যুদ্ধ আর মৃত্যু যেন একে অন্যের প্রতিশব্দ। সভ্যতার আদি থেকেই ক্ষমতা দখল ও নানামুখী বিরোধের জের ধরে পৃথিবীতে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে মারা গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় ও ধ্বংসাত্মক অধ্যায়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে এ যুদ্ধ শুরু হয়, যা ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলে। এ যুদ্ধে গোটা পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানিকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রচেষ্টার ফলে এ সন্ধির প্রতি জার্মান জাতির আস্থাহীনতা, হিটলার কর্তৃক ভার্সাই সন্ধির শর্তগুলো ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা, ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট একনায়কতান্ত্রিক শক্তির উত্থান, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক মানসিকতার দ্বন্দ্ব, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ফ্যাসিস্ট তোষণনীতি ও জার্মানভীতি এবং সর্বোপরি ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর ঐক্যের ফল হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ; যে যুদ্ধের একদিকে ছিল জার্মানি, ইতালি ও জাপানের অক্ষশক্তি, অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের সমন্বয়ে মিত্রশক্তি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে অনেক উন্নত সামরিক অস্ত্র প্রয়োগের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা ছিল কয়েকগুণ বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর সকল মহাদেশ ও মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা স্থায়ী হয়েছিল ছয় বছর। এতে অংশ নিয়েছিল ৬১টি রাষ্ট্র। সবক'টি বৃহৎ রাষ্ট্র এতে যুক্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন এক সময় সংঘটিত হয়েছিল, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে অনেক ধরনের প্রক্রিয়াই বেশ জটিল হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তির গবেষণা, সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের উদ্ভাবনে বিশ্ব অনেকদূর এগিয়ে যায়। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। যুদ্ধের কারণও সামান্য নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অমীমাংসিত সমস্যা থেকে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বিকশিত আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল ঘটনাবলি থেকে এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধের বিস্ফোরণ ঘটে। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি ও জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে এ যুদ্ধের ভয়াবহতা ও তাণ্ডবচিত্র মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণসমূহ
১। জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনেক কারণের সমন্বয়ের ফলে সংঘটিত হয়। এর মধ্যে
জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বীজ নিহিত ছিল ভার্সাই সন্ধির অপমানজনক শর্তাদির মধ্যে। ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানিকে নিরস্ত্র করে তাকে তার শত্রুর সামনে অসহায় অবস্থায় রাখা হয়। মিত্রপক্ষ পরাজিত জার্মানির সব উপনিবেশ কেড়ে নেয় এবং তার উপর এক বিশাল ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তাকে আর্থিক দৈন্যের মধ্যে ঠেলে দেয়। জার্মানির কোনো বক্তব্য ও আরজি না শুনেই তাকে প্রচুর অপদস্থ ও হেনস্তা করার ব্যবস্থা করা হয়। সবদিক দিয়ে জার্মানিকে পঙ্গু ও দুর্বল করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর এরূপ দুরবস্থায় পরাজিত জার্মানরা সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়নি, বরং পরাজয়ের গ্লানি ও মিত্রশক্তির অপমানজনক আচরণ তাদের মনে এক অভূতপূর্ব আত্মচেতনা ও জাতীয়তাবোধের জন্ম দেয়। জার্মানরা ভার্সাই সন্ধি কখনো মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। ১৯২৪-২৫ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানিতে এক দারুণ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে সরকারের প্রতি জার্মানদের আস্থা হ্রাস পায় এবং নাৎসি দলের নেতৃত্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সমরবাদের সৃষ্টি হয়। নাৎসি আন্দোলন জার্মান জাতির মনে এক নতুন আশার সৃষ্টি করে এবং এক নতুন পথের সন্ধান দেয়। হিটলার নাৎসি দলের নেতা হিসেবে জার্মানির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জার্মানির আত্মনিয়ন্ত্রণের ও জাতীয়তাবাদের দাবির কথা ঘোষণা করলে জার্মানদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রবল আকার ধারণ করে। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া ও পোল্যান্ডের জার্মান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে জার্মানির অন্তর্ভুক্ত করতে চেষ্টা করলে ইউরোপের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংকটের সূত্রপাত হয়। জার্মানির সামরিক প্রস্তুতি এবং জার্মানি কর্তৃক একে একে রাইন অঞ্চল, অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া বলপূর্বক দখল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনের পথকে সুগম করে দেয়।
২.। শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতি আরেকটি প্রধান কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই জার্মানি, রাশিয়া, ইতালি ও জাপান ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপনিবেশগুলো কেড়ে নিয়ে সেগুলো ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জাপানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে জার্মানির উপনিবেশগুলো ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও আমেরিকার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। তখন বিশ্বের অধিকাংশ কাঁচামাল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার করতলগত হয় এবং এতে জার্মানি, জাপান, ইতালি বঞ্চিত হয়। ফলে বঞ্চিত তিন শক্তি বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপনে আগ্রাসী মনোভাব গ্রহণ করে। তদুপরি জার্মানি অতিমাত্রায় পররাজ্য গ্রাসে আগ্রহী হয়ে ওঠে। হিটলারের নেতৃত্বে মধ্য ইউরোপ গঠন, হস্তচ্যুত উপনিবেশগুলো আদায় এবং পূর্ব ইউরোপে অগ্রসর হয়ে উর্বরশীল রুশ-ইউক্রেন দখল করতে জার্মানরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়।
