আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জাতিসংঘই হলো ইতিহাসের প্রথম ও প্রকৃত আন্তর্জাতিক সংগঠন। সংগত কারণেই এর অঙ্গীকার ছিল বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। জন্মলগ্ন থেকে প্রায় সাত দশক জাতিসংঘকে অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দুই পরাশক্তির (রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র) অসহিষ্ণুতার শিকার হয়ে জাতিসংঘ প্রায় অকার্যকর হতে বসেছিল। কিন্তু শান্তি স্থাপনে জাতিসংঘ ও তৃতীয় বিশ্বের পাহাড়সমান সমস্যা সমাধানে এর আন্তরিকতাপূর্ণ ভূমিকা একে জিইয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন কতিপয় মহাসচিব। মহাসচিবদের ভূমিকা এর অস্তিত্বকেই অর্থবহ করেনি বরং বিশ্ববাসীর কাছে জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্যতাকে বহুমাত্রিকতা দান করেছে।
মানবজাতির কল্যাণ ও বিকাশের নিমিত্তে যে অবিরাম কাজকর্ম চলছে তার কেন্দ্রস্থল জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, যা জাতিসংঘ সনদে উল্লেখ আছে। শান্তি ও নিরাপত্তাবিধান জাতিসংঘের একটি চলমান ও প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ড। যুদ্ধের করাল গ্রাস থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্ত করার যে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভব হয়েছিল, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘ এখনো মোটামুটি সফল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় ভয়াবহ কোনো যুদ্ধের মুখোমুখি এখন পর্যন্ত বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ হয়নি, যা জাতিসংঘের এক বিরাট সাফল্য। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে জাতিসংঘ বিশেষ শান্তিরক্ষা মিশন প্রেরণ করে থাকে। শান্তিরক্ষা হলো এমন একটি কৌশল যা বিরোধ নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। শান্তিরক্ষার প্রকৃতিতে ভিন্নতা আছে। শান্তিরক্ষা সাধারণত সংঘাতপূর্ণ স্থানে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার সহযোগিতাকে বোঝায়। শাস্তি সৃষ্টি হলো দু'পক্ষের সংঘাত নিরসনের পদ্ধতি আর শান্তি তৈরি হলো সংঘাত-পরবর্তী সময়ের শাস্তি প্রতিষ্ঠার মিশন। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ অনুযায়ী মহাসচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শান্তিরক্ষা মিশনগুলো কাজ করে থাকে। তবে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আদৌ সামরিক প্রকৃতির নয়।
যদিও জাতিসংঘের কোনো চার্টারে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের স্পষ্ট উল্লেখ নেই; তবে ষষ্ঠ-সপ্তম অধ্যায়ে শান্তির জন্য হুমকি, শান্তির জন্য আশা ও আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যক্রমসংক্রান্ত সুপারিশ আছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংগঠিত ও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ প্রতিরোধ, সংকোচন, তীব্রতা হ্রাস ইত্যাদি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ও কূটনৈতিক পদ্ধতির মধ্যবর্তী স্থানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অবস্থান।
জাতিসংঘের প্রথম শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল ও আরব রাষ্ট্রসমূহ থেকে বিরোধপূর্ণ এলাকায় পর্যবেক্ষণের জন্য সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে। সাধারণত বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমনে, যুদ্ধবিরোধী চুক্তি তদারকি ও কার্যকর করা, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন পরিচালনা প্রভৃতি উদ্দেশ্যে শান্তিরক্ষা বাহিনী প্রেরণ করা হয়ে থাকে।
জাতিসংঘের সাফল্য
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ একটি স্বেচ্ছামূলক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার উপর এর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা অনেকাংশে প্রশংসার দাবি রাখে। ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, নামিবিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্র জাতিসংঘের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার ফলেই স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছে। লাওস, কঙ্গো ও কোরিয়ায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করে সেখানে শান্তি স্থাপন জাতিসংঘের বিরাট একটি সাফল্য। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সুয়েজ এলাকা থেকে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল, ফ্রান্স, ও ব্রিটেন সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করলে জাতিসংঘ তার জরুরি বাহিনী মোতায়েন করলে সুয়েজ সংকটের অবসান ঘটে। পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অবসান হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) জাতিসংঘের অন্যতম সফল প্রয়াস। লেবানন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সংকট ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের ফলে স্তিমিত হয়। গ্রিস-তুরস্ক বিরোধ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তি হয়, যা জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ইসরাইলের দখলদার বাহিনীকে লেবাননের সিডন এলাকা থেকে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ** এপ্রিল মাসে অপসারণ করা জাতিসংঘের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছিল। জাতিসংঘের মহৎ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং নিয়মিত তদারকির ফলে সোয়াজিল্যান্ড, ক্যামেরুন প্রভৃতি অছি এলাকা স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হয়। ইরাক-ইরান দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে জাতিসংঘের মাধ্যমে।
