Mass Upsurge of 1969
তৎকালীন পাকিস্তানের ইতিহাসে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, আমলা ও সামরিক চক্রের কর্তৃত্ব বিলোপের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ৮টি বিরোধী দল ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি একত্রিত হয়। তারা 'গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি জোট গঠন করে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে পাকিস্তানের মসনদ থেকে বিদায় নিতে হয় ১৯৫৮ সালের অক্টোবর বিপ্লবের নায়ক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে।
পটভূমি
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বস্তুত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সকল গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে ও সামরিক স্বৈরাচারের অবসান এবং অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত তীব্র গণআন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। জেনারেল আইয়ুব
খানের এক দশকের সামরিক শাসনের নিগ্রহ ও দমনপীড়ন, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দৈরত্বের অবসান, আগরতলা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, সর্বোপরি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের গোড়াপত্তন হয় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ৬ দফা ঘোষণার মাধ্যমে। এ গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ- ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরের ৬ আরিখ থেকে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখের মধ্যে সংঘটিত হয়। এ সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে গণআন্দোলন শুরু হলেও পূর্ব পাকিস্তানে এর তীব্রতা ছিল বেশি। ৬ দফার ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালিরা উত্তাল হলে তাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন, জেলজুলুম। ১৯৬৮ সালে আগরতলা মিথ্যা মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এতে পূর্ব বাংলার জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সৃষ্টি হয় গণঅভ্যুত্থান।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুটি গ্রুপ এবং জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের একাংশ নিয়ে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি একটি সর্বদলীয় 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। দেশে যখন নেতৃত্বের অভাব ঠিক তখনই 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য এ সংগ্রাম পরিষদ ৬ দফাকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দাবি সম্মিলিত ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
ছাত্রসমাজের এগারো দফা
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের উত্তাল দিনে ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি জনগণের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় যখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, তখন ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে পেশ করা হয় ১১ দফা কর্মসূচি। ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ:
দফা-১: আত্মনির্ভরশীল কলেজগুলোকে প্রাদেশিকীকর প্রাদেশিকীকরণের নীতি প্রত্যাহারে জগন্নাথ কলেজকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা, শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, সরকারি কলেজসমূহে নৈশ বিভাগ চালু, ছাত্রদের বেতন ৫০% হ্রাস করা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান, শিক্ষকদের বাকস্বাধীনতা দান ও বেতন বৃদ্ধি, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ছাত্রদের বাসে ভ্রমণে ভাড়া হ্রাস করা, ছাত্রাবাসে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান, জাতীয় শিক্ষা কমিশন ও হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিল ইত্যাদি।
দফা-২: প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন করা।
দফা-৩: ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা।
দফা-৪: পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষুদ্র প্রদেশগুলোর জন্য স্বায়ত্তশাসন ও একটি সাব-ফেডারেশন গঠন করা।
দফা -৫: ব্যাংক, বিমা, পাটের ব্যবসা ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা।
দফা-৬: কৃষকদের কর ও খাজনা হ্রাস করা।
দফা-৭: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, বোনাস, চিকিৎসা, বাসস্থান, ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান।
দফা-৮: পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার।
দফা-৯:জরুরি ব্যবস্থামূলক আইন, নিরাপত্তা আইন এবং অন্যান্য দমনমূলক আইন বাতিলকরণ।
দফা-১০: সিয়াটো, সেন্টো ও পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল এবং নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি গ্রহণ।
দফা-১১: আগরতলা মামলায় আটক আসামি সহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দান।
ঘটনাবলি
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ও আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবির ভিত্তিতে ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধ হলে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আন্দোলন ও ছাত্র সমাজের আন্দোলন একই মোহনায় মিলিত হলে এক প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন শুধু পূর্ব বাংলায়ই তীব্র আকার ধারণ করেনি পশ্চিম পাকিস্তানেও এর ঢেউ লাগে। সেখানে আইয়ুব খান বিরোধী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৮ জানুয়ারি থেকে ছাত্ররা তাদের ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ঐ দিন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আহূত হরতাল জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে। সরকার ১১ দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। ১৪৪ ধারা জারি করেও আন্দোলনের ধারাকে প্রতিহত করা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে শুরু হয় পুলিশি নির্যাতন। ছাত্র