অন্যদিকে রাশিয়া ক্ষুদ্র বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো ও দক্ষিণ ফিনল্যান্ড কুক্ষিগত করতে এবং বলকানের ভেতর দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করার পরিকল্পনা নেয়। উপনিবেশ স্থাপনের ব্যাপারে ভার্সাই সন্ধি ইতালিকে হতাশ করে। ইতালি পূর্ব আড্রিয়াটিক উপকূল, ফরাসি উপনিবেশ আবিসিনিয়া এবং ফরাসি 'বন্দর জিবুতি দখলে আনতে চায়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে হল্যান্ডের আধিপত্য খর্ব করে সেখানে নিজের' প্রভাব স্থাপন করতে ইতালি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সুদূর প্রাচ্যে জাপানও এশিয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে বিতাড়িত করে সমস্ত এশিয়ায় নিজের প্রভুত্ব স্থাপন করতে উদ্যোগ, নেয়। ইতালি ইথিওপিয়া আক্রমণ এবং জাপান মাঞ্চুরিয়ায় অভিযান চালিয়ে তাদের উগ্র সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের পরিচয় দেয়। বিশ্বের কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের চরম সাম্রাজ্যবাদী নীতি বিশ্বকে উত্তেজিত করে তোলে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।
৩। ফ্যাসিস্ট তোষণনীতি: জার্মানি যখন নাৎসি দলের নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে ক্রমেই ভার্সাই চুক্তির
শর্তাদি লঙ্ঘন করতে থাকে, সে সময় ইঙ্গ-ফরাসি সরকারদ্বয় দুর্বলতা দেখালে নাৎসিদের সাহস ও আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি রাইন নদীর তীরবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চল দখল করলেও ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তাছাড়া জাপানের সাথে কমিউনিস্টবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর এবং জার্মানির সাম্যবাদবিরোধী প্রচারকার্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স অনেকটা প্রীতির চোখে দেখে। যুদ্ধের পূর্বে জার্মানি, ইতালি ও জাপান কর্তৃক বিভিন্ন অঞ্চল দখলের বিরোধিতা না করায় ফ্রান্স ও ব্রিটেনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। জার্মানির প্রতি ইঙ্গ-ফরাসি তোষণনীতি হিটলারকে আগ্রাসী করে তোলে।
৪। ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান: ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম
কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দ্বারা নিজেদের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অকার্যকারিতার ফলেই অনেক দেশে একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হয়। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে মুসোলিনি ইতালিতে ক্ষমতা দখল করেন। মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালি ছিল একটি চরম ফ্যাসিবাদী শক্তি। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও আন্তর্জাতিক মতামতের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে ফ্যাসিস্ট ও জঙ্গিবাদী নীতির বাস্তবায়নই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। মুসোলিনি কর্তৃক ইথিওপিয়া বা আবিসিনিয়া দখল, স্পেনের গৃহযুদ্ধে যোগদান, লীগ অব নেশনসের সাথে অসহযোগিতা, লীগ থেকে ইতালিকে প্রত্যাহার এবং আলবেনিয়া দখল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহ সৃষ্টি করে।
৫। স্পেনের গৃহযুদ্ধ স্পেনের গৃহযুদ্ধ ও ফ্যাসিস্ট শক্তির ঐক্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ। এ গৃহযুদ্ধে পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ ১৯৩৬-৩৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। অন্য সময় 'কী হতো বলা যায় না, কিন্তু তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এ গৃহযুদ্ধ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এর কারণ হলো, ইউরোপের অধিকাংশ বৃহৎ শক্তি স্পেনের অভ্যন্তরে সংঘটিত এ ব্যাপারটির সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের সক্রিয় হস্তক্ষেপ গৃহযুদ্ধের ফলাফলকে প্রভাবিত করে। E. H. Carr-এর ভাষায়, স্পেনের গৃহযুদ্ধ ইউরোপীয় গৃহযুদ্ধের অনেকগুলো আকৃতি ধারণ করে, যদিও তা স্পেনের মাটিতে সংঘটিত হয়। এ গৃহযুদ্ধ একদিকে যেমন ইউরোপে আরেকটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি অন্যদিকে জার্মানি ও ইতালির মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি ঘটায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া নামে খ্যাত স্পেনের গৃহযুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬। একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব। পৃথিবীর উন্নত ও প্রধান শক্তিগুলো তখন এ দুই পরস্পরবিরোধী, আদর্শের ভিত্তিতে দুটি বিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। জার্মানি, ইতালি, জাপান ইত্যাদি অক্ষশক্তি একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদের ধারক ছিল। আর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকা ছিল গণতন্ত্রের সমর্থক। সাম্যবাদী সোভিয়েত রাশিয়ার পরিস্থিতি ছিল অন্যরূপ। গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র উভয়ই ছিল রাশিয়ার সাম্যবাদের শত্রু। এ পরিস্থিতিতে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই বিশ্বে দুটি সামরিক জোট গড়ে ওঠে। একদিকে অপরিতৃপ্ত জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মধ্যে 'বার্লিন-রোম-টোকিও' ঐক্য গঠন এবং অপরদিকে মিত্র রাষ্ট্রবর্গের চুক্তি প্রকৃতপক্ষে বিশ্বকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেয়। তাই জার্মানি কর্তৃক আক্রান্ত পোল্যান্ডকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সমর্থন জানালে সে মুহূর্তেই বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়া আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে আসন্ন বিপদ এড়াতে জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি করে কিছুকাল যুদ্ধ থেকে মুক্ত থাকে। কিন্তু শেষে একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসী আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে সোভিয়েত রাশিয়া গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের (মিত্রপক্ষ) পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করতে বাধ্য হয়। মিত্রপক্ষেরও তখন রাশিয়ার সাহায্য ও সমর্থন একান্ত প্রয়োজন ছিল। সুতরাং দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বিশ্ব প্রধানত গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের আদর্শগত দ্বন্দ্বে দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। এ আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও শিবিরে বিভক্তিই যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল।
৭। ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর আগ্রাসন: ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর আগ্রাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ।
ইতালিতে ফ্যাসিস্ট, জার্মানিতে নাৎসি ও জাপানে জঙ্গিবাদের অভ্যুত্থান বিশ্বশান্তিকে বিপন্ন করে তোলে। ইতালি কর্তৃক আবিসিনিয়া দখল এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ ও আলবেনিয়া অধিকার আন্তর্জাতিক শাস্তি বিঘ্নিত করে। জাপান কর্তৃক ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল এবং ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয়বার চীন আক্রমণ এশিয়ার শান্তি বিঘ্নিত করে। এ শক্তিগুলোকে অনুসরণ করে নাৎসি জার্মানি ইউরোপে ব্যাপক আকারে আগ্রাসন শুরু করে। হিটলার কর্তৃক চেকোস্লোভাকিয়া দখল ছিল আগ্রাসনের চরম নজির।
