hsc

ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন: ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা (অধ্যায়-১)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

3.1k
Please, contribute by adding content to ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন: ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আবিদনগরের বেশ কিছু ব্যবসায়ী কেতুনগর গ্রামে এসে গ্রামের চেয়ারম্যানের কাছে নিজ গ্রামের প্রধানের ব্যবসায়িক সনদ পেশ করে বাণিজ্য করার জন্য। অনেকগুলো সুবিধা আদায় করে। পরবর্তীতে আবিদনগরের প্রধান তার এক জন ব্যবসায়ীকে কেতুনগর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠান আরও কিছু সুবিধা আদায় করতে।

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

আবিদনগরের বেশ কিছু ব্যবসায়ী কেতুনগর গ্রামে এসে গ্রামের চেয়ারম্যানের কাছে নিজ গ্রামের প্রধানের ব্যবসায়িক সনদ পেশ করে বাণিজ্য করার জন্য। অনেকগুলো সুবিধা আদায় করে। পরবর্তীতে আবিদনগরের প্রধান তার এক জন ব্যবসায়ীকে কেতুনগর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠান আরও কিছু সুবিধা আদায় করতে।

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও:

আসিফকে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে। দায়িত্ব গ্রহণ করেই আসিফ কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে আসিফের সাথে কোম্পানির দ্বন্দ্ব বাঁধে। 

Europeans Companies Arrived in India

ভারতীয় উপমহাদেশের অতুল ঐশ্বর্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের সাথে পাশ্চাত্য দেশগুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ক্রুসেডের (ধর্মযুদ্ধ) পর ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের উপর আরবগণ প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে এবং ভারতীয় বাণিজ্যে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আরবদের নিকট থেকে জোনোয়া, ভেনিস, ফ্লোরেন্স প্রভৃতি নগরের ব্যবসায়ীগণ পণ্য ক্রয় করে ইউরোপের সর্বত্র বিক্রি করত। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্ক কনস্টান্টিনোপল অধিকার করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করলে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে উপমহাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সমগ্র ইউরোপ মহাদেশে ভারতীয় সামগ্রী বিশেষ করে মসলিন, মসলা, সোনা-রুপা, মৃৎশিল্পের চাহিদা ছিল আকাশ ছোঁয়া। এ অবস্থায় তারা নতুন পথের সন্ধান করতে থাকে। তাছাড়া ভারতবর্ষে আরবীয়দের একচেটিয়া প্রাধান্য খর্ব করাও ইউরোপীয়দের উদ্দেশ্য ছিল। অধিকন্তু রেনেসাঁর ফলে অজানাকে জানবার ইচ্ছায় নতুন পথের সন্ধান করতে ইউরোপীয়রা উদ্বুদ্ধ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষে (জম্মুদ্বীপ) আসার জলপথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার করে সমুদ্রপথে প্রাচ্য দেশে আসার নতুন পথের সন্ধান দেন। স্পেনের রানি ইসাবেলার নির্দেশে ভারতের সাথে ব্যবসার জন্য বাণিজ্যিক পথ আবিষ্কার করতে গিয়ে ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাস আটলান্টিকের পথে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করেন।

১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে সরাসরি আসার জলপথ আবিষ্কার করে যেমন ইতিহাস রচনা করলেন তেমনি ইউরোপীয়দের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলেন। ভাস্কো-দা-গামা আরবীয় নাবিকদের সহায়তায় উত্তমাশা অন্তরীপ (দক্ষিণ এশিয়া) পরিভ্রমণ করে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম উপকূলস্থ কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন (২৭ মে, ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে)। তখন ভারতীয় উপমহাদেশে লোদী বংশের সিকান্দার লোদীর রাজত্বকাল (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রি.) ছিল। তার দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি বাণিজ্য প্রার্থনা করেন। ভাস্কো-ডা-গামার আবিষ্কৃত পথ ধরেই ইউরোপীয় সামুদ্রিক জাতিগুলো ভারতবর্ষে আসতে থাকে। এভাবেই নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে দেন ভাস্কো-ডা-গামা। অবশ্য ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বার বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে কালিকট বন্দরে এসেছিলেন এবং সেখান থেকে কোচিনে গিয়ে পর্তুগিজ কুঠি নির্মাণ করেছিলেন। পর্তুগিজ তথা ইউরোপীয় জাতিগুলোর ভারতবর্ষে আসার ক্ষেত্রে ভাস্কো-দা-গামার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

পর্তুগিজদের আগমন

দুঃসাহসী পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামার আবিষ্কৃত পথ ধরে পর্তুগিজরা এ উপমহাদেশে আসতে শুরু করে। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে আগমন করে। এ সময় আরব বণিকদের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে এবং পর্তুগিজদের পক্ষে সাফল্য আসে। ফ্রান্সিসকো ডি আলমিডা ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম পর্তুগিজ প্রতিনিধি বা গভর্নর (১৫০৫-১৫০৯ খ্রি.)। আলবুকার্ক দ্বিতীয় গভর্নর নিযুক্ত হন (১৫০৯-১৫১৫ খ্রি.)। আলবুকার্ক পর্তুগিজ গভর্নরদের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তার সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলেই পর্তুগিজগণ ভারতীয় উপমহাদেশে খুবই শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজন্যবর্গের দুর্বলতার সুযোগে আলবুকার্ক উপমহাদেশে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি বিজয়পুরের সুলতানের নিকট থেকে গোয়া দখল করে একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন এবং ক্রমশ শক্তি বৃদ্ধি করেন। অতঃপর তিনি মালাক্কা এবং হুরমুজ দখল করে কোচিনে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি ভারতবর্ষে একটি স্থায়ী পর্তুগিজ সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি পর্তুগিজদের ভারতীয় রমণীদের বিয়ে করার নির্দেশ দেন। ভারতবর্ষে পর্তুগিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেন। ১৫১৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর পরবর্তী পর্তুগিজ প্রতিনিধিরা অল্পদিনের মধ্যেই ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলের কালিকট, চৌল, কোচিন, বোম্বাই, সিংহল, হুগলী ও বঙ্গদেশে শক্তিশালী বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে এবং কুঠিগুলো দুর্গে পরিণত করে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা চট্টগ্রামে ও সাতগাঁও-এ শুল্ক ঘাঁটি নির্মাণ করে। হুগলীতে ১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তারা উপনিবেশ গড়ে তোলে। এরপর উড়িষ্যা এবং বাংলায় কিছু অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার 'ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় পর্তুগিজদের ৪১টি বাড়ি ছিল। ইসলামপুর, শরাফতগঞ্জ ও নবাবপুরে ছিল তাদের বসতি।

পর্তুগিজদের পতন: ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের অবস্থান স্থায়ী হয়নি। তাদের অত্যাচার, নির্যাতন এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজদের উত্থানে তাদের পতন শুরু হয়। নিম্নে পর্তুগিজদের পতনের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো-
প্রথমত, ১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর পর্তুগিজদেরকে বাংলার সাতগাঁ নামক স্থানে বসতি স্থাপন এবং ব্যবসায়-বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা কালক্রমে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে ওঠে। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অন্যায়ভাবে অধিক শুল্ক আদায়, দাস ব্যবসায় লিপ্ত, ভারতীয়দের জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত, সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের দুজন ক্রীতদাসকে অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হয়। ফলে সম্রাট শাহজাহান ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে তাদের হুগলী থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর তাদের পতন শুরু হয়।
দ্বিতীয়ত, পর্তুগাল ও স্পেন মিলিত হয়ে ওলন্দাজ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে ইউরোপে ১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে পর্তুগালের অনেক অর্থ ক্ষয় হয়। ফলে পর্তুগালের মতো ছোট দেশের পক্ষে দূরপ্রাচ্যের রাজ্যের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; যা তাদের পতনের অন্যতম কারণ।
তৃতীয়ত, আলবুকার্কের পরে পর্তুগিজ সরকার অপর কোনো সুদক্ষ শাসনকর্তাকে ভারতবর্ষে প্রেরণ করতে পারেনি, যিনি পর্তুগিজ শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন; যা তাদের পতন ডেকে আনে।
চতুর্থত, পর্তুগিজদের অনুকরণে ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসি প্রভৃতি ইউরোপীয় বণিকরা ভারতবর্ষে আসতে থাকে। তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় পর্তুগিজরা টিকে থাকতে পারেনি।
পঞ্চমত, স্বদেশ থেকে আর্থিক সাহায্যের অভাবে পর্তুগিজ কোম্পানি তাদের নিয়ম-শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে। তারা অর্থ অভাবে নানান অবৈধ কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মুঘল সম্রাট আকবর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পর্তুগিজরা পিছুটান দেয়।
ষষ্ঠত, পর্তুগিজরা কেবল ব্যবসায়-বাণিজ্যই করত না, তারা এদেশের জমিদার ও প্রভাবশালী বারোভূঁইয়াদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করত। আবার সুযোগ পেলেই জুলুম, নির্যাতন, লুণ্ঠন করত। পর্তুগিজ সৈন্যরা জোর করে এদেশের মেয়েদের বিবাহ করত। এসকল কর্মকাণ্ডই তাদের পতন ডেকে আনে।

ওলন্দাজদের আগমন

ইউরোপের বণিক জাতিগুলোর মধ্যে পর্তুগিজদের পরেই হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ড) অধিবাসী ওলন্দাজদের (ডাচ) ভারতবর্ষে আগমন ঘটে। তারা ভারতবর্ষে বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (United East India Company) গঠন করে। কোম্পানির সনদ অনুযায়ী যুদ্ধবিগ্রহে যোগদান, সন্ধি স্থাপন, দুর্গ নির্মাণ প্রভৃতি অধিকার লাভকরে। ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে তারা পর্তুগিজদের নিকট থেকে মালাক্কা অধিকার করে এবং ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের সিংহল থেকে বিতাড়িত করে। এ বিজয়ের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দ্বীপগুলোর ওপর ওলন্দাজদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে তাদের প্রধান ঘাঁটি ছিল মাদ্রাজ উপকূলে নাগাপট্টম এবং বাংলায় প্রধান ঘাঁটি ছিল চুঁচুড়ায়। ঢাকায় তারা কুঠি স্থাপন করেছিল ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান মিটফোর্ট হাসপাতালের কাছে। তেজগাঁওয়ে তাদের একটি বাগানবাড়ি ছিল। ঐতিহাসিক টেলর উল্লেখ করেছেন, "১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ৩২টি ওলন্দাজ পরিবার ছিল। পিটারসন কোয়েনই ছিলেন ভারতবর্ষে ওলন্দাজ শক্তির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।”

ওলন্দাজদের পতন: স্পেনীয়দের সাথে দ্বন্দ্ব ওলন্দাজদের পতনের প্রধান কারণ। তাছাড়া ওলন্দাজগণ ভারতবর্ষ অপেক্ষা মালয় দ্বীপপুঞ্জে আধিপত্য বিস্তারে বেশি মনোযোগী হন। এ সুযোগে ইংরেজগণ ভারতবর্ষে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকলে ওলন্দাজরা টিকে থাকতে না পেরে ইংরেজদের নিকট সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যায় (এম. হাসান দানীর 'ঢাকা' বইতে উল্লেখ করেছেন, নারিন্দায় খ্রিষ্টান কবরস্থানে ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দের কুঠি প্রধান ডি ল্যাংহিটের কবরটিই এখন ঢাকায় ওলন্দাজদের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে)।

দিনেমারদের আগমন ও পতন

দিনেমার বণিকগণ (ডেনমার্কের অধিবাসী) ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (Danish East India Company) গঠন করে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে তানজোর জেলার ট্রাঙ্কুভার এবং ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার উত্তরে শ্রীরামপুরে তারা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। কিন্তু ব্যবসায় সুবিধা করতে না পারায় ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ১২,৫০,০০০ রুপিতে ইংরেজদের নিকট তাদের বাণিজ্য কুঠি বিক্রি করে এ উপমহাদেশ থেকে চলে যায়।

ইংরেজদের আগমন

ভারতবর্ষে বিপুল ঐশ্বর্য সম্পর্কে ইংরেজরা পূর্ব থেকে অবগত ছিলেন। সর্বোপরি পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও দিনেমারদের বাণিজ্য উপলক্ষ্যে ভারতবর্ষে আগমনের কথা জেনে রানি প্রথম এলিজাবেথের সময় ইংরেজ বণিকদের মনে প্রাচ্যদেশে বাণিজ্য করার অদম্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ বণিকরা প্রাচ্যের সহিত বাণিজ্য করার উদ্দেশে "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (East India Company) নামে একটি বণিক সংঘ গঠন করে। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর এ সমিতিকে রানি এলিজাবেথ ১৫ বছরের বাণিজ্য সনদ প্রদান করেন। এই সমিতির মূলধন ছিল ৭০,০০০ পাউন্ড। সদস্য সংখ্যা ছিল রানি এলিজাবেথ সহ ২৪ জন। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে 'ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামে অপর একটি বণিক সংঘ রাজার অনুমতিপত্র নিয়ে ভারতে আগমন করে। শীঘ্রই একই দেশের দুটি কোম্পানির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অতঃপর ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে উভয় কোম্পানি মিলিত হয়ে 'The United Company of Marchants of England Trading to the East Indies' নামে আখ্যায়িত হয়। এই সম্মিলিত কোম্পানিই ভারতবর্ষের ইতিহাসে 'ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' নামে সু-পরিচিত। এই কোম্পানিই সময়ের ব্যবধানে বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করে। অথচ সেদিন কেউই চিন্তা করেনি যে, এই বণিক সম্প্রদায়ই একদিন এদেশের ভাগ্যবিধাতা হবে।

১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশ নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে। এ সময় পর্তুগিজদের সাথে ইংরেজদের সংঘর্ষ হয়। শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা জয়লাভ করে। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত হিসাবে ১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে স্যার টমাসরো মোগল দরবারে আগমন করে ৩ বছর অবস্থান করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট থেকে কতগুলো বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করেন। স্যার টমাসরো অত্যন্ত দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি বিলাতের কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে পরামর্শ দেন যে, "এ দেশের মানুষের স্বভাব তিনি যা বুঝেছেন তা হলো, তারা ভীতি প্রদর্শন ও বল প্রয়োগ ছাড়া অন্য কিছুর দ্বারা বশীভূত হয় না। সুতরাং কোম্পানির উচিত প্রয়োজন মতো তরবারি ব্যবহার করা।" তার নীতি ছিল "আবেদন ও বল প্রয়োগ" যা পরবর্তীকালে ইংরেজদের ভারত শাসননীতিতে লক্ষণীয়।

