Nawab Dynasty in Bangla
বাংলার ইতিহাসে নবাবি বংশ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭) বাংলার নবাবি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নবাব বংশের শেষ শাসক নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার নবাবি বংশের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই 'রাজমহলের যুদ্ধে' আফগান বা পাঠান জাতির কররানী বংশের শেষ সুলতান দাউদ খান কররানীকে পরাজিত ও নিহত করে সম্রাট আকবর তথা মোগলরা বাংলা বিজয় করেন। এ যুদ্ধে জয়ের পর বাংলা মোগলদের প্রদেশে পরিণত হয় এবং মুঘলদের অধীনে সুবেদারি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আকবরের জৈনপুরের শাসনকর্তা খান-ই খানান মুনীম খান। সে হিসেবে বাংলার প্রথম সুবেদার হন মুনীম খান (১৫৭৬)। এরপর ধারাবাহিকভাবে যারা বঙ্গদেশ শাসন করেছেন তারা হলেন-
২। খান-ই-জাহান (১৫৭৬-১৫৭৮ খ্রি.),
৩। মুজাফফর খা তুরবর্তী (১৫৭৮-১৫৮০ খ্রি.)
৪। রাজা টোডরমল (১৫৮০-১৫৮২ খ্রি.)
৫। খান-ই-আজম মীর্জা আজীজ কেকা (১৫৮২-১৫৮৪ খ্রি.)
৬। শাহবাজ খান (১৫৮৪-১৫৮৭ খ্রি.)
৭। রাজা মানসিংহ (১৫৮৭-১৬০৬ খ্রি.)।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে (১৬০৬-১৬২৮) ৯ জন সুবাদার ছিলেন। তারা হলেন-
১। কুতুবউদ্দিন কোকা (১৬০৬-১৬০৭)
২। জাহাঙ্গীর কুলী খান (১৬০৭-১৬০৮)
৩। ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩)
৪। কাশিম খান (১৬১৩-১৬১৮)
৫। ইব্রাহীম খান (১৬১৮-১৬২২)
৬। শাহজাদা শাহজাহান (১৬২২-১৬২৫)
৭। খমজাদ খান (১৬২৫-১৬২৬)
৮। মুকারম খান (১৬২৬-১৬২৮)
৯। ফিদাই খান (১৬২৭-১৬২৮)।
সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৬২৮-১৬৫৮) ৪ জন সুবাদার বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তারা হলেন-
১। কাশিম খান খোরাসানী (১৬২৮-১৬৩২)
২। আজিম খান (১৬৩২-১৬৩৭)
৩। ইসলাম খান মাশহাদী (১৬৩৭-১৬৩৯)
৪। শাহজাদা মুহম্মদ সুজা (১৬৩৯-১৬৬০)।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) ৯ জন সুবাদার বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তারা হলেন-
১। শাহজাদা মুহম্মদ সুজা (১৬৬০)
২। মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩)
৩। শায়েস্তা খান (১৬৬৩-১৬৭৭, ১৬৭৯-১৬৮৮)
৪। ফেদাই খান (১৬৭৮)
৫। সুলতান মুহাম্মদ আজিম (১৬৭৮-১৬৭৯)
৬। খান-ই-জাহান (১৬৮৮-১৬৮৯)
৭। ইব্রাহীম খান (১৬৮৯-১৬৯৭)
৮। আজিম-উস-শান (১৬৯৭-১৭০৪)
৯। মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭)।
মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭) [Murshid Quli Khan (1704-1727)]
বাংলার স্বাধীন নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুর্শিদ কুলী খান। তিনি দক্ষিণ ভারতের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তাঁকে হাজী শফী ইস্পাহানী নামে এক মুসলিম ব্যবসায়ী ক্রয় করেন এবং তাঁকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ হাদী। শফী ইস্পাহানী তাঁকে নিজ সন্তানের মতো পারস্যে নিয়ে শিক্ষা লাভ করান। শফী ইস্পাহানী কিছুদিন দিল্লির দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ হাদী দেওয়ান সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। শফী ইস্পাহানী মৃত্যুর পর মুহাম্মদ হাদী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন। এ সময় সম্রাট তাঁকে মুর্শিদ কুলী খান উপাধিতে ভূষিত করেন (১৭০৩ খ্রি.)। শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে সুবাদারের পরেই ছিল দেওয়ান পদ। মুর্শিদ কুলী খান বাংলার বিশৃঙ্খল রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এ সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন আওরঙ্গজেবের পৌত্র আজিম-উস-শান। তিনি অলস ও আরামপ্রিয় লোক ছিলেন। ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদ কুলী খানকে উড়িষ্যার সুবেদার নিযুক্ত করেন এবং 'জাফর খান' উপাধিতে ভূষিত করেন।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে তিনি স্বাধীনভাবেই বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এবং নিজেকে বাংলার নবাব বলে ঘোষণা দেন। তার সময় ইংরেজরা বিনা শুল্কে বাংলায়-বাণিজ্য করতে পারেনি। মুর্শিদ কুলী খানের কঠোর শাসনে দেশে শান্তি স্থাপন হয় ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। শাসন ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু সংস্কার করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কার হলো ভূমি রাজস্ব সংস্কার ও অর্থনৈতিক সংস্কার। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
