ঠিক কখন থেকে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা বলা কঠিন। তবে হঠাৎ করেই এটার সূচনা হয়নি বা থেমেও যায়নি। কেউ কেউ মনে করেন, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লবের পর থেকে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এর বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। কারও মতে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ফুলটন বক্তৃতায় চার্চিলের মন্তব্যই - স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন কূটনীতিক চার্লস রোলস বলেন, "স্নায়ুযুদ্ধের ঘটনাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায় না। ট্রুম্যান নীতি ও মার্শাল পরিকল্পনার সময় থেকেই মার্কিন-রাশিয়া বিরোধ ঠাণ্ডাযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।"
স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব
স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাকাল (১৯৪৫-৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান পর্যন্ত একে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্বাভাবিক ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দুই দশক বজায় ছিল। এ দুই দশক স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতর যুগ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ প্রথম পর্যায় ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বা 'দাঁতাত' (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)-এর পূর্ব পর্যন্ত। প্রথম পর্যায়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুই বৃহৎ শক্তির প্রভাববলয় সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষণীয়। সামরিক জোট, পাল্টা সামরিক জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
প্রথম পর্যায় (১৯৪৫-৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)
প্রথম পর্যায়ে ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতাদর্শিক সমাজতান্ত্রিক শিবিরের উদ্ভব, ট্রুম্যান নীতি, মার্শাল পরিকল্পনা, বার্লিন সংকট, ন্যাটো জোট, ওয়ারস চুক্তি, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, কিউবা সংকট প্রভৃতি বিষয় পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
স্নায়ুযুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে আমরা ট্রম্যান তত্ত্বের পরিচয় পাই। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সাম্যবাদের প্রসার ঘটতে শুরু করলে গণতন্ত্রের পরিত্রাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রমাদ গোনে। তাই তাদের রাজনীতির প্রচারে এটাই প্রাধান্য পেতে শুরু করে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্র। সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্র স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করতে উদ্যত। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদে ভীত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে যে তত্ত্ব প্রকাশ করেন তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার নামে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অজুহাত বের করা, যা ট্রুম্যান তত্ত্ব নামে খ্যাত।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটেন গ্রিস থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলে আমেরিকা গ্রিস-তুরস্ক সংকটে হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। গ্রিসে সাম্যবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে আমেরিকা গ্রিসের জাতীয় ঐক্য রক্ষার অজুহাতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। আমেরিকার সাফল্য স্নায়ুযুদ্ধকে তীব্র করে তোলে।
আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিব জর্জ মার্শাল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করলেন, বাইরের সাহায্য না পেলে ইউরোপের ভেঙে পড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ইউরোপীয়রা তাদের নিজেদের করণীয় ঠিক করবে। তারা আমেরিকার কাছ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলে তা তারা পাবে। এটা মার্শাল পরিকল্পনা নামে খ্যাত। মার্শালের ঘোষণার ১২ দিন পর ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসলে সোভিয়েত প্রতিনিধি বলেন, "বাইরের বৃহৎ কোনো শক্তি ইউরোপের অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করলে এর ফল ভালো হবে না।" ইউরোপের অ-কমিউনিস্ট ১৬টি রাষ্ট্র আমেরিকার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমেরিকার সাহায্য ইউরোপে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করলেও স্নায়ুযুদ্ধকে যথেষ্ট উসকানি দিয়েছিল।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের চেকোস্লোভাকিয়া কমিউনিস্টদের দখলে চলে গেলে আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো চিন্তিত হয়ে পড়ে। এ বছর সোভিয়েত রাশিয়া বার্লিন অবরোধ করলে আমেরিকাl
বার্লিনবাসীকে বাঁচানোর জন্য আকাশ থেকে খাদ্য ফেলে সাহায্য করে। এসব পটভূমিকায় ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ৪ই এপ্রিল আমেরিকা সামরিক জোট 'ন্যাটো' (NATO: North Atlantic Treaty Organization) গঠন করে। মূলত সোভিয়েত-ভীতি থেকেই ন্যাটোর সৃষ্টি। সোভিয়েত ইউনিয়নও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অপরাপর কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর সাথে ওয়ারস চুক্তি ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মে স্বাক্ষর করে। উদ্দেশ্য পূর্ব ইউরোপে তার সাম্রাজ্যকে সুসংহত করা। এভাবে ধাপে ধাপে স্নায়ুযুদ্ধের গভীরতা ও পরিধি বাড়তে থাকে।
