পাঠ-২.৩: ফরাসি বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

43

অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য রাজার প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের। সেই অর্থ পেতে হলে কর ধার্য করা ব্যতীত রাজার কাছে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। অর্থ সচিব নেকার রাজাকে স্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন। সুযোগ বুঝে তৃতীয় সম্প্রদায় তাদের সদস্য সংখ্যা যাজক

ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সমান করার দাবি জানালে ১৭৮৮-এর ডিসেম্বরে রাজা তা মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৭৮৯-এর ৫মে স্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডাকা হয়। ১৭৫ বছর পর ফ্রান্সে এই সংসদ ভার্সাই নগরীতে নতুন করে শুরু করার ঘোষণা দেয়া হয়। এতে যাজক সম্প্রদায়ের ৩০০, অভিজাতদের ৩০০ এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের একা ৬০০ প্রতিনিধি থাকার বিধান স্বীকৃত হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে স্টেটস-জেনারেলের নির্বাচনে যাজকদের জন্য নির্ধারিত ৩০০ জনের মধ্যে ২৯১ জন, অভিজাতদের ৩০০ জনের মধ্যে ২৭০ জন এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের ৬০০ জনের মধ্যে ৫৭৮ জন সদস্য নির্বাচিত হলে মোট ১১৩৯ জন সদস্য উক্ত অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। মৃত্যুবরণ, দাঙ্গাহাঙ্গামা ও অন্যান্য কারণে বাকি ৬১টি আসনের প্রতিনিধি উক্ত সময়ে নির্বাচিত হতে পারেননি। রাজা এবং অর্থসচিব নেকার উভয়েই স্টেটস-জেনারেলের কাছে কর আদায়ের প্রস্তাব রাখেন। সংসদে তৃতীয় সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজা শুধু ধর্ম যাজক এবং অভিজাত প্রতিনিধিদের সাথেই মিলিত হলে তৃতীয় সম্প্রদায় অপমানিত বোধ করেন। ১৭ জুন তাঁরা নিজেদেরকে 'সমগ্র জনগণের প্রতিনিধি' এবং স্টেটস-জেনারেলকে 'জাতীয় সভা' বলে ঘোষণা করে। এ নিয়ে রাজা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। ২০ জুন প্রতিনিধিরা সভাকক্ষে ঢুকতে না পেরে 'টেনিস কোর্টে' সমবেত হয়ে একটি শপথ গ্রহণ করেন। উক্ত শপথে বলা ছিল যে, যতদিন

একটি সংবিধান রচিত না হবে ততদিন তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা একত্রে থাকবে। এ শপথকে 'টেনিস কোর্টের শপথ' বলা হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে যাজক ও অভিজাত প্রতিনিধিদের একটি অংশ নৈতিকভাবে তৃতীয় সম্প্রদায়ের শপথকে সমর্থন প্রদান করেন। রাজা অবস্থা বেগতিক দেখে কিছু কিছু শর্ত মেনে নিলেও যড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে থাকেন। ১২ জুলাই রাজা অর্থসচিব নেকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এতে প্যারিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে প্যারিতে পৌরসভা (কমিউন) এবং জাতীয় রক্ষিবাহিনী তথা National Guard তৈরি করা হয়। প্যারির মেয়র নিযুক্ত হলেন বেইলি (Baily) এবং রক্ষীবাহিনীর অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হলেন লাফায়েত। রাজা বাধ্য হলেন এসব নিযুক্তি মেনে নিতে। ফলে প্যারির প্রশাসনিক দায়িত্ব বুর্জোয়া তথা তৃতীয় সম্প্রদায়ের হাতে চলে যায়। প্যারিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজা বিদেশি সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় প্যারির ওপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছেন। ১৪ জুলাই তাই উত্তেজিত জনতা সকাল বেলা বাস্তিল দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করে। শহরের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলের পর সশস্ত্রভাবে জনতা বাস্তিল দুর্গ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। বিকেল চারটায় বাস্তিল দুর্গের পতন হয়। রাজাকে প্যারির

