক্তি প্রদর্শন চলে। মহীশূরে হায়দার আলীর উত্থানে ইংরেজরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। মহীশূর রাজ্যের ক্ষমতা দখলের ব্যাপারে ফরাসিগণ হায়দার আলীকে সাহায্য করেছিল, সে কারণে উপমহাদেশে ইঙ্গ- ফরাসি যুদ্ধে হায়দার আলী তার মিত্র ফরাসিদের পক্ষ অবলম্বন করে। বিশেষ করে তৃতীয় কর্নাটকের যুদ্ধে হায়দার আলী ফরাসিদের সাহায্য করায় ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। হায়দার আলী নিজের নিরাপত্তার জন্য হায়দারাবাদের নিজামের সাথে প্রতিরক্ষামূলক মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফলে নিজাম ইংরেজ পক্ষ ত্যাগ করেন। এভাবে নিজাম ও হায়দার আলীর যৌথ বাহিনী কর্নাটক আক্রমণ করলে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। ত্রিনোমালির যুদ্ধে হায়দার আলী ইংরেজদের নিকট পরাজিত হলে নিজাম হায়দার আলীর পক্ষ ত্যাগ করে এবং মাদ্রাজ সরকারের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। ইতোমধ্যে ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী আকস্মিক মাদ্রাজ আক্রমণ করে মাদ্রাজ সরকারকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন। এ সন্ধির শর্তানুযায়ী উভয়েই পরস্পরের বিজিত স্থানসমূহ, অধিকার করে, যুদ্ধ বন্দী ফেরত দেন এবং মহীশূর রাজ্য অপর কোনো শত্রু দ্বারা আক্রমণ হলে ইংরেজ সরকার হায়দার আলীকে সামরিক সাহায্য দিতে স্বীকৃত হন।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০-৮৪ খ্রি.)
মারাঠাগণ হায়দার আলীর রাজ্য আক্রমণ করলে পূর্ব শর্তানুযায়ী ইংরেজগণ হায়দার আলীকে সাহায্য না করায় তিনি ইংরেজদের ওপর রুষ্ট হন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ফরাসিরা আমেরিকার পক্ষে যোগদান করলে ভারতবর্ষে ইংরেজরা ফরাসি অধিকৃত 'মাহে' বন্দরটি অধিকার করে নেয়। এ কারণে হায়দার আলী নিজামকে সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং কর্নেল বেইলীকে পরাজিত করে আর্কট দখল করেন। এদিকে ওয়ারেন হেস্টিংস স্যার আয়ার কুটের অধীনে এক দল সৈন্য প্রেরণ করেন। উক্ত সেনাদল পোর্টোনোভার যুদ্ধে হায়দার আলীকে পরাজিত করেন (১৭৮১ খ্রি.)।। অন্য দিকে তাজ্ঞোরে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতানের হাতে কর্নেল ব্রেথওয়েট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ইত্যবসরে ফরাসি নৌ সেনাপতি সাফ্রেইন সসৈন্যে হায়দার আলীর সাহায্যে অগ্রসর হলে ইংরেজদের অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে হায়দার আলী মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর তার সুযোগ্য পুত্র টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি মাথুসকে সসৈন্যে বন্দী করতে সক্ষম হন। এদিকে ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসিদের মধ্যে ভার্সাই সন্ধি দ্বারা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উপমহাদেশেও ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। দেশপ্রেমিক টিপু সুলতান একাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মাদ্রাজ সরকার "ম্যাঙ্গোলোরের সন্ধি" স্থাপন করলে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসান ঘটে। এর ফলে উভয় পক্ষ বন্দী বিনিময় করেন এবং পরস্পরের বিজিত রাজ্য ফিরিয়ে দেন।
হায়দার আলীর চরিত্র ও কৃতিত্ব
সামান্য একজন সৈনিক হয়ে জীবন শুরু করে নিজের মেধা এবং কর্মদক্ষতা গুণে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা, ইংরেজদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জয় লাভ করা হায়দার আলীর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি মহীশূরকে একটি স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন। মন্টেস্কুর বিখ্যাত নীতি "স্বৈরতন্ত্র কেবলমাত্র সন্ত্রাস ও ভীতির দ্বারা কার্যকরী হয়" এই নীতি হায়দার আলী অনুসরণ করেন। ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ হায়দার আলীর চরিত্র নানাভাবে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করলেও মহীশূরের জনগণ তাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। ঐতিহাসিক ক্যাম্পবেল বলেন, "হায়দার আলী ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সম্ভবত ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত প্রতিভার অধিকারী যেকোনো ব্যক্তির ন্যায় প্রকৃতিপ্রদত্ত অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী।" হায়দার আলী নিরক্ষর ছিলেন। মহামতি আকবর ও মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহও নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু তারা প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিভা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারা জ্ঞান আহরণ করেন। হায়দার আলীও ছিলেন ঐ স্তরের প্রতিভাবান।
হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন
মারাঠা ও মহীশূর যুদ্ধের পর থেকে হেস্টিংস দারুন অর্থনৈতিক সংকটে পরেন। এ অবস্থায় যেকোনো অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনে হেস্টিংস আত্মনিয়োগ করেন। যার কারণে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। এ সকল অভিযোগের মধ্যে-
১। ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটানোর অভিযোগ অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সাথে ৪০ লক্ষ টাকার চুক্তিতে ১৭৭৪
খ্রিষ্টাব্দে রোহিলা যুদ্ধে হেস্টিংস ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটান। অর্থের বিনিময়ে ব্রিটিশ সৈন্য ভাড়ায় খাটানোর জন্য ব্রিটিশদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। এ কারণে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করা হয়। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল হেস্টিংস-এর বিরাট ভুল।
২। রানি ভবানীর অভিযোগ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্লাবনে ব্যাপক প্রাণহানী এবং ফসল বিনষ্টের ফলে রানি ভবানীর খাজনা দিতে বিলম্ব হয়। এ বিলম্বের কারণে হেস্টিংস তাকে জমিদারিচ্যুত করে জনৈক দুলাল রায়কে রাজশাহীর জমিদার নিযুক্ত করেন (১৭৭৪ খ্রি.)। ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রানি ভবানী কলকাতা কাউন্সিলে অভিযোগ দাখিল করেন। অবশ্য পরে তাকে জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
৩। নন্দকুমারের ফাঁসি : বৈধ-অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের অসন্তুষ্টির কারণে চারদিক থেকে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। এ সকল অভিযোগের মধ্যে ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ নন্দকুমার কলিকাতা কাউন্সিলে এক পত্রে হেস্টিংসের বিরুদ্ধে মীর জাফরের স্ত্রী মুন্নী বেগমের নিকট থেকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ আনয়ন করেন। পরিষদের সদস্যগণ নন্দকুমার কর্তৃক আনীত অভিযোগের তদন্ত দাবি করলে হেস্টিংস তা নাকচ করে দিয়ে পরিষদ ভেঙে দেন। হেস্টিংসও আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা নন্দকুমারের বিরুদ্ধে মোহনপ্রসাদ নামক ব্যক্তির দ্বারা সুপ্রিম কোর্টে জালিয়াতি অভিযোগ উত্থাপন করেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসি হয় (১৭৭৫ খ্রি.)। হেস্টিংস কর্তৃক নন্দকুমারের ফাঁসি ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। নন্দকুমারের বিচার নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা রয়েছে। কোনো কোনো মনীষীরা বলেছেন বিচার নিরপেক্ষ হয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন বিচার কলঙ্কজনক হয়েছে। কলঙ্কজনক হয়েছে এইদিক থেকে যে, জালিয়াতির অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকে ইংল্যান্ডের আইনে ফাঁসির বিধান থাকলেও ভারতীয় আইনে এরূপ কোনো বিধান ছিল না। তারপরও রেগুলেটিং আইন মোতাবেক ভারতে যে সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়েছিল তা শুধু ইংরেজ কর্মচারী অপরাধীদের বিচার করার জন্য। কোনো ভারতীয়দের বিচার করার জন্য নয়। সেদিক থেকে বিচার করলে সুপ্রিম কোর্ট । কর্তৃক নন্দকুমারের ফাঁসি যুক্তিসঙ্গত হয়নি।