১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ও পর্তুগিজদের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে স্বদেশে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়। অতঃপর ঐ বছরই ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্তুগিজ রাজকন্যা ক্যাথরিন ব্রাগাঞ্জকে বিবাহ করে যৌতুক হিসেবে পর্তুগিজদের নিকট থেকে মুম্বাই শহরটি লাভ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চার্লস-এর নিকট থেকে উক্ত শহরটি বাৎসরিক ১০ পাউন্ডের বিনিময়ে ইজারা গ্রহণ করে। কিন্তু পরে তা কোম্পানি পঞ্চাশ হাজার পাউন্ডে ক্রয় করে নেয়।
১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মুম্বাই-এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষের সাথে সম্রাট আওরঙ্গজেবের এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত চুক্তি মোতাবেক জব চার্নক বঙ্গদেশে আসার অনুমতি লাভ করেন এবং ভাগীরথী নদীর তীরে সুতানটি, কালিকট এবং গোবিন্দপুর এই তিনটি গ্রাম ক্রয় করে কলকাতা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। এ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামানুসারে ফোর্ট উইলিয়াম নামে একটি দুর্গ তৈরি করেন। এভাবে কলকাতা, মাদ্রাজ এবং মুম্বাই তিনটি শহরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফরাসিদের আগমন

ইউরোপ মহাদেশের বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বশেষে আগমন করেন ফরাসিরা। ১৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর রাজত্বকালে তার মন্ত্রী কোলবাটের সহযোগিতায় "ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি" গঠিত হয়। ১৬৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাঁসোয়াক্যার (Francois Carron) এর নেতৃত্বে তারা সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরের বছর মসলিমপট্টমে দ্বিতীয় বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। (ঢাকায় ফরাসিদের স্মৃতি বহন করে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ এলাকাটি। ঢাকার নায়েব নাজিম নওয়াজিশ খান ১৭২৬ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসিদের গঞ্জ বসানোর অনুমতি দিলে তারা একটি আবাস গড়ে তোলে যা ফরাশগঞ্জ নামে পরিচিত)। ১৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান ফরাসিদের বাংলার চন্দননগরে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেন। কালক্রমে তারা পণ্ডিচেরী, মাহে এবং কালিকট প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পার্থক্য এই যে, ফরাসি কোম্পানি ছিল ফরাসি সরকারের বাণিজ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। পক্ষান্তরে ইংরেজ কোম্পানি ছিল বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত। ইংরেজ কোম্পানি শুধুমাত্র উপমহাদেশেই বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উপনিবেশ স্থাপনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ফরাসিরা উপমহাদেশের বাইরে মাদাগাস্কার দ্বীপেও বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপনে মনোযোগী হয়। যে কারণে উপমহাদেশের বাণিজ্যে ফরাসিদের ভাটা পড়ে।

১৭২০ খ্রিষ্টাব্দের পর ফরাসি কোম্পানির অবস্থা উন্নতি হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৭২১ খ্রিষ্টাব্দে মরিসাস দ্বীপে, ১৭২৫ খ্রিষ্টাব্দে মাহে, ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কারিকরে কুঠি স্থাপন করে। ফরাসিরা পণ্ডিচেরীতে প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে। এখানে তারা একটি দুর্গ নির্মাণ করে। এ দুর্গে কিছু সংখ্যক ভারতীয় সৈন্যও নিযুক্ত করে। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে যোসেফ ডুপ্লে পণ্ডিচেরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়। ডুপ্লে নেতৃত্বে ফরাসিরা ভারতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং ভারতবর্ষে ফরাসি সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ ও ফরাসিদের ন্যায় সুইডেনের বণিক সম্প্রদায় The Swedish East India Company, The Astrian East India Company প্রভৃতি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গঠন করে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে আসে। গ্রিকরাও ভারতবর্ষে এসেছিল। জেমস টেলর উল্লেখ করেছেন, কলকাতায় গ্রিক সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা 'আগিরি' ঢাকায় বসবাস করতেন এবং ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পরলোকগমন করেন। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন উল্লেখ করেছেন, ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় ২১টি গ্রিক পরিবার ছিল। লবণ ও পাটের কারবার করে তারা বেশ অর্থ উপার্জন করেছিল। ঢাকায় তারা একটি গির্জাও তৈরি করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি চত্বরে একটি গ্রিক কবর আজও তাদের স্মৃতি বহন করে। সে যাই হোক, বাণিজ্যের ব্যাপক প্রতিযোগিতার মধ্যে ইংরেজ এবং ফরাসি ব্যতীত সকল ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় বাণিজ্য গুটিয়ে যার যার দেশে ফিরে যান।

Content added By

The English East India Company Setting up Predominance in India

ভারতবর্ষে বাণিজ্য বৃদ্ধির পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রাজ্য স্থাপন ও শাসনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। জব চার্নক ১৬৯০ সালে সুতানটি, কালিকট এবং গোবিন্দপুর এই তিনটি গ্রাম নিয়ে কলকাতা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। অতঃপর ইংরেজ কোম্পানির সুরক্ষার জন্য ১৭০০ সালে কলকাতায় একটি দুর্গ নির্মাণ করে। তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামানুসারে এ দুর্গের নামকরণ করা হয় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। ঐ বছর বাংলার ইংরেজ কুঠিগুলো নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়। নবগঠিত এই কাউন্সিলের সদর দফতর স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে। চার্লস আইয়ার সর্বপ্রথম এর গভর্নর নিযুক্ত হন। ইতোমধ্যে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিকে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারিয়ে ক্রমশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতবর্ষে বাণিজ্য বিস্তার তথা শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি অবদান রেখেছে 'ফররুখ শিয়ার' কর্তৃক প্রদত্ত ছাড়পত্র। মোগল সম্রাট ফররুখ শিয়া একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। রাজ্যের ডাক্তার-হেকিমরা অনেক চেষ্টা করেও তার রোগ মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারলেন না-। এসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাক্তার

হ্যামিলটনের চিকিৎসায় ফররুখ শিয়া সুস্থ হয়ে ওঠেন। সম্রাট রোগ মুক্তির প্রতিদান দিতে চাইলে সুচতুর হ্যামিলটন নিজের জন্য কিছু না চেয়ে কোম্পানির জন্য কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা প্রার্থনা করলেন। ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে ফররুখ শিয়া এক ফরমান জারি করে বাৎসরিক মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাংলায় একচেটিয়া বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। এই ফরমান বলে কলকাতার ইজারাসহ বিনা শুল্কে মাদ্রাজ ও মুম্বাই শহরেও বাণিজ্য করার অনুমতি লাভকরেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য প্রসারে এই ফরমান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ঐতিহাসিক রবার্ট ওর্ম এই ফরমানকে (সনদ) 'ম্যাগনাকার্টা' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে (১) মোগল সম্রাটদের দুর্বলতা; (২) নাদির শাহের আক্রমণ; (৩) প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং (৪) ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা প্রভৃতি কারণে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে। এ সময় দক্ষিণ ভারতের সুবেদারের অধীনে কর্ণাটক নামে একটি প্রদেশ ছিল। এর রাজধানী ছিল আরকট। নবাব পদমর্যাদার শাসনকর্তা স্বাধীন ছিলেন। কর্ণাটকের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ইংরেজ ও ফরাসি বণিক সম্প্রদায় এ অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ডুপ্লের নেতৃত্বে ফরাসিরা এবং ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা দক্ষিণ ভারতে প্রভাব বিস্তারের জন্য অগ্রসর হয়। ফলে প্রকাশ্য যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে 'কর্ণাটকের যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এখানে ১৭৪৬ থেকে ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফল ছিল ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ফরাসিদের বিলুপ্তি এবং পরাক্রমশালী ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।

কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। সেই সূত্রে দক্ষিণ ভারতে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে যুদ্ধ উপস্থিত হয়। তাছাড়া ইংরেজ সেনাপতি জোরপূর্বক কয়েকটি ফরাসির রণপোত দখল করলে উপমহাদেশে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজরা ফরাসিদের বাণিজ্য কেন্দ্র পণ্ডিচেরী আক্রমণ করতে উদ্যত হলে ডুপ্লের পরামর্শক্রমে কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার উদ্দীন তার রাজ্যে ইংরেজদের যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন। এ সময় ডুপ্লের সাথে কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার উদ্দীনের চুক্তি হয়, ইংরেজদের কাছ থেকে মাদ্রাজ অধিকৃত হলে তা আনোয়ার উদ্দীনকে দেওয়া হবে। কিন্তু মাদ্রাজ অধিকৃত হলে তা নবাবকে না দিয়ে ডুপ্লে তার নিজ অধিকারে রাখেন। এতে নবাব আনোয়ার উদ্দীন ক্ষুব্ধ হয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ যাত্রা করেন। কিন্তু মাত্র ৫০০ ফরাসি সৈন্যের নিকট নবাব পরাজিত হন। এটাই ইতিহাসে কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে পরাজয়ে কর্ণাটকের নবাবের দুর্বলতা প্রমাণিত হয়। এর ফলে ফরাসি এবং ইংরেজ উভয়ই উপমহাদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনে উৎসাহিত হয় এবং দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অবশ্য ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপে আইলা-স্যাপল সন্ধির দ্বারা উভয় দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটলে ভারতেও দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।

কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ

প্রথম কর্ণাটক যুদ্ধের স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির মধ্যে দ্বিতীয় কর্ণাট যুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল। সুচতুর ডুপ্লে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ফরাসিদের ক্ষমতা শুধু কর্ণাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে বঙ্গদেশ ও মুম্বাইয়ে ইংরেজদের শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অরাজকতা এবং রাজন্যবর্গের অন্তর্দ্বন্দ্ব উচ্চাভিলাষী ডুপ্লেকে যুদ্ধে অংশ নিতে উৎসাহিত করে।

১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে হায়দারাবাদের নিজাম-উল-মুলকের মৃত্যু হলে নিজাম পদের জন্য তার দ্বিতীয় পুত্র নাসির জং ও দৌহিত্র মোজাফফর জং-এর মধ্যে এবং কর্ণাটকের নবাব পদের জন্য আনোয়ার উদ্দীন ও চাঁদ সাহেবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এই সুযোগে ডুপ্লে কর্ণাটকের চাঁদ সাহেব ও হায়দারাবাদের মুজাফফর জং-এর পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে দ্বিতীয় কর্ণাটক যুদ্ধের বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত হয়। অম্বরের যুদ্ধে আনোয়ার উদ্দীন নিহত হলে কর্ণাটক চাঁদ সাহেবের হস্তগত হয়। ফলে ফরাসিদের প্রভাব বেড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে নাসির জং ও মোজাফফর জং-এর মৃত্যু হলে ঘটনা প্রবাহ নতুন মোড় নেয়। ক্লাইভ ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসিদের পরাজিত করে আরকট ও ত্রিচিনোপলী অধিকার করে মুহম্মদ আলীকে সিংহাসনে বসান। ইতোমধ্যে ফরাসি সরকারের সাথে ডুপ্লের মতবিরোধ হলে তাকে স্বদেশে ডেকে পাঠানো হয় (১৭৫৪ খ্রি.)। ফলে ইংরেজদের আধিপত্য বিস্তারে আর কোনো বাধা রইল না। ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ডুপ্লের পরিবর্তে কাউন্ট লালী পণ্ডিচেরীর শাসনকর্তা হয়ে ভারতে আসেন।

কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ

তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহের অন্যতম। এটিই উপমহাদেশে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের সর্বশেষ পর্ব। ইউরোপে সপ্ত বছরব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩) আরম্ভ হলে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ইতোমধ্যে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা সাফল্য পেয়ে বাংলায় প্রভুত্ব স্থাপন করে ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ডুপ্লের পরিবর্তে কাউন্ট লালী পণ্ডিচেরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে উপমহাদেশে আগমন করেন। তিনি ইংরেজদের মাদ্রাজ কুঠি আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজগণ ফরাসিদের মসলিমপট্টম দখল করে। ইংরেজ আক্রমণের বিরুদ্ধে পণ্ডিচেরী রক্ষা করা অসম্ভব দেখে সেখানকার ফরাসিরা আত্মসমর্পণ করে। ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে 'প্যারিস সন্ধি' মোতাবেক ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের অবসান ঘটলে ভারতীয় উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসিরা তাদের হারানো কুঠি ফিরে পেল বটে, কিন্তু সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। ফলে ইংরেজদের পথ প্রশস্ত হলো। লালী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁকে কস্টিলের দুর্গে দুই বছর বন্দি জীবনযাপন করতে হয় এবং বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

ইংরেজদের সাফল্যের কারণ

ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য স্থাপনে ফরাসিদের ব্যর্থতা ও ইংরেজদের সাফল্যের কারণগুলোর মধ্যে ছিল-

(১) ইংরেজ কোম্পানি ফরাসি কোম্পানির তুলনায় সম্পদ ও সংগঠনে শ্রেষ্ঠ।

(২) ইংরেজদের নৌশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব।

(৩) ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, অপরপক্ষে ফরাসি কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রীয় সাহায্য-সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।

(৪) বঙ্গদেশে ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর বিশেষ করে পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর তারা অনেক অর্থের অধিকারী হয়, যা বিপদের দিনে তাদেরকে রক্ষা করে।

(৫) বুদ্ধিমত্তা ও রণনৈপুণ্যে ক্লাইভ বা তার সহকর্মীদের অপেক্ষা ফরাসি ডুপ্লে বা লালীরা শ্রেষ্ঠ ছিল না এবং ফরাসিদের মধ্যে ঐক্যেরও অভাব ছিল।

(৬) ইংরেজ কোম্পানি ভারতীয় রাজনীতিতে অংশ নিলেও বাণিজ্যিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। কিন্তু ফরাসিরা বাণিজ্যিক আদর্শ থেকে দূরে সরে যায়।

(৭) ইংরেজদের মুম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতার ন্যায় ফরাসিদের পণ্ডিচেরী ও চন্দননগর সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল না।

(৮) কর্ণাটকের যুদ্ধাবস্থায় ফরাসি সরকার যোসেফ ডুপ্লের মতো একজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে স্বদেশে ডেকে পাঠিয়ে ভুল করেন, যা ফরাসিদের পরাজয় ডেকে আনে।

(৯) ফরাসি সরকারের ঔদাসীন্য ও অসহযোগিতা ভারতবর্ষে ফরাসিদের পরাজয় ডেকে আনে।

(১০) ইউরোপীয় জাতিগুলোর মধ্যে ফরাসিরাই সর্বশেষে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে। সুতরাং তারা ইংরেজ কোম্পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুল সংখ্যক বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের সুযোগ পায়নি। যার কারণে আর্থিক প্রাচুর্যও লাভ করতে পারেনি।

(১১) ইংরেজ জাতি বরাবরই নৌ শক্তিতে বলীয়ান ছিল। নৌ শক্তির সাফল্য ইংরেজদের সাফল্যের অন্যতম কারণ। ফরাসি নৌবাহিনী অপেক্ষা ইংরেজ নৌবাহিনী শক্তিশালী হওয়ায় দক্ষিণ সমুদ্রে ইংরেজরা একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

(১২) ফরাসিগণ অনেকাংশে ভারতীয় রাজন্যবর্গের সাহায্য-সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইংরেজরা কখনোই ভারতীয় রাজন্যবর্গের ওপর নির্ভরশীল ছিল না।

(১৩) ফরাসি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কোন্দল, চারিত্রিক দুর্বলতা এবং ঐক্যের অভাব তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে, ইংরেজরা ছিল ঐক্যবদ্ধ জাতি যার প্রমাণ তারা ভারতবর্ষেও রেখেছে। তারা একতাবদ্ধ হয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সাফল্য অর্জন করে।

ডুপ্লের চরিত্র ও কৃতিত্ব (The character and achievements of Duplay)

