পলাশীর যুদ্ধ (১.৪)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

12

Battle of Palassey

নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২৩ বছর বয়সে "নবাব মনসুর-উল-মুলক সিরাজউদ্দৌলা শাহ কুলী খাঁ মির্জা মুহম্মদ হায়বাত জঙ্গ বাহাদুর" উপাধি নিয়ে ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করেন। তিনিই ছিলেন অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। মাতামহের অত্যধিক স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বলে বাস্তব জীবনের কুটিলতা ও রাজনৈতিক জটিলতা সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল না; যার কারণে মসনদে বসার পর তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনারোহণকে আলীবর্দী খানের অপর দুই কন্যা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কারণ তারা প্রত্যেকেই পিতার মসনদ লাভের আশা পোষণ করতেন। ঢাকার শাসনকর্তার বিধবা পত্নী ঘসেটি বেগম এবং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তার পুত্র শওকত জঙ্গ সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। ঘসেটি বেগমের হিন্দু দেওয়ান রাজবল্লভ এ ষড়যন্ত্রে যোগ দিলেন। পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কথা নবাব উপলব্ধি করে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন- মীর জাফরকে বখশির পদ থেকে অপসরণ করে মীর মদনকে ঐ পদে নিযুক্ত করেন, পারিবারিক দেওয়ান মোহন লালকে সচিব পদে উন্নীত করে তাঁকে মহারাজা উপাধিসহ প্রধান মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়। খালা ঘষেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ অবরোধ করে ধনরত্নসহ তাঁকে নবাবের মনসুরগঞ্জ প্রাসাদে নিয়ে এসে কৌশলে নজরবন্দি রাখেন। খালাতো ভাই শওকত জঙ্গ বিদ্রোহ করলে তাকে পূর্ণিয়ার এক যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন।

এভাবে নবাব পারিবারিক ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিলেও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র নতুনভাবে শুরু হয়। এক দিকে রাজদরবারের প্রভাবশালী দেশীয় রাজন্যবর্গ (মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মানিক চাঁদ) ও অপরদিকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রতিনিয়ত তারা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। দেশি-বিদেশি এ ষড়যন্ত্রের পথ ধরেই পলাশী যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে থাকে।

পলাশীর যুদ্ধের কারণ (Causes of Battle of Palassey)

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন রবার্ট ক্লাইভের অধীনে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর মধ্যে দিল্লির অদূরে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসে তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে দুশত বছর ব্রিটিশ শাসন-শোষণে আবদ্ধ হয়। একক কোনো কারণে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, এর পেছনে অনেক দিনের অনেক কারণ জড়িত ছিল। প্রধান কারণগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের যোগদান: নবাব আলীবর্দীর মৃত্যুর পর (১৭৫৬) তার কনিষ্ঠ কন্যা আমিনার পুত্র
সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আলীবর্দীর অপর দু কন্যা ঘসেটি বেগম ও ময়মুনা বেগম তা মেনে নিতে পারেনি। কারণ সিংহাসনের প্রতি তাদেরও লোভ ছিল। সুতরাং ঘসেটি বেগম এবং ময়মুনার পুত্র শওকত জঙ্গ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ইংরেজরা তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য উক্ত ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।
২। কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ: যুবরাজ অবস্থায় নবাব ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠিতে হানা দিয়ে বহু দামি আসবাবপত্র নিয়ে যান। অবশ্য এটা ছিল নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ঘটনা।

৩। নজরানা পাঠাতে বিলম্ব ভারতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নতুন নবাবকে নজরানা দিয়ে সকলেই বশ্যতা জানাতে হয়। কিন্তু ইংরেজরা বিলম্ব করে। ঘসেটি বেগমের সাথে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে নজরানা পাঠায় এবং বিলম্বের কারণ হিসেবে জানায় কলকাতায় কোম্পানির প্রেসিডেন্টের অসুস্থতা। অবশ্য নবাব সবকিছু বুঝতে পারলে সম্পর্ক খারাপের দিকে এগোতে থাকে।

৪। ইংরেজ কর্তৃক কৃষ্ণদাসকে আশ্রয়দান: ঘসেটি বেগমের ঢাকার নায়েবি হিসাবরক্ষক ছিলেন রাজবল্লভ। দুর্নীতির জন্য
নবাব তাকে বন্দি করেন এবং নথিপত্র ও ধন-সম্পত্তি ফেরত চান। কিন্তু রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস (কৃষ্ণবল্লভ) তার পরিবারের লোকজন এবং সম্পত্তি নিয়ে নৌকাযোগে কলকাতায় পলায়ন করেন এবং ইংরেজদের আশ্রয় গ্রহণ করেন। নবাব তাকে ফেরত চাইলে কলকাতার গভর্নর ড্রেক বলেন, "কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দানের রাজনৈতিক অধিকার কোম্পানির আছে।" এতে নবাব রুষ্ট হন।

