পাঠ-২.১: প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্স

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

19

১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ফ্রান্সের জাতীয় সভার (স্টেটস জেনারেলের) অধিবেশন আহ্বান করার ফলে ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব দেখা দেয় বলে মনে করা হয়। ফরাসি বিপ্লব কেবল ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, এ বিপ্লব সমগ্র ইউরোপের রূপান্তর ঘটায়।। ঐতিহাসিক রবার্ট পামারের মতানুসারে ফরাসি বিপ্লবকে ইউরোপীয় বিপ্লব বলাই সংগত।। ফ্রান্সে যা ঘটে তাকে ইউরোপীয় বিপ্লবের ফরাসি অধ্যায় বলা যেতে পারে। ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং এই বিপ্লবকে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা প্রস্তুত ঘটনা বলা যায়। আসলে ফরাসি বিপ্লব ছিল ইউরোপীয় ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজব্যবস্থার পতনের স্বাক্ষর। এই পতন প্রথমে ফ্রান্সে দেখা দেয়, পরে ইউরোপেও তা প্রসারিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের সূচনা অষ্টাদশ শতকের ইউরোপের অবস্থার মধ্যেই নিহিত ছিল।

সামাজিক অবস্থা

ফরাসি দেশের সমাজব্যবস্থা বিশেষ অধিকার ও অসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ জন্য বলা হয়ে থাকে যে, "The Revolution of 1789 was much less rebellion against despotism than a rebellion against in equality." (১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব ছিল স্বৈরাচারী শাসন অপেক্ষা অধিকতর বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ)। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপীয় সমাজ বিশেষ করে ফ্রান্সে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যথা-যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রেণি। প্রতিটি শ্রেণিকে এস্টেট (Estate) বলা হতো। যাজক ও অভিজাত শ্রেণি ছিল যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট। সাধারণ লোকেরা ছিল Third Estate বা তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু ভূমিকেই সম্পদের প্রধান উৎস বলে মনে করা হতো, সেহেতু ভূমির মালিকানাই সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের চাবিকাঠি ছিল। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় ভূমির মালিকানা ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। যাজক শ্রেণি দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা- উচ্চতর যাজক (Upper Clergy), অধস্তন যাজক (Lower Clergy)। ফ্রান্সে যাজকের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার। যাজকরা প্রার্থনা ও উপাসনা ছাড়া শিক্ষাদান, দরিদ্রসেবা, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখা প্রভৃতি কাজের দায়িত্ব বহন করতেন। গির্জার উচ্চ যাজক যথা- বিশপ শ্রেণি ছিল সাধারণত অভিজাত পরিবারের লোক। গির্জার জমিদারির আয়, গির্জার বিভিন্ন উপস্বত্ব তারা ভোগ করত। সমাজে তাদের দারুণ প্রতিপত্তি ছিল। উচ্চ যাজকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং শাসনকার্যে অংশ নিতেন। ফরাসি মন্ত্রী নেকারের মতে, ফরাসি গির্জার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৩ কোটি লিভর (ফরাসি পাউন্ড)। কিন্তু তারা আধ্যাত্মিক কোনো দায়িত্বই পালন করতেন না।

অভিজাত শ্রেণি ছিল ইউরোপের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান ও সুবিধাভোগী শ্রেণি। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে অভিজাতদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। দেশের জনসংখ্যার ১ শতাংশ ছিল অভিজাত। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও এরা সমাজের সর্বাধিক প্রভাবশালী ছিল। মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের ফলে অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হয়। অভিজাতরা ভূমি ও কৃষকদের উপর বহু অধিকার ভোগ করত। এরা বংশানুক্রমিকভাবে ভূমির উপর অধিকার ভোগ করত। অভিজাত শ্রেণি সরকারকে কর দেওয়ার ব্যাপারে বহু ছাড় ও সুবিধা ভোগ করত।

অভিজাতরা নানা প্রকার সামন্ত কর পেত। ম্যানর প্রথা বা খামারপ্রথার ফলে অভিজাতরা ম্যানর থেকে নানাভাবে অর্থ পেত। এছাড়া তারা রাজার সভাসদ, সেনাপতি, উচ্চ কর্মচারী হিসেবে কাজ করার একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত। এরা যুদ্ধবিগ্রহ, শাসনকার্য পরিচালনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাজার সহায়তা করত। মোটকথা, অষ্টাদশ শতক ছিল ইউরোপে অভিজাত বা সামন্ত শ্রেণির কর্তৃত্বের যুগ।