ইউরোপ মহাদেশ থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আগত বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ফরাসি প্রতিনিধি যোসেফ ডুপ্লে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও কূটনৈতিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ১৭৩১ খ্রিষ্টাব্দে চন্দননগরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে আগমন করেন। তার মেধা এবং দক্ষতার জন্যই ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে তাকে পণ্ডিচেরীর গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ভারতীয় রাজন্যবর্গের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এদেশে ফরাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু ইংরেজরা তার স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজদের অনেক পরে এসেও তিনি নিজ মেধা ও কৌশল দিয়ে চন্দননগর, মাহে, কালিকট ও পণ্ডিচেরীতে শক্তিশালী ফরাসি বাণিজ্য কুঠি প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ইংরেজদের প্রায় নাস্তানাবুদ করে ফেলেন। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য স্বদেশ থেকে তিনি আশানুরূপ সাহায্য ও সহযোগিতা পাননি। পেলে হয়তো তিনি ইংরেজদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে পারতেন। তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হতো। সে যাইহোক, গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তে ভুল বুঝে তাকে স্বদেশে ডেকে পাঠানো হয়। ডুপ্লের প্রস্থানের সাথে সাথে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যে ফরাসি প্রভাব বিনষ্ট হয় এবং ইংরেজগণ পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ফরাসি সরকার তার ভুল বুঝতে পেরে তার পদচ্যুতি প্রত্যাহার করলেও তখন আর সময় ছিল না। সুতরাং বলা যায়, ভারতবর্ষে ডুপ্লের ব্যর্থতার জন্য ফরাসি সরকারই দায়ী।

ঐতিহাসিক ম্যানসন ডুপ্লের কূটনৈতিক জ্ঞান, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক শক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনিই উপমহাদেশের সাম্রাজ্যবাদ নীতির প্রবক্তা। ইংরেজরা তাকে অনুসরণ করে সাম্রাজ্যবাদ নীতি গ্রহণ করে এবং উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্য কায়েম করে।

Content added By

Nawab Dynasty in Bangla

বাংলার ইতিহাসে নবাবি বংশ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭) বাংলার নবাবি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নবাব বংশের শেষ শাসক নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার নবাবি বংশের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই 'রাজমহলের যুদ্ধে' আফগান বা পাঠান জাতির কররানী বংশের শেষ সুলতান দাউদ খান কররানীকে পরাজিত ও নিহত করে সম্রাট আকবর তথা মোগলরা বাংলা বিজয় করেন। এ যুদ্ধে জয়ের পর বাংলা মোগলদের প্রদেশে পরিণত হয় এবং মুঘলদের অধীনে সুবেদারি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আকবরের জৈনপুরের শাসনকর্তা খান-ই খানান মুনীম খান। সে হিসেবে বাংলার প্রথম সুবেদার হন মুনীম খান (১৫৭৬)। এরপর ধারাবাহিকভাবে যারা বঙ্গদেশ শাসন করেছেন তারা হলেন-

২। খান-ই-জাহান (১৫৭৬-১৫৭৮ খ্রি.),

৩। মুজাফফর খা তুরবর্তী (১৫৭৮-১৫৮০ খ্রি.)

৪। রাজা টোডরমল (১৫৮০-১৫৮২ খ্রি.)

৫। খান-ই-আজম মীর্জা আজীজ কেকা (১৫৮২-১৫৮৪ খ্রি.)

৬। শাহবাজ খান (১৫৮৪-১৫৮৭ খ্রি.)

৭। রাজা মানসিংহ (১৫৮৭-১৬০৬ খ্রি.)।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে (১৬০৬-১৬২৮) ৯ জন সুবাদার ছিলেন। তারা হলেন-

১। কুতুবউদ্দিন কোকা (১৬০৬-১৬০৭)

২। জাহাঙ্গীর কুলী খান (১৬০৭-১৬০৮)

৩। ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩)

৪। কাশিম খান (১৬১৩-১৬১৮)

৫। ইব্রাহীম খান (১৬১৮-১৬২২)

৬। শাহজাদা শাহজাহান (১৬২২-১৬২৫)

৭। খমজাদ খান (১৬২৫-১৬২৬)

৮। মুকারম খান (১৬২৬-১৬২৮)

৯। ফিদাই খান (১৬২৭-১৬২৮)।

সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৬২৮-১৬৫৮) ৪ জন সুবাদার বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তারা হলেন-

১। কাশিম খান খোরাসানী (১৬২৮-১৬৩২)

২। আজিম খান (১৬৩২-১৬৩৭)

৩। ইসলাম খান মাশহাদী (১৬৩৭-১৬৩৯)

৪। শাহজাদা মুহম্মদ সুজা (১৬৩৯-১৬৬০)।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) ৯ জন সুবাদার বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তারা হলেন-

১। শাহজাদা মুহম্মদ সুজা (১৬৬০)

২। মীর জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩)

৩। শায়েস্তা খান (১৬৬৩-১৬৭৭, ১৬৭৯-১৬৮৮)

৪। ফেদাই খান (১৬৭৮)

৫। সুলতান মুহাম্মদ আজিম (১৬৭৮-১৬৭৯)

৬। খান-ই-জাহান (১৬৮৮-১৬৮৯)

৭। ইব্রাহীম খান (১৬৮৯-১৬৯৭)

৮। আজিম-উস-শান (১৬৯৭-১৭০৪)

৯। মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭)।

মুর্শিদ কুলী খান (১৭০৪-১৭২৭) [Murshid Quli Khan (1704-1727)]

বাংলার স্বাধীন নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুর্শিদ কুলী খান। তিনি দক্ষিণ ভারতের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তাঁকে হাজী শফী ইস্পাহানী নামে এক মুসলিম ব্যবসায়ী ক্রয় করেন এবং তাঁকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ হাদী। শফী ইস্পাহানী তাঁকে নিজ সন্তানের মতো পারস্যে নিয়ে শিক্ষা লাভ করান। শফী ইস্পাহানী কিছুদিন দিল্লির দেওয়ান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এ সময় মুহাম্মদ হাদী দেওয়ান সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। শফী ইস্পাহানী মৃত্যুর পর মুহাম্মদ হাদী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন। এ সময় সম্রাট তাঁকে মুর্শিদ কুলী খান উপাধিতে ভূষিত করেন (১৭০৩ খ্রি.)। শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে সুবাদারের পরেই ছিল দেওয়ান পদ। মুর্শিদ কুলী খান বাংলার বিশৃঙ্খল রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এ সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন আওরঙ্গজেবের পৌত্র আজিম-উস-শান। তিনি অলস ও আরামপ্রিয় লোক ছিলেন। ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদ কুলী খানকে উড়িষ্যার সুবেদার নিযুক্ত করেন এবং 'জাফর খান' উপাধিতে ভূষিত করেন।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে তিনি স্বাধীনভাবেই বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এবং নিজেকে বাংলার নবাব বলে ঘোষণা দেন। তার সময় ইংরেজরা বিনা শুল্কে বাংলায়-বাণিজ্য করতে পারেনি। মুর্শিদ কুলী খানের কঠোর শাসনে দেশে শান্তি স্থাপন হয় ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। শাসন ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু সংস্কার করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কার হলো ভূমি রাজস্ব সংস্কার ও অর্থনৈতিক সংস্কার। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

ভূমি রাজস্ব সংস্কার : মুর্শিদ কুলী খানের আগমনের পূর্বে বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা নানা প্রকার সমস্যায় জর্জরিত ছিল।
তখন জায়গির প্রথা প্রচলিত ছিল। সরকারের নিজস্ব খাস জমি বলতে কিছুই ছিল না। ফলে ভূমি রাজস্ব থেকে সরকারের কোনো আয় হতো না। রাষ্ট্রের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাণিজ্য শুল্ক। মুর্শিদ কুলী খান বাংলার ভূমি রাজস্ব সংক্রান্ত দুরবস্থা দূর করতে এবং সরকারের আয় বৃদ্ধি করতে দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন- (১) মুঘল কর্মচারীদের সমুদয় জায়গির সরকারি খাস জমিতে পরিণত করা এবং এর পরিবর্তে কর্মচারীগণকে উড়িষ্যার অনুন্নত ও জঙ্গলাবৃত অঞ্চলে জায়গির প্রদান করা। (২) রাজস্ব আদায়ের ভার জমিদারদের নিকট থেকে কেড়ে নিয়ে ইজারাদারদের ওপর ন্যস্ত করা। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তার উদ্ভাবিত "মালজামিনী প্রথা" ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলা ও ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ করেন। দিল্লিতে নিয়মিত রাজস্ব প্রেরণ করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধের ব্যয় এবং রাজপরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদ কুলী খানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে মুর্শিদ কুলী খান অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে তিনি ইজারাদারদের কোনো প্রকার অবহেলা সহ্য করতেন না। তিনি প্রদেশের সকল আবাদি ও অনাবাদি জমি জরিপ করে কৃষকদের মাঝে বণ্টন করতেন এবং জমির উৎপাদন শক্তির ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণ করতেন। মুর্শিদ কুলী খান প্রবর্তিত মালজামিনী ব্যবস্থায় অধিকাংশ জমিদার তাঁদের জমিদারি থেকে উচ্ছেদ হলেও তিনি তাদের উপযুক্ত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন যা 'নানকর' নামে পরিচিত। এছাড়া মুর্শিদ কুলী খান বাংলার বিভিন্ন স্থানের আবাদি জমি সরকারি খাস জমিতে পরিণত করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার: রাজস্ব সংস্কার ছাড়াও মুর্শিদ কুলী খান ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেন এবং আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি পদাতিক এবং অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর সংখ্যা হ্রাস করেন। ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য তিনি ইউরোপীয় বণিকদের প্রতি উদার ও সহনশীল নীতি গ্রহণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় ওলন্দাজ, চুঁচুড়ায় ইংরেজ ও চন্দননগরে ফরাসি বাণিজ্য কুঠি গড়ে ওঠে।

বঙ্গদেশে ইংরেজরা মুঘল সম্রাটদের ফরমান বলে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেছিল। কিন্তু মুর্শিদ কুলী খান ইংরেজদের এই সুযোগ প্রত্যাহার করে নিলে ইংরেজ প্রতিনিধি সুরম্যান সম্রাট ফররুখ শিয়ার শরণাপন্ন হন। অতঃপর ইংরেজরা বাৎসরিক তিন হাজার টাকার বিনিময় বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। মুর্শিদ কুলী খানের রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থায় বেশ পরিবর্তন আসে, অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হয়। জমিদার ও ইংরেজ কর্মচারীর অত্যাচার, জুলুম থেকে কৃষকরা রক্ষা পায়।
কৃতিত্ব: বাংলার স্বাধীন নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুর্শিদ কুলী খান বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় নাম। সামান্য অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে তিনি বাংলার দেওয়ান ও সুবাদার পদে উন্নীত হন। তাঁর শাসনামলে বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়। বহু পারসিক কবি সাহিত্যিক মুর্শিদ কুলী খানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আগমন করেন এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।

ঐতিহাসিক সলিমুল্লাহ বলেছেন, "শায়েস্তা খানের পর ভারতের কোন অংশে জাফর খানের (মুর্শিদ কুলীর) ন্যায় ধর্ম প্রসারে উৎসাহী নিরপেক্ষ বিচারপতি এবং গুণগ্রাহী আমীর জন্মগ্রহণ করেননি।" সম্রাট আওরঙ্গজেবের ন্যায় তিনিও ছিলেন ধর্মভীরু, গোড়া, সকল প্রকার বিলাস হতে মুক্ত ও উচ্চ নৈতিক চরিত্রের অধিকারী। ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রতিভাবান সুবেদারের মৃত্যু ঘটে।

নবাব সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি.) [Nawab Sujauddin Khan (1727-1739)]

মুর্শিদ কুলী খানের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তার জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলা ও উড়িষ্যার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। তুর্কি বংশোদ্ভূত সুজাউদ্দিন একজন মোগল রাজকর্মচারী ছিলেন। মুর্শিদ কুলী খানের কন্যা জিনাত-উল-নিসার সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি নিজ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার জন্য বিশ্বাসজনক অনুচরদের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। আলীবর্দী খানকে তিনি পূর্ণিয়ার (বিহার) নায়েব নাজিম (সহকারী শাসনকর্তা) নিযুক্ত করেন। দিল্লির সম্রাট মুহম্মদ শাহকে তিনি প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন প্রেরণ করে সন্তুষ্ট করেন। যার বদৌলতে তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার পদ লাভকরেন। সম্রাট সুজাউদ্দিনকে "মুতাসন-উল-মুলক-সুজা-উদ-দৌলহ আসাদ জঙ্গ" উপাধিতে ভূষিত করেন। সুজাউদ্দিনের শাসনামলে শায়েস্তা খানের আমলের ন্যায় খাদ্যদ্রব্যের দাম খুব কম ছিল।

মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৬-১৭০৭ খ্রি.) শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ তার সময় টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যেত। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য শায়েস্তা খান ঢাকা ত্যাগের পূর্বে দুর্গের পশ্চিম তোরণ বন্ধ করে সেখানে লিখেছেন, "ভবিষ্যতে যে সুবাদারের আমলে টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যাবে তিনি ব্যতীত অন্য কেহ এই তোরণ উন্মোচন করবে না।" নবাব সুজাউদ্দিনের সময় টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যায়। ফলে তিনি মহা ধুমধামে উক্ত তোরণ উন্মোচন করেছিলেন। তার সময় ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজ কোম্পানিগুলো ঝাঁকিয়ে ব্যবসায় চালায়। তবে ইংরেজরা ফররুখ শিয়ার দস্তক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়নি।

অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তাঁর শাসনামলকে "বাংলার শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের মতে, "সুজাউদ্দিন ছিলেন নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার পরায়ণ শাসক।" তিনি ধনীদের প্রতি পক্ষপাত না করে ন্যায়বিচার করতেন। তিনি স্থাপত্যের অনুরাগী ছিলেন। তিনি মুর্শিদাবাদে দেওয়ান-ই-খাস হর্য্য নির্মাণ করেন।

নবাব সরফরাজ খান (১৭৩৯-১৭৪০ খ্রি.) [Nawab Sarfaraj Khan (1739–1740)]

১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র সরফরাজ খান বাংলার নবান হন। তিনি ছিলেন অকর্মণ্য, অনভিজ্ঞ এবং চরিত্রহীন। তিনি শাসনকার্যের প্রতি অবহেলা করে হেরেমের আমোদ-প্রমোদেই নিমগ্ন থাকতেন। এই সুযোগে উচ্চাভিলাষী বিহারের নায়েব নাজিম আলীবর্দী খান স্ব-সৈন্যে তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল 'গিরিয়ার যুদ্ধে' সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে তিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব পদ লাভ করেন।

নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.) [Nawab Alivardi Khan (1740-1756)]