ঘটনাবলি এবং বাস্তিল দুর্গ বিপ্লবীদের হস্তগত হওয়ার সংবাদ অবগত করা হলে তিনি স্বগত উচ্চারণ করেন "এটা বোধ হয় হাঙ্গামা"। পাশেই দণ্ডায়মান সভাসদ বললেন, "Mais, C'est une revolt! Non. Sire, C'est une r`evolution" 'না, রাজা মহাশয়, এ বিদ্রোহ নয়, মহাশয় এ হচ্ছে বিপ্লব।" প্রকৃতপক্ষে, ফ্রান্সে বাস্তিল দুর্গ পতনের পর থেকে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তা দ্রুতই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ফ্রান্সে ৪ আগস্টের 'কৃষি বিপ্লবে'র পর থেকে সামন্ত ব্যবস্থার জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন, ২৬ আগস্ট ১৭৮৯-এ গৃহীত মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (Declaration of the Rights of Man and of the citizen)-এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান এবং ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ পর্যন্ত সময় জাতীয় সংবিধান পরিষদের কার্যাবলি রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে দুর্বল করতে থাকে। ফ্রান্স এভাবেই বিপ্লবের এক নতুন পথ রচনা করে। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ফরাসি বিপ্লব যেসব কার্য সাধন ও বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে চলছিল নিম্নে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

জাতীয় সাংবিধানিক সভার কার্যাবলি (১৭৮৯-৯১)

জাতীয় সভা (National Assembly) ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে। তখন থেকে জাতীয় সভাকে সাংবিধানিক সভা (Constituent Assembly) বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ সভা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষাসংস্কৃতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে ফ্রান্সের পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙে যায়, নতুন বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা দৃঢ় হতে থাকে। নিম্নে এ সংস্কারগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

৪ আগস্টের 'কৃষি বিপ্লব': সামন্ত প্রথার বিলোপ

বাস্তিল দুর্গের পতনের খবর দ্রুত ফ্রান্সের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছাতে থাকে। গ্রামের দরিদ্র ও নিগৃহীত কৃষক বিপ্লবের খবর শুনে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অভিজাত জমিদার শ্রেণির নির্মম শোষণে কৃষকরা তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিল। সুতরাং প্যারিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এই খবর শুনে কৃষকরা অভিজাত-জমিদারদের ওপর চড়াও হয়। ক্রুদ্ধ কৃষকরা জমিদারদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে থাকে, নায়েবদেরকে মারধর করতে থাকে, জমিদারদের কাছ থেকে ইতোপূর্বে নেওয়া জমির বন্দোবস্ত বিষয়ক চুক্তিপত্রের কাগজ, দলিলপত্র পুড়িয়ে ফেলতে থাকে, জমির আ'লগুলো ভেঙে ফেলে দেয়। কৃষকরা আইন শৃঙ্খলার প্রতি তোয়াক্কা করার প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায়। এ ছিল পুঞ্জিভূত ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ। চারদিকে অরাজকতা বেড়ে উঠলে জমির মালিক ও ধনী ব্যক্তিরা প্রাণ রক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে শহরে চলে আসে। দেশের এ পরিস্থিতি জাতীয় সভায় আলোচনায় দারুণভাবে প্রভাব ফেলে।

