Indian Government Act 1858 and its Procedure
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন (Indian Government Act 1858) ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাবিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ জাতীয় নেতৃত্বের অভাবসহ নানা কারণে ব্যর্থ হলেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ মহাবিদ্রোহের পর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এই মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করতে পারে যে, ভারতবর্ষের ন্যায় এত বড় একটি রাষ্ট্রের শাসন করার ভার একটি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এই উপলব্ধি থেকেই ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়া এক ঘোষণা বলে ভারতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসন ব্যবস্থা স্বহস্তে গ্রহণ করেন। মহারানির এই ঘোষণার প্রায় একশ বছরে কোম্পানির দুঃশাসনের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় ব্রিটিশ শাসন। মহারানির এ রাজকীয় ঘোষণা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘোষণা দ্বারা মহারানি ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও জনসাধারণের ক্ষোভ প্রশমনের লক্ষ্যে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। এতদসংক্রান্ত মহারানির ঘোষণাই ইতিহাসে ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত।। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘোষণায় মহারানি বলেন-

১. ইতঃপূর্বে কোম্পানি তাদের শাসনামলে ভারতীয় শাসক ও রাজন্যবর্গের সাথে যেসব বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে সেগুলো সযত্নে পালিত হবে।
২. ব্রিটিশ প্রজাদের মতোই বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল ভারতীয় প্রজাকে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
৩. ভারতীয় জনসাধারণের স্ব-স্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা হবে। কোনো অবস্থায় খ্রিষ্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ ধর্মীয় ক্ষেত্রে ভারতীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে।
৪. মহাবিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ নরনারীকে হত্যার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি এবং যারা এখনও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছে তাদের সকলের প্রতি রাজকীয় ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে।
৫. লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত সাম্রাজ্যবাদনীতি ও স্বত্ব বিলোপনীতি পরিত্যক্ত করা হবে ।
-৬. উক্ত ঘোষণায় ভারতীয়দের কল্যাণে এবং উন্নয়নে আরও বলা হয়, ভারতের জনগণের উন্নতিই সরকারের শক্তি বৃদ্ধি, ভারতীয়দের পরিতৃপ্তিই ব্রিটিশ সরকারের নিরাপত্তা, তাদের কৃতজ্ঞতাই ব্রিটিশ সরকারের জন্য শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হবে। মহারানি ভিক্টোরিয়ার উল্লিখিত আবেগময় ঘোষণায় ভারতীয় জনসাধারণের ক্ষোভ হ্রাস পায় এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে সম্পর্ক ক্রমশ উন্নয়ন ঘটে।
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এক আইন পাস করে ভারতের শাসনভার মহারানি ভিক্টোরিয়ার হস্তে অর্পণ করেন। যেহেতু রানির পক্ষে সরাসরি ভারতে শাসন করা সম্ভব ছিল না, সেহেতু ব্রিটিশ সিংহাসনের প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল পদে 'ভাইসরয়' বা রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। কোম্পানির পরিচালক বোর্ড অব কন্ট্রোলের পরিবর্তে ব্রিটিশ কেবিনেট মন্ত্রীদের মধ্যে থেকে একজনকে ভারত সচিবের পদে নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি ১৫ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিলের সাহায্যে ভারতের শাসনকার্য পরিচালনা করবেন স্থির হয়।

ভারত শাসন আইনের প্রক্রিয়া (Procedure of Indian Government Act)
মহারানির ঘোষণা এবং পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারতবর্ষে অবস্থানরত গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংই প্রথম রাজপ্রতিনিধি বা ভাইসরয় নিযুক্ত হন (১৮৫৮-১৮৬২)। রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করে লর্ড ক্যানিং উদার নীতির মাধ্যমে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। পাশাপাশি ভারতীয়দের শান্ত রাখতে বেশ কিছু সংস্কারের কাজে হাত দেন। যেমন-
(ক) আইন সংস্কার: তিনি ভারতীয় দেওয়ানি আদালত এবং নেজামত আদালত একত্রিত করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর আইন সচিব কর্তৃক ভারতীয় দণ্ডবিধি আইন প্রণীত হয়। লর্ড ক্যানিং ভারতীয় সিভিল অ্যাকট পাস করে ভারতীয়দের জন্য বেশ কয়েকটি উচ্চপদ সংরক্ষিত করে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের দ্বার উন্মুক্ত করেন।
(খ) সামরিক সংগঠন: লর্ড ক্যানিং কোম্পানির সময়ের সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে আবার নতুন করে সেনাবাহিনী গঠন করেন। সেনাবিভাগে তিনি ভারতীয় সেনা কম ভর্তি করে ইউরোপীয় সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। অস্ত্রাগারের দায়িত্ব। তিনি ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে ন্যস্ত করেন।
(গ) রাজস্ব সংস্কার: ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সংগ্রামে কোম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে লর্ড ক্যানিং ইংল্যান্ডের দুজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এ ব্যবস্থা অনুযায়ী আয়কর বৃদ্ধি, পথকর স্থাপন এবং কাগজের মুদ্রা প্রবর্তন করা হয়। তিনি সামরিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সক্ষম হন।
(ঘ) শিক্ষা সংস্কার: শিক্ষা ক্ষেত্রেও তার অবদান রয়েছে। ভারতবর্ষে শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কলকাতা, মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ে তিনি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি একদিকে উপমহাদেশের মহাবিদ্রোহ দমন করে তাঁর দেশবাসীর নিকট থেকে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন। অপরদিকে, ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজস্ব আইন প্রণয়ন করে জমিদারদের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা, কাগজের মুদ্রা প্রচলন, ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বোচ্চ ক্ষমতাবিশিষ্ট আদালত 'হাইকোর্ট' প্রতিষ্ঠা এবং কলকাতা, মাদ্রাজ, মুম্বাইয়ে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ভারতবাসীর নিকট জনদরদি শাসকে পরিণত হন। ভারতের এই জনদরদি শাসক ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
লর্ড ক্যানিং-এর পর ধারাবাহিকভাবে নিম্ন বর্ণিত ভাইসরয়গণ ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে ভারতবর্ষ শাসন করেন। লর্ড এলগিন (১৮৬২-১৮৬৩ খ্রি.), স্যার জন লরেন্স (১৮৬৪-১৮৬৯ খ্রি.), লর্ড মেয়ো (১৮৬৯-১৮৭২ খ্রি.), লর্ড নর্থব্রুক (১৮৭২-১৮৭৬ খ্রি.), লর্ড লিটন (১৮৭৬-১৮৮০ খ্রি.), লর্ড রিপন (১৮৮০-১৮৮৪ খ্রি.), লর্ড দ্বিতীয় এলগিন (১৮৯৪-১৮৯৯ খ্রি.), লর্ড কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫ খ্রি.), লর্ড মিন্টো (১৯০৫-১৯১০ খ্রি.) ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হন । তন্মধ্যে লর্ড লিটন, লর্ড রিপন ও লর্ড কার্জনের নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
Read more