Fall of Soviet Union
বিংশ শতাব্দীর প্রথম 'দিকে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের উত্থান ইতিহাসের একটি আলোচিত বিষয়। আবার বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কমিউনিজমের পতন একটি বিস্ময়কর ঘটনাও বটে। কমিউনিজমের পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় চার যুগ চলতে থাকা স্নায়ুযুদ্ধেরও অবসান হয়। রাশিয়ায় কমিউনিজমের উত্থান সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া দুষ্কর।
আবার এর পতন বা বিলুপ্তি সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়াও কঠিন। কেননা এটি সাম্প্রতিক বিষয়; সাম্প্রতিক বিষয় বলে এর ইতিহাস এখনো স্থিত হয়নি। এটা সত্য যে, কমিউনিজমের পতনের মধ্য দিয়ে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান হয়। তবে এতে বিশ্ব রাজনীতিতে পুঁজিবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। অর্থাৎ আদর্শগত শক্তি-দ্বন্দ্ব এখন এককেন্দ্রিকতার দিকে ধাবমান।
লেনিনের নেতৃত্বে কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক দর্শনের ভিত্তিতে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৃষ্টি হয় তার যৌবনকাল ছিল স্ট্যালিনের শাসনামল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ক্রুশ্চেভ বা ব্রেজনেভের শাসনামল থেকেই রাশিয়ায় কমিউনিজম নানা কারণে পতনের দিকে ধাবিত হয়।
ভৌগোলিক পরিসীমায় রাশিয়া সাম্রাজ্যের পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালীন পৃথিবীর কমিউনিস্ট (সাম্যবাদী বা সমাজতন্ত্রী) রাষ্ট্রগুলোর মডেল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। মূল চারটি প্রজাতন্ত্র নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের উৎপত্তি হলেও ১৯৫৬-৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ ভেঙে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলে ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ১১টি নিজেদের মধ্যে CIS সৃষ্টি করে। ৩টি বাল্টিক রাষ্ট্র CIS-এ যোগ দেয়নি। CIS-এর পূর্ণরূপ Commonwealth of Independent States, বাংলা অর্থ 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ'। তুর্কমেনিস্তান CIS-এর সহযোগী সদস্য।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসান তথা সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের পতন এবং পরাশক্তির ভাঙনের অনেক কারণ বিদ্যমান। এ কারণসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত: সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের আদর্শ অন্তঃসারশূন্য। সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, দক্ষতা, উৎপাদন প্রভৃতি বিষয়কে প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়। এ আদর্শে বিশ্বাসীকে শিক্ষা দেওয়া হয় যে, তোমরা আদর্শের জন্য কাজ কর, অর্থের জন্য নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া শুধু আদর্শের জন্য কাজ করা ভোগবাদী যুগে মানবচরিত্রের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি প্রজন্মকে এ আদর্শের দ্বারা অর্থাৎ ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে ভবিষ্যৎ সুখ-শান্তির জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় সম্মোহিত করে রাখা সম্ভব, কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সম্ভব নয়। মানুষের জীবনে ভোগই চরম কথা নয়; মানসিক প্রশান্তির জন্য ত্যাগেরও প্রয়োজন পড়ে। এটা মহত্তর। কিন্তু অনেক ত্যাগের পরও যখন দেখা গেল ভবিষ্যৎ সুখ-সমৃদ্ধি দুরাশা, তখন কমিউনিজমে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসে চিড় ধরে। সাধারণ জনগণ, যাদের আন্দোলনের ফসল রুশ বিপ্লব- তারা যখন দেখল নেতৃস্থানীয় পলিটব্যুরোর সদস্যরা ভোগ-বিলাসে জীবন যাপন করছেন; শ্রেণিগত অসাম্য কমিউনিজমের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নেতৃবৃন্দের প্রতি তথা কমিউনিজমের প্রতি তাদের মোহমুক্তি ঘটে। তারা নেতৃবৃন্দকে হিংসার চোখে দেখতে ও ঘৃণা করতে শুরু করে। কমিউনিজম যে ধরনের সুখ-শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা ছয় যুগেও পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বৃহত্তর জনগণ এ আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় যে ধরনের আদর্শ বিরাজ করার কথা ছিল, নেতৃবৃন্দ তা থেকে বিচ্যুত হওয়ায় জনগণের মধ্যে ক্ষোভের উদ্রেক হয়। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় লক্ষ্যসমূহ অর্জনের পথ রুদ্ধ, যা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, ফলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়। কমিউনিস্ট শাসকরা ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখতে ছিলেন বদ্ধপরিকর এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছার নীতি চর্চা করলে জনগণের মনে এ আদর্শ সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে
শুরু করে।
