French Revolution
ষোড়শ লুই (Sixteen Louis 1754-1793) (১৭৫৪-১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বুরবোঁ রাজবংশের স্বৈরাচারী রাজা ছিলেন। তিনি অলস, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও ব্যক্তিত্বহীন ছিলেন। তিনি সুন্দরী ও অহংকারী পত্নী অস্ট্রিয়ার রাজকুমারী মেরি আঁতোয়ানেত দ্বারা পরিচালিত হতেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তিনি ব্যর্থ ছিলেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তি, টেইলি কর প্রত্যাহার, অক্যাথলিকদের প্রতি সহনশীল নীতি অবলম্বনে তিনি সফলতার পরিচয় দেন। তার সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ফরাসি বিপ্লব, যার জন্য তাকে অধিক দায়ী করা হয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চলমান ত্রুটিপূর্ণ প্রথার সংস্কারসাধনে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে এ বিপ্লবের সম্মুখীন হতে হয়। এ বিপ্লবের প্রথম দিকে ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটে, যা স্বৈরতন্ত্রের পতনকেই নির্দেশ করে।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি হাজার হাজার জনতার সম্মুখে তাকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হয়। তার মৃত্যুর মাধ্যমে ফ্রান্সে হাজার বছরের চলমান রাজতন্ত্র শাসনের অবসান ঘটে।'
রানি মেরি আঁতোয়ানেত (Queen Marie Antoinette 1755-1793) (১৭৫৫-১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ): বুরবোঁ রাজবংশের রাজা ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী। সুন্দরী, অহংকারী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ মেরি আঁতোয়ানেত-এর জন্ম হয়েছিল অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ রাজবংশে। তার পূর্ণনাম হলো মেরি আঁতোয়ানেত জোসেফা জোহান্না। ষোড়শ লুই-এর সঙ্গে বিয়ের পর তিনি ফ্রান্সের কুইন কনসর্ট হন। প্রথমে ফরাসি জনগণের প্রিয় হলেও পরে তার অমিতব্যয়িতা, বিলাসব্যসন ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। দেশের অভ্যন্তরে অনাবৃষ্টির কারণে গমের উৎপাদন কম হয়, যার ফলে রুটির দাম কমানোর জন্য শহরে ভুখা মিছিল বের হলে রানি তাদের রুটির পরিবর্তে কেক খাওয়ার পরামর্শ দেন, যা চরম স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, তার জন্যই ফ্রান্স ফকির হয়ে গিয়েছিল ও বিপ্লব সূচিত হয়েছিল। বিপ্লবে ষোড়শ লুই-এর শিরশ্ছেদের পর তার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়।
ফরাসি বিপ্লব ইউরোপসহ পৃথিবীর ইতিহাসের যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সনাতন ফরাসি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য, রাজনৈতিক অধিকারে প্রবঞ্চনা, স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের উৎপীড়ন ও নির্যাতন, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির অগণতান্ত্রিক ও শোষণমুখী মানসিকতা সুদীর্ঘকাল জনমনে যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল, তারই ফল হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত এ বিপ্লব ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে প্রভাবিত করেছিল সারা ইউরোপকে, যা অনেক স্থানে পুরাতন সমাজ ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেয় এবং এক নতুন যুগের সূচনা করে, যে যুগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের সমতা। আধুনিক ঐতিহাসিকরা এ নিপ্লবকে যুগ থেকে যুগান্তরে উত্তরণের নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লবী প্রবাহ বলে চিহ্নিত করেন। কোনো একটি বিশেষ কারণে কিংবা কতিপয় লোক বা দলের কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। কেন ফরাসি বিপ্লব একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, কেন বিপ্লবী ফ্রান্সের সাথে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, তা জানতে হলে সনাতন ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য অবস্থা জানা প্রয়োজন।
ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে ইউরোপের প্রায় সকল দেশে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকারের দাবিদার শাসকগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ছিল নির্যাতন, নিপীড়ন ও উৎপীড়ন। সরকার ও প্রশাসন ছিল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর কুক্ষিগত। মানুষের অধিকার ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বিপ্লবপূর্ব ইউরোপে অনুপস্থিত ছিল।
ফরাসি বিপ্লব -প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বিশ্বের একজন মহান সেনাপতি, যিনি অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাকে একটি দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বের একজন মহান সেনাপতি, যিনি অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাকে একটি দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল।
মি. টমাস একজন বিখ্যাত বীর। তিনি বলেছিলেন, "আমিই বিপ্লব"।
১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ফ্রান্সের জাতীয় সভার (স্টেটস জেনারেলের) অধিবেশন আহ্বান করার ফলে ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব দেখা দেয় বলে মনে করা হয়। ফরাসি বিপ্লব কেবল ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, এ বিপ্লব সমগ্র ইউরোপের রূপান্তর ঘটায়।। ঐতিহাসিক রবার্ট পামারের মতানুসারে ফরাসি বিপ্লবকে ইউরোপীয় বিপ্লব বলাই সংগত।। ফ্রান্সে যা ঘটে তাকে ইউরোপীয় বিপ্লবের ফরাসি অধ্যায় বলা যেতে পারে। ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং এই বিপ্লবকে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা প্রস্তুত ঘটনা বলা যায়। আসলে ফরাসি বিপ্লব ছিল ইউরোপীয় ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজব্যবস্থার পতনের স্বাক্ষর। এই পতন প্রথমে ফ্রান্সে দেখা দেয়, পরে ইউরোপেও তা প্রসারিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের সূচনা অষ্টাদশ শতকের ইউরোপের অবস্থার মধ্যেই নিহিত ছিল।
সামাজিক অবস্থা
ফরাসি দেশের সমাজব্যবস্থা বিশেষ অধিকার ও অসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ জন্য বলা হয়ে থাকে যে, "The Revolution of 1789 was much less rebellion against despotism than a rebellion against in equality." (১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব ছিল স্বৈরাচারী শাসন অপেক্ষা অধিকতর বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ)। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপীয় সমাজ বিশেষ করে ফ্রান্সে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যথা-যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রেণি। প্রতিটি শ্রেণিকে এস্টেট (Estate) বলা হতো। যাজক ও অভিজাত শ্রেণি ছিল যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট। সাধারণ লোকেরা ছিল Third Estate বা তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু ভূমিকেই সম্পদের প্রধান উৎস বলে মনে করা হতো, সেহেতু ভূমির মালিকানাই সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের চাবিকাঠি ছিল। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় ভূমির মালিকানা ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। যাজক শ্রেণি দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা- উচ্চতর যাজক (Upper Clergy), অধস্তন যাজক (Lower Clergy)। ফ্রান্সে যাজকের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার। যাজকরা প্রার্থনা ও উপাসনা ছাড়া শিক্ষাদান, দরিদ্রসেবা, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখা প্রভৃতি কাজের দায়িত্ব বহন করতেন। গির্জার উচ্চ যাজক যথা- বিশপ শ্রেণি ছিল সাধারণত অভিজাত পরিবারের লোক। গির্জার জমিদারির আয়, গির্জার বিভিন্ন উপস্বত্ব তারা ভোগ করত। সমাজে তাদের দারুণ প্রতিপত্তি ছিল। উচ্চ যাজকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং শাসনকার্যে অংশ নিতেন। ফরাসি মন্ত্রী নেকারের মতে, ফরাসি গির্জার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৩ কোটি লিভর (ফরাসি পাউন্ড)। কিন্তু তারা আধ্যাত্মিক কোনো দায়িত্বই পালন করতেন না।
অভিজাত শ্রেণি ছিল ইউরোপের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান ও সুবিধাভোগী শ্রেণি। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে অভিজাতদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। দেশের জনসংখ্যার ১ শতাংশ ছিল অভিজাত। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও এরা সমাজের সর্বাধিক প্রভাবশালী ছিল। মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের ফলে অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হয়। অভিজাতরা ভূমি ও কৃষকদের উপর বহু অধিকার ভোগ করত। এরা বংশানুক্রমিকভাবে ভূমির উপর অধিকার ভোগ করত। অভিজাত শ্রেণি সরকারকে কর দেওয়ার ব্যাপারে বহু ছাড় ও সুবিধা ভোগ করত।
অভিজাতরা নানা প্রকার সামন্ত কর পেত। ম্যানর প্রথা বা খামারপ্রথার ফলে অভিজাতরা ম্যানর থেকে নানাভাবে অর্থ পেত। এছাড়া তারা রাজার সভাসদ, সেনাপতি, উচ্চ কর্মচারী হিসেবে কাজ করার একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত। এরা যুদ্ধবিগ্রহ, শাসনকার্য পরিচালনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাজার সহায়তা করত। মোটকথা, অষ্টাদশ শতক ছিল ইউরোপে অভিজাত বা সামন্ত শ্রেণির কর্তৃত্বের যুগ।
তৃতীয় শ্রেণি বা Third Estate বলতে অভিজাত ও যাজক ছাড়া বাকি সকল লোককে বোঝাত। ধনী বুর্জোয়া যথা- শিল্পপতি, ব্যাংক মালিক প্রমুখের অর্থকৌলীন্য থাকলেও জন্মকৌলীন্যের অভাবে তারা তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত ছিল। ফরাসি দেশে ধনী বুর্জোয়াদের নাম ছিল haute bourgeois বা ছুটে বুর্জোয়া। বুদ্ধিজীবী ও চাকরিজীবী সম্প্রদায়, যথা- শিক্ষক, আইনজীবী, সাধারণ কর্মচারী প্রমুখও তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের মধ্যবিত্ত বা পাতি বুর্জোয়া বলা হতো। এই শ্রেণিও কায়িক শ্রমের দ্বারা জীবিকা অর্জন করত না। তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল কৃষকরা। কৃষক শ্রেণি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, যথা- স্বাধীন কৃষক ও ভূমিদাস। ভূমিদাস শ্রেণি মালিককে বিভিন্ন কর দিত, যাজককে ধর্ম কর দিত, মালিকের জমিতে বেগার খাটত। এরা অত্যন্ত দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাত। তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার কিছুই ছিল না। কৃষক শ্রেণিই ছিল সমাজের সম্পদের উৎপাদনকারী। কিন্তু অভিজাত বুর্জোয়া ও শহরবাসীরা এদের হীন চোখে দেখত। তারা মনে করত যে, কৃষকরা ছিল নিরক্ষর কুৎসিত শ্রেণি। জমি চাষ করতে, কর দিতে ও উচ্চ শ্রেণির সেবা করতে কৃষকরা জন্মগ্রহণ করেছে। কৃষকদের জীবন ছিল শোষিত, করভারে জর্জরিত এবং অভিজাতদের দ্বারা নির্যাতিত। ঐতিহাসিক C. D. Hazen এ প্রসঙ্গে বলেন, এ সমস্ত কর দেওয়ার ফলে কৃষকরা প্রায় অনাহারে থাকত।
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এই শ্রেণির প্রভাব ইউরোপের সকল দেশে সমান ছিল না। সামন্তপ্রথার ফলে ফ্রান্সে অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। অভিজাত শ্রেণি জন্মকৌলীন্যের জোরে সবকিছুই ভোগ করত। বুর্জোয়া শ্রেণি অর্থকৌলীন্যে বলীয়ান হলেও সমাজে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল না। পূর্ব ইউরোপে বুর্জোয়াদের সংখ্যা ছিল নামমাত্র। অন্তঃশুল্ক, বৈষম্যমূলক করব্যবস্থা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রতি সরকারি উদাসীনতা বুর্জোয়া শ্রেণিকে সামন্ত শাসনের প্রতি বিরূপ করে তোলে। বুর্জোয়ারা ছিল শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। এরা এজন্য পুরাতনতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা হারায় এবং বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। ঐতিহাসিক রাইকার ফরাসি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ফরাসি বিপ্লব মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সাম্য লাভের আন্দোলনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল।
গ্রামে ও শহরে এক শ্রেণির ভূমিহীন দিনমজুর ও শ্রমিক ছিল। এদের বাসগৃহ বা চাষের জমি বলতে কিছুই ছিল না। এরা অপরের জমিতে দিনমজুরি খাটত। শহরে এলে এরা কারখানার কাজ বা গৃহভৃত্যের কাজ করত। অভিজাতরা এই সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণিকে সমাজের নিম্নশ্রেণি বলে গণ্য করত। এছাড়া ভিক্ষুক ও উপজীবিকাহীন লোকও এ যুগে দেখা যেত। ফ্রান্সের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ ছিল উপজীবিকাহীন লোক। বিপ্লবের সময় এরা প্যারিসের জনতার সাথে যোগ দিয়ে ধ্বংসকারী মূর্তি ধারণ করে। নেপোলিয়নের মতে, "ফরাসি বিপ্লব সুবিধা ভোগকারী এবং ক্ষমতালিন্স শ্রেণির বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত জাতীয় গণ-আন্দোলন।" (The french Revolution was a general mass movement of the nation against the Privileged classes.")"৬
অর্থনৈতিক অবস্থা৭
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের অর্থনীতি একটি পরিবর্তনমুখী অবস্থায় উপনীত হয়। মধ্যযুগের শেষ দিক থেকে কৃষির পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য ও উপনিবেশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যদিও অষ্টাদশ শতকে কৃষিই ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি, তবু শিল্প, বাণিজ্য ও মূলধন নিয়মিতভাবে বেড়ে পুরাতন সমাজের চরিত্রে পরিবর্তনের সূচনা করে। অর্থনীতিতে কৃষিরই ছিল অগ্রাধিকার। সমাজে মর্যাদালাভের প্রধান উপায় ছিল ভূসম্পত্তির মালিকানা। এমনকি বণিকরা বাণিজ্যে ভালো অর্থ রোজগার করার পর সে অর্থে জমি কিনে জমির মালিকানাকে তাদের আয় ও সম্মান লাভের পথ মনে করত। বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষাবাদের ব্যবস্থা তেমন ছিল না। দরিদ্র ও নিরক্ষর কৃষকরা এসব বিষয় বুঝত না। লেফেভারের মতে, কৃষকরা বৃষ্টি ও প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করে কৃষিকাজ করত। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলে কৃষকের দুঃখ-কষ্টের সীমা থাকত না। জমিগুলো পালাক্রমে আবাদ করে এর উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা হতো না।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। আলোচিত রাজা লর্ড অ্যাক্টনের মতে, "মার্কান্টাইলবাদ ছিল আলোচিত স্বৈরতন্ত্রের অনুরূপ বা অনুপূরক অর্থনৈতিক মতবাদ।" মার্কান্টাইলবাদীরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। সুতরাং বিদেশি মাল অবাধে আমদানি করলে বা খাদ্যদ্রব্য অবাধে রপ্তানি করলে সম্পদ ক্ষয় পাবে। ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে অবাধ বাণিজ্য চলত না। সেজন্য আমদানি মালের উপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হতো।
মার্কান্টাইল বা সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে ফিজিওক্র্যাট (Physiocrats) নামক অর্থনীতিবিদরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। অবাধ বাণিজ্যবাদীরা একথা বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিশ্বে সম্পদের সীমা নেই। যতই খাদ্য ও শিল্পবস্তুর উৎপাদন বাড়বে ততই সম্পদ বাড়বে। এজন্য তারা শিল্প-বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ লোপ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যের দাবি জানান। মার্কান্টাইলবাদজনিত সংরক্ষণনীতির ফলে বাণিজ্যমন্দা এবং দারিদ্র্য বাড়ছে, একথা বোঝাতে তারা চেষ্টা করেন। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ফিজিওক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনার ফলে সংরক্ষণবাদের তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। তবু ইউরোপীয় শাসকদের চিন্তা মার্কান্টাইলবাদের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়নি।
ইউরোপের সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলো অষ্টাদশ শতকের উপনিবেশের সঙ্গে বাণিজ্য স্থাপনের চেষ্টা চালায়। ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন এ বিষয়ে কৃতিত্ব দেখায়। ভারত ও উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ দখলের জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ১৭৪০-৬৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ যুদ্ধবিগ্রহ দেখা দেয়। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে শতকরা ৪০ ভাগ বাণিজ্য উপনিবেশের সাথে চলত। উপনিবেশের সম্পদ ও দক্ষিণ আমেরিকার সোনা, রুপা আমদানির ফলে ইউরোপের এক শ্রেণির বণিকের হাতে প্রভূত সম্পদ জমা হয়। এরা মূলধনী বা ক্যাপিটালিস্ট (Capitalist) শ্রেণিতে পরিণত হয়। এই শ্রেণি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ
সরকারকে সুদে ধার দিত। বাকি অর্থ শিল্পে ও ব্যাংকে লগ্নি করত। এদের মূলধনের সাহায্যে লন্ডনের বেরিং (Baring), আমস্টারডামের হোপ (Hope), ফ্রান্সের সুইস (Swiss) ব্যাংক প্রভৃতি বিখ্যাত ব্যাংক চালু হয়। মোটকথা, অষ্টাদশ শতকে কৃষির কথা বাদ দিলে শিল্প-বাণিজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া দেখা যায়। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল পরিবর্তনের অগ্রদূত। এই পরিবর্তনের চাপে পুরাতন কৃষিকেন্দ্রিক সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির ধ্বংসের পথ পরিষ্কার হয়। ফরাসি বিপ্লব ছিল তারই প্রকাশ।
রাজনৈতিক অবস্থা
অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সসহ ইউরোপে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র বিদ্যমান ছিল। এ সম্পর্কে সি. ডি. এম. কেটেলবির মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, "অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ গণতান্ত্রিক কিংবা জাতীয়তাবাদী কোনোটাই ছিল না, আসলে সেগুলো ছিল রাজবংশসম্ভূত এবং রাজ্যকে রাজার ব্যক্তিগত কিংবা রাজবংশের সম্পত্তি বলে মনে করা হতো।" রাজাই ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজ্য বিস্তারকে জাতির শক্তি ও মর্যাদার চিহ্ন বলে ধরা হতো। রাজা স্বর্গীয় অধিকার নীতি অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি দাবি করতেন যে, তার কাজের জন্য তিনি একমাত্র ঈশ্বরের নিকট দায়ী। পার্থিব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ অনুযায়ী তিনি চলবেন না। এভাবে রাজার স্বর্গীয় অধিকার তত্ত্ব মধ্যযুগের শেষ দিকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এ মতবাদের আশ্রয় নিয়ে রাজারা যারপরনাই স্বৈরাচারী হন। ফ্রাস্ত্রের বুরবোঁ রাজবংশ ছিল রাজকীয় স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রকৃষ্ট নিদর্শন। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই ঘোষণা করেন যে, 'আমিই রাষ্ট্র'। রাজশক্তিগুলো বংশানুক্রমিকভাবে শাসন করত। ইউরোপের জনসাধারণের বা প্রজাদের স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিল না। অধিকাংশ দেশের শাসনব্যবস্থা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী। জনসাধারণের ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের অধিকার ছিল না। রাজা, অভিজাত ও ধর্মযাজকরা একযোগে জনসাধারণকে শাসন করতেন। ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন ছিল না। কারণ বিচারব্যবস্থা রাজার হুকুমেই চলত। ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন অযোগ্য ও অকর্মণ্য। দেশ শাসন করার নৈতিক অধিকার তিনি হারিয়ে ফেলেন।
ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ
১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও সর্বহারা