যে সকল ভাগ্যান্বেষী তরবারি মাত্র সম্বল করে উচ্চ পদে আসীন হন তাদের মধ্যে আরব বংশোদ্ভূত আলীবর্দী খান অন্যতম। তার প্রকৃত নাম মির্জা মুহম্মদ আলী। তিনি প্রথমে আজম শাহ এবং পরে সুজাউদ্দিন খানের অধীনে বিহারের নায়েব নাজিম পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং আলীবর্দী খান উপাধি লাভ করেছিলেন। বাংলার মসনদে বসার পর আলীবর্দী খান গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তার নিজ আমির ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিদের বসান। নবাব আলীবর্দী খান মুর্শিদ কুলী খানের বংশধরকে হত্যা ও বিভিন্ন পদ থেকে উচ্ছেদ করে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেন। তার শাসনামলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মারাঠা আক্রমণ বা বর্গী হামলা।

মারাঠা আক্রমণ: আলীবর্দীর আমলে মারাঠাদের আক্রমণে বাংলা ছারখার হয়ে যায়। যাত্রাপথে দুধারের গ্রামগুলোকে তারা লুটপাট করে ও আগুনে জ্বালিয়ে শশ্মশানে পরিণত করে। এসময় রঘুজী ভোসলে ছিল মারাঠা সর্দার এবং ভাস্কর পণ্ডিত ছিলেন মারাঠা সেনাপতি। মারাঠাদের ভয়ে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পালায়, ফলে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাঁতিরা ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালায়, ফলে বস্ত্রের অভাব দেখা দেয়। বাংলায় বর্গীরা স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর কীরূপ অত্যাচার চালায় এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করে তা গ্রাম্য নারীদের ঘুমপাড়ানি ছড়ায় এখনও প্রমাণ মেলে।

"খোকা ঘুমালো

পাড়া জুড়ালো

বর্গী এলো দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে

খাজনা দেব কিসে।"

মারাঠারা পানির ন্যায়। পানিতে আঘাত করলে যেমন প্রতিঘাত করে না তেমনি আঘাতের চিহ্নও থাকে না। আলীবর্দী খান মারাঠাদের আক্রমণ প্রতিহত করলেও আবার তারা সক্রিয় হয়ে আক্রমণ চালাত। দীর্ঘ সংগ্রামে আলীবর্দী খানের দেহ ও মন ভেঙে যায়। অবশেষে মারাঠাদের উড়িষ্যার একাংশের রাজস্ব এবং বছরে ১২ লক্ষ টাকা চৌথ প্রদান করে তাদের সাথে স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্থাপন করেন।

কৃতিত্ব : নবাব আলীবর্দী খান এদেশে ইংরেজদের ক্রমবর্ধমান শক্তি সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। নৌবলে বলীয়ান ইংরেজদের বিতাড়িত করা সহজ হবে না ভেবে বাণিজ্য অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্গ নির্মাণ করতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, "তোমরা বণিক, তোমাদের দুর্গের প্রয়োজন কি? আমিই তোমাদের নিরাপত্তা দিব।" নবাব আলীবর্দী খান ইংরেজদের বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেও ইংরেজদের নিকট মাথা নত করেননি। মারাঠা আক্রমণ ছাড়া তার শাসনামলে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। নবাব আলীবর্দী খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। ছিল তিন কন্যা- ঘসেটি বেগম (মেহেরুন্নেছা), ময়মুনা বেগম ও আমেনা বেগম। তিনি তিন কন্যাকে নিজ ভ্রাতা হাজী আহমেদের তিন পুত্রের সঙ্গে বিবাহ দেন। প্রথম কন্যা ঘসেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিস মুহাম্মদ খানকে ঢাকার শাসনকর্তা, দ্বিতীয় কন্যা ময়মুনা বেগমের স্বামী সৈয়দ আহমদ খানকে পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা এবং ছোট কন্যা আমেনা বেগমের স্বামী জয়নুদ্দীন আহমদ খানকে পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। আমেনা বেগমের গর্ভে ১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দে একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করলে আলীবর্দী খান নিজ নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখেন মির্জা মুহম্মদ আলী। এই মির্জা মুহম্মদ আলীই ইতিহাসখ্যাত নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পিতা জয়নুদ্দীন আহমদ বিহারের ডেপুটি নবাব থাকাকালীন অবস্থায় ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দে আফগান বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। এ সময় আলীবর্দী খান তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজকে বিহারের ডেপুটি নবাব নিযুক্ত করেন। তখন সিরাজের বয়স ১৫ বছর। মৃত্যুর পূর্বে নবাব আলীবর্দী খান তার প্রিয় দৌহিত্র সিরাজকে উত্তরাধিকার হিসাবে মনোনীত করেন। নবাব আলীবর্দী খান দীর্ঘ ১৬ বছর সুনামের সহিত রাজত্ব করে ৭৬ বছর বয়সে ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পরলোকগমন করেন।

Content added || updated By

Battle of Palassey

নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২৩ বছর বয়সে "নবাব মনসুর-উল-মুলক সিরাজউদ্দৌলা শাহ কুলী খাঁ মির্জা মুহম্মদ হায়বাত জঙ্গ বাহাদুর" উপাধি নিয়ে ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করেন। তিনিই ছিলেন অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। মাতামহের অত্যধিক স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বলে বাস্তব জীবনের কুটিলতা ও রাজনৈতিক জটিলতা সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ জ্ঞান ছিল না; যার কারণে মসনদে বসার পর তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনারোহণকে আলীবর্দী খানের অপর দুই কন্যা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কারণ তারা প্রত্যেকেই পিতার মসনদ লাভের আশা পোষণ করতেন। ঢাকার শাসনকর্তার বিধবা পত্নী ঘসেটি বেগম এবং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তার পুত্র শওকত জঙ্গ সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। ঘসেটি বেগমের হিন্দু দেওয়ান রাজবল্লভ এ ষড়যন্ত্রে যোগ দিলেন। পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কথা নবাব উপলব্ধি করে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন- মীর জাফরকে বখশির পদ থেকে অপসরণ করে মীর মদনকে ঐ পদে নিযুক্ত করেন, পারিবারিক দেওয়ান মোহন লালকে সচিব পদে উন্নীত করে তাঁকে মহারাজা উপাধিসহ প্রধান মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়। খালা ঘষেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ অবরোধ করে ধনরত্নসহ তাঁকে নবাবের মনসুরগঞ্জ প্রাসাদে নিয়ে এসে কৌশলে নজরবন্দি রাখেন। খালাতো ভাই শওকত জঙ্গ বিদ্রোহ করলে তাকে পূর্ণিয়ার এক যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন।

এভাবে নবাব পারিবারিক ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিলেও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র নতুনভাবে শুরু হয়। এক দিকে রাজদরবারের প্রভাবশালী দেশীয় রাজন্যবর্গ (মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মানিক চাঁদ) ও অপরদিকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রতিনিয়ত তারা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। দেশি-বিদেশি এ ষড়যন্ত্রের পথ ধরেই পলাশী যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে থাকে।

পলাশীর যুদ্ধের কারণ (Causes of Battle of Palassey)

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন রবার্ট ক্লাইভের অধীনে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনী এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর মধ্যে দিল্লির অদূরে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসে তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে দুশত বছর ব্রিটিশ শাসন-শোষণে আবদ্ধ হয়। একক কোনো কারণে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, এর পেছনে অনেক দিনের অনেক কারণ জড়িত ছিল। প্রধান কারণগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের যোগদান: নবাব আলীবর্দীর মৃত্যুর পর (১৭৫৬) তার কনিষ্ঠ কন্যা আমিনার পুত্র
সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আলীবর্দীর অপর দু কন্যা ঘসেটি বেগম ও ময়মুনা বেগম তা মেনে নিতে পারেনি। কারণ সিংহাসনের প্রতি তাদেরও লোভ ছিল। সুতরাং ঘসেটি বেগম এবং ময়মুনার পুত্র শওকত জঙ্গ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ইংরেজরা তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য উক্ত ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।
২। কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ: যুবরাজ অবস্থায় নবাব ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠিতে হানা দিয়ে বহু দামি আসবাবপত্র নিয়ে যান। অবশ্য এটা ছিল নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ঘটনা।

৩। নজরানা পাঠাতে বিলম্ব ভারতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নতুন নবাবকে নজরানা দিয়ে সকলেই বশ্যতা জানাতে হয়। কিন্তু ইংরেজরা বিলম্ব করে। ঘসেটি বেগমের সাথে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে নজরানা পাঠায় এবং বিলম্বের কারণ হিসেবে জানায় কলকাতায় কোম্পানির প্রেসিডেন্টের অসুস্থতা। অবশ্য নবাব সবকিছু বুঝতে পারলে সম্পর্ক খারাপের দিকে এগোতে থাকে।

৪। ইংরেজ কর্তৃক কৃষ্ণদাসকে আশ্রয়দান: ঘসেটি বেগমের ঢাকার নায়েবি হিসাবরক্ষক ছিলেন রাজবল্লভ। দুর্নীতির জন্য
নবাব তাকে বন্দি করেন এবং নথিপত্র ও ধন-সম্পত্তি ফেরত চান। কিন্তু রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস (কৃষ্ণবল্লভ) তার পরিবারের লোকজন এবং সম্পত্তি নিয়ে নৌকাযোগে কলকাতায় পলায়ন করেন এবং ইংরেজদের আশ্রয় গ্রহণ করেন। নবাব তাকে ফেরত চাইলে কলকাতার গভর্নর ড্রেক বলেন, "কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দানের রাজনৈতিক অধিকার কোম্পানির আছে।" এতে নবাব রুষ্ট হন।

৫। নবাবের আদেশ অমান্য করে দুর্গ নির্মাণ: বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগত ইংরেজ বণিকগণ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে কুঠি
স্থাপন করে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও আয়তন বৃদ্ধি করে। নবাব প্রতিবাদ পত্র পাঠালে ড্রেক ছলনার আশ্রয় নিয়ে প্রথমে দুর্গ নির্মাণের কথা অস্বীকার করেন। পরে দুর্গ নির্মাণের কাজ অগ্রগতি হলে তিনি এই অজুহাত দেখান যে, "এ দুর্গ ফরাসি আক্রমণ থেকে ইংরেজদের আত্মরক্ষার জন্য নির্মিত হচ্ছে, নবাবের বিরুদ্ধে এই দুর্গ ব্যবহার করা হবে না।" আদেশ অমান্য করে দুর্গ নির্মাণ করতে থাকলে নবাব ইংরেজদের দমনের সিদ্ধান্ত নেন।

৬। নবাবের দূতকে অপমান কৃষ্ণদাসকে ফেরত আনতে এবং দুর্গের কাজ পর্যবেক্ষণ করার জন্য নবাব তাঁর ব্যক্তিগত দূত নারায়ণ দাসকে কলকাতায় পাঠান। নারায়ণ দাস কলকাতায় ঢুকলে গভর্নর ড্রেক তাঁকে গুপ্তচর ঘোষণা করে অপমান করে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করে। নারায়ণ দাসের সাথে এরূপ ব্যবহারে নবাব অত্যন্ত রুষ্ট হন এবং কোম্পানিকে শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন।

৭। শুল্ক প্রত্যাহার: ইতোমধ্যে বাণিজ্য ও শুল্ক সংক্রান্ত ব্যাপারে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের বিরোধ দেখা দেয়। ১৭১৭
খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট ফররুখ শিয়ার ফরমানের পর বাংলার আলীবর্দী খান ও নবাব মুর্শিদ কুলী খানের সাথে ইংরেজদের একটা বোঝাপড়া হয়েছিল। তাতে ছিল- (১) কোম্পানি বাংলার আন্তঃবাণিজ্যে হাত দিবে না। হাত দিলেও নিয়মিত শুল্ক দিবে। (২) কোম্পানির বাণিজ্য ব্যতীত কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ছাড়পত্র বা ফরমান ব্যবহার করবে না। কিন্তু নবাব লক্ষ করলেন কোম্পানি উক্ত বোঝাপড়ার শর্ত ভেঙে বাণিজ্য করছেন। তাতে দেশীয় বণিকগণ মার খাচ্ছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। এ অবস্থায় নবাব এক পত্রে জানান যে, ১৭১৭-১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (৩৯ বছর) পর্যন্ত কোম্পানি অবৈধ ব্যবসার দ্বারা প্রচুর শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। আর তা হতে দেওয়া যায় না।

৮। নবাবের কলকাতা আক্রমণ ও অন্ধকূপ হত্যা কাহিনি: ইংরেজদের ঔদ্ধত্য ব্যবহার এবং ক্ষমতা বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে নবাব ৪ জুন, ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠি দখল করে কয়েকজন ইংরেজ বন্দি করেন। অতঃপর নবাব তার ৫০,০০০ সেনাদল নিয়ে কলকাতা অভিযান করেন। অতর্কিত আক্রমণ করে নবাব ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ (১৬ জুন, ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) অধিকার করেন। ভীত হয়ে কলকাতার গভর্নর ড্রেক ও অন্যান্য ইংরেজরা দুর্গের পিছন দরজা দিয়ে জাহাজ যোগে ফলতায় পলায়ন করেন এবং ফলতা থেকে কলকাতা পতন সংবাদ মাদ্রাজ পাঠান। ড্রেক দুর্গ ত্যাগ করে পলায়ন করলেও অধিকাংশ ইংরেজ পালাতে পারেনি। হলওয়েল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন যে, দুর্গ অধিকারের পর সন্ধ্যার সময় ১৪৬ জন ইংরেজকে ১৮ ফুট লম্বা ও ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি কক্ষে আটক রাখে। এই কক্ষে একটিমাত্র ক্ষুদ্র জানালা ছিল। ফলে শ্বাসরোধ হয়ে ১২৩ জন ইংরেজ মারা যায়। এই ঘটনাকে তথাকথিত অন্ধকূপ হত্যা বা Black Hole Tragedy বলে। অন্ধকূপ হত্যা সত্যি ঘটেছিল কি না তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। সমসাময়িক ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসি কুঠির নথিপত্রে উল্লেখ আছে, 'অন্ধকূপ' নামক কক্ষটিতে সিরাজের আদেশে এক রাতের জন্য ইংরেজ বন্দিদের আবদ্ধ রাখা হয়েছিল। সেখানে বন্দি বা নিহত সংখ্যা উল্লেখ নেই। সমসাময়িক অন্য রচনাবলিতেও এ ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তখন দুর্গে ১৪৬ জন ইংরেজ ছিল না, থাকলেও বর্ণিত ঐ কক্ষে ১৪৬ জনকে কোনোভাবেই রাখা সম্ভব নয়। বাস্তবে অন্ধকূপ ঘটনা ছিল একটি অতিরঞ্জিত কল্পকাহিনি। গবেষক অক্ষয় কুমার মৈত্র অন্ধকূপ হত্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। স্যার জে. এন সরকার বলেছেন, "হলওয়েল ইংরেজদের উত্তেজিত করার জন্য অন্ধকূপ হত্যার কাহিনিকে অতিরঞ্জিত করেন।" যাই হোক, নবাব কলকাতা অধিকার করে নাম রাখলেন 'আলীনগর' এবং মানিকচাঁদকে দায়িত্ব দিয়ে নবাব মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।