ভূমি রাজস্ব সংস্কার : মুর্শিদ কুলী খানের আগমনের পূর্বে বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা নানা প্রকার সমস্যায় জর্জরিত ছিল।
তখন জায়গির প্রথা প্রচলিত ছিল। সরকারের নিজস্ব খাস জমি বলতে কিছুই ছিল না। ফলে ভূমি রাজস্ব থেকে সরকারের কোনো আয় হতো না। রাষ্ট্রের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাণিজ্য শুল্ক। মুর্শিদ কুলী খান বাংলার ভূমি রাজস্ব সংক্রান্ত দুরবস্থা দূর করতে এবং সরকারের আয় বৃদ্ধি করতে দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন- (১) মুঘল কর্মচারীদের সমুদয় জায়গির সরকারি খাস জমিতে পরিণত করা এবং এর পরিবর্তে কর্মচারীগণকে উড়িষ্যার অনুন্নত ও জঙ্গলাবৃত অঞ্চলে জায়গির প্রদান করা। (২) রাজস্ব আদায়ের ভার জমিদারদের নিকট থেকে কেড়ে নিয়ে ইজারাদারদের ওপর ন্যস্ত করা। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তার উদ্ভাবিত "মালজামিনী প্রথা" ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলা ও ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ করেন। দিল্লিতে নিয়মিত রাজস্ব প্রেরণ করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধের ব্যয় এবং রাজপরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদ কুলী খানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে মুর্শিদ কুলী খান অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে তিনি ইজারাদারদের কোনো প্রকার অবহেলা সহ্য করতেন না। তিনি প্রদেশের সকল আবাদি ও অনাবাদি জমি জরিপ করে কৃষকদের মাঝে বণ্টন করতেন এবং জমির উৎপাদন শক্তির ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণ করতেন। মুর্শিদ কুলী খান প্রবর্তিত মালজামিনী ব্যবস্থায় অধিকাংশ জমিদার তাঁদের জমিদারি থেকে উচ্ছেদ হলেও তিনি তাদের উপযুক্ত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন যা 'নানকর' নামে পরিচিত। এছাড়া মুর্শিদ কুলী খান বাংলার বিভিন্ন স্থানের আবাদি জমি সরকারি খাস জমিতে পরিণত করেন।
অর্থনৈতিক সংস্কার: রাজস্ব সংস্কার ছাড়াও মুর্শিদ কুলী খান ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেন এবং আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি পদাতিক এবং অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর সংখ্যা হ্রাস করেন। ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য তিনি ইউরোপীয় বণিকদের প্রতি উদার ও সহনশীল নীতি গ্রহণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় ওলন্দাজ, চুঁচুড়ায় ইংরেজ ও চন্দননগরে ফরাসি বাণিজ্য কুঠি গড়ে ওঠে।
বঙ্গদেশে ইংরেজরা মুঘল সম্রাটদের ফরমান বলে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেছিল। কিন্তু মুর্শিদ কুলী খান ইংরেজদের এই সুযোগ প্রত্যাহার করে নিলে ইংরেজ প্রতিনিধি সুরম্যান সম্রাট ফররুখ শিয়ার শরণাপন্ন হন। অতঃপর ইংরেজরা বাৎসরিক তিন হাজার টাকার বিনিময় বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। মুর্শিদ কুলী খানের রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থায় বেশ পরিবর্তন আসে, অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হয়। জমিদার ও ইংরেজ কর্মচারীর অত্যাচার, জুলুম থেকে কৃষকরা রক্ষা পায়।
কৃতিত্ব: বাংলার স্বাধীন নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুর্শিদ কুলী খান বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় নাম। সামান্য অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে তিনি বাংলার দেওয়ান ও সুবাদার পদে উন্নীত হন। তাঁর শাসনামলে বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়। বহু পারসিক কবি সাহিত্যিক মুর্শিদ কুলী খানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আগমন করেন এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।