জনসাধারণের কঠোর প্রতিবাদ বিদ্রোহের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। কোনো বিশেষ কারণ বা আকস্মিক কোনো ঘটনার দ্বারা এই মহাবিপ্লব সংঘটিত হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণের সমাবেশের ফলে এই বিপ্লবের সূত্রপাত হলেও রাজনৈতিক কারণকে এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ বলা চলে।
রাজার স্বেচ্ছাচারিতা
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল স্বৈরাচারী। রাজা ছিলেন সকল ক্ষমতার উৎস। তিনি ছিলেন একাধারে শাসক, বিচারক এবং আইন প্রণেতা। তিনি ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। চতুর্দশ লুই বলতেন, 'আমিই রাষ্ট্র' এবং ষোড়শ লুই বলতেন 'আমি যা ইচ্ছা করি তা-ই আইন'।"৯ এরূপ স্বৈরাচারী
শাসনে জনমতের কোনো স্থান ছিল না এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার লেশমাত্র ছিল না। লেত্রে-ডি-ক্যাশে (lethre de cachct) নামক গ্রেফতারি পরোয়ানার উপর রাজার স্বাক্ষর নিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা যেত। ফ্রান্সে স্টেটস জেনারেল নামক ফিউডাল পার্লামেন্ট-এর অস্তিত্ব বিনষ্ট করে রাজা দেশের সকল ক্ষমতা নিজ হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।
অত্যাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ
রাজতন্ত্রের এরূপ সর্বাত্মক ক্ষমতার সদ্ব্যবহার চতুর্দশ লুই তার কর্মক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা দ্বারা করতে সক্ষম ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী পঞ্চদশ লুই ছিলেন দুর্বল, বিলাসী ও শাসনকার্যে সম্পূর্ণ উদাসীন। ফলে চতুর্দশ লুইয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। কারণ তার শাসনকার্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দেশের গৌরব অর্জন। সপ্তদশ শতাব্দীতে রিশল্যু, ম্যাজারিন ও কোলবার্টের ন্যায় সুযোগ্য মন্ত্রীরা ইউরোপের রাজনীতিতে ফ্রান্সের জন্য একটি সম্মানজনক স্থান তৈরি করেন। কিন্তু পঞ্চদশ লুই ও ষোড়শ লুই শাসনব্যবস্থায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং তাদের হাতে রাজতন্ত্র একটা অত্যাচার ও উৎপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। তদুপরি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের শোচনীয় ব্যর্থতার ফলে ফলে। জনগণ তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে।
শাসন ও বিচারব্যবস্থায় নৈরাজ্য
সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেও শাসনব্যবস্থায় রাজার সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল না। এ সময়ে ফ্রান্স ৪০টি ক্ষুদ্র সামন্ত অঞ্চলে বিভক্ত থাকায় উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করতেন। রাজকর্মচারীদের ক্ষমতা ও সরকারি বিভাগগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না থাকার দরুন বিশৃঙ্খলা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারব্যবস্থারও চরম অধঃপতন ঘটে। বিচারব্যবস্থা একদিকে ছিল ব্যয়বহুল, অপরদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত। সমগ্র দেশে কমপক্ষে বিভিন্ন ধরনের ৪০০ আইনকানুন বলবৎ ছিল। আইনের চোখে সকল মানুষ সমান ছিল না। নিজ দায়িত্বের প্রতি উদাসীন বিচারকগণ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সচেষ্ট ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে দেশে বিচারের নামে অবিচার এবং শাসনের নামে কুশাসন চলছিল। ফ্রান্সের জাতীয় সভা ছিল মৃতপ্রায়।
অভিজাত শ্রেণির উত্থান
রাজশক্তির দুর্বলতার ফলে অভিজাত শ্রেণি পুনরায় রাজসভায় নিজেদের প্রাধান্য স্থাপন করে এবং রাজা তাদের ক্রীড়নকে পরিণত হন। দেশের ও দশের কোনো মঙ্গল সাধন না করে তারা নিজ ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তৎপর হয়। ইনটেনডেন্টদের সাহায্যে তারা প্রদেশের মানুষকে শাসনের নামে শোষণ করত। এককথায় ভার্সাই রাজসভার পূর্ব গৌরব বিলুপ্ত হয়েছিল। ঐতিহাসিক হ্যাম্পসনের মতে, "শাসনব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেণির প্রভাব অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।"
রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
দুর্বল রাজা এবং ক্ষমতাশালী অভিজাত শ্রেণির কারণে দেশের শাসনব্যবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। অথচ ফরাসি নৃপতিগণ তাদের বিলাসিতা, শাসন ও সামরিক অভিযানের কৃতিত্বের জন্য দেশের বিপুল অর্থের অপব্যয় করতেন। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ ছিল জাঁকজমক ও বিলাসিতায় পরিপূর্ণ এক স্বর্ণপুরী। ১৮,০০০ কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় নিযুক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৬,০০০ কর্মচারী রাজা ও রানির সেবায় নিয়োজিত
ছিল। রানির ব্যক্তিগত ভৃত্যের সংখ্যা ছিল ৫০০। প্রিয়পাত্রদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো। বিশেষ করে ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী রানি মেরি আঁতোয়ানেত-এর সীমাহীন বিলাসিতা দুঃসহনীয় ছিল। রাজপরিবারের এরূপ অমিতব্যয়িতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ফরাসি জনগণকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত টমাস জেফারসন বলেন, “রানি না থাকলে ফ্রান্সে বিপ্লবই হতো না।”১০
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যর্থতা: অষ্টাদশ শতকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ফ্রান্স চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের বিপর্যয় ঘটে। ঐতিহাসিক বার্নস এবং রালফ এ প্রসঙ্গে বলেন, "France was now crippled almost beyond hope of recovery." আমেরিকা ও ভারতে ইংরেজদের কাছে ফ্রান্স পরাজিত হয়। এসব পরাজয়ের ফলে ফ্রান্সের ব্যবসা-বাণিজ্যের চরম ক্ষতি হয় এবং ফরাসি রাজকোষ অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ফরাসি সরকারের ব্যর্থতায় জনগণের কাছে রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তি দারুণভাবে নষ্ট হয়।”১১
উপরের আলোচনা থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি রাজশক্তির অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ষোড়শ লুই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ফরাসি জাতিকে শাসন করার নৈতিক অধিকার রাজা হারিয়ে ফেলেছিলেন। রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের দোষ-ত্রুটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। । অবশেষে তা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে এবং পতন অপরিহার্য হয়।
ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ
পূর্বতন শাসনামলে ফ্রান্সের জনসমাজ প্রধানত দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যথা- সুবিধাভোগী শ্রেণি ও সুবিধাহীন শ্রেণি। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় প্রথম দলভুক্ত ছিলেন। যাজকগণকে প্রথম সম্প্রদায় এবং অভিজাতগণকে দ্বিতীয় সম্প্রদায় বলা হতো। সমাজে বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত, শ্রমশিল্পী, কৃষক প্রমুখ শ্রেণি ছিল সুবিধাহীন সম্প্রদায়ভুক্ত। সুবিধাহীন শ্রেণিকে আবার অধিকারহীনও বলা হয়। কারণ এসব শ্রেণির মানুষের কোনো অধিকার ছিল না, ছিল কেবল দায়িত্ব পালনের তাগিদ। অপরদিকে সুবিধাভোগী শ্রেণির যাজক ও অভিজাতগণ কেবল ভোগ করতেন। কর না দেওয়ার সুবিধা, অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়া, এককথায় কোনো দায়িত্ব পালন না করেই শুধু সুবিধা ভোগ করাই ছিল তাদের অধিকার। ফরাসি সমাজের নিয়মটা যেন ছিল এ রকম- যাজকরা উপাসনা করবেন, অভিজাতরা লড়াই করবে আর বাকি সবাই জোগাবে তাদের জন্য অর্থ। ফরাসি সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ও অধিকারহীন মানুষের মধ্যে যে বিস্তর প্রভেদ ছিল, তাকে ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়।
পূর্বতন শাসনামলে ফ্রান্সে রাজাকে বাদ দিলে যাজকদের ছিল সমাজের সর্বোচ্চ আসন। এজন্য ফ্রান্সে যাজক শ্রেণিকে বলা হতো প্রথম এস্টেট বা প্রথম সম্প্রদায়। ধর্ম-উপাসনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, সাধারণ মানুষের ন্যায় যাজক শ্রেণি পার্থিব ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও আগ্রহী ছিল। তারা খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করতেন এবং ধর্ম কর আদায় করতেন। তবে যাজক শ্রেণির মধ্যে নিম্নস্তরের যাজকরা আবার উপরের স্তরের যাজকদের ঘৃণার পাত্র ছিলেন। উচ্চ ও নিম্নস্তরের মধ্যে যে সামাজিক প্রভেদ ছিল, তা নিম্নশ্রেণির যাজকদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন কামনা করতেন।
যাজকদের পরেই ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের স্থান। তাদের বলা হতো দ্বিতীয় এস্টেট বা দ্বিতীয় সম্প্রদায়। প্রথা হিসেবে সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও অভিজাত শ্রেণির সামন্তপ্রথা থেকে পাওয়া সুবিধাসমূহ আগের মতো বহাল ছিল। সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন অভিজাতরা যাজক ব্যতীত আর সকলের উপার্জনের উপর বেঁচে থাকত বলে তারা ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠেছিল। বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষ অভিজাতদের এসব সুবিধা নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর হয়। দেশের প্রায় সমস্ত জমি বিনা খাজনায় অভিজাত ও ঊর্ধ্বতন যাজকরা ভোগ করতেন। তাদের এ স্বার্থপরতা তৃতীয় সম্প্রদায়ের মনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃতীয় সম্প্রদায় ছিল বঞ্চিত ও নিপীড়িত। তারা আবার তিনটি উপদলে বিভক্ত ছিল, যথা- ১. বুর্জোয়া ২. কারিগর ও ৩. কৃষক। বুর্জোয়ারা ছিল ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, ধনসম্পদ ও জাতীয়তাবোধে অন্যান্য শ্রেণির ঊর্ধ্বে। তারা অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার ভোগ করাকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। ফরাসি দার্শনিকদের ক্ষুরধার লেখনী তাদের মনের মধ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করে, তারা প্রথম ও দ্বিতীয় সম্প্রদায়ের মতো সমান অধিকার দাবি করে এবং বিপ্লব ঘটানোর জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। অপরপক্ষে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিও তাদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করতে সম্মত ছিল না।
বুর্জোয়াদের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং সুবিধাপ্রাপ্তদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য আপসহীন মনোভাব- এই মানসিক অবস্থা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
নেপোলিয়ন যথার্থই বলেছেন, সামাজিক অহমিকাই ছিল বিপ্লবের মূল কারণ, স্বাধীনতা ছিল অজুহাত মাত্র। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত এবং সাধারণ মানুষ তাদের দয়ার উপর নির্ভর করত। কারিগর ও শ্রমশিল্পীরা স্বভাবতই সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ক্রমেই বিপ্লবী হয়ে ওঠে। কৃষকদের কোনো নাগরিক অধিকার ছিল না। নানা প্রকার কর প্রদানের দায়িত্ব শুধু তাদের উপর ন্যস্ত ছিল। তাছাড়া জমিদারের কাজে তারা বেগার খাটত এবং শ্রম কর দিতে বাধ্য ছিল। সামন্তপ্রথাজনিত নানাবিধ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কৃষকরা একে অবৈধ ও অসংগত বলে বিবেচনা করত। কৃষকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। বিপ্লবের প্রাক্কালে মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মৌলিক নাগরিক অধিকার ছিল না। অধ্যাপক মন্টেস্কু বলেন, "কৃষকদের দুরবস্থাই ফরাসি বিপ্লবের প্রধান কারণ। সুতরাং সামাজিক বৈষম্যপ্রসূত বিদ্বেষ ফরাসি বিপ্লবের একটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ।"
ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ
ফরাসি বিপ্লব ইউরোপ তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালীন প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনসাধারণের কঠোর প্রতিবাদ বিপ্লবের আকারে আত্মপ্রকাশ করে। বহুকালের গ্লানি এই বিপ্লবের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল। বহু কারণের একত্র সমাবেশের ফলেই এই বিপ্লবের সূত্রপাত হয়। এগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণ ছিল অন্যতম। ঐতিহাসিক মর্গ স্টিফেনস অর্থনৈতিক কারণের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
আমরা জানি, প্রাক-বিপ্লব যুগে ফরাসি সরকারের প্রধান দুর্বলতাই ছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। অথচ সরকারের অপচয় কমানো যায়নি। যেহেতু কৃষক ছিল দারিদ্র্যের চরম সীমায়, নতুন করের বোঝা চাপানো সম্ভব ছিল না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল, রাষ্ট্রের আর্থিক সংকটের মুখেও প্রথম দুই শ্রেণি- যাজক ও অভিজাতরা তাদের কর না দেওয়ার বিশেষ অধিকার ছাড়তে রাজি হয়নি। ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই এবং তার মন্ত্রীরা এ ব্যাপারে অভিজাতদের উপর চাপ সৃষ্টি করার ফলেই অভিজাত বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। অর্থনৈতিক ঘাটতির প্রধান কারণ ছিল, ফ্রান্স ব্যয়বহুল ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছিল। এমনও হয়েছিল যে, বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয়েছিল। এই ঋণের উপর যে বিপুল টাকা সুদ হিসেবে দেওয়া হতো, তাতে সরকারি আয়ের একটা বড় অংশই খরচ হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় আসে যখন সরকার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয় যে অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ফরাসি সরকার ভুগছিল তা হলো করভারের অসমতা। এই অসমতা ছিল মানুষে মানুষে এবং এলাকায় এলাকায়। যেহেতু ফ্রান্স ছিল সে সময়ে 'বিশেষ অধিকারের দেশ' সেহেতু যাজক ও অভিজাত শ্রেণি কর না দেওয়ার বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় প্রায় সকল প্রকার প্রত্যক্ষ কর থেকে অব্যাহতি পেত। ফলে ফরাসি রাজকোষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো। এভাবে ধনীগণ, যারা রাষ্ট্রকে অধিক কর প্রদান করতে পারত, তারা অল্প দিয়ে আরও অধিক পরিমাণে অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছিল এবং যারা দরিদ্র তারা রাষ্ট্রকে তাদের ক্ষমতার অতিরিক্ত কর দানে বাধ্য হয়ে ক্রমশ ধ্বংসের পথে অগ্রসর হতে থাকে। কর আদায়ের এই ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির ফলে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌছে যায়।
করপ্রথা ছিল অন্যায়, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট। এই সময়ে রাষ্ট্র কর, ধর্ম কর এবং সামন্ত প্রভুর দায় মেটাতে গিয়ে কৃষকদের আয়ের চার-পঞ্চমাংশ নিঃশেষ হয়ে যেত। প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর ছাড়াও নানা রকমের করের তাড়নায় কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। প্রত্যক্ষ কর টেইলি বা ভূমিকর, ক্যাপিটেশন বা আয়কর, ভিংটিয়েমে বা সম্পত্তি কর এবং পরোক্ষ কর গেবেলা বা লবণ কর, এইডস, (মাদক দ্রব্যের উপর কর) আবগারি শুল্ক, দলিলপত্রের উপর কর, আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্ক প্রভৃতি সবই তৃতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য বিশেষ করে কৃষকদেরই দিতে হতো। তাই ফরাসি দেশে একটি প্রবাদ আছে- "অভিজাত শ্রেণি যুদ্ধ করে, পুরোহিত শ্রেণি ধর্মকর্ম করে আর জনগণ করের বোঝা বহন করে। "১২ যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়কে এসব কর দেওয়া থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করত। দেশের প্রতি কোনো কর্তব্য তাদের ছিল না। অধিকারহীন সম্প্রদায় বিশেষ করে কৃষকদের সুযোগ-সুবিধার বালাই ছিল না, ছিল কেবল দায়িত্ব পালনের তাগিদ। কৃষকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে কার্লাইল মন্তব্য করেছেন, "ফ্রান্সের কৃষকদের এক-তৃতীয়াংশ বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় আলু খেয়ে জীবন ধারণ করত।১৩
কর আদায়ের ব্যবস্থাও ছিল দুর্নীতিপূর্ণ ও নির্যাতনমূলক। কর আদায়ের ভার সরকার এক শ্রেণির মধ্যবর্তী কর আদায়কারীর হাতে দিয়েছিল। তারা সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে এক-একটি স্থানের কর আদায়ের অধিকার পেত। স্বভাবতই কর আদায়ে অত্যাচার করা হতো। তাছাড়া প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ের এক-দশমাংশ ধর্ম কর হিসেবে আদায় করা হতো। যদিও সামন্তপ্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল, তথাপি সামন্ত প্রথার কর আদায়ের রীতি তখনো চালু ছিল। এককথায় বলা যায়, মোট আদায়কৃত করের ৯৬ শতাংশ এ তৃতীয় সম্প্রদায়কে বহন করতে হতো। এ বৈষম্যমূলক নীতির ফলে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং তা ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এ সময় অ্যাডাম স্মিথ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বক্ষেত্রে অনিয়ম লক্ষ করে তদানীন্তন ফ্রান্সকে "অর্থনৈতিক ভ্রান্তির জাদুকর" (A Museum of economic errors) বলে বর্ণনা করেছিলেন। ১৪
ফরাসি জনসাধারণের অর্থনৈতিক দুর্দশা রাজতন্ত্রের আর্থিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। চতুর্দশ লুইয়ের সময়ে অনবরত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে রাজকোষের অপরিমেয় অর্থ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তার উত্তরাধিকারী পঞ্চদশ লুইয়ের সামরিক অভিযান, দুর্নীতিপরায়ণ শাসন, বিলাসিতা ও অমিতব্যয়িতার ফলে ফ্রান্স অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একেবারে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। দেশের এই শোচনীয় অর্থনৈতিক দুর্যোগের দিনে হতভাগ্য ষোড়শ লুই ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সময়ে মন্ত্রী Turgo and Necker অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য কতিপয় অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
তারা উভয়েই সুবিধাপ্রাপ্ত যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের উপর কর আরোপ করার প্রস্তাব করলে এবং রানির মাধ্যমে ষোড়শ লুইয়ের উপর চাপ দিলে পর পর দুজন মন্ত্রীকে পদচ্যুত করা হয়। এদের পদচ্যুতি ফরাসি অর্থনৈতিক অবস্থাকে এক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ইতিমধ্যে ১৭৮৭-৮৯ খ্রিষ্টাব্দের অজন্মা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক জীবনে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। ১৭৮৭-৮৯ খ্রিষ্টাব্দের অজন্মায় ফসল উৎপাদন অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পায়। কৃষক, কারিগর, শ্রমিক এককথায় মেহনতি মানুষের জীবনে দুর্গতি এলেও অধিকারপ্রাপ্ত বা সুবিধাভোগী যাজক ও অভিজাতদের আর্থিক অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি। কারণ তারা পরের রোজগারের উপর বেঁচে ছিল। তাছাড়া রাষ্ট্রকে তাদের কর দিতে হতো না। এভাবে গ্রামের কৃষক এবং শহরের কারিগর, শ্রমিক প্রমুখ তাদের আর্থিক দুর্দশার জন্যই ফরাসি রাজতন্ত্র এবং অভিজাতদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে বিপ্লব অপরিহার্য করে তুলেছিল। অর্থ সংগ্রহের জন্য বাধ্য হয়ে ষোড়শ লুই ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান করেন। জাতীয় সভার অধিবেশনে তৃতীয় সম্প্রদায়ের সাথে রাজার মতভেদ ঘটে এবং প্যারিস ও অন্যত্র ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রায় দুই শত বছর পরে জাতির প্রতি রাজার এই আহ্বান স্বৈরতন্ত্রের চরম ব্যর্থতা ও অক্ষমতার কথাই ঘোষণা করে এবং এই অধিবেশনকে উপলক্ষ করেই ফরাসি বিপ্লবের সূত্রপাত হয়।
ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিপ্লবের প্রভাব..
ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব (১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) ফরাসি বিপ্লবের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইংল্যান্ডের বিপ্লব, নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা ও সমসাময়িক লেখক লকের জনসাধারণের সার্বভৌমত্বের মতবাদটি মন্টেস্কু, ভলতেয়ার প্রমুখ দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল।
আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারণ। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধে লাফায়েত ও অন্য বহু ফরাসি যোগদান করেছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধে আমেরিকার সাফল্য তাদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। যুদ্ধ থেকে ফিরে দেশে এসে তারা আমেরিকার ন্যায় জনগণের শাসন ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর হয়। তাছাড়া ফ্রান্স আমেরিকাকে স্বাধীনতাযুদ্ধে অর্থ সাহায্য করায় ফ্রান্সের রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়েছিল। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় বিপ্লবের মূলে কাজ করেছিল।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিতে সবকিছু বিচার করার মানসিকতাই ছিল জ্ঞানদীপ্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য। অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল আধুনিক ইতিহাসে জ্ঞানদীপ্তির যুগ। রেনেসাঁপ্রসূত অনুসন্ধিৎসা ও সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি উক্ত শতাব্দীতে কার্যকর ছিল। জ্ঞানদীপ্তির প্রভাবে উদ্দীপ্ত এক শ্রেণির পণ্ডিত ফ্রান্সের পূর্বতন শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তম্ভগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়েছিলেন। ফরাসি, দার্শনিকদের মধ্যে মন্টেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো, দিদারো প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
অনেকের মতে, বিপ্লবে দার্শনিকগণ প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্ব গ্রহণ করেননি বা অংশগ্রহণ করেননি। তবে স্বীকার করতে হবে যে, দার্শনিকদের প্রকৃত কার্যের ক্ষেত্র ছিল মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং ভাব-জগতে নতুন ভাবধারার সৃষ্টি করা। অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নীতিগত অধিকার সম্পর্কে তারা জনগণকে সচেতন করেন এবং অবহিত করেন। প্রকৃতপক্ষে এখানেই দার্শনিকদের অবদান।
মন্টেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দ): ফরাসি দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন মন্টেকু। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে বিপ্লব বিমুখ এবং রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। গণতন্ত্রে তার কোনো বিশ্বাস ছিল না। তিনি ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সমর্থক। তিনি তার যুক্তিবাদী মনন দ্বারা ফ্রান্সের প্রচলিত সমাজ ও শাসনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করেন। তিনি ছিলেন ক্যাথলিক গির্জার ও রাজার সীমাহীন ক্ষমতার ঘোরবিরোধী। 'স্বর্গীয় অধিকারপ্রাপ্ত রাজতন্ত্র' তত্ত্বকে অস্বীকার করে তিনি এর ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো তুলে ধরেন। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে 'দ্য স্পিরিট অব লজ' (The spirit of laws-1748) এবং 'দ্য পারসিয়ান লেটারস্' (The Persian Letters) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি 'Persian Letters' নামক ব্যঙ্গাত্মক লেখার মধ্য দিয়ে ফরাসি সমাজের অন্যায় শ্রেণিবৈষম্যের প্রতি কটাক্ষপাত করেন এবং The spirit of laws' গ্রন্থে তিনি শাসনব্যবস্থার মধ্যে, আইন বিভাগ, কার্যনির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ- এই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা বিভাজনের কথা বলেছেন। কারণ তার ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্ব মতে, এই তিনটি বিভাগের ক্ষমতার একত্রীকরণের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও লোপ পায়। সুতরাং মন্টেস্কুর রচনা জনগণকে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। তিনি স্বৈরতন্ত্রের যে বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেন এবং বিকল্প হিসেবে ক্ষমতা বিভাজনের যে প্রস্তাব দেন তা সমকালীন যুগে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মন্টেফু ফরাসি বিপ্লব দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার লেখনী ফরাসি জনতার মননে ব্যাপক প্রতিঘাত সৃষ্টি করেছিল। এজন্য ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব-পরবর্তী সংবিধানে তার ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির ব্যবহারিক প্রয়োগ করা হয়।

ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ) ভলতেয়ার ছিলেন ফরাসি দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম প্রতিভাবান। তার প্রকৃত নাম ফ্রাঁসোয়া ম্যারি অ্যারাউয়্যে। তিনি নাটক, কাব্য, ইতিহাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন। তার লেখাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে Oedipe, Letters Philosophiques, Elements of Essays on Universal History এবং Zodig." তার লেখার লক্ষ্য ছিল চার্চের দোষ-ত্রুটি এবং ধর্মের সঙ্গে যুক্ত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করা। তিনি আপসহীনভাবে সামন্তপ্রথা ও খ্রিষ্টানধর্মের গোঁড়ামিবিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী ও অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক দার্শনিক। তাকে মানবজাতির 'বিবেক' আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। তিনি প্রচলিত রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মনীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করে ফরাসি বিপ্লবের পথকে প্রশস্ত করেন। তিনি গির্জার দুর্নীতি ব্যঙ্গাত্মক লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করলে গির্জার প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভীতি কমে যায়। তার বিখ্যাত উক্তি হলো, “ঈশ্বর না থাকলে তাকে বানাতে হতো। কেননা, প্রকৃতি বলছে ঈশ্বর আছে।”
রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দ): ): বিপ্লবের প্রেরণা সৃষ্টিতে রুশোর অবদানও কিন্তু কম ছিল না। তিনি ফ্রান্সে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী প্রচার করেন। সাম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্র ছিল তার আদর্শ। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে New Heloisic, Confession, Emile ও Social Contract বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার বিখ্যাত সোশ্যাল কনট্রাক্ট (Social Contract-1762) গ্রন্থ দ্বারা শাসনক্ষেত্রে জনমত তথা জনগণই সার্বভৌম- এই মতবাদ প্রচার করেন। 'মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু মানুষ সর্বত্রই শৃঙ্খলবদ্ধ'- রুশোর এই মতবাদ বিপ্লবীদের কল্পনার আগুনে ফুলকি ধরিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে রুশো ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের অগ্রদূত। রুশো তার বিখ্যাত রচনায় এ সত্য প্রচার করেন যে, ঈশ্বর রাজা বা রাষ্ট্র সৃষ্টি করেননি। আদিতে' সব মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে স্বাধীন ও সুখী ছিল। জনসাধারণই রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস। সুতরাং রাজা জনসাধারণের মতানুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তার এ তত্ত্ব ইউরোপীয় চিন্তাজগতে এক বৈপ্লবিক চেতনার জন্ম দেয়। এ কারণে রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের মন্ত্রগুরু বলা হয়ে থাকে।
ডেনিস দিদারো (Denis Diderot): বিপ্লবের অব্যবহিত পূর্বের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন ডেনিস দিদারো।
তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষ রচনা করে ফ্রান্সে যুক্তিবাদী দৃষ্টি গঠনে সহায়তা করেছিলেন। এই গ্রন্থে মানুষের জ্ঞাতব্য সবকিছুই সন্নিবেশিত করা হয়েছিল এবং তদানীন্তন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনাও এ গ্রন্থে লিখিত হয়েছিল। মানুষের জন্মগত অধিকার, মানবধর্ম, শিক্ষা বিষয়ে তথ্যপূর্ণ লেখা। ছিল এ গ্রন্থে, যা বঞ্চিত মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে উজ্জীবিত করে।
এভাবে দেখা যায় যে, বিভিন্ন পণ্ডিত, জ্ঞানী দার্শনিকদের লেখনীর মাধ্যমে ফরাসি জনগণের মন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। তবু ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের অবদান সম্পর্কে ঐতিহাসিক বা গবেষকগণ একমত নন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ফরাসি বিপ্লব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই সংঘটিত হয়েছিল, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বা দার্শনিক কারণে নয়। এই বিতর্কের গভীরে না গিয়েও বলা যায় যে, দার্শনিকদের
প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই বিপ্লবকে উৎসাহিত করেছিল। কারণ দার্শনিকগণ তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দোষ-ত্রুটির প্রতি ফরাসি জনগণের দৃষ্টি আর্কষণ করে এক বিরাট জাগরণের সৃষ্টি করেছিলেন। তারা এভাবে পূর্বতন শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন, ফলে বিপ্লব সম্ভবপর হয়েছিল। একথা মানতে হবে যে, দার্শনিকদের সমালোচনা ও যুক্তিবাদী রচনা ফরাসি জনগণকে বিপ্লব সংঘটনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। সুতরাং ফরাসি বিপ্লবে মহান দার্শনিকদের প্রভাব ও অবদান ছিল অপরিসীম ও অনস্বীকার্য।
সমালোচনা
ফরাসি বিপ্লবের কারণগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন। ঐতিহাসিক ফিসারের মতে, "ফরাসি রাজতন্ত্র সমাজের ঊর্ধ্বতন সম্প্রদায়ের বিশেষ অধিকার সমাধান করতে পারেনি বলে বিপ্লব ঘটেছিল। সামন্তপ্রথার দোষ-ত্রুটি অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর ন্যায় ফ্রান্সের জাতীয় জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। ফরাসি রাজশক্তি এসব দোষ-ত্রুটি দূর করতে সক্ষম হয়নি।" ঐতিহাসিক মন্টেগু বলেন, "কৃষকদের দুরবস্থাই ছিল ফরাসি বিপ্লবের মূল কারণ।" জে. হল্যান্ড রুজের মতে, "ফরাসি দার্শনিকদের রচনার প্রভাবে জনমনে যে প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল তাতে ফরাসি বিপ্লবের সৃষ্টি হয়।" মর্স স্টিফেনের মতে, "এ বিপ্লবের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক- দার্শনিক বা সামাজিক নয়। "১৭ঐতিহাসিকদের উপর্যুক্ত মতামতগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, ফরাসি বিপ্লব কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে সংঘটিত হয়নি। প্রত্যেকটি কারণেরই এক-একটি বিশেষ প্রভাব ছিল। বিভিন্ন কারণের গুরুত্বে পার্থক্য থাকলেও সবগুলো কারণের সমষ্টিগত ফল হিসেবে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে ঘটেছিল। তবে এটা সত্য যে, অন্য কারণগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এটি ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল।
চতুর্থত: ইউরোপীয় অপর দেশগুলোর তুলনায় ফরাসি মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল সমাজসচেতন ও শিক্ষাদীক্ষায় অধিক উন্নত। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক উচ্চাশাই তাদের বিপ্লবী মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলে।
পঞ্চমত: ফরাসি কৃষকরা ছিল ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের কৃষকের তুলনায় অধিক মর্যাদা ও অধিকারসচেতন। তাদের আর্থিক অবস্থা অপরাপর ইউরোপীয় দেশের তুলনায় ভালো ছিল। ফলে ফরাসি কৃষকরা বিপ্লবের মূলবাণী ধারণ করতে সময়ক্ষেপণ করেনি।
ষষ্ঠত: ফরাসি দার্শনিকদের রচনা ফরাসি জনগণের মনে নতুন আশা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। এ সমস্ত কারণেই ফ্রান্সে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির পটভূমি তৈরি হয় এবং বিপ্লব ফ্রান্সেই প্রথম সংঘটিত হয়।
সপ্তমত: ষোড়শ লুইয়ের অর্থনৈতিক ধস ফ্রান্সে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা করে, যা রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার অনেক পূর্বেই ফ্রান্সে বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। ঐতিহাসিক কেটেলবি বলেন, "দুর্বল স্বৈরতন্ত্রী এবং দুর্বল রাজতন্ত্র, দুর্নীতিগ্রস্ত গির্জা, অভিজাতদের সংখ্যা বৃদ্ধি, রাজকোষের দেউলিয়াত্ব, অসন্তুষ্ট বুর্জোয়া, উৎপীড়িত কৃষক শ্রেণি, আর্থিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ প্রভৃতি কারণ ফ্রান্সকে বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেয়।
ইউরোপের সর্বত্র একই ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশে বিপ্লব না ঘটে ফ্রান্সে কেন বিপ্লব প্রথম দেখা দিয়েছিল, তার কারণ আলোচনা করা দরকার। বিভিন্ন কারণে ফ্রান্সেই বিপ্লব প্রথম দেখা দেয়।
প্রথমত: ফ্রান্সের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজতন্ত্র অপেক্ষা অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবীদের শক্তি প্রতিহত করার মতো ক্ষমতা রাজা ষোড়শ লুইয়ের ছিল না।
দ্বিতীয়ত: সামন্তপ্রথার নিষ্ক্রিয়তা বিপ্লবীদের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। সামন্ত প্রভুদের সাথে কৃষকদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বিদ্বেষমূলক। এ পরিস্থিতি কৃষকদের বিপ্লব সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিল।
তৃতীয়ত: ইউরোপীয় অপর দেশগুলোর তুলনায় ফরাসিরা অধিকমাত্রায় ব্যক্তিস্বাধীনতা আশা করত এবং এ কারণে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের জন্য তারা উদগ্রীব হয়ে বিপ্লবে জড়িয়ে পড়ে।
ফরাসি বিপ্লবের স্রষ্টা
এটি সর্বজনবিদিত যে, ফরাসি বিপ্লব তৃতীয় সম্প্রদায়েরই সৃষ্টি। কিন্তু তৃতীয় সম্প্রদায় একটি বিশেষ একক শ্রেণি ছিল না, এটি কৃষক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিপ্লবের সূচনা করেছিল কারা? এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ লক্ষ করা যায়। কতিপয় ঐতিহাসিক নির্যাতিত কৃষক শ্রেণিকে ফরাসি বিপ্লবের স্রষ্টা বলে অভিমত দেন। আবার কতিপয় ঐতিহাসিক মনে করেন বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল ফরাসি বিপ্লবের সূচনাকারী। তাদের যুক্তি হচ্ছে, বিপ্লব ঘটানোর মতো যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধি বা যোগ্যতা কৃষকদের ছিল না। বরং বুর্জোয়ারা ছিল শিক্ষিত ও ব্যবসায়ী। তারা যথেষ্ট বিত্তবান হলেও সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তাই সামাজিক মর্যাদা লাভের প্রত্যাশায় মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণি বিপ্লবের স্রষ্টা, কৃষকরা তাদের অভিযোগ ও সমস্যা থেকে উত্তরণের আশায় বুর্জোয়াদের অনুসরণ করেছিল মাত্র।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
ছোট-বড় নানা কারণের সমষ্টি ছিল ফরাসি বিপ্লব। ১৭৮৯-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্সে সংঘটিত ধারাবাহিক বৈপ্লবিক ঘটনার সমষ্টিকেই সাধারণত ফরাসি বিপ্লব নামে অভিহিত করা হয়। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সুবিধাভোগী শ্রেণির অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ বিপ্লবের সূচনা হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভূমিকা বিচার করলে ফরাসি বিপ্লবকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা- অভিজাত, মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণি, শহুরে জনগণ ও গ্রামীণ কৃষক। প্রথম পর্যায়ের বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল অভিজাত শ্রেণি, দ্বিতীয় পর্যায়ে বিপ্লবের নেতৃত্ব চলে যায় মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়াদের হাতে। তৃতীয় পর্যায়ে শহরাঞ্চলে গণবিপ্লব শুরু হয়। সর্বশেষ কৃষকবিপ্লব দেখা দেয়। বিপ্লবের গতি যেমন ছিল বৈচিত্র্যময়, তেমনি ছিল ব্যাপক। ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন ষোড়শ লুই ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন ফ্রান্সের অর্থনৈতিক জীবনে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। পূর্ববর্তী শাসক চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে টুর্গো ও নেকার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব করলেও সুবিধাবাদীদের বিরোধিতার মুখে তা কার্যকর হয়নি। ষোড়শ লুই অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব মোকাবিলা করার জন্য নতুন করারোপের সিদ্ধান্ত নিলে প্যারিসের পার্লামেন্ট তার বিরোধিতা করে। পার্লামেন্টারিয়ানরা মৃতপ্রায় 'States-General'-এর অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দেন। রাজা বাধ্য হয়ে ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মে 'States-General'-এর অধিবেশন আহ্বান করেন।