১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে স্নায়ুযুদ্ধ এশিয়ায় প্রবেশ করে। এ সময় চীনে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজম-ভীতি থেকে চীনের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বিরত থাকে; সোভিয়েত রাশিয়া স্বীকৃতি দিলে সাম্যবাদী দুই রাষ্ট্রের ঐক্য হওয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোরিয়ার তাৎপর্য বাড়তে থাকলে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের কায়রো সম্মেলনে স্থিরীকৃত ছিল যে, কোরিয়া বিদেশি নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের কাছ থেকে কোরিয়াকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। আমেরিকা কোরিয়ার উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করলে একটা ফয়সালায় গিয়ে কোরিয়া সমস্যার সমাধান হয়, কোরিয়ার উপর ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব বজায় থাকবে। পরে ৩৮° অক্ষরেখা অনুযায়ী কোরিয়া দু'ভাগে বিভক্ত হয়। দক্ষিণাংশে দক্ষিণ কোরিয়া- যাতে আমেরিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উত্তরাংশে উত্তর কোরিয়া- যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি চীনের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার পক্ষে অনুকূল নয়। তাই চীনও কোরিয়ার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করলে তিন বৃহৎ শক্তির স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। স্নায়ুযুদ্ধ প্রত্যক্ষ যুদ্ধের রূপ নিলে আমেরিকা কোরিয়ায় নাজেহাল হয়। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে কোরিয়ায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বারা প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অবসান হলেও স্নায়ুযুদ্ধ এখনো চলমান।
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার স্ট্যালিনের মৃত্যু হলে স্নায়ুযুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হতে শুরু করে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হন উদার মনের আইজেনহাওয়ার। তখন থেকেই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। যার দরুন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন ও জেনেভা সম্মেলন নামে দু-দুটি সম্মেলন হয়। জেনেভা সম্মেলনে আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের নির্বিচারে উৎপাদন ও ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা নেই। উভয় দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রচেষ্টা চালাবে। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে স্নায়ুযুদ্ধের আরেকটি রূপ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত SEATO এবং মধ্যপ্রাচ্য প্রতিরক্ষা সংগঠন MEDO ন্যাটোর সাথে যুক্ত হলে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাসের বদলে বৃদ্ধি পায়। ট্রুম্যান তত্ত্বের মতো আইজেনহাওয়ার মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য সব রকম সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে রাশিয়া আবার সামরিক জোট WARSAW (ওয়ারস) গঠনের মাধ্যমে নিজের প্রভাববলয় বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। কাজেই স্নায়ুযুদ্ধ তীব্র করতে শুধু আমেরিকা এককভাবে দায়ী নয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি দু'ভাগ
স্নায়ুযুদ্ধ: পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব
হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক ভাগ 'জার্মান যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র' (GFR), যা পশ্চিম জার্মানি নামে পরিচিত। অন্য অংশ 'জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' (GDR), যা পূর্ব জার্মানি নামে পরিচিতি পায়। স্নায়ুযুদ্ধের ফলে অতীতের ঐক্যবদ্ধ জার্মানি আবার বিভক্ত হয়।
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কেন্নান থিসিস ঘোষণা করলে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নেয়। কেন্নানের সংযম তত্ত্বের মূলকথা ছিল, সোভিয়েত সামরিক ক্ষমতা হ্রাসের দিকে। এমতাবস্থায় বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতিস্বীকারে বাধ্য হবে। জোরগলায় কেন্নান তত্ত্ব প্রচারের অন্যতম কারণ ছিল, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কৌশল আয়ত্ত করায় সংযত আচরণের মাধ্যমে সোভিয়েতকে চাপে রাখা।
সুয়েজ সংকটকে কেন্দ্র করে মিশর স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশর থেকে ব্রিটিশ বাহিনী সরে এলে এবং রাশিয়া মিশরকে সমর্থন দিলে দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ জয়ের লক্ষ্যে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়, আমেরিকা এ যাত্রায় পিছিয়ে পড়ে। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন সমস্যা আবার স্নায়ুযুদ্ধকে সংকটাপন্ন করে তোলে। অবশেষে ক্যাম্প ডেভিড আলোচনার মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা গৃহীত হলে এবং সামরিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেলে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন ইউ-টু অনুসন্ধানী বিমান রাশিয়া গুলি করে ভূপাতিত করলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়। কিউবা সংকটকে কেন্দ্র করে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ) আবার উভয় বৃহৎ শক্তি যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মধ্য দিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি নিহত হলে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভক্ষমতাচ্যুত হলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা হ্রাস পেতে শুরু করে।
স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৬৪-৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)