ঐতিহাসিক সলিমুল্লাহ বলেছেন, "শায়েস্তা খানের পর ভারতের কোন অংশে জাফর খানের (মুর্শিদ কুলীর) ন্যায় ধর্ম প্রসারে উৎসাহী নিরপেক্ষ বিচারপতি এবং গুণগ্রাহী আমীর জন্মগ্রহণ করেননি।" সম্রাট আওরঙ্গজেবের ন্যায় তিনিও ছিলেন ধর্মভীরু, গোড়া, সকল প্রকার বিলাস হতে মুক্ত ও উচ্চ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রতিভাবান সুবেদারের মৃত্যু ঘটে।
নবাব সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি.) [Nawab Sujauddin Khan (1727-1739)]
মুর্শিদ কুলী খানের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তার জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলা ও উড়িষ্যার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। তুর্কি বংশোদ্ভূত সুজাউদ্দিন একজন মোগল রাজকর্মচারী ছিলেন। মুর্শিদ কুলী খানের কন্যা জিনাত-উল-নিসার সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি নিজ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার জন্য বিশ্বাসজনক অনুচরদের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। আলীবর্দী খানকে তিনি পূর্ণিয়ার (বিহার) নায়েব নাজিম (সহকারী শাসনকর্তা) নিযুক্ত করেন। দিল্লির সম্রাট মুহম্মদ শাহকে তিনি প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন প্রেরণ করে সন্তুষ্ট করেন। যার বদৌলতে তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার পদ লাভকরেন। সম্রাট সুজাউদ্দিনকে "মুতাসন-উল-মুলক-সুজা-উদ-দৌলহ আসাদ জঙ্গ" উপাধিতে ভূষিত করেন। সুজাউদ্দিনের শাসনামলে শায়েস্তা খানের আমলের ন্যায় খাদ্যদ্রব্যের দাম খুব কম ছিল।
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৬-১৭০৭ খ্রি.) শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ তার সময় টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যেত। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য শায়েস্তা খান ঢাকা ত্যাগের পূর্বে দুর্গের পশ্চিম তোরণ বন্ধ করে সেখানে লিখেছেন, "ভবিষ্যতে যে সুবাদারের আমলে টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যাবে তিনি ব্যতীত অন্য কেহ এই তোরণ উন্মোচন করবে না।" নবাব সুজাউদ্দিনের সময় টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যায়। ফলে তিনি মহা ধুমধামে উক্ত তোরণ উন্মোচন করেছিলেন। তার সময় ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজ কোম্পানিগুলো ঝাঁকিয়ে ব্যবসায় চালায়। তবে ইংরেজরা ফররুখ শিয়ার দস্তক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়নি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তাঁর শাসনামলকে "বাংলার শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের মতে, "সুজাউদ্দিন ছিলেন নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার পরায়ণ শাসক।" তিনি ধনীদের প্রতি পক্ষপাত না করে ন্যায়বিচার করতেন। তিনি স্থাপত্যের অনুরাগী ছিলেন। তিনি মুর্শিদাবাদে দেওয়ান-ই-খাস হর্য্য নির্মাণ করেন।
নবাব সরফরাজ খান (১৭৩৯-১৭৪০ খ্রি.) [Nawab Sarfaraj Khan (1739–1740)]
১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র সরফরাজ খান বাংলার নবান হন। তিনি ছিলেন অকর্মণ্য, অনভিজ্ঞ এবং চরিত্রহীন। তিনি শাসনকার্যের প্রতি অবহেলা করে হেরেমের আমোদ-প্রমোদেই নিমগ্ন থাকতেন। এই সুযোগে উচ্চাভিলাষী বিহারের নায়েব নাজিম আলীবর্দী খান স্ব-সৈন্যে তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল 'গিরিয়ার যুদ্ধে' সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব পদ লাভ করেন।
নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.) [Nawab Alivardi Khan (1740-1756)]