তৃতীয় শ্রেণি বা Third Estate বলতে অভিজাত ও যাজক ছাড়া বাকি সকল লোককে বোঝাত। ধনী বুর্জোয়া যথা- শিল্পপতি, ব্যাংক মালিক প্রমুখের অর্থকৌলীন্য থাকলেও জন্মকৌলীন্যের অভাবে তারা তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত ছিল। ফরাসি দেশে ধনী বুর্জোয়াদের নাম ছিল haute bourgeois বা ছুটে বুর্জোয়া। বুদ্ধিজীবী ও চাকরিজীবী সম্প্রদায়, যথা- শিক্ষক, আইনজীবী, সাধারণ কর্মচারী প্রমুখও তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের মধ্যবিত্ত বা পাতি বুর্জোয়া বলা হতো। এই শ্রেণিও কায়িক শ্রমের দ্বারা জীবিকা অর্জন করত না। তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল কৃষকরা। কৃষক শ্রেণি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, যথা- স্বাধীন কৃষক ও ভূমিদাস। ভূমিদাস শ্রেণি মালিককে বিভিন্ন কর দিত, যাজককে ধর্ম কর দিত, মালিকের জমিতে বেগার খাটত। এরা অত্যন্ত দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাত। তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার কিছুই ছিল না। কৃষক শ্রেণিই ছিল সমাজের সম্পদের উৎপাদনকারী। কিন্তু অভিজাত বুর্জোয়া ও শহরবাসীরা এদের হীন চোখে দেখত। তারা মনে করত যে, কৃষকরা ছিল নিরক্ষর কুৎসিত শ্রেণি। জমি চাষ করতে, কর দিতে ও উচ্চ শ্রেণির সেবা করতে কৃষকরা জন্মগ্রহণ করেছে। কৃষকদের জীবন ছিল শোষিত, করভারে জর্জরিত এবং অভিজাতদের দ্বারা নির্যাতিত। ঐতিহাসিক C. D. Hazen এ প্রসঙ্গে বলেন, এ সমস্ত কর দেওয়ার ফলে কৃষকরা প্রায় অনাহারে থাকত।

অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এই শ্রেণির প্রভাব ইউরোপের সকল দেশে সমান ছিল না। সামন্তপ্রথার ফলে ফ্রান্সে অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। অভিজাত শ্রেণি জন্মকৌলীন্যের জোরে সবকিছুই ভোগ করত। বুর্জোয়া শ্রেণি অর্থকৌলীন্যে বলীয়ান হলেও সমাজে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল না। পূর্ব ইউরোপে বুর্জোয়াদের সংখ্যা ছিল নামমাত্র। অন্তঃশুল্ক, বৈষম্যমূলক করব্যবস্থা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রতি সরকারি উদাসীনতা বুর্জোয়া শ্রেণিকে সামন্ত শাসনের প্রতি বিরূপ করে তোলে। বুর্জোয়ারা ছিল শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। এরা এজন্য পুরাতনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা হারায় এবং বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। ঐতিহাসিক রাইকার ফরাসি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ফরাসি বিপ্লব মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সাম্য লাভের আন্দোলনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল।

গ্রামে ও শহরে এক শ্রেণির ভূমিহীন দিনমজুর ও শ্রমিক ছিল। এদের বাসগৃহ বা চাষের জমি বলতে কিছুই ছিল না। এরা অপরের জমিতে দিনমজুরি খাটত। শহরে এলে এরা কারখানার কাজ বা গৃহভৃত্যের কাজ করত। অভিজাতরা এই সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণিকে সমাজের নিম্নশ্রেণি বলে গণ্য করত। এছাড়া ভিক্ষুক ও উপজীবিকাহীন লোকও এ যুগে দেখা যেত। ফ্রান্সের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ ছিল উপজীবিকাহীন লোক। বিপ্লবের সময় এরা প্যারিসের জনতার সাথে যোগ দিয়ে ধ্বংসকারী মূর্তি ধারণ করে। নেপোলিয়নের মতে, "ফরাসি বিপ্লব সুবিধা ভোগকারী এবং ক্ষমতালিন্স শ্রেণির বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত জাতীয় গণ-আন্দোলন।" (The french Revolution was a general mass movement of the nation against the Privileged classes.")"