৪। চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচারের অভিযোগ : মারাঠা ও মহীশূর যুদ্ধে কোম্পানির অনেক অর্থ নষ্ট হয়। ফলে কোম্পানি অর্থ সংকটে পতিত হয়। অর্থ সংকট দূর করতে হেস্টিংস হোক সেটা বৈধ কিংবা অবৈধ যেকোনো উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি এক সন্ধির মাধ্যমে অযোধ্যার নবাবের নিকট থেকে বারাণসীকে পৃথক করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং চৈৎসিংহকে বারাণসীর জমিদার নিযুক্ত করেন। তখন থেকে চৈৎসিংহ কোম্পানিকে নিয়মিত বাৎসরিক কর প্রদান করত। কিন্তু হেস্টিংস তার কাছে নানা অজুহাতে অর্থ দাবি করেন। প্রথমে ফরাসি আক্রমণের মিথ্যা অযুহাতে ৫ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেন। ২য় বারে জোর পূর্বক ২ লক্ষ টাকা এবং ২ হাজার অশ্ব দাবি করেন। অশ্ব প্রেরণে দেরি হলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে চৈৎ সিংহের আত্মীয় নারায়ণকে বার্ষিক ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বারাণসীর জমিদারি অর্পণ করেন। চৈৎ সিংহের প্রতি হেস্টিংসের এরূপ নির্মম ব্যবহার ও নিষ্ঠুরতা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে হেস্টিংসের চরিত্রকে ভীষণভাবে কলঙ্কিত করেছে।
৫। অযোধ্যার বেগমদের ওপর অত্যাচার: সুজাউদ্দৌলার স্ত্রী ও আসফ উদ্দৌলার মাতা অযোধ্যার বেগম নামে পরিচিত ছিলেন। হেস্টিংস অযোধ্যায় একদল সৈন্য প্রেরণ করে বেগমের ওপর অত্যাচার চালিয়ে ৭৬ লক্ষ টাকা আদায়সহ জোরপূর্বক স্বর্ণ-অলঙ্কার ছিনিয়ে নেন। ঐতিহাসিক লয়ালের মতে, হেস্টিংস কর্তৃক চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে অযোধ্যার বেগমের নিকট অর্থ সংগ্রহ করা একটি নীচ প্রকৃতির কর্ম ব্যতীত আর কিছুই নয়।
এ সকল কর্ম দ্বারা বর্বরতার দিক থেকে হেস্টিংস ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেন।
হেস্টিংসের পদত্যাগ ও ইম্পিচমেন্ট
হেস্টিংসের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ কমন্সসভায় উত্থাপিত হতে থাকে। যেমন- পরিষদের সাথে মত বিরোধ, রোহিলা যুদ্ধে ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্রিটিশ সৈন্য অংশগ্রহণ, অন্যায়ভাবে নন্দ কুমারের ফাঁসি, চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচার, রানি ভবানীকে জমিদারি চ্যুত, অযোধ্যার বেগমের সর্বস্ব লুণ্ঠন ইত্যাদি। এ সকল অভিযোগের মুখে ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে ইম্পিচ করা হয়। ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ বছর পর্যন্ত হেস্টিংসের বিচার কার্যক্রম চলে। তাকে মানবজাতির শত্রু বলে অভিযুক্ত করা হয়। স্বদেশবাসীর কৃপায় হেস্টিংস মুক্তি পেলেও আত্মগ্লানিতে তিলে তিলে অবশেষে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
হেস্টিংসের কৃতিত্ব বিচার
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের এক দুর্যোগময় মুহূর্তে হেস্টিংস বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি একটি বিতর্কিত চরিত্র। ইংরেজ বাগ্মি মেকলে, বার্ক এবং ঐতিহাসিক মিল ও বেভারিজ তার চরিত্রের কঠোর সমালোচনা ও তীব্র নিন্দা করছেন। অন্যদিকে ড. স্মিথ সহ আধুনিক ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষে ক্লাইভ প্রতিষ্ঠিত শিশু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করণে তাঁর বুদ্ধিমত্তা, সাহসিকতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পি.ই রবার্টসের মতে, "সম্ভবত হেস্টিংস ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরেজ শাসক। কিছুটা নৈতিক দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি গতিশীল ও উর্বর মস্তিষ্ক, অক্লান্ত শক্তি এবং অটুট মনোবলের অধিকারী ছিলেন।" ভারতবর্ষে তিনি যা কিছু করছেন সবই ইংরেজ জাতির স্বার্থে করেছেন। তার পরও তাকে পদচ্যুতি, ইস্পিচমেন্ট এবং সাত বছরের বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বে দুঃখ করে বলেছিলেন, "আমি আপনাদের সবকিছু দিয়েছিলাম অথচ আপনারা আমাকে পুরস্কার স্বরূপ দিলেন আত্মসাতের অভিযোগ, অপমান এবং অবিশ্বাসের যাতনা।"
