ফরাসি সমাজে বিপ্লবের বেশ আগে থেকেই জ্ঞানদীপ্ত দার্শনিকদের জ্ঞানচর্চা মধ্যযুগীয় ভাবধারার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার জন্য মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকে। তাঁদের চিন্তাধারা ফ্রান্সের সমা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তারাই মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র পরিত্যাগ করে আধুনিক সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধা করে এমন ফরাসি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার যুক্তি তুলে ধরেন। এখন সেসব মনীষীদের মধ্য থেকে কয়েক জনের চিন্তাৎস সাথে আমরা পরিচিত হবো।
মহামতি ভলত্যেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রি.)
ফ্রাঁসোয়া ম্যারি আঁরুয়েকে সবাই মহামতি ভলত্যেয়ার হিসেবেই জানেন। ভিক্টর হুগো ভলত্যেয়ারকে আখ্যায়িত করেছিলেন 'মানুষের চেয়েও বড় কিছু বলে'। কবি, নাট্যকার, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ইত্যাদি সব নামেই তাঁকে চেনা যায়, জানা যায়, ডাকা হয়। তাঁর রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্যহচ্ছে- তিনি গির্জা ও রাষ্ট্রের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে অত্যন্ত তির্যক ভাষায় ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রাক-বিপ্লব যুগের শোষণনীতি, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং গোড়ামির নিন্দা করেন। স্বাধীনচেতা ভলত্যেয়ার সাবলীল ভাষায় লেখনি পরিচালনা করে ফরাসি জাতিকে রিপ্লবী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁকে মানবজাতির বিবেক আখ্যা দেয়া হয়। কারণ প্রতিষ্ঠিত ঘুণেধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে তিনি তাঁর লেখা পরিচালনা করতেন। ভলত্যেয়ার নিজে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলন না। তিনি মনে করতেন সরকার একটি প্রয়োজনীয় দুষ্টক্ষত (Necessary evil)। তিনি বলতেন, "সহস্র ইঁদুর দ্বারা শাসিত না হয়ে একটি সিংহের শাসন অধিক কাম্য।" জনমঙ্গলকর স্বেচ্ছাচারিতাকে (Benevolent desposition) তিনি দেশের শাসন ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত মনে করতেন। গির্জার অন্যায়কে তিনি যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাতে কেউ কেউ তাঁর

ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হন। বস্তুত তিনি ধর্মের নামে ধর্মযাজকদের অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং বাড়াবাড়িকেই সমালোচনা করেছিলেন। ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য ছিল না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে "ঈশ্বর না থাকলে তাঁকে বানাতে হতো, কিন্তু প্রকৃতি বলছে ঈশ্বর আছে।" তবে ভলত্যেয়ারের ঈশ্বর হচ্ছেন পৃথিবী সৃষ্টির প্রজ্ঞানতা, প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে বলেই তিনি মনে করতেন। ভলত্যেয়ারের মতে, সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যে ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ফ্রান্সের ধর্মযাজকদের ভোগ-বিলাসিতা এবং রাজতন্ত্রের একনিষ্ঠ রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে তিনি ধর্মের মূল বাণীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করতেন। তাই তিনি এটিকে মোটেও পছন্দ করতেন না। তিনি ফ্রান্সের অভিজাত সম্প্রদায় এবং তাদের প্রভু স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনকে মোটেই পছন্দ করেননি। মানুষের মধ্যে প্রেম ও ভালোবাসার অভাব তাঁকে পীড়া দিত। তিনি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচক ছিলেন। এ কারণে তাঁকে কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। বাস্তিল দুর্গেই তাঁর স্থান হয়েছিল দু'বার। ব্যক্তির স্বাধীনতা, জনগণের দুঃখ- দুর্দশা দূর ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়েই ভলত্যেয়ার মানুষকে সচেতন করেছেন। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে গির্জা বিরোধী রচনা লিখে তিনি যেভাবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তা-ই ফরাসি বিপ্লবী যুগে বেশ বড় ধরনের অবদান রেখেছিল। তবে তিনি রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ সম্পূর্ণরূপে চাননি। তিনি রাজতন্ত্রকে সাংবিধানিকভাবে দেশ চালানোর পথেই চলতে বলেছেন। কেননা রাজতন্ত্রে রাজার কথাই আইন, সংবিধান বলে কিছু মানা হতো না। ভলত্যেয়ার মনে করেন যে, আইন ছাড়া চলতে গিয়ে রাজারা স্বৈরাচার হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্র তাদেরকে আইনের মধ্যে চলতে হবে। এটিই নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। ইংল্যান্ডের রাজনীতি তাঁকে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ইংল্যান্ডের প্রতিযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তিনি ফ্রান্সকে ইংল্যান্ডের মতোই উন্নত একটি দেশরূপে দেখতে চেয়েছিলেন। ফ্রান্সকে তিনি মূর্খের দেশ নয়, বরং জ্ঞানী, গুণী ও প্রজ্ঞান মানুষদের দ্বারা শাসিত হওয়ার দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলি হচ্ছে- কাঁদিদ, চতুর্দশ লুইয়ের শতাব্দী, সিয়েকল দ্য লুই কার্তজ, জাতির আত্মার সারমর্ম বিষয়ক রচনাবলি, অধিবিদ্যা, দার্শনিক অভিধান Oedipe, Letters Philosophiques, Element of Essays on Universal History, Zoology ইত্যাদি। তাঁর এসব রচনাবলি ফরাসি জনগণকে ধর্ম বিশ্বাস, জীবন ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
শার্লস মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রি.)
মূলত দার্শনিক হলেও শার্লস মন্তেস্কু সংবিধান এবং রাজনীতি বিষয়ক রচনাবলি সে যুগে পাঠকদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। তিনি রাজার সীমাহীন ক্ষমতা এবং ক্যাথলিক গির্জার আচরণের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সংসদীয় পদ্ধতির প্রশংসা এবং অনুরূপ ব্যবস্থা ফ্রান্সে চালু করার ওপর জোর প্রদান করেন। মন্তেঙ্কু নিজেকে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের একজন সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত 'The Spirit of the Laws' গ্রন্থটি তাঁর জন্য ব্যাপক স্বীকৃতি বয়ে আনে। মাত্র ১৮ মাসে বইটির ২২টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২০ বছর শ্রম দিয়ে