অর্থনৈতিক অবস্থা

অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের অর্থনীতি একটি পরিবর্তনমুখী অবস্থায় উপনীত হয়। মধ্যযুগের শেষ দিক থেকে কৃষির পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য ও উপনিবেশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যদিও অষ্টাদশ শতকে কৃষিই ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি, তবু শিল্প, বাণিজ্য ও মূলধন নিয়মিতভাবে বেড়ে পুরাতন সমাজের চরিত্রে পরিবর্তনের সূচনা করে। অর্থনীতিতে কৃষিরই ছিল অগ্রাধিকার। সমাজে মর্যাদালাভের প্রধান উপায় ছিল ভূসম্পত্তির মালিকানা। এমনকি বণিকরা বাণিজ্যে ভালো অর্থ রোজগার করার পর সে অর্থে জমি কিনে জমির মালিকানাকে তাদের আয় ও সম্মান লাভের পথ মনে করত। বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষাবাদের ব্যবস্থা তেমন ছিল না। দরিদ্র ও নিরক্ষর কৃষকরা এসব বিষয় বুঝত না। লেফেভারের মতে, কৃষকরা বৃষ্টি ও প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করে কৃষিকাজ করত। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে কৃষকের দুঃখ-কষ্টের সীমা থাকত না। জমিগুলো পালাক্রমে আবাদ করে এর উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা হতো না।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। আলোচিত রাজা লর্ড অ্যাক্টনের মতে, "মার্কান্টাইলবাদ ছিল আলোচিত স্বৈরতন্ত্রের অনুরূপ বা অনুপূরক অর্থনৈতিক মতবাদ।" মার্কান্টাইলবাদীরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। সুতরাং বিদেশি মাল অবাধে আমদানি করলে বা খাদ্যদ্রব্য অবাধে রপ্তানি করলে সম্পদ ক্ষয় পাবে। ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চলত না। সেজন্য আমদানি মালের উপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হতো।

মার্কান্টাইল বা সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে ফিজিওক্র্যাট (Physiocrats) নামক অর্থনীতিবিদরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। অবাধ বাণিজ্যবাদীরা একথা বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিশ্বে সম্পদের সীমা নেই। যতই খাদ্য ও শিল্পবস্তুর উৎপাদন বাড়বে ততই সম্পদ বাড়বে। এজন্য তারা শিল্প-বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ লোপ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যের দাবি জানান। মার্কান্টাইলবাদজনিত সংরক্ষণনীতির ফলে বাণিজ্যমন্দা এবং দারিদ্র্য বাড়ছে, একথা বোঝাতে তারা চেষ্টা করেন। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ফিজিওক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনার ফলে সংরক্ষণবাদের তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। তবু ইউরোপীয় শাসকদের চিন্তা মার্কান্টাইলবাদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়নি।

ইউরোপের সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলো অষ্টাদশ শতকের উপনিবেশের সঙ্গে বাণিজ্য স্থাপনের চেষ্টা চালায়। ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন এ বিষয়ে কৃতিত্ব দেখায়। ভারত ও উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ দখলের জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ১৭৪০-৬৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দেয়। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে শতকরা ৪০ ভাগ বাণিজ্য উপনিবেশের সাথে চলত। উপনিবেশের সম্পদ ও দক্ষিণ আমেরিকার সোনা, রুপা আমদানির ফলে ইউরোপের এক শ্রেণির বণিকের হাতে প্রভূত সম্পদ জমা হয়। এরা মূলধনী বা ক্যাপিটালিস্ট (Capitalist) শ্রেণিতে পরিণত হয়। এই শ্রেণি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ

সরকারকে সুদে ধার দিত। বাকি অর্থ শিল্পে ও ব্যাংকে লগ্নি করত। এদের মূলধনের সাহায্যে লন্ডনের বেরিং (Baring), আমস্টারডামের হোপ (Hope), ফ্রান্সের সুইস (Swiss) ব্যাংক প্রভৃতি বিখ্যাত ব্যাংক চালু হয়। মোটকথা, অষ্টাদশ শতকে কৃষির কথা বাদ দিলে শিল্প-বাণিজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া দেখা যায়। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল পরিবর্তনের অগ্রদূত। এই পরিবর্তনের চাপে পুরাতন কৃষিকেন্দ্রিক সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির ধ্বংসের পথ পরিষ্কার হয়। ফরাসি বিপ্লব ছিল তারই প্রকাশ।

