পাঠ-৯.২: বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পৃথিকৃৎ (নির্বাচিত) মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, ডেসমন্ড টুটু।

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

20

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎদের কর্মপন্থায় ভিন্নতা থাকলেও সবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শোষণ থেকে বর্ণবিদ্বেষী আইন দূর করা। নরগোষ্ঠীগত বিভেদ দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। মহাত্মা গান্ধী, ডেসমন্ড টুটু ও নেলসন ম্যান্ডেলা আফ্রিকাকেন্দ্রিক বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা। মার্টিন লুথার কিং-এর আন্দোলনের ক্ষেত্র ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কর্মের দ্বারা আজ তারা বিশ্বের শ্রদ্ধেয় ও বরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাদের কর্ম ও দর্শন তাদেরকে এক-একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ।
Mahatma Gandhi 1869-1948

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবর বর্তমান গুজরাটের অন্তর্গত সমুদ্রতীরবর্তী কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন। আত্মার উদারতার জন্যই তিনি 'মহাত্মা' নামে খ্যাতি লাভ করেন। তার পিতার নাম করমচাঁদ গান্ধী এবং মায়ের নাম পুতলি বাঈ। তিনি পিতামাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তার পিতামাতা উভয়েই ছিলেন আচারনিষ্ঠ হিন্দু; মা ছিলেন পাপনাথী সম্প্রদায়ের অনুগামী। তারা সর্বধর্মের সংমিশ্রণে বিশ্বাসী ছিল।

পোরবন্দরের পাঠশালায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মোহনদাসের সাত বছর বয়সে পিতা স্থানান্তরিত হয়ে সপরিবারে রাজকোটে চলে আসেন।' এখানের প্রাথমিক স্কুল শেষ করে রাজকোটের তালুক বিদ্যালয়ে এবং পরে কাথিয়াবাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। প্রবেশিকা পাস করে তিনি সমলদাস কলেজে কিছুদিন পড়ালেখা করেন। এ সময় উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি লন্ডন যেতে আগ্রহী হয়ে উঠলে তাকে লন্ডন পাঠানো হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডনে যান এবং ইনার টেম্পল কলেজ থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার পিতা তাকে কস্তুরী 'বাঈয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। তিনি চার ছেলেসন্তানের জনক হন। তারা হলেন- হরিলাল, মনিলাল, রামদাস ও দেবদাস।

তার কর্মজীবন

দেশে ফিরে এসে তিনি বোম্বাই হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। মৃদুভাষী ও লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় এবং দৃঢ় নৈতিক মনোভাবের জন্য আইন পেশায় তিনি জমাতে পারেননি। 'দাদা আব্দুল্লাহ কোম্পানি'র এক মামলা লড়ার জন্য ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় যান।" দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যই তাকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতকায় ব্রিটিশ সরকারের অশ্বেতকায়দের প্রতি বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি তার বিবেককে পীড়া দেয়। উল্লেখ্য, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা ১৮৬০-৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রেলপথ নির্মাণে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারত থেকে শ্রমিক আমদানি করে। সে সূত্রেই ভারতীয়রা আফ্রিকায় অভিবাসী হয়। সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় অভিবাসীরা এবং তিনি নিজেও বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। বর্ণবৈষম্য এত প্রকট ছিল যে, তাকে তারা কুলি ব্যারিস্টার বলে ডাকত। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তারা কুলি বেপারী বলত। কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয়দের প্রতি পশুর মতো আচরণ করত। তারা রাস্তায় ফুটপাতে হাঁটতে পারত না, রেলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে হতো, হোটেলে ঢুকে খাবার খেতে পারত না। স্বদেশি এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এ আচরণ দেখে, মহাত্মা গান্ধী প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।