মারণাস্ত্র তৈরি ও আণবিক শক্তি প্রতিযোগিতায় যাতে বিশ্ব আর কোনো ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় যুদ্ধের সম্মুখীন না হয় সেজন্য জাতিসংঘ নিরস্ত্রীকরণ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিবর্গকে আলোচনায় বসিয়ে ন্যূনতম নীতিতে ঐকমত্যে পৌছতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বিশ্ব সংস্থার উদ্যোগ ছাড়া বৃহৎ শক্তিসমূহকে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হয়ে উঠত না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়, জাতিসংঘ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। অনগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের জনগোষ্ঠীকে আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য, কারিগরি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে সংস্থাটি। দুস্থ, দুর্দশাগ্রস্ত ও নির্যাতিত আর্তমানবতার কল্যাণে জাতিসংঘ সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। আর্মেনিয়া, হাইতি প্রভৃতি দেশে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের পর জাতিসংঘ ব্যাপক ত্রাণ ও সাহায্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সাহায্য কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
শান্তিরক্ষায় জাতিসংঘের কর্মতৎপরতা ও সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে আন্তর্জাতিক নোবেল কমিটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের উপস্থিতি ও প্রচেষ্টা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের শেষ ভরসা। জাতিসংঘ অকার্যকর হলে বিশ্বকে আরও ভয়াবহ শঙ্কা ও ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানবজাতি পরস্পর আলোচনা, পরামর্শ, ঐক্য ও সহযোগিতার আশ্রয়স্থল হারিয়ে আরও বেশি অনিশ্চয়তা ও সংকটে নিপতিত হবে। জাতিসংঘের অকার্যকারিতা সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বরং সমস্যা সমাধানের পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়ারই নামান্তর হবে।
জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ
১। সোভিয়েত-ইরান বিরোধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত সৈন্য অপসারিত হয়নি- এমন একটি অভিযোগ নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি করা হয়। সৈন্য অপসারিত হওয়ার পরও অভিযোগ প্রত্যাহার না হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদ বর্জন করে।
২। বার্লিন অবরোধ: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমা দেশগুলো পূর্বানুমতি ছাড়া অভিন্ন জার্মান মুদ্রা চালু করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের যোগাযোগব্যবস্থা অবরুদ্ধ করে রাখে। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির যোগাযোগব্যবস্থা বহির্দেশের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পশ্চিম বার্লিনে খাদ্যদ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আকাশপথে, পাঠাতে বাধ্য হয়। নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত চতুর্শক্তির আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করতে হয়।
৩। ইন্দোনেশীয় সংকট ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে নেদারল্যান্ডস তার উপনিবেশ ইন্দোনেশিয়াকে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে একটি চুক্তি করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নেদারল্যান্ডস ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তা অস্বীকার করে ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ভারত বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করলে মীমাংসার জন্য ১৮ দফা উদ্ভাবন করা হয়। ফলস্বরূপ নেদারল্যান্ডস ইন্দোনেশিয়াকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা প্রদান করতে বাধ্য হয়।
৪। আরব-ইসরাইল বিরোধ: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এতে আরব-ইসরাইল বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। মিশর সুয়েজ খাল ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয়করণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মিশবের উপর ক্ষিপ্ত হয় এবং ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যা আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় এ সংকট সৃষ্টি হলে জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘ বাহিনী পাঠালে সাময়িকভাবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘর্ষ স্তিমিত হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরাইল সমস্যার পরিসমাপ্তি এখনো হয়নি।
