Concept of Cold War
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল অভিজ্ঞ কূটনীতিক বার্নাড বারুচ কলম্বিয়ায় এক ভাষণে সর্বপ্রথম স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই (Cold War) শব্দটি প্রয়োগ করেন। তিনি তার ভাষণে মার্কিন-সোভিয়েত সম্পর্কের ব্যাপারে বলেন, "আমরা আর প্রতারিত হতে চাই না, এখন আমরা স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে আছি।" স্নায়ুযুদ্ধ বলতে
স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব
প্রকৃতপক্ষে কোনো যুদ্ধের অবস্থা বোঝায় না। যুদ্ধ কথাটা ব্যবহার করা হচ্ছে অথচ কোনো যুদ্ধ নেই। স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল হলো একটা উত্তেজনা বা উদ্বেগ বিরাজমান থাকে, যা স্নায়ুর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। যারা যুদ্ধের সাথে জড়িত তারা সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না কিন্তু আচার-আচরণের মাধ্যমে যুদ্ধের একটা আবহ তৈরি করছে। সংক্ষেপে বলা যায়, যুদ্ধও নয় শান্তিও নয়, আবার যুদ্ধের অনুপস্থিতিও নয়-এমন একটা গুমট ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশই স্নায়ুযুদ্ধ। সম্পর্কের উত্থান-পতন, সন্দেহ-উত্তেজনা সবকিছুর মূলে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করত। মতবিরোধ বা পারস্পরিক তিক্ততা যখন মীমাংসার পর্যায়ে থাকে না তখন পরস্পর বিরোধী পক্ষ অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধের অবসানের জন্য অগ্রসর হলে আমরা তাকে যুদ্ধ বলি। স্নায়ুযুদ্ধের বেলায় সশস্ত্র সংঘর্ষের পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলেও কোনো পক্ষই প্রকাশ্য সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না এবং নানা কৌশলে যুদ্ধ এড়িয়ে যায়। আবার উত্তেজনাময় পরিবেশ তৈরিতে কোনো পক্ষই দ্বিধা করছে না। বিবদমান রাষ্ট্রের মধ্যে এ রেষারেষির প্রতিক্রিয়া সমগ্র আন্তর্জাতিক সমাজের উপর পড়ে এবং সারা বিশ্বে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াইকে অস্বস্তিকর বা অনভিপ্রেত শান্তি বলা যেতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতির দুই পরাশক্তির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠনের মাধ্যমে শক্তির ভারসাম্য গড়ে তোলে, যার জন্য এক পক্ষের উপর অন্য পক্ষের প্রত্যক্ষ সামরিক আক্রমণের আশঙ্কা দূরীভূত হয়। ফলে দুই পরাশক্তির নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক লড়াই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত।
অধ্যাপক ফ্রাংকেলের মতে, "স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডাযুদ্ধ বলতে গণতান্ত্রিক মতাদর্শ ও সাম্যবাদ এবং তাদের প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধের সাথে জড়িত সকল ঘটনাকে বোঝায়।"
অধ্যাপক ফ্রিডম্যানের মতে, "স্নায়ুযুদ্ধ হলো যুদ্ধের একটি নতুন কৌশল। স্নায়ুযুদ্ধ এমন একটি পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেখানে যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের জন্য সকল প্রস্তুতি চলতে থাকে।""
অর্থাৎ ঠাণ্ডাযুদ্ধ এমন এক অবস্থা, যেখানে প্রকৃত যুদ্ধের আশ্রয় গ্রহণ না করেও অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়। ঠাণ্ডাযুদ্ধকে এক প্রকার যুদ্ধহীন যুদ্ধ বলা যায়। স্নায়ুযুদ্ধে দুটি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র পরস্পরের স্নায়ুতে সংগোপনে একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে, যুদ্ধের মাধ্যমে যার বহিঃপ্রকাশ কোনো ক্রমেই ঘটে না।
স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
Read more