পাঠ-৮.৭: জার্মানির একত্রীকরণ: প্রভাব ও ফলাফল।

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

18

বিশ্ব ইতিহাসে জার্মান সমস্যা এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। জার্মান সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো জাতীয় ঘটনা নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে জার্মান একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজমান থাকলেও বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুগে এর বিভক্তির কারণে সমস্যার উদ্ভব হয়। সংকটের শুরু: হিটলারের নাৎসি বাহিনী পরাজিত হলে জার্মানিতে রাশিয়া ও ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিজোট প্রবেশ করে। মূলত রাশিয়া ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে জার্মানকে কেন্দ্র করে যে মতাদর্শগত স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, সমস্যার শুরুও সেখান থেকেই। সংকটের উদ্ভবে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বক্তব্যকে অনেকেই দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুদ্ধোত্তর যুগে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরাজিত রাষ্ট্রের সাথে কী রকম আচরণ করা হবে তা ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের আটলান্টিক সনদে উল্লেখ ছিল। এতে বলা হয়, প্রত্যেক জাতিরই নিজ পছন্দমতো সরকার গঠনের অধিকার আছে, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু চার্চিল ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে ঘোষণা করেন যে, জার্মানির সাথে আচরণের বৈধ ভিত্তি হিসেবে কোনোভাবেই আটলান্টিক সনদকে ধর্তব্যে নেওয়া যাবে না। এ ঘোষণা থেকেই মূলত মিত্রশক্তিবর্গ (রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র) পরাজিত জার্মানির সাথে আলাদা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। রাশিয়ার সৈন্যবাহিনী জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অবস্থান নেয়। সমগ্র বার্লিনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা রাশিয়ার সেনাধ্যক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। মিত্রশক্তির অন্য সদস্যরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রয়াস নেয়। মোটকথা, জার্মানি চতুর্শক্তির দ্বারা চার ভাগে ভাগ হয়ে শাসিত হতে থাকে। ফলে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য 'মিত্রপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ কমিশন' গঠন করা হয়। জার্মানির পশ্চিমাংশকে মিত্রত্রয় (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ত্রিপক্ষীয় এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এদের আশঙ্কা ছিল, বার্লিনের পূর্বাংশে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকায় সেখানে যেভাবে সাম্যবাদের আদর্শ প্রসারিত হচ্ছে, তা পশ্চিমাংশেও প্রবেশ করতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জার্মানির গুরুত্ব বিজিত সকল শক্তির কাছে সমান ছিল। মিত্রশক্তি জোটের শক্তিত্রয় বার্লিনের পশ্চিমাংশে মুদ্রাব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন মুদ্রা মার্ক চালু করলে বার্লিনকেন্দ্রিক স্নায়ুযুদ্ধ রাশিয়ার সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাশিয়াও সমগ্র বার্লিনে মুদ্রাব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিলে জার্মান সংকট আরও জটিল হয়।

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সোভিয়েত দখলকৃত পূর্বাংশে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলসমূহ ও শ্রমিক সংঘকে রাজনীতি করার অনুমোদন দেওয়া হয়। পাঁচটি রাজ্য সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়; ১১টি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। ১৯৪৬-৪৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পাঁচটি রাজ্য তাদের নিজ নিজ শাসনতন্ত্র রচনা করে। পশ্চিমাংশেও রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমোদন ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়া হয়। পশ্চিমাংশে ১৯৪৫-৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে অনেকগুলো রাজ্য গঠিত হয় এবং সেগুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে জয়ী গণতান্ত্রিক দল নিয়োগকৃত সরকারের স্থলাভিষিক্ত হয়। উভয় অঞ্চলে একই রকম অর্থনৈতিক নীতি সম্পাদনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রস্তাব রাশিয়া অগ্রাহ্য করলে জার্মানির মার্কিন ও ব্রিটিশ গভর্নর 'দ্বি-অঞ্চল চুক্তি' স্বাক্ষর করেন। সোভিয়েত তার দখলকৃত অঞ্চল পূর্বাংশে জার্মান অর্থনৈতিক কমিশন গঠন করে। ফলে জার্মান সংকট জটিলতর হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনতান্ত্রিকভাবে জার্মানি বিভক্ত না হলেও বাস্তবে জার্মানি ছিল মিত্রশক্তির দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন একটা উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঞ্চল। শাসনতান্ত্রিকভাবে জার্মানি বিভক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জুন অনুষ্ঠিত লন্ডন ইশতেহারের সুপারিশের ভিত্তিতে। পশ্চিমাঞ্চলের সামরিক গভর্নররা ১১টি রাজ্যের শাসকদের কাছে ফ্রাংকফুর্ট দলিলপত্র হস্তান্তর করেন। এতে গণপরিষদ গঠনের ফর্মুলা ও দখলদার বিধিসংক্রান্ত বিষয়ের উল্লেখ ছিল। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় পরিষদ নির্বাহী কমিটির 'মৌলিক আইন' স্থির করে। বন হয় পশ্চিম জার্মানির রাজধানী। পশ্চিমাংশের শাসনতান্ত্রিক নাম হয় জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্র (Federal Republic of Germany), সংক্ষেপে এফআরজি। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের শাসনতন্ত্র পশ্চিম জার্মানিকে সামরিক দখলদারিত্বের কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি দেয়। যদিও এফআরজি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে।