৯। ইংরেজ বাহিনীর কলকাতা পুনরুদ্ধার: কলকাতা পতনের সংবাদ মাদ্রাজে পৌঁছলে, মাদ্রাজের গভর্নর সন্ডার্স ক্রোধে ক্ষিপ্ত হন এবং কর্নেল ক্লাইভ ও নৌ সেনাপতি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে কলকাতায় পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠান। নির্দেশ দেন যে, সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে কোনো ইংরেজভক্ত লোককে যেন বাংলার সিংহাসনে বসানো হয়। ক্লাইভ কলকাতায় এসে উৎকোচ দ্বারা মানিকচাঁদকে বশীভূত করে বিনা যুদ্ধে কলকাতা দখল করে এবং নবাবের বন্দর হুগলী পুড়িয়ে দেন।

১০। আলীনগরের সন্ধি: ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুন নবাব সিরাজউদ্দৌলা' কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে নাম দেন আলীনগর। অতঃপর নবাব কলকাতা রক্ষার জন্য সেনাপতি মানিকচাঁদকে দায়িত্ব দিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। এখানে নবাব যে ভুলটি করেন তা হলো- কলকাতা পতনের পর যে সকল ইংরেজ কলকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত না করা। এমনকি কলকাতায় ইংরেজদের পালটা আক্রমণ প্রতিরোধেও কোনো ব্যবস্থা নবাব গ্রহণ করেননি। কলকাতায় অবস্থানকালে ওলন্দাজরা ইংরেজদের খাদ্য সরবরাহ করতে থাকে। ক্লাইভ কলকাতায় এসে মানিকচাঁদকে উৎকোচ দ্বারা বশীভূত করে প্রায় বিনা যুদ্ধে কলকাতা পুনরুদ্ধার করেন (২রা জানুয়ারি, ১৭৫৭)। নবাবের কলকাতা অধিকারের প্রতিশোধ হিসেবে ক্লাইভ নবাবের হুগলী বন্দর পুড়িয়ে দেন। এ সংবাদে সিরাজ পুনরায় কলকাতা অভিযান করেন। ক্লাইভ নবাবকে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েকজন সাহসী সেনা নিয়ে অতি গোপনে রাতের অন্ধকারে নবাবের শিবির আক্রমণ করেন। কিন্তু নবাব দৈবক্রমে বেঁচে যান। তবে তার ১,৩০০ সৈন্য এই অতর্কিত হানায় মারা পড়ে। এ আক্রমণের পর নবাব স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, তার সভাসদ ও সেনাপতিদের মধ্যে অনেকেই গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এজন্য তার মনের জোর কমে যায়। এদিকে তিনি খবর পান যে, আফগান আক্রমণকারী আহমদ শাহ আবদালী আগ্রা, মাথুরা বিধ্বস্ত করে বাংলার দিকে ধেয়ে আসছে। সামনে ইংরেজ মধ্যখানে নিজ সভাসদ ও সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র, পেছনে আফগান আক্রমণের আশঙ্কা, ত্রিমুখী চাপে নবাব দিশেহারা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় নবাব ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধি স্থাপন করেন যা ইতিহাসে 'আলীনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত। আলীনগরে বসে ৯ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এ সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। আলীনগর স্থানের নাম অনুযায়ী এ সন্ধির নামকরণ হয় 'আলীনগরের সন্ধি'। আলীনগরের সন্ধি ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলা পতনের প্রথম ধাপ। এই সন্ধির মাধ্যমে নবাব নতজানু হয়ে সন্ধি শর্তে আবদ্ধ হন। সন্ধির শর্তানুসারে (১) পূর্বের সম্রাটের নিকট থেকে
ইংরেজদের প্রাপ্ত সকল সুযোগ-সুবিধা নবাব মেনে নেন অর্থাৎ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য অধিকার বহাল থাকে। (২) নবাব কোম্পানিকে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের অনুমতি দেন। (৩) ইংরেজ কোম্পানিকে কলকাতায় নিজস্ব টাকশাল স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হয়। (৪) নবাব কর্তৃক কলকাতা আক্রমণে কোম্পানির যে ক্ষতি হয়েছিল সে ক্ষতিপূরণ প্রদানে নবাব অঙ্গীকারবদ্ধ হন। (৫) কলকাতার অধিবাসীরা সবসময় কোম্পানির শাসনাধীনে থাকবে তা স্থির হয়। আলীনগরের সন্ধির শর্ত সবগুলোই ছিল ইংরেজদের অনুকূলে, বাংলার নবাবের প্রতিকূলে। এ সন্ধি বাংলার জন্য মোটেও কল্যাণকর ছিল না। আলীনগরের সন্ধির ফলে নবাবের ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। এতে নবাবের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। ইংরেজদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আলীনগরের সন্ধি ছিল ইংরেজ কোম্পানির বিরাট সাফল্য। এই সন্ধির ওপর ভিত্তি করে ইংরেজরা পরবর্তীতে উপমহাদেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

১১। মীরজাফরের সাথে গোপন সন্ধি: নবাবের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়। মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ,
উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, মানিকচাঁদ, ইয়ার খান প্রভৃতি ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের নায়ক। ইংরেজ অধিনায়ক ক্লাইভ এতে যোগদান করে। কলকাতায় কাউন্সিলের সাথে মীরজাফরের একটি গোপন সন্ধি (১০ জুন, ১৭৫৭) স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি মতে, ইংরেজরা মীরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসাবেন। বিনিময়ে মীরজাফর ইংরেজদের ১৭১৭ সালের ফরমান এবং আলীনগরের সন্ধি মতে সকল প্রকার বাণিজ্য সুবিধা দিবে। কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা কোম্পানিকে দিবে। মীরজাফরের সাথে গোপন চুক্তিই ছিল পলাশীর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ।

যুদ্ধের ঘটনাবলি

মীরজাফরের সাথে গোপন চুক্তির পর ক্লাইভ নবাবকে আক্রমণ অজুহাত হিসেবে বলেন, সিরাজউদ্দৌলা আলীনগরের সন্ধি ভঙ্গ করেছেন। ক্লাইভ সিরাজউদ্দৌলার কাছে কলকাতা আক্রমণের ক্ষতিপূরণ দাবি করে এক চরমপত্র প্রেরণ করে। নবাবের উত্তর পাওয়ার আগেই ক্লাইভ ৩৩০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদে অগ্রসর হন। নবাব ৭৮,০০০ সৈন্য নিয়ে ১৭৫৭/২৩ জুন মুর্শিদাবাদ থেকে ২৩ মাইল দক্ষিণে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তে উপস্থিত হন। নবাবের পক্ষে মোহনলাল, মীর মদন এবং ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে ১২০০০ সৈন্য নিয়ে ইংরেজ বাহিনীকে আমবাগানের ভিতরে পলায়নে বাধ্য করেন। কিন্তু নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও রায়দুর্লভ তাদের সেনা দল নিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ ইংরেজ গোলার আঘাতে মোহনলালের মৃত্যু হলে নবাব ভেঙে পড়েন। এ সময় নবাব মীরজাফরের শরণাপন্ন হন। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। ফলে নবাবের সেনাবাহিনী যুদ্ধ বন্ধ করে যে যার মতো ফিরতে থাকে। এই সুযোগে ক্লাইভ পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ছত্রভঙ্গ নবাব বাহিনীকে পরাজিত করেন। সেনাপতি মোহনলালসহ নবাবের ৫০০ সৈন্য এবং ইংরেজদের ২৩ জন সৈন্য নিহত হয়।

নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের মৃত্যুতে বাঙালি কবি নবীন চন্দ্র সেন তার 'পলাশীর যুদ্ধ' কাব্যে লিখেছেন-

'কোথা যাও ফিরে চাও সহস্র কিরণ।

বারেক ফিরিয়া চাও ওগো দিনমনি;

তুমি অস্তাচলে দেব করিলে গমন

আসিবে ভারতে পনুঃ বিষাদ রজনী।'

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নবাব পলায়ন করে মুর্শিদাবাদে গিয়ে পুনরায় যুদ্ধ গ্রহণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদে সাহায্য না পেয়ে স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং একমাত্র কন্যা সহ নৌকা যোগে ভাগলপুরে (পাটনা) পলায়ন করেন। পথিমধ্যে দুর্ভাগ্যবশত রাজমহলের নিকটে ধরা পড়েন এবং রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়। মীরজাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেন (২৫ জুন, ১৭৫৭ খ্রি.)। মীরজাফর ২৬ জুন, ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক বাংলার মসনদে বসেন।

পলাশীর যুদ্ধের প্রকৃতি

পলাশীর যুদ্ধ বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধ নয়। এটি ছিল মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা, ক্লাইভের কূটকৌশল এবং একটি ষড়যন্ত্র। ব্যাপক অর্থে, একে একটি ক্ষুদ্র সংঘর্ষ বলা যায়। এই যুদ্ধে নবাবের সামরিক শক্তির কোনো পরীক্ষা হয়নি। নবাব বাহিনীর মীরজাফর ও রায়দুর্লভের অধীনস্থ সৈন্যরা এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। সুতরাং নবাব পরাজিত হয়েছেন প্রতারণার কাছে, বিশ্বাসঘাতকতার কাছে।

ঐতিহাসিক ম্যালসন বলেন, "পলাশীর যুদ্ধ যদিও যুগান্তকারী ঘটনা তবুও তাকে কখনো একটি বড় যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে এটি একটি খণ্ড যুদ্ধ হলেও এর ফলাফল পৃথিবীর অনেক বৃহত্তম সংগ্রামের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।”

পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল (The results of Battle of Palassey)

ইংরেজ কোম্পানির বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার ক্ষেত্রে পলাশীর যুদ্ধ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

রাজনৈতিক ফলাফল:

১. নবাবের নির্মম মৃত্যু: পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব ভাগলপুরে পলায়নের পথে রাজমহন নামক স্থানে তিনি ইংরেজ সৈন্যের নিকট ধরা পড়েন। তাঁকে বন্দি অবস্থায় মুর্শিদাবাদে আনা হয়। মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে।

২. বাংলায় স্বাধীন সূর্য অস্তমিত নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সাথে সাথে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সূর্য প্রায় ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়।

৩. ইংরেজদের ভারতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এত দিন ইংরেজ ছিল নিছক একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। আর
পলাশীর যুদ্ধে জয়ের ফলে ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তারা অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধে জয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করার প্রয়াস পান।

৪. মীরজাফর নামেমাত্র নবাব এ যুদ্ধের ফলে দেশপ্রেমিক সিরাজউদ্দৌলার স্থলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর পুতুল শাসকরূপে বাংলার সিংহাসনে বসেন। পূর্ব গোপন চুক্তি অনুযায়ী মীরজাফর ইংরেজদেরকে ব্যাপক বাণিজ্য সুবিধা, ক্লাইভকে ৩,৩৪,০০০ পাউন্ড ও কোম্পানিকে এক কোটি টাকা এবং ২৪ পরগনার জমিদারি প্রদান করেন।

৫. ক্লাইভের শক্তি প্রদর্শন: কুচক্রী ও ক্ষমতালোভী ক্লাইভ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অতি সহজে ইংরেজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এবং নবাবের বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা ধূলিসাৎ করে দেয়।

৬. ফরাসি শক্তি বিলুপ্ত: পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজগণ কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধে (১৭৬৩) ফরাসিদের দাক্ষিণাত্যে পরাজিত করে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। পলাশীর যুদ্ধ ভারতে অবস্থানরত ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারণ হিসেবেও গণ্য হয়।

অর্থনৈতিক ফলাফল:

পলাশীর যুদ্ধের ফলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য যেমনি অস্তমিত হয় তেমনি অর্থনীতি পাচারের দ্বারও উন্মোচিত হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর থেকে অষ্টাদশ শতক ধরে কোম্পানি এবং তার কর্মচারীরা বাংলা তথা উপমহাদেশের সম্পদ যেভাবে অপহরণ, লুণ্ঠন ও পাচার করেছে তাকে পলাশীর লুণ্ঠন বলা হয়েছে। পলাশীর লুণ্ঠন (Plassey plunder) কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ব্রুকস অ্যাডামস (Brooks Adams) নামে এক গবেষক।

পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর কোম্পানি মীর জাফরের সাথে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক নগদ এবং কিস্তিতে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তির অধিকারী হয়। শুধু তাই নয় তারা ব্যবসায়-বাণিজ্যে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করে, কোম্পানি বিনা শুল্কে বা নামেমাত্র শুল্কে বাংলার সর্বত্র একচেটিয়া বাণিজ্য করতে থাকে, এতে দেশীয় বণিকদের সমাধি রচিত হয়। কোম্পানির পাশাপাশি কর্মচারীরা নামে, বেনামে বাণিজ্য, উৎকোচ, উপঢৌকন গ্রহণ করে অজস্র পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ ইংল্যান্ডে পাঠাতে থাকে। এতে ইংল্যান্ড সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং উপমহাদেশ নিঃস্ব হয়ে যায়।

ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধে জয়ের পর যেভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছে তাকে অর্থ উপার্জন না বলে অর্থ অপহরণ বলাই যুক্তিযুক্ত। অর্থ অপহরণের পথপ্রদর্শক ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। "ক্লাইভ এবং তাঁর অনুসারীরা যত তাড়াতাড়ি পার অর্থ সংগ্রহ কর এবং স্বদেশে ফিরে যাও"- এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন। মীর জাফরের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ যখন শেষ হয় তখন তারা মীর কাশিমকে বাংলার মসনদে বসিয়ে নতুন করে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে। মীর কাসিমকে মসনদে বসানো বাবদ ৩২,৭৮,০০০ টাকা কোম্পানি হাতিয়ে নেয়। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র নজমউদ্দৌলাকে মসনদে বসিয়ে ৬২,৫০,০০০ টাকা এবং নাজিম পদে রেজখানকে বসিয়ে কোম্পানির সদস্যরা ৪,৭৬,০০০ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। এ সময় তারা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে অর্থ সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছায়। চৌৎসিংহ অযোধ্যার নবাব প্রভৃতির নিকট থেকে প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করে।

কোম্পানি এবং কোম্পানির কর্মচারীরা ভারতবর্ষ থেকে কী পরিমাণ অর্থ সম্পদ অপহরণ করেছেন তার সঠিক হিসাব মেলানো কঠিন। তবে কোম্পানির কর্মচারীদের ইংল্যান্ডে বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে তাদেরকে ভারতীয় নবাব বলে ডাকা হতো। কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্য সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, "এক সিলিং খরচ না করে এই সকল ব্যক্তিরা (কোম্পানির কর্মচারী) শূন্য থেকে সোনা বানাত। তারা মাছের তেলে মাছ ভাজত।" সুতরাং পলাশীর যুদ্ধের অর্থনৈতিক ফলাফল উপমহাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর।

পলাশী যুদ্ধের গুরুত্ব (The significance of Battle of Palassey)

পলাশীর যুদ্ধের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াটসন বলেন, "The battle of Paluey was of extraordinary importance not only but to the British National ingeneral" অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধে জয়লাভ করে ইংরেজগণ ভূ-সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে এবং এর লব্ধ কর কেবলমাত্র কোম্পানির নয় সমগ্র জাতিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। নিম্নে পলাশী যুদ্ধের গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো।

১. ভাগ্য নির্ধারিত যুদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের যুদ্ধ। রায় চৌধুরী, দত্ত ও মজুমদারের মতে, “পলাশীর যুদ্ধ একটি খণ্ডযুদ্ধ ব্যতীত আর কিছুই নয়। কিন্তু এর ফলাফল ছিল অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা বাংলা তথা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিজয়ের সূত্রপাত করে।"

২. ইংরেজদের ক্ষমতা বৃদ্ধি। এ বিজয়ে ইংরেজদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নামেমাত্র নবাব ক্ষমতায় থাকে বাংলার মসনদের পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিযুক্তির ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়।

৩. নব-জাগরণের সূত্রপাত। পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলায় রেনেসাঁস বা নব-জাগরণের সূত্রপাত হয়া। এ প্রসদে ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ম্যানসন বলেছেন, "পলাশীর যুদ্ধের মতো আর কোনো যুদ্ধের ফলাফল এত প্রত্যক্ষ, এত বিশাল এবং এত স্থায়ী হতে দেখা যায়না। ঐতিহাসিক মার্শালের মতে, "পলাশীর যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি যুদ্ধ হিল না, পলাশীর ঘটনা ছিল একটি বিপ্লব।

৪. আধুনিক যুগের সূচনা। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের সাথে সাথে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত হয়। ফলে সমগ্র ভারতবর্ষে মধ্যযুগের অবসান হয়ে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে। ইংরেজদের মাধ্যমে উপমহাদেশে সামরিক সংগঠন, আইনকানুন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাদীক্ষা ও শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ প্রসঙ্গে স্যার জে. এন, সরকার বলেছেন, ১৭৫৭ এর ২৩ জুন ভারতবর্ষে মধ্য যুগের শেষ হয় এবং আধুনিক যুগ শুরু হয়।

বস্তুত পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজ কোম্পানি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর এস আহমদ-এর অভিমত প্রধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধ পানিপথের যুদ্ধ (১৫২৬)-এর মতোই স্মরণীয় ও মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।
পরিশেষে বলা যায়, পলাশীর প্রান্তে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল তা উভয়ণ কনাতে বাঙালিদের পাড়ি দিতে হয়েছে ২১৩ বছরের রক্ত স্নাত দীর্ঘ পথ। কাজী নজরুল ইসলাম তার 'কাণ্ডারী হুশিয়ার' কবিতায় লিখেছেন-

কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,

বাঙালির খুনে নাল হল যেখা ক্লাইভের খঞ্জর!

ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর

উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাতিয়া পুনর্বার!!

নবাবের পরাজয়ের কারণ (Causes of defeat of Nawab)

পলাশীর যুদ্ধ ছিল একটি নাটক, একটি ষড়যন্ত্র। ইংরেজদের তুলনায় নবাবের সৈন্য সংখ্যা অধিক হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধে নবাব পরাজিত হন। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নবাবের পরাজয়ের প্রধান কারণ হলে আরও বেশ কতগুলো কারণে নবাবের পরাজয় ঘটে। নিম্নে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো-
প্রথমত, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের প্রথম এবং প্রধান কারণ। যে মীরজাফর পবিত্র কোরআন মাথায় নিয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার শপথ করেছিলেন সেই মীরজাফর যুদ্ধ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ জয়ের প্রাক্কালে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিয়েও চরম বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার সূত্রে সিরাজ যে সিংহাসনটি পেয়েছিলেন তা মোটেও পুষ্প সজ্জা ছিল না। নবাব আলীবর্দী খান প্রভুর দৌহিত্রকে হত্যা করে বাংলার মসনদে বসেছিলেন এবং প্রভু তথা মুর্শিদ কুলী খানের বংশধরদের সকলকে উচ্চ পদ থেকে অপসারণ করে নিজের লোক বসিয়েছিলেন। যার ফলে বহু বিরোধী লোক সৃষ্টি হয়, যারা আলীবর্দীর মনোনীত সিরাজের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তাছাড়া আলীবর্দীর দুই কন্যাও সিংহাসনের দাবিদার ছিলেন। আলীবর্দী তোষণ নীতি দ্বারা ইংরেজদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। মোট কথা ভেতরে এবং বাইরে অনেক শত্রু থাকার মধ্য দিয়ে সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসেছিলেন, যা তার পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তৃতীয়ত, নবাব সিরাজউদ্দৌলা বয়সে অত্যন্ত তরুণ ছিলেন। তাছাড়া অতি আদরে বড় হওয়ায় রাজনৈতিক কূটকৌশল তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। চারদিকে যেভাবে শত্রু সৃষ্টি হয়েছিল তা দমন করতে যে কঠোর মনোবল দরকার তা সিরাজের ছিল না। তিনি বিচক্ষণ হলে ষড়যন্ত্রকারীদের বহিষ্কার বা বন্দি করতে পারতেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে মীরজাফরের যুদ্ধ বিরতির উপদেশ উপেক্ষা করতে পারতেন। যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ সিরাজের দুর্বল চিত্তের বহিঃপ্রকাশ।

চতুর্থত, ব্রিটিশরা বরাবরই সুচতুর এবং কূটকৌশলী ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ক্লাইভ রণ-নীতি ও কূটনীতিতে সিরাজউদ্দৌলা অপেক্ষা অধিকতর দক্ষ ছিল। ভারতে আধিপত্য বিস্তারে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা এক্ষেত্রে কাজ করছে।

পঞ্চমত, এ সময় বঙ্গদেশে চারিত্রিক অবনতি দেখা দেয়। স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা অনেক বঙ্গদেশীয়দের চরিত্রকে কলুষিত করে। সেনাপতি, আমলা, রাজন্যবর্গ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ স্বীয়স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। শুধু মীরজাফরই জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেননি তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মিলিত হয়েছিল জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, মানিকচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, ইয়ার লতিফ, ঘসেটি বেগম আরও অনেকে।

পলাশীর যুদ্ধের ষড়যন্ত্রকারীদের শেষ পরিণতি

পলাশীর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূত্রপাত হয়। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের পেছনে কতিপয় কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারী জড়িত ছিল। মূলত তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই যুদ্ধে নবাব পরাজিত হয়। নিয়তি এসব ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমা করেনি। এদেরও শেষ পরিণতি ঘটেছে। নিম্নে পলাশীর যুদ্ধের কতিপয় ষড়যন্ত্রকারীর শেষ পরিণতি তুলে ধরা হলো-

লর্ড ক্লাইভের আত্মহত্যা: পলাশীর যুদ্ধে বিদেশে ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম হোতা ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। ভারতবর্ষে ঘুষ, দুর্নীতি, সম্পদ আত্মসাৎ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, দুর্বৃত্তায়ন এবং অপরাজনীতির অপরাধে ইংল্যান্ডের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন লর্ড ক্লাইভ। ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে এবং একে একে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হতে থাকলে অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২ নভেম্বর নিজের গলায় নিজেই ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বজ্রপাতে নিহত মীর মিরন নিজ মাথায় পবিত্র কোরআন এবং নিজ পুত্র মিরনের মাথায় হাত রেখে মীরজাফর দেশের স্বাধীনতা রক্ষার যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নবাব হওয়ার লোভে সে প্রতিজ্ঞা তিনি রক্ষা করতে পারেননি। যে মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই মিরনের মাথায় পলাশীর যুদ্ধের ৩ বছর পর ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুলাই বর্ষাকালে বজ্রপাত নেমে আসে। তাতেই ২১ বছর বয়সে মিরনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়।

ঘসেটি বেগমের পরিণতি: পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম। ষড়যন্ত্রকালীন প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়া সহ বিভিন্ন কারণে একপর্যায়ে ঘসেটি বেগম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মীরজাফর এবং পুত্র মিরনের সাথে। ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি করা হয় ঘসেটি বেগমকে। এখানে বসেও মীরজাফরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকলে মিরন তাকে বন্দি অবস্থায় নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ঘসেটি বেগম কোনোদিনই মুর্শিদাবাদে পৌঁছতে পারেনি। পথেই নৌকা ডুবিতে ঘসেটি বেগমের সলিল সমাধি ঘটে। মুর্শিদাবাদের মাটি তার কপালে জোটেনি।

পাগল অবস্থায় মারা যান উমিচাঁদ দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে আর একজন ছিলেন উমিচাঁদ। শিখ সম্প্রদায়ের উমিচাঁদ (প্রকৃত নাম আমির চাঁদ) কলকাতার একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। মুর্শিদাবাদ কোর্টে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে দালালি করতেন। অর্থ লোভে তিনি ক্লাইভ ও মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে যোগ দেন। পলাশীর যুদ্ধে নবাবকে পরাজিত করতে পারলে যে সম্পদ পাওয়া যাবে তার ৫ ভাগ দাবি করেন উমিচাঁদ। চতুর ক্লাইভ সম্মত হয়ে এক চুক্তিপত্র করেন। চুক্তিপত্রটির দুটি কপি করা হয়। একটিতে ৫ ভাগ সম্পদ দেওয়ার কথা লেখা থাকলেও মূল কপিতে তা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে মূল কপিটি উমিচাঁদকে দেখানো হয়নি। পরবর্তীতে প্রকৃত ঘটনা জানার পর অর্থ শোকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার সর্ব স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। ১০ বছর পাগল অবস্থায় রাস্তায় ঘুরে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন।

জগৎশেঠের শিরশ্ছেদ: অর্থলোভে যিনি ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন তিনি হলেন জগৎশেঠ। তাঁর প্রকৃত নাম মাহাতাপ চাঁদ। টাইটেল জগৎশেঠ, যার অর্থ পৃথিবীর ব্যাংকার। সুদের কারবারে এত বেশি অর্থের মালিক হয়েছিলেন যে, যার কারণে উক্ত টাইটেল পেয়েছিল। নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে তার ব্যাপক অর্থনৈতিক ভূমিকা ছিল। পলাশীর যুদ্ধের ছয় বছর পর ইংরেজদের কাছে তার লেখা এক ষড়যন্ত্র চিঠি মীর কাশিমের হস্তগত হয়। চিঠি প্রাপ্তির পর মীর কাশিম অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি তার সৈন্যদল নিয়ে জগৎশেঠ এবং তার পরিবারের সকলের শিরশ্ছেদ করেন।

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় নদীয়ার শাসনকর্তা ছিলের কৃষ্ণচন্দ্র রায়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় মুসলমানদের শাসনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাই তিনি ইংরেজদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও মীর কাশিমের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এই দ্বন্দ্বের রেশ ধরেই কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেন মীর কাশিম।

মীরজাফরের পরিণতি: পলাশীর যুদ্ধে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন মীরজাফর। পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর। দু বারে তিনি ৪ বছর নবাব থাকলেও ইংরেজদের অবজ্ঞা এবং দেশবাসীর ঘৃণার পাত্র হিসেবেই বেঁচে ছিলেন। ১৭ জানুয়ারি ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ৭৪ বছর বয়সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে মীরজাফরের জাগতিক মৃত্যু ঘটলেও তিনি বেঁচে আছেন। মীরজাফরের প্রাসাদে ঢোকার প্রধান ফটকটি * ইতিহাসে সরকারি দলিল দস্তাবেজে এবং টুরিষ্ট গাইড বইয়ে 'নেমক হারাম দেউর' বা 'বিশ্বাসঘাতকের গেট' নামে পরিচিতি পেয়েছে। মীরজাফর বেঁচে আছেন তবে একটি জঘন্য গালি হিসাবে।

Content added By

Battle of Buxer-1764

পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ক্লাইভের হাত ধরে পুতুল শাসকরূপে বাংলার মসনদে বসেন (১৭৫৭-১৭৬০ খ্রি.)। মীর জাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তি মোতাবেক ক্লাইভকে ২,৩৪,০০০ পাউন্ড, কলকাতার প্রত্যেক সদস্যকে ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ পাউন্ড, সেনা ও নৌবাহিনীর প্রধানকে ২৫ লক্ষ টাকা উপঢৌকন, কোম্পানিকে দেড় কোটি টাকা, সিরাজউদ্দৌলা কর্তৃক কলকাতা দখলের ক্ষতিপূরণ ও ফরাসিদের বাংলা থেকে বিতাড়ন ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০,০০০ পাউন্ড এবং ২৪ পরগনার জমিদারি স্বত্ব প্রদান করেন। এছাড়া কোম্পানির বিভিন্ন চাহিদা ও বাণিজ্য সুবিধা মেটাতে মুর্শিদাবাদের কোষাগার শূন্য হয়ে যায়। প্রতিশ্রুতির বাকি অর্থ আসবাবপত্র, মূল্যবান ধাতুনির্মিত বাসনপত্র ইত্যাদি বিক্রি করেও অর্থের সংকুলান না হলে বাকি অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের অঙ্গীকার করেন। ইংরেজরা মীরজাফরের মাধ্যমে বাংলার টাকার গাছে নাড়া দিয়ে টাকা কুড়ানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোম্পানির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা "Yet rich quickly and go back home" নীতি গ্রহণ করেন।

ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা

ইংরেজদের চাহিদা মোতাবেক অর্থ প্রদানে ব্যর্থ ও ওলন্দাজ কোম্পানির সাথে গোপন পত্রালাপের অপরাধে ইংরেজরা মীরজাফরকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে ইংরেজরা গোপনে মীরজাফরের জামাতা মীর কাশিমের সাথে একটি সন্ধি করে (১৭৬০ খ্রি.)। সন্ধি মোতাবেক রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীরজাফরকে সরিয়ে মীর কাশিমকে বাংলার মসনদে বসালেন (১৭৬০ খ্রি.)। মীর কাশিম ছিলেন গুজরাটের সুবেদার সৈয়দ ইমতিয়াজের পৌত্র। তিনি নবাব আলীবর্দী ও নবাব সিরাজদ্দৌলার সেনাপতি ছিলেন। পরবর্তীকালে মীরজাফরের কন্যা ফাতেমা বেগমকে বিবাহ করে রাজদরবারে প্রভাব বিস্তার করেন। ইংরেজদের সাথে চুক্তি করে ১৭৬০ খ্রিষ্টখ্রিষ্টাব্দে বাংলার নবাব হন। প্রথমেই তিনি চুক্তি মোতাবেক ইংরেজকে প্রাপ্য অর্থের বিনিময়ে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম প্রদান করেন। এভাবে মীর কাশিম কোম্পানির যাবতীয় পাওনা মিটিয়ে শাসনকার্যে মনোনিবেশ করেন।

বক্সারের যুদ্ধের কারণ (Causes of Battle of Buxer)

মীর কাশিম ইংরেজদের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতায় আসলেও তিনি স্বাধীনচেতা মনোভাবের ছিলেন। এজন্য তিনি ইংরেজদের প্রভাব মুক্ত থাকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মীর কাশিমের স্বাধীনচেতা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণই ছিল বক্সারের যুদ্ধের অন্যতম কারণ। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-