রাজনৈতিক অবস্থা

অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সসহ ইউরোপে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। এ সম্পর্কে সি. ডি. এম. কেটেলবির মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, "অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ গণতান্ত্রিক কিংবা জাতীয়তাবাদী কোনোটাই ছিল না, আসলে সেগুলো ছিল রাজবংশসম্ভূত এবং রাজ্যকে রাজার ব্যক্তিগত কিংবা রাজবংশের সম্পত্তি বলে মনে করা হতো।" রাজাই ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজ্য বিস্তারকে জাতির শক্তি ও মর্যাদার চিহ্ন বলে ধরা হতো। রাজা স্বর্গীয় অধিকার নীতি অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি দাবি করতেন যে, তার কাজের জন্য তিনি একমাত্র ঈশ্বরের নিকট দায়ী। পার্থিব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ অনুযায়ী তিনি চলবেন না। এভাবে রাজার স্বর্গীয় অধিকার তত্ত্ব মধ্যযুগের শেষ দিকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এ মতবাদের আশ্রয় নিয়ে রাজারা যারপরনাই স্বৈরাচারী হন। ফ্রাস্ত্রের বুরবোঁ রাজবংশ ছিল রাজকীয় স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রকৃষ্ট নিদর্শন। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই ঘোষণা করেন যে, 'আমিই রাষ্ট্র'। রাজশক্তিগুলো বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করত। ইউরোপের জনসাধারণের বা প্রজাদের স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিল না। অধিকাংশ দেশের শাসনব্যবস্থা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী। জনসাধারণের ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের অধিকার ছিল না। রাজা, অভিজাত ও ধর্মযাজকরা একযোগে জনসাধারণকে শাসন করতেন। ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন ছিল না। কারণ বিচারব্যবস্থা রাজার হুকুমেই চলত। ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন অযোগ্য ও অকর্মণ্য। দেশ শাসন করার নৈতিক অধিকার তিনি হারিয়ে ফেলেন।

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ

১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও সর্বহারা
জনসাধারণের কঠোর প্রতিবাদ বিদ্রোহের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। কোনো বিশেষ কারণ বা আকস্মিক কোনো ঘটনার দ্বারা এই মহাবিপ্লব সংঘটিত হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণের সমাবেশের ফলে এই বিপ্লবের সূত্রপাত হলেও রাজনৈতিক কারণকে এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ বলা চলে।

রাজার স্বেচ্ছাচারিতা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল স্বৈরাচারী। রাজা ছিলেন সকল ক্ষমতার উৎস। তিনি ছিলেন একাধারে শাসক, বিচারক এবং আইন প্রণেতা। তিনি ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। চতুর্দশ লুই বলতেন, 'আমিই রাষ্ট্র' এবং ষোড়শ লুই বলতেন 'আমি যা ইচ্ছা করি তা-ই আইন'।" এরূপ স্বৈরাচারী

শাসনে জনমতের কোনো স্থান ছিল না এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার লেশমাত্র ছিল না। লেত্রে-ডি-ক্যাশে (lethre de cachct) নামক গ্রেফতারি পরোয়ানার উপর রাজার স্বাক্ষর নিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা যেত। ফ্রান্সে স্টেটস জেনারেল নামক ফিউডাল পার্লামেন্ট-এর অস্তিত্ব বিনষ্ট করে রাজা দেশের সকল ক্ষমতা নিজ হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।

অত্যাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ

রাজতন্ত্রের এরূপ সর্বাত্মক ক্ষমতার সদ্ব্যবহার চতুর্দশ লুই তার কর্মক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা দ্বারা করতে সক্ষম ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী পঞ্চদশ লুই ছিলেন দুর্বল, বিলাসী ও শাসনকার্যে সম্পূর্ণ উদাসীন। ফলে চতুর্দশ লুইয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। কারণ তার শাসনকার্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দেশের গৌরব অর্জন। সপ্তদশ শতাব্দীতে রিশল্যু, ম্যাজারিন ও কোলবার্টের ন্যায় সুযোগ্য মন্ত্রীরা ইউরোপের রাজনীতিতে ফ্রান্সের জন্য একটি সম্মানজনক স্থান তৈরি করেন। কিন্তু পঞ্চদশ লুই ও ষোড়শ লুই শাসনব্যবস্থায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং তাদের হাতে রাজতন্ত্র একটা অত্যাচার ও উৎপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। তদুপরি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের শোচনীয় ব্যর্থতার ফলে ফলে। জনগণ তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে।

