hsc

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (৩.১২)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

11

The Indian National Congress

"১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়"- আর সি মজুমদার।

কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি

ব্রিটিশ শাসননীতির বিরুদ্ধে শিক্ষিত ভারতবাসীর মধ্যে ক্রমশ ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে থাকে, যা ক্রমশ জাতীয় চেতনায় রূপ নেয়। আর এ চেতনা থেকে ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এর পূর্বে ও পরে ছোটখাটো অনেক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য জনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি'। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে স্যার সৈয়দ আহমদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন'। এই অ্যাসোসিয়েশনকে জাতীয় কংগ্রেসের পূর্বসূরী হিসেবে গণ্য করা হয়। এসকল সমিতি শিক্ষিত অভিজাত ও জমিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো বিধায় মধ্যবিত্ত বা সাধারণ জনগণ এর ধারেকাছে যেতে পারত না। যার ফলে এসকল সমিতির সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তবে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের অনুকরণে মুম্বাইয়েও সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে 'ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন' বা ভারত সভা নামে আর একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠনটি শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সংগঠনে পরিণত হয়। এ সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, রাজনৈতিক সচেতনতার সৃষ্টি হয় এবং চাকরিসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়সসীমা একুশ থেকে নামিয়ে উনিশে আনা হলে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আগ্রা, দিল্লি, আলীগড়, লাহোর, কানপুর, বেনারস ও অমৃতসরসহ ভারতে বিভিন্ন প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রতিবাদ সভা হয়। এ আন্দোলন যখন চলমান তখন ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার 'ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট' জারি করে দেশীয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা করলে এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন শুরু হয়। এসব অসন্তোষের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ইলবার্ট বিল নিয়ে শুরু হয় আর এক বিতর্ক। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে এক আইন বলে ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয় কোনো নাগরিকদের বিচার করতে পারত না। এ বৈষম্য দূর করার জন্য লর্ড লিটন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হয়ে (১৮৭৬-১৮৮০) আইন সদস্য মি. ইলবার্টের মাধ্যমে একটি বিল তৈরি করেন। যে বিলে ইউরোপীয় নাগরিকদের বিচার করার এখতিয়ার ভারতীয় বিচারকদের দেওয়া হয়। এই বিলের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে অবস্থানরত ইউরোপীয় নাগরিকরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভের মুখে এ বিলের কিছুটা সংস্কার করে বিচারকার্যে জুরির ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে অর্ধেক বিচারক ইউরোপীয় থাকবে। ভারতবর্ষের মাটিতে ইউরোপীয়দের বিক্ষোভভারতীয়দের মর্যাদায় আঘাত হানে। এমতাবস্থায় ভারতবাসী সর্বভারতীয় একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা একান্তভাবে উপলব্ধি করে। পূর্বের আন্দোলনের সাথে এ উপলব্ধি নতুন করে যুক্ত হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার কিছুটা চাপের মুখে পড়ে। এজন্য ভারতীয়দের দাবি ও আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করা এবং ভারতীয়দের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য মনোযোগী হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম-এর উদ্যোগে এবং ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সহযোগিতায় ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাই
শহরে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস) প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে একথাও সত্য যে, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক আহুত ভারতীয় জাতীয় সম্মেলনে - জাতীয় কংগ্রেস গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। ভারতীয় শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে শাসনতান্ত্রিক পথে পরিচালনা করার জন্য ইংরেজ আমলা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন জবরদস্ত ইন্ডিয়ান সিভিল সার্জন (আই.সি.এস কর্মকর্তা)। তিনি ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি নিযুক্ত হন ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। তিনি একনাগাড়ে ২৫ বছর সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ

ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয়দের দাবি-দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে প্রথম রাজনৈতিক দল হচ্ছে জাতীয় কংগ্রেস। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ হলো-

প্রথমত, ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করা। আই.সি.এস কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় হিউম তার অভিজ্ঞতা দ্বারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতে এক বড় ধরনের বিদ্রোহ আসন্ন। সুতরাং তিনি ভারতীয়দের অসন্তোষ প্রশমিত করার লক্ষ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের নিকট লিখিত এক পত্রে একটি স্থায়ী সংস্থা গঠনের উপদেশ দেন।

দ্বিতীয়ত, ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণের পর তিনি ভারতীয়দের স্বার্থ আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী হন।

তৃতীয়ত, সর্বোপরি তদানীন্তন ভারতের বড় লাট লর্ড ডাফরিনও এ সময় ভারত সরকারের সমালোচনার জন্য একটি বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
এভাবে ডাফরিন ও হিউম-এর যৌথ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টায় ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর মুম্বাই শহরে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয় কংগ্রেসের উদ্দেশ্য

মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কলকাতার খ্যাতনামা ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কংগ্রেসের ৪টি মূল উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করেন-

১। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে যোগসূত্র এবং সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা।
২। পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতা দূর করে জাতীয় ঐক্যের পথ প্রশস্ত করা।
৩। শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আলাপ-আলোচনার দ্বারা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলি চিহ্নিত করে তার সমাধানের পথ নির্ধারণ করা। এবং
৪। আগামী এক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা।

জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছিল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সংগঠন। দাদাভাই নওরোজী, গোপালকৃষ্ণ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বদরউদ্দীন তৈয়াবজী প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে দাদাভাই নওরোজীর সভাপতিত্বে দ্বিতীয় এবং ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বদরউদ্দীন তৈয়াবজীর সভাপতিত্বে তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়ে ব্রিটিশ সরকারের নিকট দাবি-দাওয়া উত্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ প্রতিষ্ঠান ভারতীয় অ্যাকটের বিলুপ্তিসাধন এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সভাগুলোতে সংস্কার ও সম্প্রসারণ দাবি সর্বোপরি কংগ্রেসের জনপ্রিয়তায় ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিরূপ মনোভাব গ্রহণ করেন। পর্যায়ক্রমে এতে চরমপন্থিদের অনুপ্রবেশ ঘটলে এ সংগঠন বিপ্লবী নীতি গ্রহণ করে। বিপিন চন্দ্র পাল, মতিলাল ঘোষ, বালগঙ্গাধর তিলক, লাল লাজপক্ষ রাও প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠলে মুসলমান নেতৃবৃন্দ হতাশ হয়ে পড়েন। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ২০ বছরের মধ্যে মুসলমানদের দাবি উপেক্ষিত বলে এতদিনে মুসলমানদের ঘুম ভাঙে। তারা অনুভব করল যে, কংগ্রেস মুসলমানদের সংগঠন নয় ও মুসলমানদের দাবির প্রতিও কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয় লোকেরা শ্রদ্ধাশীল নয়। কংগ্রেসের কার্যক্রমে ব্রিটিশ সরকারও সন্তুষ্ট নয়। এখানে তারা ভেদাভেদনীতির সূত্র আবিষ্কার করে। মূলত কংগ্রেস নেতাদের কার্যকলাপে শঙ্কিত হয়ে কংগ্রেস আন্দোলনের মূলোচ্ছেদ করতে ব্রিটিশ সরকার সচেষ্ট হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...