ভারতের ব্রিটিশ শাসনের এক ক্লান্তি লগ্নে হেস্টিংস শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখন ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের প্রভাবে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। ইংরেজ কর্মচারীর দুর্নীতির রাহু গ্রাস, দ্বৈতশাসনের কুফলে চারদিকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। এ অবস্থা থেকে তিনি ব্রিটিশ ভারতকে উত্তরণ করতে সক্ষম হন। শাসক হিসেবে হেস্টিংসের অন্যতম সাফল্য হলো দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজস্ব আদায়ের ভার কোম্পানির কালেক্টর নামক কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত করা। অত্যাচার এবং উৎপীড়নের অভিযোগে ডেপুটি নায়েবের পদ দুটি বাতিল করে তিনি রেজা খান এবং সেতাব রায়কে বিচারের জন্য কলকাতায় প্রেরণ করেন।
হেস্টিংস রাজস্ব বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। তিনি রাজস্বের ভার কালেক্টর নামে ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর ন্যস্ত করেন। রাজস্ব বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য রাজকোষ মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন। রাজকোষকে সমৃদ্ধশালী করতে ভূমিরাজস্ব পাঁচ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি অবৈধ উপায়ে অর্থ আত্মসাৎ, নন্দ কুমারের ফাঁসি, চৈৎ সিংহের প্রতি অবিচার, অযোধ্যার বেগমের প্রতি দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি কাজের জন্য তিনি নিন্দিত ও নন্দিত উভয়ই হয়েছেন।
পিটের ভারত শাসন আইন-১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দ (Pitts Indian Government Act- 1784 AD)
১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং আইনের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের জন্য ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট ভারতীয়দের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করেন। যা ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইন নামে খ্যাত। রেগুলেটিং আইন ১১ বছর বলবৎ থাকার পর উইলিয়াম পিট এই আইন প্রণয়ন করলেন। এ আইন দ্বারাই হেস্টিংসকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নরের পথ থেকে (১৭৭২ নিয়োগ) গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩ অনুযায়ী কোম্পানির ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। হেস্টিংস ভারতবর্ষে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। যা ইংল্যান্ড পার্লামেন্ট সমর্থন করতে পারেনি। রেগুলেটিং বা নিয়ামক আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ইংল্যান্ডের সচেতন জনসাধারণের চোখে পড়ে। তাছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানি প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা হেস্টিংস নিজেই স্বীকার করেছেন। এ সকল কারণে রেগুলেটিং আইনের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে কোম্পানির ওপর ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা সুস্পষ্ট এবং সুদৃঢ় করার জন্য ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পিটের ভারত শাসন আইন প্রণীত হয়।
পিটের ভারত শাসন আইনের ধারাসমূহ: ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম পিট কর্তৃক প্রণয়নকৃত ভারত শাসন আইনের প্রধান ধারাগুলো তুলে ধরা হলো-
(১) এই আইন দ্বারা ছয়জন প্রিভি কাউন্সিলারকে নিয়ে গঠিত (বোর্ড অব কন্ট্রোল) নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের ওপর কোম্পানির সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। মূলত তিনি ভারত বিষয়ক মন্ত্রীতে পরিণত হন।
(২) এ আইনে কোম্পানির তিনজন ডাইরেক্টর দ্বারা গঠিত একটি সিক্রেট কমিটির মাধ্যমে বোর্ড অব কন্ট্রোলের গোপন নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত কোম্পানির ভারতস্থিত কর্মচারীদের নিকট প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
(৩) এ আইনের দ্বারা বোর্ড অব কন্ট্রোল ও সিক্রেট কমিটির সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা সংশোধন করার ক্ষমতা থেকে অংশীদার সভাকে বঞ্চিত করা হয়।