'States-General' তিন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত ছিল। জাতীয় মহাসংকটের সময় যখন ১৭৬ বছর পর এটি পুনরুজ্জীবিত হলো তখন শাসনতন্ত্রের প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিল। এর সদস্যসংখ্যা ছিল ১,২১৪। যাজক সম্প্রদায় অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির সদস্যসংখ্যা ছিল ৩০৮, অভিজাত সম্পদায়ের ২৮৫ এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল ৬২১ জন, তন্মধ্যে ৩৬০ জন ছিলেন আইনজীবী। সকল সদস্যের ভোটাধিকার ছিল না। সকল সম্প্রদায়ের সমষ্টিগত ১টি করে মোট ৩টি ভোট ছিল। স্বার্থের খাতিরে ১ম ও ২য় সম্প্রদায় বা শ্রেণি সর্বদাই এক থাকত। তাই ৩য় সম্প্রদায় অধিবেশনের শুরুতে প্রত্যেককে ভোটাধিকার দেওয়ার দাবি জানায়। তৃতীয় সম্প্রদায় অর্থাৎ সাধারণ জনতার প্রতিনিধিরা প্রত্যেকে ভোটাধিকারপ্রাপ্ত হলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হবেন- এ আশঙ্কায় রাজা তাদের দাবি অগ্রাহ্য করলেন। তারা তাদের দাবিতে অনড় রইলেন। অবশেষে তারা (১৭ই জুন ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) নিজেদের ফ্রান্সের National Assembly বলে ঘোষণা করলেন। তাদের যুক্তি ছিল, তারা ফরাসি জাতির ৯৬% জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সুতরাং তারাই সমগ্র জাতির মুখপাত্র। মূলত এ সময় থেকেই ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়।
'রাজা যাজক ও অভিজাতদের প্ররোচনায় ৩য় সম্প্রদায়কে দমন করার জন্য জাতীয় পরিষদের (National Assembly), অধিবেশন স্থগিত করলেন। ৩য় সম্প্রদায় ২০শে জুন তারিখে অধিবেশনের সময় এসে দেখে সভাগৃহ বন্ধ ও ফটকে সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা 'মিরাবোর' নেতৃত্বে পার্শ্ববর্তী টেনিস খেলার মাঠে সমবেত হলো। এখানে তারা এ সম্পর্কে শপথ নেয় যে, যত দিন তারা ফ্রান্সের জন্য শাসনতন্ত্র রচনা করতে না পারবে এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারবে তত দিন পর্যন্ত তারা সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। ইতিহাসে তা 'টেনিস কোর্টের' শপথ নামে পরিচিত।
সভাপতি বেইলি বলেন, "তৃতীয় শ্রেণি হলো প্রকৃত জাতি, একে কারও আদেশ করার অধিকার নেই।"
অতঃপর ষোড়শ লুই চিরাচরিত প্রথানুযায়ী অধিবেশন আহ্বান করেন এবং আলাদাভাবে ভোট প্রদানের কথা সকলকে জানিয়ে দেন। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ১ম ও ২য় সম্প্রদায় অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলেও ৩য় সম্প্রদায় সভাকক্ষে বসে রইল। তাদের কক্ষ ত্যাগের নির্দেশ দিলে 'মিাবো' দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, "আমরা জনগণের প্রতিনিধি, আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ স্থান থেকে বহিষ্কার করতে হলে একমাত্র বলপ্রয়োগ ছাড়া অন্য কিছুতে সম্ভব নয়।"" পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাজা ৩য় সম্প্রদায়ের দাবি মেনে নিলেন এবং সকল সম্প্রদায়কে একই সভায় বসার ও প্রত্যেককে ১টি করে ভোট দেওয়ার অনুমতি দিলেন।
বিপ্লবের সূচনা
এ সময় ফ্রান্সে অজন্মার (খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া) ফলে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয়। অসহায় কৃষককুল খাদ্যের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে প্যারিস নগরীতে সমবেত হতে লাগল। সরকারি ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বিপ্লবের উন্মাদনায় খাদ্যের জন্য লুটপাট শুরু করল। প্যারিস নগরী 'বিপ্লবের মঞ্চে' পরিণত হলো। ভীত-সন্ত্রস্ত রাজা আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় বিচলিত হয়ে ভার্সাই নগরীতে সৈন্য মোতায়েন করলেন। কিছুদিন পর জনপ্রিয় মন্ত্রী নেকারকে বরখাস্ত করলেন। এতে বিপ্লবের বহ্নিশিখা তীব্রতর হলো। দেশের সর্বত্র অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। জনসাধারণ সামন্তপ্রথার বিনাশকল্পে অভিজাতদের গৃহ আক্রমণ করে যাবতীয় মালামাল লুণ্ঠন করল। শুল্ক আদায়ের কুঠিগুলোতে আগুন দিল। এ ধ্বংসাত্মক কার্যাবলি দেখে যাজক ও অভিজাত শ্রেণি নিজ নিজ অধিকার ত্যাগ করল। এভাবে সামন্তবাদের শেষ চিহ্ন বিলুপ্ত হওয়ায় 'সামাজিক সাম্য' স্থাপিত হলো। জনসাধারণ লাফায়েতের নেতৃত্বে দেশরক্ষার জন্য 'National Guard' নামে একটি জাতীয় বাহিনী গঠন করল। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই উন্মত্ত ও বিপ্লবী জনতা অত্যাচারী শাসনের প্রতীক 'বাস্তিল দুর্গ' ধূলিসাৎ করে দিল। উন্মত্ত জনতা বন্দিগণকে মুক্ত করে বাস্তিলের গভর্নর দেলুনেকে হত্যা করল। রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও শোষণতন্ত্রের প্রাচীন প্রতীক দুর্গ 'বাস্তিলের' পতন ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে একটি চমকপ্রদ ঘটনা। এর পতনের মধ্য দিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। বিদ্রোহ বিপ্লবের রূপ ধারণ করল।
কৃষক-বিপ্লব
বাস্তিলের পতনের সংবাদ গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে কৃষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শোষণের সকল যন্ত্র ভেঙে ফেলতে তারা চঞ্চল হয়ে ওঠে। সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, পর পর শস্যহানি, বেকারত্ব ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি গ্রামীণ কৃষককে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশ যারা গ্রামাঞ্চলে বাস করত, তারা সামন্তপ্রথা ভাঙার জন্য কৃষকদের নেতৃত্ব দেয়। ইতিমধ্যে একটি গুজব ছড়াল যে, অভিজাতদের একদল ভাড়াটে গুণ্ডা গ্রামের শস্যক্ষেতগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কৃষক-বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ফ্রান্সের সকল স্থানে ক্ষুব্ধ কৃষকদের দ্বারা জমিদারদের পল্লি ভবনগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সামন্তপ্রথার বিনাশকল্পে জমিদার কুঠি ও শুল্ক আদায়ের, কুঠিগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। অনেক স্থানে কৃষকরা সামন্ত প্রভুদের জমিগুলো দখল করে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়। তারা বেগার খাটতে ও কর দিতে অস্বীকার করে। শুধু জমিদারই নয়, কলকারখানার মালিকরাও হামলার শিকার হয়। প্রদেশসমূহে বিপ্লব সামাজিক অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। এসব হামলা ও ভাঙচুরের সংবাদে যাজক ও অভিজাত প্রতিনিধিবর্গ ভীত হয়ে উঠলেন। ৪ঠা আগস্ট প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি নাটকীয়ভাবে নিজেদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা বর্জন করতে শুরু করে। মাত্র এক রাতে কমপক্ষে ত্রিশটি আইন জারি করে মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাগুলোর উচ্ছেদ সাধন করা হয়। ফরাসি বিপ্লবের - ইতিহাসে এ রাত 'বঞ্চিতদের রাত' নামে খ্যাত।
বাস্তিল দুর্গ পতনের গুরুত্ব
বাস্তিল দুর্গের পতন ফ্রাগের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঐতিহাসিকদের মতে, এ পতনের প্রতীকী মূল্য ছিল ব্যাপক। দুর্গটি ছিল বুরবো শাসকদের ক্ষমতা ও শক্তির প্রতীক, অত্যাচারের প্রতীক। তাই বাস্তিল দুর্গ পতন মানে সনাতন সমাজব্যবস্থারই পতন। ফ্রান্সের সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটে; পৌর বিপ্লবের পথ সুগম হয়। বাস্তিলের পতনের সাথে সাথে রাজতন্ত্রের সমর্থক সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে। রাজতন্ত্রের অবসানে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অচলাবস্থা দেখা দেয় এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ দুর্গ পতনের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে জনসাধারণ প্যারিস নগরীতে বিপ্লবাত্মক কাজ শুরু করে। সৈন্যদের মধ্যে বিপ্লবের প্রভাব বিস্তার লাভ করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক গুডউইন বলেন, "বিপ্লবের অন্য কোনো ঘটনা বাস্তিলের মতো বিভিন্নমুখী বা সুদূরপ্রসারী ছিল না।"২০

'বাস্তিল দুর্গ' পতনের কিছুদিন পরেই রাজা ষোড়শ লুই নেকারকে পুনরায় মন্ত্রী নিয়োগ করলেন। কিন্তু বিপ্লবের গতিধারা ক্রমেই অদমনীয় হয়ে ওঠে এবং বেকার, দরিদ্র ও খাদ্যাভাবে পিষ্ট জনতা আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকে। ৫ই অক্টোবর কয়েক হাজার রমণী খাদ্যের দাবিতে 'ভুখা মিছিল' নিয়ে ভার্সাইয়ের দিকে যাত্রা করে। ঐতিহাসিক রাইকার বলেন, "রাজা তার শেষ সমাধি রচনার জন্য এক রকম বন্দি অবস্থায় রানিসহ প্যারিস নগরীতে আসতে বাধ্য হলেন।" এ ঘটনাকে 'রাজতন্ত্রের শবযাত্রা' বলা হয়েছে। কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও রাজা জনসাধারণের ইচ্ছার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেন না। রাজতন্ত্রের সাথে জনতার ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল। ফলে ফ্রান্সের ইতিহাস রক্তে রঞ্জিত হলো। এটা ছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রথম অধ্যায়। ইতিমধ্যে বিপ্লবের কার্যে সহযোগিতার জন্য ফ্রান্সে বহু ক্লাব বা সংঘের উদ্ভব হলো। রাজপরিবার প্যারিসে আগমনের ফলে এখানে জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করা হয়; যার কাজ ছিল ফ্রান্সের জন্য নতুন সংবিধান বা শাসনতন্ত্র রচনা করা। ইতিহাসে তা 'ফরাসি গণপরিষদ' বা 'সংবিধান সভা' নামে পরিচিত।
বিপ্লবী সংস্কার ও সংবিধান সভা
ফরাসি বিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সভা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এর কার্যাদির মধ্যে পূর্বতন আমলের সকল বৈষম্য, দুর্নীতি ও অনাচার ইত্যাদির বিলুপ্তির ঘোষণা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের স্থলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ ছিল। ভার্সাই থেকে রাজপরিবারের প্যারিস নগরীতে আগমনের ফলে জাতীয় সভাকেও প্যারিসে অধিবেশন বসাতে হলো। তখন থেকে এই সভা ফ্রান্সের জন্য নতুন সংবিধান রচনা বা গঠনে মনোনিবেশ করে এবং স্বভাবতই তা ফরাসি সংবিধান সভায় পরিণত হয়। এর কার্যকাল ছিল ১৭৮৯-৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
সংবিধান সভা সামন্তপ্রথাজনিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলুপ্ত করে পুরাতন শাসনব্যবস্থার ত্রুটি দূর করেছিল। রুশোর গণতান্ত্রিক ভাবধারা, ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা প্রভৃতির অনুকরণে ফরাসি গণপরিষদ মানুষের মৌলিক অধিকারসম্বলিত এক বিপ্লবী * অধিকারম প্রস্তাবনাপত্র সন্নিবিষ্ট করেছিল। প্রস্তাবনাপত্রে বলা হয় যে-২১
১। স্বাধীনতা মানুষ মাত্রেরই জন্মগত অধিকার এবং প্রত্যেকে সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী।
২। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পত্তি ভোগের স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং অত্যাচারের বিরোধিতা করা মানুষের মৌলিক অধিকার।
৩। আইনের চোখে সকলেই সমান এবং বিনা বিচারে কাউকে কারারুদ্ধ করা চলবে না।
৪। ধর্মীয় ব্যাপারে স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি ব্যক্তি মাত্রেরই আছে।
৫। জনগণই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক। এককথায় স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী তথা ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব ঘোষণা এই সনদে রূপলাভ করে। এই ঘোষণা সম্পর্কে ঐতিহাসিক আলার্ড (Aulurd) বলেন, "The declaration was a death certificate of the old Regime. "
অতঃপর সংবিধান সভা শাসনতন্ত্র রচনায় মনোনিবেশ করে এবং ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে চূড়ান্তভাবে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। নিম্নলিখিত শর্তাবলি এই সংবিধানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
অতঃপর সংবিধান সভা শাসনতন্ত্র রচনায় মনোনিবেশ করে এবং ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে চূড়ান্তভাবে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। নিম্নলিখিত শর্তাবলি এই সংবিধানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
১। প্রথমেই রাজার ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং রাজার খরচের জন্য Civil list প্রস্তুত করা হয়।
২। আইনসভার মতামত ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণা বা শান্তি স্থাপন করা অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
৩। রাজা নতুন আইন বাতিল করতে পারবেন না, কিন্তু সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য তাকে সাসপেনসিভ ভেটো ক্ষমতা দেওয়া হয়।
৪। আইনসভা এক কক্ষযুক্ত হবে এবং এর সদস্যগণ জনগণের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। ভোটাধিকারের ব্যাপারে ফরাসি জনগণকে 'সক্রিয়' ও 'নিষ্ক্রিয়' নাগরিক- এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। কেবল সক্রিয় নাগরিকগণেরই ভোটাধিকার ছিল।
৫। সারা দেশকে ৮৩ ডিপার্টমেন্টে ভাগ করা হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, সকল ডিপার্টমেন্টের প্রধানগণ জনগণ কর্তৃক নিযুক্ত হবেন, কিন্তু তারা সভার সদস্য হতে পারবেন না।
৬। জাতির অর্থনৈতিক কাঠামোর নিরাপত্তা বিধান সংবিধান সভার পরবর্তী কাজ।
৭। পরবর্তী কাজ হলো ধর্মসংক্রান্ত। Civil Constitution of the Clergy নামের এক আইন দ্বারা প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে বা প্রদেশে একটি করে চার্চ স্থাপন করা হলো। সেসব চার্চের যাজকগণ জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন বলে স্থির করা হয়। ফলে যাজকগণ অন্যান্য কর্মচারীর ন্যায় মাসিক ভাতা পেতেন। এভাবে চার্চ রাষ্ট্রের অধীন হয়ে যায়।
৮। সর্বশেষ রোবস্পিয়ার নামের এক নেতার প্রস্তাব অনুসারে এই সংবিধান সভার কোনো সদস্য নতুন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী গঠিত আইনসভার সভ্য হতে পারবেন না বলে স্থির করা হয়।
৯। বিনা বিচারে কাউকে কারারুদ্ধ রাখা আইনবিরুদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয় এবং 'লেত্রে ডি কেশে' (Lettre de Cachet) নামক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বিলোপ করা হয়। স্থির হয়, বিচারকগণ সক্রিয় ভোটদাতাগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন এবং বিচারে জুরিপ্রথা প্রবর্তিত হয়। রাজা ও পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করা হয়।
এভাবে সংবিধান সভা ফ্রান্সের জন্য এক নতুন শাসনব্যবস্থা উদ্ভাবন করে। পূর্বতন শাসনামলের অনেক দোষ-ত্রুটি দূরীভূত হলো এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হলো। কিন্তু বাস্তবতাবর্জিত ও ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত সদস্যগণ সংস্কারগুলো এত দ্রুত প্রবর্তন করেন যে, এর ফলে জাতীয় ঐক্যের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে এবং সর্বত্র অরাজকতা ও অনিশ্চয়তার লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। নতুন শাসনতন্ত্রে নানা ত্রুটি ছিল, এগুলো নিম্নরূপ:
শাসনতন্ত্রের রচয়িতাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল যে, তারা যে দ্রুতগতিতে পূর্বতন ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন করেছিলেন, সেই গতিতে পুনর্গঠনের কার্য সম্পন্ন করতে পারেননি। শাসনতন্ত্রের ত্রুটিসমূহ পর্যালোচনা করে আমরা দেখি যে, নতুন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী রাজার সার্বভৌম ক্ষমতা অপ্রত্যাশিতভাবে খর্ব করা হয় এবং এর ফলে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। শাসন বিভাগ ও আইন পরিষদকে এমনভাবে পৃথক করা হয় যে, রাজার মন্ত্রীগণ এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়। রাজার প্রতি অত্যধিক সন্দেহ পোষণ করার ফলে শেষ পর্যন্ত নতুন শাসনব্যবস্থা বিফলতায় পর্যবসিত হয়েছিল। এছাড়া সম্পত্তির মালিকানার উপর ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে বহু লোক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দ্বারা স্বীকৃত সাম্যনীতি এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। এক কক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগব্যবস্থা মোটেও সন্তোষজনক হয়নি। Civil Constitution of the Clergy প্রণয়ন করেই সংবিধান সভা সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ভুল করেছিল। কারণ এতে চার্চের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে একে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অধীনে নিয়ে এসেছিল। এই বিধান প্রবর্তনের ফলে উচ্চ স্তর এবং অধস্তন উভয় শ্রেণির যাজক সম্প্রদায়ের মনে সন্দেহ ও ভীতির উদ্রেক করে এবং বিপ্লব সম্পর্কে ফরাসি জাতির মনোভাব দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়। রোবম্পিয়ারের প্রস্তাব অনুসারে সংবিধান সভার কোনো সদস্য নতুন আইনসভার সদস্য হতে না পারার কারণে সেসব সদস্য যেটুকু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তা থেকে ফরাসি জাতি বঞ্চিত হয়। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক ছিল।
পরিশেষে মন্তব্য করা যায় যে, এসব দোষ-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ফ্রান্সের সংবিধান সভার কার্যাবলি একেবারেই ব্যর্থ হয়নি। ঐতিহাসিক ক্রপোটকিনের ভাষায়, “সংবিধান সভার কার্যাদি নিঃসন্দেহে মধ্যবিত্তের হলেও রাজনৈতিক সাম্যের আদর্শ, অসমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহচিত মনোভাবের স্ফুরণের আদর্শ প্রভৃতি নতুন আদর্শের প্রবর্তন সংবিধান সভার মহান কৃতিত্বের পরিচায়ক।"২২ সামাজিক বৈষম্য দূর করে তা নির্যাতিত মানুষকে মুক্তির সন্ধান দেয় এবং জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। তৎকালীন অসাম্য ও সুবিধা-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সাম্যনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত নতুন সমাজব্যবস্থার আংশিক গোড়াপত্তন করে। তাছাড়া সংবিধান সভা কর্তৃক প্রাদেশিক সুবিধা ও স্থানীয় ঐতিহ্যসমূহের বিলোপসাধন জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পথ প্রশস্ত করে।