৫। ফকল্যান্ড যুদ্ধ: আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূলে ৪৮০ কিলোমিটার দূরে ফকল্যান্ড দ্বীপগুলো অবস্থিত। উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এই দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টিনা নিজেদের বলে দাবি করে। আর্জেন্টিনীয়রা এগুলোকে 'মালবিনাস দ্বীপপুঞ্জ' নামে ডাকে। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এই দ্বীপগুলোতে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এই দ্বীপগুলোর উপর আর্জেন্টিনার দাবি ব্রিটিশরা উপেক্ষা করে। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলো আবারও নিজেদের বলে দাবি তোলে। এই দ্বীপের সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘের মধ্যস্থতা আহ্বান করে। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেন এই দ্বীপগুলো আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু একসাথে নয় ধীরে ধীরে। তাছাড়া শর্ত দেয়, এই দ্বীপগুলো আর্জেন্টিনার অধীনে দিলেও এর প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব থাকবে ব্রিটেনের উপর। এই শর্তাবলি আর্জেন্টিনা মেনে নেয়নি। এজন্য ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের মার্চের দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট লেওপোলদো গালতিয়েরি দ্বীপগুলো দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। আর্জেন্টিনার উপকূলে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে ব্রিটিশ শাসন বিতাড়িত করার জন্য আর্জেন্টাইন সরকার ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারকে একটি চরমপত্র প্রদান করে। ফলে দ্বীপটি নিজেদের দখলে রাখার জন্য উভয় পক্ষই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আর্জেন্টিনা ৩টি যুদ্ধজাহাজ ও ১০,০০০ সৈন্যের সমাবেশ ঘটায় এবং ব্রিটেন তা প্রতিহত করার জন্য ২০টি যুদ্ধজাহাজ, সহযোগী নৌযান ও ৬,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। তাছাড়া ব্রিটেন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে ২০০ মাইল পরিধির মধ্যে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ব্রিটেনের পক্ষ নেয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষ নেয়। পূর্ব ফকল্যান্ডের সান কার্লোস বন্দরে ২০শে মে মধ্যরাতে ব্রিটিশরা আক্রমণ শুরু করে। মূলত ২১শে মে থেকে ২৮শে মে পর্যন্ত যুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌছে। এই সময় ব্রিটিশ সরকার জল, স্থল ও আকাশপথে আর্জেন্টাইন বাহিনীর উপর হামলা করে। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পেরু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রদান করলেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। এই যুদ্ধে আর্জেন্টাইন বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় হয়। ফলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশরা দখল করে নেয়।৬
৬। ইরাক-কুয়েত সমস্যা: ইরাক বিনা উসকানিতে কুয়েতের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই
নভেম্বর দখল করে নেয়। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি জাতিসংঘ ইরাককে তাদের সৈন্য কুয়েত থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ প্রদান করে। ইরাকের সাথে আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ইরাক কুয়েতকে তাদের ১৯তম প্রদেশ বলে দাবি করে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী কুয়েতকে ইরাকি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করে। জাতিসংঘে এ সংকট নিরসনে ১২টি প্রস্তাব গৃহীত হয়।এছাড়া ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ কসোভোয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক মিশন, সিয়েরালিওনে পর্যবেক্ষক মিশন, পূর্ব তিমুরে সামরিক প্রশাসন গড়ে তোলা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে অর্গানাইজড মিশন প্রেরণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
জাতিসংঘের ব্যর্থতা
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাব থাকলে সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের সফলতায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ নানাবিধ জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণেও জাতিসংঘের মহান ব্রত পালনে অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ শক্তির ভেটো ক্ষমতা জাতিসংঘকে পঙ্গু করে রেখেছে। সামরিক শক্তির অভাবে জাতিসংঘ তার শান্তি ও নিরাপত্তারক্ষার সর্বাত্মক প্রস্তাবকেও কার্যকর করতে সক্ষম হয় না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একমেরুকরণ প্রবণতার কারণে একক বৃহৎ শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতাপ ও প্রভাবের প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘের ভূমিকার উপর নিপতিত হয়েছে বলা যায়।
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় সম্মিলিত জাতিসংঘের অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বিশ্বের শান্তিকামী
মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভরসা ও আশ্রয়স্থল হিসেবে জাতিসংঘের ব্যর্থতা এর মর্যাদা ও গৌরবকে অনেক ক্ষেত্রে স্নান করে দিয়েছে। সংঘাত ও সংঘর্ষে, আক্রমণ ও নির্যাতনে জাতিসংঘকে আজ আশ্রয় ও ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জাতিসংঘের উপস্থিতিতেই বিশ্বের অনেক অঞ্চলে আজ অন্যায় ও অবিচার চলছে। বৃহৎ রাষ্ট্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে, মানবাধিকারকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। জাতিসংঘ অসহায় নির্বাক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বৃহৎ শক্তি জাতিসংঘকে কোনো তোয়াক্কা করছে না। জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও সাফল্য সম্পর্কে আজ বিশ্ব জনমনে ব্যাপক সংশয় ও অনাস্থা দেখা দিয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা আজ সুদূরপরাহত। বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ আজ আণবিক মারণাস্ত্রের ভয়াবহতায় ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নে চরম অশান্তি ও উৎকণ্ঠায় সময় অতিক্রম করছে। ফিলিস্তিন সমস্যা, ইন্দোচীন সমস্যা, লেবাননের গৃহযুদ্ধ, ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম, আফগান সমস্যা, ইরাক সমস্যা, আফ্রিকার বর্ণবাদী সমস্যা, শরণার্থী সমস্যা, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানবাধিকারের অবাধ ও নির্লজ্জ লঙ্ঘন, বুভুক্ষু ও নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবতার করুণ আর্তনাদ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ইস্যুকে সুদূরপরাহত করে রেখেছে। বিশ্বজুড়ে চলছে আধিপত্যবাদের এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। বৃহৎ পরাশক্তি রাষ্ট্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। শক্তির জোরে সবল রাষ্ট্র ক্ষমতাহীন দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনবরত হস্তক্ষেপ করে চলছে; নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে তাদের তাঁবেদার সরকার বসাচ্ছে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণে জার্মানি, ইয়েমেন দীর্ঘদিন পূর্ব ও পশ্চিমে এবং উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করেছে। কোরিয়া আজও বিভক্ত রয়েছে। ইসরাইল বিশ্বজনমতের সকল আবেদন উপেক্ষা করে বেপরোয়াভাবে প্যালেস্টাইনের উপর বর্বরোচিত হামলা ও দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব আবাসভূমির ন্যায়সংগত দাবি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং তাদের উপর নানা রকম নির্যাতন ও নিপীড়ন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ আজ বৃহৎ শক্তির করাল গ্রাসে আবদ্ধ। ১৯৭৭-৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বৃহৎ শক্তিবর্গের মদদপুষ্ট ভিয়েতনাম বাহিনী যখন কম্বোডিয়া দখল করল, জাতিসংঘ তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ফকল্যান্ড সমস্যার সমাধান এবং ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ, দমনের নামে লিবিয়ার উপর মার্কিন জঙ্গি বিমান হামলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সার্ব বাহিনী কর্তৃক বসনিয়ায় মানব-ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞে জাতিসংঘের রহস্যজনক নীরব ভূমিকা বিশ্বজনমতকে হতবাক করেছে। সোমালিয়া, রুয়ান্ডাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা এ সংস্থার প্রতি বিশ্বের শান্তিকামী জনগণকে বিক্ষুব্ধ করেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে আফগানিস্তান দখল করে নেয়। আফগানিস্তান সরকারকে উৎখাত করে যেখানে তাঁবেদার পুতুল সরকার বসানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ নির্লজ্জ ও গুরুতর অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
আফগানিস্তানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সহযোগিতায় মিথ্যা অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে। ইরাক দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নিকট ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগের কোনো সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তথাপি ইরাকের উপর চালানো হয় ব্যাপক দখলদারী অভিযান, হত্যা করা হয় নিরীহ সাধারণ জনগোষ্ঠীকে, ধ্বংস করা হয় ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ ব্যাপক জাতীয় সম্পদ। এ ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল অসহায়ের মতো। সাধারণ জনগোষ্ঠী ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট জাতিসংঘের অস্তিত্ব তখন নিতান্তই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করে বলপ্রয়োগের অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নামে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণ করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আধিপত্যবাদ ও নৈরাজ্যবাদ। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় জাতিসংঘের এহেন ভূমিকা ও ব্যর্থতা পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বের শান্তিকামী ও সচেতন জনমনে আজ প্রশ্ন জেগেছে- শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রতে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ কি এভাবে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করতে করতে শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ভাগ্যকেই বরণ করে নেবে?
জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ
জাতিপুঞ্জের ধ্বংসাবশেষের পর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাকে অধিকতর নিশ্চয়তাদানের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা জাতিসংঘ আজ অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। নিচে জাতিসংঘের ব্যর্থতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
প্রথমত: জাতিসংঘের ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে এর গঠন কাঠামোর ত্রুটি, সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বোধ ও সাম্যনীতির অভাব। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, সকল সদস্য রাষ্ট্র জাতিসংঘের অভ্যন্তরে সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার অধিকারী। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচটি বৃহৎ রাষ্ট্রের স্থায়ী আসনের ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের একক ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারকে জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী ব্যবস্থা বলা যায়।
দ্বিতীয়ত: নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণে পাঁচটি বৃহৎ সদস্য রাষ্ট্রের সকলে একমত হওয়া আবশ্যক। যেকোনো এক সদস্য দ্বিমত পোষণ করে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে অন্য সকলে একমত হলেও কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। এরূপ ভেটো ক্ষমতা বৃহৎ শক্তির হাতে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা ও তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির অন্যতম অস্ত্রস্বরূপ। ভেটো ক্ষমতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না।
তৃতীয়ত: সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত হলেও এর প্রকৃত কোনো কার্যকরী ক্ষমতা নেই বললেই চলে। সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরাপত্তা পরিষদের মুখাপেক্ষী। সাধারণ পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তকে বাস্তব রূপ দিতে পারে না। সাধারণ পরিষদের এরূপ অক্ষমতার কারণে তাকে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হয়।
চতুর্থত: জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী না থাকায় আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করলে জাতিসংঘ কোনোরূপ বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। সাধারণ সদস্য রাষ্ট্রের সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব বা জটিলতার উদ্ভব ঘটায়।
পঞ্চমত: বৃহৎ শক্তিসমূহের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে তাদের সদিচ্ছার অভাব বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
ষষ্ঠত: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো সময় বৃহৎ কোনো রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও আঞ্চলিক প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নির্লজ্জভাবে হস্তক্ষেপ করছে। এর ফলে অন্যান্য রাষ্ট্রও পরবর্তী সময়ে জড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। জাতিসংঘের মহান শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষামূলক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে তোলে।
সপ্তমত: আর্থিক সংকটে নিপতিত হয়ে জাতিসংঘ বর্তমানে অনেক সাহায্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘে এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সদস্যরা ঠিকমতো চাঁদা প্রদান করছে না। অর্থাভাবে জাতিসংঘ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
উপর্যুক্ত ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘ তার মহান ভাবমূর্তি অনেকখানি হারাতে বসেছে। জাতিসংঘ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সত্য কিন্তু তার মহা সনদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আজ সুদূরপরাহত। ব্যর্থতার পথে সকল প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তারক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের তা' একান্ত কামনা। জাতিসংঘের সফলতা মানবজাতির সফলতা।
জাতিসংঘকে অধিকতর কার্যকর করার ব্যবস্থা.
বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানাবিধ কারণে জাতিসংঘের গৌরব-মর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত। জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এমতাবস্থায় জাতিসংঘের সাফল্য ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। নিচে জাতিসংঘকে অধিকতর সফল ও কার্যকর করার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থা বা উপায় সম্পর্কে সুপারিশ করা হলো-
১। জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে এর অভ্যন্তরে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২। নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হওয়া উচিত। সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রয়োজনবোধে বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
৩। নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ রাষ্ট্রের একক ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করতে হবে। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশ সদস্যের সমর্থনই যথেষ্ট। সাধারণ পরিষদের সমর্থন অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে সে অনুযায়ী স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
৪। সকল সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামরিক জোট ও চুক্তিসমূহ বাতিল করতে হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সংস্থা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে গঠন করা যেতে পারে।
৫। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অধিকতর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন একান্ত আবশ্যক। নিরাপত্তা পরিষদ ও সশস্ত্র কাউন্সিলের সম্মতিক্রমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। জাতিসংঘের পূর্বসম্মতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রে তার সামরিক বাহিনী পাঠাতে পারবে না।