১। মীর কাশিমের স্বাধীনচেতা মনোভাব ও কতিপয় প্রস্তুতি: বক্সারের যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল মীর কাশিমের স্বাধীনচেতা মনোভাব। মীর কাশিম মীরজাফরের ন্যায় পুতুল শাসক হয়ে থাকতে নারাজ ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন আজ হোক আর কাল হোক ইংরেজ কোম্পানির সাথে যুদ্ধ অনিবার্য। সে কারণে তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। মীর কাশিমের প্রস্তুতির মধ্যে ছিল- (ক) অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিশালী করা। এজন্য তিনি ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেন। রাজস্ব বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পূর্বের বকেয়া অর্থ আদায় এবং অভিজাতবর্গের অবৈধ ভোগকৃত অর্থ ফেরত নেন এবং আলীবর্দী, মীর জাফর ও শেঠ পরিবার থেকে বলপূর্বক প্রচুর অর্থ আদায় করেন। (খ) নিজ শক্তি বৃদ্ধির জন্য বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে সম্রাট শাহ আলমের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। (গ) মুর্শিদাবাদ থেকে রাজধানী মুঙ্গরে স্থানান্তর করেন এবং সেখানে গোলাবারুদের কারখানা স্থাপন করেন। (ঘ) ইউরোপীয় তিনজন সেনাপতির সাহায্যে দেশীয় সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এভাবে মীর কাশিমের শক্তি বৃদ্ধি ইংরেজরা সন্দেহের চোখে দেখেন।

২। দেশীয় বণিকদের শুল্ক প্রত্যাহার: ইংরেজ কোম্পানি বিনা শুল্কে আন্তঃবাণিজ্য চালাতে থাকলে কেবল নবাবই
বাণিজ্য শুল্ক হতে বঞ্চিত হলেন না, দেশীয় বণিকদেরও ভীষণ ক্ষতি হতে থাকে। দেশীয় বণিকদের ক্ষতির প্রতিকারে অসমর্থ হয়ে নবাব মীর কাশিম ইংরেজ ও দেশীয় নির্বিশেষে সকল ব্যবসায়ীদের উপর হতে বাণিজ্য শুল্ক উঠিয়ে দিলেন। কিন্তু এ ব্যবস্থা ইংরেজদের মনঃপুত হলো না। তারা মীর কাশিমকে পদচ্যুত করে শুধুমাত্র দেশীয় বণিকদের শুল দিতে বাধ্য করার নীতি নেন।

যুদ্ধের ঘটনাবলি

নবাব মীর কাশিমের সাথে বোঝাপড়ার জন্য গভর্নর ভেনসিকার পাটনার সেনাধ্যক্ষ মেজর এলিসকে পাটনা আক্রমণের নির্দেশ দেন। নবাব তাকে প্রতিহত করে এবং দূত এমিয়টকে হত্যা করে। এমিয়ট হত্যার অজুহাতে কোম্পানি নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে (১৭৬৩)। ইংরেজরা মনে করেন যে, মীরজাফরের মতো এরূপ অনুগত নবাব পাওয়া যাবে না। সে কারণে ইংরেজ প্রধানরা সিদ্ধান্ত নিলেন মীর কাশিমকে সরিয়ে পুনরায় মীরজাফরকে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসাবেন। সে মতে ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুলাই পুনরায় ইংরেজদের সাথে মীরজাফরের সন্ধি হয়। সন্ধি মোতাবেক মীরজাফরকে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত করা হবে, বিনিময়ে মীরজাফর ইংরেজদের সকল বাণিজ্য সুবিধা দেবে। অতঃপর ইংরেজ ও মীরজাফরের মিলিত সৈন্যদল মীর কাশিমকে কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, সোতি ও উদয়নালার যুদ্ধে পরাজিত করলে মীর কাশিম বাংলা থেকে পিছু হটে বিহারে চলে যায়। নবাব মীর কাশিম উপায়হীন হয়ে নবাব সুজাউদ্দৌলা ও সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাহায্য প্রার্থনা করেন। তাদের যৌথবাহিনী বিহারের দিকে অগ্রসর হয়। ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মনরো ২৩ অক্টোবর ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের প্রান্তে যৌথবাহিনীর পথ রোধ করলে উভয়পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে যৌথবাহিনী পরাজিত হয়। মীর কাশিম যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন এবং বহু বছর অজ্ঞাত থাকার পর ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেন। নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং শাহ আলম ইংরেজদের সন্ধি ভিক্ষা করেন। এভাবে বক্সারের প্রান্তে দ্বিতীয় বার এবং চূড়ান্তভাবে বাংলার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে।

মীর কাশিমের ব্যর্থতার কারণ

১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পরাজয়ের বিভিন্ন কারণ ছিল। প্রধান কারণগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১. অর্থনৈতিক দুর্বলতা: ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে নবাব মীর কাশিমের পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল তাঁর অর্থনৈতিক দুর্বলতা। পূর্ববর্তী শাসক মীরজাফরের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ঋণের অনেক অর্থ মীর কাশিমকে পরিশোধ করতে হয়। তাছাড়া মসনদ লাভের জন্য তিনি দুই লক্ষ পাউন্ড ইংরেজদের প্রদান করতে বাধ্য হন। যার ফলে তার রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। অর্থের অভাবে তিনি প্রয়োজনীয় সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে পারেননি।

২. জমিদার ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের অসহযোগিতা: দেশীয় জমিদার ও অনেক প্রশাসনিক কর্মচারী মীর কাশিমকে
অসহযোগিতা করে। জমিদাররা ঠিকমতো রাজস্ব দিতেন না। অনেক জমিদার ও কর্মচারীরা গোপনে মীর কাশিমের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করতেন। তাঁরা নানাভাবে সংকট সৃষ্টি করেন। ফলে মীর কাশিম তাঁর শক্তি পূর্ণভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেননি। যা তার পরাজয় ডেকে আনে।

৩. সেনাবাহিনীর অদক্ষতা ও বিশ্বাসঘাতকতা: ইংরেজদের তুলনায় মীর কাশিমের সেনাবাহিনী ছিল অদক্ষ। তাছাড়া পলাশীর যুদ্ধের ন্যায় বক্সারের যুদ্ধেও বিশ্বাসঘাতকরা ছিল। মীর কাশিমের গোলন্দাজ বাহিনীর আর্মেনিয়ান সেনাপতি মরকা ও আরাটুন মীর কাশিমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে গোপনে শত্রুপক্ষে যোগ দেয়। বিশেষ করে এটা তারা করেছিল উদয়নালার যুদ্ধে। এ যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজিত হয়; যা বক্সারের যুদ্ধে প্রভাব পড়ে এবং পতন ডেকে আনে।

৪. ইংরেজ গোলন্দাজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজ গোলন্দাজ বাহিনী তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে। এ সময় ইংরেজ বাহিনী বিশেষ করে গোলন্দাজ বাহিনী সেনাপতি হেক্টর মনরোর নেতৃত্বে শক্তিশালী কামান ব্যবহার করে। যে কামানের সামনে মীর কাশিমের বাহিনী ছিল অসহায়। তাছাড়া ইংরেজদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল খুবই উন্নত মানের। পলাশীর যুদ্ধ ছিল একটি নাটক, সেখানে প্রকৃত যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে উভয়ের শক্তি প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেখানে ইংরেজরা শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছে।

৫. সম্রাট শাহ আলম ও নবাব সুজাউদ্দৌলার যথাযথ সহযোগিতার অভাব: বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব মীর কাশিম সম্রাট শাহ আলম, নবাব সুজাউদ্দৌলা, এলাহাবাদের শাসনকর্তা মহারাজা বেণী বাহাদুর এদের যৌথ বাহিনী নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নবাব মীর কাশিম তার মিত্রদের কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা পাননি। নবাব সুজাউদ্দৌলার উজির, মহারাজা বেণী বাহাদুর বিশ্বাসঘাতকতা করেন। সম্রাট শাহ আলমের দিউয়ান সিতাব রায়ও ইংরেজদের সাহায্য করেন। ফলে যুদ্ধে মীর কাশিম হেরে যান।

৬. মীর কাশিমের উদারতা: ইংরেজদের সাথে মীর কাশিম অত্যধিক উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ইংরেজদের অত্যধিক বিশ্বাস করতেন। যে সুযোগটা ইংরেজরা গ্রহণ করেছে। মীর কাশিম তার উদারতার জন্য রাজকোষ শূন্য করে ইংরেজদের তথাকথিত পাওনা মিটিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের 'দস্তক' ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিলেন। ফলে মীর কাশিম যথেষ্ট অর্থকষ্টে পতিত হন। যে কারণে মীর কাশিম যুদ্ধে পরাজিত হন।

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সুশৃঙ্খল ইংরেজ বাহিনীর মোকাবিলা করার মতো সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করতে মীর কাশিম ব্যর্থ হন। তাছাড়া নিজেদের মধ্যে অসহযোগিতা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি একাধিক কারণে মীর কাশিম পরাজিত হন।

বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব (Importance of the Battle of Buxer)

বক্সারের যুদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহের মধ্যে অন্যতম। পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজরা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে কিন্তু অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। এ যুদ্ধে মীর কাশিমের সকল আশা-ভরসা ধূলিস্যাৎ হয় এবং ইংরেজদের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।স্যার স্টিফেনের মতে, "উপমহাদেশ ব্রিটিশ শক্তির উত্থানে পলাশীর যুদ্ধ অপেক্ষা বক্সারের যুদ্ধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ” এই উক্তিটি যথার্থ। এর সপক্ষে যুক্তি হচ্ছে-

প্রথমত, পলাশীর যুদ্ধ ছিল ষড়যন্ত্রমূলক কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল প্রকৃত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে উভয়ের শক্তি প্রদর্শিত হয়েছে। এ যুদ্ধ ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার শেষ যুদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, পলাশীর যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ শাসনের যে সূত্রপাত হয় বক্সারের যুদ্ধে তা পূর্ণতা লাভ করে। ঐতিহাসিক ব্রস বলেছেন, "বক্সারের যুদ্ধের ফলাফলের উপর উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ভরশীল ছিল।" বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পরাজয়ের সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার শেষ আলোটুকু নিভে যায়।

তৃতীয়ত, বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পরই ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষণ এবং উপমহাদেশে বাণিজ্যের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

চতুর্থত, বক্সারের যুদ্ধের ফলে মীর কাশিম সিংহাসনচ্যুত হন একং মীরজাফর পুনরায় পুতুল শাসক হিসেবে বাংলার মসনদে বসেন।

পঞ্চমত, এ যুদ্ধের ফলে বাংলার নবাব পদে কে বসবেন এবং নবাব পদ কে হারাবেন তা ইংরেজ কর্তৃক নির্ধারিত হয়।

ষষ্ঠত, পলাশীর যুদ্ধে কেবলমাত্র বাংলার নবাব পরাজিত হয় কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে বাংলা, অযোধ্যা এবং মোগল সম্রাট এক যোগে পরাজিত হয়।

সপ্তমত, এ যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ায় সম্রাট শাহ আলম ও অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ইংরেজদের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সর্বোপরি এ যুদ্ধে জয়ের ফলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বণিক থেকে শাসকে পরিণত হয়। অর্থাৎ বণিকের মানদণ্ড শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত করেন।

Content added By

The English Company Gets Dewani-1765

১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজিত হলে বাংলার সিংহাসনে পুতুল সরকার হিসেবে আবার মীরজাফর আসীন হয়। এক বছরের মাথায় (১৭৬৫) মীরজাফরের মৃত্যু হলে তার নাবালক পুত্র নজিমউদ্দৌলা কোম্পানির আশ্রিতা হিসেবে সিংহাসনে বসেন। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকে সমস্ত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়।
এ সময় ক্লাইভ দ্বিতীয়বার শাসনভার গ্রহণ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দূর করে স্থিতিশীলতা আনার জন্য বাদশাহ শাহ আলমের নিকট থেকে দেওয়ানি লাভের চেষ্টা করেন। এই লক্ষ্যে ক্লাইভ অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সাথে 'এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি' স্থাপন করেন (আগস্ট ১৭৬৫)। এই সন্ধি মতে নবাব সুজাউদ্দৌলা রাজ্য ফিরে পান বিনিময়ে কোম্পানিকে ৫০ লক্ষ টাকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং কোরা ও এলাহাবাদ অঞ্চলের দেওয়ানি ছেড়ে দেন। এরপর 'এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি' (আগস্ট ১৭৬৫) দ্বারা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
এই সন্ধি দ্বারা কোরা ও এলাহাবাদ যা কোম্পানি অযোধ্যার নবাবের নিকট থেকে পেয়েছিল তা বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমকে ছেড়ে দেয়। বিনিময়ে বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্বের স্বত্ব স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেন। এই দেওয়ানি লাভ ছিল কোম্পানির বিরাট বিজয়। এতদিন কোম্পানি মীরজাফর ও মীর কাশিমের সঙ্গে চুক্তি বলে বর্ধমান, মেদিনীপুর, চট্টগ্রাম ও চব্বিশ পরগনার রাজস্ব ভোগ করত। এখন তারা গোটা বাংলার রাজস্বের অধিকারী। কোম্পানি নবাবের কৃপাপ্রার্থী বণিক কোম্পানি থেকে এক লাফে রাজস্বের অধিকারী হয়ে বাংলার উপর প্রকৃত আধিপত্য বিস্তার করে। সুতরাং দেওয়ানি লাভ ছিল কোম্পানির চূড়ান্ত সাফল্য।

দেওয়ানি লাভের গুরুত্ব

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্ব ছিল দেওয়ানি লাভ। মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এ দুটি দিক থেকে ইংরেজদের জন্য বাংলায় দেওয়ানি লাভ ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

রাজনৈতিক গুরুত্ব:

প্রথমত, ইংরেজদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে উঠে আসার প্রধান সিঁড়ি ছিল দেওয়ানি লাভ।

দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার পরোক্ষভাবে বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা গ্রহণ করে। বস্তুতপক্ষে দেওয়ানি লাভ করে ইংরেজ কোম্পানি তাদের দখলকৃত ক্ষমতাকে আইনগত বৈধতা প্রদান করে।

তৃতীয়ত, দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের নিকট রাজনৈতিক বিজয়। এর ফলে বাংলার নবাব ও সম্রাট ক্ষমতা শূন্য হয়ে ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। নবাব নামে মাত্র সিংহাসনে বসে থাকেন। সবকিছু পরিচালনা করত ইংরেজরা।

চতুর্থত, দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি শুধু রাজস্ব অধিকারই লাভ করেনি; বরং নাবালক নাজিমউদ্দৌলার সাথে সন্ধির ফলে পরোক্ষভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতাও কোম্পানি লাভ করে। কোম্পানি নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি হাতে না নিয়ে নবাবের হাতে রাখে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে। নবাব ছিল নামে মাত্র। ক্লাইভ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, দেওয়ানির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলার সকল ক্ষমতার উৎসে পরিণত হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব:

প্রথমত, দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের বিরাট অর্থনৈতিক বিজয়। দেওয়ানি লাভ ছিলো কোম্পানি ভারতে অর্থনৈতিক শোষণের বিরাট হাতিয়ার। দেওয়ানি লাভ প্রসঙ্গে লর্ড ক্লাইভ বলেছেন, "বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়া যাবে তা এত বেশি হবে যে, সম্রাট ও বাংলার নবাবের নির্ধারিত সমস্ত ব্যয় পরিশোধ করেও কোম্পানির হাতে আয় থাকবে ১২ কোটি টাকা (১৭৬৫-৬৬ খ্রি.)।"

দ্বিতীয়ত, কোম্পানি দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানির কর্মচারীরা বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার সুযোগ পায়। নদীর পানির মতো এদেশ থেকে তারা অর্থ পাচার করতে থাকে।

