'লর্ড ক্লাইভের চরিত্র ও কৃতিত্ব (১.৮)

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

10

The Character and Achievement of Lord Clive

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শক্তির উত্থানের পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন লর্ড ক্লাইভ। লর্ড ক্লাইভ কোম্পানির সামান্য কেরানি পদে নিয়োগ নিয়ে উপমহাদেশে আগমন করে নিজ মেধা ও বুদ্ধি বলে গভর্নর এবং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপন করে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তিনি কূটনৈতিক মেধা দিয়ে কর্ণাটকের যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজিত করে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ভাগ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ এবং দ্বৈতশাসন প্রবর্তনে রয়েছে তার অনন্য ভূমিকা। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে তিনি ছিলেন চূড়ামণি। ঘুষ ও দুর্নীতির বরপুত্র লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে ভারতে তুমুল আন্দোলন শুরু হলে ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বোর্ড অব ডাইরেক্টর তাকে স্বদেশে ডেকে পাঠান। বঙ্গদেশে জালিয়াতি এবং 'ঘুষ গ্রহণে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়। পার্লামেন্টে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও জনসাধারণের ধিক্কারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আত্মহত্যা করেন। কৌশলে অর্থ আত্মসাতে তার জুড়ি ছিল না। তিনিই ছিলেন

পলাশী লুণ্ঠনের হোতা। তিনি বলতেন, টাকা চাই আরো টাকা, নষ্ট করার মতো একদম সময় নেই। তিনি কোনো প্রকার নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা ও অর্থ সংগ্রহে নিমগ্ন হন। কার্ল মার্কস তার ভারতীয় ইতিহাসে ক্লাইভকে 'দস্যু চূড়ামণি' আখ্যায়িত করেছেন। বলতে গেলে ভারতবর্ষে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ক্লাইভই রোপণ করে যান। তার দ্বৈতশাসনের কুফলই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। তার চরিত্রে বিভিন্ন গুণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির শিরোমণি হিসেবে তিনি ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছেন।

সারসংক্ষেপ

মেগাস্থিনিস: মেগাস্থিনিস ছিলেন গ্রিক রাষ্ট্রদূত ও বিখ্যাত পর্যটক। গ্রিক রাজা সেলুকাসের দূত হিসেবে মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনামলে (৩২৪-৩০০ খ্রি.পূর্ব) পাটলিপুত্রে আগমন করেন এবং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি ইন্ডিকা নামে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি ভারতবর্ষের সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন খাদ্যদ্রব্য, কৃষি, বনজ, খনিজ সম্পদ সব দিক থেকে ভারতবর্ষ সমৃদ্ধশালী। নদীমাতৃক দেশ বলে জমির উর্বরতা ছিল অত্যধিক। খাদ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য দেখে মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেছেন, "ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ কখনও ঘটেনি।"

আইন-ই-আকবরী : আইন-ই-আকবরী হচ্ছে ঐতিহাসিক আবুল ফজল কর্তৃক রচিত একখানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে উক্ত গ্রন্থখানা রচনা করা হয়। এ গ্রন্থে সম্পদশালী বাংলার অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

তযুক-ই-বাবর: তুযুক-ই-বাবর হলো মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর কর্তৃক রচিত একখানা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি ভারতবর্ষের সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন।

হানাদার: হানাদার শব্দের অর্থ হচ্ছে আক্রমণকারী। রাজ্য দখল কিংবা সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যারা অন্য দেশ আক্রমণ করে তারাই হানাদার নামে পরিচিত। উপমহাদেশের সম্পদে প্রলুব্ধ হয়ে অনেক হানাদাররা আক্রমণ করে ভারতীয় উপমহাদেশে।

রেনেসাঁ : পনেরো শতকের ইউরোপের পুনঃজাগরণকে রেনেসাঁ বলা হয়। রেনেসাঁ বা পুনঃজাগরণের ফলে ইউরোপীয়রা নতুন নতুন আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ হয়।