সন্ত্রাসের রাজত্ব
ফরাসি বিপ্লবের অগ্রগতির ইতিহাসে সন্ত্রাসের বা ত্রাসের রাজত্ব একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এর ব্যাপ্তিকাল ছিল ১০/১০/১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২৮/০৭/১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ফরাসি বিপ্লবের পরে বিপ্লববিরোধী মনোভাব, রাজতান্ত্রিকদের দমন ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে জাতীয় কনভেনশনের বামপন্থি উগ্র জেকোবিন দল যে জরুরি অবস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিপ্লবী আদর্শকে সংহত করতে তৎপর ছিল, তা-ই ইতিহাসের সন্ত্রাসের শাসন বা ত্রাসের রাজত্ব। এর প্রধান নেতা ছিলেন রোবস্পিয়ার। ত্রাসের রাজত্ব ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি আপৎকালীন জরুরি শাসনব্যবস্থা, যা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। তবে মানতে হবে যে, তৎকালীন সময়ে এর বিশেষ প্রয়োজন ছিল।
সন্ত্রাসের রাজত্বের পটভূমি
জাতীয় কনভেনশনের সকল সদস্য একজোট হয়ে ফ্রান্সকে 'প্রজাতন্ত্র' বলে ঘোষণা করলেও তাদের মধ্যে মতৈক্যের চেয়ে মতানৈক্যই ছিল বেশি। তাই শুরু থেকেই জাতীয় কনভেনশনের কাজকর্ম অভ্যন্তরীণ সংহতির অভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষত দেশের বাইরে-ভেতরে নানাবিধ সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে সংহতির অভাব জাতির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আদর্শগত দিক দিয়ে গিরোন্ডিস্ট দল মনে করত, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ফ্রান্সের বিপ্লব জয়যুক্ত হয়েছে। জেকোবিন দল মনে করত, কেবল প্রজাতন্ত্র ঘোষণাতেই বিপ্লবের সুফল নিশ্চিত নয় বরং প্রজাতন্ত্রবিরোধী ও রাজতন্ত্রের সমর্থকদের শাস্তি দিয়ে বিপ্লবকে নিরাপদ করা প্রয়োজন। রাজা ষোড়শ লুইকে মৃত্যুদণ্ডে (২১শে জানুয়ারি, ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে) দণ্ডিত করলে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রীয় ব্যাপারে এক চরম শোচনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় উগ্রপন্থি জেকোবিন দলের সদস্যরা বিপ্লবকে বাঁচানোর জন্য এক স্বৈরাচারী নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল। বিপ্লবী নেতা মারাট এ ব্যবস্থাকে 'মুক্তির স্বৈরতন্ত্র' বলে অভিহিত করেছেন। আসলে এ ব্যবস্থা ছিল ভীতি ও বলপ্রয়োগ এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিপ্লবকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার এক অভিনব পদ্ধতি।
এককথায় বলা যায়, রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং উদ্দেশ্যসাধনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। আর এ ঐক্য অর্জন ভীতি প্রদর্শনের দ্বারাই সম্ভব। এ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়েই তারা ফ্রান্সে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।'
তিনটি কারণে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়ে পড়েছিল-
প্রথমত: বিপ্লবীদের হাতে ষোড়শ লুইয়ের প্রাণনাশে সারা ইউরোপে স্বৈরাচারী শাসকগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন এই ভেবে যে, তাদের নিজ নিজ দেশের মানুষের মধ্যে চরমপন্থার অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে।
দ্বিতীয়ত: জাতীয় কনভেনশনের বিপ্লবী আদর্শ প্রচারের সম্প্রসারণনীতি ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে বিপ্লববিরোধী হয়ে ওঠে। তাই ইউরোপীয় শক্তিসমূহ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়ে আক্রমণে উদ্যত হয়।
বৈদেশিক আক্রমণের আশঙ্কা ছাড়াও ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বিপ্লববিরোধী হয়ে পড়ে। এরূপ অবস্থায় ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে রাজতন্ত্রের সমর্থকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। প্যারিস কমিউনের একাধিপত্য ও প্রাধান্য অন্যান্য শহরবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। রাজনৈতিক অসন্তোষের সাথে ধর্মীয় বিবাদ যুক্ত হয়ে এক জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। এসব কারণে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে জেকোবিন দল বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য এ ব্যবস্থা কায়েম করতে বাধ্য হয়। এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাকে জোরদার করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিপ্লববিরোধীদের শাস্তি বিধান করা এবং যুদ্ধের প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীকে সংগঠিত করা।
সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা
উপর্যুক্ত পটভূমিকায় দেশে একটি শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠা করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। ফ্রান্সের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১২ জন সদস্য নিয়ে রোবম্পিয়ারের নেতৃত্বে 'জননিরাপত্তা কমিটি' গঠন করা হয়। এই কমিটিকে সহায়তা করার জন্য তিনটি সংস্থা গঠন করা হয়- সন্দেহ আইন, বিপ্লবী বিচারালয় ও বিপ্লবী বধ্যভূমি। জননিরাপত্তা কমিটিকে সহায়তাদানের জন্য বিরাট সেনাবাহিনী গঠিত হয়।
সন্দেহ আইনের বলে যেকোনো ব্যক্তিকে রাজতন্ত্রের সমর্থক বা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধী বলে সন্দেহ হলে গ্রেফতার করা যেত। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেফতারের জন্য সমগ্র ফ্রান্সে ৫০,০০০ বিপ্লবী কমিটি গঠন করা হয়।
বিপ্লববিরোধী ব্যক্তিদের বিচারের জন্য এক বিশেষ বিপ্লবী বিচারালয় গঠিত হয়। এটি স্থাপিত হয় ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে। এটি ছিল বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত এবং এর রায় চূড়ান্ত বলে গৃহীত হতো। বিপ্লবী বিচারালয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে তা কার্যকর করা হতো।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে বিপ্লবী বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হতো এবং গিলোটিনের আঘাতে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। মৃত ব্যক্তির সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতো। একমাত্র প্যারিসের বিচারালয়ের রায়ে এক হাজারের অধিক নর-নারীকে গিলোটিনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল।
ত্রাসের রাজত্বের ফল
ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফ্রান্সের অবস্থার উন্নতি হয়। ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের উল্লেখযোগ্য উন্নতির মূলে ছিল সন্ত্রাসের শাসনের সাফল্য। বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিপ্লববিরোধী সকল শক্তিকে দমন করে ফ্রান্সের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।
ঐতিহাসিক ওলার বলেন, "সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল পরিস্থিতির চাপে উদ্ভূত স্বৈরশাসন ব্যবস্থা।"২৩ ঐতিহাসিক রাইকার বলেন, "ত্রাস-রাজত্ব প্রতিষ্ঠা বাস্তবধর্মী রাজনীতি জ্ঞানের একটি বিস্ময়কর অবদান। এটি ফ্রান্সকে বিপদমুক্ত করেছিল।" সন্ত্রাসের শাসন যে এক অসাধারণ ও অভূতপূর্ব শাসনব্যবস্থা ছিল এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ফ্রান্সের সংকটময় মুহূর্তে এ রকম শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। সংকট থেকে উত্তরণের জন্য 'জরুরিকালীন স্বেচ্ছাতন্ত্র' এবং 'ক্লেশ স্বেচ্ছাতন্ত্রের' প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। সংকটময় পরিস্থিতিতে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে ও বৈদেশিক আক্রমণে ফ্রান্স খণ্ড খণ্ড হয়ে যেত। অনেকের কাছে সন্ত্রাসের রাজত্ব অসহ্য মনে হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন দল-উপদলের মধ্যে রোবস্পিয়ারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে এবং তার বিরুদ্ধে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়। আকস্মিকভাবে একদিন সকলে মিলে রোবস্পিয়ার ও তার অনুগামীদের গিলোটিনে হত্যা করলে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে
ফরাসি কয়েকজন নেতা
মিরাবো (Mirabeau): ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম জননেতা মিরাবো এক অভিজাত পরিবারে ১৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দে
জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল ও অমিতব্যয়ী ছিলেন। তিনি একপ্রকার সমাজচ্যুত হয়ে তৃতীয় সম্প্রদায়ে যোগদান করেন এবং বিপ্লবে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে ফ্রান্সের জাতীয় সভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনকালে তিনি সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, "আমি একটা খ্যাপা কুকুর। কিন্তু আমাকে আপনারা নির্বাচিত করুন; দেখবেন আমার কামড়ে স্বেচ্ছাচারিতা ও সুবিধাবাদের অপমৃত্যু হয়েছে।" বিপ্লবকালীন টেনিস কোর্টের শপথে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পক্ষপাতী ছিলেন না কিন্তু রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। উপযুক্ত সংস্কারের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের দোষ-ত্রুটি দূর করতে চেয়েছিলেন। এজন্য রাজা ষোড়শ লুইকে তিনি শাসনতান্ত্রিক পথে বিপ্লব পরিচালনা করতে বলেছিলেন। ষোড়শ লুইয়ের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি রাজাকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অবিবেচক রাজা তার উপদেশ গ্রহণ করেননি। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যু হলে ফরাসি রাজতন্ত্রের সকল আশার অবসান ঘটে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বিপ্লব এত সর্বগ্রাসী হয়ে ধ্বংসলীলার সূত্রপাত করতে পারত না। তার উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি বিপ্লবকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করা।

ডানটন: ডানটন ছিলেন একজন আইনজীবী এবং জেকোবিন দলের বিপ্লবী নেতা। গ্রান্ট এবং টেমপারলের মতে, "বিপ্লবের ইতিহাসে ডানটন একটি অদ্ভুত চরিত্র।" ফ্রান্সের বিপ্লবের পুরোভাগে ছিলেন তিনি। তার কর্মকুশলতায় ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্স প্রুশিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। তিনি জেকোবিন গিরোন্ডিস্টদের মধ্যে বিভেদ তুলে দিয়ে ফ্রান্সের মঙ্গলার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার পক্ষপাতী ছিলেন। ত্রাসের রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী হোক এটা তার কাম্য ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি উগ্রতা পছন্দ করতেন না। জেকোবিন দলের উগ্রপন্থি নেতা রোবস্পিয়ারের সাথে তার মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং গিলোটিনের দ্বারা মৃত্যু কার্যকর করা হয়। তার মৃত্যুর পর রোবম্পিয়ারের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে।

রোবস্পিয়ার: ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ছিলেন রোবস্পিয়ার। তিনি ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই মে ফ্রান্সে
জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি ছিলেন আইনজীবী। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত উগ্রপন্থি। তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। ব্যক্তি চরিত্রের সংকীর্ণতা, একদেশদর্শিতা ও উচ্চাভিলাষ একদিকে তাকে যেমন হেয়প্রতিপন্ন করেছিল, তেমনি সত্যনিষ্ঠা ও নীতিজ্ঞানের জন্য সমসাময়িক বিপ্লবীদের মধ্যে তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিল। তিনি সদ্গুণ ও বিভীষিকাকে শাসনকার্যের হাতিয়ার বলে মনে করতেন। তার ব্যক্তিগত চরিত্রে একদিকে ছিল উদার রূপ, অন্যদিকে ছিল নিষ্ঠুরতা। ডানটন ও হার্বার্টের মৃত্যুর পর জেকোবিন দলের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। রাজতন্ত্র অবসানের পর তিনি ফ্রান্সে বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ছিলেন। তার প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় বহু লোকের মৃত্যু ঘটেছিল; তবে তিনি বিভীষিকার পথ ধরেই বিপ্লবকে রক্ষা করেছিলেন। ক্ষমতার অন্ধমোহ তার জীবনে করুণ পরিণতি ডেকে এনেছিল। ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জুলাই তিনি অনুচরবর্গসহ এক হোটেলে প্রতিবিপ্লবীদের হাতে ধৃত হন এবং তাকে ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুলাই গিলোটিনে হত্যার মধ্য দিয়ে ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।
লাফায়েত (Lafayette): লাফায়েত ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের
এক গর্বিত সৈনিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জনস্বার্থ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বিধান করা প্রত্যেক শাসনব্যবস্থারই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তিনি ছিলেন নির্ভীক ও উদারচেতা। মানবাধিকারের মহান দলিলে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও শাসনকার্য-নির্বাহক কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। নেপোলিয়নের মতে, তিনি ছিলেন নির্বোধ ও বিপ্লবী নেতা। মিরাবোর মতে, তিনি ছিলেন প্রধান বিদূষক, ডেনিস রিচার্ডের মতে, তিনি ছিলেন সাহসী, নিষ্ঠাবান, যুদ্ধপ্রিয়, আবেগপ্রবণ ও নির্বোধ।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
পৃথিবীর ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব এক যুগান্তকারী আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে যে বুর্জোয়া বিপ্লবের সূচনা হয় তা পূর্বতন সমাজের পতনের পূর্বাভাস বলা যায়। বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। সাধারণ কৃষক শ্রেণি বিপ্লবে অংশ নিয়ে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটায়। ফলে তা 'প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের' রূপ নিয়ে ফ্রান্সে পৌর-বিপ্লবের সূচনা করে। আবার একপর্যায়ে বিপ্লবের নেতৃত্ব উগ্রপন্থি জেকোবিন দলের নিকট চলে যাওয়ায় তা 'গণবিপ্লব' হিসেবে আখ্যা পায়। যে বিপ্লবের নামেই তাকে আখ্যায়িত করা হোক না কেন তা সর্বজনীনভাবে ফরাসি বিপ্লব নামে স্বীকৃত; যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটে জুলাই (১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে) ও ফেব্রুয়ারি (১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল নিম্নরূপ:
ক) সামন্তপ্রথার বিলোপ ফরাসি বিপ্লবের ফলে পতনোন্মুখ সামন্তপ্রথার অবসান ঘটে। অভিজাত সম্প্রদায়ের সামন্তপ্রথাজনিত বিশেষ অধিকার খর্ব হয়। সামন্তপ্রথাজনিত সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ক্ষমতা লোপ পায়। গিল্ড প্রথার বিলোপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
খ) নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের স্থলে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম একটি সাফল্য। রাজার সীমাহীন ক্ষমতা খর্ব করা হয়। রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। রাজার ক্ষমতা প্রতিনিধি সভার অধীন করা হয়।
গ) বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ফরাসি বিপ্লবের একটি বড় অবদান হচ্ছে বিপ্লবী চেতনার সঞ্চার। বিপ্লবের মূলমন্ত্র স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী ইউরোপের সর্বত্র স্বাধিকারের বীজ ছড়িয়ে দেয়। ফরাসিরা গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে আরও বিপ্লবের জন্ম দেয়।
ঘ) গির্জার সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ: ফরাসি বিপ্লবের আরও একটি সফল দিক হলো, ফরাসি সমাজের দুর্নীতির প্রতীক গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও রাষ্ট্রীয়করণ। এতে শত-সহস্র বছরের সঞ্চিত ধর্মান্ধতা, হীনম্মন্যতা ও অসহিষ্ণুতা দূরীভূত হয়। 'পুরোহিতদের নাগরিক সংবিধান-১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ' নামে আইনের দ্বারা পোপের ধর্মীয় প্রভাব সীমিত করা হয়, ধর্মযাজকের সংখ্যা হ্রাস করে ক্ষমতা খর্ব করা হয়।
ঙ) মানুষের মৌলিক অধিকার ঘোষণা: ফরাসি বিপ্লবের আরেকটি সাফল্য হলো মানুষের মৌলিক অধিকার ঘোষণা ও এর মূলনীতিসম্বলিত প্রস্তাব গ্রহণ। রুশোর গণতান্ত্রিক ভাবধারায় পুষ্ট হয়ে এবং আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয় পরিষদ এ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ছিল ফ্রান্সের ম্যাগনাকার্টা। ফরাসিরা শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, সাম্যবাদ ও স্বাধিকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের সূচনার প্রেরণা পায় এ ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে।