তৃতীয়ত, দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি ইউরোপ থেকে রৌপ্য আনা বন্ধ করে দেয়। কারণ বাংলা থেকে তারা যে পরিমাণ রাজস্ব পেত তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল। দেওয়ানি লাভকে তারা মাছের তেলে মাছ ভাজাতে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে।

চতুর্থত, পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানি যে লুণ্ঠন শুরু করেছিল, দেওয়ানি লাভের মধ্য দিয়ে সে লুণ্ঠনের পথ আরও প্রশস্ত ও গতিশীল হয়।

পঞ্চমত, অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ইংল্যান্ডের মূলধনের একটি বিরাট অংশ গড়ে ওঠে বাংলা থেকে প্রেরিত অর্থের দ্বারা। এই মূলধনের সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটে। কেননা শিল্পবিপ্লব শব্দটি ব্যবহারকারী ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি শিল্পবিপ্লবের সময়কাল উল্লেখ করেছেন ১৭৬০ থেকে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ। সুতরাং ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে বাংলা থেকে পাচার করা সম্পদের সাহায্যে ইংল্যান্ডের মূলধন গড়ে ওঠেছে এবং এই মূলধনের দ্বারা ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব ঘটে থাকতে পারে তা অনুমান করলে ভুল হবে না।

Content added || updated By

The Dual Government of the English Company

দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে দেওয়ানি লাভ এবং বাংলার নবাবকে বাৎসরিক ৫৩ লক্ষ টাকার বৃত্তিভোগীতে পরিণত করে লর্ড ক্লাইভ বাংলায় যে অদ্ভুত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তাই ইতিহাসে দ্বৈতশাসন (Dual Governments) নামে পরিচিত।

প্রকৃতপক্ষে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার নিকট থেকে প্রাপ্ত কারা ও এলাহাবাদ জেলা এবং বার্ষিক ২৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পরিণতিই ছিল দ্বৈত শাসন। মীরজাফরের মৃত্যুর পর তার নাবালক পুত্র নজিমউদ্দৌলা নামে মাত্র সিংহাসনে থাকেন। রাজস্ব ক্ষমতা কোম্পানি দখল করে। কিন্তু শাসন সংক্রান্ত দায়িত্ব নবাবের হস্তে ন্যস্ত করে। কোম্পানি রাজস্বের অধিকার স্ব-হস্তে রেখে তা আদায়ের ভার দেশীয় দুজন কর্মচারী সিতাব রায় এবং রেজা খানের ওপর ছেড়ে দেয়। এর কারণ ছিল কোম্পানির প্রকৃত ক্ষমতা গোপন করা এবং রাজস্ব সম্পর্কে তাদের যথেষ্ট জ্ঞান বা লোকবল না থাকা। অতএব দেখা যায়, এই বিভক্তির ফলে নবাব পেল শাসন সংক্রান্ত বিষয়সমূহ এবং কোম্পানি পেল রাজস্বের অধিকার। অর্থাৎ নবাব পেল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং কোম্পানি পেল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিভক্তিকরণের এই অদ্ভুত ব্যবস্থাই ইতিহাসে দ্বৈতশাসন নামে পরিচিত।

দ্বৈতশাসনের ফলাফল

লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই ছিল বেশি। এ নীতিতে ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের ফলে বাংলার জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে'। বাংলার অর্থনৈতিক দুরবস্থা লক্ষ করে ঐতিহাসিক মেকেল বলেন, এরূপ নিষ্ঠুর শোষণ ও উৎপীড়ন বাংলার মানুষ কোনো দিন দেখেনি। এ নীতিতে রাজ্য শাসনের ব্যাপারে নবাবকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাঁকে কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। অপরদিকে কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা যার কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক র‍্যামসে ম্যুর (Ramsay Muir) বলেন, "প্রথম থেকেই দ্বৈতশাসনের ব্যর্থতা ছিল সুনিশ্চিত।"

দ্বৈতশাসনের ফলে বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পের অবনতি ঘটে। বাংলার স্বাধীন নবাবি আমলে বহু বিদেশি ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি এদেশের পণ্য কিনত কিন্তু কোম্পানির দ্বৈতশাসন নীতির ফলে তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য ব্যবসায় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে মার খায় এবং দেশের রপ্তানি আয় নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে।

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় বাংলার লর্ড ক্লাইভ কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক, শান্তি-সমৃদ্ধি ধ্বংস করে দেয়। নবাবের হাতে কোনো ক্ষমতা না থাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। গ্রাম বাংলায় চোর, ডাকাত, লুটেরা আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে গ্রাম শূন্য হয়ে যায়। কোম্পানির লোকেরা ইচ্ছামতো রাজস্ব আদায় করত, অত্যাচার করত। ফলে বাংলার মানুষ দরিদ্র ও অসহায় হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্পের অবনতি ঘটে। দেশের রপ্তানি আয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। ইংল্যান্ডে অর্থ পাঠানো বৃদ্ধি পায়। পূর্বে যে পূর্ণিয়া জেলা থেকে বার্ষিক চার লক্ষ টাকা আদায় করা হতো দ্বৈতশাসনের ফলে সেখান থেকে ২৫ লক্ষ টাকা আদায় করা হতো। অধিক রাজস্ব আদায়ের ওপর দু বছর অনাবৃষ্টির ফলে বাংলায় এক 'ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে।

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা কোম্পানির জন্য কিছু সুফল বয়ে আনলেও এর কুফল ছিল ভয়াবহ। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য নবাবকে কোম্পানির দয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো। অর্থাভাব এবং ক্ষমতার অভাবে প্রশাসনিক আইন-শৃঙ্খলা দ্রুত ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, কোম্পানির ক্ষমতা বলে রেজাখান ও সিতাব রায়ের রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। শাসন ও ক্ষমতার দোটানায় পড়ে জনসাধারণের দুঃখ-কষ্টের অন্ত ছিল না। দ্বৈতশাসনের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০) গভর্নর কার্টিয়ারের শাসনকালে ইংরেজি ১৭৭০ এবং বাংলা ১১৭৬ সালে বাংলা ও বিহারে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষে বঙ্গদেশে এক-তৃতীয়াংশ লোক মৃত্যুবরণ করে, যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ ও দ্বৈতশাসন প্রবর্তনের চরম পরিণতিই ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ঐতিহাসিক হান্টারের বিবরণ থেকে জানা যায়, পর পর দু'বছর (১৭৬৮ ও ১৭৬৯ খ্রি.) অনাবৃষ্টির পর কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের জুলুমে সর্বস্বান্ত হয়ে কৃষক তার গরু লাঙল বেচে ফেলে, বীজধান খেয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত পুত্র, কন্যাকে বিক্রি করতে আরম্ভ করে। গাছের পাতা, ঘাস প্রভৃতিও তারা খেতে শুরু করে। একই সঙ্গে আরম্ভ হয় মারাত্মক গুটি বসন্তের (ইংল্যান্ডের Black Death-এর মতো) মহামারি। দলে দলে মানুষ পথে-ঘাটে মৃত্যুবরণ করে। মাংসভোজী পশু-পাখিদের মানুষের মাংসে অরুচি দেখা দেয়। গ্রামগুলো মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়। এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশা মন্বন্তরে বঙ্গদেশের ৩ কোটি লোকের মধ্যে ১ কোটি লোক মৃত্যুবরণ করে।

এই মন্বন্তরের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এই মন্বন্তরের ফলে গ্রামগুলো জনশূন্য শ্মশানে পরিণত হয়, জমিগুলো অনাবাদি হয়ে থাকে এবং জমিদারি 'নাজাই প্রথার' প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। পরোক্ষ ফল হিসেবে দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটে এবং ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং এ্যাক্ট প্রবর্তন হয়।

Content added By

The Character and Achievement of Lord Clive

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শক্তির উত্থানের পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন লর্ড ক্লাইভ। লর্ড ক্লাইভ কোম্পানির সামান্য কেরানি পদে নিয়োগ নিয়ে উপমহাদেশে আগমন করে নিজ মেধা ও বুদ্ধি বলে গভর্নর এবং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপন করে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তিনি কূটনৈতিক মেধা দিয়ে কর্ণাটকের যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজিত করে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ভাগ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ এবং দ্বৈতশাসন প্রবর্তনে রয়েছে তার অনন্য ভূমিকা। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে তিনি ছিলেন চূড়ামণি। ঘুষ ও দুর্নীতির বরপুত্র লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে ভারতে তুমুল আন্দোলন শুরু হলে ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বোর্ড অব ডাইরেক্টর তাকে স্বদেশে ডেকে পাঠান। বঙ্গদেশে জালিয়াতি এবং 'ঘুষ গ্রহণে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়। পার্লামেন্টে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও জনসাধারণের ধিক্কারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আত্মহত্যা করেন। কৌশলে অর্থ আত্মসাতে তার জুড়ি ছিল না। তিনিই ছিলেন

পলাশী লুণ্ঠনের হোতা। তিনি বলতেন, টাকা চাই আরো টাকা, নষ্ট করার মতো একদম সময় নেই। তিনি কোনো প্রকার নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা ও অর্থ সংগ্রহে নিমগ্ন হন। কার্ল মার্কস তার ভারতীয় ইতিহাসে ক্লাইভকে 'দস্যু চূড়ামণি' আখ্যায়িত করেছেন। বলতে গেলে ভারতবর্ষে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ক্লাইভই রোপণ করে যান। তার দ্বৈতশাসনের কুফলই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। তার চরিত্রে বিভিন্ন গুণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির শিরোমণি হিসেবে তিনি ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছেন।

সারসংক্ষেপ

মেগাস্থিনিস: মেগাস্থিনিস ছিলেন গ্রিক রাষ্ট্রদূত ও বিখ্যাত পর্যটক। গ্রিক রাজা সেলুকাসের দূত হিসেবে মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনামলে (৩২৪-৩০০ খ্রি.পূর্ব) পাটলিপুত্রে আগমন করেন এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি ইন্ডিকা নামে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি ভারতবর্ষের সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন খাদ্যদ্রব্য, কৃষি, বনজ, খনিজ সম্পদ সব দিক থেকে ভারতবর্ষ সমৃদ্ধশালী। নদীমাতৃক দেশ বলে জমির উর্বরতা ছিল অত্যধিক। খাদ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য দেখে মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেছেন, "ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ কখনও ঘটেনি।"

আইন-ই-আকবরী : আইন-ই-আকবরী হচ্ছে ঐতিহাসিক আবুল ফজল কর্তৃক রচিত একখানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে উক্ত গ্রন্থখানা রচনা করা হয়। এ গ্রন্থে সম্পদশালী বাংলার অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

তযুক-ই-বাবর: তুযুক-ই-বাবর হলো মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর কর্তৃক রচিত একখানা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি ভারতবর্ষের সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন।

হানাদার: হানাদার শব্দের অর্থ হচ্ছে আক্রমণকারী। রাজ্য দখল কিংবা সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যারা অন্য দেশ আক্রমণ করে তারাই হানাদার নামে পরিচিত। উপমহাদেশের সম্পদে প্রলুব্ধ হয়ে অনেক হানাদাররা আক্রমণ করে ভারতীয় উপমহাদেশে।

রেনেসাঁ : পনেরো শতকের ইউরোপের পুনঃজাগরণকে রেনেসাঁ বলা হয়। রেনেসাঁ বা পুনঃজাগরণের ফলে ইউরোপীয়রা নতুন নতুন আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ হয়।

ওলন্দাজ: হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদের ওলন্দাজ বলা হয়। এরা ডাচ নামেও পরিচিত। ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগিজদের পরেই ভারতবর্ষে ওলন্দাজদের আগমন ঘটে। তারা ভারতবর্ষে বাণিজ্যে সাফল্য অর্জন করতে না পেরে ইংরেজদের কাছে তল্পিতল্পা বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যায়।

দিনেমার: ডেনমার্কের অধিবাসীদের দিনেমার বলা হয়। ভারতবর্ষে বাণিজ্য করার জন্য দিনেমাররা ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। বাণিজ্যে সুবিধা করতে না পেরে কুঠিসমূহ ইংরেজদের নিকট বিক্রি করেন।

ইংরেজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশরা যে কোম্পানির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য শুরু করে সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠা করেছিল তা-ই হচ্ছে উপমহাদেশে বহুল পরিচিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য লন্ডনের অধিবাসীগণ ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে "লন্ডন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি" গঠন করে। এর সদস্য সংখ্যা ছিল রানি এলিজাবেথ সহ ২৬ জন। এ কোম্পানিকে উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য রানি এলিজাবেথ ঐ বছরের ৩১ ডিসেম্বর ১৫০ বছর মেয়াদি সনদপত্র প্রদান করেন। এ কোম্পানি ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। উপমহাদেশে এ কোম্পানির বাণিজ্য সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে "ইংলিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি" নামে আর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে। ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে এ দুটি কোম্পানি মিলিত হয়ে "The United Company of Merchants Trading to East India" নামে পুনর্গঠিত হয়। এ কোম্পানিই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সাধারণত "ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি” নামে পরিচিত।

মালজামিনী প্রথা : মালজামিনী হচ্ছে বাংলার নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদ কুলী খান কর্তৃক রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী তিনি বাংলাকে ১৩টি চাকলায় এবং ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ করে রাজস্ব আদায় করতেন।

অন্ধকূপ হত্যা: ইংরেজ লেখক হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত একটি কাহিনি ইতিহাসে অন্ধকূপ হত্যা নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা দুর্গ আক্রমণ করে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে একটি ছোট কক্ষের মধ্যে আটকিয়ে রাখেন। ফলে ১২৩ জন ইংরেজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।

মীর জাফর। মীর জাফর আলী খান ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের ভগ্নিপতি ও প্রধান সেনাপতি। আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিরাজউদ্দৌলা নবাব হলে মীর জাফরের সেনাপতির পদ বহাল থাকে। তিনি ছিলেন জঘন্য নিচু চরিত্রের লোক। নিজে নবাব হওয়ার লোভে ইংরেজ কোম্পানির সাথে গোপনে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব তার বিশাল বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের নিকট পরাজিত এবং নিহত হন। ২০০ বছরের জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। তিনি ইংরেজদের পুতুল শাসকরূপে দু দফায় (১ম দফা ১৭৫৭-১৭৬০, ২য় দফা ১৭৬৪-১৭৬৫ খ্রি.) ৪ বছর বাংলার নবাব পদে থেকে মীর জাফর বিশ্বাসঘাতক এই গালি নিয়ে ইতিহাস স্থান করে নেন।

দেওয়ানি: সাধারণত দেওয়ানি বলতে রাজস্বকে বোঝায়। পলাশী এবং বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। মূলত দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের চূড়ান্ত বিজয়।

দ্বৈতশাসন: লর্ড ক্লাইভ কর্তৃক প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন ছিল একটি অদ্ভুত শাসন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বাংলার নবাব পেয়েছিলেন ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং ইংরেজরা পেয়েছিল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। দ্বৈতশাসনের কুফলই ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। যে মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: ইংরেজ শাসনামলে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক বাংলা ১১৭৬ সালে বাংলা ও বিহারে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার ৩ কোটি লোকের মধ্যে ১ কোটি লোক মারা যায়। ১১৭৬ সালের এই দুর্ভিক্ষই ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...