শাসন ও বিচারব্যবস্থায় নৈরাজ্য

সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেও শাসনব্যবস্থায় রাজার সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল না। এ সময়ে ফ্রান্স ৪০টি ক্ষুদ্র সামন্ত অঞ্চলে বিভক্ত থাকায় উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করতেন। রাজকর্মচারীদের ক্ষমতা ও সরকারি বিভাগগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না থাকার দরুন বিশৃঙ্খলা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারব্যবস্থারও চরম অধঃপতন ঘটে। বিচারব্যবস্থা একদিকে ছিল ব্যয়বহুল, অপরদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত। সমগ্র দেশে কমপক্ষে বিভিন্ন ধরনের ৪০০ আইনকানুন বলবৎ ছিল। আইনের চোখে সকল মানুষ সমান ছিল না। নিজ দায়িত্বের প্রতি উদাসীন বিচারকগণ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সচেষ্ট ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে দেশে বিচারের নামে অবিচার এবং শাসনের নামে কুশাসন চলছিল। ফ্রান্সের জাতীয় সভা ছিল মৃতপ্রায়।

অভিজাত শ্রেণির উত্থান

রাজশক্তির দুর্বলতার ফলে অভিজাত শ্রেণি পুনরায় রাজসভায় নিজেদের প্রাধান্য স্থাপন করে এবং রাজা তাদের ক্রীড়নকে পরিণত হন। দেশের ও দশের কোনো মঙ্গল সাধন না করে তারা নিজ ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তৎপর হয়। ইনটেনডেন্টদের সাহায্যে তারা প্রদেশের মানুষকে শাসনের নামে শোষণ করত। এককথায় ভার্সাই রাজসভার পূর্ব গৌরব বিলুপ্ত হয়েছিল। ঐতিহাসিক হ্যাম্পসনের মতে, "শাসনব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেণির প্রভাব অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।"

রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

দুর্বল রাজা এবং ক্ষমতাশালী অভিজাত শ্রেণির কারণে দেশের শাসনব্যবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। অথচ ফরাসি নৃপতিগণ তাদের বিলাসিতা, শাসন ও সামরিক অভিযানের কৃতিত্বের জন্য দেশের বিপুল অর্থের অপব্যয় করতেন। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ ছিল জাঁকজমক ও বিলাসিতায় পরিপূর্ণ এক স্বর্ণপুরী। ১৮,০০০ কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় নিযুক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৬,০০০ কর্মচারী রাজা ও রানির সেবায় নিয়োজিত

ছিল। রানির ব্যক্তিগত ভৃত্যের সংখ্যা ছিল ৫০০। প্রিয়পাত্রদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো। বিশেষ করে ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী রানি মেরি আঁতোয়ানেত-এর সীমাহীন বিলাসিতা দুঃসহনীয় ছিল। রাজপরিবারের এরূপ অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ফরাসি জনগণকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত টমাস জেফারসন বলেন, “রানি না থাকলে ফ্রান্সে বিপ্লবই হতো না।”১০

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যর্থতা: অষ্টাদশ শতকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ফ্রান্স চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের বিপর্যয় ঘটে। ঐতিহাসিক বার্নস এবং রালফ এ প্রসঙ্গে বলেন, "France was now crippled almost beyond hope of recovery." আমেরিকা ও ভারতে ইংরেজদের কাছে ফ্রান্স পরাজিত হয়। এসব পরাজয়ের ফলে ফ্রান্সের ব্যবসা-বাণিজ্যের চরম ক্ষতি হয় এবং ফরাসি রাজকোষ অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ফরাসি সরকারের ব্যর্থতায় জনগণের কাছে রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তি দারুণভাবে নষ্ট হয়।”১১

উপরের আলোচনা থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি রাজশক্তির অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ষোড়শ লুই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ফরাসি জাতিকে শাসন করার নৈতিক অধিকার রাজা হারিয়ে ফেলেছিলেন। রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের দোষ-ত্রুটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। । অবশেষে তা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে এবং পতন অপরিহার্য হয়।

ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ

পূর্বতন শাসনামলে ফ্রান্সের জনসমাজ প্রধানত দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যথা- সুবিধাভোগী শ্রেণি ও সুবিধাহীন শ্রেণি। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় প্রথম দলভুক্ত ছিলেন। যাজকগণকে প্রথম সম্প্রদায় এবং অভিজাতগণকে দ্বিতীয় সম্প্রদায় বলা হতো। সমাজে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত, শ্রমশিল্পী, কৃষক প্রমুখ শ্রেণি ছিল সুবিধাহীন সম্প্রদায়ভুক্ত। সুবিধাহীন শ্রেণিকে আবার অধিকারহীনও বলা হয়। কারণ এসব শ্রেণির মানুষের কোনো অধিকার ছিল না, ছিল কেবল দায়িত্ব পালনের তাগিদ। অপরদিকে সুবিধাভোগী শ্রেণির যাজক ও অভিজাতগণ কেবল ভোগ করতেন। কর না দেওয়ার সুবিধা, অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়া, এককথায় কোনো দায়িত্ব পালন না করেই শুধু সুবিধা ভোগ করাই ছিল তাদের অধিকার। ফরাসি সমাজের নিয়মটা যেন ছিল এ রকম- যাজকরা উপাসনা করবেন, অভিজাতরা লড়াই করবে আর বাকি সবাই জোগাবে তাদের জন্য অর্থ। ফরাসি সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ও অধিকারহীন মানুষের মধ্যে যে বিস্তর প্রভেদ ছিল, তাকে ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়।