৭। জাতিসংঘের আদর্শ ও নীতিমালা যাতে সকল সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলে তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সম্মিলিত শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ নীতি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা চাই।
৮। জাতিসংঘের সফলতা নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সদিচ্ছা, সহযোগিতা ও আন্তরিক কর্মপ্রচেষ্টার উপর। সকল সদস্য'রাষ্ট্রকে আন্তরিকতার সাথে জাতিসংঘের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।
৯। জাতিসংঘের মহাসচিবের পদমর্যাদা ও ক্ষমতার পুনর্মূল্যায়ন করা আবশ্যক। মহাসচিবের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে জাতিসংঘের নেতৃত্বদানে তার ক্ষমতাকে অর্থবহ করে তোলা আবশ্যক।
১০। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত করা আবশ্যক।
১১। অনুন্নত ও দরিদ্র দেশসমূহে জাতিসংঘের সাহায্য ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। মানবতার কল্যাণেই জাতিসংঘের সার্থকতা নিহিত রয়েছে।
১২। জাতিসংঘকে বর্তমান আর্থিক সংকটের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অনাবশ্যক ব্যয় পরিত্যাগ করতে হবে। সকল সদস্য যাতে বার্ষিক চাঁদা সময়মতো পরিশোধ করে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘকে আর্থিক দিক থেকে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিজস্ব আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
উল্লিখিত ব্যবস্থাসমূহ সঠিকভাবে কার্যকর করতে পারলে জাতিসংঘ তার বর্তমান দুর্বলতা, অক্ষমতা ও দৈন্যদশা অনেকখানি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। সকল বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে জাতিসংঘ যেদিন মানবতার কল্যাণসাধন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে আরও অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে, সেদিনই জাতিসংঘ গঠনের প্রকৃত সার্থকতা উপলব্ধি করা যাবে। মোটকথা, বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘকে সকল আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ
যাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৩৬তম সদস্য হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাতিসংঘের উল্লেখ করার মতো কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ও বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর সহযোগিতায় জাতিসংঘের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। জাতিসংঘ বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পগুলোতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সমমর্যাদা ও সাম্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে বৈদেশিক কার্যক্রম নির্ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মহত্ত্ব ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ যে ভূমিকা রেখেছে তার স্বীকৃতিও পেয়েছে। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। ১লা জুন, ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ১ মাসের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬-৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সাবেক স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জাতিসংঘের কার্যপ্রণালিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দিলে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে। সর্বোপরি বাংলাদেশ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বিশ্বশান্তি রক্ষা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ, বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জাতির আত্মত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল থেকে এসব বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে।
শান্তিরক্ষা কাজে বাংলাদেশ
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের শান্তি মিশন শুরু হয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিরক্ষা মিশনের দেখাশোনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের নিয়মিত অংশগ্রহণ ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু হয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধের শেষের দিকে UNIMOG-এর পর্যবেক্ষক হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ ও অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত গৌরবের। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সক্রিয় অংশীদার। বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের কার্যক্রমের সাথে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এ মহান দায়িত্ব পালন করে আসছে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে উপসাগরীয় যুদ্ধে যৌথ বাহিনীতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ত্বরান্বিত করে। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক বাহিনী ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক হারে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও সৈন্য প্রেরণ শুরু হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগ দেয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে শান্তি মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে বিগত ২৪ বছরে বাংলাদেশের ভূমিকা দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলাদেশ চলমান ১৫টি মিশনের মধ্যে ১৪টি মিশনসহ মোট ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছে। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল সর্বোচ্চ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। জনবলের দিক থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সবার শীর্ষে। শান্তি মিশনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মিশনকর্মীরা সংশ্লিষ্ট দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যেমন অবদান রাখছেন, তেমনি আমাদের সংস্কৃতিকে বহির্বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ এ যাবৎ প্রায় ১,২৮,৫৪৫ জন সদস্য পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশ যেসব শান্তি মিশন সমাপ্ত করেছে