৫। নবাবের আদেশ অমান্য করে দুর্গ নির্মাণ: বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগত ইংরেজ বণিকগণ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে কুঠি
স্থাপন করে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও আয়তন বৃদ্ধি করে। নবাব প্রতিবাদ পত্র পাঠালে ড্রেক ছলনার আশ্রয় নিয়ে প্রথমে দুর্গ নির্মাণের কথা অস্বীকার করেন। পরে দুর্গ নির্মাণের কাজ অগ্রগতি হলে তিনি এই অজুহাত দেখান যে, "এ দুর্গ ফরাসি আক্রমণ থেকে ইংরেজদের আত্মরক্ষার জন্য নির্মিত হচ্ছে, নবাবের বিরুদ্ধে এই দুর্গ ব্যবহার করা হবে না।" আদেশ অমান্য করে দুর্গ নির্মাণ করতে থাকলে নবাব ইংরেজদের দমনের সিদ্ধান্ত নেন।

৬। নবাবের দূতকে অপমান কৃষ্ণদাসকে ফেরত আনতে এবং দুর্গের কাজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য নবাব তাঁর ব্যক্তিগত দূত নারায়ণ দাসকে কলকাতায় পাঠান। নারায়ণ দাস কলকাতায় ঢুকলে গভর্নর ড্রেক তাঁকে গুপ্তচর ঘোষণা করে অপমান করে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করে। নারায়ণ দাসের সাথে এরূপ ব্যবহারে নবাব অত্যন্ত রুষ্ট হন এবং কোম্পানিকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন।

৭। শুল্ক প্রত্যাহার: ইতোমধ্যে বাণিজ্য ও শুল্ক সংক্রান্ত ব্যাপারে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের বিরোধ দেখা দেয়। ১৭১৭
খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট ফররুখ শিয়ার ফরমানের পর বাংলার আলীবর্দী খান ও নবাব মুর্শিদ কুলী খানের সাথে ইংরেজদের একটা বোঝাপড়া হয়েছিল। তাতে ছিল- (১) কোম্পানি বাংলার আন্তঃবাণিজ্যে হাত দিবে না। হাত দিলেও নিয়মিত শুল্ক দিবে। (২) কোম্পানির বাণিজ্য ব্যতীত কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ছাড়পত্র বা ফরমান ব্যবহার করবে না। কিন্তু নবাব লক্ষ করলেন কোম্পানি উক্ত বোঝাপড়ার শর্ত ভেঙে বাণিজ্য করছেন। তাতে দেশীয় বণিকগণ মার খাচ্ছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। এ অবস্থায় নবাব এক পত্রে জানান যে, ১৭১৭-১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (৩৯ বছর) পর্যন্ত কোম্পানি অবৈধ ব্যবসার দ্বারা প্রচুর শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। আর তা হতে দেওয়া যায় না।

৮। নবাবের কলকাতা আক্রমণ ও অন্ধকূপ হত্যা কাহিনি: ইংরেজদের ঔদ্ধত্য ব্যবহার এবং ক্ষমতা বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে নবাব ৪ জুন, ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠি দখল করে কয়েকজন ইংরেজ বন্দি করেন। অতঃপর নবাব তার ৫০,০০০ সেনাদল নিয়ে কলকাতা অভিযান করেন। অতর্কিত আক্রমণ করে নবাব ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ (১৬ জুন, ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) অধিকার করেন। ভীত হয়ে কলকাতার গভর্নর ড্রেক ও অন্যান্য ইংরেজরা দুর্গের পিছন দরজা দিয়ে জাহাজ যোগে ফলতায় পলায়ন করেন এবং ফলতা থেকে কলকাতা পতন সংবাদ মাদ্রাজ পাঠান। ড্রেক দুর্গ ত্যাগ করে পলায়ন করলেও অধিকাংশ ইংরেজ পালাতে পারেনি। হলওয়েল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন যে, দুর্গ অধিকারের পর সন্ধ্যার সময় ১৪৬ জন ইংরেজকে ১৮ ফুট লম্বা ও ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি কক্ষে আটক রাখে। এই কক্ষে একটিমাত্র ক্ষুদ্র জানালা ছিল। ফলে শ্বাসরোধ হয়ে ১২৩ জন ইংরেজ মারা যায়। এই ঘটনাকে তথাকথিত অন্ধকূপ হত্যা বা Black Hole Tragedy বলে। অন্ধকূপ হত্যা সত্যি ঘটেছিল কি না তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। সমসাময়িক ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসি কুঠির নথিপত্রে উল্লেখ আছে, 'অন্ধকূপ' নামক কক্ষটিতে সিরাজের আদেশে এক রাতের জন্য ইংরেজ বন্দিদের আবদ্ধ রাখা হয়েছিল। সেখানে বন্দি বা নিহত সংখ্যা উল্লেখ নেই। সমসাময়িক অন্য রচনাবলিতেও এ ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তখন দুর্গে ১৪৬ জন ইংরেজ ছিল না, থাকলেও বর্ণিত ঐ কক্ষে ১৪৬ জনকে কোনোভাবেই রাখা সম্ভব নয়। বাস্তবে অন্ধকূপ ঘটনা ছিল একটি অতিরঞ্জিত কল্পকাহিনি। গবেষক অক্ষয় কুমার মৈত্র অন্ধকূপ হত্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। স্যার জে. এন সরকার বলেছেন, "হলওয়েল ইংরেজদের উত্তেজিত করার জন্য অন্ধকূপ হত্যার কাহিনিকে অতিরঞ্জিত করেন।" যাই হোক, নবাব কলকাতা অধিকার করে নাম রাখলেন 'আলীনগর' এবং মানিকচাঁদকে দায়িত্ব দিয়ে নবাব মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।

