Simon Commission-1927 and Neheru Report-1928
সাইমন কমিশন-১৯২৭ (Simon Commission-1927)
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভারত শাসন আইন ভারতবাসীর রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে এ আইনের বিরুদ্ধে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়। তার ওপর ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে স্বরাজ দলের নেতা মতিলাল নেহেরু শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি জানান। এমতাবস্থায় প্রশাসন ও সংবিধানে উভয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার জন্য বড় লাট লর্ড আরউইন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কমিশন ভারতবর্ষে সুশাসন গঠনের ঘোষণা দেন। এ প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের দাবিদাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে উদারনৈতিক দলের সদস্য স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে লর্ড সভার ২ জন এবং কমন্স সভার ৪ জন মোট ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন প্রেরণ করেন। কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসন লাভ করার যোগ্যতা আছে কি-না তা তদন্ত করে দেখা। এই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় একে 'সাদা কমিশন' বলে বিদ্রূপ করা হয়। কেবল ইংরেজদের নিয়ে সাইমন কমিশন গঠিত হয় বলে ভারতে এর বিরুদ্ধে অসন্তোষ লক্ষ করা যায়।
কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, লিবারেল ফেডারেশন ও হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এ কমিশন গঠনের নিন্দা করে এবং সাইমন কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশন মুম্বাই-এ আগমন করলে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। সর্বত্র স্লোগান দেওয়া হয় "সাইমন ফিরে যাও"। কমিশনকে কালো পতাকা দেখানো হয়। এ অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে সাইমন কমিশন তাদের তদন্ত কাজ শেষ করে। এই কমিশন ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দু'খণ্ডে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্ট ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার পদ্ধতি এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব করা হয়।
দুটি কারণে এই কমিশনের প্রস্তাব ভারতবাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়নি। (১) কমিশনে ভারতীয় কোনো সদস্য না থাকা এবং (২) প্রস্তাবসমূহ ভারতবাসীর স্বার্থের অনুকূলে না হওয়া। কংগ্রেস এই কমিশনের বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। মূলত এই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করা হয়।
নেহেরু রিপোর্ট-১৯২৮ (Neheru Report-1928)
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সাইমন কমিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সাইমন কমিশন স্বদেশে ফিরে যায়। তৎকালীন ভারত সচিব বার্কেনহেড ভারতীয় নেতাদের কাছে সর্বসম্মত একটি সংবিধান তৈরির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। ভারতীয় নেতারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। উপমহাদেশের সাংবিধানিক সংকট নিরসনের জন্য কংগ্রেস নেতা মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে একটি কমিটি ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ আগস্ট একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এটাই ইতিহাসে 'নেহেরু রিপোর্ট' নামে পরিচিত। এ রিপোর্টে বলা হয়-

১. সমগ্র ভারতে যুক্ত মিশ্র নির্বাচন হবে।
২. গণপরিষদে (কেন্দ্রীয় আইনসভা) কোনো আসন সংরক্ষিত থাকবে না তবে যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু তাদের জন্য এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হিন্দুদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে। এ ধরনের আসন সংরক্ষণ শুধু ঐসব প্রদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতে হবে যেখানে তারা সংখ্যালঘু এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অমুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতে। যেসব প্রদেশে হিন্দু বা মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে তারা ইচ্ছা করলে বাড়তি আসনের জন্যও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে।
৩. ক. পাঞ্জাব ও বাংলাদেশ কোনো সম্প্রদায়ের জন্য কোনো আসন সংরক্ষিত থাকবে না।
খ. পাঞ্জাব ও বাংলাদেশ ব্যতীত অন্যান্য প্রদেশে মুসলমান সংখ্যালঘুদের জন্য জনসংখ্যানুপাতে আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তৎসঙ্গে বাড়তি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকারও থাকবে।
গ. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অমুসলমানদের জন্য অনুরূপ আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তৎসঙ্গে বাড়তি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকারও থাকবে।
৪. যেসব প্রদেশে আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে তা সেখানে দশ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে।
৫. সিন্ধুকে বোম্বে থেকে পৃথক করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তরিত করা হবে, তবে অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করে আলাদা প্রদেশ কার্যকরী হবে।
৬. উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং এ ধরনের গঠিত নতুন প্রদেশসমূহ অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় সরকার গঠন করবে।
এ রিপোর্টে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করা হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ দলমত নির্বিশেষে এ রিপোর্টের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মুসলিম লীগ, কংগ্রেসের একাংশ ও হিন্দু মহাসভা নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা করে, প্রকৃতপক্ষে নেহেরু রিপোর্ট ভারতে বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে ব্যর্থ হয়। এ রিপোর্ট প্রকাশে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ভেঙে পড়ে। ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধি পায়।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন: ব্রিটিশ আমল মো. এনায়েত হোসেন (কাজল) স্যার এর লেখা বই
Read more