পূর্বতন শাসনামলে ফ্রান্সে রাজাকে বাদ দিলে যাজকদের ছিল সমাজের সর্বোচ্চ আসন। এজন্য ফ্রান্সে যাজক শ্রেণিকে বলা হতো প্রথম এস্টেট বা প্রথম সম্প্রদায়। ধর্ম-উপাসনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, সাধারণ মানুষের ন্যায় যাজক শ্রেণি পার্থিব ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও আগ্রহী ছিল। তারা খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করতেন এবং ধর্ম কর আদায় করতেন। তবে যাজক শ্রেণির মধ্যে নিম্নস্তরের যাজকরা আবার উপরের স্তরের যাজকদের ঘৃণার পাত্র ছিলেন। উচ্চ ও নিম্নস্তরের মধ্যে যে সামাজিক প্রভেদ ছিল, তা নিম্নশ্রেণির যাজকদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন কামনা করতেন।

যাজকদের পরেই ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের স্থান। তাদের বলা হতো দ্বিতীয় এস্টেট বা দ্বিতীয় সম্প্রদায়। প্রথা হিসেবে সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও অভিজাত শ্রেণির সামন্তপ্রথা থেকে পাওয়া সুবিধাসমূহ আগের মতো বহাল ছিল। সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন অভিজাতরা যাজক ব্যতীত আর সকলের উপার্জনের উপর বেঁচে থাকত বলে তারা ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠেছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষ অভিজাতদের এসব সুবিধা নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর হয়। দেশের প্রায় সমস্ত জমি বিনা খাজনায় অভিজাত ও ঊর্ধ্বতন যাজকরা ভোগ করতেন। তাদের এ স্বার্থপরতা তৃতীয় সম্প্রদায়ের মনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল বঞ্চিত ও নিপীড়িত। তারা আবার তিনটি উপদলে বিভক্ত ছিল, যথা- ১. বুর্জোয়া ২. কারিগর ও ৩. কৃষক। বুর্জোয়ারা ছিল ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, ধনসম্পদ ও জাতীয়তাবোধে অন্যান্য শ্রেণির ঊর্ধ্বে। তারা অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার ভোগ করাকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। ফরাসি দার্শনিকদের ক্ষুরধার লেখনী তাদের মনের মধ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করে, তারা প্রথম ও দ্বিতীয় সম্প্রদায়ের মতো সমান অধিকার দাবি করে এবং বিপ্লব ঘটানোর জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। অপরপক্ষে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিও তাদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করতে সম্মত ছিল না।
বুর্জোয়াদের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সুবিধাপ্রাপ্তদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য আপসহীন মনোভাব- এই মানসিক অবস্থা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

নেপোলিয়ন যথার্থই বলেছেন, সামাজিক অহমিকাই ছিল বিপ্লবের মূল কারণ, স্বাধীনতা ছিল অজুহাত মাত্র। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত এবং সাধারণ মানুষ তাদের দয়ার উপর নির্ভর করত। কারিগর ও শ্রমশিল্পীরা স্বভাবতই সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্রমেই বিপ্লবী হয়ে ওঠে। কৃষকদের কোনো নাগরিক অধিকার ছিল না। নানা প্রকার কর প্রদানের দায়িত্ব শুধু তাদের উপর ন্যস্ত ছিল। তাছাড়া জমিদারের কাজে তারা বেগার খাটত এবং শ্রম কর দিতে বাধ্য ছিল। সামন্তপ্রথাজনিত নানাবিধ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কৃষকরা একে অবৈধ ও অসংগত বলে বিবেচনা করত। কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। বিপ্লবের প্রাক্কালে মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মৌলিক নাগরিক অধিকার ছিল না। অধ্যাপক মন্টেস্কু বলেন, "কৃষকদের দুরবস্থাই ফরাসি বিপ্লবের প্রধান কারণ। সুতরাং সামাজিক বৈষম্যপ্রসূত বিদ্বেষ ফরাসি বিপ্লবের একটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ।"

