৭.৮ পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়

ইতিহাস ১ম পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

3

Surrender of Pak-army and Rise of Independent Sovereign Bangladesh

দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বাংলার সূর্য সন্তানরা ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে অস্ত্র কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে অস্ত্র দীর্ঘ ৯ মাসে বিভিন্ন রণাঙ্গনে গর্জে উঠে পাকবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমনি অবস্থায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ভারতের স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় যৌথবাহিনী। যৌথবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন ভারতের লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অতঃপর যৌথবাহিনী জল, স্থল, ও আকাশ পথে একযোগে প্রচণ্ড আক্রমণ করে পাকহানাদার বাহিনীকে একেবারে কাবু করে ফেলে। দিশেহারা

পাকবাহিনী পালাতে শুরু করে। এ সময় যৌথবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে তারা কোনো কিছু না ভেবেই দ্রুত রাজি হয়ে যান।

অবশেষে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩০ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লে. জে. এ.কে. নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ যৌথ বাহিনীর পক্ষে লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকবাহিনীর প্রধান আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী এবং যৌথবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। আর এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে। জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকায় বাংলাদেশ নামে একটি নবীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা ভুলণ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা হারিয়ে বাঙালি জাতি পরাধীনতার অথৈ জলে হাবুডুবু খেতে থাকে এবং একই সাথে স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রাখে। সে চেষ্টার সারথি হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন তিতুমীর, হাজী শরীয়তউল্লাহ, তাতিয়াতপি, লক্ষ্মীবাঈ, ক্ষুদিরাম, মাস্টার দ্যা সূর্যসেন, প্রীতিলতা প্রমুখ বীর বাঙালি। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমাদের জাতীয় জীবনে এটি শ্রেষ্ঠ অর্জন। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এবং শহিদদের প্রতি অকৃত্রিম বিনম্র শ্রদ্ধা রেখে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব পরিবেশে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করা হয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বহমান থাকবে ততদিন ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থাকবে। প্রতিবছর আসবে; প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা। লাল সবুজের বাংলাদেশে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। সে ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

আত্মসমর্পণের দলিল

"পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ পূর্ব রণাঙ্গণে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানের সকল সশস্ত্রবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্বীকৃত হচ্ছেন। এ আত্মসমর্পণ পাকিস্তানের সকল সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী এবং আধা-সামারিক ও বেসরকারি, সশস্ত্রবাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসব বাহিনীর সকলেই- যারা যেখানে আছে, সেখানকার নিকটস্থ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ ও সকল অস্ত্র সমর্পণ করবে।"
"এই দলিল স্বাক্ষরের সময় থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীনস্থ বলে বিবেচিত হবে। কোনো প্রকার অবাধ্যতা আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং যুদ্ধের স্বীকৃত ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গৃহীত হবে। যদি আত্মসমর্পণের কোনো শর্তের ব্যাখ্যা বা অর্থ সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।"
"লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এ আশ্বাস প্রদান করেছেন যে, আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি জেনেভা কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী একজন সৈনিকের প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং আত্মসমর্পণকারী সকল সামরিক ও আধা-সামারিক ব্যক্তির নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থার অঙ্গীকার প্রদান করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীনস্থ সেনাবাহিনী সকল বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান করবে।"

জগজিৎ সিং অরোরা। আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি
লেফটেন্যান্ট জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল
জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ সামরিক আইন প্রশাসক
ভারত-বাংলাদেশ বাহিনী পূর্ব রণাঙ্গন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড (পাকিস্তান)
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১

সারসংক্ষেপ

নিয়মিত বাহিনী: দক্ষ ট্রেনিং প্রাপ্ত মুজিবনগর সরকারের নির্ধারিত সরকারি বাহিনী হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত বাহিনী। এ বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৮,৬০০ জন। এদের সামরিক বেতন ভাতা দেওয়া হতো। এ বাহিনী নিয়েই ৩টি ফোর্স গঠন করা হয়।