আব্দুল্লাহ শেঠের মামলার কাজে একবার তিনি প্রিটোরিয়া যাওয়ার জন্য রেলের প্রথম শ্রেণির যাত্রী হিসেবে যাত্রা করেন। রাত ৯টায় ট্রেন ম্যারিজবুর্গ স্টেশনে এসে থামলে এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রী গাত্রবর্ণ শ্যামলা দেখে তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে যেতে বললে তিনি প্রতিবাদ করেন। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে স্টেশনে মালপত্রসহ গলাধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ অপমান তাকে খুব বিচলিত করে। পরে রেল . ম্যানেজারের সহায়তায় প্রিটোরিয়া পৌছেন। বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করবেন। তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। নাটালের বৃহৎ সভায় নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস নামে ভারতীয়দের জাতীয় সমিতি গঠিত হয়। গান্ধী হন এ সমিতির সভাপতি। মহাত্মা গান্ধী পেশা ও আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি কিছু লেখালেখি করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'সত্যের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার গল্প' (The Story of My Experiments With Truth)। তাছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম নিয়ে লেখা 'দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ' (Satyagraha in South Africa), স্বাধিকার বিষয়ে ম্যানিফেস্টো 'হিন্দি স্বরাজ' (Hind Swaraj or Indian Home Rule) ইত্যাদি। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকার গান্ধীর রচনাবলি একত্রিত করে (The Collected Works of Mahatma Gandhi) প্রকাশ করে। এই রচনাবলি প্রায় শতাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হয় এবং প্রায় ৫০,০০০ পাতা আছে। এই রচনাবলি ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

আন্দোলনের সূত্রপাত

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার 'এশিয়াটিক ল অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স', যা ভারতীয়দের কাছে The Black Act' বা কালো আইন নামে পরিচিত, পাস করলে এ ঘৃণ্য আইন বাতিলের জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প নেন। এ আইনে বলা ছিল, ট্রান্সভালের ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা ঐ দেশে বাস করতে হলে নাম রেজিস্ট্রি করে সনদ নিতে হবে। পুলিশকে রেজিস্ট্রেশন সনদ দেখাতে না পারলে জরিমানা ও জেল হবে। গান্ধী এ ঘৃণ্য আইন রদ করার জন্য ব্রিটেনে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আপত্তি জানান। কাজ না হওয়ায় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও বর্ণবাদের শিকার ভারতীয়দের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নতুন করে অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। আফ্রিকায় বসবাসকারী আড়াই লক্ষ ভারতীয়কে সুসংগঠিত করে আন্দোলনের নতুন নাম দেন 'সত্যাগ্রহ আন্দোলন'। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আগ্রহ থেকে এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল বিধায় এর নাম সত্যাগ্রহ আন্দোলন। শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদী নীতি ও স্বতন্ত্র সহাবস্থাননীতির বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল, সত্যাগ্রহীরা অন্যায্য, অগ্রহণযোগ্য আইন না মানার সংকল্প নেয়। আন্দোলন হবে অহিংস, প্রতিশোধের নয়। বর্ণবাদবিরোধী এ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূত্রে গান্ধী সর্বপ্রথম বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিশ্ববাসীর নিকট সমাদৃত হন। ভারতীয়দের সম-অধিকারের জন্য আইন অমান্য আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। ব্রিটিশ 'সরকার তাকে কয়েকবার কারারুদ্ধ করলেও তার সংগ্রামের ফলে বর্ণবাদী সরকার ভারতীয়দের অধিকার সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করে। দীর্ঘ আট বছর পর তার আন্দোলনের সফলতা আসে। রাজনৈতিক বিদ্রোহ হিসেবে সত্যাগ্রহ আন্দোলন ছিল অপরিসীম শক্তিশালী ও কার্যকর।

গান্ধীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে ফেরেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতায় তখন ভারতের আবহাওয়া উত্তপ্ত, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে এসে তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী অধিকার রক্ষা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করেন। একখানা কমদামি ছোট ধুতি ও ছোট শার্ট পরে রেলের তৃতীয় শ্রেণিতে চড়ে সারা ভারত চষে বেড়ান। তিনি জাতীয়তাবাদকে গণমানুষের জন্য একটি বাস্তব ও বোধগম্য মতবাদে পরিণত করেন। তার জীবন যে শুধু ঘটনাবহুল তা নয়, বহু রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ আন্দোলন, ভারতে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, লবণ করের বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া লন্ডনে

অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও ইংরেজ শাসনের উচ্ছেদের ব্যাপারে তার ভূমিকা অনন্য। ভারতে 'রাওলাট বিল-১৯১৯'-কে কেন্দ্র করে গান্ধী নির্যাতনমূলক এ আইনের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেন। এ আইনে যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচার ও বিনা বিচারে আটকের ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশ সরকার বর্বরোচিত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি অহিংস সাধনা করলেও প্রাণ দিতে হয়েছিল হিংস্র প্রকৃতির আরএসএস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ)-এর এক উগ্রপন্থি শিখ নথুরাম গডসের হাতে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি তার জীবনাবসানে পৃথিবী হারায় মানবতার মুক্তির এক বিশ্বনেতাকে। তিনি ছিলেন ভারতবাসীর বাপু ও জাতির পিতা। মানুষ শ্রদ্ধাভরে তাকে ডাকত 'বাপুজি'।

মার্টিন লুথার কিং (১৯২৯-১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)
Martin Luther King 1929-1968

মার্টিন লুথার কিং ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি আমেরিকার মন্টগোমারি আটলান্টা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার ধর্মযাজক বাবার নাম ছিল মাইকেল কিং এবং ধর্মযাজক দাদার নাম ছিল রেভারেন্ড ডেনিয়েল; যিনি বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে NAACP (National Association for the Advancement for Coloured People) গঠন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এ সংগঠনের মাধ্যমেই মার্টিন লুথার কিং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার বাবা তার ছয় বছর বয়সে প্রকৃত নাম মাইকেল কিং পরিবর্তন করে জার্মানির ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সংস্কারক মার্টিন লুথার কিং-এর সম্মানে এরূপ নামকরণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, ধীর এবং অনুভূতিপ্রবণ। স্বাভাবিক চেতনা জন্ম নিতেই বুঝতে পারেন চারপাশের প্রতিবেশে কালোদের প্রতি শুধু ঘৃণা আর বৈষম্য। ট্রামে-বাসে, পথে-ঘাটে, স্কুলে, চাকরিতে সর্বত্র শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য; কালোদের বঞ্চনা।” নিগ্রো হওয়ায় তিনি সাদাদের স্কুলে পড়তে পারেননি। অত্যন্ত মেধাবী কিং দার্শনিক থেরোর লেখায় প্রভাবান্বিত হন। ১৫ বছর বয়সেই গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করার পর ধারাবাহিকভাবে ব্যাচেলর ও ধর্মতত্ত্বের উপর পিএইচডি ডিগ্রি নেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ডেক্সটার ব্যাপটিস্ট চার্চের ধর্মযাজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। যাজক জীবনে বাবার বন্ধু 'হাওয়ার্ড থারম্যানের' সান্নিধ্যে আসেন। তার সাহচর্যে এসেই তিনি জানতে পারেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে। দার্শনিক থেরো, বাবার বন্ধু থারম্যান এবং গান্ধীর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তিনি নিগ্রোদের প্রতি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। দাদার প্রতিষ্ঠিত NAACP-এর সভাপতি এবং খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সংগঠন AIM-এর সভাপতি হলে তার প্রতিবাদী কণ্ঠ আরও জোরালো হয়। তার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল নিগ্রোদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, কালোদের সর্বত্র প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মন্টগোমারিতে বাস ভ্রমণকেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। যাস ধর্মঘটকারীদের দাবি ছিল-১২ (১) বাসে নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্য দূর করতে হবে। (২) বাসে যে আগে
উঠবে সে আগে বসবে। (৩) নিগ্রোদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করতে হবে। (৪) নিগ্রো এলাকা দিয়ে চলাচলকারী বাসে নিগ্রো ড্রাইভার নিয়োগ করতে হবে l