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ

ফরাসি বিপ্লব ইউরোপ তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালীন প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনসাধারণের কঠোর প্রতিবাদ বিপ্লবের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। বহুকালের গ্লানি এই বিপ্লবের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল। বহু কারণের একত্র সমাবেশের ফলেই এই বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। এগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণ ছিল অন্যতম। ঐতিহাসিক মর্গ স্টিফেনস অর্থনৈতিক কারণের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

আমরা জানি, প্রাক-বিপ্লব যুগে ফরাসি সরকারের প্রধান দুর্বলতাই ছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। অথচ সরকারের অপচয় কমানো যায়নি। যেহেতু কৃষক ছিল দারিদ্র্যের চরম সীমায়, নতুন করের বোঝা চাপানো সম্ভব ছিল না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল, রাষ্ট্রের আর্থিক সংকটের মুখেও প্রথম দুই শ্রেণি- যাজক ও অভিজাতরা তাদের কর না দেওয়ার বিশেষ অধিকার ছাড়তে রাজি হয়নি। ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই এবং তার মন্ত্রীরা এ ব্যাপারে অভিজাতদের উপর চাপ সৃষ্টি করার ফলেই অভিজাত বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। অর্থনৈতিক ঘাটতির প্রধান কারণ ছিল, ফ্রান্স ব্যয়বহুল ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছিল। এমনও হয়েছিল যে, বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়েছিল। এই ঋণের উপর যে বিপুল টাকা সুদ হিসেবে দেওয়া হতো, তাতে সরকারি আয়ের একটা বড় অংশই খরচ হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় আসে যখন সরকার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় যে অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ফরাসি সরকার ভুগছিল তা হলো করভারের অসমতা। এই অসমতা ছিল মানুষে মানুষে এবং এলাকায় এলাকায়। যেহেতু ফ্রান্স ছিল সে সময়ে 'বিশেষ অধিকারের দেশ' সেহেতু যাজক ও অভিজাত শ্রেণি কর না দেওয়ার বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় প্রায় সকল প্রকার প্রত্যক্ষ কর থেকে অব্যাহতি পেত। ফলে ফরাসি রাজকোষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। এভাবে ধনীগণ, যারা রাষ্ট্রকে অধিক কর প্রদান করতে পারত, তারা অল্প দিয়ে আরও অধিক পরিমাণে অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছিল এবং যারা দরিদ্র তারা রাষ্ট্রকে তাদের ক্ষমতার অতিরিক্ত কর দানে বাধ্য হয়ে ক্রমশ ধ্বংসের পথে অগ্রসর হতে থাকে। কর আদায়ের এই ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির ফলে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌছে যায়।

করপ্রথা ছিল অন্যায়, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট। এই সময়ে রাষ্ট্র কর, ধর্ম কর এবং সামন্ত প্রভুর দায় মেটাতে গিয়ে কৃষকদের আয়ের চার-পঞ্চমাংশ নিঃশেষ হয়ে যেত। প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর ছাড়াও নানা রকমের করের তাড়নায় কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। প্রত্যক্ষ কর টেইলি বা ভূমিকর, ক্যাপিটেশন বা আয়কর, ভিংটিয়েমে বা সম্পত্তি কর এবং পরোক্ষ কর গেবেলা বা লবণ কর, এইডস, (মাদক দ্রব্যের উপর কর) আবগারি শুল্ক, দলিলপত্রের উপর কর, আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্ক প্রভৃতি সবই তৃতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য বিশেষ করে কৃষকদেরই দিতে হতো। তাই ফরাসি দেশে একটি প্রবাদ আছে- "অভিজাত শ্রেণি যুদ্ধ করে, পুরোহিত শ্রেণি ধর্মকর্ম করে আর জনগণ করের বোঝা বহন করে। "১২ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়কে এসব কর দেওয়া থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করত। দেশের প্রতি কোনো কর্তব্য তাদের ছিল না। অধিকারহীন সম্প্রদায় বিশেষ করে কৃষকদের সুযোগ-সুবিধার বালাই ছিল না, ছিল কেবল দায়িত্ব পালনের তাগিদ। কৃষকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে কার্লাইল মন্তব্য করেছেন, "ফ্রান্সের কৃষকদের এক-তৃতীয়াংশ বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় আলু খেয়ে জীবন ধারণ করত।১৩