এদিকে সোভিয়েত অধিকৃত অঞ্চলে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সমাজতান্ত্রিক একতা দল (Socialist Unity Party) সোভিয়েত সামরিক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। একতা দল 'জার্মান জনগণের কংগ্রেস' গঠনের আহ্বান জানায়। এ লক্ষ্যে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। পূর্বাংশের রাজধানী হয় বার্লিন এবং দেশের শাসনতান্ত্রিক নামকরণ করা হয় জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (German Democratic Republic), সংক্ষেপে জিডিআর, যা ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কার্যকর হয়।
পশ্চিমাংশের ফেডারেল সরকার সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কাজ শুরু করলেও সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত জিডিআর-এর শাসনকার্যে সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায়।

জার্মানির একত্রীকরণের বিভিন্ন পর্যায়

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দুটি জার্মান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝিতে তারা পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্ব লাভকরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরাজিত জার্মানবাসী পুরনো জাতীয় একতার চেতনাকে সব সময় লালন করে এলেও উভয় শক্তির মতদ্বৈধের কারণে একত্রীকরণ-প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। পুনরেকত্রীকরণের মূলনীতিতে বিশ্বাসী ছিল বলেই পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সরকার একে অন্যকে স্বীকৃতি দিতে রাজি ছিল না। জার্মান ঐক্যের সমস্যার মূলে ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যকার পারস্পরিক অনাস্থা, অবিশ্বাস ও ভীতি। ঐক্যবদ্ধ জার্মানি যদি পশ্চিমা জোটে যোগ দেয় অথবা রাশিয়ার সাথে জোট বাঁধে, তবে ইউরোপের শক্তি-সাম্য বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এটাই ছিল তাদের পারস্পরিক সন্দেহ ও ভীতির মূল কারণ।

প্রথম পর্যায়: জার্মান ঐক্যের সমস্যাকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবমুক্ত করার জন্য ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া প্রস্তাব করে যে, জার্মানি থেকে সকল বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা কর্তব্য। এ প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান ঐক্যসংক্রান্ত অনেকগুলো দাবি পরস্পর কর্তৃক গৃহীত হলেও দুই জার্মানিকে সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়নি। কেননা রাশিয়া এ সময় পূর্ব জার্মানিকে পৃথক স্বীকৃতির দাবি তোলে। পৃথকভাবে পূর্ব জার্মানি স্বীকৃতি পেলে ঐক্যপ্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হতো।
দ্বিতীয় পর্যায়: জার্মান ঐক্যের ব্যাপারে পরিস্থিতি জটিল হলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ বাড়তে থাকে। এ সমস্যার সমাধানের সহজ পথ ছিল শক্তি-দ্বন্দ্ব পরিহার করে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া। পোল্যান্ড এ সময় জার্মানি ও মধ্য ইউরোপকে আণবিক অস্ত্রবর্জিত এলাকা হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করে। পশ্চিম জার্মানি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র 'পাসিং টু' গ্রহণ করলে দুই জার্মানির ঐক্যের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ন্যাটোর সাথে পশ্চিম জার্মানি ও ওয়ারসোর সাথে পূর্ব জার্মানি জোটবদ্ধ হয়। উভয় সামরিক সংস্থা ইউরোপের নিরাপত্তার স্বার্থে পরস্পর অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করলে জার্মানির ঐক্যের পথ সুগম হতো।

