নিয়ন্ত্রণ (দশম অধ্যায়)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.7k
Please, contribute by adding content to নিয়ন্ত্রণ.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

মি. জাকির হোসেন তার কারখানার কর্মীদের দৈনিক ২০০ একক দ্রব্য উৎপাদন করতে বলে। কিন্তু দিন শেষে তাদের উৎপাদিত হয় ১৯০ একক। 

পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে
পরবর্তী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে
কার্যকর নির্দেশনা প্রদান করে
কর্মীদের উৎসাহ প্রদান করে
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা
লাভ-ক্ষতি হিসাব বিবরণী
পার্ট (PERT)
বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্তি বিশ্লেষণ

Concept of Controlling

ভার্চুয়াল কর্পোরেশন লি.-এর বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা মাসে ১০,০০০ একক নির্ধারণ করা হয়। এজন্য বিক্রয় বিভাগের সবাইকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি মাসে ৭,০০০ একক অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। এজন্য বিক্রয় বিভাগের কর্মীদের যথেষ্ট চাপের মধ্যে রাখা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদেরও কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নতুন বিক্রয় কৌশল নির্দিষ্ট করে। এরপরও বিক্রি ৭,৮০০ একক অতিক্রম করছে না। সব দিক বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ পুনরায় বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ৮,০০০ একক নির্ধারণ করে। ওপরের ঘটনায় যে পদক্ষেপগুলো (বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, চাপ প্রয়োগ, প্রশিক্ষণ দেওয়া, নতুন বিক্রয় কৌশল নির্দিষ্ট করা, বিক্রির নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ) নেওয়া হয়েছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের অন্তর্ভুক্ত।

নিয়ন্ত্রণের (Controlling) আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছু পরিচালনা করা, সংযত করা, দমন করা, বিরত রাখা, আয়ত্তে রাখা প্রভৃতি। ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ হলো নিয়ন্ত্রণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সব কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা এবং কোনো ধরনের সমস্যা পাওয়া গেলে তার সংশোধন করা হলো নিয়ন্ত্রণ। প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রথমে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এরপর পরিকল্পনার আলোকে প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও সম্পদ সংগঠিতকরণ, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা ও সমন্বয়সাধন করতে হয়। কিন্তু অধীনস্থরা সব সময় সব কাজ সঠিকভাবে করতে পারেন না। প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে কখনো পরিবেশ-পরিস্থিতিও প্রতিকূলে যায়। তাই প্রয়োজন হয় নিয়ন্ত্রণের। এর মাধ্যমে ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করা হয় এবং সংশোধনের ব্যবস্থা নিয়ে লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়া যায়।

  • যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক হ্যারল্ড কুঞ্জ এবং সানফ্রানসিসকো বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক
    হেইঞ্জ ওয়েরিচ (Harold Koontz and Heniz Weihrich) এর মতে, 'Controlling is measuring and correcting individual and organizational performance to ensure that events conform to plans.' অর্থাৎ, 'পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পাদন নিশ্চিত করার জন্য ব্যক্তির ও প্রতিষ্ঠানের সম্পাদিত কাজ পরিমাপ ও সংশোধন করাকে নিয়ন্ত্রণ বলে।'
  • ডেভিড এইচ, হল্ট (David H. Holt) এর মতে, Controlling is the management function of monitoring performance and adopting work variables to improve results' অর্থাৎ, 'নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কাজ সম্পাদন তদারকি করা এবং ফলাফল উন্নয়নে শিল্প প্রতিষ্ঠানের খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থাপকীয় কাজ বিশেষ।'

উল্লিখিত আলোচনা ও সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নিচের ধারণা পাওয়া যায়-

  • নিয়ন্ত্রণ একটি চলমান প্রক্রিয়া;
  • এটি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ কাজ;
  • পরিকল্পনা বা আদর্শমানের ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়;
  • এতে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করে আদর্শমানের সাথে তুলনা করা হয়;
  • এতে কোনো পার্থক্য বা বিচ্যুতি থাকলে তার কারণ নির্ণয় করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়;

অতএব, পরিকল্পনা বা আদর্শমান অনুযায়ী যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে কোনো বিচ্যুতি থাকলে
প্রয়োজনীয় সংশোধনমলক ব্যবস্থা নেওয়ার কাজকে নিয়য়ণ বলে।

  

নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Characteristics of Controlling