কর্তৃপক্ষ দমননীতি চালিয়েও আন্দোলন দমাতে পারেনি। এক বছর (১৯৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) বাস ধর্মঘট চলার. পর কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়; সুপ্রিম কোর্ট বাসের বর্ণবৈষম্যকে সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করেন। এ জয়ের পেছনে কিং-এর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কৃষ্ণাঙ্গদের দাবির পক্ষে ধীরে ধীরে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। সরকার (প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার) তাকে ও অন্য কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের হোয়াইট হাউসে আলোচনায় ডাকে। আলোচনা ফলপ্রসূ হলো না। দেশের শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী আচরণ 'ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। কিং দেশময় চষে বেড়ালেন। তার বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিগ্রোরা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করল। নিগ্রো খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরা তার সমর্থনে এগিয়ে এলেন। তিনি আমেরিকার কালো মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলেন। শ্বেতাঙ্গরা নিগ্রোদের অহিংস আন্দোলনে হিংস্র আচরণ করতে শুরু করল। সরকারের কঠোর দমননীতি দেখে কিছু কিছু কৃষ্ণাঙ্গ নেতা তাকে অহিংস আন্দোলনের পথ পরিহার করে সহিংস আন্দোলন পরিচালনার পরামর্শ দেন। তিনি তাতে সাড়া দেননি। এ পর্যায়ে তিনি ধর্মযাজকের কাজে বেশি মনোযোগী হন। তার কাছে ধর্ম ছিল মানবমুক্তির একটা পথ। আন্দোলন আবার চাঙ্গা হয় আটলান্টা প্রদেশের একটি বিখ্যাত ক্যান্টিনে খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে। ঐ ক্যান্টিনে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার ছিল না। যদিও ইতিমধ্যে কিং-এর আন্দোলনের ফলে প্রায় সব প্রদেশেই কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররা শ্বেতাঙ্গদের সাথে একসাথে খাবার খাওয়ার অধিকার পেয়েছিল। কিং ৭৫ জন ছাত্রকে সাথে নিয়ে ঐ ক্যান্টিনে প্রবেশ করে খাবার চাইলে তার অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি। বরং শান্তিভঙ্গের অভিযোগে তাকেসহ কিছু ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। কেনেডির অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি গান্ধীর ন্যায় অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেন। কিংকে সাধারণ - নাগরিকদের খেপিয়ে তোলার অভিযোগে বন্দি করা হয়। এতে কৃষ্ণাঙ্গরা আরও সংঘবদ্ধ হয় এবং বিভিন্ন স্থানে হিংসাত্মক কার্যক্রম শুরু করে। স্কুলে বর্ণবৈষম্য প্রথা তুলে নিতে সরকার বাধ্য হয়। প্রতিবাদে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুল ফেডারেলে বোমা ফাটালে বহু হতাহত হয়।

শান্তি আর সত্যের পথে অবিচলিত কিং দেশজুড়ে ফ্রিডম মার্চ শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ওয়াশিংটনের দিকে পদযাত্রা শুরু করে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালে সমবেত হয় প্রায় আড়াই লক্ষ কালো মানুষ। এদিন ছিল আমেরিকা থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির শতবর্ষ পূর্তি। এটা ছিল এক শান্তি প্রতিবাদ সমাবেশ। এদিন মার্টিন লুথার কিং তার ঐতিহাসিক ভাষণ 'I have a dream' প্রদান করেন। সাদা-কালো ভেদাভেদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তার প্রতিবাদী কণ্ঠ। তার ভাষণে তিনি বলেন, "আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জাগবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানেরা- ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসবে। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে, যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয়, তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।" এ ভাষণের পর টাইম পত্রিকা তাকে বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পুরস্কৃত করে। শুধু আমেরিকায় নয়, বিশ্বে তিনি মানবতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। জার্মানি তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী হন। তার নেতৃত্বে নিগ্রোদের মানবাধিকার আন্দোলন বিশ্বের সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রেসিডেন্ট জনসন কৃষ্ণাঙ্গদের বহু দাবি স্বীকার করে নেন। ভিয়েতনাম। যুদ্ধে মানবতা বিপর্যস্ত হতে দেখে তিনি যুদ্ধবিরোধী পদযাত্রার আহ্বান জানান। দারিদ্র্য নির্মূলের দাবিতে আবার ওয়াশিংটন অভিমুখে পদযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে মেমপিস রাজ্যে নিগ্রো পৌর কর্মীরা শ্বেতাঙ্গদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধার জন্য আন্দোলন শুরু করলে তিনি সেখানে ছুটে যান। কর্তৃপক্ষ দাবি না মানায় শহরজুড়ে দাঙ্গা-লুটপাট শুরু হয়। অনেকে হতাহত হয়। ৩রা এপ্রিল ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সহকর্মীরা তাকে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অকুতোভয় লুথার কিং তা অগ্রাহ্য করেন। সকলকে হিংসা ত্যাগের আহ্বান জানান। পরদিন ৪ঠা এপ্রিল লরেইন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থি যুবক জেমস আর্ল রে'র গুলিতে তিনি মারা যান। তখন তার বয়স মাত্র ৩৯ বছর। গান্ধীর মতো অহিংসতায় বিশ্বাসী হলেও গান্ধীর মতোই তাঁকে হিংস্রতার বলি হতে হয়

নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ)
Nelson Mandela 1918-2013

দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের মুক্তির অগ্রদূত, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন রোলিহালালা ম্যান্ডেলা ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকিতে মভেজো গ্রামে থেদু রাজবংশের ক্যাডেট শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তার দাদা ছিলেন মভেজো গ্রামের থেমু জাতিগোষ্ঠীর রাজা। ম্যান্ডেলার বাবা গাডলা হেনরি মাপকাইনসা মভেজো গ্রামের মোড়ল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ঔপনিবেশিক শাসকদের (শ্বেতাঙ্গদের) বিরাগভাজন হওয়ায় ম্যান্ডেলার পিতা মোড়লের পদ থেকে পদচ্যুত হন। তখন তিনি পরিবারসহ কুনু গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ম্যান্ডেলার পিতার ছিল ৪ জন স্ত্রী ও ১৩টি সন্তান। তার মা নোসেকিনি ফ্যানি (Nosekeni Fanny) ছিলেন প্রভাবশালী জোসা গোত্রের মেয়ে এবং তার বাবার তৃতীয় স্ত্রী। ম্যান্ডেলার শৈশব কাটে নানাবাড়িতে।

রোলিহালালা (যে গাছের ডাল ভাঙে) তার ডাক নাম। তার পরিবারে তিনিই প্রথম পড়ালেখার জন্য স্কুলে ভর্তি হন। ভর্তির পর শিক্ষিকা মাদিঙ্গানে তার ইংরেজি নাম দেন নেলসন।১০

ম্যান্ডেলার ৯ বছর বয়সে তার পিতা যক্ষ্মায় মারা যান। তখন তার অভিভাবক হন পিতার বন্ধু থেম্বুর শাসনকর্তা জোঙ্গিস্তাবা। ম্যান্ডেলার স্কুল ছিল খেদু রাজপ্রাসাদের কাছে একটি মিশনারি স্কুল। খেমু রীতি অনুযায়ী ১৬ বছর বয়সে তার গোত্র তাকে বরণ করে নেয়। ম্যান্ডেলা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ক্লার্কবুরি বোর্ডিং স্কুল থেকে ৩ বছরের জায়গায় ২ বছরেই তিনি জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাস করেন। বোফেট শহরের হেল্ডটাউন থেকে স্কুল সিনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাসের পর ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ-তে ভর্তি হন। এখানেই অলিভার টাম্বো ও কাইজারের সাথে তার পরিচয় হয়। এ দু'বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের সুবাদেই তিনি বান্টুস্থানের রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (ANC) একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। পরের বছর বন্ধুদের সাথে মিলে এএনসির যুবদল গঠন করেন। তিনি ঔপনিবেশিক শাসন ও বর্ণবাদী শাসননীতির বিরুদ্ধে ক্রমেই শক্তিশালী কণ্ঠস্বররূপে নিজেকে ও তার দলকে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন তার আদর্শ। ম্যান্ডেলা বিদ্যমান বর্ণবিদ্বেষী আইনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। শ্বেতাঙ্গ ন্যাশনালিস্ট পার্টি দমননীতির আশ্রয় নেয়, মামলা করে। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে ১৫৬ জন কর্মীসহ ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয়। পাঁচ বছর মামলা চলার পর সব আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুক্তি পান। এএনসি অহিংস আন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে সহিংস আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিলে সরকার আন্দোলকারীদের 'সন্ত্রাসী' আখ্যা দেয়। এএনসির সশস্ত্র অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নাম এমকে, যার অর্থ 'দেশের বল্লম'। ১ বছর ৫ মাস ফেরারি থাকার পর ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই আগস্ট সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবাজির অভিযোগে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। বহুল আলোচিত 'রিভোনিয়া ট্রায়াল' মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে রোবেন দ্বীপে তার কারাবাস শুরু হয়।