তৃতীয় পর্যায়: ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে উভয় জার্মানির শাসকদ্বয় (পশ্চিমের চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ড, পূর্বের প্রধানমন্ত্রী উইলি স্টুপ) সাক্ষাতে সম্মতি দিলে জার্মান ঐক্যের সম্ভাবনা দেখা দেয়। পারস্পরিক সংযুক্তির আকাঙ্ক্ষা তীব্র হওয়ায় রাশিয়ার 'লৌহ যবনিকা' জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। পূর্ব জার্মানির প্রেসিডেন্ট এরিক হোয়েনকার সংযুক্তির বিরোধী ছিলেন বলে তাকে অপসারণ করা হয়। পশ্চিমের প্রতি পূর্ব জার্মানির মানুষের আকর্ষণ এত বেশি ছিল যে, কয়েক হাজার মানুষ পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাড়ি জমায়। বহির্গমন রোধকল্পে সোভিয়েত পরামর্শে বার্লিন প্রাচীর দেওয়া হয়, যা জার্মান ঐক্যের প্রশ্নে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। ঐক্যের ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা চললেও পরাশক্তিগুলোর মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তা বিলম্বিত হয়। দুই পরাশক্তির মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ও ঝুঁকি নিতে অপারগতাই দুই জার্মানির ঐক্যপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে।

চতুর্থ পর্যায়: পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টিতে এ সময় সংস্কারবাদী নেতা মডারোকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভের আবির্ভাবে সমাজতন্ত্রের সংশোধনকল্পে যে সংস্কারনীতি গ্রহণ করা হয়, তা পূর্ব ইউরোপীয় বিপ্লবকে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে ধাবিত করে। জার্মান বিভক্তির প্রতীক বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হলে দুই জার্মানির ঐক্যের পথে প্রধান বাধা দূর হয়। সীমানাসংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে আরও এক বছর লাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সীমারেখাই ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সীমারেখা হবে বলে স্থির হয়।

পঞ্চম পর্যায়: ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে পূর্ব জার্মানিতে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে যে নির্বাচন হয় তাতে জার্মানির দ্রুত ঐক্যের পক্ষপাতী রক্ষণশীল দলগুলোর মৈত্রী জোট জয়লাভ করলে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় গতি আসে। কিন্তু জার্মানির একত্রীকরণের জন্য প্রয়োজন ছিল চতুর্শক্তির ঐকমত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া এই চতুর্শক্তি ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে মস্কোতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ঐক্যবদ্ধ জার্মানি গঠনে তাদের মতামত ব্যক্ত করে। এই চুক্তিতে দুই জার্মানির প্রতিনিধিরাও স্বাক্ষর প্রদান করেন। ফলে জার্মানির একত্রীকরণে আর কোনো বাধা থাকল না। এই চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।"

কাজেই দেখা যায়, জার্মানির একত্রীকরণে জার্মানিবাসীর ঐকান্তিকতা ও আগ্রহের কমতি ছিল না। বৃহৎ শক্তিগুলোর শক্তি-দ্বন্দ্বের কারণে জার্মানির একত্রীকরণ বিলম্বিত হয়। বিলম্ব হলেও জার্মান আজ একটি জাতি, একটি রাষ্ট্র, যার বর্তমান নাম Republic of Germany.

প্রভাব ও ফলাফল

বার্লিন প্রাচীরের অবসান ও জার্মানির একত্রীকরণের তাৎক্ষণিক প্রভাব ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে লক্ষণীয়। তবে সুদূরপ্রসারী ফলাফলের প্রভাব ভবিষ্যৎ ইউরোপের রাজনীতিতে আরও বেশি পরিমাণ দৃশ্যমান হবে।