(৪) এ ধারায় উল্লেখ করা হয়, ভারতের শাসনকার্যে গভর্নর জেনারেলকে একজন সেনাপতি ও দুজন কাউন্সিলার করবে।
(৫) গভর্নর জেনারেলকে ভারতের সকল প্রেসিডেন্সির কার্যকলাপ তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ফলে মুম্বাই ও মাদ্রাজ সরকারের ওপর বাংলা প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কেননা গভর্নর জেনারেল ছিলেন মূলত বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রধান। ফলে ভারতের সকল প্রেসিডেন্সিতে একই রকম প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন গড়ে ওঠে। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে একটি অতিরিক্ত আইন প্রণয়ন করে বিশেষ ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার এবং প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণ করার ক্ষমতা গভর্নর জেনারেলকে প্রদান করা হয়েছিল।
(৬) পিটের ভারত শাসন আইনে এ ঘোষণাও বিধিবদ্ধ করা হয় যে, "রাজ্য জয় ও সাম্রাজ্য বিস্তার ইংল্যান্ডের জাতীয় মর্যাদা ও নীতির বহির্ভূত।"
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পিটের ভারত শাসন আইন কার্যকর থাকে। তৎকালীন ইংল্যান্ড ও ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় এ আইনের কার্যকারিতা অনস্বীকার্য। এ আইনের দ্বারা রেগুলেটিং আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধিত করে : গভর্নর জেনারেলের মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এবং মাদ্রাজ ও মুম্বাই প্রেসিডেন্সি দুটির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোম্পানির সার্বভৌম ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
পিটের ভারত শাসন আইনের ত্রুটি: উইলিয়াম পিটের ভারত শাসন আইন একেবারে ত্রুটিমুক্ত ছিল না। এ আইনের ত্রুটির মধ্যে-
প্রথমত, ভারতীয় সাম্রাজ্য পার্লামেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি তার স্বাধীন বাণিজ্য নীতি চালিয়ে যায় এবং দ্বৈতশাসন নীতি প্রবর্তিত হয়।
দ্বিতীয়ত, কোম্পানি ও বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে কোম্পানি ভারতের শাসনকার্য পরিচালনায় উদাসীন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, ডাইরেক্টর সভাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বোর্ড অব কন্ট্রোলকে দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে বোর্ড ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপরপক্ষে ভারতের শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার কোনো দায়িত্ব ছিল না।
পিটের ভারত শাসন আইনের গুরুত্ব ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষমতা কোম্পানির নিকট থেকে ব্রিটিশ সরকার গ্রহণের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৫৮ পর্যন্ত পিটের ভারত শাসন আইনের কার্যকারিতা ছিল। তৎকালীন ইংল্যান্ড এবং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় পিটের ভারত শাসন আইনের ভূমিকা অপরিসীম
প্রথমত, এ আইনের দ্বারা ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, গভর্নরকে গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করে মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।
তৃতীয়ত, মাদ্রাজ ও মুম্বাই প্রেসিডেন্সি দুটির ওপর কলকাতা প্রেসিডেন্সির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়।
চতুর্থত, ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় একজন মন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। তিনিই ভারত বিষয়ক মন্ত্রীতে পরিণত হন।
পঞ্চমত, এ আইন দ্বারা পর রাজ্য গ্রাস নীতি বাতিল করা হয়। ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোম্পানির সার্বভৌম ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
ভারতীয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেও ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি স্বাধীনভাবেই বাণিজ্য নীতি চালিয়ে যান। কোম্পানি ও বোর্ডের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে কোম্পানি ভারতের শাসনকার্য পরিচালনায় উদাসীন হয়ে পড়ে।
Read more