তার ২৭ বছরের কারাগার জীবনের ১৮ বছরই এ দ্বীপের কারাগারে কাটে। এ কারাগারটিকে তিনি বলতেন 'রোবেন বিশ্ববিদ্যালয়'। কারাগার থেকেই তিনি দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে তাকেসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দিকে 'রোবেন কারাগার' থেকে 'পোলসমুর' কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ স্থানান্তরের ফলে ম্যান্ডেলাসহ এএনসির শীর্ষ নেতাদের সাথে শ্বেতাঙ্গ সরকারের আলোচনার সুযোগ হয়। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে শ্বেতাঙ্গ 'বোথা' সরকার সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগের শর্তে তাকে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। তিনি রাজি হননি। এএনসির নেতৃত্বে কখনো তীব্র মাত্রায় আবার কখনো কম মাত্রায় আন্দোলন চলতে থাকে। এ বছরই সরকারের একজন মন্ত্রীর সাথে হাসপাতালে আলোচনা হয়। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বোথা সরকার দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। এ সময় বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও ব্রিটেন এবং আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র লন্ডনে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (সিনিয়র) বুশ ঘোষণা দেন যে, ম্যান্ডেলাকে ৬ মাসের মধ্যে মুক্তি না দিলে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হবে। এরূপ পরিস্থিতিতে আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ক এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন যে, ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেওয়া হবে। এএনসিসহ ৩৩টি দল ও সংস্থার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। দেশের সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিতকল্পে সকলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হবে। অবশেষে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুক্তি পান। তার 'মুক্তির মাধ্যমে আফ্রিকার ইতিহাস নতুনভাবে রচিত হয়। একের পর এক বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক আইনগুলো বাতিল হতে থাকে। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্বর্তী সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়। ২২শে ডিসেম্বর তা অনুমোদিত হয়। স্থির হয়, ২৭শে এপ্রিল ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এএনসি ৬৪% ভোট পেয়ে ৪০০ আসনের মধ্যে ২৫২টি আসন লাভ করে। ১০ই মে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যক্তিরূপে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ম্যান্ডেলা। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। প্রায় এক শতক মানবতার মুক্তির সংগ্রামে লড়াই করে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গের নিজ বাড়িতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১০ দিন রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পর বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে জন্মস্থান কুনু গ্রামেই তাকে সমাহিত করা হয়। প্রতিবাদ দিয়ে তার জীবন শুরু, ঐক্য ও শান্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতা। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বমানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন 'মাদিবা'। বর্ণবাদবিরোধী এ মহান নেতা বিশ্বকে বেঁধে গেছেন ঐক্যের সুতোয়। শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্য থেকে মুক্তি আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় দক্ষিণ আফ্রিকানদের কাছে 'টাটা' অর্থাৎ বাবা নামে তিনি পরিচিত ছিলেন।

ডেসমন্ড টুটু
Desmond Tutu

ডেসমন্ড টুটু ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালের ক্লার্কসড্রপে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জেচারিয়া জিলিলু টুটু এবং মাতার নাম আলেট্টা। তিন সন্তানের মধ্যে ডেসমন্ড টুটু ছিলেন দ্বিতীয়। তার বয়স যখন বারো বছর তখন তার পিতা সপরিবারে জোহানেসবার্গে গমন করেন। তার পিতা ছিলেন একজন শিক্ষক এবং মাতা ছিলেন একটি অন্ধ-বধির স্কুলের রাঁধুনি ও আয়া। যদিও টুটু ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পিতার আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় তার ডাক্তারি পড়া আর হয়নি। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। তার স্কুলের শিক্ষকজীবন শুরু হয় ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু বান্টু স্কুলে কৃষ্ণাঙ্গদের পড়ালেখার সুযোগ না থাকায় তিনি প্রতিবাদ করে পদত্যাগ করেন। বান্টু শিক্ষা আইন ছিল একটি কালো আইন। তারপর তিনি ধর্মবিদ্যা নিয়ে জোহানেসবার্গের সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজে পুনরায় পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি Anglican Priest- 'ধর্মযাজক' হিসেবে মনোনীত হন। এরপর তিনি লন্ডনের কিং কলেজ থেকে ধর্মবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর আফ্রিকায় ফিরে গিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৭-৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আফ্রিকার জনগণ বিষয়ে লেকচার দিয়ে সরকারের বিভিন্ন নিপীড়নমূলক নীতি সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী বি. জে. ভোস্টারকে চিঠি লেখেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি বালতিভর্তি বারুদের মতো। জনরোষ যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। কিন্তু তার চিঠির কোনো জবাব প্রধানমন্ত্রী দেননি। তিনি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে বর্ণবাদবিরোধী লেকচার দিয়ে বেড়ান।