প্রথমত: জার্মানি একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের শক্তিরূপে জার্মানি এখনো আত্মত্মপ্রকাশ করতে না পারলেও নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপের এবং বিশ্বের একটি শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। তবে সামরিক দিক দিয়ে ইউরোপের প্রথম শক্তি জার্মানি এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সে এখন - বিশ্বের তৃতীয় শক্তি, যা জার্মানি একত্রীকরণের একটি তাৎক্ষণিক ফল।
দ্বিতীয়ত: এককালের একঘরে জার্মানি আজ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় অবদান রেখে বিশ্বের মূল শক্তিধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, যা জার্মানির একত্রীকরণের ফলেই সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে জার্মানির অবস্থান বর্তমানে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরে।

তৃতীয়ত: সমীক্ষকদের ধারণা, জার্মানির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নপ্রক্রিয়া অব্যাহত ও স্থিতিশীল থাকলে আগামী দশকে জার্মানি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পরাশক্তিগুলোর মাঝে অবস্থান নেবে; যা জার্মানি একত্রীকরণের একটি ইতিবাচক সাফল্য।
চতুর্থত: জার্মানির একত্রীকরণের ফলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিরাজমান শক্তি-জোটের প্রতি আবার হয়তো সামরিক হুমকির কারণ হতে পারে।
পঞ্চমত: জার্মানির একত্রীকরণ ইউরোপের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশ্ব শক্তি কাঠামোকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে আন্দোলিত করছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভের চেষ্টা জার্মানি ইতিমধ্যে ব্যক্ত করেছে। জার্মানি ছিল একসময় ইউরোপের পরাশক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপূরণীয় ক্ষতি পুষিয়ে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে আবার অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়। মিত্রশক্তির কূটকৌশলের ও শক্তিদ্বন্যের ফলে জার্মানি বিভক্ত হলেও ঐক্যবদ্ধ জার্মানি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কেননা, জাতি-রাষ্ট্র জার্মানদের রয়েছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা। তাদের দেশপ্রেমে ও জাতীয়তাবোধে রয়েছে ঐক্যের সূর। তাই তারা শক্তিশালী শক্তিবর্গের দ্বারা নির্মিত বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। অতীত অভিজ্ঞতাই বলে দেয়, জার্মানি আবার ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান অচিরেই জানান দেবে।
জার্মানির এ সম্ভাব্য শক্তিকে সঠিক পথে ব্যবহার ও পরিচালিত করতে বিশ্বের বৃহৎ শক্তি যদি সহযোগিতা দেয়, তবে জার্মানির উন্নয়ন যেমন গতিশীল হবে, তেমনি সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নে সহায়ক হবে।

প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা

Explanation of Key Words

সিআইএস (CIS): সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সংস্থা CIS। এর পূর্ণরূপ
Commonwealth of Independent States. এটি গঠিত হয় ২১শে ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে। সদস্যসংখ্যা '১২। এর সদস্য দেশ হলো রাশিয়া, আজারবাইজান, ইউক্রেন, বেলারুশ, মলদোভিয়া, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও জর্জিয়া। সংস্থাটির সদর দপ্তর বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে অবস্থিত।

কনফেডারেশন: কতগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র একত্রিত হয়ে কোনো সংস্থা গঠন করলে তাকে কনফেডারেশন বলে। স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ফলে শিথিল কনফেডারেশন গঠিত হয়।

কমনওয়েলথ: কমনওয়েলথ হলো সাবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত স্বাধীন ও আশ্রিত দেশসমূহ নিয়ে গঠিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগঠন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার প্রতীকী প্রধান ব্রিটেনের রানি। এর সদর দপ্তর মার্লবোরো হাউস, লন্ডন। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার কমনওয়েলথ দিবস পালিত হয়। এই সংস্থার সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতের পদবি হাইকমিশনার। সংস্থাটির বর্তমান সদস্য দেশ ৫৩টি।

ভোগবাদ: ভোগবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ, যার দ্বারা পশ্চিমা বিশ্বের (পুঁজিবাদী বিশ্বের) জীবনব্যবস্থার কতিপয় দিক বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। মূলত অতিনিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদী) দর্শনের চাপে পিষ্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ ভোগবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে। সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের এরূপ অত্যধিক ভোগবাদী মানসিকতার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন তড়িত গতিতে ভেঙে পড়ে।