৮। কমিউটার্নবিরোধী ঐক্য ও অক্ষশক্তির সৃষ্টি: ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে জার্মানি ও জাপানের মধ্যে
কমিউটার্নবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিটি ছিল ফ্রাংকো-সোভিয়েত চুক্তির বিরোধিতার ফল। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ইতালি এতে যোগদান করে। এর ফলে পৃথিবীর অনেকটা অংশ আবার দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে; যার একদিকে ছিল সংশোধনবাদী শক্তিসমূহ- জার্মানি, জাপান ও ইতালি, যা পরবর্তীকালে অক্ষশক্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিন-রোম-টোকিও জোট গঠিত হলে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে।
৯। মস্কো-বার্লিন অনাক্রমণ চুক্তি: পোল্যান্ড আক্রমণ করলে যাতে জার্মানিকে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে না হয়, সেজন্য হিটলার ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে আগস্ট রাশিয়ার সাথে দশ বছরব্যাপী একটি অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। রাশিয়ার প্রতি পশ্চিমা শক্তির ক্রমাগত বিরুদ্ধাচরণ এবং রাশিয়ার সে মুহূর্তে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা হিটলারকে চুক্তি স্বাক্ষরে সাহায্য করেছিল। মস্কো-বার্লিন অনাক্রমণ চুক্তির ফলে জার্মানির দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করার আশঙ্কা দূর হওয়ায় পোল্যান্ড আক্রমণ সহজতর হয়।
১০। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সংকট: ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের একাধিক আন্তর্জাতিক সংকট ক্রমাগত বিশ্বশান্তি ব্যাহত করে। জাপান ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে মাঞ্চুরিয়া এবং ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চীন আক্রমণ করলে লীগ অব নেশনস জাপানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়ত, ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি ভার্সাই সন্ধি ও লোকার্নো চুক্তি অগ্রাহ্য করে রাইন অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও লীগ অব নেশনস এক্ষেত্রে কোনোরূপ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে নীরব ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত, ইতালি ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ইথিওপিয়া এবং ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে আলবেনিয়া জোরপূর্বক দখল করলে লীগ অব নেশনস ইতালিকে তার আগ্রাসী নীতি থেকে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক সংকটে লীগ অব নেশনস আপস নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হলে এর কার্যকারিতা হ্রাস পায়। ফলে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়তে আর কোনো বাধা থাকল না।
প্রত্যক্ষ কারণ
জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ। হিটলার ডানজিগ জার্মানিকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং পূর্ব প্রুশিয়ার সাথে অবশিষ্ট জার্মানির সংযোগকারী এক ফালি ভূমি জার্মানিকে প্রদানসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনার জন্য একজন পোলিশ দূতকে জার্মানিতে পাঠানোর দাবি জানান। কিন্তু অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পোল্যান্ড নিরুত্তর থাকলে হিটলার ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। এর প্রতিবাদে ৩রা সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ৪ঠা সেপ্টেম্বর ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরু হয় চরম নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ দ্বিতীয়, বিশ্বযুদ্ধ।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যে পোল্যান্ড জার্মানির দখলে চলে যায়। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ডেনমার্ক ও নরওয়েতে জার্মান বাহিনী প্রবেশ করে। মে মাসে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ দখল করে জার্মান বাহিনী ফ্রান্স আক্রমণ করে। যুদ্ধ ক্রমেই ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়াসহ বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২২শে জুন ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে জাপান আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেকগুলো দেশ দখল করে নেয়। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই মে জার্মানি ও ২রা সেপ্টেম্বর জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে, যাতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি মানুষ, বারো গুণের বেশি সম্পদের ক্ষতি হয়।
কাজেই, অনেকগুলো কারণের সমন্বয় হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভার্সাই সন্ধির ব্যর্থতা, গণতান্ত্রিক শাসনের দুর্বলতা একদিকে যেমন ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর উত্থানে সাহায্য করেছিল, তেমনি গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক মানসিকতার দ্বন্দ্ব, তোষণনীতি সর্বোপরি জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতা ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর আকাঙ্ক্ষাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছিল; যা ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির পক্ষে শেষ পর্যন্ত সহ্য করা সম্ভব ছিল না, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
অক্ষশক্তি চুক্তি
Axis Power Treaty
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংকট ক্রমাগত বিশ্বশান্তি ব্যাহত করে। ইউরোপে একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব হলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ ও জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিবাদের উত্থান ঘটে। হিটলার ও মুসোলিনির মধ্যে আদর্শগত মিল থাকায় তারা উভয়েই একে অপরের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন। মুসোলিনি তার ফ্যাসিস্ট পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করার মাধ্যমে ভার্সাই সন্ধির অপ্রাপ্তিগুলো পাওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসর হন। হিটলার তার নাৎসি পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করার পন্থা অবলম্বন করেন। ভার্সাই শান্তিচুক্তির শর্ত একে একে ভঙ্গ করে জার্মানি ক্রমেই অনমনীয় ও উদ্ধত হয়ে ওঠে। তাদের উভয়ের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে এক দেশ আরেক দেশকে সমর্থন দিতে থাকে। আবিসিনিয়ার বিরুদ্ধে ইতালির আগ্রাসননীতি জার্মান কর্তৃক সমর্থিত হয়। আবার জার্মানি ভার্সাই সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করলে তা ইতালি কর্তৃক সমর্থিত হয়। মূলত ইতালি কর্তৃক আবিসিনিয়া দখল ও জার্মানি কর্তৃক রাইনল্যান্ড সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা উভয় দেশের আঁতাতের ফল। আবিসিনিয়া যুদ্ধের পরই জার্মানি-ইতালি মৈত্রী দৃঢ় হয়। রুশ বিপ্লবের কমিউনিজমভীতি উভয় রাষ্ট্রের মৈত্রীকে আরও ঘনিষ্ঠতর করে। ইতালি-জার্মানি