শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।
(ক) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন: শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে বাণিজ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি এবং পুঁজির লেনদেন বেড়ে যায়। বাণিজ্যিক মূলধন (Mercantile capital) শিল্প মূলধনে (Industrial capital) রূপান্তরিত হয়। ব্যবসায়ীরা বড় বড় শিল্প কারখানায় বিপুল মূলধন খাটিয়ে প্রচুর পণ্যসামগ্রী উৎপাদন শুরু করে। বড় বড় শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য তখন ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠতে থাকে। একক মালিকানায় যে সব বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না সেগুলো যৌথ মালিকানায় ও যৌথ মূলধনী কারবারে রূপান্তরিত হয়। ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেকগুণ বেড়ে যায়। ফলে ইংল্যান্ডে অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। ১৭৬০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের আমদানি ১২ গুণ, রপ্তানি ১৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। ইংল্যান্ডের শিল্পজাত দ্রব্য অনেক দেশে রপ্তানি হতে থাকে। ইংল্যান্ডকে এ জন্য "পৃথিবীর কর্মশালা" বা (Workshop of the World) বলে অভিহিত করা হতো। শিল্পাশ্রয়ী সভ্যতা বলে ইংল্যান্ডের নামকরণের পেছনে যুক্তি ছিল এই যে, দৈনন্দিন খুঁটিনাটি ব্যবহার্য জিনিসপত্র থেকে বড় বড় ভোগ্যপণ্য জিনিসও ব্রিটিশরা উৎপাদন করতে থাকে। ইংল্যান্ড গোটা উনিশ শতক, এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত পৃথিবীর প্রধান ধনী দেশ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভিত্তি এতই মজবুত ছিল যে, ১৮০৬ থেকে ১৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট মহাদেশীয় ব্যবস্থা (Continental system) প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক যে অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন তাতেও ইংল্যান্ডকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হয়নি। শিল্প বিপ্লবের ফলে শিল্পপতি ও কারখানার মালিকগণ প্রচুর সম্পদ ও অর্থের মালিক হন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও ইংল্যান্ডের কোষাগারে প্রচুর অর্থ সঞ্চিত হতে থাকে। এর ফলে ইংল্যান্ডের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যায় এবং সমাজ জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তবে ইংল্যান্ডের ধনী দরিদ্রের মধ্যে তখন বৈষম্যের ব্যবধানও ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শ্রেণিতে সংঘাত এবং দ্বন্দ্ব ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায়। শিল্প বিপর অর্থনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে এর সাথে বেশ কিছু জটিল সমস্যাও এর অর্থনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় তৈরি হয় যা পরবর্তীকালে বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে।
(খ) সামাজিক পরিবর্তন: শিল্প বিপ্লবের অনিবার্য প্রভাব ইংল্যান্ডের সমাজ জীবনে পরিলক্ষিত হয়। কলকারখানা প্রতিষ্ঠার ফলে নতুন নতুন শিল্প-শহর গড়ে ওঠে। গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষ দল বেঁধে কাজের সন্ধানে শহরে চলে আসে। গ্রামগুলো জনবিরল এবং শহরগুলো জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শহরগুলো এত মানুষকে আশ্রয় দিতে অক্ষম ছিল, কারখানাগুলোও তাদেরকে কাজ দিতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু গ্রামছাড়া মানুষদের ভিড়ে শহরগুলোকে যে হতন্ত্রী পরিবেশ প্রদান করে তা ইংল্যান্ডের ঐশ্বর্যকেই যেন পরিহাস করছিল। তবে ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থায় এর ফলে নতুন মেরুকরণও ঘটতে থাকে। আগে সমাজ যেখানে কৃষক ও লর্ড-জমিদার- এই দুই পরস্পর বিরোধী শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে বুর্জোয়া এবং শ্রমিক-কারিগর শ্রেণিরও অভ্যুদয় ঘটতে থাকে। বুর্জোয়াদের মধ্যেও ধনী, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মানুষ ছিলেন। অপরদিকে শ্রমিকদের জীবন বেশ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অধিক পরিশ্রম করেও একজন শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পেত না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বসবাস করে এবং নিম্নপুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে জীবনধারণের ফলে অনেক শ্রমিকই অকালে মৃত্যুবরণ করে। ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণি এসব শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছোট-বড় অনেক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। উনিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে চার্টিস্ট আন্দোলন শুধু শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসেই নয়, ইংল্যান্ডে গণতন্ত্রের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ফরাসি ও জার্মান সমাজ ব্যবস্থায় শিল্প বিপ্লব অনুরূপভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
(গ) রাজনৈতিক পরিবর্তন : শিল্প বিপ্লব ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেকগুলো পরিবর্তন নিয়ে আসে। দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ শিল্পপতি ও. বণিকদের হাতে চলে যেতে থাকে। শিল্পপতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে বড় অংশই শ্রমিক সত্তাকে অনুধাবন করত না। সস্তা মজুরির বিনিময়ে মালিকরা বালক-বালিকা ও নারীদেরকে কারখানায় নিয়োগ প্রদান করত, যখন-তখন তাদের আবার বরখাস্তও করত। তবে ক্রমান্বয়ে শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। যন্ত্রপাতির সাথে শ্রমিকদের পরিচয় এদেরকে কিছুটা শিক্ষিত হতে সাহায্য করে। জীবন-জীবিকার সংস্থানের তীব্র সংকট তাদেরকে অধিকতর রাজনীতি সচেতন করে তোলে। ইংল্যান্ডের চার্টিস্ট আন্দোলন (১৮৩২-৪৮ খ্রি.) এ ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে সমাজতন্ত্রের ভাবধারা বিস্তার লাভ করে। মজুরি নির্ধারণ ও বদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার শ্রমিক আন্দোলন, নির্বাচন প্রথার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন, কমন্স সভা সংস্কারের আন্দোলন, সর্বজনীন ভোটাধিকারের আন্দোলন- শিল্প বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের ফল। ইংল্যান্ডে জাতীয়তাবাদ, উদার গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রীয় ধারার আন্দোলন নতুন এই রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয়েরই ফসল। ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে এ সব ভাবধারার ক প্রভাব পড়ে। ফলে ইংল্যান্ড একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
শিল্প বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
Read more