Problems to Develop Leadership
মানুষ পরিচালনা করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর মানুষ তথা কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়া বা পরিচালনার এ কঠিন কাজটি নেতাকেই করতে হয়। অধীনস্থ কর্মীদের পরিচালনায় নেতাকে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা, নেতার নিজস্ব দুর্বলতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অধীনস্থ কর্মীসংক্রান্ত সমস্যা প্রভৃতি বিষয়ও কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নেতা সাধারণত যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তা নিচে তুলে ধরা হলো-

ক. প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা (Institutional Problems)
নেতৃত্বের বিকাশ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম-নীতি, কাঠামোগত জটিলতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, কার্য-পরিবেশগত সমস্যা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততা অনেক ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিচে প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য সমস্যাসমূহ তুলে ধরা হলো-
- পরিবেশগত বাধা (Environmental obstacle): প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান সব সময় অনুকূল থাকে না। সংগঠনের বিশৃঙ্খলামূলক অবস্থা বিরাজ করলে নেতা কখনো সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন না। এর ফলে, যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন নেতাও তার যোগ্যতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন।
- উপকরণের স্বল্পতা (Shortage of factors): উৎপাদনের উপকরণ যথা: শ্রম, মূলধন, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি প্রভৃতি যদি সহজলভ্য হয়, তাহলে নেতার নেতৃত্বদান সহজ হয়। কিন্তু, বাস্তবে এসব উপকরণ যথাসময় যথাস্থানে না পাওয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এতে নেতৃত্বের বিকাশেও বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়।
- সুষ্ঠু নীতির অভাব (Lack of proper policy): কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানের নীতি-পদ্ধতিও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে থাকে। কিন্তু, এ নীতি-পদ্ধতি নেতার পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। ফলে কার্যকর নেতৃত্ব বাধাগ্রস্ত হয়।
- নেতা নির্বাচনের সমস্যা (Problems of selecting leader): সফল নেতৃত্ব বিকাশে সর্বগুণে গুণান্বিত যোগ্য নেতার প্রয়োজন। যোগ্য নেতার অভাবে কর্মীদের ঠিকমতো পরিচালনা করা যায় না। কর্মীরা অযোগ্য নেতাকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণও করেন না। কিন্তু, বাস্তবে যোগ্য নেতা খুঁজে পাওয়া বা নির্বাচন করা সব সময় সম্ভব হয় না।
- কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অস্পষ্টতা (Vague in authority and responsibility): আদেশ দেওয়ার বৈধ ক্ষমতা হলো কর্তৃত্ব; আর কাজ সম্পাদনের দায়বদ্ধতাকে বলা হয় দায়িত্ব। নেতাকে সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করেই নেতৃত্ব দিতে হয়। অনেক সময় সংগঠন কাঠামোতে কর্মীদের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব এবং এর সীমারেখা যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত বা বণ্টন করা থাকে না। এতে কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায় না। এ ধরনের অস্পষ্টতার কারণে সুষ্ঠু নেতত বাধাগ্রস্ত হয়।
খ. নেতার ব্যক্তিগত সমস্যা (Leader Related Problems)
ব্যক্তি হিসেবে মানুষ সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়, এটি সর্বজনস্বীকৃত। তাই, নেতার ব্যক্তিগত ত্রুটি বা দুর্বলতাও অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বিকাশে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যথা:
- নেতার অদক্ষতা (Inefficiency of leader): নেতা তার অনুসারী বা অধীনস্থদের পরিচালনা করে থাকেন। তাদের
যথাযথভাবে পরিচালনা করার জন্য নেতার শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, শিল্প-সম্পর্ক বিষয়ক জ্ঞান থাকতে হয়। তবে বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে একজন নেতার সার্বিক জ্ঞান ও পারদর্শিতা না-ও থাকতে পারে। তাই এক্ষেত্রে নেতার অদক্ষতা সফল নেতৃত্বের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। - পক্ষপাতিত্ব (Partiality): কোনো ব্যক্তি, দল বা জিনিসের প্রতি অনুচিত পছন্দ বা অনুমোদনকে পক্ষপাত বলে। অধীনস্থ কর্মীদের প্রতি নেতাকে সব সময় নিরপেক্ষ আচরণ প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু কোনো কোনো নেতার কাজ বণ্টনে বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের দল, মত ও এলাকার কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে দেখা যায়। এতে বঞ্চিত কর্মীরা নেতার আদেশ-নির্দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মান্য করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
- আবেগ ও অহংকার (Emotion and arrogance): পরিস্থিতি বা সম্পর্ক থেকে উৎপন্ন চরম মানসিক অনুভূতিকে আবেগ বলা হয়। অনেক সময় কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুসরণ না করলে বা নেতার আদেশ-নির্দেশ না শুনলে নেতা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। এতে নেতৃত্বের কার্যকারিতা কমে যায়। আবার নেতার অতিমাত্রায় ক্ষমতা অনেক সময় অহংকারের জন্ম দেয়। এতে অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব সাফল্য পায় না।
- দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা (Tendency to avoid responsibility): অনেক নেতা শুধু ক্ষমতাকে উপভোগ করতে চান। ক্ষমতার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার যে মানসিকতা থাকা দরকার, তা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। এরূপ নেতা নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে থাকেন। এতে অন্য কর্মীদের নেতা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় এবং তার নেতৃত্ব মেনে নিতে চায় না। এভাবে নেতা তার নেতৃত্বের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেন।