মৈত্রী বন্ধনকে অক্ষশক্তি বলার কারণ হিসেবে মুসোলিনির ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য। মুসোলিনি বলেন, "এটি একটি অক্ষ যার চারদিকে শান্তির জন্য অনুপ্রাণিত ইউরোপীয় শক্তিবর্গ সহযোগিতা করতে পারে।" রোম-বার্লিন অক্ষশক্তি গঠনের ফলে এ দুটি দেশ একে অপরের অনুগামী হয়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে জার্মানি ও জাপান কমিউটার্নবিরোধী চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। উদ্দেশ্য রুশ বিপ্লবের সাম্যবাদের প্রভাব রোধ করা। পরবর্তী বছর ইতালিও এ জোটে শরিক হয়। সাম্যবাদের প্রভাব রোধকল্পে এ তিনটি দেশের কমিউটার্নবিরোধী চুক্তি 'রোম-বার্লিন-টোকিও' চুক্তি নামে পরিচিত। ইতালি এ চুক্তি গ্রহণ করায় অক্ষশক্তি চুক্তি সম্পূর্ণ হয়। অক্ষশক্তি মূলত একটি সামরিক জোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া, ফিনল্যান্ড প্রভৃতি দেশ অক্ষশক্তির সহযোগী হয়। অক্ষশক্তির সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও ঔদ্ধত্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি কারণ।
মিত্রশক্তি জোট
Allied Force
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নানা পটভূমিকায় যে ঐক্য গড়ে ওঠে তা 'মিত্রশক্তি জোট' নামে পরিচিত, যা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালীন সৃষ্ট 'ত্রিশক্তি আঁতাত'-এর বর্ধিত রূপ। মূলত অক্ষশক্তির আগ্রাসনমূলক ভীতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় মিত্রশক্তি জোটের উদ্ভব হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক সংকট ক্রমাগত বিশ্বশান্তি ব্যাহত করে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের নিজ নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে জোটবদ্ধ হয়। একক কোনো সন্ধি চুক্তি দ্বারা এ মিত্রশক্তি জোটের সৃষ্টি হয়নি। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, আবার কখনো ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এ জোট সৃষ্টির সূচনা করে। যেমন- ইঙ্গ-ফরাসি মৈত্রী জোট হয় মূলত ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের আগ্রাসন থেকে বাঁচার অভিপ্রায় নিয়ে। ইঙ্গ-ফরাসি মৈত্রী জোট ইতালি ও জার্মানির আগ্রাসননীতির বিরুদ্ধে শুধু নীরব দর্শকই ছিল না, তোষণনীতি গ্রহণ করে। যার দরুন জার্মানির ঔদ্ধত্য আরও বাড়ে। এ রকম পটভূমিকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মিত্র খুঁজতে শুরু করে। ক্ষুদ্র আঁতাতের রাষ্ট্রগুলো ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে পাশে না পেয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করে। পোল্যান্ডের সাথেও তারা মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বলকান অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোও তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে পারস্পরিক জোটবদ্ধ হয়। শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবর্তে ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক তৎপরতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে কাছে আনে। হিটলারের ক্ষমতা লাভের পর যুক্তরাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে সমর্থন দিলে সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মিলন হয়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, অথচ হিটলার এ চুক্তি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া আক্রমণ করে বসেন। ফলে রাশিয়া-ইংল্যান্ড মৈত্রী জোটের উদ্ভব হয়। এ জোট যুগ্মভাবে জার্মানির আক্রমণ প্রতিহত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এদিকে পূর্বেই রাশিয়া ফ্রান্সের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। ফলে ইউরোপে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সাথে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার মিত্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এদিকে দূর প্রাচ্যে জাপানের নৌ-শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং জাপান জার্মানি ও ইতালির সাথে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সহায়ক শক্তি ছিল। তাই জাপান কর্তৃক পার্ল হারবার আক্রান্ত হলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের পাশে এসে দাঁড়ায়। এভাবে দেখা যায় সময় বাড়ার সাথে সাথে মিত্রশক্তির সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকে। এরূপ নানা জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মিত্রশক্তি জোটের আত্মপ্রকাশ। এ জোটের উদ্দেশ্য ছিল হিটলার ও মুসোলিনির আগ্রাসন থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখা। উদ্দেশ্য মহৎ ছিল বলে এ জোটকে মহৎ মৈত্রী শক্তিও বলা হয়। রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটা ছিল অক্ষশক্তির বিপরীত রাজনৈতিক ও সামরিক জোট। মূলত মিত্রজোটের নেতৃত্বে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ প্রভৃতি দেশ ছিল মিত্র জোটের সহযোগী রাষ্ট্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টির জন্য হিটলারের দায়িত্ব
হিটলারই অনেকাংশে দায়ী ছিলেন। কেননা-
১। ভার্সাই সন্ধির সুস্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেন।
২। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতিন অঞ্চল দাবি করেন। সে অঞ্চলের অধিবাসীরা অধিকাংশই ছিল জার্মান জাতির লোক। সে বছর মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি সুদেতিন অঞ্চল জার্মানিকে প্রদান করতে চেকোস্লোভাকিয়াকে রাজি করায়। হিটলার চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করলে রাশিয়া-ফ্রান্সের যুগ্মভাবে জার্মান তোষণনীতিতে রাশিয়া স্বভাবতই সন্দিহান হয়ে ওঠে। ফলে হিটলারকে কোনো কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি এবং তার লিপ্সা ও দুঃসাহস আরও বেড়ে 'যায়।
৩। সুদেতিন অঞ্চল দখলের ছয় মাসের মধ্যেই হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশের উপর আধিপত্য বিস্তার করেন। এভাবে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের দুর্বলতার সুযোগে তার রাজ্যলিপ্সা দিন দিন বেড়েই চলে। এরপর তিনি লিথুয়ানিয়ার কাছ থেকে মেমেল বন্দর দখল করেন।