দ্বিতীয়ত: কমিউনিজমের বিপরীত পুঁজিবাদের শক্তিকে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের যথার্থভাবে বুঝতে অক্ষমতা কমিউনিজমের ধ্বংস ডেকে আনে। কমিউনিস্ট আদর্শকে রক্ষার জন্য অবিরাম সতর্ক ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন ছিল। পলিটব্যুরোর নেতৃবৃন্দ তা ভুলে গিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। পুঁজিবাদী শক্তির কমিউনিজমের বিরুদ্ধে অনবরত প্রচারণা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য-সন্ত্রাস সাম্যবাদের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। পুঁজিবাদী শক্তির কূটনীতির সফলতার কাছে রাশিয়ার সাম্যবাদের কূটনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছিল দুর্বল, যা কমিউনিজমের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
তৃতীয়ত: লেনিন বা স্ট্যালিনের শাসনামলে তাদের অবদানের দ্বারা কমিউনিজমে বিশ্বাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে যে কর্মস্পৃহা ও স্বাজাত্যবোধ ছিল তা ক্রুশ্চেভ ও ব্রেজনেভের শাসনামলে হ্রাস - পায়। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপর মতাদর্শ যতই গুরুত্ব পাক জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাবে। ক্রুশ্চেভও ব্রেজনেভের শাসনামলে শাসনব্যবস্থার অসমতা ও শিথিলতার সুযোগে জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ইউনিয়নভুক্ত অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের মানুষের মাঝে সূক্ষ্ম জাতীয়তাবোধ কার্যকর হয়। কমিউনিজমের আদর্শ ইউনিয়নভুক্ত সকলের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রুশরা যে বিশেষ শ্রেণির মর্যাদা পেত, স্লাভ বা ইউক্রেন, বেলারুশের জনগণ সে মর্যাদা পেত না, যা কমিউনিজমের পতনের একটি কারণ।
চতুর্থত: শাসক নেতৃবৃন্দ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণে কমিউনিজমের পতন ঘটে। শাসক শ্রেণির পক্ষপাতিত্ব এবং কমিউনিজমের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করে। সর্বহারা শ্রেণি বা শ্রমিক শ্রেণি থেকে স্ট্যালিনের পর আর সে রকম নেতৃত্ব সৃষ্টি না হওয়ায় কমিউনিজমের আদর্শ এ শ্রেণিকে আকর্ষণ করতে পারেনি।
পঞ্চমত: সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক স্থবিরতা এর বিলুপ্তির কারণ। পুঁজিবাদের প্রচারণার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মতো শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল না। ভারী শিল্পে বেশি গুরুত্বদান, আণবিক গবেষণা ও সমরাস্ত্র নির্মাণে সাধ্যাতীত খরচ রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করে। অপ্রতুল খাদ্য উৎপাদন সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করে এবং তারা পুঁজিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কমিউনিজমের আদর্শকে চাঙ্গা করতে বা ধরে রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না, যা পতনের অন্যতম কারণ।
ষষ্ঠত: বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা যে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা পায়, তা আমলাতন্ত্রের প্রতি অতি নির্ভরশীলতার কারণে বিকৃত রূপ ধারণ করে। ফলে ষাটের দশকের প্রজন্ম এবং নেতৃত্ব পুরনো নেতৃত্বের ত্যাগ-তিতিক্ষার গল্প শুনেছে; কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখতে পায় বিস্তর পার্থক্য। তাই ভোগবাদী আদর্শই তাদের আকর্ষণ করলে তারা কমিউনিজমের আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের বিকৃতি সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির একটি কারণ।
সপ্তমত: কমিউনিজমের আদর্শে আদর্শবান নেতাদের পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির কারণ। মার্কিনিদের ষড়যন্ত্রে নেতৃত্বের একটি অংশ যে জড়িত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় Problems of Communism' জার্নালে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যায় মন্তব্য করা হয়-'উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।' এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ জর্জ কেনানের প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বের ভবিষ্যদ্বাণীটি প্রণিধানযোগ্য, "যদি কখনো কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দলের একতা ও কার্যকারিতায় ভাঙনের সৃষ্টি করে, তবে সোভিয়েত রাশিয়া রাতারাতি অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী থেকে অন্যতম দুর্বল ও শোচনীয় জাতীয় সমাজে পরিণত হতে পারে।" কাজেই সাম্যবাদের উপরিকাঠামো শক্ত হলেও অন্তর্নিহিত কাঠামো ছিল দুর্বল।
অষ্টমত: মিখাইল গর্বাচেভ ও ইয়েলৎসিনের উত্থানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ত্বরান্বিত হয়। উপরিউক্ত কারণগুলোর সামষ্টিক ক্রিয়ায় যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের জনমানুষের আদর্শ কল্পবিলাস, তখন গর্বাচেভের সংস্কার কর্মসূচির দ্বারা তারা অনুপ্রাণিত হয়। বৃহৎ প্রজাতন্ত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের পুনর্গঠনমূলক কর্মসূচি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনকে আরও সহজ করে। এ দুই নেতা পুঁজিবাদের সৃষ্ট কি না তা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং কমিউনিজমে ধস নামার পেছনে কোনো একক কারণকে চিহ্নিত করা দুরূহ ব্যাপার। ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে উপর্যুক্ত কারণগুলোর কোনটি মুখ্য বা কোনটি গৌণ তা বেরিয়ে আসবে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব -প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more