প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। প্রণীত পরিকল্পনার আলোকে সব কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো নিয়ন্ত্রণ। আদর্শ নিয়ন্ত্রণের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো-

  • লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Goal oriented): প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে হয়। নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হলো পরিকল্পনামাফিক সবকিছুই চলছে কিনা তা দেখা। পরিকল্পিত কাজগুলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে হচ্ছে -কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও সংশোধন করা। যেমন: 'পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন'। এ ধরনের লক্ষ্য থাকলে প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
  • ভবিষ্যতমুখী (Future oriented): নিয়ন্ত্রণ সব সময়ই ভবিষ্যৎ কেন্দ্রিক বা পশ্চাৎমুখী। অর্থাৎ, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা হয়। প্রকৃত কার্যফলের আলোকে পরিকল্পনার সমস্যা, গতি-প্রকৃতি, সমাধান প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণ পরে গিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়।
  • আদর্শমান নির্ভরতা (Dependent on standard): নিয়ন্ত্রণকাজ একটি আদর্শমান নির্ভর প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় কোনো কাজ সম্পাদনে দক্ষতা, সময় ও ব্যয়ের আদর্শমান নির্ধারণ করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই আদর্শমানের অনুপস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করা যায় না।-
  • কালান্তিক কাজ (Periodical work): নির্দিষ্ট সময় পর পর যে কাজ প্রতিনিয়ত করা হয়, তাকে কালান্তিক কাজ বলে। নিয়ন্ত্রণ দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক বা বার্ষিক হতে পারে। এটি প্রতিষ্ঠানের আকার, আয়তন, পণ্য বা সেবা প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে। এজন্য নিয়ন্ত্রণকে কালান্তিক কাজও বলা হয়।
  • অবিরাম প্রক্রিয়া (Continuous process): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ কাজ হলেও এটি একটি অবিরাম বা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠানের বিলোপসাধন না হওয়া পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের কাজ চলতে থাকে। একবার কোনো কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হলে তার সাথে মিল রেখে নির্দিষ্ট সময় শেষে নিয়ন্ত্রণের কাজও করতে হয়। তাই এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
  • ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ (Last step of management process): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ কাজ। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের আলোকে সর্বপ্রথম পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো নিয়ন্ত্রণের কাজ।
  • মিতব্যয়িতা (Economies): দক্ষ ও কার্যকরভাবে সম্পদ ও উপকরণ ব্যবহারকে মিতব্যয়িতা বলে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অপচয় কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রণে এমন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয় যেখানে খরচ বেশি হতে পারে। এ ব্যবস্থা ব্যয়সাপেক্ষ হলে তাতে জটিলতা বাড়ে।
  • আওতা (Scope): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের সব স্তরে পরিব্যাপ্ত। ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ ও উপবিভাগে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। এছাড়া প্রতিটি পরিকল্পনার রাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে যে কাজ যেভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা সেভাবে সম্পন্ন করতে কোনো অসুবিধা হয় না।
  • প্রতিরোধক (Preventive): একই ধরনের ভুল বারবার যেন না হয় সে বিষয়টি আদর্শ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নিশ্চিত করা হয়। এক্ষেত্রে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা এমনভাবে নেওয়া বা বাস্তবায়ন করা হয়, যা সম্ভাব্য ত্রুটির বিপক্ষে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। ফলে এটি ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সমস্যাও দূর করে থাকে।
  • দ্রুত ভুল-ত্রুটি নির্দেশক (Deviation indicator): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিকল্পনার আলোকে সব কাজ সম্পাদন হচ্ছে কি না এবং কাজ সম্পাদনে কোথাও কোনো ভুল-ত্রুটি হচ্ছে কি না, তা দ্রুততার সাথে নির্ধারণ করা হয়।
  • সংশোধন ব্যবস্থার নির্দেশক (Direction of corrective action); নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিকল্পনা বা প্রকৃত কার্যফলের ত্রুটি নির্ণয় করে থাকে। অন্যদিকে কীভাবে ত্রুটি সংশোধন করতে হবে, তা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিয়ে থাকে। তাই নিয়ন্ত্রণ হলো সংশোধন ব্যবস্থার নির্দেশক।
  • পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি (Basis of next plan): নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এর
    মাধ্যমে ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায়। এতে নিয়ন্ত্রণই পথনিদের্শনা দিয়ে দেয়, পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত।

তাই. বলা যায়, ব্যবস্থাপনা কার্যাবলির সর্বশেষ ধাপ হিসেবে নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য একটি আদর্শ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যামান থাকা আবশ্যক।

নমনীয়তাকে কেন নিয়ন্ত্রণের বিশেষ গুণ বলা হয়?

পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পরিবর্তন রাখার সুযোগকে নমনীয়তা বলে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে মিল রেখে ব্যবস্থাপনা কাজ ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করতে হয়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নমনীয়তা বলতে বোঝায়, প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে পরিবর্তন আনা। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় এ গুণের অভাব থাকলে উদ্দেশ্যের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব না-ও হতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি, আয়তন ও সম্পদ সব সময় পরিবর্তনশীল। তাই, পরিবর্তিত অবস্থার সাথে মিল রেখে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এজন্য নমনীয়তাকে নিয়ন্ত্রণের বিশেষ গুণ বলা হয়।

  নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Importance of Controlling

পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অন্যান্য কার্যক্রম যত সুন্দরভাবেই সম্পাদিত হোক না কেন, সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সবকিছুই অর্থহীন হতে পারে। তাই সব স্তরের সব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এর গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

  • পরিকল্পনা বাস্তবায়ন (Implementation of plan): পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কাজগুলো সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন হয় নিয়ন্ত্রণের। প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতির সব তথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যথাসময়ে পাওয়া যায়। ফলে এর মাধ্যমে পরিকল্পনার সঠিক ও সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
  • দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ (Taking prompt action): কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় যেকোনো ভুল-ত্রুটি খুব সহজে ধরা
    পড়ে এবং প্রতিটি সমস্যার সঠিক কারণ সম্পর্কে জানা যায়। চিহ্নিত কারণের আলোকে দ্রুততার সাথে সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি বা দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণ পাওয়া যায়।
  • পরবর্তী পরিকল্পনার মান উন্নয়ন (Developing the quality of next plan): সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দ্বারা দ্রুততার সাথে ভুল-ত্রুটি নিরূপণ ও দূর করা যায়। এ ব্যবস্থা পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি স্থিরীকরণে ও মান উন্নয়নে সাহায্য করে। প্রতিটি বিভাগ ও কর্মী পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা বোঝা যায়। ফলে উদ্দেশ্য অর্জনের পথে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়। এভাবে উত্তম পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব হয়।
  • অর্জিত ফলাফল পরিমাপ (Measuring performance): পরিকল্পনা ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ সম্পাদন হচ্ছে কি না, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করে তা পরিমাপ করা যায়। ফলে কোনো বিচ্যুতি থাকলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে মানসম্মতভাবে কাজ সম্পাদন সম্ভব হয়।
  • বিচ্যুতির কারণ নির্ণয় (Determining the cause of deviation): আদর্শমানের সাথে সম্পাদিত কাজের পার্থক্যকে বিচ্যুতি বলে। এরূপ, পার্থক্য বা বিচ্যুতি থাকলে তার পরিমাণ নিরূপণ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচ্যুতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হয়। এতে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে সহজে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা যায়।
  • সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ (Taking corrective action): কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিকল্পনার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ধরা পড়ে। এছাড়া বিচ্যুতির কারণ ও সমস্যার প্রকৃতি বের করা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এভাবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাকে সাহায্য করে থাকে।
  • সময় ও অপচয় হ্রাস (Minimizing time and wastage): কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের সব কাজ পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। কোথাও সমস্যা হলে সাথে সাথে ধরা পড়ে এবং তা সমাধানের লক্ষ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এভাবে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সময় ও অপচয় কমে যায়।
  • কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টন (Assigning authority and responsibility): সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের বিভিন্ন নির্বাহী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব নির্ধারণ ও বণ্টন করে দেওয়া হয়। ফলে প্রত্যেকের যোগ্যতা ও কাজের দক্ষতা ক্রমেই বেড়ে যায় এবং সহজে প্রত্যেকের কাজ পরিমাপ করা যায়।
  • নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা (Discipline and order): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সাহায্যে ব্যক্তিগত কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। এটি ক্ষেত্রবিশেষে পুরস্কার, তিরস্কার, বহিষ্কার বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়; যা প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সাহায্য করে।

সুতরাং বলা যায়, ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য কাজ হলো নিয়ন্ত্রণ। সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন ও সফলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

  

নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Principles of Controlling

নীতি বা আদর্শ বলতে কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য যথাযথ পথনির্দেশনাকে বোঝায়। নীতি বা আদর্শের মাধ্যমে কী করা উচিত এবং কীভাবে কাজটি করলে লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে, তার নির্দেশনা পাওয়া যায়। নিচে নিয়ন্ত্রণের নীতিগুলো তুলে ধরা হলো-

  • লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Goal oriented); প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্যই নিয়ন্ত্রণ কাজ করা হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে মিল থাকা আবশ্যক। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে মিল না হলে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে নতুন করে জটিলতার তৈরি হয়।
  • উপযুক্ততা (Suitability): উপযুক্ততার নীতি বলতে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত, যা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য যথোপযুক্ত এবং মূল উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক হয়। নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে কাজের প্রকৃতির সাথে মিল থাকলে তা সহজে কার্যকর করা যায়। এজন্য নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি যেক্ষেত্রে যথাযথ বিবেচিত হবে, সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের সেই পদ্ধতি বা কৌশল ব্যবহার করা উচিত।
  • সরলতা (Simplicity): নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সহজ-সরল হওয়া উচিত। এতে সবার কাছে তা বোধগম্য হয়। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রক (যিনি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করবেন) এবং অধীনস্থ (যাদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হবে) সবাই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো যেন সহজে বুঝতে পারেন। নিয়ন্ত্রণ কৌশল অস্পষ্ট হলে তা কখনোই ফলপ্রসূ হয় না। তাই, নিয়ন্ত্রণের বিষয় সবাই বুঝতে পারার মতো হওয়া উচিত।
  • গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability): নিয়ন্ত্রণ একটি কার্যপ্রক্রিয়া এবং এর বাস্তবায়ন হয় অধীনস্থ কর্মীদের মাধ্যমে। অধীনস্থ কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ কৌশল ও এর প্রয়োগবিধিকে মন থেকে মেনে নিলেই সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে সংগঠনের সব স্তরের কর্মীদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়।
  • ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা (Future guidelines): গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার কারণ বের করা এবং ভবিষ্যতে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য নির্বাহীদের কী করা উচিত, তার নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে তা ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
  • নমনীয়তা (Flexibility): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে তা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আগে থেকে নেওয়া ব্যবস্থা সব সময় সঠিক হবে, এরূপ প্রত্যাশা করা যায় না। অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রণীত ব্যবস্থা সংশোধন বা পরিবর্তন করা যেতে পারে। এতে কাজে গতিশীলতা আসে ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে যথাসম্ভব নমনীয় হতে হবে।
  • ব্যতিক্রম (Exception): সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্তৃক সম্ভব নয় এমন ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মব্যবস্থা নেওয়া হলো ব্যতিক্রমের নীতি। সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিচ্যুতি দেখা দিলে সেগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণত ঊর্ধ্বতন নির্বাহী সরাসরি হস্তক্ষেপ করে কাজ সম্পন্ন করেন। তাই ব্যতিক্রম ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষ খেয়াল রাখতে হয়।
  • মিতব্যয়িতা (Economies): সম্পদ ও উপকরণকে দক্ষ ও কার্যকরভাবে, কম খরচে ও সময়ে এবং অপচয় না করে ব্যবহার করাকে মিতব্যয়িতা বলে। মান নির্ধারণ, প্রকৃত কার্যফল মূল্যায়ন, বিচ্যুতির কারণ নির্ণয় প্রভৃতি ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সময় ও খরচ কমে যায়। তাই নিয়ন্ত্রণে মিতব্যয়িতার নীতি অনুসরণ করা অবশ্যই প্রয়োজন।
  • দক্ষতা (Efficiency): দক্ষতা বলতে স্বল্প সময় ও খরচে সঠিকভাবে কাজ সম্পাদনকে বোঝায়। নিয়ন্ত্রণ কাজে বিচ্যুতি নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পরিকল্পনা সঠিকভাবে তৈরি করা যায় না। ফলে নিয়ন্ত্রণ কাজে দক্ষতা বাড়ায়। এজন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দক্ষতার নীতি অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন।
  • মুততা (Promptness): নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে ত্রুটি-বিচ্যুতি বের করে পরবর্তী সময়ে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। তাই বিচ্যুতির বিপরীতে নেওয়া সংশোধনীগুলো যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ (Direct control): নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরোক্ষ না হয়ে প্রত্যক্ষ হওয়া উচিত। অর্থাৎ, যিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং যাদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হয়। এজন্য সাংগঠনিক কাঠামোতে নির্বাহী ও অধীনস্থদের মধ্যে দূরত্ব কম রাখা উচিত।
  • নিরবচ্ছিন্নতা (Continuousness); নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে হওয়া উচিত। পরিবর্তনশীল পরিবেশ-পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কোনো পরিবর্তন, উদ্দেশ্যের পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বারবার পরিকল্পনার পরিবর্তনের সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে হয়।
  • আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার (Use of modern technology): নতুন প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সফলতা আশা করা যায় না। তাই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হওয়া প্রয়োজন। এতে কার্যকর ও সঠিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।