৯। ইংরেজ বাহিনীর কলকাতা পুনরুদ্ধার: কলকাতা পতনের সংবাদ মাদ্রাজে পৌঁছলে, মাদ্রাজের গভর্নর সন্ডার্স ক্রোধে ক্ষিপ্ত হন এবং কর্নেল ক্লাইভ ও নৌ সেনাপতি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে কলকাতায় পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠান। নির্দেশ দেন যে, সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে কোনো ইংরেজভক্ত লোককে যেন বাংলার সিংহাসনে বসানো হয়। ক্লাইভ কলকাতায় এসে উৎকোচ দ্বারা মানিকচাঁদকে বশীভূত করে বিনা যুদ্ধে কলকাতা দখল করে এবং নবাবের বন্দর হুগলী পুড়িয়ে দেন।

১০। আলীনগরের সন্ধি: ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলা' কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে নাম দেন আলীনগর। অতঃপর নবাব কলকাতা রক্ষার জন্য সেনাপতি মানিকচাঁদকে দায়িত্ব দিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। এখানে নবাব যে ভুলটি করেন তা হলো- কলকাতা পতনের পর যে সকল ইংরেজ কলকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত না করা। এমনকি কলকাতায় ইংরেজদের পালটা আক্রমণ প্রতিরোধেও কোনো ব্যবস্থা নবাব গ্রহণ করেননি। কলকাতায় অবস্থানকালে ওলন্দাজরা ইংরেজদের খাদ্য সরবরাহ করতে থাকে। ক্লাইভ কলকাতায় এসে মানিকচাঁদকে উৎকোচ দ্বারা বশীভূত করে প্রায় বিনা যুদ্ধে কলকাতা পুনরুদ্ধার করেন (২রা জানুয়ারি, ১৭৫৭)। নবাবের কলকাতা অধিকারের প্রতিশোধ হিসেবে ক্লাইভ নবাবের হুগলী বন্দর পুড়িয়ে দেন। এ সংবাদে সিরাজ পুনরায় কলকাতা অভিযান করেন। ক্লাইভ নবাবকে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েকজন সাহসী সেনা নিয়ে অতি গোপনে রাতের অন্ধকারে নবাবের শিবির আক্রমণ করেন। কিন্তু নবাব দৈবক্রমে বেঁচে যান। তবে তার ১,৩০০ সৈন্য এই অতর্কিত হানায় মারা পড়ে। এ আক্রমণের পর নবাব স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, তার সভাসদ ও সেনাপতিদের মধ্যে অনেকেই গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এজন্য তার মনের জোর কমে যায়। এদিকে তিনি খবর পান যে, আফগান আক্রমণকারী আহমদ শাহ আবদালী আগ্রা, মাথুরা বিধ্বস্ত করে বাংলার দিকে ধেয়ে আসছে। সামনে ইংরেজ মধ্যখানে নিজ সভাসদ ও সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র, পেছনে আফগান আক্রমণের আশঙ্কা, ত্রিমুখী চাপে নবাব দিশেহারা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় নবাব ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধি স্থাপন করেন যা ইতিহাসে 'আলীনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত। আলীনগরে বসে ৯ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এ সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। আলীনগর স্থানের নাম অনুযায়ী এ সন্ধির নামকরণ হয় 'আলীনগরের সন্ধি'। আলীনগরের সন্ধি ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলা পতনের প্রথম ধাপ। এই সন্ধির মাধ্যমে নবাব নতজানু হয়ে সন্ধি শর্তে আবদ্ধ হন। সন্ধির শর্তানুসারে (১) পূর্বের সম্রাটের নিকট থেকে
ইংরেজদের প্রাপ্ত সকল সুযোগ-সুবিধা নবাব মেনে নেন অর্থাৎ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য অধিকার বহাল থাকে। (২) নবাব কোম্পানিকে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের অনুমতি দেন। (৩) ইংরেজ কোম্পানিকে কলকাতায় নিজস্ব টাকশাল স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হয়। (৪) নবাব কর্তৃক কলকাতা আক্রমণে কোম্পানির যে ক্ষতি হয়েছিল সে ক্ষতিপূরণ প্রদানে নবাব অঙ্গীকারবদ্ধ হন। (৫) কলকাতার অধিবাসীরা সবসময় কোম্পানির শাসনাধীনে থাকবে তা স্থির হয়। আলীনগরের সন্ধির শর্ত সবগুলোই ছিল ইংরেজদের অনুকূলে, বাংলার নবাবের প্রতিকূলে। এ সন্ধি বাংলার জন্য মোটেও কল্যাণকর ছিল না। আলীনগরের সন্ধির ফলে নবাবের ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। এতে নবাবের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। ইংরেজদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আলীনগরের সন্ধি ছিল ইংরেজ কোম্পানির বিরাট সাফল্য। এই সন্ধির ওপর ভিত্তি করে ইংরেজরা পরবর্তীতে উপমহাদেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