কর আদায়ের ব্যবস্থাও ছিল দুর্নীতিপূর্ণ ও নির্যাতনমূলক। কর আদায়ের ভার সরকার এক শ্রেণির মধ্যবর্তী কর আদায়কারীর হাতে দিয়েছিল। তারা সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে এক-একটি স্থানের কর আদায়ের অধিকার পেত। স্বভাবতই কর আদায়ে অত্যাচার করা হতো। তাছাড়া প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ের এক-দশমাংশ ধর্ম কর হিসেবে আদায় করা হতো। যদিও সামন্তপ্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল, তথাপি সামন্ত প্রথার কর আদায়ের রীতি তখনো চালু ছিল। এককথায় বলা যায়, মোট আদায়কৃত করের ৯৬ শতাংশ এ তৃতীয় সম্প্রদায়কে বহন করতে হতো। এ বৈষম্যমূলক নীতির ফলে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং তা ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এ সময় অ্যাডাম স্মিথ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বক্ষেত্রে অনিয়ম লক্ষ করে তদানীন্তন ফ্রান্সকে "অর্থনৈতিক ভ্রান্তির জাদুকর" (A Museum of economic errors) বলে বর্ণনা করেছিলেন। ১৪

ফরাসি জনসাধারণের অর্থনৈতিক দুর্দশা রাজতন্ত্রের আর্থিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। চতুর্দশ লুইয়ের সময়ে অনবরত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে রাজকোষের অপরিমেয় অর্থ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তার উত্তরাধিকারী পঞ্চদশ লুইয়ের সামরিক অভিযান, দুর্নীতিপরায়ণ শাসন, বিলাসিতা ও অমিতব্যয়িতার ফলে ফ্রান্স অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একেবারে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। দেশের এই শোচনীয় অর্থনৈতিক দুর্যোগের দিনে হতভাগ্য ষোড়শ লুই ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সময়ে মন্ত্রী Turgo and Necker অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য কতিপয় অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

তারা উভয়েই সুবিধাপ্রাপ্ত যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের উপর কর আরোপ করার প্রস্তাব করলে এবং রানির মাধ্যমে ষোড়শ লুইয়ের উপর চাপ দিলে পর পর দুজন মন্ত্রীকে পদচ্যুত করা হয়। এদের পদচ্যুতি ফরাসি অর্থনৈতিক অবস্থাকে এক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ইতিমধ্যে ১৭৮৭-৮৯ খ্রিষ্টাব্দের অজন্মা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক জীবনে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। ১৭৮৭-৮৯ খ্রিষ্টাব্দের অজন্মায় ফসল উৎপাদন অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পায়। কৃষক, কারিগর, শ্রমিক এককথায় মেহনতি মানুষের জীবনে দুর্গতি এলেও অধিকারপ্রাপ্ত বা সুবিধাভোগী যাজক ও অভিজাতদের আর্থিক অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি। কারণ তারা পরের রোজগারের উপর বেঁচে ছিল। তাছাড়া রাষ্ট্রকে তাদের কর দিতে হতো না। এভাবে গ্রামের কৃষক এবং শহরের কারিগর, শ্রমিক প্রমুখ তাদের আর্থিক দুর্দশার জন্যই ফরাসি রাজতন্ত্র এবং অভিজাতদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে বিপ্লব অপরিহার্য করে তুলেছিল। অর্থ সংগ্রহের জন্য বাধ্য হয়ে ষোড়শ লুই ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান করেন। জাতীয় সভার অধিবেশনে তৃতীয় সম্প্রদায়ের সাথে রাজার মতভেদ ঘটে এবং প্যারিস ও অন্যত্র ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রায় দুই শত বছর পরে জাতির প্রতি রাজার এই আহ্বান স্বৈরতন্ত্রের চরম ব্যর্থতা ও অক্ষমতার কথাই ঘোষণা করে এবং এই অধিবেশনকে উপলক্ষ করেই ফরাসি বিপ্লবের সূত্রপাত হয়।

ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিপ্লবের প্রভাব..
ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব (১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) ফরাসি বিপ্লবের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইংল্যান্ডের বিপ্লব, নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা ও সমসাময়িক লেখক লকের জনসাধারণের সার্বভৌমত্বের মতবাদটি মন্টেস্কু, ভলতেয়ার প্রমুখ দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল।
আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে লাফায়েত ও অন্য বহু ফরাসি যোগদান করেছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধে আমেরিকার সাফল্য তাদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। যুদ্ধ থেকে ফিরে দেশে এসে তারা আমেরিকার ন্যায় জনগণের শাসন ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর হয়। তাছাড়া ফ্রান্স আমেরিকাকে স্বাধীনতাযুদ্ধে অর্থ সাহায্য করায় ফ্রান্সের রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় বিপ্লবের মূলে কাজ করেছিল।

ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...