চ) সীমাবদ্ধ ভোটাধিকারের প্রচলন গণপরিষদের সদস্যরা জনসাধারণের সীমাবদ্ধ ভোটাধিকারের মধ্যেমে নির্বাচিত হবেন, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম সাফল্য। যদিও সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রচলন বিপ্লবীদের দাবি ছিল। সম্পত্তির ভিত্তিতে জনসাধারণকে 'সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়' নাগরিক হিসেবে বিভক্ত করা ভোটাধিকার প্রয়োগের নেতিবাচক দিক। বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে এটুকু প্রাপ্তিও ছিল অনেক।
ছ রাজনৈতিক দলের উদ্ভব: ফ্রান্সে চারটি রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। যথা-
১। প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থি দল, যারা পূর্বতন শাসনতন্ত্র ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার পক্ষপাতী ছিল।
২। নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রপন্থি বা মধ্যপন্থি নিরপেক্ষ দল, যারা ইংল্যান্ডের ন্যায় ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র স্থাপনের পক্ষপাতী ছিল।
৩। রাজতন্ত্রবিরোধী বামপন্থি উগ্র জেকোবিন দল।
৪। রাজতন্ত্রবিরোধী নরমপন্থি গিরোন্ডিস্ট দল।
জ) স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠা: স্থানীয় শাসনব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ ও জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তা ন্যস্ত করা ছিল ফরাসি বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য ফলাফল। সমগ্র ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে ভাগ করা হয় এবং এগুলোকে, আবার ৩৭৪টি ক্যান্টনে বিভক্ত করা হয়। ক্যান্টনগুলোকে আবার ৪৪,০০০ কমিউনে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেক অঞ্চলের শাসনভার স্থানীয়ভাবে প্রদান করা হয়। স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত ক্ষমতা কমিউনগুলোর হাতে ন্যস্ত হওয়ায় রাজার প্রত্যক্ষ শাসনের অবসান ঘটে।
ঝ) জাতীয়তাবাদী চেতনার সৃষ্টি: ফরাসি বিপ্লবের ফলে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভব হয়। 'জাতি দীর্ঘজীবী হোক'- বিপ্লবীদের জাতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত এ স্লোগান একাত্মবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহ্য সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা ভিন্ন ভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক একে আঠারো শতকের অন্যান্য বিপ্লবের সাথে তুলনা করেছেন। কেউ আবার আধুনিক গণতন্ত্রে বিবর্তনে এর বিশেষ অবদানের উপর, গুরুত্ব দিয়েছেন। কেউ বা গণতান্ত্রিক নীতিমালার মূল্যায়নে জনগণের সার্বভৌমত্বের উপর বেশি জোর দিয়েছেন। মূলত ফরাসি বিপ্লবের তাৎপর্য ও প্রভাব ছিল বহুমুখী। এ বিপ্লবের ফলে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজজীবন ও চিন্তাধারা, কূটনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহের সনাতন ভাবধারা সমূলে উৎপাটিত হয়। এ বিপ্লব সংঘটিত হয় জ্ঞানদীপ্ত মধ্যবিত্তের স্বার্থের অনুকূলে এবং পরিচালিত হয় একটি মধ্যপন্থি শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে।
মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হতে। রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের সমবণ্টন, দুঃসহ অভাব-অভিযোগের সমাধান ও অযৌক্তিক-অসংগত ত্রুটির সংশোধন বিপ্লবীদের দাবি ছিল। স্বৈরাচারী শাসনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা বিপ্লবী নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ক্রমশ মধ্যবিত্ত নরম সাংবিধানিক আন্দোলনকারীদের হাত থেকে বিপ্লবের নেতৃত্ব চলে যায় বেপরোয়া জনতার হাতে। ফলে বিপ্লবের ফলাফল ও প্রভাবে বহুমুখিতা লক্ষ করা যায়।
ইউরোপে ও বিশ্বে ফরাসি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
নিঃসন্দেহে ফরাসি বিপ্লব ছিল ঐতিহ্যমণ্ডিত ও সর্বজনীন বিপ্লব। এর প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এর প্রভাবে আন্দোলিত হয় ইউরোপসহ সারা বিশ্ব। বিপ্লব শুরুর সময় ইউরোপের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিপ্লবকে স্বাগত জানায়। কিন্তু বিপ্লবোত্তর এর আবর্ত ও গতি বাড়তে থাকলে এর প্রতিক্রিয়ায় ভিন্নতা আসে। তবে নেপোলিয়নের শাসনামল এবং পরবর্তী সময়েও বিপ্লবের প্রভাব ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদ্যমান ছিল। ইউরোপব্যাপী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে ইউরোপের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুদ্ধের পথ উন্মুক্ত হয়।
ইউরোপীয় শক্তিবর্গের সাথে ফ্রান্সের যুদ্ধ সৃষ্টির প্রকৃত কারণ হলো:
১। ফরাসি বিপ্লবের আবর্ত বৃদ্ধি ও বিপ্লবের গতির বহির্মুখিতা;
২। ইউরোপীয় রক্ষণশীল রাজন্যবর্গের বিপ্লবভীতি। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই ও রানি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। এতে অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল প্রভৃতি রাজতান্ত্রিক দেশের রাজন্যবর্গের মধ্যে বিপ্লবভীতির সঞ্চার হয়। ফ্রান্সের বিপ্লবী ভাবধারা থেকে নিজ নিজ দেশকে রক্ষার জন্য ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রজোট গঠন করে।
৩। ফ্রান্স 'এভিগনন' দখল করলে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে ফ্রান্সের পররাজ্য গ্রাসের নীতি সম্পর্কিত উদ্বেগের সঞ্চার হয় এবং
৪। ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সের রাজ্যাংশ দখলের উদ্যোগ নেয়। অপরদিকে ফ্রান্স ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ থেকে ফ্রান্সকে রক্ষার এবং বিপ্লবের প্রভাব সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে যুদ্ধে জড়ায়।
প্রথম দিকে ফ্রান্স শুধু বিপ্লবকে রক্ষার জন্যই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ আক্রমণাত্মক যুদ্ধে রূপ নিতে বেশি সময় লাগল না। আক্রমণাত্মক যুদ্ধের সাথে জাতীয়তাবোধের সংমিশ্রণ থাকায় বিপ্লবী যুদ্ধ সর্বগ্রাসী যুদ্ধে পরিণত হলো।
ক. ইংল্যান্ডে প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব: ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী প্রথম দিকে ব্রিটিশদের
মনে তুমুল আনন্দোচ্ছ্বাস জাগিয়েছিল। ফ্রান্সের বুরবোঁ রাজবংশের পতনে চিরশত্রু ইংল্যান্ড সন্তোষ প্রকাশ করেছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পিটের প্রত্যাশা ছিল, ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে উভয় দেশের বৈরিতা দূর হবে। ব্রিটিশ প্রশাসনের ধারণা ছিল, ফরাসি বিপ্লব একান্তই স্থানীয় ঘটনা, ইংল্যান্ড পর্যন্ত এর প্রভাব প্রসারিত হবে না। কিন্তু অচিরেই ইংল্যান্ডের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ইংল্যান্ডস্থ ফরাসি বিপ্লবের অনুসারীরা ফ্রান্সের অনুকরণে বিভিন্ন ক্লাব গঠন করতে শুরু করে। বিপ্লবের সর্বনাশা গতিধারায় ইংল্যান্ড সংক্রমিত হয়। বিপ্লবের বাড়াবাড়ি ও হিংসার ব্যাপকতা ব্রিটিশদের মনোভাবকে কঠোর করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্রিটেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা হ্রাস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে ইংল্যান্ড মুক্ত থাকতে পারেনি। ইংল্যান্ডের শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে এবং ব্যাপ্টিস্ট আন্দোলনে ফরাসি বিপ্লব প্রেরণা জোগায়।
খ. প্রুশিয়ায় (জার্মানিতে) প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব প্রুশিয়া ছিল বহু রাজ্যে বিভক্ত একটি রাজতান্ত্রিক দেশ। বিপ্লবের গতিধারা যাতে রক্ষণশীল প্রশিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য প্রুশিয়া প্রথমে রাষ্ট্রজোটের সদস্য হয়। বুরবোঁ রাজবংশকে রক্ষার অভিপ্রায় নিয়ে বিপ্লবী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অংশ নেয়। প্রুশিয়া-অস্ট্রিয়া স্বার্থ সংঘাতের সুযোগ নিয়ে ফ্রান্স অবশেষে যুদ্ধে জয়লাভ করে। ফলস্বরূপ প্রুশিয়া রাষ্ট্রজোট ত্যাগ করে এবং ওয়ার্টিগনিস থেকে বিতাড়িত হয়। জার্মানির উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা ফরাসি বিপ্লবের প্রতি সহনশীল ছিলেন। তাদের সমর্থন নিয়ে জার্মানির স্বৈরাচার শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে নিয়মতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রবর্তনের জন্য, আন্দোলন শুরু হয়, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
গ. অস্ট্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব অস্ট্রিয়াও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়। অস্ট্রিয়ারাজ লিওপোল্ড ছিলেন ষোড়শ লুইয়ের ঘোর সমর্থক। বুরবোঁ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্যাডুয়া নামক স্থানে এক প্রচারপত্র প্রকাশ করলেন। এ প্রচারপত্রে তিনি ষোড়শ লুইয়ের সমস্যাকে নিজেদের সমস্যা বলে মনে করতে রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে অনুরোধ করেন। তিনি ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ফরাসি রাজতন্ত্রকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে লিওপোল্ড ও প্রুশিয়ারাজ ফ্রেডারিক 'পিলনিজের' ঘোষণা প্রচার করলেন। এতে ঘোষণা করলেন যে, বিপ্লবী ফ্রান্সের পরিস্থিতি ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের চিন্তার বিষয়। ইউরোপীয় অপরাপর রাজন্যবর্গের সাহায্য পাওয়া মাত্রই অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া ফ্রান্সের বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। এ ভীতি প্রদর্শনের পরও ফ্রান্স ভয় পেল না। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফ্রান্স অস্ট্রিয়াকে স্যাভয় থেকে উৎখাত করে স্যাভয়ের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়।
এভাবে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যখন ফরাসি বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দিল, তখন ফ্রান্স ডাচদের নদী সেন্ডকে সর্বজনীন নদীপথ বলে ঘোষণা করল। এতে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের স্বার্থহানি ঘটল। পূর্ব থেকেই অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। নতুন করে স্পেন, হল্যান্ড ও সার্দিনিয়া ফ্রান্সের
বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। যুদ্ধের প্রথম দিকে ফ্রান্স পর্যুদস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়ায়। স্পেন রাষ্ট্রজোট ত্যাগে বাধ্য হয় এবং পিরনিজ পর্বতের ওপারে আশ্রয় নেয়। বেলজিয়াম ফরাসি সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং হল্যান্ড ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
কাজেই দেখা যায়, ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া ছিল যুদ্ধংদেহী ও বহুমুখী এবং প্রভাব ছিল ব্যাপক। কোনো বিপ্লবের বিপ্লবী ভাবধারা ও গতি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। ইউরোপব্যাপী এর মিশ্র ও তুমুল প্রতিক্রিয়াই এর প্রমাণ।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই

নেপোলিয়নের পরিচয়: যেসব ব্যক্তি স্বীয় কর্ম ও প্রতিভা দ্বারা ইতিহাসের গতি পরিবর্তন করতে সমর্থ
হয়েছিলেন, নেপোলিয়ন তাদের অন্যতম। ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনেতা, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক নেপোলিয়ন ইতালির কর্সিকা দ্বীপে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজেই বলেন, "আমার দেশ যখন মরণাপন্ন তখন আমার জন্ম হয়।" জন্মের কিছুদিন পরই কর্সিকায় ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ফ্রান্সের সাথে তার ভাগ্য জড়িয়ে যায়। তার পিতার নাম ছিল কার্লো বোনাপার্ট এবং মাতার নাম ছিল লেটিজ়িয়া বোনাপার্ট। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন নির্ভীক, অনমনীয় ও অধ্যবসায়ী। অল্প বয়সে সামরিক শিক্ষা লাভ করে ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লেফটেন্যান্ট হন। বিপ্লবী জেকোবিন দলে যোগদান করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি টুলোঁ বন্দর থেকে ইংরেজ বাহিনীকে বিতাড়নে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্রান্সের নিরাপত্তা রক্ষা করেছিলেন। বিজয়ের পুরস্কারস্বরূপ তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। এর কিছুদিন পরেই রাজতন্ত্রীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে জাতীয় সম্মেলনকে রক্ষা করলে তিনি ফরাসিদের শ্রদ্ধা ও আস্থাভাজন নেতায় পরিণত হন।
ডাইরেক্টরি শাসন ও নেপোলিয়নের উত্থান
ফরাসি বিপ্লবোত্তর ফ্রান্সে ডাইরেক্টরি শাসন ছিল ১৭৯৫-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। হোবার্ট, দাঁতন ও রোবস্পিয়ারের নেতৃত্বে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব (১৭৯৩-৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্সে চালু হয়েছিল তার অবসানের পর ডাইরেক্টরি শাসন শুরু হয়। ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় সম্মেলন (National Assembly) বিপ্লবের যে তৃতীয় সংবিধান প্রণয়ন করে, তাতে শাসনভার পাঁচজন ডাইরেক্টর বা পরিচালকের হাতে ন্যস্ত হওয়ায় একে ডাইরেক্টরি শাসন বলে। ডাইরেক্টরি শাসনামলে নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ইতালীয় অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইতালীয় অভিযানে তার সমর কৌশল ও ক্ষিপ্রতা এবং দৃঢ় সংকল্প তাকে একজন 'ক্ষুদ্র সেনাপতিতে' পরিণত করে। ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রিয়া পরাজিত হলে ইতালিতে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্ভীক সেনাপতি বিজয়ের পর দেশে ফিরলে তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দেশপ্রেমিক সেনাপতি চিরশত্রু ইংল্যান্ডকে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। ভারতবর্ষে ইংল্যান্ডের যোগাযোগ বন্ধ ও তাদের আর্থিক শক্তিকে দুর্বল করার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) করেন। যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মিশর। ভূমধ্যসাগরে ইংরেজ নৌ সেনাপতি নেলসনের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি মাল্টা দখল করে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় উপস্থিত হন। অতঃপর তিনি কায়রো দখল করেন। কিন্তু নৌশক্তিতে ইংল্যান্ড শক্তিশালী হওয়ায় নীলনদের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি পর্যুদস্ত হন। মিশর অভিযানে তার ব্যর্থতা তিনি বুঝতে পারেন। ফরাসি বাহিনীকে মিশরে তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে আসেন। দেশে এসে তিনি এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও হতাশাগ্রস্ত ফ্রান্স দেখেন। জনগণ ডাইরেক্টরির অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এ সময় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের নেতৃত্বের দ্বিতীয় শক্তিজোট গঠিত হয়। তারা জোটবদ্ধ হয়ে ফ্রান্সকে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এ রকম ক্রান্তিলগ্নে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ডাইরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর 'কনসুলেটর' শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কনসুলেট আমলে কার্যত ফ্রান্সের নির্বাহী ক্ষমতা নেপোলিয়নের হাতে চলে যায়। ক্ষমতা গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমি ফ্রান্সের রাজমুকুটকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি, আমি তরবারির সাহায্যে তা মাথায় তুলে নিই।"
কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়ন
ডাইরেক্টরি শাসনের পতন হলে ফরাসি বিপ্লবের 'চতুর্থ সংবিধান' প্রণয়ন করা হয়। নতুন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ক্ষমতা তিনজন 'কনসুল' দ্বারা গঠিত একটি কনসুলেটের উপর অর্পিত হয়। সিয়েস, ডোকাস ও নেপোলিয়নকে নিয়ে গঠিত এ সরকারকে কনসুলেট শাসনব্যবস্থা বলা হতো। নেপোলিয়ন হন এক নম্বর কনসুল এবং অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী। কার্যত প্রশাসনিক সকল ক্ষমতা নেপোলিয়নের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। কনসুলেট ব্যবস্থা জনসাধারণের নিকট পেশ করা হলে তা বিপুল ভোটাধিক্যে পাস হয়। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই ডিসেম্বর তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, "বিপ্লবের মূলনীতি জয়যুক্ত হয়েছে এবং বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।"
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সংস্কার
কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়ন পাঁচ বছর (১৭৯৯-১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ) ক্ষমতায় ছিলেন। এ সময় তিনি ফরাসি জাতির উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারসাধনে আত্মনিয়োগ করেন। তার সংস্কারগুলোতে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শসমূহ প্রতিফলিত হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তিনি যে সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন তার জন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে তার নাম অমর হয়ে আছে।
তার সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
১। জাতির ক্ষত উপশম করা;
২। একটি সুষ্ঠু ও সুদৃঢ় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা;