লেখা এ গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন দেশের সংবিধানের চরিত্র, আইনের উদঘাটন এবং বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর Persian Letters অর্থাৎ 'পারস্যের পত্রমালা' The Greatness and Decadence of the Romans উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এসব গ্রন্থ তাঁকে দেশে-বিদেশে পরিচিত করে তোলে। লেখনী দ্বারা মন্তেঙ্কু ফ্রান্সের জনসাধারণের একটি অংশকে রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মানবগোষ্ঠী রূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন।
ঝাঁ ঝাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রি.)
রুশো জাতিতে ফরাসি হলেও জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে। তিনি শিক্ষক, সচিব ও সংগীত সমালোচক হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। তবে লেখক এবং দার্শনিক হিসেবে তাঁর অবদান অতুলনীয়। সমাজ দর্শন, সংগীত, শিক্ষা, রাষ্ট্রতত্ত্ব, সাহিত্য এবং উদ্ভিদবিদ্যা- জ্ঞান জগতের এসব শাখায় তিনি

বিস্ময়কর স্বাক্ষর রেখে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বুদ্ধির চেয়েও মানুষের অনুভূতিকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান। করেছেন। মানুষ সম্পর্কে তাঁর চিন্তায় অসাধারণ মৌলিকত্ব লক্ষ্য করা যায়। তিনিই প্রথম উল্লেখ করেছেন যে, মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলাবদ্ধ (Man is born free, but everywhere he is chain.)। তিনি সকল মানুষের সমানধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। রুশো বলেছেন যে, আদিম সমাজে সাম্য ছিল, তাই সেখানে অন্যায় ও দুর্নীতি ছিল না। বুশো লিখেছেন, "কোনো মানুষ সে পরিমাণে ধনী হবে না, যা হলে সে অন্য মানুষকে ক্রয় করতে চাইবে, আবার কোনো মানুষ সমাজে ততখানি দরিদ্র থাকবে না, যতখানি হলে সে মানুষটি নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হবে।" রুশো সে ধরনেরই একটি সাম্যনীতি দ্বারা পরিচালিত সমাজ চেয়েছিলেন। তাঁর লেখা এমিল (Emile) গ্রন্থটি শিক্ষাবিষয়ক এবং কঁফেসিয় (Confession) গ্রন্থটি আত্মজীবনীমূলক রচনা। তবে তার বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে The Social Contract এবং Discourse on the Origin of Inequality, সমাজ ও রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় বুশো সমতা ও কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। এতে বিপ্লবের মেজাজ এবং সুর যেন বেজে ওঠেছিল। তাঁর রচনাবলিতেই ফরাসি বিপ্লবের আগমনী বার্তা যেন লেখা হয়েছিল। তাই কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তা রুশোকেই The chief
prophet of the revolution বা 'বিপ্লবের প্রধান প্রবক্তা' বলে অভিহিত করেছিলেন। ফ্রান্সে দিদেরো, ম্যাবলি, কঁদরসে প্রমুখ মনীষী বিপ্লবের প্রাক্কালে বুদ্ধিবিভাসার যে যুগের সূচনা করেছিলেন তা সমাজের সচেতন মহলকে আলোড়িত করেছিল। তাঁরা ফ্রান্সের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়েই উক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবন গড়ে তোলার সম্ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে বলে মনে করেন। ফরাসি বুদ্ধিবিভাসার আন্দোলনই ফরাসি বিপ্লবের চেতনা গড়ে তোলে। অপরদিকে পুরাতন ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, সেই ব্যবস্থার অযোগ্যতা ও অপ্রয়োজনীয়তাই প্রমাণ করেছে; ফরাসি সমাজ নতুন অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটাতে প্রস্তুতি নিতে থাকে, এর জন্য সমাজে বিপ্লবের বস্তুগত (Objective) শর্ত পূরণ হতে থাকে। অন্যদিকে অর্থাৎ সামন্ত সমাজ ব্যবস্থা অচল হতে থাকে, উন্নত সমাজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বুদ্ধিবিভাসার আন্দোলন বিপ্লবের বিষয়গত (Subjective) তথা চেতনাগত শর্ত বা বাস্তবতা তৈরি করে। ফলে ফ্রান্সে বিপ্লব অবধারিতভাবেই সংঘটিত হতে যাচ্ছিল যে, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। ১৭৮৯-এ সেই বিপ্লবই শুরু হয়।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
Read more