পাঠ-২.৪: ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

17

পৃথিবীর ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব এক যুগান্তকারী আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে যে বুর্জোয়া বিপ্লবের সূচনা হয় তা পূর্বতন সমাজের পতনের পূর্বাভাস বলা যায়। বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। সাধারণ কৃষক শ্রেণি বিপ্লবে অংশ নিয়ে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটায়। ফলে তা 'প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের' রূপ নিয়ে ফ্রান্সে পৌর-বিপ্লবের সূচনা করে। আবার একপর্যায়ে বিপ্লবের নেতৃত্ব উগ্রপন্থি জেকোবিন দলের নিকট চলে যাওয়ায় তা 'গণবিপ্লব' হিসেবে আখ্যা পায়। যে বিপ্লবের নামেই তাকে আখ্যায়িত করা হোক না কেন তা সর্বজনীনভাবে ফরাসি বিপ্লব নামে স্বীকৃত; যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটে জুলাই (১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে) ও ফেব্রুয়ারি (১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল নিম্নরূপ:

ক) সামন্তপ্রথার বিলোপ ফরাসি বিপ্লবের ফলে পতনোন্মুখ সামন্তপ্রথার অবসান ঘটে। অভিজাত সম্প্রদায়ের সামন্তপ্রথাজনিত বিশেষ অধিকার খর্ব হয়। সামন্তপ্রথাজনিত সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ক্ষমতা লোপ পায়। গিল্ড প্রথার বিলোপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
খ) নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের স্থলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম একটি সাফল্য। রাজার সীমাহীন ক্ষমতা খর্ব করা হয়। রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। রাজার ক্ষমতা প্রতিনিধি সভার অধীন করা হয়।

গ) বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ফরাসি বিপ্লবের একটি বড় অবদান হচ্ছে বিপ্লবী চেতনার সঞ্চার। বিপ্লবের মূলমন্ত্র স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী ইউরোপের সর্বত্র স্বাধিকারের বীজ ছড়িয়ে দেয়। ফরাসিরা গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে আরও বিপ্লবের জন্ম দেয়।

ঘ) গির্জার সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ: ফরাসি বিপ্লবের আরও একটি সফল দিক হলো, ফরাসি সমাজের দুর্নীতির প্রতীক গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও রাষ্ট্রীয়করণ। এতে শত-সহস্র বছরের সঞ্চিত ধর্মান্ধতা, হীনম্মন্যতা ও অসহিষ্ণুতা দূরীভূত হয়। 'পুরোহিতদের নাগরিক সংবিধান-১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ' নামে আইনের দ্বারা পোপের ধর্মীয় প্রভাব সীমিত করা হয়, ধর্মযাজকের সংখ্যা হ্রাস করে ক্ষমতা খর্ব করা হয়।

ঙ) মানুষের মৌলিক অধিকার ঘোষণা: ফরাসি বিপ্লবের আরেকটি সাফল্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার ঘোষণা ও এর মূলনীতিসম্বলিত প্রস্তাব গ্রহণ। রুশোর গণতান্ত্রিক ভাবধারায় পুষ্ট হয়ে এবং আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয় পরিষদ এ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ছিল ফ্রান্সের ম্যাগনাকার্টা। ফরাসিরা শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, সাম্যবাদ ও স্বাধিকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের সূচনার প্রেরণা পায় এ ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে।
চ) সীমাবদ্ধ ভোটাধিকারের প্রচলন গণপরিষদের সদস্যরা জনসাধারণের সীমাবদ্ধ ভোটাধিকারের মধ্যেমে নির্বাচিত হবেন, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম সাফল্য। যদিও সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রচলন বিপ্লবীদের দাবি ছিল। সম্পত্তির ভিত্তিতে জনসাধারণকে 'সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়' নাগরিক হিসেবে বিভক্ত করা ভোটাধিকার প্রয়োগের নেতিবাচক দিক। বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে এটুকু প্রাপ্তিও ছিল অনেক।

ছ রাজনৈতিক দলের উদ্ভব: ফ্রান্সে চারটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। যথা-

১। প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থি দল, যারা পূর্বতন শাসনতন্ত্র ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার পক্ষপাতী ছিল।

২। নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রপন্থি বা মধ্যপন্থি নিরপেক্ষ দল, যারা ইংল্যান্ডের ন্যায় ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র স্থাপনের পক্ষপাতী ছিল।
৩। রাজতন্ত্রবিরোধী বামপন্থি উগ্র জেকোবিন দল।

৪। রাজতন্ত্রবিরোধী নরমপন্থি গিরোন্ডিস্ট দল।

জ) স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠা: স্থানীয় শাসনব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ ও জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তা ন্যস্ত করা ছিল ফরাসি বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য ফলাফল। সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে ভাগ করা হয় এবং এগুলোকে, আবার ৩৭৪টি ক্যান্টনে বিভক্ত করা হয়। ক্যান্টনগুলোকে আবার ৪৪,০০০ কমিউনে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেক অঞ্চলের শাসনভার স্থানীয়ভাবে প্রদান করা হয়। স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতা কমিউনগুলোর হাতে ন্যস্ত হওয়ায় রাজার প্রত্যক্ষ শাসনের অবসান ঘটে।

ঝ) জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি: ফরাসি বিপ্লবের ফলে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভব হয়। 'জাতি দীর্ঘজীবী হোক'- বিপ্লবীদের জাতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত এ স্লোগান একাত্মবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে।

ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...