৩। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও অনাচার দূর করা।
৪। খ্যাতির মোহ, গৌরবের আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের মন জয় করার ঐকান্তিক বাসনা।
এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নেপোলিয়ন নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
ক. শাসনতান্ত্রিক সংস্কার নেপোলিয়ন সর্বপ্রথম ফ্রান্সে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার
লক্ষ্যে দেশ থেকে রাজনৈতিক দলাদলি উচ্ছেদ করেন। সমগ্র ফ্রান্সকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আনার জন্য ফ্রান্সের প্রদেশগুলোতে একই শাসননীতি ও আইনকানুন প্রবর্তন করলেন। বিপ্লবের যুগে ফ্রান্সকে ৮৩টি প্রদেশে ও ৫৪৭টি জেলায় ভাগ করা হয়েছিল, তিনি তা অব্যাহত রাখেন। পূর্বে সরকারি কর্মচারীরা জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। তিনি এ পদ্ধতি উঠিয়ে দিয়ে প্রথম কনসুলেট কর্তৃক মনোনয়নব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। প্রাদেশিক শাসকরা প্রথমে কনসুল ও পরে সম্রাট পদের সৃষ্টি হলে সম্রাট কর্তৃক নিযুক্তির ব্যবস্থা চালু করেন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা অনেকাংশে কমিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীনে আনেন। এভাবে নেপোলিয়ন কেন্দ্রীয় আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, ন্যায়সংগত ও কার্যকর করলেন।
খ. অর্থনৈতিক সংস্কার: অর্থনৈতিক সংস্কার তার শাসনামলে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ডেভিড টমসর্নের
মতে, পূর্বতম শাসনব্যবস্থার ক্যান্সার ছিল অর্থব্যবস্থা ও করপ্রথা। অর্থনৈতিক সমস্যাই ফরাসি বিপ্লবের জন্য মূলত দায়ী ছিল। সুতরাং এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে ফ্রান্স যত শিগগির আরোগ্য লাভ করে সেদিকে নেপোলিয়ন বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ফ্রান্সের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য Bank of France নামে একটি জাতীয় ব্যাংক ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যাতে সহজে ব্যাংক থেকে অর্থ সাহায্য পান তার ব্যবস্থা করেন। তিনি দেশে মুদ্রানীতির আধুনিক নীতিসম্মত সংস্কার সাধন করেন। নেপোলিয়ন কর প্রদানে ফরাসিদের স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে দিলেন এবং কর আদায় প্রথার সংস্কার সাধন করলেন। নেপোলিয়ন কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে তাদের করের হার হ্রাস করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ব্যাপারে যাতে কোনো প্রকার অমিতব্যয়িতা বা দুর্নীতির অবকাশ না থাকে সেদিকে তিনি কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করেন। এছাড়া যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ ও পুরনো রাস্তার সংস্কার সাধন করেন। তার এ সমস্ত সংস্কারের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধিত হলো। এতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘকাল পর সুষ্ঠু ও সুবিন্যস্ত হলো।
গ. আইন সংস্কার: ফ্রান্সের কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো তার আইন সংস্কার।
ইতিপূর্বে ফ্রান্সে কোনো সুসংবদ্ধ আইন প্রচলিত ছিল না। যে চারশটি বিভিন্ন রকমের আইন প্রচলিত ছিল তাতে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। নেপোলিয়ন অনেক কষ্ট স্বীকার করে প্রাচীনকাল থেকে ফ্রান্সে প্রচলিত সমস্ত আইন সংগ্রহ করে এগুলোর সংস্কার সাধন করেন। পাঁচজন বিচক্ষণ আইনবিদের সমন্বয়ে ও তার তত্ত্বাবধানে একটি আইন কমিশন গঠন করে 'আইন-বিধি' প্রণয়ন করেন, যাকে Code Napoleon বলা হয়। এতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের চোখে মানুষের সমতা, কৃষকদের ভূমি মালিকানা স্বত্ব প্রভৃতি বিপ্লবের আদর্শ স্বীকৃতি লাভ করে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভ্রাম্যমাণ বিচারক ব্যবস্থা সৃষ্টি তার অন্যতম একটি কীর্তি। জুরি প্রথা পূর্বের মতো বহাল রাখা হয়। তার প্রবর্তিত দেওয়ানি আইন ও কার্যবিধি, ফৌজদারি আইন ও কার্যবিধি এবং বাণিজ্য আইন ছিল জটিলতামুক্ত ও সুবিন্যস্ত। রোমান আইনের মূল আদর্শের উপর ভিত্তি করে এগুলো রচিত বলে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তা গৃহীত হয়। তিনি নিজেই এ আইন-বিধির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, "চল্লিশটি যুদ্ধে জয়লাভ করা আমার সত্যিকারের গৌরব নয়, যা কখনো মুছে ফেলা যাবে না এবং যা চিরস্থায়ী হবে তা হলো আইন-বিধি।"২৪ তার আইন-বিধির জন্য তাকে দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান বলা হয়।
ঘ. ধর্মীয় সংস্কার: ধর্মনীতি পুনর্গঠনের ব্যাপারেও তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন। ধর্মীয় সংস্কারের ব্যাপারে
তিনি উদার নীতি গ্রহণ করেন। তার ধর্মীয় সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় ব্যাপারে ঐক্য ও শান্তি স্থাপন করা। নেপোলিয়ন তার বিখ্যাত 'Concordate of 1801' বা ধর্ম মীমাংসা নীতি দ্বারা পোপ ও ফরাসি চার্চের পারস্পরিক বিরোধ দূর করেন। এ মীমাংসার ফলে স্থির হয় যে, রোমান ক্যাথলিক ধর্মই ফরাসিদের ধর্ম। আরও স্থির হয় যে, যাজক সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং পোপ কর্তৃক এসব নিয়োগ অনুমোদিত হবে। নিম্নস্তরের কর্মচারী বিশপ কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং এ নিয়োগ সম্রাট কর্তৃক অনুমোদিত হবে। এভাবে ফরাসি চার্চের উপর তার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। মূলত ফরাসি চার্চ রাষ্ট্রের একটি বিভাগে পরিণত হলো। প্রকৃতপক্ষে নেপোলিয়নের ধর্ম সংস্কার তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক। নেপোলিয়নের ধর্ম সংস্কার সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোব্যান বলেন, "The Concordate was a great victory for Bonaparte and a master, stroke of Policy. The Emperor was able hence Forth to use the clergy as an instrument of government.২৫
ঙ. অন্যান্য সংস্কার: শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারসাধন ও উন্নয়ন তার উল্লেখযোগ্য অবদান। দেশের শিক্ষার উন্নতির
প্রতি তার সজাগ দৃষ্টি ছিল। তার আমলে ফরাসি ভাষার প্রসার ও সমৃদ্ধি ঘটে। তিনি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সরকারি ব্যয়ে বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বহু কারিগরি বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন। তারই চেষ্টায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে 'University of France' প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি জাতি-ধর্ম ও রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নাগরিককে সমান সুযোগ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সমতা প্রদান করেন। প্রকৃত গুণীদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার জন্য ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন 'Legion of Honour' নামে একটি সম্মানসূচক খেতাব সৃষ্টি করেন। এ সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বংশগত মর্যাদার পরিবর্তে প্রকৃত গুণের ও স্বীয় কর্মের ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন। এভাবে তিনি তার অনুগত একটি অভিজাত সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন।
নেপোলিয়নের সংস্কার ফ্রান্সের জাতীয় জীবনে নতুন প্রাণস্পন্দনের সঞ্চার করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফরাসি বিপ্লবের দুর্বার গতিধারায় যে সংঘাত দেশ ও জনগণের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল, এসব সংস্কারের ফলে সেগুলোর অবসান হয়। তার একনায়কতন্ত্র বিপ্লবের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে বাধা প্রদান করেছিল। তবে একথা সত্য যে, বিপ্লবপ্রসূত সাম্যনীতি, জনকল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা স্থাপন করে বিপ্লব ও স্বৈরাচারী শাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তার সংস্কারে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ যেমন প্রতিফলিত হয়, আবার ধর্মীয় ক্ষেত্রে আপস করে যাজকদের প্রাধান্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ প্রভৃতি স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড ছিল বিপ্লবের আদর্শের পরিপন্থী। তবে তার সংস্কারগুলোর লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়া, যাতে তিনি অনেকাংশেই সফল। ঐতিহাসিক ফিশার বলেন, "তার সামরিক বিজয়গুলো ক্ষণস্থায়ী হলেও ফ্রান্সে তার বেসামরিক কার্যাবলি গ্রানাইটের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল। "২৬
নেপোলিয়নের সংস্কারসমূহের সীমাবদ্ধতা
নেপোলিয়নের সংস্কারসমূহের সীমাবদ্ধতাও ছিল। যেমন-
(ক) প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে সারা দেশে প্রশাসনিক ঐক্য ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় হলেও প্রিফেক্টগণ জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদের খুব কমই নিয়োজিত করতে পারতেন। নেপোলিয়নের নিরন্তর যুদ্ধের রসদ সরবরাহ ও প্রশাসনযন্ত্রের ক্রীড়নক হয়ে তাদের ব্যস্ত থাকতে হতো। ফলে প্রশাসন কেন্দ্রীকরণ নীতি তার জন্য শেষ পর্যন্ত কোনো শুভ ফল বয়ে আনেনি। প্রিফেক্টদের নেপোলিয়নের দুর্দিনে কোনো সাহায্য করতে পারেননি।
(খ) নেপোলিয়নের আইন সংস্কারও শত্রুমুক্ত ছিল না। যেমন:
প্রথমত: ফ্রান্সের নারীসমাজের বন্ধনমুক্তি ও সমান অধিক অধিকার লাভের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল কোড নেপোলিয়ন দ্বারা তা দূরীভূত হয়। নারীদের সম্পত্তির অধিকার সংকুচিত করা হয়।
দ্বিতীয়ত: পুরুষ ও নারীর অধিকারের সমতাকে কোড নেপোলিয়নে অস্বীকার করা হয়।
তৃতীয়ত: পিতাকে পরিবারের উপর সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা হয়।
চতুর্থত : তার আইন-বিধিতে শ্রমিকদের অধিকারের কোনো কথা ছিল না। তাদের নিম্নতম মজুরি ও ধর্মঘটের অধিকার স্বীকার করা হয়নি, বরং বুর্জোয়াদের স্বার্থের অনুকূলে ছিল।
(গ) নেপোলিয়নের শিক্ষা সংস্কারও শত্রুমুক্ত ছিল না। যেমন:
প্রথমত: তার শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষের মুক্তচিন্তা ও চেতনার কোনো স্থান ছিল না।
দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাঠ্যসূচিকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছিল, যাতে তার শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ছাত্রদের মনে প্রশ্নের সৃষ্টি না হয়।
তৃতীয়ত: সৃজনশীল চিন্তাধারা, মৌলিক সৃষ্টি ও গবেষণাকে উৎসাহ না দেওয়ায় ফ্রান্সে শুধু অধিকসংখ্যক ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা ও সেনাপতি তৈরি হয়, কবি, সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবী তদ্রূপ সৃষ্টি হয়নি। সুস্থ সংস্কৃতি ফরাসি জীবনধারা থেকে নির্বাসিত হয়। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার সংস্কারগুলো ফ্রান্সের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করে; যা সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় জীবনে শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধি এনে দেয়- বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও ফরাসি বিপ্লব
ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্ক কিরূপ ছিল তা তার দুটি উক্তি থেকে সহজেই বোঝা যায়।
তিনি ছিলেন একাধারে বিপ্লবের উত্তর-সাধক (Child the Revolution), আবার এর বিনাশক (Destroyer)। একদিকে তিনি বিপ্লবকে রক্ষা করেছিলেন, অবার অন্যদিকে তিনি একে ধ্বংস করেছিলেন। তাই একসময় তিনি বলেছিলেন, 'আমিই বিপ্লব' (I am the Revolution)। পরবর্তীকালে কোনো একসময় তিনি বলেছিলেন, "আমি বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি।"২" তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সত্যতা নিহিত আছে।
ফরাসি বিপ্লবের ফলে জনসাধারণের মধ্যে যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তিনি নিজেই। সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন কৌলীন্যের জোরে নয়, প্রতিভার বদৌলতে। তার প্রবর্তিত সংস্কারগুলোর সাথে বিপ্লবের ভাবাদর্শের কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না। আইনের চোখে সকলেই সমান- এ নীতিকে স্থায়িত্ব দান করে তিনি বিশ্বের সামনে বিপ্লবের একটি আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আক্রমণ থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোতে ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বিপ্লবের প্রভাব ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব বিবেচনায় তিনি যে নিজেই বিপ্লব ও বিপ্লবের রক্ষাকারী তা স্বীকার করে নিতে হয়।।
আবার ঘন ঘন শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের অমোঘ বাণী 'সাম্য ও শান্তি'তে তার বিশ্বাস ছিল, বিপ্লবীদের স্বাধীনতায় তার আস্থা ছিল না। তাই তিনি মন্তব্য করেন, "ফরাসি জাতির কাম্য সমতা, স্বাধীনতা নয়।" তার কতিপয় সংস্কার ও গৃহীত পদক্ষেপ বিপ্লববিরোধী ছিল। এ বিবেচনায় তাকে বিপ্লবের বিনাশক বলা চলে। তবে, বিপ্লবী আদর্শের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা না থাকলেও তার কার্যক্রমগুলো ছিল ক্ষিপ্রগতির; এজন্য 'আমিই বিপ্লব'- এ উক্তিটি তার নামের সাথে অত্যন্ত মানানসই।
নেপোলিয়নের পতনের কারণসমূহ
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফরাসি বিপ্লব তরঙ্গের চূড়ায় আরোহণ করে তিনি ফ্রান্সের সিংহাসনে উপনীত হন। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি রাজ্যবিস্তার, শাসন সংস্কার, সামরিক বিজয় প্রভৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের পরিচয় দেন। কিন্তু এর পর থেকে তার ভাগ্যরবি ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে শুরু করে। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের চির অবসান ঘটে। নিচে তার পতনের কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
নেপোলিয়নের অনমনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেপোলিয়নের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তিনি ইউরোপের ভাগ্যবিধাতারূপে এক
বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন। কিন্তু এটি যে একটি অলীক স্বপ্ন, তা তার মতো বিচক্ষণ, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ কেন বুঝতে পারেননি, তা সাধারণ বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা করা কঠিন। গভীর আত্মপ্রত্যয় ও অহমিকার কারণে তিনি তার জীবনের কতকগুলো শ্রেষ্ঠ সুযোগ হারিয়ে নিজেকে ভুল পথে পরিচালনা করেন।
লাইপজিগের যুদ্ধের পর মিত্রশক্তি নেপোলিয়নকে সম্মানজনক ফ্রাংকফুর্ট প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে বলা হয়, নেপোলিয়ন বেলজিয়াম ও হল্যান্ড ত্যাগ করলে তাকে ফ্রান্সে রাজপদ দেওয়া হবে। কিন্তু নেপোলিয়ন রাজি হননি। কারণ তিনি তখনো নিজেকে অজেয় মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে মিত্রশক্তির ফ্রাংকফুর্ট প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ছিল নেপোলিয়নের জীবনে বড় ভুল।
ভ্রান্ত স্পেনীয় নীতি: স্পেনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং স্পেনের সিংহাসনে নিজ ভাই যোসেফ
বোনাপার্টকে প্রতিষ্ঠিত করা নেপোলিয়নের জীবনে মারাত্মক এক ভুল ছিল। তিনি স্পেনবাসীর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের উপর চরম আঘাত হেনে কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেন। নেপোলিয়নের স্পেন আক্রমণ স্পেনবাসী কখনোই মেনে নেয়নি। ফলে স্পেনবাসী জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এ আন্দোলনের পরিণতিস্বরূপ উপদ্বীপের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্পেনবাসীর জাতীয়তাবাদী এ সংগ্রাম ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও প্রেরণা জোগায়। যাহোক, স্পেনের মতো একটি ছোট দেশকে পরাস্ত করতে না পারায় তার সামরিক মর্যাদা বিনষ্ট হয়। প্রকৃতপক্ষে স্পেনেই নেপোলিয়নের সামরিক মর্যাদার সমাধি রচিত হয়। নেপোলিয়ন নিজেই বলেছেন, "স্পেনের ক্ষতেই আমার সর্বনাশ হয়।" (The Spanish ulcer ruined me.)২৮
সাম্রাজ্যের মধ্যে স্ববিরোধিতা নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্যের বিপর্যয় ছিল একরূপ সুনিশ্চিত, কারণ সাম্রাজ্যের