১১। মীরজাফরের সাথে গোপন সন্ধি: নবাবের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়। মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ,
উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, মানিকচাঁদ, ইয়ার খান প্রভৃতি ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের নায়ক। ইংরেজ অধিনায়ক ক্লাইভ এতে যোগদান করে। কলকাতায় কাউন্সিলের সাথে মীরজাফরের একটি গোপন সন্ধি (১০ জুন, ১৭৫৭) স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি মতে, ইংরেজরা মীরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসাবেন। বিনিময়ে মীরজাফর ইংরেজদের ১৭১৭ সালের ফরমান এবং আলীনগরের সন্ধি মতে সকল প্রকার বাণিজ্য সুবিধা দিবে। কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা কোম্পানিকে দিবে। মীরজাফরের সাথে গোপন চুক্তিই ছিল পলাশীর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ।

যুদ্ধের ঘটনাবলি

মীরজাফরের সাথে গোপন চুক্তির পর ক্লাইভ নবাবকে আক্রমণ অজুহাত হিসেবে বলেন, সিরাজউদ্দৌলা আলীনগরের সন্ধি ভঙ্গ করেছেন। ক্লাইভ সিরাজউদ্দৌলার কাছে কলকাতা আক্রমণের ক্ষতিপূরণ দাবি করে এক চরমপত্র প্রেরণ করে। নবাবের উত্তর পাওয়ার আগেই ক্লাইভ ৩৩০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদে অগ্রসর হন। নবাব ৭৮,০০০ সৈন্য নিয়ে ১৭৫৭/২৩ জুন মুর্শিদাবাদ থেকে ২৩ মাইল দক্ষিণে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তে উপস্থিত হন। নবাবের পক্ষে মোহনলাল, মীর মদন এবং ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে ১২০০০ সৈন্য নিয়ে ইংরেজ বাহিনীকে আমবাগানের ভিতরে পলায়নে বাধ্য করেন। কিন্তু নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও রায়দুর্লভ তাদের সেনা দল নিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ ইংরেজ গোলার আঘাতে মোহনলালের মৃত্যু হলে নবাব ভেঙে পড়েন। এ সময় নবাব মীরজাফরের শরণাপন্ন হন। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। ফলে নবাবের সেনাবাহিনী যুদ্ধ বন্ধ করে যে যার মতো ফিরতে থাকে। এই সুযোগে ক্লাইভ পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ছত্রভঙ্গ নবাব বাহিনীকে পরাজিত করেন। সেনাপতি মোহনলালসহ নবাবের ৫০০ সৈন্য এবং ইংরেজদের ২৩ জন সৈন্য নিহত হয়।

নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের মৃত্যুতে বাঙালি কবি নবীন চন্দ্র সেন তার 'পলাশীর যুদ্ধ' কাব্যে লিখেছেন-

'কোথা যাও ফিরে চাও সহস্র কিরণ।

বারেক ফিরিয়া চাও ওগো দিনমনি;

তুমি অস্তাচলে দেব করিলে গমন

আসিবে ভারতে পনুঃ বিষাদ রজনী।'