ওলন্দাজ: হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদের ওলন্দাজ বলা হয়। এরা ডাচ নামেও পরিচিত। ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগিজদের পরেই ভারতবর্ষে ওলন্দাজদের আগমন ঘটে। তারা ভারতবর্ষে বাণিজ্যে সাফল্য অর্জন করতে না পেরে ইংরেজদের কাছে তল্পিতল্পা বিক্রি করে স্বদেশে ফিরে যায়।

দিনেমার: ডেনমার্কের অধিবাসীদের দিনেমার বলা হয়। ভারতবর্ষে বাণিজ্য করার জন্য দিনেমাররা ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেনিস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। বাণিজ্যে সুবিধা করতে না পেরে কুঠিসমূহ ইংরেজদের নিকট বিক্রি করেন।

ইংরেজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশরা যে কোম্পানির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য শুরু করে সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠা করেছিল তা-ই হচ্ছে উপমহাদেশে বহুল পরিচিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য লন্ডনের অধিবাসীগণ ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে "লন্ডন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি" গঠন করে। এর সদস্য সংখ্যা ছিল রানি এলিজাবেথ সহ ২৬ জন। এ কোম্পানিকে উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য রানি এলিজাবেথ ঐ বছরের ৩১ ডিসেম্বর ১৫০ বছর মেয়াদি সনদপত্র প্রদান করেন। এ কোম্পানি ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। উপমহাদেশে এ কোম্পানির বাণিজ্য সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে "ইংলিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি" নামে আর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে। ১৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে এ দুটি কোম্পানি মিলিত হয়ে "The United Company of Merchants Trading to East India" নামে পুনর্গঠিত হয়। এ কোম্পানিই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সাধারণত "ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি” নামে পরিচিত।

মালজামিনী প্রথা : মালজামিনী হচ্ছে বাংলার নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদ কুলী খান কর্তৃক রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুযায়ী তিনি বাংলাকে ১৩টি চাকলায় এবং ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ করে রাজস্ব আদায় করতেন।

অন্ধকূপ হত্যা: ইংরেজ লেখক হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত একটি কাহিনি ইতিহাসে অন্ধকূপ হত্যা নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা দুর্গ আক্রমণ করে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে একটি ছোট কক্ষের মধ্যে আটকিয়ে রাখেন। ফলে ১২৩ জন ইংরেজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।

মীর জাফর। মীর জাফর আলী খান ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের ভগ্নিপতি ও প্রধান সেনাপতি। আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিরাজউদ্দৌলা নবাব হলে মীর জাফরের সেনাপতির পদ বহাল থাকে। তিনি ছিলেন জঘন্য নিচু চরিত্রের লোক। নিজে নবাব হওয়ার লোভে ইংরেজ কোম্পানির সাথে গোপনে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব তার বিশাল বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের নিকট পরাজিত এবং নিহত হন। ২০০ বছরের জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। তিনি ইংরেজদের পুতুল শাসকরূপে দু দফায় (১ম দফা ১৭৫৭-১৭৬০, ২য় দফা ১৭৬৪-১৭৬৫ খ্রি.) ৪ বছর বাংলার নবাব পদে থেকে মীর জাফর বিশ্বাসঘাতক এই গালি নিয়ে ইতিহাস স্থান করে নেন।

দেওয়ানি: সাধারণত দেওয়ানি বলতে রাজস্বকে বোঝায়। পলাশী এবং বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। মূলত দেওয়ানি লাভ ছিল ইংরেজদের চূড়ান্ত বিজয়।

দ্বৈতশাসন: লর্ড ক্লাইভ কর্তৃক প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন ছিল একটি অদ্ভুত শাসন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বাংলার নবাব পেয়েছিলেন ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং ইংরেজরা পেয়েছিল দায়িত্বহীন ক্ষমতা। দ্বৈতশাসনের কুফলই ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। যে মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: ইংরেজ শাসনামলে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক বাংলা ১১৭৬ সালে বাংলা ও বিহারে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার ৩ কোটি লোকের মধ্যে ১ কোটি লোক মারা যায়। ১১৭৬ সালের এই দুর্ভিক্ষই ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...