১৯৭৬-৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মযাজকদের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এ পর্যায়েও তিনি বর্ণবাদবিরোধী লড়াই চালিয়ে যান। তিনি অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই এএনসি'র সশস্ত্র পন্থার আন্দোলনকে তিনি কখনো সমর্থন করেননি। নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে বাইবেল পড়া সকলের জন্য উচিত বলে তিনি মনে করতেন। তার দৃষ্টিতে ধর্মীয় গ্রন্থ মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করে।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সুয়েটোতে দাঙ্গা হলে সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের সমর্থন দেন এবং জনগণকে বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেন। ফলে আমেরিকার রিগান সরকার ও ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়। ফলে আফ্রিকার মুদ্রার ৩৫% দরপতন হয় এবং বহু কৃষ্ণাঙ্গl

চাকরি হারায়। শ্রমিকদের কষ্ট লাঘবে তিনি তাদের বোঝান যে, এ কষ্ট মহৎ কষ্ট। একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এ আন্দোলন করা হচ্ছে। তিনি আন্দোলনে ছিলেন বরাবরই অহিংস। সরকার তার পাসপোর্ট দু'বার জব্দ করলেও তার বিরুদ্ধে বড় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বর্ণবাদকে নাৎসিবাদ ও কমিউনিজমের সাথে তুলনা করেন। তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, যিনি কেপটাউন এবং সাউদার্ন প্রভিন্সের ধর্মযাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টুটুর মূল্যায়নকারীরা বর্ণবৈষম্য প্রথা বিলোপের পর থেকে তাকে একজন ইসরাইল ও. আমেরিকাবিরোধী হিসেবে দেখে থাকেন। মানবাধিকার অর্জনের জন্য তিনি তার জীবনের খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে সর্বদা নিপীড়িত ও নির্যাতিতদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার আন্দোলন শুধু বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এইডসের বিরুদ্ধে, দরিদ্রতার বিরুদ্ধে, যক্ষ্মার বিরুদ্ধে, যৌনতার বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, বন্দিত্বের বিরুদ্ধে, মানবভীতি ও দেশান্তরভীতির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান।

১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার নতুন সংবিধানে Anti-apartheid বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে, যা তার জন্য ছিল বিরাট এক বিজয়। তার বক্তব্য একটাই- "We will be free! All of us; Black & White ' together." বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তি ডেসমন্ড টুটু ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারেও অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি মানবতাবিরোধী বিভিন্ন আইনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন সেমিনার ও র‍্যালিতে অংশগ্রহণ করে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতির উপর প্রভাব এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিয়ে একজন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন। নারী অধিকার রক্ষায় তার প্রচেষ্টা অব্যাহত। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এবং ওয়েস্টার্ন কেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জেক গারওয়েল টুটুর নামে একটি শিক্ষা ট্রাস্ট গঠন করেন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে নভেম্বর বর্ণবাদমুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিয়ে সম্মানিত হন। আণবিক সমরাস্ত্র নিরস্ত্রীকরণে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। কাজেই দেখা যায়, তিনি শুধুই একজন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী ও সমাজকর্মীও বটে। জীবন্ত কিংবদন্তি এ মহৎ মানবাধিকারকর্মী বক্তব্য, বিবৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অদ্যাবধি কাজ করে যাচ্ছেন।

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...