অন্তর্নিহিত স্বার্থ ছিল স্ববিরোধী ও অসংগতিপূর্ণ। ডেভিড থমসন-এর ভাষায়, "The Napoleonic Empire was doomed because of its inherent and self-defeating contradictions. "২৯ ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধের শুরু এবং ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়নের সিংহাসন ত্যাগ- এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটেনি। মহাদেশীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে নেপোলিয়ন ব্রিটেনের নৌশক্তি ও বাণিজ্য ধ্বংস করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য নেপোলিয়নকে রাজ্যজয়ের এক সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু ফ্রান্সের আগ্রাসন ব্রিটেন তথা ইউরোপের প্রতিরোধ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব যারপরনাই কঠোর করে তুলেছিল। এটি ছিল রাজ্যজয় ও প্রতিরোধের এক জটপাকানো আবর্ত, যা নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্যের সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারক হয়। নেপোলিয়নের বংশগত ও জাতীয়তাবাদী স্বার্থ ও নীতির মধ্যেও প্রচণ্ড অন্তর্বিরোধ ছিল, যা সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে। তিনি হল্যান্ড, নেপলস, ওয়েস্টফেলিয়া ও স্পেনের সিংহাসনে নিজের ভ্রাতাদের অভিষিক্ত করে ইউরোপে এক নতুন বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য স্থাপন করেন, যা ছিল বিপ্লবী আদর্শের পরিপন্থী। ফ্রান্সের স্বার্থেই তিনি এসব দেশকে পদানত করে রাখতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একসময় মন্তব্য করেছিলেন, "My Policy is France before all." কিন্তু পূর্বতন পারিবারিক বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য ও আধুনিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা সে সময় মোটেই সম্ভব ছিল না। যে আদর্শের কথা প্রচার করে তিনি ক্ষমতার চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন, তা তিনি নিজেই ধ্বংস করে নিজের পতন অনিবার্য করে তুলেছিলেন।
সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক ত্রুটি: ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর
সাংগঠনিক চরিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বিপ্লবী যুদ্ধের সময় যে 'মহান সেনাবাহিনী' (Grand Army) নেপোলিয়ন গড়ে তুলেছিলেন, অস্টারলিজ ও জেনার যুদ্ধে ও স্পেনীয় অভিযানে তা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় এবং নেপোলিয়নকে বিদেশি সেনার উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সেনাবাহিনীতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। এই বিদেশি সেনাবাহিনীর আনুগত্য সম্বন্ধে নেপোলিয়নের নিজেরই যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।
মস্কো অভিযানের অদূরদর্শিতা মস্কো অভিযান নেপোলিয়নের পতনের অপর প্রধান কারণ। প্রাকৃতিক
অসুবিধা অগ্রাহ্য করে সুদূর মস্কো অভিযানে প্রবৃত্ত হয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ রুশ জনগণের গেরিলা যুদ্ধের ফলে অগণিত ফরাসি সেনা ও সেনাপতিগণ মৃত্যুবরণ করেন। হিটলারের মস্কো অভিযানের ন্যায় নেপোলিয়নের মস্কো অভিযানও চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এই ব্যর্থতার ফলে নেপোলিয়নের সামরিক শক্তি ও তার ব্যক্তিগত মর্যাদা বিশেষভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইউরোপের জনগণের মনে প্রবল জাতীয়তাবোধের সঞ্চার হয়। মস্কো অভিযান নেপোলিয়নের অদূরদর্শিতার অপর নিদর্শন বহন করে।
মহাদেশীয় ব্যবস্থার অসারতা ও প্রতিক্রিয়া নেপোলিয়নের পতনের অন্য কারণ হলো মহাদেশীয় ব্যবস্থা।
ইংল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই নেপোলিয়ন এই অবরোধপ্রথা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু এটা কার্যকর করার জন্য যে নৌশক্তির প্রয়োজন ছিল, নেপোলিয়নের তা ছিল না। এই অবরোধ প্রথা অবলম্বনের ফলে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং তাদের মনে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে এক দারুণ বিদ্বেষের সঞ্চার করে। সমুদ্রের উপর ইংল্যান্ডের নৌশক্তি অপ্রতিহত থাকায় ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে গোপন ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকলে মহাদেশীয় ব্যবস্থার অসারতা প্রতিপন্ন হয়। এ ব্যবস্থার ফলে নেপোলিয়নের মিত্র রুশ সম্রাট আলেকজান্ডারও তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে ওঠেন এবং অপর মিত্রশক্তিগুলোও তার বিরোধী হয়ে ওঠে।
এ কথা অনস্বীকার্য, মহাদেশীয় অবরোধ কঠোরভাবে বলবৎ করতে গিয়ে নেপোলিয়ন নিজেই ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং এই বিচ্ছিন্নতাই তাকে বিপর্যয়ের সম্মুখে ঠেলে দেয়। এই মহাদেশীয় অবরোধ ইউরোপের জনগণের মনে নেপোলিয়নের প্রতি প্রবল ঘৃণার সঞ্চার করে। অবরোধ প্রথা কঠোরভাবে বলবৎ করতে গিয়ে তিনি বহু অহেতুক যুদ্ধের ও জটিলতার সৃষ্টি করেন, যা ফ্রান্সের পক্ষে ক্ষতিকর হয়। এযাবৎ নেপোলিয়নের প্রবল সমর্থক মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিদ্বিষ্ট হয়ে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। যে অর্থনৈতিক অস্ত্রের দ্বারা নেপোলিয়ন ব্রিটেনকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন, সেই অস্ত্রের আঘাত তাকেই পেতে হলো।
পোপের প্রতি দুর্ব্যবহার: পোপের সঙ্গে বিবাদ ও পোপের প্রতি দুর্ব্যবহার নেপোলিয়নের পতনের অপর কারণ। নেপোলিয়ন পোপের অধিকারভুক্ত সব বন্দরে ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি করেছিলেন, কিন্তু পোপ নিরপেক্ষ থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নেপোলিয়নের সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাধে। নেপোলিয়ন পোপকে বন্দি করে তার রাজ্য দখল করেন। ফলে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের ঘৃণা ও বিদ্বেষ অর্জন করেন। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতা স্বদেশে নেপোলিয়নের জনপ্রিয়তা বহুলাংশে ক্ষুণ্ণ করে।
ব্রিটিশ নৌশক্তির প্রাধান্য সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌশক্তির প্রাধান্য নেপোলিয়নের পতনের অপর কারণ। নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা ব্রিটিশ শক্তিকে কোনো প্রকারেই খর্ব করতে পারেনি, বরং সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌশক্তি অপ্রতিহত থাকায় ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো ব্রিটেনের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মহাদেশীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার এটাই ছিল প্রধান কারণ। নীলনদের যুদ্ধে ও ট্রাফালগারের যুদ্ধে ফরাসি নৌশক্তি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। স্পেনের যুদ্ধেও ব্রিটিশ নৌশক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোট ও ফরাসি জাতির শান্তি কামনা নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের রাষ্ট্রজোট ফ্রান্সের সামরিক শক্তিকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। ইউরোপের প্রায় সকল বৃহৎ শক্তি অস্ত্রধারণ করে নেপোলিয়নের সামরিক পরিকল্পনা এক প্রকার বানচাল করে দেয়। এছাড়া দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহের ফলে ফরাসি জাতি শান্তির জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে নেপোলিয়নের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা নেপোলিয়ন সাফল্যের চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শেষ পর্যন্ত তাকে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ইউরোপের রাজনীতি থেকে বিদায় গ্রহণ করতে হয়। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক ওয়াটারলু যুদ্ধে তিনি পরাজিত হলে মিত্রশক্তি তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসন দেয়। সেখানেই তার ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের অবসান ঘটে। বিশ্বের ইতিহাসে নেপোলিয়নের মতো বীরের এরূপ করুণ পরিণতি পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
বুরবোঁ: ফরাসি বিপ্লবের সময় এবং বিপ্লবপূর্ব সময়ে যে রাজারা ফ্রান্স শাসন করতেন তারা বুরবোঁ রাজবংশের ছিলেন।
বুরবোঁ রাজাদের শাসনকাল:
-(ক) চতুর্থ হেনরি (১৫৮৯ – ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ)।
(খ) ত্রয়োদশ লুই (১৬১০- ১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
(গ) চতুর্দশ লুই (১৬৪৩ -১৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
(ঘ) পঞ্চদশ লুই (১৭১৫- ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
ঙ) ষোড়শ লুই (১৭৭৪ -১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দ)।
- এস্টেট (Estate): অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের সমাজ মূলত ৩টি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি শ্রেণিকে এস্টেট (Estate) বলা হতো। ধর্মীয় যাজকরা ছিল 1st Estate-এর অন্তর্ভুক্ত, অভিজাত সম্প্রদায় ছিল 2nd Estate এবং সাধারণ মানুষ (বুর্জোয়া, শ্রমিক, কৃষক, সর্বহারা) ছিল 3rd Estate-এর অন্তর্ভুক্ত। তৎকালীন শ্রেণিবিভক্ত ফরাসি সমাজের বাস্তব চিত্র এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
- বুর্জোয়া: আধুনিককালে বুর্জোয়া শব্দটি সমাজে শক্তিশালী সম্মানিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু ফরাসি সমাজে 'বুর্জোয়া' শব্দটি তাচ্ছিল্য অর্থে ব্যবহৃত হতো। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে বা চাকরি করে বিত্তবান হয়েছিল তাদের বুর্জোয়া বলা হতো। ফ্রান্সের রাজনীতিতে তাদের কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান বা অধিকার ছিল না। ফরাসি সমাজের যাজক ও অভিজাতরা 'বুর্জোয়া' শব্দটি ঘৃণ্য অর্থে ব্যবহার করত। রাজনৈতিক অধিকারবিহীন মধ্যবিত্তদের অবমাননা করার জন্যই এটি ব্যবহার করা হতো। এতে বোঝানো হতো, বুর্জোয়া মানেই রাজসভার সদস্য হওয়ার অযোগ্য। তবে বুর্জোয়া শ্রেণি জ্ঞানদীপ্ত যুগের আলোকপ্রাপ্ত মানুষ ছিল। এদের দ্বারাই ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টি হয়। ধনী বুর্জোয়াদের বলা হতো হুটে বুর্জোয়া আর শিক্ষক, আইনজীবী অর্থাৎ মধ্যবিত্তদের বলা হতো পাতি বুর্জোয়া।
ল্যাটিন শব্দ Burgus থেকে Bourgeois শব্দের উৎপত্তি। Burgus অর্থ শহর। সাধারণ অর্থে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বুর্জোয়া। - বুদ্ধিজীবী: বুদ্ধিবৃত্তি অর্থাৎ বিদ্যা, অধ্যয়ন, মেধা ইত্যাদিভিত্তিক পেশার মাধ্যমে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদেরই বলা হয় বুদ্ধিজীবী। সাধারণত শিক্ষক, অধ্যাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ প্রমুখকেই বুদ্ধিজীবী বলে ধরা হয়। একটি দেশের জনমত গঠন ও তা পরিচালনার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সে ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব সংঘটনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে বিপ্লবে উৎসাহিত করে।
- সর্বহারা শ্রেণি: যেসব মানুষের নিজেদের কোনো জমি বা উৎপাদনের উপকরণ নেই, যারা বেঁচে থাকার জন্য সারাজীবন মজুরির বিনিময়ে অন্যের সম্পত্তিতে কাজ করে, তারাই হলো সর্বহারা শ্রেণি বা শ্রমিক শ্রেণি বা Proletariat। অভিজাতরা ওই সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণিকে নিম্নশ্রেণি বলে গণ্য করত। ফরাসি বিপ্লবে এরূপ সর্বহারা শ্রেণি বিপ্লবের গতিকে ত্বরান্বিত করে। ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে বিপ্লব সফল হয়।
- মার্কান্টাইলবাদ: ফরাসি বিপ্লবের সময়কালে মার্কান্টাইল মতবাদ বা সংরক্ষণবাদ অনুযায়ী খাদ্যশস্য দেশের বাইরে রপ্তানি করা নিষিদ্ধ ছিল। খাদ্যশস্য রপ্তানি ও অবাধ বিক্রি নিষিদ্ধ থাকায় খাদ্যদ্রব্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যেত না। সরকার মনে করত কৃষকরা উদ্বৃত্ত খাদ্য চালান দিলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। ন্যায্য দামের অভাবে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ফলে দেশের সর্বত্র সর্বহারা শ্রেণির বিদ্রোহ পরিলক্ষিত হয়।
- ফিজিওক্র্যাট: অর্থনীতিবিদদের একটি সংঘ দল। মার্কান্টাইল বা সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে ফিজিওক্র্যাট নামক অর্থনীতিবিদরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। ফিজিওক্র্যাটরী একথা বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিশ্বে সম্পদের সীমা নেই। তিই খাদ্য ও শিল্পবস্তুর উৎপাদন বাড়বে ততই সম্পদ বাড়বে। এজন্য তারা শিল্প-বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ লোপ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যের দাবি জানান।
- ক্যাপিটালিস্ট: মূলধনী বা পুঁজিবাদী শ্রেণিকে Capitalist বলা হয়। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য উপনিবেশের সাথে চলত। ফলে এক শ্রেণির বণিকের হাতে প্রচুর অর্থসম্পদ সঞ্চিত হতে থাকে। তাদের সঞ্চিত পুঁজিই ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের জন্ম দেয়। গ্রামীণ পর্যায়ে তাদের সঞ্চিত অর্থ সমবণ্টন না হওয়ায় বণিক শ্রেণি ও সাধারণ কৃষক শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে।
- লেত্রে ডি ক্যাশে এটি একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার উপর রাজার স্বাক্ষর নিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা যেত। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে লেত্রে ডি ক্যাশের মাধ্যমে অনেক লোককে হত্যা করা হতো।
- প্রথম এস্টেট ফ্রান্সে যাজক শ্রেণিকে বলা হতো প্রথম এস্টেট বা প্রথম সম্প্রদায়। তারা খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করতেন এবং ধর্ম কর আদায় করতেন। তবে যাজক শ্রেণির মধ্যে নিম্নস্তরের যাজকরা আবার উপরের স্তরের যাজকদের ঘৃণার পাত্র ছিলেন।
- দ্বিতীয় এস্টেট: অভিজাতদের বলা হতো দ্বিতীয় এস্টেট। যাজকদের পরেই ছিল এদের স্থান। প্রথা হিসেবে ফ্রান্স থেকে সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও অভিজাত শ্রেণির সামন্তপ্রথা থেকে পাওয়া সুবিধাসমূহ আগের মতো বহাল ছিল। সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন অভিজাতরা যাজক ব্যতীত আর সকলের উপার্জনের উপর নির্ভর থাকত বলে তারা ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠেছিল।
- তৃতীয় এস্টেট: ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই তৃতীয় এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই এস্টেট আবার বুর্জোয়া, কারিগর ও কৃষক- এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। এই এস্টেটের লোকদের কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অধিকার ছিল না। তারা অত্যধিক করের ভারে জর্জরিত ছিল। তাই বুর্জোয়াদের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদের বিপ্লবী করে তোলে।
- টেনিস কোর্ট শপথ: ফরাসি বিপ্লবের প্রথম দিককার এক নাটকীয় ঘটনা। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুন তারিখে তৃতীয় স্টেট বা পার্লামেন্টের ডেপুটিরা আকস্মিকভাবে ভার্সাইয়ের নির্ধারিত সম্মেলনস্থল বন্ধ করে দেওয়াকে তৃতীয় এস্টেট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়ার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং রাজপ্রাসাদের অপর পাশের রাজকীয় টেনিস কোর্টে (লম্বা খোলা হল ঘরে) মুলতবি বৈঠকে মিলিত হন। মি. বেইলির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ডেপুটিরা শপথ গ্রহণ করেন, যে পর্যন্ত দেশের শাসনতন্ত্র শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হবে, সে পর্যন্ত তারা যখনই প্রয়োজন, তখনই বৈঠকে মিলিত হতে থাকবেন। স্বভাবতই এই শপথ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার উপর জনগণের বিপ্লবাত্মক দাবিরই শামিল। অবশ্য এই শপথের তিন দিন পরেই ডেপুটিগণ তাদের সাবেক সম্মেলনস্থলে ফিরে যেতে সমর্থ হন।
- বাস্তিল দুর্গ: এটি ছিল একটি দুর্গ-কাম-কারাগার। প্যারিস নগরীর কাছে এর অবস্থান ছিল। বুরবোঁ রাজতন্ত্রের শোষণ ও অত্যাচারের প্রতীক ছিল এ দুর্গ। দুর্গটি খুবই সুরক্ষিত ছিল। দুর্গের প্রাচীর ৯০ ফুট উঁচু এবং ৭৫ ফুট প্রশস্ত ছিল, যা গভীর পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। দুর্গে প্রবেশের জন্য শক্ত একটি সেতু ছিল। বিপদের সময় সেতুটি টেনে তুলে রাখার ব্যবস্থা ছিল। বিপ্লবী জনতার উদ্দেশ্য ছিল দুর্গ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং একই সঙ্গে বন্দিদের মুক্ত করা। উন্মত্ত জনতা ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে 'বাস্তিলের অধিনায়ক দেলুপকে হত্যা করে রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিলের পতন ঘটায়। জনতার হাতে ৩২ হাজার বন্দুক চলে যায়। বাস্তিলের পতনের সংবাদ পেয়ে রাজা ষোড়শ লুই মন্তব্য করলেন, "Yes
That'es Revolt." কিন্তু সংবাদবাহক বললেন, "Sir, It is not revolt, it is revolution." - সাসপেনসিভ ভেটো ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংবিধান সভা প্রণীত শাসনতন্ত্রে রাজার ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করা হয়। শাসনতন্ত্রে বলা হয়, রাজা নতুন আইন বাতিল করতে পারবেন না, কিন্তু সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য তাকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয় তাকে সাসপেনসিভ ভেটো ক্ষমতা বলা হয়।
- সন্ত্রাসের রাজত্ব: ফরাসি বিপ্লবের অগ্রগতির ইতিহাসে সন্ত্রাস বা ত্রাসের রাজত্ব একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এর ব্যাপ্তিকাল ছিল ১০/১০/১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২৮/০৭/১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ফরাসি বিপ্লবের পরে বিপ্লববিরোধী মনোভাব, রাজতান্ত্রিকদের দমন ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে জাতীয় কনভেনশনের বামপন্থি উগ্র জেকোবিন দল যে জরুরি অবস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিপ্লবী আদর্শকে সংহত করতে তৎপর ছিল, তা-ই ইতিহাসের সন্ত্রাসের বা ত্রাসের রাজত্ব। এর প্রধান নেতা ছিলেন রোবস্পিয়ার।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more