Non-co-operation Movement
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদীরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করেন, "পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে দেওয়া হবে না। এরপরও জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলে তা কসাইখানায় পরিণত হবে।" ভুট্টোর পরামর্শে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১ মার্চের এক ঘোষণায় ইয়াহিয়া খান বললেন, “৩ মার্চের ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।" এ ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনা প্রয়োজনবোধ করলেন না। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি দুটি কারণ উল্লেখ করেন- (১) পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পি.পি.পি. এবং অন্যান্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত এবং (২) ভারত কর্তৃক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অস্থিরতা সৃষ্টি। অবশ্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, দেশে যে মুহূর্তে স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থা ফিরে আসবে তখনই তিনি কালবিলম্ব না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। বাস্তব ক্ষেত্রে এটা ছিল তাঁর রাজনৈতিক চাতুরতা। পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, যে কারণ দেখিয়ে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেন তা একটি অযুহাত মাত্র। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।
জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার অব্যবহিত পরই পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এস. এম. আহসান যিনি বাঙালিদের দাবি-দাওয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তাকে সরিয়ে তাঁর স্থলে গভর্নর হিসেবে লে. জে. টিক্কা খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। (বেলুচিস্তানের কশাই হিসেবে টিক্কা খানের কুখ্যাতি রয়েছে)। মূলত ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা এবং প্রতিশ্রুতি দেশবাসীকে সন্দিহান করে তোলে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রতিবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে মিছিলে অংশগ্রহণ করে। ২ মার্চ আ.স.ম রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের দাবিতে সাড়া দিয়ে ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং সায়া পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ দিবস হরতালের আহ্বান করেন। সামরিক কর্তৃপক্ষ এদিন শহরে সান্ধ্য আইন জারি করে।
৩ মার্চ বিকালে পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জনসভার আয়োজন করে। সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে এ জনসভায় জনতার ঢল নামে। এ জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন যে, যখন জাতীয় পরিষদের সব সদস্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কতিপয় সদস্য ঢাকায় উপস্থিত হলেন, তখন অধিবেশন স্থগিত রেখে কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকেই ব্যাহত করা হয়েছে। এ জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারকে পুলিশের নির্যাতন ও সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বলেন এবং একই সাথে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত কর প্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। তিনি একে জাতীয় সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন এবং এ সংগ্রামে জনগণের অংশগ্রহণকে অপরিহার্য বলে মনে করেন। শেখ মুজিবুর রহমান নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করেন। এর প্রতিবাদস্বরূপ তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের জন্য অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মাওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, নুরুল আমীন সহ অন্যান্য নেতারা আওয়ামী লীগ আহূত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। সারা দেশব্যাপী শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। জনগণ অকুণ্ঠভাবে অসহযোগ আন্দোলন সফল করে তোলে।
অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব ও গুরুত্ব (Impact and importance of non-cooperation movement)
১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পূর্ব প্রস্তুতি। এ আন্দোলন পাকিস্তান শাসনের ভীতকে দুর্বল করে দেয়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের মনে পাকসেনাদের ভয় দূরীভূত হয়। মূলত ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই ২৪ দিন পূর্ববাংলা অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেই ছিল। এসময় সবকিছু অচল অবস্থায় থাকে এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পূর্ববাংলার শাসন কার্য পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পূর্ববাংলার সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস, সচিবালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আদালত, পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক-বিমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ অমান্য করে। খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হয়ে যায়। ইয়াহিয়া সরকার কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে যোগদানের জন্য। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ১৪ মার্চ' ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ দফার এক নির্দেশনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর-খাজনা, বন্ধ ঘোষণা করেন। [মোট কথা অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে সেনাবাহিনী ব্যতীত পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।]
গুরুত্ব: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী সাংবিধানিক উপায়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সমগ্র বাঙালি জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এর পর অসহযোগ আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনের পথ বেয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ লাভ করে। চারদিকে 'জয় বাংলা', তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, 'পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা', 'জনগণের একদফা বাংলার স্বাধীনতা', 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর' প্রভৃতি স্লোগানে বাঙালি জনগণ মুখরিত করে তোলে। কিন্তু এ সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আলাপ-আলোচনার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে এবং ২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর পৈশাচিক গণহত্যা শুরু করে। এ সময় যে অনুপ্রেরণায় বাঙালি আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তা হলো ৭ মার্চের ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন এবং দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সৃষ্টি হয় বাঙালির মননে দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। অনেক প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ তার যাত্রা আরম্ভ করে।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Read more