১৭৮৯ সালের ৪ আগস্ট তারিখের অধিবেশনে সোলমন নামক জনৈক সদস্য গ্রামে-গঞ্জে সংঘটিত কৃষকদের বিদ্রোহ সম্পর্কে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিপ্লবের অন্যতম নেতা রোবসপিয়ের প্রস্তাব করেন যে, অভিজাতদের উচিত স্বেচ্ছায় তাদের স্বত্ব ত্যাগ করা। পরিস্থিতি জমিদারদের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ায় জমির মালিকানা ত্যাগ করা ব্যতীত অভিজাত এবং ধর্মযাজকদের জন্য অপর কোনো পথ খোলা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের অভিমত আরও অনেক সদস্য প্রকাশ করলে সংবিধান সভার অধিবেশনটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঐ রাতে সভায় অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যায়। ১১ আগস্ট সভায় একটি আদেশনামা (Decree) জারি করে বলা হয় "সামন্তপ্রথা ফ্রান্স থেকে অতঃপর লুপ্ত হলো।” কিন্তু তারপরও বেশ কিছু কর লুপ্ত হয় নি, সম্পত্তির ওপর জ্যেষ্ঠ পুত্রের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, মৎস্য চাষের অধিকার অব্যাহত থাকে, অভিজাতদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এসব কারণে ৪ ও ১১ আগস্টের ঘোষণা দ্বারা সামন্তপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে-এমন দাবি করাটি ঠিক হবে না। তবে সামন্তপ্রথা বিলুপ্তির ঘোষণার তাৎপর্যকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ফ্রান্সের কৃষকরা নির্মম শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে। সামন্তপ্রথার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি শিথিল হতে থাকে, ১৭৯৩ সালে জ্যাকোবিনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সামন্ত ব্যবস্থার অবশেষে উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে ১৭৮৯ সাল থেকে ফ্রান্সে সামন্তপ্রথা বিলোপের যে সকল উদ্যোগ গৃহীত হয় তার ফলে কৃষি ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয়- ফরাসি ইতিহাসে একে 'কৃষি বিপ্লব' নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, বিপ্লবের অঙ্গীকার ও মুক্তির দলিল

সংবিধান সভার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ২৬ আগস্ট ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তি ও নাগরির অধিকারগুলো ঘোষণা করা হয়। (Declaration of the Rights of Man and Citizen)। এই ঘোষণাপত্রে মোট ১৭৫ অনুচ্ছেদে মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে যেসব মানবাধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করা হয় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়-

১.মানুষ জন্মসূত্রে স্বাধীন এবং স্বাধীনতা ভোগের সমঅধিকারী।
২. ঘোষণাপত্রে বিবৃত হয়, মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার, সম্পত্তি অর্জন ও ভোগ করার অধিকার, জীবনের নিরাপত্ত রক্ষা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার অধিকার প্রকৃতিগতভাবেই স্বীকৃত।
৩.জনগণ হলো আইনের উৎস। তাই জনমতের বিরুদ্ধে আইন রচিত হতে পারে না।
8.রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র জাতি বা জনগণের মধ্যেই নিহিত থাকে। রাজা শুধুমাত্র রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন, অধিকারী নন।
৫.আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। কেউ কোনো বিশেষ মর্যাদা লাভ বা অধিকার ভোগ করতে পারে না।
৬. সম্পত্তি ভোগের অধিকার হলো একটি পবিত্র অধিকার। আইনের সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণ ব্যতীত কারও সম্পত্তি দখল করা যাবে না।
৭. মতামত প্রকাশের ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি লাভকরে।

৮. বেআইনিভাবে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার কিংবা কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে না। যেহেতু আইনের চোখে সকল মানুষ সমান-তাই কোন বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ মর্যাদা বা সুযোগ লাভ করতে পারেন না।
৯. ঘোষণাপত্রে সরকারি ক্ষমতার বিভাজন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণা করা হয়।
ঘোষণাপত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও তবে কীভাবে এসব অধিকার সকল মানুষের জীবনে বাস্তবায়ন করা যাবে- সে সম্পর্কে অবশ্য ঘোষণাপত্রে কিছু বলা হয় নি। তাই ধনী ও দরিদের মধ্যে অধিকারের যেমন তারতম্য ঘটেছে, কার্যত ভূমিহীন কৃষকের ভূমি ও সম্পত্তি পাওয়ার সমানাধিকারের বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়। তারপরও ফ্রান্সের রাজতন্ত্র এতদিন যেভাবে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা ভোগ করত তা এ দলিলে রোধ করা হয়, মন্ত্রীরা আইন সভার কাছে মেয়াদ শেষে দায়িত্বভার বুঝে দিতে বাধ্য ছিল যে তাও বিধিবদ্ধ করা হয়, প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকগণ স্বাধীনভাবে সীমিত নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্তি পাবেন- সেই নিয়ম প্রবর্তন করা হয়। ফ্রান্স মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ লাভকরে।