স্যাটেলাইট স্টেট: যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবাধীন অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রই স্যাটেলাইট স্টেট। এসব দেশ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিনির্ধারণের জন্য শক্তিশালী দেশের প্রতি অনুগত থাকে।

হেলসিংকি সম্মেলন: হেলসিংকি সম্মেলন বস্তুত পূর্ব ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সংলাপ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বহুজাতিক ফোরাম তৈরিতে সহায়তা করে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ফলে উক্ত সম্মেলনই নব্বইয়ের শুরুর দিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তা Organization for Security and Co-operation in Europe হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

অক্টোবর বসন্ত: সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিনের শাসনামলের পর পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে উদারনীতির সরকার ক্ষমতায় আসে। পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট দল এ সময় স্বাধীনচেতা উদারনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হতো। পোল্যান্ডের রাজনীতির ক্ষেত্রে এ উদার মনোভাবকে অক্টোবর বসন্ত বলা হয়

সংহতি আন্দোলন (Solidarity Movement): পোল্যান্ডের জাহাজ শ্রমিক নেতা লেস ওয়ালেসার নেতৃত্বে স্বাধীন শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন বিভিন্ন দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করে সেটিই সলিডারিটি আন্দোলন। শ্রমিকদের রাজনৈতিক দলের নাম Solidarity এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনের নাম হয় সলিডারিটি আন্দোলন বা সংহতি আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল দাবি ছিল- কৃষকদের প্রতি অবহেলা করা যাবে না। সোভিয়েত বলয় থেকে পোল্যান্ডকে মুক্ত করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল। তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল পোল্যান্ডকে আর্থসামাজিক সংকট থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা।

বলকান অঞ্চল: বলকান অঞ্চল বলতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বোঝায়। এর পূর্বে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। বলকান অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৫,৫০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এ অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি লোকের বাস। বর্তমানে বলকান অঞ্চলে ১১টি রাষ্ট্র অবস্থিত। রাষ্ট্রগুলো হলো- আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, বুলগেরিয়া, মন্টিনেগ্রো, গ্রিস, ম্যাসিডোনিয়া, সার্বিয়া, মলদোভিয়া, রুমানিয়া ও স্লোভেনিয়া।

পটসডাম চুক্তি: ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির পটসডামে চার্চিল, ট্রুম্যান ও স্ট্যালিনের মধ্যে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাই ঐতিহাসিক পটসডাম চুক্তি নামে পরিচিত। পটসডাম চুক্তিতে জার্মান অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, কোনিগসবার্গ শহর সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডে অবস্থিত জার্মানদের জার্মানিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।

বার্লিন প্রাচীর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী মিত্রপক্ষ পরাজিত জার্মানিকে নিজেদের মধ্যে ৪ ভাগে ভাগ করে নেয়। সে হিসাবে জার্মানির পূর্বাংশে প্রতিষ্ঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নকেন্দ্রিক সমাজতান্ত্রিক শাসন আর পশ্চিমাংশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শাসন। পুঁজিবাদী শাসনের প্রভাবে পশ্চিম জার্মানিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে। পক্ষান্তরে পূর্ব জার্মানিতে কমিউনিস্ট শাসনের সমতার শৃঙ্খলাজনিত কঠোরতার কারণে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গড়ে ওঠেনি। ফলে পূর্ব জার্মানিবাসী পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পশ্চিম জার্মানিতে পাড়ি দেওয়ার জন্য বার্লিনের দিকে ধাবিত হয়। এ বহির্গমন রোধকল্পে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শে পূর্ব জার্মানির GDR (German Democratic Republic) সরকার পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে একটি কংক্রিটের দেয়াল তৈরি করে। ইতিহাসে এ দেয়ালই বার্লিন প্রাচীর নামে খ্যাত, যা ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ও ১৩ই আগস্ট মধ্যরাতে নির্মাণ করা হয়। এ প্রাচীরটি ছিল সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিভাজনরেখা এবং জার্মান জাতির বিভক্তির প্রতীক। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর জার্মান জাতির বিভক্তির প্রতীক বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়।

অনুগ্রহ রাষ্ট্র: পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে (পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া) সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত ছিল বিধায় এ রাষ্ট্রগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের 'অনুগ্রহ রাষ্ট্র' বলা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এসব রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের প্রভাব ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...