৪। হিটলার ক্রমে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে পোল্যান্ডের ডানজিগ বন্দর এবং পূর্ব রাশিয়া ও জার্মানির অন্য অংশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একখণ্ড সংযোগ ভূমি (করিডোর) দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড ও ফ্রান্স পরস্পর একটা আত্মরক্ষামূলক সামরিক সাহায্যের চুক্তি সম্পাদন করে। হিটলারের শক্তি বৃদ্ধিতে রাশিয়া সন্দিগ্ধ হয়ে জার্মানির সাথে এক 'অনাক্রমণ চুক্তি' স্বাক্ষর করে। হিটলারের পক্ষে এ চুক্তি ছিল এক চরম কূটনৈতিক সাফল্য। এভাবে শক্তি সমন্বয় করে জার্মানির নেতা হিটলার বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হন। এ সময় হিটলারের সশস্ত্র বাহিনী অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাহিনীতে পরিণত হয়। হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত ও অপমানিত জার্মানির হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেই ক্ষান্ত হননি, বিশ্বের সর্বত্র জার্মান জাতির মর্যাদা ও আধিপত্য বিস্তারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। তাই অমিত সাহসী, দুর্বার ও দুর্জয় জার্মান বাহিনীকে তিনি বিশ্ব জয়ের সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ করেন। তার সাম্রাজ্যবাদী নীতির চরম বিকাশ ঘটে বিনা অজুহাতে পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে। তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিশোধস্পৃহা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ। হিটলারের নেতৃত্ব না পেলে জার্মানি এত ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে বিশ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারত না।
মহাপ্রলয়ংকরী ও সর্বনাশা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জার্মানির ভাগ্যনিয়ন্তা হিটলার। এ যুদ্ধ মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আমেরিকার অত্যাধুনিক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের মাধ্যমে এ যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ
(ইউরোপের প্রথম রণাঙ্গন)
জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর) মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মাসের মধ্যে হিটলার পোল্যান্ড অধিকার করে নেন। এরপর জার্মানি ডেনমার্ক ও নরওয়ে অধিকার করে। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে হিটলার লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম ও হল্যান্ড আক্রমণ করেন। ভার্সাই সন্ধিতে যে সকল স্থান বেলজিয়ামকে দেওয়া হয়েছিল জার্মানি তা দখল করে। হল্যান্ডকে পদানত করে হিটলার l
অতর্কিতে ফ্রান্স আক্রমণ করেন। হিটলারের আক্রমণে মিত্রবাহিনী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ২৭শে মে থেকে ৪ঠা জুনের মধ্যে সাড়ে তিন লক্ষ মিত্রসেনাকে ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দর থেকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। অপ্রতিহত গতিতে অগ্রসর হয়ে জার্মানি সমগ্র উত্তর ফ্রান্স অধিকার করে। এদিকে, ইতালির মুসোলিনিও মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং ইতালিসংলগ্ন ফ্রান্সের কিছু এলাকা দখল করে নেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের কাছে জার্মানির পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে (১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই নভেম্বর) ক্যাম্পেইন-এর বনাঞ্চলে যে রেলগাড়ির মাধ্যমে জার্মান প্রতিনিধিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়েছিল, হিটলারের নির্দেশে সেই রেলগাড়ির কামরাটি আনা হয় এবং ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুন কামরার অভ্যন্তরে ফরাসি প্রতিনিধিগণ হিটলারের উপস্থিতিতে জার্মান সেনাপতি কাইটেলের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু অংশে জার্মানির তাঁবেদার ফরাসি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপে হিটলারের অপ্রতিহত অগ্রগতি চলতে থাকে। এর পরের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল ব্রিটেন। এরূপ অবস্থায় বিক্ষুব্ধ জনমতের চাপে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন পদত্যাগ করলে উইনস্টন চার্চিল নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে সমুদ্র উপকূলের বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেন। ব্রিটেনে বাধ্যতামূলক সামরিক বৃত্তি চালু করেন। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর পাল্টা আক্রমণের মুখে হিটলারের ব্রিটেন আক্রমণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হিটলার ইংরেজদের আফ্রিকায় জব্দ করার চেষ্টা করেন। ইতালি ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড অধিকার করে। তারা মিশর ও সুয়েজ খাল দখল করে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রাধান্য খর্ব করার চেষ্টা করে। জার্মান সেনাপতি রোমেল এক দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী নিয়ে মিশরের উদ্দেশে রওনা হন। ইংরেজ সেনাপতি ওয়াভেল ইতালির অগ্রগতি রোধ করেন এবং আবিসিনিয়া দখল করে নেন। বলকান অঞ্চলে ইতালি গ্রিস আক্রমণ করলে ব্রিটেন গ্রিসের সাহায্যে এগিয়ে আসে। বুলগেরিয়া তার হারানো অঞ্চল ফিরে পাওয়ার জন্য জার্মানি ও ইতালির পক্ষে যোগ দেয়। যুগোশ্লাভিয়া জার্মানির অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ক্রমে জার্মানি গ্রিস ও যুগোশ্লাভিয়া দখল করে নেয়।

জার্মানির সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ
মস্কো-বার্লিন অনাক্রমণ চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন। জার্মান সেনাপতি পাউলাসের অধীনে এক বিশাল বাহিনী রুশ সীমান্ত অতিক্রম করে দ্রুতগতিতে মস্কোর দিকে ছুটে যায়। উত্তরে বাল্টিক সাগর থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত প্রায় চারশ কি.মি. সীমান্তজুড়ে যুদ্ধ হয়। মাত্র ২৬ দিনের যুদ্ধে জার্মান বাহিনী মস্কোর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে নেয়। লেলিনগ্রাড অবরুদ্ধ হয়। নেপোলিয়নের সময়কার যুদ্ধের মতো রুশ বাহিনী পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে পশ্চাদপসরণ করে। অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে মস্কোও অবরুদ্ধ হয়। ইতিমধ্যে রাশিয়ায় শীতকাল শুরু হয়। প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে জার্মান বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। বার্লিনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রুশ লালফৌজ জার্মানদের বাধা দেয়। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম দিকে লালফৌজ লেলিনগ্রাড মুক্ত করে। সেপ্টেম্বরে শুরু হয় স্টালিনগ্রাডের যুদ্ধ। অসম্ভব সাহসিকতার সাথে রুশরা জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। নভেম্বর মাসে রুশ সেনাপতি ঝুকড বার্লিনের সাথে জার্মান সৈন্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে জার্মান সেনাপতি পাউলাস আত্মসমর্পণে বাধ্য হন।
জাপান কর্তৃক পার্ল হারবার আক্রমণ
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানি নৌশক্তির উত্থান ও চীনে জাপানের আগ্রাসী নীতি জাপান ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায়। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এক আদেশ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রে জাপানের যত সম্পদ আছে তা বাজেয়াপ্ত ও তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে চীন থেকে বেরিয়ে আসার নোটিশ পাঠালে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার আক্রমণ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হতে থাকে।
ইউরোপে মিত্রশক্তির দ্বিতীয় রণাঙ্গন