সংবিধান সভা সমগ্র ফ্রান্সকে সমান পরিধির ৮৩ টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে ভাগ করে। এই প্রদেশগুলোকে ৫৪৭ টি জেলায় এবং প্রতিটি জেলাকে কয়েকটি ক্যান্টনে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি স্তরেই নির্বাচিত শাসনকর্তা নিয়োগ করার বিধান রাখা হয়। যে সকল নাগরিক অন্তত তিন দিনের মজুরি রাষ্ট্রকে প্রদানে সক্ষম- তারা ভোটাধিকার লাভ করে; এদেরকে 'সক্রিয়', যারা উক্ত করদানে অক্ষম- তাদের 'নিষ্কিয়' নাগরিক বলে অবহিত করা হয়। ফ্রান্সের তৎকালীন মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখের মধ্যে মাত্র ৪৫ লাখ নাগরিক 'সক্রিয়' বলে বিবেচিত হয়।
সংবিধান সভা বিচারালয়গুলোকে আইন বিভাগ বা শাসন বিভাগ থেকে মুক্ত করে নেয়। এর ফলে বিচারকগণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। তবে স্থানীয় আদালতগুলোর ওপরে হাইকোর্ট বা আপিল আদালত স্থাপন করা হয়।

সংবিধান সভা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার সাধন করে। সভা সকল পরোক্ষ কর বাতিল করে, জমি এবং অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নতুন কর পদ্ধতি চালু করে, গ্রামে গ্রামসভা এবং শহরে মিউনিসিপ্যালিটিকে এসব কর আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করে। সভা বাণিজ্যিক কারবারের ওপর আয়কর দেওয়ার প্রথা প্রবর্তন করে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য দাতব্য কর আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়। সংবিধান সভা গির্জার সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসে এবং প্রাপ্ত সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে এ্যাসাইন্যাট নামক এক প্রকার কাগুজে মুদ্রা বাজারে চালু করে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যকে অবাধ রাখা হয়, স্বাধীনভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার - অধিকার দেয়া হয়

সংবিধান সভা ফরাসি গির্জার পুরাতন সকল কালা-কানুন বাতিল করে, সকল গির্জাকে জাতীয়করণ করে এবং ধর্মযাজকদেরকে ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান প্রবর্তন করে। আগে বিশপ ও অন্যান্য যাজকরা রোমের পোপ কর্তৃক মনোনীত হতেন। নতুন ব্যবস্থায় যাজকরা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পেতেন। গির্জার জমি তাদের ভোগদখল করার সুযোগ রহিত করা হয়।
সংবিধান সভা অবশ্য ফ্রান্সের বেকারদের কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। অধিকন্তু ১৭৯১ সালের ১৪ জুলাই এডভোকেট ল্য শেপলিয়র-এর প্রস্তাব মোতাবেক ফ্রান্সে শ্রমিক ধর্মঘট ও সংগঠন করার অধিকার বিলোপ করা হয়। এ ধরনের কিছু ত্রুটি ছাড়া সংবিধান সভা বিপ্লবের পথে ফ্রান্সকে অনেকখানি অগ্রসর হতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। ১৭৯১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের জন্য নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। এ পর্যন্ত জাতীয় সংবিধান সভায় যে সকল আইন বা ডিক্রি গৃহীত হয়েছিল নতুন সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৭৯১ সালের ১ অক্টোবর সাংবিধানিক সভার স্থলে বিধান সভা ফ্রান্সকে পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করে।

