নির্দেশনার গুরুত্ব (৬.১৬)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

Improtance of Direction

ধরা যাক, একটি ট্রেন কোনো স্টেশনে থেমে আছে। যাত্রার সময়ও হয়ে গেছে। উক্ত স্টেশনের গার্ড বাঁশি বাজালেন বা সবুজ সংকেত দেখালেন। অতঃপর ট্রেনটি যাত্রা শুরু করল। আবার, অন্য আরেকটি দৃশ্যে একটি ফুটবল খেলার মাঠে দুই দল খেলোয়াড় প্রস্তুত। রেফারির বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে খেলা আরম্ভ হয়ে গেল। গার্ডের বাঁশি বাজানো বা সবুজ সংকেত দেখানো এবং রেফারির বাঁশি বাজানো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।

একইভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানের উপায়-উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও কর্মীদের সুসংগঠিত করা সত্ত্বেও সবকিছুই স্থির বলে মনে হবে যতক্ষণ না ব্যবস্থাপক নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনা পাওয়ার পরই প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। এ থেকেই অনুমান করা যায়, কোনো সংগঠিত কার্যক্রমে নির্দেশনাই মূলত গতির সঞ্চার করে। তাই, এটি হলো একটি প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। এটি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার কোনো কাজই নির্দেশনা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই মার্শাল ই. ডিমক (Marshall E. Dimok) নির্দেশনাকে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার হৃৎপিণ্ড বলে অভিহিত করেছেন। নিচে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-

  • লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা (Help to achieve the goal): প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে সঠিক নির্দেশনা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের করণীয় কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানানো হয়। সঠিক নির্দেশনার ফলে প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এর সুবাদে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়। এভাবে নির্দেশনা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
  • পরিকল্পনা বাস্তবায়ন (Implementation of the plan): নির্দেশনার মাধ্যমে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। কোন কাজ কখন, কীভাবে সম্পাদন করতে হবে সে বিষয়ে ব্যবস্থাপকগণ কর্তৃক কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। তাছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেয়েই কর্মীরা কাজ শুরু করেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্যই কর্মীরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে থাকেন। অর্থাৎ, এটি জারির পর সংগঠনের সব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি হয়।
  • কর্মীদের সম্পর্ক ও মানোন্নয়ন (Development of relation and quality of the employees): কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ ও ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এভাবে, পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। অপরদিকে, নির্দেশনার অর্থ কেবল আদেশ দেওয়াই নয়। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে সঠিক দিকনির্দেশনা, পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা পেয়ে কর্মীদের কাজের মান ও দক্ষতা বাড়ে।
  • নেতৃত্বের বিকাশ (Development of leadership): কর্মীদের আচরণ কী হবে এবং কার কী দায়িত্ব তা নির্দিষ্ট
    করার ক্ষেত্রে নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার, নির্দেশনা দিতে গিয়ে কর্মীদের কীভাবে পরিচালনা করবে একজন নির্বাহী সে বিষয়টিও আয়ত্ত করতে পারেন। এভাবে প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। নির্দেশনা মূলত বাস্তবায়নসংক্রান্ত কাজ। সঠিক নির্দেশনার ওপর ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কাজ যেমন- পরিকল্পনা প্রণয়ন, সংগঠিতকরণ, কর্মীসংস্থান প্রভৃতির সাফল্য নির্ভর করে।
  • ঐক্য সৃষ্টি (Creation of unity): প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানে
    নিয়োজিত লোকবল ঐক্যবদ্ধ করে পরিচালনা করা। প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনার মান উন্নত হলে অধীনস্থ কর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। তাই, প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা উত্তম হলে অধীনস্থদের ঐক্য ও সংঘবদ্ধতাও মজবুত হয়।
  • নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা (Establishing discipline): ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় থাকা জরুরি। নির্দেশনা উত্তম হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন। এ অবস্থায় কারও পক্ষে পথভ্রষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-শৃঙ্খলার বিরোধী কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না।
  • দক্ষতার উন্নয়ন (Development in efficiency): সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টার অপচয় না করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করার সামর্থ্যকে দক্ষতা বলে। নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় অধীনস্থদের করণীয় কাজ কীভাবে সহজে করতে পারে তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে কর্মীরা পরোক্ষভাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার প্রশিক্ষণ লাভ করেন। কার্যকর নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীরা কাজ সম্পাদনের উপায়, সঠিক সময় প্রভৃতি সম্পর্কে আগে থেকে জেনে থাকেন। ফলে তারা সুশৃঙ্খলভাবে ও নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন।
  • পরিচালনায় সহায়তা (Helping in operation): প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নির্দেশনা থাকলে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের
    মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সমঝোতা সৃষ্টি হয়। ফলে, প্রতিষ্ঠানে উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক তৈরি হয়। সঠিক নির্দেশনার ফলে কাজ সম্পাদনসংক্রান্ত খুঁটিনাটি সব বিষয়ে কর্মীদের জানা হয়ে যায়। এতে কর্মীরা নিয়মমাফিক কাজে সব সময় নিয়োজিত থাকেন। তাই, উর্ধ্বতন নির্বাহীদের পক্ষে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সহজ হয়।
  • সঠিক মূল্যায়ন ও সমন্বয় (Proper evaluation and coordination): প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এর কার্যাবলির মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করাও জরুরি। সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীদের কাজ সহজে মূল্যায়ন করা যায়। নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীদের দায়িত্ব কী ছিল ও তা কতটুকু পালন করা হয়েছে, তা জানা যায়। আবার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ ও কর্মীদের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন সহজ হয়।
  • কার্যকর নিয়ন্ত্রণ (Effective control): সঠিক নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। এর মাধ্যমে
    অধীনস্থদের কাজে ভুল-ত্রুটির পরিমাণ কমে যায়। তাছাড়া, নির্বাহীরা সব সময় সচেতনভাবে খেয়াল রাখেন বলে কাজে বিচ্যুতি হলে তা সাথে সাথে ধরা পড়ে। ফলে, তা দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব হয়। এভাবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান (Proper supervision): নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় অধীনস্থদের কাজ লক্ষ্য অনুযায়ী ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হয়। আর নিয়মিত তদারকির ফলে কর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকেন। তাই, নির্দেশনার মাধ্যমে সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান করা সহজ হয়।
  • ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ (Ensuring continuity): নির্দেশনা হলো অবিরাম প্রক্রিয়া। লক্ষ্য অর্জনে প্রদত্ত
    নির্দেশনার কার্যকারিতা থাকতে থাকতেই পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে কাজের গতি বন্ধ হওয়া বা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এভাবে, কার্যপ্রবাহ তৈরির মাধ্যমে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা সহজ হয়।

উপসংহারে বলা যায়, নির্দেশনা হলো ব্যবস্থাপনার একটি প্রধান কাজ। এটি ছাড়া ব্যবস্থাপকীয় সব কর্মপ্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। তাই, ব্যবস্থাপককে তার অধীনস্থদের সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তা কার্যকর করতে হবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...