মিত্রশক্তির যুদ্ধকালীন কূটনীতির অংশ হিসেবে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে স্টালিন, রুজভেল্ট। চার্চিল তেহরানে এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য উক্তর পশ্চিম ফ্রান্সের নরমান্ডিকে বেছে নেওয়া হয়। স্থির হয় যে, প্রথমে ৩৬ ডিভিশন সেনা অবতরণ করবে, পে আরও ১০ ডিভিশন সেনা দক্ষিণ ফ্রান্সে নামানো হবে। দশ হাজার বিমান এতে অংশ নেবে এবং যুদ্ধজাহাজ ও পরিবহন যানের সংখ্যা হবে সাড়ে সাত হাজার। আমেরিকান, ব্রিটিশ, কানাডীয়, ওলন্দাজ, পোলা নরওয়েজীয়, ফরাসি ও গ্রিক সৈন্যদের অবতরণের দিন ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুন স্থির হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ৬ই জুন স্থির করা হয়। এ দিনটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে ডি-ডে বলা হয়। এই বিশাল সামরিক অভিযানের নেতা ছিলেন আমেরিকান সেনাপতি আইজেনহাওয়ার। অবতরণের দিন সন্ধা * থেকে মিত্রবাহিনীর এক হাজার বোমারু বিমান উপকূলবর্তী জার্মান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোর উপর নির্বিচালে বোমাবর্ষণ করে। সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেষ রাতে সেনা অবতরণ শুরু হয়। পাঁচ দিন ধরে মিত্রবাহিনীর সাথে জার্মান সৈন্যদের তুমুল যুদ্ধ হয়। মিত্রবাহিনী নরমান্ডি উপকূলের ১২৮ কি.মি. এলাক অধিকার করে ও ৩২ কি.মি. ভেতরে প্রবেশ করে। আগস্ট মাসে ফরাসি বাহিনী টুলো বন্দরে অবতরণ করে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ইউরোপে জার্মান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। মিত্রবাহিনী দ্রুতবেগে জার্মানির দিকে অগ্রসর হয়।

ইতালির আত্মসমর্পণ
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে আফ্রিকায় ইতালির পরাজয় শুরু হয়। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে মিত্রপক্ষ তিউনিস ও রিজার্টা দখল করে নেয়। এরপর মিত্রপক্ষ সিসিলি আক্রমণ করে। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জুলাই মার্কিন সেনাপতি প্যাটন ও ইংরেজ সেনাপতি মন্টগোমারি অতর্কিতে সিসিলি আক্রমণ করে ১৭ই আগস্টের মধ্যে দখল করে নেন। দীর্ঘ যুদ্ধ, ক্রমাগত পরাজয় ও অভ্যন্তরীণ দুরবস্থা মুসোলিনির বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে জুলাই মুসোলিনিকে অপসারণ করেন। আবিসিনীয় যুদ্ধের নায়ক বোদেগলি নতুন সরকার গঠন করেন। মুসোলিনিকে বন্দি করা হয়। কিন্তু জার্মান ছত্রীবাহিনী তাকে মুক্ত করে। তিনি জার্মান অধিকৃত উত্তর ইতালিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান হন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন বাহিনী পশ্চিম ও ব্রিটিশ বাহিনী পূর্ব দিক থেকে ইতালি আক্রমণ করে। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের জুনে রোম মিত্রবাহিনীর হস্তগত হয়। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মিত্রবাহিনী উত্তর ইতালি আক্রমণ করলে মুসোলিনি সুইজারল্যান্ডে পলায়নের চেষ্টা করে জন্তার হাতে ধৃত ও নিহত হন। ফলে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। ইতালি বিনাশর্তে মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে।
জার্মানির আত্মসমর্পণ
জার্মানির পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী এবং পূর্ব সীমান্ত দিয়ে রুশ বাহিনী বার্লিনের দিকে অগ্রসর হয়। রাজধানী রক্ষার জন্য হিটলার শহরে প্রবেশে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২১শে এপ্রিল ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে রুশ সেনারা বার্লিন শহরে প্রবেশ করে। ৩০শে এপ্রিল হিটলার ৫০ ফুট গভীর ভূগর্ভের বাংকারে স্ত্রী ইভা ব্রাউনসহ আত্মহত্যা করেন। গোয়েবল্সও সপরিবারে আত্মহত্যা করেন। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই মে শেষরাতে জার্মান প্রতিনিধিবর্গ মিত্রপক্ষের প্রধান সেনাপতি 'আইজেনহাওয়ারের সদর দপ্তর ফ্রান্সের রেইম্স শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
জাপানের আত্মসমর্পণ (হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণ)
জার্মানির পতনের পরও জাপান যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় শক্তিসমূহের উপনিবেশগুলো দখল করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক বনে যায়। তারা মিত্রবাহিনীর কাছে বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত হলেও অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে মিত্রবাহিনীকে প্রতিহত করে চলছিল। মিত্রবাহিনীরক্তক্ষয় এড়ানোর জন্য জাপানকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিলেও জাপান তা অগ্রাহ্য করতে থাকে। অবশেষে মিত্রপক্ষের অন্যতম শক্তি আমেরিকা ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে এবং ৯ই আগস্ট নাগাসাকি শহরে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। শক্তিশালী আণবিক বোমার প্রচণ্ড বিস্ফোরণে এ দুটি শহর সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শহর দুটিতে লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষের মৃত্যু হয়, অগণিত লোক পঙ্গু হয়ে যায় আণবিক বোমার প্রতিক্রিয়ায়। নারী-পুরুষ-শিশু-নির্বিশেষ সকলেই এ বোমার নির্মম আঘাতের শিকার হয়। জাপান এ বিভীষিকা থেকে বাঁচতে বিনাশর্তে মিত্রশক্তির প্রধান সেনাপতি ম্যাক আর্থারের নিকট আত্মসমর্পণ করে। জাপানের সেনাপতি উমেজুর ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২রা সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে।

নিষ্ঠুরতার হলোকাস্ট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলোচিত হলোকাস্ট। ইহুদি নিধনকেই হলোকাস্ট বলা হয়। হিটলারের অধীন বিষয় হচ্ছে জার্মান নাৎসি বাহিনী ইউরোপের তদানীন্তন ইহুদি জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি অংশকে বন্দিশিবির, শ্রমশিবির ও গ্যাস চেম্বারে নির্মমভাবে হত্যা করে। আনুমানিক ৬০ লক্ষ ইহুদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এছাড়াও সোভিয়েত যুদ্ধবন্দি, কমিউনিস্ট, রোমান ভাষাগোষ্ঠীর যাযাবর, স্লাভিক ভাষাভাষী জনগণ, প্রতিবন্ধী, সমকামী পুরুষের উপর অমানবিক গণহত্যা পরিচালনা করা হয়। মূলত এ গণহত্যাই হলো হলোকাস্ট।
লিটল বয়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (৬ই আগস্ট ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) জাপানের হিরোশিমায় যে বোমা নিক্ষেপ করা হয় তার নাম লিটল বয়। এর ওজন ছিল ৪,০০০ কেজি। এটি মূল আঘাত হানে সিমা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে। এটি ছিল একটি নিউক্লিয়ার পারমাণবিক বোমা। এর বিস্ফোরণে ৩,৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়। এর বিস্ফোরণের ধ্বংসলীলা দেখে এটির বহনকারী পাইলট কর্নেল পলটিবেটস চিৎকার করে বলে ওঠেন, "হায় ঈশ্বর! একি করলাম।"
ফ্যাট ম্যান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (৯ই আগস্ট ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) জাপানের নাগাসাকিতে যে বোমা নিক্ষেপ করা হয় তার নাম ফ্যাট ম্যান। এ বিস্ফোরণের মাত্রা ছিল ২১ কিলোটন টিএনটি-এর সমতুল্য। এটি মূল আঘাত হানে মিতসুবিশি স্টিল ও অস্ত্র কারখানা এবং উরাকামি সমরাস্ত্র কারখানায়। এর ওজন ছিল ৪,৬৩০ কেজি। এর পাইলট ছিলেন মেজর চার্লস ডব্লিউ সুইনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের কারণ