বিধান সভার শাসনকাল (১৭৯১-৯২): রাজতন্ত্রের পতন

নতুন সংবিধান অনুযায়ী ফ্রান্সে বিধান (Assembly ছবি) সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর সাংবিধানিক সভার কার্যকাল শেষ হয় এবং ১ অক্টোবর থেকে বিধান সভার (Legislative Assembly কর্মকাণ্ড শুরু হয়, ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বিধান সভায় ৭৪৫ জন সদস্য নির্বাচি হন। এদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অনুসারী প্রায় ২৬০ জন এবং প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাসী জ্যাকোবিন গোষ্ঠী বা পরিচিত ১৩৬ জন সদস্য ছিলেন। তবে জ্যাকোবিন দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে জিরন প্রদেশ থেকে আগতরা পৃঞ্চ হয়ে যায়। এরা জিরন্ডিস্ট নামে পরিচিত ধারার শক্তি পরবর্তী সময়ে পরিচিত হতে থাকে। বিধান সভায় এসব ধারা বাইরেও মধ্যপন্থি (মডারেট) চিন্তা ধারার গোষ্ঠীও বেশ সক্রিয় ছিল।

বিধান সভার শাসনকালে ফ্রান্সে দ্রুত অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিপ্লব বিরোধী শক্তিও ঐ সময় মাথাচাড় দিয়ে ওঠে। অথচ বিধান সভা এসব প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পায় নি। চারদিকে দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারী, লুটেরা ও ধনিকগোষ্ঠী অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকে। এক শ্রেণির যাজন পুরাতন যাজকতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানাতে থাকে, নতুন Civil Constitution of the Clergy-র প্রতি বৈরিতা প্রদর্শ শুরু করে। এছাড়া রাজতন্ত্রের ঘোরতর সমর্থক যারা দেশ থেকে পলায়ন করে প্রতিবেশী দেশসমূহে আশ্রয় নিয়েছি সেসব এমিগ্রি (Emigres) সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর হতে থাকে। বিধান সভাকে এসব সমস্যা মোকাবিলা করার হয়েছিল। অবশ্য যেসব ধর্মযাজক নতুন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে না বিধান সভা তাদের সরকারি বেড ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই বিদ্রোহীদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে গণ্য করে দেশত্যাগীদের সম্পর্কেও বিধান সভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারির মধ্যে যারা দো' প্রত্যাবর্তন করবে না, তাদের জায়গা-সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। কিন্তু রাজা আইন দুটির বিরুদ্ধে Veto প্রদা করলে জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিস্টরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটতে থাকে। ২০ জুন, ১৭৯২ খ্রিস্টাে প্যারিসের জনতা টুইলারিস রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে। রাজা-রানি এ যাত্রা রক্ষা পেলেও ছদ্মবেশ ধারণ কর্ত পলায়নকালে ভ্যারেন্নে নামক স্থানে তাদেরকে জনতা চিনে ফেলে এবং প্যারিতে ধৃত অবস্থায় তারা আনীত হন। এ ফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জনগণের তীব্র ধিক্কার উচ্চারিত হয় এবং রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দাবি জোরদার হতে থাকে। অস্ট্রিয়াও ঐ সময় রাজা-রানিকে উদ্ধারের নামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদান করে ইউরোপের সকল বিপ্লববিরোধী শক্তির সাহায্য কামনা করে। ফলে ফ্রান্সে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হবে থাকে। বিধান সভা "মাতৃভূমি বিপন্ন” এই ধ্বনি তুলে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফ্রান্সের অভ্যন্তরে অরাজকতা বেড়ে যায়, শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট প্যারির বিপ্লবী কমিউনগুলো টুইলারি রাজপ্রাসাদ পুনরায় আক্রমণ করে। রাজা-রানিকে বন্দী করা হয়। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের ঘোষণা দিতে বিধান সভা বার্ধ
হয়।

জাতীয় কনভেনশন (১৭৯২-১৭৯৫ খ্রি.): ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

জিরন্ডিন, জ্যাকোবিন এবং প্রতিবিপ্লবী থ্যার্মিডোরিয়ানদের শাসন, ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটার সাথে সাথে বিধান সভার কার্যকারিতাও ফুরিয়ে যায়। নতুন জাতীয় পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হতে থাকে; দেশে নৈরাজ্য, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বেড়েই চলে। অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাত্র ৭.৫০ শতাংশ ভোটার ভোট প্রদান করেন। ৭৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হন। নতুন যে জাতীয় পরিষদ গঠিত হয় ফ্রান্সে এটিকে জাতীয় কনভেনশন নামে অভিহিত করা হয়েছিল। উক্ত জাতীয় কনভেনশন ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হলেও ঐ সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে তিনটি পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। নিম্নে উক্ত তিন শক্তির শাসনকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

জিরন্ডিন শাসনামল (১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ থেকে ২ জুন ১৭৯৩ খ্রি.)