উপসংহারে বলা যায়, ব্যবসায় সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য উল্লিখিত আদর্শের অনুসরণ করা উচিত। এতে নিয়ন্ত্রণের সফল বাস্তবায়ন হবে।

নিয়ন্ত্রণকে কেন পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি বলা হয়?

পরিকল্পিতভাবে কাজ করার পর নির্দিষ্ট সময় শেষে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়-

১. কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়েছে এবং কোনো বিচ্যুতি হয়নি। অথবা,
২. কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়নি এবং বিচ্যুতি হয়েছে।
প্রথম অবস্থা কর্তৃপক্ষকে আশাবাদী করে। ফলে পরবর্তী সময়ে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের আওতা কিছুটা বাড়িয়ে বা টার্গেট বাড়িয়ে পরিকল্পনা তৈরি সম্ভব হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় অবস্থায় বিচ্যুতির কারণ নিরূপণ করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তার আলোকে সংযোজন-বিয়োজন করে পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তাই নিয়ন্ত্রণকে পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি বলা হয়।

  নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Steps of Controlling

ব্যবস্থাপনা কার্যাবলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশেষ কাজ হলো নিয়ন্ত্রণ। ব্যবস্থাপনার সব স্তরে, সব কাজে ধারাবাহিক ও অবিরামভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার প্রথমে পরিকল্পিত টার্গেট বা আদর্শমান প্রতিষ্ঠা করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করা হয়। এরপর আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা করে পার্থক্য বা বিচ্যুতি আছে কি না, যাচাই করা হয়। কোনো প্রকার ঘাটতি বা বিচ্যুতি না থাকলে পরবর্তী সময়ে একই পরিকল্পনা বা কিছুটা বড় পরিসরের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। কিন্তু পার্থক্য বা বিচ্যুতি বের হলে বিচ্যুতির কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিচে আদর্শ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার ধাপ, উপাদান বা পদক্ষেপগুলো চিত্রের সাহায্যে দেখানো হলো-

আদর্শমান প্রতিষ্ঠা (Establishing standard): ব্যবস্থাপনা কাজের শুরুতে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আদর্শমান হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা কাঙ্ক্ষিত কার্যফল প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো আদর্শমান নির্ধারণ বা মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা। আদর্শমান এমন একটি মানদণ্ড, যার আলোকে কাজের প্রকৃত ফলাফল পরিমাপ করা হয়। এটি সংখ্যা, ওজন, আয়, ব্যয়, সময়, ঘণ্টা, একক, পরিমাণ, গ্রেড বা আর্থিক মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে। আদর্শমানই নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি। এটি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা সম্ভব হয় না। তবে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী আদর্শমানের পার্থক্য হয়। যেমন:

  • উৎপাদনের ক্ষেত্রে আদর্শমান সংখ্যা, গুণ ও সময়ভিত্তিক হতে পারে।
  • ব্যয়ের ক্ষেত্রে আদর্শমান প্রত্যক্ষ ব্যয় (Direct cost) ও পরোক্ষ ব্যয় (Indirect cost) হতে পারে।
  • বিনিয়োগের আদর্শমান মোট বিনিয়োগ, সম্পদের পরিমাণ ও ব্যবহার প্রভৃতি হতে পারে।
  • প্রতিবছর ২০% হারে উৎপাদন বাড়ছে। তাই ২০% উৎপাদন বাড়ানোর টার্গেট আদর্শমান হতে পারে।
  • প্রতিষ্ঠানে যে বাজেট তৈরি করা হয় তা-ও আয়-ব্যয়ের আদর্শমান হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • ধরা যাক, একজন শ্রমিককে সপ্তাহে ৪০০ একক পণ্য উৎপাদন করতে হবে। তাহলে এটিও একটি আদর্শমান।