দুই বৃহৎ শক্তির শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্নায়ুযুদ্ধের চেহারা পাল্টে যায়। বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের এ ধারণা জন্মে যে, পারমাণবিক বোমা আদৌ কল্যাণজনক নয়। উভয় পক্ষই বিবাদ অবসানের প্রতি নজর দেয়। তারা অনুভব করতে শুরু করে যে, যুদ্ধ মানবজাতির জন্য কেবল অকল্যাণ ও ধ্বংসই ডেকে আনবে। তাই তারা পরস্পর বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের মধ্যে যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাকে যুক্তরাষ্ট্র দাঁতাত এবং রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নামে অভিহিত করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া উভয়ই সহ-অবস্থানের নীতি অনুসরণের দিকে অগ্রসর হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে। তবে এ কথা সত্য যে, স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস মানে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান নয়। যা হোক, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রথম পদক্ষেপ। হলো ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে আংশিক পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধের চুক্তি সম্পাদন। তারা উভয়ই আরও সিদ্ধান্ত নেয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয়, সেদিকে তারা সতর্ক নজর রাখবে। ষাটের দশকে এসে দুই বৃহৎ পরাশক্তি ও তাদের অনুগামীদের বোধোদয় হয় যে, নির্বিচারে অস্ত্র উৎপাদন নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়। ফলে NATO-র সদস্যরা সামরিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পথ পরিহার করে নিজেদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে নজর দেয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা পারস্পরিক বন্ধুত্বের সহায়ক হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলো (ফ্রান্স, ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি) এ নীতি গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ দেয়। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এ ব্যবস্থার সূত্রপাত হলেও সত্তরের দশকে তা ব্যাপকতা ও পরিপুষ্টতা পায়। উল্লিখিত দেশগুলো এ সময় অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ার কাজে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, সাম্যবাদের সম্প্রসারণের ভীতি তাদের বিচলিত করতে পারেনি। ফলে ওয়াশিংটন ও মস্কো যাবতীয় বিরোধ (যেগুলো স্নায়ুযুদ্ধকে পরিপুষ্ট করে) মিটিয়ে ফেলার জন্য আলোচনায় বসাকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। অবশ্য এ সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পারমাণবিক অস্ত্র রোধে বলিষ্ঠ ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যার দরুন উভয় দেশ অস্ত্রোৎপাদনের প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসতে উদ্যোগী হয়। স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টিতে বা জিইয়ে রাখতে বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের রাষ্ট্রপ্রধানদের যেমন একটি ভূমিকা ছিল, তেমনি এর তীব্রতা হ্রাসে বা অবসানে রাষ্ট্রপ্রধানদের দৃষ্টিভঙ্গির একটা ভূমিকা ছিল। সত্তর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এ দশককে আলাপ-আলোচনার দশক বলে অভিহিত করেন। ফলে রাশিয়ার সাথে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়। তারা বুঝতে পারে যে, স্নায়ুযুদ্ধের পেছনে সামরিক অস্ত্রসমূহ উত্তেজনা ছড়ায়। তাই অস্ত্রসমূহ সীমিতকরণে উভয় রাষ্ট্রই রাজি হয়। এ আলোচনা SALT (Strategic Arms Limitation Talks) নামে পরিচিত। পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডের সক্রিয় উদ্যোগে পোল্যান্ডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি কমিউনিস্ট ব্লকের সাথে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ দেখান। ফলে বার্লিনকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, যা স্নায়ুযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল তা অনেকটা কমে যায়। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বলাবাহুল্য, ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রস্থল ছিল জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ। সত্তর দশকের মাঝামাঝি চুক্তি সম্পাদন ও ভাব বিনিময়ের ফলে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে হেলসিংকি সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অনুগামী রাষ্ট্রগুলো সর্বাধিক গোপনীয়তা অনুসরণ করে চলত। বিশেষ করে উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে তারা এড়িয়ে চলত এবং এ কারণে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিত। হেলসিংকি সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সহযোগিতাকে সম্প্রসারিত করার প্রচেষ্টা চালানো হবে এবং সাংবাদিকরা বিনা বাধায় সংবাদ সংগ্রহ করতে পারবেন। এ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপে প্রদত্ত সামরিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সাহায্য কমিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। হেলসিংকি সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে আমেরিকার প্রভাব কমানো।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ পরাশক্তিদ্বয়ের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটা কমে আসে। আশির দশকে সল্ট-টু স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যদিও ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধ আবার নতুন মাত্রা পায়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়ন, কম্পুচিয়ায় সোভিয়েত মিত্র ভিয়েতনামের আগ্রাসন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বর্বর নীতি, নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা বিদ্রোহীদের মার্কিন সাহায্য, 'লিবিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা ইত্যাদি ঘটনা বৃহৎ শক্তিদ্বয়ের মধ্যে পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধ সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
Read more