১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কনভেনশনের অধিবেশন শুরু হয়। জিরোন্ড অঞ্চলের নামে অভিহিত হলেও ঐ সময় নরমপন্থি বুর্জোয়াদের প্রাধান্য কনভেনশনে ছিল। ফ্রান্স যতদিন ইউরোপে যুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল ততদিন কনভেনশনে জিরন্ডিনদের প্রভাব ছিল, এরপর তাতে ভাঁটা পড়ে। তাছাড়া জিরন্ডিনগণ কনভেনশনে রাজার ভাগ্য নির্ধারণ, নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং কমিউন প্রতিষ্ঠার দাবি প্রসঙ্গে দৃঢ় কোনো অবস্থান গ্রহণ করতে পারেনি, অপরদিকে এসব দাবি নিয়ে জ্যাকোবিনরা ছিল সোচ্চার। জ্যাকোবিনদের অনড় অবস্থানের কারণেই রাজাকে কনভেনশন মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া সংবিধান রচনার ওপরও তারা জোর প্রদান করে, দেশে সাধারণ নিরাপত্তা সমিতি (Committee of General Defence) নামক একটি সংস্থা তৈরি করা হয়। দেশে খাদ্য সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। জিরন্ডিনরা নতুন সংবিধান রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নিজেদের মধ্যেই বিরোধ বেড়ে যায়। ফলে জনগণের কাছে জিরন্ডিনদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়, জ্যাকোবিনদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। তারা খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে। ২ জুন, জ্যাকোবিনরা জনতাকে নেতৃত্ব প্রদান করে, ক্ষমতা থেকে জিরন্ডিনরা বিতাড়িত হয়, জ্যাকোবিনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

জ্যাকোবিনদের শাসনামল (২ জুন ১৭৯৩ খ্রি. থেকে ২৭/২৮ জুলাই ১৭৯৪ খ্রি.)

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন জ্যাকোবিনরা ক্ষমতা দখল করে। ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক দল ছিল প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এবং বিপ্লবের রক্ষক। কিন্তু এ সময় ফ্রান্সে প্রতি বিপ্লব দেখা দেয়। প্যারিসের কমিউনের একাধিপত্য ও অত্যাচারে ডিপার্টমেন্টে (শাসন এলাকা) তীব্র বিক্ষোভ দেখা দেয়। জিরোনডিস্ট দলের পতনে লায়ন্স (Lyons), মারসাই, বরদো প্রভৃতি শহরগুলোতে প্রতি বিপ্লব বা বিপ্লব বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। এই রাজনৈতিক গৃহ বিবাদের সুযোগে ফ্রান্সের ধর্মযাজকগণ লা-ডেনডি (Le-vende) কৃষকদের বিপ্লবকালীন ধর্মীয় সংস্কার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ইন্ধন দেয়। এভাবে ধর্মের নামে ও রাজতন্ত্রের সমর্থনে ফ্রান্সে প্রতি বিপ্লব শুরু হয়। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ফ্রান্সের বিপ্লবী সরকারকে উৎখাতের জন্যে জোট গঠন করে ফ্রান্স আক্রমণ করে। এই অবস্থায় জ্যাকোবিন দল ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ প্রতি বিপ্লব এবং দেশ রক্ষার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে প্রতি বিপ্লব বা অরাজক অবস্থার অবসান করার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সন্ত্রাস বা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে প্রতি বিপ্লব দমন করা হয়েছিল বলে জ্যাকোবিন দলের এ শাসনব্যবস্থাকে সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) বলা হয়। জ্যাকোবিন দলের নেতা রোবসপীয়র ছিলেন সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রধান স্থপতি।

হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে এক বিভীষিকার সঞ্চার করাই ছিল জ্যাকোবিন দলের প্রধান লক্ষ্য। তারা প্রচার করত যে ত্রাসই হচ্ছে দ্রুত বা বলিষ্ঠ ন্যায়বিচারের পথ। সুতরাং ত্রাসই হচ্ছে পুণ্যের পথ।
(Terror is only justice more prompt more vigorous, more invexorable and therefore virtue's child). সন্ত্রাসের রাজত্ব বাস্তবায়নে প্রথমেই সংবিধান রদ করা হয় এবং দুটি ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে তাদের হাতে সন্ত্রাসের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
এই কমিটি হলো- (১) জননিরাপত্তা কমিটি (২) সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুলাই হতে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জননিরাপত্তা কমিটি রাষ্ট্রের সকল কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সন্ত্রাসবাদী শাসন পরিচালনা করেছিল। এই কমিটির সদস্য ছিল এগার জন। এর মধ্যে প্রধান ছিলেন রোবসপীয়র।

থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া জাতীয় কনভেনশনের পতন

বিপ্লবীদের প্রবর্তিত ফরাসি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট মাসটিকে থার্মিডোর মাস নামে অভিহিত করা হয়। জাতীয় কনভেনশনে সংঘটিত অভ্যুত্থান মূলত প্রতিবিপ্লবী শক্তির সমর্থনে হয়েছিল। ২৮ জুলাই অর্থাৎ ১০ থার্মিডোর ২২ জনকে এবং ২৯ জুলাই বা ১১ থার্মিডোর প্যারি কমিউনের ৭০ জন সদস্যকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। 'গোল্ডেন ইয়থ' নামধারী যুবকরা জ্যাকোবিন ক্লাবগুলো গুঁড়িয়ে ফেলে, অথবা বন্ধ করে দেয়। গণনিরাপত্তা কমিটি নিষিদ্ধ করা হয়, এমনকি প্যারিসের কমিউনগুলোও বাতিল করে দেয়া হয়। জ্যাকোবিনদের শাসনকে মুছে ফেলতে গিয়ে থার্মিড়োরগণ প্রতিবিপ্লবই সম্পন্ন করতে থাকে। ফ্রান্সে কার্যত নতুন আর এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। এটিকে "শ্বেত সন্ত্রাস” নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। শ্বেত সন্ত্রাসে অগণিত মানুষ মৃত্যুবরণ করে। অনেকে এ হত্যাকে জ্যাকোবিনদের পরিচালিত সন্ত্রাস ও হত্যার চেয়েও ভয়াবহ বলে অভিহিত করে থাকেন। দেশে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে, দ্রব্যমূল্য বেড়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়। জাতীয় কনভেনশনে প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়া শক্তি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কনভেনশনের বিপ্লবী সদস্যদের হত্যা করা হয়। দেশে খাদ্যাভাব, বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, হত্যা, জাতীয় রক্ষীবাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত প্রতিবাদকে প্রতিহত করা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে ১৭৯৫ সালের মে মাসে (ফরাসি প্রেরিয়াল মাস) ফ্রান্সে বিদ্রোহ বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। থার্মিডোরীয় বুর্জোয়ারা অবস্থা বুঝতে পেরে নতুন সংবিধান রচনায় হাত দেয়। ২২ আগস্ট কনভেনশন নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। প্রজাতন্ত্রের নতুন সংবিধান অনুযায়ী দুই কক্ষবিশিষ্ট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ১৭৯৫ সালের ১০ অক্টোবর উচ্চকক্ষের ৫ জন ডাইরেক্টর কর্তৃক ফ্রান্স শাসিত হওয়ার বিধান প্রবর্তন করা হয়। বিলুপ্ত হয় জাতীয় কনভেনশন। প্রতিষ্ঠিত হয় ডাইরেক্টরি শাসন ব্যবস্থা।

ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...