নানা কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজয় বরণ করে। যেমন:
জার্মান সেনাপতিদের অসহযোগিতা হিটলারের প্রতি জার্মান সেনাবাহিনীর নিরঙ্কুশ সমর্থনের অভাব
জার্মানির পরাজয়ের একটি কারণ। সেনাপতিদের প্রতি হিটলারের সন্দেহ ও অবিশ্বাস জার্মান শক্তি বৃদ্ধির অন্তরায় ছিল। তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জার্মান সেনাপতিরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তার নাৎসি সরকারের প্রতি গণসমর্থন খুব জোরালো ছিল ছিল না; না; যা তার পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
সামরিক উপকরণ, জনশক্তি ও সম্পদের অপ্রতুলতা জার্মানি সামরিক উপকরণ, জনশক্তি ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের প্রথম দিকে প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সমরাস্ত্রে সজ্জিত না থাকায় জার্মানি সাফল্য পায়। কিন্তু যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সমরাস্ত্রে সমৃদ্ধ হলে জার্মানি আর পেরে ওঠেনি। S
ত্রুটিপূর্ণ সামরিক কৌশল জার্মানির সামরিক কৌশল ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ফ্রান্সের পরাজয়ের পর হিটলারের
রাশিয়া আক্রমণ যুক্তিযুক্ত হয়নি। তার সেনাপতিদের মতামত উপেক্ষা করে রাশিয়া আক্রমণ করেন বিধায় তিনি সাফল্য লাভ করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে রাশিয়া আক্রমণই হিটলারের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং তার পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
জার্মানির মিত্রদের অসহযোগিতা দুর্যোগের সময়ে অক্ষশক্তির সদস্যরা জার্মানিকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করেনি। ফিনল্যান্ড, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া সকলেই জার্মানির পক্ষ ত্যাগ করে মিত্রপক্ষের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরম মিত্র ইতালি যুদ্ধের শেষের দিকে জার্মানির বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে মুসোলিনির মৃত্যু হলে হিটলার দুর্বল হয়ে পড়েন। স্পেনের ফ্রাংকো প্রয়োজনের সময় সর্বশক্তি দিয়ে জার্মানির পাশে থাকেননি।
ভৌগোলিক অবস্থান: ভৌগোলিক দিক থেকে জার্মানির আত্মরক্ষার জন্য বিস্তৃত ভূভাগ ছিল না। রাশিয়া
যেমন তার বিরাট ভূভাগ থাকার ফলে যুদ্ধে পিছু হটে শত্রুকে যুদ্ধের পর যুদ্ধ দিতে পারত, জার্মানিকে ভৌগোলিক অবস্থান সে সুযোগ দেয়নি। এজন্যই জার্মানি সর্বদাই আক্রমণাত্মক যুদ্ধে পটু ছিল। জার্মানির একই সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা ছিল না। যে মুহূর্তে জার্মানি পূর্বে রাশিয়া এবং পশ্চিমে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির যুগপৎ আক্রমণের মুখোমুখি হয়, সে মুহূর্তে জার্মানির পতনের ঘণ্টা বেজে যায়। কারণ তাকে পিছু হটে নিজ দেশের মধ্যেই মিত্রশক্তির মোকাবিলা করতে হয়।
নৌবহরের অভাব: হিটলারের শক্তিশালী নৌবহর ছিল না। তিনি পদাতিক ও বিমানবাহিনীর উপর অধিক নির্ভর করতেন। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য সরবরাহ ঠিক রাখতে নৌবহরের ভয়ানক দরকার হয়। নৌবহর না থাকায় ব্রিটেনের যুদ্ধে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়। ইংলিশ চ্যানেলে শক্তিশালী ব্রিটিশ নৌবাহিনীর উপস্থিতি জার্মান বাহিনীকে চ্যানেল অতিক্রমের সুযোগই দেয়নি। এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো মিত্রবাহিনী জার্মানির উপকূলভাগ অবরোধ করায় জার্মানির সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়।
উপর্যুক্ত কারণগুলোর সমষ্টিগত প্রক্রিয়ায় জার্মানি পরাজিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল
কোনো যুদ্ধের ফলাফলই মানবজাতির জন্য শুভ নয়। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, সম্পদের অপচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম যুদ্ধ। এর ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক এবং ধ্বংসলীলা ছিল মারাত্মক। ভয়াবহ এ যুদ্ধে আনুমানিক ছয় কোটি বিশ লক্ষ লোক মারা যায়। ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধের ভয়াবহতাকে কয়েক হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। এ যুদ্ধে ধ্বংস হয় বহু নগর, শহর ও জনপদ। বহু লোক পঙ্গুত্ব নিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাছাড়া উল্লেখযোগ্য ফলাফল নিম্নরূপ: প্রথমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে জার্মানির নাৎসিবাদ, ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জাপানের সমরবাদের পরাজয় ঘটে। ফ্যাসিস্ট ও নাৎসি দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এ সকল দলের নেতাদেরও যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

দ্বিতীয়ত: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের প্রতি মানুষের যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল এ যুদ্ধ তার স্বরূপ উন্মোচন করে এবং এ ব্যবস্থাগুলো ইউরোপের রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার স্থান দখল করে।
তৃতীয়ত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে স্বল্পকালের জন্য হলেও মৈত্রীর বন্ধন রচনা করতে সাহায্য করে।
চতুর্থত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের এক বিস্তৃত অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
পঞ্চমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে জার্মানি বিভক্ত হয়। বার্লিন প্রাচীর জার্মান জাতিকে আবারও বিভক্ত করে। জার্মানির পূর্ব অংশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পশ্চিম অংশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ষষ্ঠত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে উপনিবেশবাদের অবসান ঘটতে থাকে। শুরু হয় উপনিবেশবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাধীন হতে থাকে। পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান শুরু হয়।
সপ্তমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের স্থলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং রাশিয়া-আমেরিকা স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়। জাতিসংঘের উদ্ভব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল।
অষ্টমত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনা বিশ্ববাসীকে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে আজও আতঙ্কগ্রস্ত করে।
Explanation of Key Words
- ফ্যাসিবাদ: ল্যাটিন শব্দ Fascio থেকে ফ্যাসিবাদ (Fascism) কথাটির উৎপত্তি। ফ্যাসিও শব্দের অর্থ হচ্ছে গুচ্ছ, ঐক্য বা একতা। আবার অন্য অর্থ হলো বল বা শক্তি। ইতালির সিসিলি দ্বীপে উনিশ শতকের শেষ দিকে জমিদারবিরোধী কিছু কৃষক সংগঠন বিভিন্ন উদ্ভিদের কাণ্ডগুচ্ছ সংগঠনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করত। এর দ্বারা তারা বোঝাতে চাইত, 'একতাই বল, একতাই শক্তি'। মুসোলিনি তার দলের প্রতীক হিসেবে Fascio শব্দটিকে গ্রহণ করেন এবং তার প্রবর্তিত উগ্র জাতীয়তাবাদী মতবাদই হলো Fascism বা ফ্যাসিবাদ। আর ফ্যাসিবাদী আদর্শকে যারা ধারণ করত তারা ফ্যাসিস্ট।
- নাৎসিবাদ: ফ্যাসিবাদেরই জার্মান সংস্করণের নাম নাৎসিবাদ। জার্মান ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি (সংক্ষেপে নাজি) ফ্যাসিবাদের আদর্শ, কর্মপদ্ধতি, উদ্দেশ্য ও স্বরূপকে আরও হিংস্রভাবে ধারণ করার মাধ্যমে গোটা জার্মান সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছিল। বিদেশি লগ্নি পুঁজি ও সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দ্বারা জার্মান উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর ছিল। এজন্য এ গোষ্ঠী যে ভাবাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাই নাৎসিবাদ বা Nazism. তাদের স্লোগান ছিল- 'এক জাতি, এক রাষ্ট্র এবং একজন ফুয়েরার'। উক্ত ভাবাদর্শের প্রধান ব্যক্তি রাষ্ট্রের 'ফুয়েরার'।
- একনায়কত্ব: ল্যাটিন শব্দ Dictator (সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী) থেকে একনায়কত্ব (Dictatorship) কথাটির উৎপত্তি। কোনো শাসক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ যখন শাসিতের মতামতের তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্রভাবে শাসনকাজ চালিয়ে যায়, তখন তার বা তাদের শাসনকে বলে একনায়কত্ব। রোমান প্রজাতন্ত্রের সময় থেকে এর উৎপত্তি। এ সময় জরুরি অবস্থায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতাসহ সাত বছরের জন্য একজন ডিক্টেটর নিয়োগের ক্ষমতা রোমান সিনেটকে প্রদান করা হয়। বর্তমান দুনিয়ায় বিভিন্ন ধরনের একনায়কত্ব কায়েম আছে। যেমন- বুর্জোয়া একনায়কত্ব, সর্বহারা একনায়কত্ব, সামরিক একনায়কত্ব ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, একনায়কত্ব সর্বদাই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের একচ্ছত্র স্বার্থে প্রতিপক্ষের উপর সার্বিক নিষ্পেষণ চাপিয়ে দেয়।
- ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Veimar Republic): প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানিতে যে নির্বাচন
হয় তাতে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল (Social Democratic Party) ১৬৩টি আসন পেয়ে জয়লাভকরে। নির্বাচিত সরকার ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারি ভাইমার নামক স্থানে জার্মানিকে প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা দেয়। ভাইমারের নামানুসারে নবগঠিত প্রজাতন্ত্র 'ভাইমার প্রজাতন্ত্র' বলে পরিচিতি পায়। - এডলফ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ): অস্ট্রিয়ার শহর ব্রাউনাউ-এ জন্মগ্রহণকারী হিটলার ১৯০৯-১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে ভিয়েনায় অবস্থান করেন। এ সময় হিটলার ইহুদিবিরোধী চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির চিত্রকর হিসেবে কষ্টে জীবিকা অর্জন করেন। অস্ট্রিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে তিনি জার্মানির ব্যাভেরিয়ার পদাতিক সেনাদলে যোগ দেন। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কর্পোরাল হন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ মেইন ক্যাম্প। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে হিনডেনবুর্গ হিটলারকে দেশের চ্যান্সেলর নিয়োগ করেন।
- মুসোলিনি: বেনিতো মুসোলিনি ইতালির রোম নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন কামার এবং মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজনৈতিক কারণে সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যান। দেশে ফিরে তিনি সমাজতন্ত্রী দলে যোগদান করেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মিলান শহরে যুদ্ধফেরত সৈনিক ও বেকার যুবকদের এক সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলনে আসা সৈনিকদের নিয়ে তিনি একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠন করেন। ধীরে ধীরে ক্ষমতা সঞ্চয় করে ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের দ্বারা গঠিত সরকার পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করে ১৯২৮-২৯ খ্রিষ্টাব্দে।
- লোকার্নো চুক্তি: ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে লোকার্নোতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ফ্রান্স-জার্মানি সীমান্ত সমস্যার সমাধান এবং রাইনল্যান্ডের বেসামরিকীকরণ। এ সমস্যার সমাধানের ফলে জার্মানির একঘরে থাকার বিষয়টি সমাধান হয় এবং জার্মানি লীগ অব নেশনসের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে হিটলার এই চুক্তি ভঙ্গ করে রাইনল্যান্ডে সৈন্য প্রেরণ করেন।
- S.A. বাহিনী: নাৎসি দলের স্বার্থরক্ষা ও নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তার জন্য ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় S.A. বাহিনী। এরা বোয়েনোর নেতৃত্বে অন্য দল বিশেষ করে কমিউনিস্টদের হাত থেকে দলের সভাগুলো রক্ষা করা ছাড়াও অন্য দলের উপর হামলা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হত্যা, গুম ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করত। বাদামি রঙের পোশাক পরত বলে এদের ব্রাউন শার্টও বলা হতো।
- ফুয়েরার: শাব্দিক অর্থে প্রধান নেতা। জার্মান সংসদে এক বিশেষ আইন পাস করে হিটলারকে শাসনকাজ পরিচালনা ও আইন প্রণয়নের অধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে কার্যত জার্মানিতে তিনি সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের মৃত্যু ঘটলে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট দুটি পদ নিজে গ্রহণ করে জার্মান রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন এবং নিজেকে ফুয়েরার বলে ঘোষণা করেন। নিজের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে হিটলার বিরোধী দল, ইহুদিবাদ প্রভৃতি দমন করে জার্মানির একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হন।
- Mein kampf (আমার সংগ্রাম) হিটলার কর্তৃক রচিত আত্মকথামূলক গ্রন্থের নাম 'Mein Kampf', যার বাংলা অর্থ হলো 'আমার সংগ্রাম'। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে হিটলার কয়েকজন সহযোগী নিয়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। বিচারে তার ৫ বছরের জেল হয়। কারাগারে বসে তিনি আত্মকথামূলক গ্রন্থ 'Mein Kampf' রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি জার্মান জাতীয়তাবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, তরুণসমাজের কাছে তা অবশ্য পাঠ্য পুস্তকে পরিণত। হয়। এ গ্রন্থে তিনি নাৎসি আদর্শ এবং এ আদর্শ বাস্তবায়নের উপায় ব্যাখ্যা করেন। এজন্য গ্রন্থটিকে 'নাৎসি বাইবেল' বলা হয়।
হিটলার ও মুসোলিনির উত্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ স্যারে এর লেখা বই
Read more