Historical Agartala Case (State Verses Sheikh Mujibur Rahaman and others)- 1968
ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা (Historical Agartala case)
বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি আইয়ুব খানের পক্ষে মেনে নেওয়া কখনো সম্ভব ছিল না। তাই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক চেতনা, স্বাধিকার আন্দোলন। এ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য আইয়ুব খান-মোনেম * খান নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে এক মামলা দায়ের করে। শাসকগোষ্ঠীর অভিযোগ ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় এক ষড়যন্ত্র করেছে। আগরতলা স্থানটির নাম অনুযায়ী এই মামলার নাম দেওয়া হয় আগরতলা মামলা। সরকারি নথিতে দায়েরকৃত এ মামলাকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য মামলা নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন হাইকোর্টের বিচারপতিকে নিয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ছাত্র-জনতা এই মামলাকে পিণ্ডি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করে। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরও অনেক জন সৎসাহসী বাঙালি অফিসারকে দেশের শত্রু বলে চিহ্নিত করে তাঁদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও প্রতিবাদী আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল এ মামলার মুখ্য উদ্দেশ্য। ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮, দায়ের করা এ মামলার আসামিদের নামের তালিকা:
১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (গোপালগঞ্জ)
২। লে. কর্নেল মোয়াজ্জেম হোসেন (পিরোজপুর, বরিশাল)
২৩। স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান (মাদারীপুর)
৪।এল, এস. সুলতান উদ্দিন আহমদ (নোয়াখালী)
১৫। এল, এস. নূর মোহাম্মদ (ঢাকা)
৬। জনাব আহমেদ ফজলুর রহমান সি. এস. পি. (ঢাকা)
৭। ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ (নোয়াখালী).
৮। প্রাক্তন কর্পোরাল এ. এস. আবদুল সামাদ (বরিশাল)
৯। প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন (বরিশাল, বাকেরগঞ্জ)
১০। জনাব রুহুল কুদ্দুস সি. এস. পি. (খুলনা)
১১। ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (বরিশাল সদর)
১২। ভূপতিভূষণ চৌধুরী-আনিক চৌধুরী (চট্টগ্রাম)
১৩। বিধান কৃষ্ণ সেন (চট্টগ্রাম)
১৪। সুবেদার আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)
১৫। হাবিলদার মুজিবুর রহমান ই. পি. আর. টি. সি. ক্লার্ক (কুমিল্লা)
১৬। ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুর রাজ্জাক (কুমিল্লা)
১৭। সার্জেন্ট জহিরুল হক (নোয়াখালী)
১৮। মোহাম্মদ খুরশীদ (ফরিদপুর)
১৯। কে. এম. শামসুর রহমান সি. এস. পি. (ঢাকা)
২০। রিসালদার এ. কে. এম. শামসুল হক (ঢাকা)
২১। হাবিলদার আজিজুল হক (বরিশাল, ভোলা)
২২। মাহফুজুল বারী (নোয়াখালী)
২৩। সার্জেন্ট শামসুল হক (নোয়াখালী)
২৪। মেজর ডা. শামসুল আলম (ঢাকা)
২৫। ক্যাপ্টেন মোঃ আবদুল মুত্তালিব (ময়মনসিংহ)
২৬। ক্যাপ্টেন শওকত আলী (ফরিদপুর)
২৭। ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা (বরিশাল সদর)
২৮। ক্যাপ্টেন এ. এস. এম নুরুজ্জামান (বরিশাল)
২৯। ফ্লাইট সার্জেন্ট আবদুল জলিল (ঢাকা)
৩০। মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী (সিলেট)
৩১। লে. এম. এস. এম. রহমান (যশোর)
৩২। সুবেদার এ. কে. এম. তাজুল ইসলাম (বরিশাল, ভান্ডারিয়া)
৩৩। মোহাম্মদ আলী রেজা (কুষ্টিয়া)
৩৪। ক্যাপ্টেন ডা. খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ)
৩৫। লে. আবদুর রউফ (ময়মনসিংহ)
আগরতলা মামলার কারণ (Causes of Agartala case)
আগরতলা মামলা বাঙালি জনগণ ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও দমননীতিরই বহিঃপ্রকাশ। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ হিসেবে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে তাকে ও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার হীন ষড়যন্ত্রে এ মামলা দায়ের করা হয়। নিম্নে আগরতলা মামলার কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো:
১. ৬ দফা দাবি নস্যাৎ: ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত ৬ দফা দাবি নস্যাৎ করাই ছিল আগরতলা মামলার মুখ্য উদ্দেশ্য। ৬ দফার আন্দোলন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হলে স্বৈরাচারী আইয়ুব-মোনায়েম সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করার জন্য আগরতলা মামলার নীলনকশা (Blueprint) তৈরি করে।
২. শেখ মুজিবসহ কতিপয় দেশ প্রেমিককে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা: ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আইয়ুব
সরকার পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনয়ন করে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবসহ কতিপয় সৎসাহসী দেশ প্রেমিককে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা।
৩. বাঙালিদের মধ্যে একাত্মতার সংকট সৃষ্টি: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবল সমর্থন ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে যে একাত্মতার সৃষ্টি হয় তাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই মামলার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে বাঙালিদের মধ্যে একাত্মতাবোধের সংকট সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হয়।
