পাঠ-১.২ শিল্পবিপ্লবের কারণ।

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

44

শিল্প বিপ্লব প্রথম সংঘটিত হয় ইংল্যান্ডে। সময়টি ছিল আঠারো শতক। যে সব কারণে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল
তা নিম্নরূপ:

(১) অর্থনৈতিক আঠারো শতকের কিছু আগেই ব্রিটেনের সামন্তবাদী অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ে। পুরাতন *ভূমি ব্যবস্থার প্রতি কৃষক, ভূমিদাস ও প্রান্তিক চাষিরা আস্থা হারিয়ে ফেলে। জমিদারগণ বাজারমুখী কৃষিনীতি চালু করে। এর ফলে কৃষিতে উৎপাদন বেড়ে যায়। কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসে। ব্রিটেনের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে। ভারতবর্ষ থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি করে সেগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল অর্থোপার্জন করে ব্রিটেন। আঠারো শতকের শুরুতে ব্রিটেনের কৃষিতে উদ্বৃত্ত বেড়ে যায়। কেটে যায় দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। চাষিরা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে সাবলম্বী হয়ে ওঠে। ব্রিটেনে অনাবাদি জমিতে চাষাবাদের ফলে শস্য উৎপাদন বেড়ে যায়। শিল্প-উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত হয়। এই অবস্থায় শিল্প বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়।

(২) সামাজিক পনের শতকের পর থেকে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক যে সব পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার ফলে সমাজ ব্যবস্থাতেও বেশ কিছু পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। ব্রিটেনের প্রথাগত সামন্ত ব্যবস্থাতেও জমিদার এবং কৃষক শ্রেণির আধুনিকায়ন ঘটতে থাকে। জমিদারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং হস্তচালিত এ শিল্পোদ্যোগের সঙ্গে জড়িত হতে থাকে, একই সঙ্গে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক এবং ভূমিদাসদের একটি অংশও নতুন এ সব বণিক এবং শিল্প মালিকের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে থাকে। কৃষি কাঠামোতে ধনী কৃষকের উদ্ভব ঘটে। আঠারো শতকে এসে কৃষিতে জমিদারতন্ত্র ভেঙে পুঁজিবাদী ধারার চাষাবাদের প্রবর্তন শুরু হয়। ফলে সমাজ 'ব্যবস্থায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদক শ্রেণির উদ্ভব ঘটতে থাকে। সমাজ ব্যবস্থায় সচ্ছল ও অসচ্ছল কৃষক, জমিদার, বণিক এবং শিল্প উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ ছাড়া শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও বস্তি বাসীর সংখ্যা উল্লেখ করার মতো বৃদ্ধি পায়। সমাজে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং ধনিক শ্রেণির অবস্থান বেশ স্পষ্ট হতে থাকে। নতুন এ সব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সামাজিক শক্তি পুঁজিপতি, অর্থসংগ্রহকারী, সংগঠক, বণিক, পরিচালক, বিক্রেতা, উকিল, শিক্ষক, আমলা ও অভিজাত শ্রেণি ইত্যাদিরূপে ইংল্যান্ডের সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে সংগঠিত হতে থাকে। সংগঠক শ্রেণির উদ্যোগ দ্রুত প্রসারিত হয়। ফলে ইংল্যান্ড যেন তখন শ্রমজীবী শ্রেণির বিকাশের অপেক্ষায় ছিল। এর পথ ধরেই ইংল্যান্ড সব দেশের আগে শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।