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নবাব পলায়ন করে মুর্শিদাবাদে গিয়ে পুনরায় যুদ্ধ গ্রহণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদে সাহায্য না পেয়ে স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং একমাত্র কন্যা সহ নৌকা যোগে ভাগলপুরে (পাটনা) পলায়ন করেন। পথিমধ্যে দুর্ভাগ্যবশত রাজমহলের নিকটে ধরা পড়েন এবং রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়। মীরজাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেন (২৫ জুন, ১৭৫৭ খ্রি.)। মীরজাফর ২৬ জুন, ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক বাংলার মসনদে বসেন।

পলাশীর যুদ্ধের প্রকৃতি

পলাশীর যুদ্ধ বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধ নয়। এটি ছিল মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, ক্লাইভের কূটকৌশল এবং একটি ষড়যন্ত্র। ব্যাপক অর্থে, একে একটি ক্ষুদ্র সংঘর্ষ বলা যায়। এই যুদ্ধে নবাবের সামরিক শক্তির কোনো পরীক্ষা হয়নি। নবাব বাহিনীর মীরজাফর ও রায়দুর্লভের অধীনস্থ সৈন্যরা এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। সুতরাং নবাব পরাজিত হয়েছেন প্রতারণার কাছে, বিশ্বাসঘাতকতার কাছে।

ঐতিহাসিক ম্যালসন বলেন, "পলাশীর যুদ্ধ যদিও যুগান্তকারী ঘটনা তবুও তাকে কখনো একটি বড় যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে এটি একটি খণ্ড যুদ্ধ হলেও এর ফলাফল পৃথিবীর অনেক বৃহত্তম সংগ্রামের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।”

পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল (The results of Battle of Palassey)

ইংরেজ কোম্পানির বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার ক্ষেত্রে পলাশীর যুদ্ধ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

রাজনৈতিক ফলাফল:

১. নবাবের নির্মম মৃত্যু: পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব ভাগলপুরে পলায়নের পথে রাজমহন নামক স্থানে তিনি ইংরেজ সৈন্যের নিকট ধরা পড়েন। তাঁকে বন্দি অবস্থায় মুর্শিদাবাদে আনা হয়। মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে।

২. বাংলায় স্বাধীন সূর্য অস্তমিত নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সাথে সাথে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সূর্য প্রায় ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়।

৩. ইংরেজদের ভারতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এত দিন ইংরেজ ছিল নিছক একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। আর
পলাশীর যুদ্ধে জয়ের ফলে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তারা অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধে জয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার প্রয়াস পান।

৪. মীরজাফর নামেমাত্র নবাব এ যুদ্ধের ফলে দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার স্থলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর পুতুল শাসকরূপে বাংলার সিংহাসনে বসেন। পূর্ব গোপন চুক্তি অনুযায়ী মীরজাফর ইংরেজদেরকে ব্যাপক বাণিজ্য সুবিধা, ক্লাইভকে ৩,৩৪,০০০ পাউন্ড ও কোম্পানিকে এক কোটি টাকা এবং ২৪ পরগনার জমিদারি প্রদান করেন।

৫. ক্লাইভের শক্তি প্রদর্শন: কুচক্রী ও ক্ষমতালোভী ক্লাইভ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অতি সহজে ইংরেজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এবং নবাবের বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা ধূলিসাৎ করে দেয়।

৬. ফরাসি শক্তি বিলুপ্ত: পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজগণ কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধে (১৭৬৩) ফরাসিদের দাক্ষিণাত্যে পরাজিত করে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। পলাশীর যুদ্ধ ভারতে অবস্থানরত ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারণ হিসেবেও গণ্য হয়।

অর্থনৈতিক ফলাফল:

পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য যেমনি অস্তমিত হয় তেমনি অর্থনীতি পাচারের দ্বারও উন্মোচিত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর থেকে অষ্টাদশ শতক ধরে কোম্পানি এবং তার কর্মচারীরা বাংলা তথা উপমহাদেশের সম্পদ যেভাবে অপহরণ, লুণ্ঠন ও পাচার করেছে তাকে পলাশীর লুণ্ঠন বলা হয়েছে। পলাশীর লুণ্ঠন (Plassey plunder) কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ব্রুকস অ্যাডামস (Brooks Adams) নামে এক গবেষক।

পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর কোম্পানি মীর জাফরের সাথে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক নগদ এবং কিস্তিতে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তির অধিকারী হয়। শুধু তাই নয় তারা ব্যবসায়-বাণিজ্যে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করে, কোম্পানি বিনা শুল্কে বা নামেমাত্র শুল্কে বাংলার সর্বত্র একচেটিয়া বাণিজ্য করতে থাকে, এতে দেশীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়। কোম্পানির পাশাপাশি কর্মচারীরা নামে, বেনামে বাণিজ্য, উৎকোচ, উপঢৌকন গ্রহণ করে অজস্র পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ ইংল্যান্ডে পাঠাতে থাকে। এতে ইংল্যান্ড সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং উপমহাদেশ নিঃস্ব হয়ে যায়।

ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর যেভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছে তাকে অর্থ উপার্জন না বলে অর্থ অপহরণ বলাই যুক্তিযুক্ত। অর্থ অপহরণের পথপ্রদর্শক ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। "ক্লাইভ এবং তাঁর অনুসারীরা যত তাড়াতাড়ি পার অর্থ সংগ্রহ কর এবং স্বদেশে ফিরে যাও"- এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন। মীর জাফরের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ যখন শেষ হয় তখন তারা মীর কাশিমকে বাংলার মসনদে বসিয়ে নতুন করে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে। মীর কাসিমকে মসনদে বসানো বাবদ ৩২,৭৮,০০০ টাকা কোম্পানি হাতিয়ে নেয়। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র নজমউদ্দৌলাকে মসনদে বসিয়ে ৬২,৫০,০০০ টাকা এবং নাজিম পদে রেজখানকে বসিয়ে কোম্পানির সদস্যরা ৪,৭৬,০০০ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। এ সময় তারা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে অর্থ সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছায়। চৌৎসিংহ অযোধ্যার নবাব প্রভৃতির নিকট থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করে।

কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মচারীরা ভারতবর্ষ থেকে কী পরিমাণ অর্থ সম্পদ অপহরণ করেছেন তার সঠিক হিসাব মেলানো কঠিন। তবে কোম্পানির কর্মচারীদের ইংল্যান্ডে বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে তাদেরকে ভারতীয় নবাব বলে ডাকা হতো। কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্য সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, "এক সিলিং খরচ না করে এই সকল ব্যক্তিরা (কোম্পানির কর্মচারী) শূন্য থেকে সোনা বানাত। তারা মাছের তেলে মাছ ভাজত।" সুতরাং পলাশীর যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফলাফল উপমহাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর।

পলাশী যুদ্ধের গুরুত্ব (The significance of Battle of Palassey)

পলাশীর যুদ্ধের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াটসন বলেন, "The battle of Paluey was of extraordinary importance not only but to the British National ingeneral" অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধে জয়লাভ করে ইংরেজগণ ভূ-সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে এবং এর লব্ধ কর কেবলমাত্র কোম্পানির নয় সমগ্র জাতিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। নিম্নে পলাশী যুদ্ধের গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো।

১. ভাগ্য নির্ধারিত যুদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের যুদ্ধ। রায় চৌধুরী, দত্ত ও মজুমদারের মতে, “পলাশীর যুদ্ধ একটি খণ্ডযুদ্ধ ব্যতীত আর কিছুই নয়। কিন্তু এর ফলাফল ছিল অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা বাংলা তথা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিজয়ের সূত্রপাত করে।"

২. ইংরেজদের ক্ষমতা বৃদ্ধি। এ বিজয়ে ইংরেজদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নামেমাত্র নবাব ক্ষমতায় থাকে বাংলার মসনদের পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিযুক্তির ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়।

৩. নব-জাগরণের সূত্রপাত। পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলায় রেনেসাঁস বা নব-জাগরণের সূত্রপাত হয়া। এ প্রসদে ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ম্যানসন বলেছেন, "পলাশীর যুদ্ধের মতো আর কোনো যুদ্ধের ফলাফল এত প্রত্যক্ষ, এত বিশাল এবং এত স্থায়ী হতে দেখা যায়না। ঐতিহাসিক মার্শালের মতে, "পলাশীর যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি যুদ্ধ হিল না, পলাশীর ঘটনা ছিল একটি বিপ্লব।

৪. আধুনিক যুগের সূচনা। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের সাথে সাথে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত হয়। ফলে সমগ্র ভারতবর্ষে মধ্যযুগের অবসান হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে। ইংরেজদের মাধ্যমে উপমহাদেশে সামরিক সংগঠন, আইনকানুন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাদীক্ষা ও শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ প্রসঙ্গে স্যার জে. এন, সরকার বলেছেন, ১৭৫৭ এর ২৩ জুন ভারতবর্ষে মধ্য যুগের শেষ হয় এবং আধুনিক যুগ শুরু হয়।

বস্তুত পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজ কোম্পানি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর এস আহমদ-এর অভিমত প্রধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ পানিপথের যুদ্ধ (১৫২৬)-এর মতোই স্মরণীয় ও মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।
পরিশেষে বলা যায়, পলাশীর প্রান্তে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল তা উভয়ণ কনাতে বাঙালিদের পাড়ি দিতে হয়েছে ২১৩ বছরের রক্ত স্নাত দীর্ঘ পথ। কাজী নজরুল ইসলাম তার 'কাণ্ডারী হুশিয়ার' কবিতায় লিখেছেন-

কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,

বাঙালির খুনে নাল হল যেখা ক্লাইভের খঞ্জর!

ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর

উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাতিয়া পুনর্বার!!

নবাবের পরাজয়ের কারণ (Causes of defeat of Nawab)

পলাশীর যুদ্ধ ছিল একটি নাটক, একটি ষড়যন্ত্র। ইংরেজদের তুলনায় নবাবের সৈন্য সংখ্যা অধিক হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে নবাব পরাজিত হন। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নবাবের পরাজয়ের প্রধান কারণ হলে আরও বেশ কতগুলো কারণে নবাবের পরাজয় ঘটে। নিম্নে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো-
প্রথমত, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রথম এবং প্রধান কারণ। যে মীরজাফর পবিত্র কোরআন মাথায় নিয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার শপথ করেছিলেন সেই মীরজাফর যুদ্ধ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ জয়ের প্রাক্কালে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিয়েও চরম বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার সূত্রে সিরাজ যে সিংহাসনটি পেয়েছিলেন তা মোটেও পুষ্প সজ্জা ছিল না। নবাব আলীবর্দী খান প্রভুর দৌহিত্রকে হত্যা করে বাংলার মসনদে বসেছিলেন এবং প্রভু তথা মুর্শিদ কুলী খানের বংশধরদের সকলকে উচ্চ পদ থেকে অপসারণ করে নিজের লোক বসিয়েছিলেন। যার ফলে বহু বিরোধী লোক সৃষ্টি হয়, যারা আলীবর্দীর মনোনীত সিরাজের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তাছাড়া আলীবর্দীর দুই কন্যাও সিংহাসনের দাবিদার ছিলেন। আলীবর্দী তোষণ নীতি দ্বারা ইংরেজদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। মোট কথা ভেতরে এবং বাইরে অনেক শত্রু থাকার মধ্য দিয়ে সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসেছিলেন, যা তার পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তৃতীয়ত, নবাব সিরাজউদ্দৌলা বয়সে অত্যন্ত তরুণ ছিলেন। তাছাড়া অতি আদরে বড় হওয়ায় রাজনৈতিক কূটকৌশল তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। চারদিকে যেভাবে শত্রু সৃষ্টি হয়েছিল তা দমন করতে যে কঠোর মনোবল দরকার তা সিরাজের ছিল না। তিনি বিচক্ষণ হলে ষড়যন্ত্রকারীদের বহিষ্কার বা বন্দি করতে পারতেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে মীরজাফরের যুদ্ধ বিরতির উপদেশ উপেক্ষা করতে পারতেন। যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ সিরাজের দুর্বল চিত্তের বহিঃপ্রকাশ।

চতুর্থত, ব্রিটিশরা বরাবরই সুচতুর এবং কূটকৌশলী ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ক্লাইভ রণ-নীতি ও কূটনীতিতে সিরাজউদ্দৌলা অপেক্ষা অধিকতর দক্ষ ছিল। ভারতে আধিপত্য বিস্তারে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে কাজ করছে।

পঞ্চমত, এ সময় বঙ্গদেশে চারিত্রিক অবনতি দেখা দেয়। স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা অনেক বঙ্গদেশীয়দের চরিত্রকে কলুষিত করে। সেনাপতি, আমলা, রাজন্যবর্গ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ স্বীয়স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। শুধু মীরজাফরই জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেননি তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মিলিত হয়েছিল জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, মানিকচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, ইয়ার লতিফ, ঘসেটি বেগম আরও অনেকে।

পলাশীর যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকারীদের শেষ পরিণতি

পলাশীর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূত্রপাত হয়। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের পেছনে কতিপয় কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারী জড়িত ছিল। মূলত তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই যুদ্ধে নবাব পরাজিত হয়। নিয়তি এসব ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমা করেনি। এদেরও শেষ পরিণতি ঘটেছে। নিম্নে পলাশীর যুদ্ধের কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর শেষ পরিণতি তুলে ধরা হলো-

লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা: পলাশীর যুদ্ধে বিদেশে ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম হোতা ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। ভারতবর্ষে ঘুষ, দুর্নীতি, সম্পদ আত্মসাৎ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, দুর্বৃত্তায়ন এবং অপরাজনীতির অপরাধে ইংল্যান্ডের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন লর্ড ক্লাইভ। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে এবং একে একে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হতে থাকলে অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২ নভেম্বর নিজের গলায় নিজেই ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বজ্রপাতে নিহত মীর মিরন নিজ মাথায় পবিত্র কোরআন এবং নিজ পুত্র মিরনের মাথায় হাত রেখে মীরজাফর দেশের স্বাধীনতা রক্ষার যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নবাব হওয়ার লোভে সে প্রতিজ্ঞা তিনি রক্ষা করতে পারেননি। যে মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই মিরনের মাথায় পলাশীর যুদ্ধের ৩ বছর পর ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুলাই বর্ষাকালে বজ্রপাত নেমে আসে। তাতেই ২১ বছর বয়সে মিরনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়।

ঘসেটি বেগমের পরিণতি: পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম। ষড়যন্ত্রকালীন প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়া সহ বিভিন্ন কারণে একপর্যায়ে ঘসেটি বেগম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মীরজাফর এবং পুত্র মিরনের সাথে। ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি করা হয় ঘসেটি বেগমকে। এখানে বসেও মীরজাফরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকলে মিরন তাকে বন্দি অবস্থায় নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ঘসেটি বেগম কোনোদিনই মুর্শিদাবাদে পৌঁছতে পারেনি। পথেই নৌকা ডুবিতে ঘসেটি বেগমের সলিল সমাধি ঘটে। মুর্শিদাবাদের মাটি তার কপালে জোটেনি।

পাগল অবস্থায় মারা যান উমিচাঁদ দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে আর একজন ছিলেন উমিচাঁদ। শিখ সম্প্রদায়ের উমিচাঁদ (প্রকৃত নাম আমির চাঁদ) কলকাতার একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। মুর্শিদাবাদ কোর্টে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে দালালি করতেন। অর্থ লোভে তিনি ক্লাইভ ও মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে যোগ দেন। পলাশীর যুদ্ধে নবাবকে পরাজিত করতে পারলে যে সম্পদ পাওয়া যাবে তার ৫ ভাগ দাবি করেন উমিচাঁদ। চতুর ক্লাইভ সম্মত হয়ে এক চুক্তিপত্র করেন। চুক্তিপত্রটির দুটি কপি করা হয়। একটিতে ৫ ভাগ সম্পদ দেওয়ার কথা লেখা থাকলেও মূল কপিতে তা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে মূল কপিটি উমিচাঁদকে দেখানো হয়নি। পরবর্তীতে প্রকৃত ঘটনা জানার পর অর্থ শোকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার সর্ব স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। ১০ বছর পাগল অবস্থায় রাস্তায় ঘুরে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন।

জগৎশেঠের শিরশ্ছেদ: অর্থলোভে যিনি ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন তিনি হলেন জগৎশেঠ। তাঁর প্রকৃত নাম মাহাতাপ চাঁদ। টাইটেল জগৎশেঠ, যার অর্থ পৃথিবীর ব্যাংকার। সুদের কারবারে এত বেশি অর্থের মালিক হয়েছিলেন যে, যার কারণে উক্ত টাইটেল পেয়েছিল। নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে তার ব্যাপক অর্থনৈতিক ভূমিকা ছিল। পলাশীর যুদ্ধের ছয় বছর পর ইংরেজদের কাছে তার লেখা এক ষড়যন্ত্র চিঠি মীর কাশিমের হস্তগত হয়। চিঠি প্রাপ্তির পর মীর কাশিম অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি তার সৈন্যদল নিয়ে জগৎশেঠ এবং তার পরিবারের সকলের শিরশ্ছেদ করেন।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় নদীয়ার শাসনকর্তা ছিলের কৃষ্ণচন্দ্র রায়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় মুসলমানদের শাসনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাই তিনি ইংরেজদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও মীর কাশিমের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এই দ্বন্দ্বের রেশ ধরেই কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেন মীর কাশিম।

মীরজাফরের পরিণতি: পলাশীর যুদ্ধে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন মীরজাফর। পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর। দু বারে তিনি ৪ বছর নবাব থাকলেও ইংরেজদের অবজ্ঞা এবং দেশবাসীর ঘৃণার পাত্র হিসেবেই বেঁচে ছিলেন। ১৭ জানুয়ারি ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ৭৪ বছর বয়সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে মীরজাফরের জাগতিক মৃত্যু ঘটলেও তিনি বেঁচে আছেন। মীরজাফরের প্রাসাদে ঢোকার প্রধান ফটকটি * ইতিহাসে সরকারি দলিল দস্তাবেজে এবং টুরিষ্ট গাইড বইয়ে 'নেমক হারাম দেউর' বা 'বিশ্বাসঘাতকের গেট' নামে পরিচিতি পেয়েছে। মীরজাফর বেঁচে আছেন তবে একটি জঘন্য গালি হিসাবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...