যে সকল ভাগ্যান্বেষী তরবারি মাত্র সম্বল করে উচ্চ পদে আসীন হন তাদের মধ্যে আরব বংশোদ্ভূত আলীবর্দী খান অন্যতম। তার প্রকৃত নাম মির্জা মুহম্মদ আলী। তিনি প্রথমে আজম শাহ এবং পরে সুজাউদ্দিন খানের অধীনে বিহারের নায়েব নাজিম পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং আলীবর্দী খান উপাধি লাভ করেছিলেন। বাংলার মসনদে বসার পর আলীবর্দী খান গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তার নিজ আমির ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিদের বসান। নবাব আলীবর্দী খান মুর্শিদ কুলী খানের বংশধরকে হত্যা ও বিভিন্ন পদ থেকে উচ্ছেদ করে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেন। তার শাসনামলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মারাঠা আক্রমণ বা বর্গী হামলা।
মারাঠা আক্রমণ: আলীবর্দীর আমলে মারাঠাদের আক্রমণে বাংলা ছারখার হয়ে যায়। যাত্রাপথে দুধারের গ্রামগুলোকে তারা লুটপাট করে ও আগুনে জ্বালিয়ে শশ্মশানে পরিণত করে। এসময় রঘুজী ভোসলে ছিল মারাঠা সর্দার এবং ভাস্কর পণ্ডিত ছিলেন মারাঠা সেনাপতি। মারাঠাদের ভয়ে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পালায়, ফলে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাঁতিরা ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালায়, ফলে বস্ত্রের অভাব দেখা দেয়। বাংলায় বর্গীরা স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর কীরূপ অত্যাচার চালায় এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করে তা গ্রাম্য নারীদের ঘুমপাড়ানি ছড়ায় এখনও প্রমাণ মেলে।
"খোকা ঘুমালো
পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে।"
মারাঠারা পানির ন্যায়। পানিতে আঘাত করলে যেমন প্রতিঘাত করে না তেমনি আঘাতের চিহ্নও থাকে না। আলীবর্দী খান মারাঠাদের আক্রমণ প্রতিহত করলেও আবার তারা সক্রিয় হয়ে আক্রমণ চালাত। দীর্ঘ সংগ্রামে আলীবর্দী খানের দেহ ও মন ভেঙে যায়। অবশেষে মারাঠাদের উড়িষ্যার একাংশের রাজস্ব এবং বছরে ১২ লক্ষ টাকা চৌথ প্রদান করে তাদের সাথে স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্থাপন করেন।
কৃতিত্ব : নবাব আলীবর্দী খান এদেশে ইংরেজদের ক্রমবর্ধমান শক্তি সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। নৌবলে বলীয়ান ইংরেজদের বিতাড়িত করা সহজ হবে না ভেবে বাণিজ্য অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্গ নির্মাণ করতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, "তোমরা বণিক, তোমাদের দুর্গের প্রয়োজন কি? আমিই তোমাদের নিরাপত্তা দিব।" নবাব আলীবর্দী খান ইংরেজদের বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেও ইংরেজদের নিকট মাথা নত করেননি। মারাঠা আক্রমণ ছাড়া তার শাসনামলে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। নবাব আলীবর্দী খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। ছিল তিন কন্যা- ঘসেটি বেগম (মেহেরুন্নেছা), ময়মুনা বেগম ও আমেনা বেগম। তিনি তিন কন্যাকে নিজ ভ্রাতা হাজী আহমেদের তিন পুত্রের সঙ্গে বিবাহ দেন। প্রথম কন্যা ঘসেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিস মুহাম্মদ খানকে ঢাকার শাসনকর্তা, দ্বিতীয় কন্যা ময়মুনা বেগমের স্বামী সৈয়দ আহমদ খানকে পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা এবং ছোট কন্যা আমেনা বেগমের স্বামী জয়নুদ্দীন আহমদ খানকে পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। আমেনা বেগমের গর্ভে ১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দে একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করলে আলীবর্দী খান নিজ নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখেন মির্জা মুহম্মদ আলী। এই মির্জা মুহম্মদ আলীই ইতিহাসখ্যাত নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পিতা জয়নুদ্দীন আহমদ বিহারের ডেপুটি নবাব থাকাকালীন অবস্থায় ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে আফগান বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। এ সময় আলীবর্দী খান তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজকে বিহারের ডেপুটি নবাব নিযুক্ত করেন। তখন সিরাজের বয়স ১৫ বছর। মৃত্যুর পূর্বে নবাব আলীবর্দী খান তার প্রিয় দৌহিত্র সিরাজকে উত্তরাধিকার হিসাবে মনোনীত করেন। নবাব আলীবর্দী খান দীর্ঘ ১৬ বছর সুনামের সহিত রাজত্ব করে ৭৬ বছর বয়সে ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পরলোকগমন করেন।
Read more