| সময়কাল | মিশনের নাম | দেশ | মিশনের উদ্দেশ্য | বাংলাদেশ কর্তৃক প্রেরিত সৈন্য |
| খ্রিষ্টাব্দ ১৯৮৮-১৯৯১ | ইউনাইটেড নেশনস ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভার গ্রুপ (UNIIMOG) | ইরান-ইরাক | ইরান-ইরাক যুদ্ধের অবসান | ৩১ |
| ১৯৮৮-১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস গুড অফিসেস মিশন ইন আফগানিস্তান অ্যান্ড পাকিস্তান (UNGOMAP) | আফগানিস্তান | সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের অবসান | ০২ |
| ১৯৮৯-১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস ট্রানজিশন অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপ (UNTAG) | নামিবিয়া | নামিবিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের অবসান | ২৫ |
| ১৯৯১-১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ | কম্বোডিয়া (UNAMIC) ইউনাইটেড নেশনস অ্যাডভান্স মিশন ইন | কম্বোডিয়া | ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান | ১০০২ |
| ১৯৯১-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অ্যাঙ্গোলা ভেরিফিকেশন মিশন-১ (UNAVEM-I) | অ্যাঙ্গোলা | অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধের অবসান | ০৯ |
| ১৯৯১-২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস ইরাক-কুয়েত অবজারভেশন মিশন (UNIKOM) | ইরাক-কুয়েত | উপসাগরীয় যুদ্ধের অবসান | ৮,২৩৮ |
| ১৯৯২-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস প্রটেকশন ফোর্স (UNPROFOR) | বসনিয়া, মেসিডোনিয়া, হার্জগোভিনা | যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের অবসান | ১,৪২৩ |
| ১৯৯২-১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন মোজাম্বিক (ONUMOZ) | মোজাম্বিক | মোজাম্বিকের গৃহযুদ্ধের অবসান | ২,৫২২ |
| ১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন সোমালিয়া-1 (UNOSOM-I) | সোমালিয়া | সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান | ০৭ |
| ১৯৯৩-১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অপারেশন ইন সোমালিয়া-11 (UNOSOM-II) | সোমালিয়া | সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসান | ১,৯৬৭ |
| ১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস ট্রানজিশনাল অথরিটি ইন কম্বোডিয়া (UNTAC) | কম্বোডিয়া | ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অবসান | ১,০০২ |
| ১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন হাইতি (UNMIH) | হাইতি | হাইতির সামরিক শাসনের অবসান | ২,১২৫ |
| ১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ফর রুয়ান্ডা (UNAMIR) | রুয়ান্ডা | রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান | ১,০১২ |
| ১৯৯৩-২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন জর্জিয়া (UNOMIG) | জর্জিয়া | আবখাজিয়া যুদ্ধের অবসান | ১৩১ |
| ১৯৯৩-১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন উগান্ডা-রুয়ান্ডা (UNOMUR) | রুয়ান্ডা | রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের অবসান | ২০ |
| ১৯৯৪-২০০০ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস মিশন অব অবজারভারস ইন তাজিকিস্তান (UNMOT) | তাজিকিস্তান | তাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধের অবসান | 8০ |
| ১৯৯৫-১৯৯৭খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অ্যাঙ্গোলা ভেরিফিকেশন মিশন-II (UNAVEM-II) | অ্যাঙ্গোলা | অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধের অবসান | ৪৭৯ |
| ১৯৯৬-২০০২ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস মিশন অব অবজারভারস ইন প্রিভলাকা (UNMOP) | ক্রোয়েশিয়া | প্রিভলাকার আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের অবসান | ১,৪২৩ |
| ১৯৯৯-২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ | UNAMET/UNTAET/UNMISET | পূর্ব তিমুর, ইন্দোনেশিয়া | পূর্ব তিমুর ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বন্দ্বের অবসান | ১,৩৮৫ |
| ১৯৯৯-২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন সিয়েরা লিওন (UNAMSIL) | সিয়েরালিওন | সিয়েরালিওনের গৃহযুদ্ধের অবসান | ১১,৯৪৪ |
| ২০০৭-২০১০ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস মিশন ইন দ্য সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক অ্যান্ড শাদ (MINURCAT) | শাদ | দারফুর সংঘর্ষ ও শাদের গৃহযুদ্ধের অবসান | ৫৭ |
| ২০০৭-২০১০ খ্রিষ্টাব্দ | ইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন সুদান (UNOMIS) | সুদান | সুদানের দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের অবসান | ৮,৭৭১ |
Explanation of Key Words
- লন্ডন ঘোষণা (London Proclamation): জাতিসংঘের জন্মের সূচনা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুন লন্ডনের জেমস প্রাসাদে। এ সময় জার্মানির নাৎসি আক্রমণের ভয়ে ইউরোপের মিত্রদেশের নেতৃবৃন্দ এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। এসব দেশের নেতৃবৃন্দ চিরস্থায়ী শান্তির জন্য এবং আগ্রাসনমুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সভার আয়োজন করেন। উক্ত সভার ঘোষণাসমূহই লন্ডন ঘোষণা নামে পরিচিত হয়।
- আটলান্টিক সনদ (Atlantic Charter): দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে নিউফাউন্ডল্যান্ডের আর্জেন্টিনা
উপসাগরে মার্কিন ক্রুজার 'অগাস্টা' এবং ব্রিটিশ জাহাজ 'প্রিন্স অব ওয়েলসে' অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কতিপয় মৌল নীতি সম্পর্কে একমত হয়ে যে বিবৃতি প্রদান করেন, সেটিই আটলান্টিক সনদ নামে খ্যাত। এই চুক্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা প্রতিহতকরণ, জনগণের অধিকারের সমর্থন প্রভৃতি বিষয়ের চুক্তি হয়।। য়। এই চুক্তিতে জার্মানি ও ইতালির হয়। এই দু বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ১৫টি দেশ সমর্থন দান করে। - মস্কো সম্মেলন (Moscow Conference): ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুলাই মস্কোয় জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত লড়াইয়ের বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে দুই পক্ষ পরস্পরকে সহায়তাদানের বিষয়ে, সব মিত্রের সম্মতি ছাড়া জার্মানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না চালানোর বিষয়ে এবং তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অথবা শান্তিচুক্তি সম্পাদন না করার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল। মস্কো সম্মেলনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। এজন্য মস্কো সম্মেলনকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার তৃতীয় পদক্ষেপ বলা হয়।