বিক্ষোভের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র জনতার ওপর পুলিশের নির্যাতন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিলের উপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হন (২০ জানুয়ারি দিনটি পরবর্তীতে আসাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে)। দিন দিন আন্দোলনের গতি আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং তা গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। পুলিশ কর্তৃক ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট, মিছিল চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গণবিক্ষোভ দমন করার জন্য শাসকগোষ্ঠী সেনাবাহিনী তলব করে এবং বিভিন্ন জায়গায় কারফিউ জারি করে। সেনাবাহিনী প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালিয়েও এ দুর্বার আন্দোলন স্তব্ধ করতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানেও এ সময় স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। সমগ্র দেশে অরাজকতা দেখা দেয়। অবশেষে আইয়ুব খান গণআন্দোলনের নিকট নতি স্বীকার করেন।

দেশের অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে তিনি জাতীয় সমস্যাগুলো আলোচনার জন্য বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন (১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ খ্রি.)। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও আগরতলা মামলায় আটক। সুতরাং তাকে ছাড়া আলোচনা বৈঠক নিরর্থক। কিন্তু আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করলে শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে মাওলানা ভাসানীও গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। সমগ্র দেশব্যাপী আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি উঠে। ইতোমধ্যে দুটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলে। আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দী অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনতা তখনই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মামলার প্রধান বিচারকের বাড়িসহ কয়েকজন মন্ত্রীর বাড়ি, গাড়ি ও জনস্বার্থ বিরোধী প্রতিটি অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। পরদিন সংবাদ পাওয়া গেল যে, ১৭ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার ড. শামসুজ্জোহাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ সংবাদে সারা দেশে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আন্দোলনের প্রচণ্ডতা লক্ষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ঘোষণা করেন যে, তিনি আগামী নির্বাচনে (১৯৭০ খ্রি.) আর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন না। গণদাবিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানকে বরখাস্ত করেন এবং তদস্থলে ড. এম.এন হুদাকে নিয়োগ করেন।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যরা কারাগার থেকে বিনাশর্তে মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিকে রেসকোর্স ময়দানে এক গণসংবর্ধনা দান করে। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে এ জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার নিপীড়িত জনগণের জন্য তার আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ 'বঙ্গবন্ধু' খেতাবে ভূষিত করা হয়। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় জনগণের প্রতি তীব্র কৃতজ্ঞতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি যোগদান করবেন এবং ছাত্রদের ১১ দফা ও আওয়ামী লীগের ৬ দফার ভিত্তিতে আলোচনা চালাবেন। তাঁর দাবি অগ্রাহ্য হলে তিনি দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন গড়ে তুলবেন।
১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠক বসে। Democratic Action Committee-এর প্রতিনিধিগণ এবং বিচারপতি মুর্শেদ ও এয়ার মার্শাল আজগর খানের মতো স্বতন্ত্র নেতৃবৃন্দও এতে যোগ দেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খান এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এতে যোগদান করেননি। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সকল আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। বৈঠকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন না থাকায় শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠক বর্জন করেন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ইতোমধ্যে গণআন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। দেশের নানা স্থানে অরাজনৈতিক কার্যকলাপ ও হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। আইন ও প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির প্রচণ্ডতা লক্ষ করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নিকট ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনীতি থেকে সড়ে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের শাসনতন্ত্র ও জাতীয় পরিষদ বাতিল ঘোষিত হয়। একই সাথে দীর্ঘ দশ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে।
১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে যেসব ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তাদের সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬)
মজলুম জননেতা নামে খ্যাত মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ শরাফত আলী খান একজন নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক। মাতা মজিরন বিবি। তার বাল্য নাম চেকা মিয়া। বাল্যকালে তিনি ইরাক থেকে আগত পীর সৈয়দ নাসির উদ্দীন বোগদাদীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন এবং তার পরামর্শে তিনি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এখানে শিক্ষালাভের সময় তিনি দেশপ্রেমের দীক্ষা পান।
টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তৎকালীন জমিদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস গুপ্তের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেন। এ সময় তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং দশ মাস কারাদণ্ড ভোগ করেন। জমিদার বিরোধী আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়ে জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চলে যান আসামে। সেখানে গিয়েও তিনি নির্যাতিত কৃষক শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে আসামের ধুবড়ি জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে আয়োজিত বিশাল জনসভায় চরের বাঙালি কৃষক জনতা তাকে 'ভাসানী' উপাধিতে ভূষিত করে। সেই থেকে তিনি হলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। মজলুমদের প্রতি যেখানেই জুলুম হয়েছে সেখানেই তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। সে কারণেই তাকে মজলুম জননেতা বলা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি আসামে আট বছর জেল খাটেন।
১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। একই বছর আসামে বাঙালি নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে 'লাইনপ্রথা' চালু হলে এই প্রথা বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন (২২ ও ২৩ মার্চ, ১৯৪০)। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯৪৯-১৯৫৭) এবং বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান হন যুগ্ম সম্পাদক। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের নিকট তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী মানুষ। ঐ বছর অর্থাৎ ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরুদ্ধে ভূখা মিছিলের নেতৃত্ব দিলে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলে তিনি আবারও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি এবং যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব সাফল্যে তার অবদান অপরিসীম।
মাওলানা ভাসানী তার দূরদর্শিতা দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের হাত থেকে বাঙালিদের বাঁচা সম্ভব নয়। তাই তিনি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দেই পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী "পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি" বাতিলের দাবি জানান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী সে দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন (১৮ মার্চ, ১৯৫৭)। একই বছর তার নেতৃত্বে ২৫ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে "ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি" (ন্যাপ) গঠিত হয় এবং তিনি হন এর সভাপতি। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি চীনের বিপ্লব দিবস (১ অক্টোবর)-এর উৎসবে যোগদানের জন্য পিকিং যাত্রা করেন। সেখানে ৭ সপ্তাহ অবস্থানকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুং ও চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনা করেন।
১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে তখন স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান অপরিসীম। তিনি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর দেশব্যাপী 'প্রতিরোধ দিবস' এবং ৭ ডিসেম্বর হরতালের আহ্বান করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের তীব্রতায় ২২ মার্চ আগরতলার মামলা প্রত্যাহার এবং ২৫ মার্চ স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে বিভিন্ন জনসভায় তিনি বলেছিলেন, 'স্বাধীন বাংলাদেশ না দেখে তিনি মরবেন না।' এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানকে তিনি ওয়ালাইকুম সালাম বলে চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতার কথা জানিয়ে দেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২-এর ২২ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রবর্তন করেন এবং পত্রিকা প্রকাশ (সাপ্তাহিক হক কথা), বিভিন্ন সভা সমিতিতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দেশের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য সারা জীবন সংগ্রাম পরিচালনা করেন। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে তাঁর অবদান স্মরণীয়। রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। তিনি "দেশের সমস্যা ও সমাধান" (১৯৬২) এবং "মাও সেতুং-এর দেশ" নামে দুইখানা গ্রন্থ রচনা করেন। গোটা বাঙালিকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। তার মহা প্রস্থানে বাংলার রাজনীতিতে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তার প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাকে চিরতরে সমাহিত করা হয়। তার অমর বাণী, "অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয় অনাড়ম্বর যাপিত জীবন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সংগ্রাম করে অধিকার আদায় তার জীবনের এই তিন শিক্ষা আমাদের চলার পাথেয়।
আসাদুজ্জামান (১৯৪২---১৯৬৯)
আসাদুজ্জামান ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুন নরসিংদী জেলাধীন শিবপুর থানার ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্জ মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের। আসাদ ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে শিবপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) এবং ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বি. এ. অনার্স এবং ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিটি 'ল' কলেজে এল, এল, বি.তে ভর্তি হন। এ সময় তিনি ছিলেন তৎকালীন কৃষক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং মাওলানা ভাসানীর রাজনীতির অনুসারী। সাংগঠনিকভাবে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের 'ঢাকা হল' বর্তমান 'শহিদুল্লাহ হল' শাখার সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের 'বিরুদ্ধে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে এক ছাত্রসভা আহ্বান করে। সভায় শহরের

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্র যোগদান করে। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে একটি মিছিল বের করে। মিছিলের এক অংশ মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তা ধরে চাঁনখাঁর পুলের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে আসাদের বক্ষ বিদীর্ণ হয়। সাথে সাথে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে। এ হত্যাকাণ্ডে ২১ জানুয়ারি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয় এবং পল্টন ময়দানে এক বিশাল গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ২২ ও ২৩ জানুয়ারি 'শোক দিবস' এবং ২৪ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির শেষ দিনটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। ফলে এ ঘটনার মাত্র দুমাসের মধ্যে আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা ও তাঁর সরকারের পতন ঘটে।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনে একুশের মতোই এক গৌরবময় অর্জন। এই অর্জনের অন্যতম কাণ্ডারি মৃত্যুঞ্জয়ী ছাত্র নেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনিই উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ।
মতিয়ুর রহমান (১৯৫৭-১৯৬৯)
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে ১২ বছরের যে শিশুটি শহিদ হন তিনি হলেন মতিযুর রহমান। ২৪ জানুয়ারি ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মতিযুর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার আলী মল্লিক একজন ব্যাংক কর্মচারী। মতিয়র রহমান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জানুয়ারি আসাদ হত্যার প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা নগরী মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালালে ৬ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়। এই হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী ধর্মঘট ডাক দেয়। ধর্মঘটের আহ্বানে সারা দিয়ে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ছাত্র-জনতার 'উপর পুলিশ গুলি চালালে মতিয়ুর রহমান শহিদ হন (২৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯)। 'অকুতোভয় এই কিশোর মিছিলের পুরোভাগে থেকে বাঙালিদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তার আত্মত্যাগে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। মতিযুরের জীবন উৎসর্গ বৃথা যায়নি। গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। গণ আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে (২৫ মার্চ, ১৯৬৯)। মতিয়র বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম শহিদ।

সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৯৩৫-১৯৬৯)
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশ যখন উত্তাল তখন পাক বাহিনী অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে আগরতলা মামলার ১৭ নং আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করে (১৫ ফেব্রুয়ারি)। সার্জেন্ট জহুরুল হক ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করার পর ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন। ক্রমে সার্জেন্ট পদে উন্নীত হন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে' সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গ্রেফতার হন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক হন। এ সম্পর্কে প্রেসনোটে বলা হয়, "গত মাসে (ডিসেম্বর, ১৯৬৭) পূর্বপাকিস্তানে উদঘাটিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এদের গ্রেফতার করা হয়েছে।" সরকার এই ষড়যন্ত্রকে "আগরতলা ষড়যন্ত্র" বলে অভিহিত করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে এ মামলার ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় ১৭ নম্বর আসামি করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হককে।

প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকার এই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। মামলার শেষ তারিখ ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। আইয়ুব খান যখন রাজনৈতিক দলগুলোকে গোল টেবিল বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী অবস্থায় একটি ক্ষুদ্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাবিলদার মনজুর শাহ কর্তৃক নিহত হন (১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)। তাঁর এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বেগবান হয়। আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। তাঁর আত্মত্যাগ পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে। মান্দোলনকে শানিত করে। সার্জেন্ট জহুরুল হক বাঙালি জাতির সূর্য সন্তান।
ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহা (১৯৩৪-১৯৬৯)
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে আর একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহাকে হত্যা। এ হত্যাকাণ্ড দিয়ে পাক সেনাবাহিনী পৈশাচিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
ড. মুহম্মদ শামসুজ্জোহা ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে বাকুড়া জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে আই. এসসি পাস করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে বি. এসসি অনার্স এবং ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এম. এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে রিডার পদে উন্নীত হন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ছাত্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ

করেন। তিনি ছাত্রদের বলেছিলেন, "সেনাবাহিনী যদি গুলি চালায় তাহলে আমার বুকের উপর দিয়ে প্রথমে চালাতে হবে, তোমাদের নয়।" তিনি নিজের জীবন দিয়ে একথা প্রমাণ করে গেছেন। আন্দোলন চলা অবস্থায় ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এই অকুতোভয় সেনানীকে হত্যা করে। তাঁকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে চিরতরে সমাহিত করা হয়। তার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ড. শামসুজ্জোহা হল'-এর নামকরণ করা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে জীবন দিয়ে তিনি যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা বাঙালি ছাত্র-শিক্ষকদের চিরকাল অনুপ্রেরণা যোগাবে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরের যুক্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যতগুলো 'ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১৯৬৯ সালের 'গণঅভ্যুত্থান' একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার গণমানুষের বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় এটা প্রমাণ করে যে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি চায়। এ আন্দোলনের বিশেষ ফলাফল ও তাৎপর্য ছিল-
(ক) রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার: ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সর্বদলীয়
ছাত্র সংগ্রাম কমিটি' (Student Action Committee-SAC) এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি (Democratic Action Committee -DAC)। SAC এর ১১ দফা এবং DAC-এর ৮ দফার ভিত্তিতে গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়। ১১ দফা ও ৮ দফার অন্যতম দাবি ছিল সকল রাজবন্দিদের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার। এছাড়া সভা-সমাবেশে, মিছিলে-স্লোগানে গণমানুষের দাবি ছিল এটা। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানের প্রবল জনদাবির মুখে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ শে'ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়।
(খ) গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান: গণঅভ্যুত্থানের চাপে পড়ে আইয়ুব খান ১৭ই ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকের ঘোষণা দেন। কিন্ত তখনও শেখ মুজিবুর রহমান এর নিঃশর্ত মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য ২২শে ফেব্রুয়ারি রাজবন্দিদের মুক্তির পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি উক্ত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকার মূলত গণআন্দোলনে নতি স্বীকার করে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করতে বাধ্য হয়।
(গ) আইয়ুব ও মোনায়েমের পতন: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ১৯৫৮ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খান জোর করে পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নরের পদ গ্রহণ করেন। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২০ শে মার্চ বাংলার দ্বিতীয় মীর জাফর নামে খ্যাত মোনায়েম খান অপসারিত হয়। ২৫ শে মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
(ঘ) স্বৈারাচার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি: ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের মাঝে স্বৈরাচার বিরোধী
আন্দোলন জাগ্রত হয়। জেনারেল আইয়ুব খান একজন স্বৈরাচারী শাসক হলেও প্রথম দিকে তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি। আইয়ুব খান তা কঠোরভাবে দমন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ঊনসত্তরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল সে জোয়ারে আয়ুব-মোনায়েমের গদি ভেসে যায়।
(ঙ) অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপরিচিতি: ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণার মাধ্যমে শেখ
মুজিবুর রহমান গণমানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। এ আন্দালনে এটা প্রমাণিত হয় যে শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের কত প্রিয় নেতা এবং এও প্রমাণিত হয় যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আগরতলা একটি ষড়যন্ত্র মামলা। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম একটি দাবি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি, তিনি এবং অন্যান্য রাজবন্দিরা ২২ শে ফেব্রুয়ারি নিঃশর্ত মুক্তি লাভ করেন। ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির (SAC) উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ দিন প্রায় ১০ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' (বাংলার বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত *করেন। এভাবে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু ও গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা।
(চ) বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃঢ়করণ ও এক্যবদ্ধকরণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রথম স্ফুরণহয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে এ জাতীয়তাবাদ আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান জাতীয়তাবাদ জাগ্রতর একটি চূড়ান্ত মাইলফলক। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে যায়।
(ছ) ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়েছিল তার প্রভাবেই ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
(জ) স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ব
প্রস্তুতি। এ আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে আইয়ুব খানের পতন হয়। আইয়ুব খানের এ পতন বাংলাদেশি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবেই সত্তর-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে। বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা যাতে হস্তান্তর করতে না হয় সেজন্য ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে। অর্জন করে হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতা। মূলত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্যই জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালিদের পরিচালিত যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান - ছিল সবচেয়ে ব্যাপক ও গণসম্পৃক্ত আন্দোলন। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পথ ধরেই বীর বাঙালিরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। অতএব, বাঙালি জাতির রাজনৈতিক বিকাশ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান একটি তাৎপর্যবাহী ঐতিহাসিক ঘটনা।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Read more