স্বাধীন বাহিনী: নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ বাহিনী গড়ে ওঠে। দেশ স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এ সকল বাহিনী নিজেদের প্রচেষ্টায় অস্ত্র যোগার করে ট্রেনিং দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই সরকারের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এ বাহিনী যুদ্ধ করেছে এবং কৃতিত্ব রেখেছে। স্বাধীন বাহিনীর মধ্যে মুজিব বাহিনী, আফসারী বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী উল্লেখযোগ্য।
শাস্তি কমিটি: মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যে সংগঠনটির জন্ম হয় তা হলো শান্তি কমিটি। পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল টিক্কা খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জামায়েত ইসলাম কাউন্সিল মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন ইসলামি দলগুলোর সহায়তায় এ কমিটি গঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা মহানগরীর কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা খায়েরুদ্দিন ছিলেন ঢাকা জেলা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক। শান্তি কমিটি পাকবাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে।

বুদ্ধিজীবী দিবস: ২৫ মার্চ-এর কালরাত থেকে নয় মাসে পাকবাহিনীর নৃশংস হত্যার সর্বশেষ নজির ছিল ১৪ ডিসেম্বর বাংলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। মনীষী গোর্কি বলেছিলেন, মাছের যেমন পচন শুরু হয় মাথা থেকে, তেমনি কোনো জাতির অধঃপতনের সূত্রপাত হয় মস্তিষ্ক থেকে। গোর্কির এই উক্তি অনুসরণ করেই সম্ভবত পাকবাহিনী বাংলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যাতে বাঙালিকে মেধাশূন্য করা যায়। পাকবাহিনীর এই পরিকল্পনায় সহযোগিতা করেছিল এ। দেশীয় আলবদর, আলশামস এবং রাজাকার বাহিনী। বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি করে তাদের ধরে আনা হয় ঢাকার মিরপুরের শিয়ালবাড়ি, মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার বদ্ধ ভূমিসহ বিভিন্ন স্থানে এবং তাদের হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর লাশের স্তূপে যাদের পাওয়া গিয়েছিল তাদের সকলের হাত-পা, চোখ বাঁধা ছিল। বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ স্মরণ রাখার জন্য স্বাধীনতার পর ১৪ ডিসেম্বর (বুদ্ধিজীবী হত্যার দিনটি) বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে সরকার ঘোষণা করে।

বেসরকারিভাবে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের যে তালিকা পাওয়া যায় তাতে ১১০৯ জন বুদ্ধিজীবীর কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৯ জন শিক্ষাবিদ, ৪১ জন আইনজীবী, ৫০ জন চিকিৎসক, ১৩ জন সাংবাদিক, ১৬ জন কবি-সাহিত্যিক। শিক্ষাবিদদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ফজলুর রহমান, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্যসহ ১৭ জন। চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আলিম চৌধুরী, শামসুদ্দীন প্রমুখ। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, নিজামুদ্দিন আহমদ প্রমুখ। আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, নাজমুল হক সরকার, আবদুল জব্বার প্রমুখ। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। প্রকৌশলী সামসুদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সেকান্দার হায়াত চৌধুরী এবং গীতিকার আলতাফ মাহমুদ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ: ৩০ লক্ষ শহিদ এবং ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা।
বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকায় পরিচিত একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি
রাষ্ট্র, একটি পতাকা ও. বাঙালি জাতির সম্মান। তাদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার সাভারের
নবীনগরে নির্মিত করেছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ৮৪ একর আয়তনের ওপর নির্মিত সৌধটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট
জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সৌধটির শুভ উদ্বোধন করেন। ৭টি ফলকে ১৫০ ফুট বা ৪৬.৫০ মিটার উচ্চতার
সৌধটির স্থপতি সৈয়দ মাঈনুল হোসেন। ত্রিভুজাকৃতির সৌধটি নির্মাণে কংক্রিট ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। জাতীয়
স্মৃতিসৌধটির ৭টি ফলকের তাৎপর্য হচ্ছে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে সাতটি পর্যায় (১৯৫২-এর ভাষা
আন্দোলন, ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ) আন্দোলন হয়েছিল তার এক একটি
আন্দোলনকে এক একটি ফলকের প্রতীক হিসেবে বুঝানো হয়েছে। অনেকে আবার ৭টি ফলককে রংধনুর সাত রং-এর
সাথে তুলনা করেন। জাতীয় দিবসগুলোতে জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতীয় বীর সন্তানদের
প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...