- তেহরান সম্মেলন (Tehran Conference): ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে নভেম্বর থেকে ১লা ডিসেম্বর
পর্যন্ত সময়ে পারস্যের (ইরান) রাজধানী তেহরানে মিত্রশক্তি জোটের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে ফ্রান্সে মিত্রবাহিনীর অবতরণ, জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত আক্রমণের বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া জাপানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সোভিয়েতের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধ শেষে শান্তিরক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের কথা বলা হয়। - ইয়াল্টা সম্মেলন (Yalta Conference): জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ২৭-এ সন্নিবেশিত নিরাপত্তা
পরিষদের ভোটিং ব্যবস্থা সম্পর্কে বিধিবিধান। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেব্রুয়ারিতে এই সম্মেলনে স্ট্যালিন, চার্চিল ও রুজভেল্ট আলোচনা করেন। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে ভেটো ক্ষমতা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। - চতুর্থ জাতি ঘোষণা: ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো সম্মেলনে বৃহৎ চার শক্তিধর রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন,
রাশিয়া ও চীন) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর চতুর্থ জাতি ঘোষণা প্রকাশিত হয়। চতুর্থ জাতি ঘোষণায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ, পরাজিত শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণ ও বিশ্বব্যাপী শাস্তি প্রতিষ্ঠা প্রাধান্য পায়। জার্মানির নৃশংসতা নিয়ে চার বৃহৎ রাষ্ট্র ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, যা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ। চতুর্থ জাতি ঘোষণায় সিদ্ধান্ত হয়, জার্মানিকে অভিযুক্ত করে ন্যুরেমবার্গ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে। - ইউনেস্কো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দারিদ্র্য নিরসনকল্পে জাতিসংঘের বেশ কতকগুলো অঙ্গসংগঠন গড়ে ওঠে। এসব বিশেষ সংস্থার মধ্যে 'জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা' (UNESCO) অন্যতম। UNESCO-এর পূর্ণরূপ হলো- United Nations Educational Scientific and Cultural Organization. বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থাপনা আবিষ্কার ও সংরক্ষণে UNESCO গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
- আংকটাড: বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি পুঁজি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রের সঙ্গে উন্নয়নসংশ্লিষ্ট ইস্যুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার জন্য এই সংস্থা জাতিসংঘ ব্যবস্থায় কেন্দ্রবিন্দুরূপে কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য, পুঁজি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সুবিধাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি বিশ্বায়নের ফলে উদ্ভূত নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় এবং সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে সংযুক্ত হতে সাহায্য করা। বর্তমানে আংকটাড তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে অনেকখানি সফলতা অর্জন করেছে।
- ডাম্বারটন ওকস (Dumbarton Oaks): ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সোভিয়েত
ইউনিয়নের সাথে চীন ডাম্বারটন ওকসের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। উক্ত সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংগঠনের নাম স্থির হয় United Nations (জাতিসংঘ)। - শক্তি-ভারসাম্য: শক্তিসাম্য বা শক্তি-ভারসাম্য একটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থা, যেটি
আন্তর্জাতিক শাস্তি রক্ষা করার ক্ষেত্রে কাজ করে। এর মাধ্যমে কোনো গ্রুপ বা রাষ্ট্রীয় জোট অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। শক্তি-ভারসাম্যের মাধ্যমে কিছু সমশক্তিধর রাষ্ট্র জোট করে শাস্তিকে সুরক্ষা দিতে পারে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল Balance of Power। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে লীগ অব ন্যাশনসের প্রতিষ্ঠা হওয়ায় এই পুরনো কূটনৈতিক ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হয়। - ভেটো: কোনো কিছু অমান্য করা বা না মানার নামই ভেটো। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘ (UNO) প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী মিত্রপক্ষের ৫টি শক্তিধর রাষ্ট্র; যথা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, চীন ও ফ্রান্স। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় এ ৫টি রাষ্ট্র যেকোনো সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করে। এ ৫টি রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বিধায় নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। জাতিসংঘের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে এ ৫টি রাষ্ট্রের যেকোনো রাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে না। জাতিসংঘের গঠনপ্রক্রিয়ায় ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র Veto প্রয়োগের ক্ষমতা সংরক্ষণের সুযোগ পায়।
- ইউনিসেফ: জাতিসংঘের অধীন একটি সহযোগী সংস্থার নাম ইউনিসেফ (UNICEF), যার পূর্ণরূপ হলো- United Nations International Children's Emergency Fund.. অর্থাৎ শিশুদের কল্যাণে গঠিত শিশু তহবিলের নামই ইউনিসেফ।
জাতিসংঘ এবং বিশ্বশান্তি মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই