Birth of New States
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে যে সর্বহারা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রভাব রাশিয়ার সীমা ছাড়িয়ে অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে জর্জিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন ও তুর্কমেনিস্তান রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত হয়েছিল। ১৯৪০-৪১ খ্রিষ্টাব্দে বাল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পরবর্তীকালে মলদোভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়। ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্র এর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে গণ্য হতে শুরু করে।
আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এ পরিবর্তন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গর্বাচেভের সংস্কার প্রবর্তনে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ শুরু হলে তা প্রতিহত করার জন্য তিনি গ্লাসনস্ত (স্বাধীন মতামত ও সমালোচনা করার অধিকার) ও পেরেন্দ্রৈকা (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন) কর্মসূচি গ্রহণ করেন। কিন্তু তার উদারনৈতিক কর্মসূচি ভাঙন রোধ করতে পারেনি। যে কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা সোভিয়েত সমাজজীবনে চলছিল, তার প্রতি বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের জনগণ বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে। আস্তে আস্তে সোভিয়েত সমাজব্যবস্থার সমস্ত অংশেই বিক্ষোভ দানা বাঁধে। তার উদারনৈতিক নীতির প্রভাবে প্রজাতন্ত্রগুলোতে জাতিগত সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই কমিউনিজমের বিলুপ্তির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নেরও বিলুপ্তি ঘটে। অর্থাৎ যে কারণগুলোর সামষ্টিক প্রতিক্রিয়ায় সাম্যবাদের পতন ঘটে, প্রায় একই রকম পটভূমিকায় স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভব ঘটে। পেরেস্ত্রৈকা অর্থাৎ অর্থনৈতিক পুনর্গঠননীতি উদারনৈতিকতার সাথে যুক্ত হয়ে প্রজাতন্ত্রগুলোর বিভক্তিকে ত্বরান্বিত করে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও নীতির পরিবর্তন স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভবের প্রধান কারণ।
বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসংগতি ও বৈষম্য কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দুর্বল করেঃte W যা প্রকারান্তরে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভবকে প্রভাবান্বিত করে। । পশ্চিমা ভোগবাদ তাদের আকর্ষণ করে।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তি, বিভ্রান্তি ও শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে প্রজাতন্ত্রের জনগণ ভোগবাদে আকৃষ্ট হয়; অর্থাৎ পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। গর্বাচেভের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচিকে তারা সাদরে গ্রহণ করে এবং ইউনিয়নমুক্ত হওয়ার প্রয়াস নেয়; সফলও হয়। গর্বাচেভের সংস্কারসমূহে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু থেকে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র জনপ্রিয় ফ্রন্ট গঠন করে। রাশিয়ান প্রজাতন্ত্র ফ্রন্টকে সহ্য করার ইঙ্গিত দিলে এতে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করতে সাহসী হয়ে ওঠে। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সেখানকার বিপ্লবের প্রভাবে প্রজাতন্ত্রগুলো অনুপ্রাণিত হয়।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গর্বাচেভের বক্তব্য ছিল 'শান্তির কোনো বিকল্প নেই।' সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২৭তম কংগ্রেসে তিনি বলেন, "বর্তমান দুনিয়া হচ্ছে জটিল, বিচিত্র এবং গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা ও স্ববিরোধিতার দ্বারা বিভক্ত।" আসলে মিখাইল গর্বাচেভ অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার জন্য শান্তি বজায় রাখা জরুরি ছিল। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া তার কোনো বিকল্প ছিল না। তার কর্মকাণ্ড প্রজাতন্ত্রগুলোকে স্বাধীনতা ঘোষণায় অনুপ্রাণিত করে।

ইতিমধ্যে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সর্বব্যাপী প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ হতে শুরু করে। বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাচনে বিভিন্ন দল অংশগ্রহণ করতে ও কমিউনিস্টদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট শোভার্দনাদজে কমিউনিস্ট দলের বাইরে নির্বাচন করেন। ইউক্রেন, বেলারুশ ও লিথুয়ানিয়ায় নির্বাচন কমিউনিস্টদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার সংকেত দেয়। এস্তোনিয়া ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ লিথুয়ানিয়াও স্বাধীনতা
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব
ঘোষণা করে। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের শেষ নাগাদ লাটভিয়া, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। গর্বাচেভ এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণাকে 'অগণতান্ত্রিক উপায়ে বের হয়ে আসা' আখ্যায়িত করেন। তাই শিথিল কনফেডারেশন গঠনের উদ্যোগ নেন এবং প্রজাতন্ত্রগুলোকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু প্রজাতন্ত্রগুলো জাতি-রাষ্ট্র মর্যাদায় বিশ্বাস করত বলে তার উদ্যোগে কেউ সাড়া দেয়নি।
গর্বাচেভের নীতি যেমন কট্টর কমিউনিস্টদের পছন্দ হয়নি, তেমনি দ্রুত উদারনীতি কার্যকর করতে বিশ্বাসী রুশ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনেরও পছন্দ হয়নি। গর্বাচেভ ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে সাধারণ জরুরি স্বার্থবিজড়িত বিষয় (প্রতিরক্ষা, আয়-ব্যয়, নীতিনির্ধারণ) নিয়ে ২০শে আগস্ট গণভোটের ব্যবস্থা করেন। উদ্দেশ্য ছিল ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে শিথিল সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করা। কিন্তু ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে আগস্ট গণভোটের পূর্বদিন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে কট্টর কমিউনিস্টরা নজরবন্দি করে রাখে। যদিও ইয়েলৎসিন ও উদারপন্থি জনগণের সহায়তায় তিনি মুক্ত হন এবং পুনরায় ক্ষমতায় বসেন। কিন্তু আলমা আতার বৈঠকে ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ১১টি নিজেদের মধ্যে শিথিল কনফেডারেশন (CIS) গঠনের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়।
সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা যাদের ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে, তারা বাস্তববাদী ছিলেন। তারা পূর্বে প্রস্তাবিত ইউনিয়ন চুক্তি বাতিল করে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, দেশটি এখন থেকে 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের ইউনিয়ন' বলে অভিহিত হবে, প্রজাতন্ত্রের নয়। ২৪শে আগস্ট ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে ইউক্রেন স্বাধীনতা ঘোষণা করলে শিথিল কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠা আর হয়নি। এর কারণ হলো ইউক্রেনের স্বাধীনতা ঘোষণার দুই সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান ছাড়া বেলারুশ, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান প্রভৃতি প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পশ্চিমা বিশ্ব অতি দ্রুত এদের স্বীকৃতি দিয়ে দেয়। শেষোক্তগুলোর স্বাধীনতা ঘোষণার পেছনে স্থানীয় কমিউনিস্টদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারটি বেশি কাজ করেছে। কাজেই দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পূর্বেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের বিষয়টি চূড়ান্তই ছিল। ইয়েলৎসিন ছিলেন প্রচণ্ড কমিউনিস্টবিরোধী। তিনি খুব দ্রুত সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন করা শুরু করলে সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভাঙন ত্বরান্বিত হয়। ইয়েলৎসিন সুযোগ বুঝে গর্বাচেভের কাঁধে দোষ চাপিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন-প্রক্রিয়াকে চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত করেন। তবে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর ইন্ধন, সহযোগিতায় স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভব তথা কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হয়। বিশ্বের ৭২ বছরের পুরনো একটি পরাশক্তির পতন হয়। ১৫টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে যে ১১টি নিজেদের মধ্যে CIS সৃষ্টি করে, সেগুলো হলো- আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজেস্তান, মলদোভিয়া, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, ইউক্রেন ও উজবেকিস্তান।
লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া CIS-এ যোগ দেয়নি।
CIS (Commonwealth of Independent States)
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ১৫টি রাষ্ট্রের (সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত) মধ্যে ১১টি তাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের তাগিদে নিজেদের মধ্যে যে কনফেডারেশন গঠন করে তার নাম CIS |
CIS ভুক্ত ১১টি রাষ্ট্রের নাম ও স্বাধীনতার তারিখ নিচে প্রদর্শন করা হলো:
| ক্রমিক নং | স্বাধীন দেশের নাম | স্বাধীনতা অর্জনের তারিখ |
| ০১ | আজারবাইজান | ২৩শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০২ | জর্জিয়া | ৯ই মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৩ | রাশিয়া | ১১ই জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৪ | উজবেকিস্তান | ২০শে জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৫ | মলদোভিয়া | ২৩শে জুন, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৬ | ইউক্রেন | ১৬ই জুলাই, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৭ | বেলারুশ | ২৭শে জুলাই, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৮ | তাজিকিস্তান | ২৫শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ০৯ | আর্মেনিয়া | ২৩শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ১০ | কাজাখস্তান | ২৫শে অক্টোবর, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
| ১১ | কিরঘিজস্তান | ১১ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ |
এই ১১টি রাষ্ট্র ছিল CIS-এর পূর্ণাঙ্গ সদস্য।
| ১২ | তুর্কমেনিস্তান | ২২শে আগস্ট, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | সহযোগী সদস্য |
| ১৩ | লিথুয়ানিয়া | ১১ই মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | এ তিনটি বাল্টিক |
| ১৪ | এস্তোনিয়া | ৩০শে মার্চ, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | রাষ্ট্র CIS-এ |
| ১৫ | লাটভিয়া | ৪ই মে, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ | যোগ দেয়নি |
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more