(৩) বাণিজ্য বিপ্লব: ইংল্যান্ডে ১৫০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আড়াইশ বছর ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভারে সম্প্রসারিত হয়। দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে এ সব বাণিজ্য ছড়িয়ে যেতে থাকে। বাণিজ্য প্রসারের জন্যে ইংল্যান্ডে বিভিন্ন পণ্যের বাৎসরিক মেলা বসতো। লন্ডন শহরে বাজার নিয়মিত হতে থাকে। অন্যান্য শহরে যদিও সাপ্তাহিক বাজার ছিল; তবে ক্রমে বাজারের চাহিদা পূরণে নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারে ইংল্যান্ড প্রধান ভূমিকা রাখে। ইংল্যান্ডে বিদেশি কোম্পানিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করার মাধ্যমে নিজেদের বাণিজ্যকে অবাধে বিকাশ লাভের সুযোগ করে দেয়। ইংল্যান্ডে গড়ে ওঠে দুই ধরনের কোম্পানি। এক. যৌথ মূলধনী, দুই. নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি। ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো মূলত যৌথ মূলধনে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৫৭খ্রিস্টাব্দে এটি যৌথ মূলধনী কোম্পানিতে পরিণত হয়। এক সময় এ কোম্পানিটি দক্ষিণ আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণে-অবস্থিত উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে অস্ট্রেলিয়ার 'পশ্চিমের ম্যাগেলান প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভারতবর্ষে এই কোম্পানি সুরাট, মাদ্রাজ, কলকাতা ও বোম্বাইতে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। এক সময় এই কোম্পানিই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে নেয়। এছাড়া ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে হাডসন বে কোম্পানি স্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে ব্রিটেন কানাডাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মানুষ ধরে ধরে ক্রীতদাস হিসেবে ব্রিটেনে বিক্রি করা এবং চিনির জন্যে আখচাষের লক্ষ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রেরণ করার জন্যে রয়‍্যাল্ব আফ্রিকান কোম্পানিকে অধিকার দেওয়া হয়। তাদেরও দক্ষিণে একচেটিয়া বাণিজ্য করার জন্যে ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে সাউথ সি কোম্পানি সনদ লাভ করে। এসব কোম্পানি ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, আমেরিকা ও কানাডায় ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। ব্রিটেনের হাতে তার ফলে যথেষ্ট পুঁজির সঞ্চয় ঘটে। এভাবেই ব্রিটেনে অবাধ অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বণিকতন্ত্র বিশেষভাবে ভূমিকা রাখে।

(৪) প্রযুক্তির উদ্ভাবন: ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব সাধনে প্রযুক্তির উদ্ভাবন সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। ষোল শতকের মধ্য
ভাগ থেকে ইংল্যান্ডের উৎপাদন ব্যবস্থায় পুজির অনুপ্রবেশ ঘটে। সতের ও আঠারো শতকে কুটিরের বদলে কারখানার সংযোজন ঘটে। নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন শুরু হয়। প্রধানত লোহা ও ইস্পাতের ব্যবহার, নতুন চালিকা শক্তির উৎসের আবিষ্কার, বস্ত্র শিল্পের যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে মানুষের কর্মশক্তি বৃদ্ধি, কারখানা প্রথা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন পদ্ধতিতে নতুন ধারা চালু, প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের গোপন ভাণ্ডারকে মানুষের জন্য উন্মোচন করা, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তির ব্যবহারে গতিশীল শিল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে শিল্প বিপ্লবের মধ্যে ইংল্যান্ডের প্রবেশ অবধারিত হয়।

(৫) নবজাগরণ: পনের শতকের পর থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই রেনেসাঁসের (নবজাগরণ) প্রভাব
বাড়তে থাকে। মানুষ যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ হতে থাকে। এর আগে গির্জার একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা রুদ্ধ ছিল। শিক্ষাদীক্ষাও রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনোভাবেই প্রণোদনা পায় নি। তবে রেনেসাঁসের প্রভাবে ইংল্যান্ডে সতের-আঠারো শতকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের মতো শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়গুলো নিজস্ব জায়গা করে নেয়। এর ফলে শিল্প ও প্রযুক্তির তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক জ্ঞানের চর্চা নতুনভাবে গতি লাভ করতে থাকে।
উপরে উল্লিখিত কারণে অন্যান্য দেশের আগে ইংল্যান্ডে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ ঘটতে থাকে। ইংল্যান্ড শিল্প বিপ্লবের সূচনাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত হয়। এরই প্রভাব পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশে পড়ে।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...