- অদূরদর্শিতা (Rocklessness): নেতা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অধীনস্থদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেন। তবে অহেতুক বা বিনা প্রয়োজনে নির্দেশ দিলে কর্মীদের কাছে নেতা হাস্যকর ব্যক্তিতে পরিণত হন। এতে নেতৃত্বের গতি থাকে না। এর ফলে অনেক সময় জরুরি নির্দেশনাও কর্মীরা এড়িয়ে চলেন।
গ. অধীনস্থ কর্মীসংক্রান্ত সমস্যা (Subordinate Related Problems)
সফল নেতৃত্বের বিকাশে শুধু নেতার গুণই যথেষ্ট নয় বরং অধীনস্থ বা অনুসারীদের যোগ্যতা এবং অযোগ্যতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে অধীনস্থদের বিভিন্ন অযোগ্যতাও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নেতার নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে। যেমন:
- অধীনস্থদের অদক্ষতা (Inefficiency of subordinates): দক্ষ কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়া যত
সহজ, অদক্ষ কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া তত সহজ নয়। তাছাড়া অদক্ষ কর্মী নেতার আদেশ-নির্দেশ ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। তাদের অনেকের মধ্যে কাজ করার ব্যাপারে আন্তরিকতার অভাবও দেখা যায়। তাই, অধস্তন কর্মীদের অদক্ষতা নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। - অন্ধ অনুসরণ (Blindly following): কখনো নেতার অদক্ষতা, অযোগ্যতা বা অনভিজ্ঞতার কারণে তার নির্দেশনা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। তবে নেতার প্রতি অনুসারীদের অন্ধবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নেতার জারিকৃত ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশনাও অধস্তন কর্মীরা পালন করে থাকেন। এতে হিতে বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হয়।
- শ্রদ্ধাবোধের অভাব (Lack of respectiveness): নেতার প্রতি অনুসারীদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু, কখনও কখনও অনুসারীরা নেতার নেতৃত্ব মানতে চান না বা নেতার প্রতি যথাযথ আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ দেখান না। ফলে নেতার প্রত্যেক কথাই তাদের কাছে গুরুত্বহীন বলে মনে হয়। এতে নেতৃত্বের বিকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।
- তোষামোদি প্রবণতা (Tendency to flattery): কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু কর্মী দেখা যায়, যারা নেতার অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায় সব সময় নেতার আশপাশে থাকেন। বিনা কারণে তোষামোদি করেন। এভাবে অনেক সময় নেতার অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হন। এ কারণে এ ধরনের কর্মীদের সাথে নীতিমান কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে, সফল নেতৃত্বও বাধাগ্রস্ত হয়।
- মানসিকতার ভিন্নতা (Mental differences): বিভিন্ন অঞ্চল ও মতাদর্শের কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে একত্রে কাজ করতে হয়। এরূপ এলাকাগত ও আদর্শগত পার্থক্যের কারণে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে অনেক দল বা উপদল তৈরি হয়। কখনও কখনও এদের অবস্থান এতটাই অনড় ও অটল হয় যে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নেতার নেতৃত্বও অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ঘ. অন্যান্য সমস্যা (Other problems)
নেতৃত্বের সফল প্রয়োগ ও বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লিখিত সমস্যাসমূহ ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। যেগুলোকে নেতৃত্বের বাধা সৃষ্টিকারী উপাদান বলা যায়। যেমন:
- রাজনৈতিক প্রভাব (Political influence): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়াও জাতীয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব, কর্মীদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি প্রভৃতি প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সফল প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নেতা তার কাজের ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েন।
- সামাজিক-সাংস্কৃতিক অসামঞ্জস্যতা (Socio-cultural imbalanceness): কর্মীদের নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মধ্যে মিল রাখা না গেলে নেতৃত্ব কার্যকর করা যায় না। আর প্রতিষ্ঠান, নেতা এবং অনুসারীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিল ও সমতা ছাড়া সফল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে সুষ্ঠু সমন্বয় সম্ভব হয় না।
- প্রযুক্তিগত সমস্যা (Technological problem): নেতৃত্ব প্রয়োগে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও কখনও কখনও তা সমস্যাও তৈরি করে। একজন নেতা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারলে তিনি অনুসারীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন না। এতে নেতৃত্বের কার্যকারিতা কমে যায়।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural climate): অনেক সময় দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক কারণে অস্বাভাবিক
কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে, প্রতিষ্ঠানে বা সমাজে নেতৃত্ব বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এসব পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি সংস্থা ও এনজিও নেতৃত্বে এগিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই বলা যায় যে, নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত সমস্যাগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষপটে সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই, উক্ত সমস্যাগুলো দূরে রাখতে পারলে প্রতিষ্ঠানের সফলতা অর্জন খুবই সহজ হয়।
Read more