৪. পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত শক্তিশালী করা আগরতলা মামলার একটি অন্যতম কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত আরও শক্তিশালী করা। এজন্য তারা ঘৃণ্য আগরতলা মামলার আশ্রয় গ্রহণ করে শেখ মুজিবকে 'পাকিস্তানের শত্রু' এবং 'ভারতের দালাল' বলে প্রচার চালায়।
৫. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন নস্যাৎ করা আগরতলা মামলার একটি কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দীর্ঘদিনের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন নস্যাৎ বা বানচাল করা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানে গড়িমসি করে আসছিল।
৬. শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখা: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর শাসন ও শোষণের যে স্টিম রোলার চালিয়ে আসছিল তা অব্যাহত রাখাও এ মামলার অন্যতম কারণ বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
৭. গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করা: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানে অবাধ, সুষ্ঠু, সাধারণ নির্বাচনে অনীহা প্রকাশ করে আসছিল। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হবে বলে তাদের মনে শঙ্কা ছিল। এই মামলার এটিও অন্যতম কারণ।
৮. বাঙালিদের দাবিয়ে রাখা বাঙালিরা তাদের ন্যায্য অধিকারে সব সময় সোচ্চার ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু
করে যখনি পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ওপর জুলুম করেছে তখনই বাঙালিরা রুখে দাঁড়িয়েছে। ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে যে জনস্রোত সৃষ্টি হয়েছিল তা থামিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার জন্যই নেতৃস্থানীয় লোকদের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয় বলে অনেকে মনে করেন।
মামলার বিচার কার্যক্রম
আগরতলা মামলার আসামিদের ১৮ জানুয়ারি 'দেশরক্ষা আইন' থেকে মুক্তি দিয়ে আর্মি, নেভি এন্ড এয়ারফোর্স এ্যাক্ট আইনে গ্রেফতার দেখিয়ে কেন্দ্রীয় জেল থেকে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়। এ মামলার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য মে মাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। জুন মাসে বিচার শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি এস. এ. রহমান। বিচারের শুরুতে আসামিগণ নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। শেখ মুজিবুর রহমান একে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাদের উপর অমানসিক অত্যাচার করে। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণে এই মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এটা যে পাকিস্তানের শাসকচক্রের হীন ষড়যন্ত্র ছিল তা বের হয়ে আসে। এই মামলা সাজিয়ে আইয়ুব খান চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন। এই মামলার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বলাবাহুল্য এ মামলা আইয়ুব খানের জন্য আত্মঘাতী হয়। প্রকৃতপক্ষে এই মামলাই তার পতন ডেকে আনে। বাঙালি জাতির মধ্যমণি শেখ মুজিবুর রহমানকে এই মিথ্যা মামলার আসামি করার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য নেতাদের মুক্তির জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। সরকার এই আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশ, ই.পি.আর. ও সামরিক বাহিনীকে তলব করে। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে এবং ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে এ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
আগরতলা মামলার গুরুত্ব (Importance of Agartala case)
আগরতলা মামলার গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ মামলার মধ্য দিয়ে পাক সাময়িকচক্রের হীন উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে যায় এবং পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। নিম্নে আগরতলা মামলার গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
প্রথমত, জনগণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের কথা বিশ্বাস করার পরিবর্তে এ মামলাকে বাঙালিদের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করে। ফলে তাদের দের প্রতি বাঙালিদের অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হয়।
তৃতীয়ত, ৬ দফা ও ১১ দফা দাবি পূর্ব বাংলার সত্যিকারের গণদাবিতে পরিণত হয় রিণত হয়।
চতুর্থত, এ মামলাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। সরকার এ আন্দোলন নস্যাৎ
করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সমগ্র দেশে ১৪৪ ধারা জারি করে। ।। কিন্তু পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসে। পুলিশের গুলিতে আসাদ নিহত হলে (২০ জানুয়ারি) এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
পঞ্চমত, এ মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আইয়ুব বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হয়। আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে সরে দাঁড়ান। এটা ছিল বাঙালিদের বিরাট বিজয়।
সর্বোপরি এ মামলা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয় এবং সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Read more