যে সব আবিষ্কারের ফলে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় বলে ধরা হয় তা নিম্নরূপ:
(ক ) বস্ত্রশিল্প: ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প বিপ্লব ঘটে বস্ত্রখাতে। ইংল্যান্ডের আবহাওয়াগত কারণে বস্ত্র উৎপাদনের
ব্যাপক তাগিদ ছিল। সুতাকাটা ও বয়নের জন্যে প্রথম যন্ত্রের ব্যবহারও তাই ঘটে। সে কারণেই হস্তচালিত পদ্ধতির যান্ত্রিকীকরণ অপেক্ষাকৃত আগে ঘটে। একটির পর একটি আবিষ্কার অল্পদিনের মধ্যেই বস্ত্রশিল্পে যথার্থ অর্থেই বিপ্লব ঘটাতে থাকে। ১৭৩৩ সালে জন কে (John Kay) নামক একজন তাঁতি 'উড়ন্ত' মাকু (Flying Shuttle) আবিষ্কার করেন। ১৭৬৪ খ্রি. জেমস হারগ্রিভস 'সুতাকাটা জেনি' (Spinning Jenny), ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড আর্করাইট' 'ওয়াটার ফ্রেম' এবং এডমান্ড কাটরাইটের 'পাওয়ার লুম' আবিষ্কার বয়ন শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুধু যন্ত্র আবিষ্কারই নয়, উৎপাদনে তা প্রয়োগের ফলে কারখানার প্রসার ঘটে বেশ দ্রুত। ব্রিটেনে অসংখ্য শ্রমিক বিভিন্ন কারখানায় যুক্ত হয়। ব্রিটেন দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য অন্যান্য দেশে রপ্তানি শুরু করে।


(খ) জল পরিবহন শিল্পোন্নতির চাহিদা মেটাতে কয়লা, লোহা ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের জন্যে জল পথ উন্মুক্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৭৬১ সালে ম্যানচেস্টার ও ওয়ার্সলের মধ্যে প্রথম খাল কাটা হয়। ১৭৭৭সালে ট্রেন্ট মার্সে খাল কাটা হয়। জাহাজ যাতায়াতের জন্যে খাল কাটা কালক্রমে নদ-নদী ড্রেজিং শিল্পে পরিণত হয়। ব্রিটেনে জাহাজ শিল্প বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। বাষ্পচালিত জাহাজ শিল্প বিপ্লবে নতুন সংযোজন ঘটায়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে জেমস ওয়াট (James Watt) প্রথম কার্যকরী বাষ্পচালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর দ্বিগুণ-শক্তিসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করা হয়। ইংল্যান্ডে প্রথম স্টিমার তথা বাষ্পীয় জলপোত ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। অবশ্য ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ফুলটনের নির্মিত স্টিমবোট শিল্প বিপ্লবের গতিপ্রবাহকে বাড়িয়ে দেয়।

(গ) স্থল পথ ও পরিবহন শিল্প বিপ্লব ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে স্থলপথ ও পরিবহনের অগ্রগতি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তখনও পর্যন্ত কাঁচা ও সরু রাস্তার বেশি কিছু ছিল না। যানবাহনও ছিল মূলত মানুষ অথবা ঘোড়াবাহিত। শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে এ ধরনের রাস্তাঘাট ও পরিবহন মোটেও যথেষ্ট ছিল না। ফলে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং যানবাহন তৈরি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আঠারো ও উনিশ শতকে রাস্তাঘাট নির্মাণ শিল্প পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। টেলফোর্ড এবং ম্যাকাডাম নামক দু'জন স্কট ইঞ্জিনিয়ার ব্রিটেনের রাস্তাঘাট নির্মাণের কিছু নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দ্রুতগামী পরিবহন হিসেবে ব্রিটেনে রেল পরিবহন সতের শতক থেকে শুরু হয়। তখন ছিল ঘোড়ায় টানা রেল। তরে-১৮২৫-খ্রিষ্টাব্দে স্টিফেনসন প্রথম রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার করলে যন্ত্রনির্ভর রেল পরিবহন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

(ঘ) খনিজ সম্পদ আহরণ: শিল্প বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে কয়লা, লোহা, ইস্পাতসহ নানা খনিজ পদার্থ উত্তোলন এবং এগুলোর ব্যবহার শুরুর মাধ্যমে। বিশেষত কলকারখানা নির্মাণে কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রেল লাইন নির্মাণে লোহার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে হামফ্রি ড্যাভি (Humphry Davy) খনিগর্ভে কাজ করার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এতে খনির কাজ সহজ হয়। লোহা গলানোর জন্য Blast Furnace নামক একটি বিশেষ যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে-বেঞ্জামিন হেন্সম্যান এবং হেনরি কট (১৭৮৪ খ্রি.) ইস্পাত গলানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এ ছাড়া ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে বেসেমার কনভার্ট, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ওপেন হার্থ এবং বেসিক প্রসেস উদ্ভাবনের ফলে ইস্পাত উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঢালাই লোহার উৎপাদন ১৭২০-এ ১৮ হাজার টন এবং ১৮০২-তে ২৫০ হাজার টনে দাঁড়ায়। পাথুরে কয়লা উৎপাদন ১৭৫০-এ ৫ মিলিয়ন টন থেকে ঐ শতকের শেষ দিকে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ মিলিয়ন টনের বেশি হয়।

(ঙ) অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার: উনিশ শতকে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ এবং বিদ্যুৎ আবিষ্কার ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবকে
ব্যাপক অগ্রগতি প্রদানে ভূমিকা রাখে। গ্যাস, জুতা, আটা, ময়দা, মাদক দ্রব্য ইত্যাদির উৎপাদন বেড়ে যায়। গড়ে ওঠতে থাকে ছোট, মাঝারি ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন নতুন শিল্প শহর। ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লিভারপুল এবং স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহর এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডে বিপুল সংখ্যক ভারী শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশে পরিচিত হয়।

শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
Read more