  • প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ (Measuring actual performance): এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময় শেষে বাস্তবে কতটুকু কাজ সম্পাদন হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করে ফলাফল বের করা হয়। বিভিন্নভাবে সম্পাদিত কাজ পরিমাপ করা যায়। যেমন: সিই সম্পাদিত কাজের মৌখিক ও লিখিত বিবরণ পর্যালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ করা, তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রযুক্তি ও সার্কিট ক্যামেরার ব্যবহার।
আদর্শমানপ্রকৃত কার্যফল পরিমাপ
একজন শ্রমিককে সপ্তাহে ৪০০ একক পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এটি একটি আদর্শমান।উল্লিখিত শ্রমিক সপ্তাহে ৩৮০ একক পণ্য উৎপাদন করেছে। এটি প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ।
  • আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা (Comparing actual performance with the standard): প্রকৃত বা সম্পাদিত কাজ পরিমাপের পর এর সাথে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা বা আদর্শমানের তুলনা করা হয়। এ তুলনার মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পরিমাপ এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল বা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বিচ্যুতি থাকলে তার পরিমাণ কতটুকু, তা চিহ্নিত করা হয়। যেমন: একটি বিভাগের সাপ্তাহিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বা আদর্শ হলো ৪০০ একক। কিন্তু সপ্তাহ শেষে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করে দেখা যায়, উৎপাদন হয়েছে ৩৮০ একক। অতএব, বিচ্যুতি হয়েছে (৪০০-৩৮০) একক = ২০ একক। এখানে, বিচ্যুতি = আদর্শমান প্রকৃত কার্যফল। এক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি না থাকলে বা ফলাফল সন্তোষজনক হলে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয় না। তবে অবস্থার প্রেক্ষিতে বা প্রকৃত কার্যফল বেশি হলে। আদর্শমানকে আরও বাড়িয়ে পুনঃনির্ধারণ করা যেতে পারে।
  • বিচ্যুতির কারণ শনাক্তকরণ (Identifying the cause of deviation): নির্ধারিত আদর্শমানের সাথে সম্পাদিত প্রকৃত কার্যফলের সাথে তুলনা করে যে পার্থক্য বের হয়, তাকে বিচ্যুতি বলে। নিয়ন্ত্রণের এ পর্যায়ে আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা করে বিচ্যুতি পাওয়া গেলে তার কারণ শনাক্ত করা হয়। এ বিচ্যুতি অনেক কারণে হতে পারে। যেমন: ভুল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, কর্মচারীদের অনুপস্থিতি ও অদক্ষতা, দুর্বল তদারকি, নিম্নমানের কাঁচামাল, প্রশিক্ষণের অভাব, অনুন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, অনুপযুক্ত কাজের পরিবেশ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি।
  • সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ (Taking corrective action): নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পর্যায়ে চিহ্নিত বিচ্যুতি বা ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেসব কারণে ভুল-ত্রুটি বা বিচ্যুতি হয়েছে সেসব কারণ দূর করার জন্য ব্যবস্থা নিতে হয়। প্রয়োজনে পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজাতে হয়। উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনও হতে পারে। পাশাপাশি সংগঠিতকরণ, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, সমন্বয়সাধন, প্রেষণা এমনকি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন হওয়া আবশ্যক কেন?

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য হলো নিরবচ্ছিন্নতা (Continuity)। পরিবর্তনশীল পরিবেশ, পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কোনো পরিবর্তন, উদ্দেশ্যের পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিরামহীন (Continuous) না হলে আদর্শমানের (Standard) সাথে প্রকৃত কার্যফলের (Performance) ব্যাপক বিচ্যুতি (Deviation) দেখা দিতে পারে। ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন হওয়া আবশ্যক।

  নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Techniques of Controlling

একজন ব্যবস্থাপক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া কার্যকর করতে যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ কৌশল বলা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা কৌশল প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। তবে সব ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি বা কৌশল প্রয়োগ করে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, প্রকৃতি, আয়তন, ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও উপকরণের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। নিচে বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হলো-

বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণ (Budgetary control): পরিকল্পনার সংখ্যাত্মক প্রকাশকে বাজেট বলে। বালেট পরিকল্পনার সংখ্যায়ক প্রকাশ আর এ সংখ্যাত্মক মানের ওপর ভিত্তি করে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাকে বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণ বলে। নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ভিত্তি হিসেবে বাজেট কাজ করে। এর মাধ্যমে দ্রুত বিচ্যুতি নিরূপণ করা সহজ হয়। উৎপাদন পরিকল্পনা, মজুদ পণ্য পরিকল্পনা, বিক্রয় পরিকল্পনা প্রভৃতিকেও বাজেট বলা হয়। এটি বিভিন্ন ধরনের হয়। যথা- মূলধন বাজেট, আয়-ব্যয় বাজেট, বিক্রয় বাজেট। একটি প্রতিষ্ঠানের ২০২০ সালের বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলে তা হবে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় বাজেট। এসব ক্ষেত্রে বাজেটের নির্ধারিত সংখ্যাত্মক মানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা করা হয়। এরপর বিচ্যুতি আছে কি না, বের করা হয় ও প্রয়োজন হলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ (Personal observation): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে অধীনস্থদের কাজের খোঁজ-খবর নেন। ভুল-ত্রুটি পেলে তিনি তা সংশোধনের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। এ পদ্ধতি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন- অধীনস্থদের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে মি. X এক মাস বিক্রয়কাজ তদারকি করলেন। এতে দেখা গেল, বিক্রয় ২০% বেড়েছে। মি. X-এর এ কাজই হলো নিয়ন্ত্রণের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ কৌশল। এর মাধ্যমে অধস্তন কর্মীরা তাদের সমস্যা ও ভুল বুঝতে পারে।

সংখ্যাত্মক উপাত্ত বিশ্লেষণ (Analysing numerical information): যে পদ্ধতিতে সম্পাদিত কাজকে
আদর্শমানের (Standard) সাথে তুলনা করে বিচ্যুতি পরিমাপ করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে পদ্ধতিকে সংখ্যাত্মক উপাত্ত বিশ্লেষণ বলে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, অর্ধ-বার্ষিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে উৎপাদান বা বিক্রির পরিমাণ নির্ধারণ এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতাধীন। ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক উৎপাদনের আদর্শমাত্রা হলো ৫০০ একক। কিন্তু সপ্তাহ শেষে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করে দেখা যায়, উৎপাদন হয়েছে ৪৫০ একক। অতএব, বিচ্যুতি হয়েছে (৫০০ ৪৫০) একক = ৫০ একক। এই বিশ্লেষণের আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষণ (Internal audit): প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন কাজের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ত্রুটি-বিচ্যুতি নিরূপণ ও সংশোধন করার ব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষণ বা নিরীক্ষা বলা হয়। এটি নিয়ন্ত্রণের সাধারণ, বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় কৌশল। বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে হিসাবপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এরূপ নিয়ন্ত্রণ কৌশল বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর দ্বারা জালিয়াতি ও প্রতারণার সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া, কর্মীদের সেবার মান বাড়ে ও সতর্ক থাকে।

আর্থিক হিসাব বিবরণী বিশ্লেষণ (Analysis of financial statement): নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সময় শেষে প্রতিষ্ঠানের
আয়-ব্যয় হিসাব, নগদ প্রবাহ বিবরণী, উদ্বৃত্তপত্র প্রভৃতি প্রস্তুত করাকে আর্থিক হিসাব বিবরণী বলা হয়। নির্দিষ্ট সময় শেষে আর্থিক কাজ সম্পাদনের সংখ্যাত্মক হিসাব বিবরণীকে আয়-ব্যয় হিসাব বলে। প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি বিবরণী থেকে আয়-ব্যয়ের সংখ্যাত্মক তথ্য ও মুনাফার পরিমাণ পাওয়া যায়। ফলে প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে পারছে কি না, তা যাচাই করা যায়। এতে সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লাভজনক একটি কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার আগে বোর্ড মিটিং হবে। এজন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাব কর্মকর্তাকে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিলেন।

বিশেষ প্রতিবেদন (Special report): কোনো কোনো কাজে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপের জন্য বিশেষ
প্রতিবেদন প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠানের ভেতর অথবা বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে কাজ সম্পাদনে বিচ্যুতি (Deviation) চিহ্নিত করা যায় এবং তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়। যেমন- কর্মীদের কর্মস্থল পরিত্যাগের হার বৃদ্ধি, কর্মদক্ষতার উন্নতি না হওয়া, আন্তঃবিভাগীয় সম্পর্কের অবনতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি।

নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ বা পার্ট (Network analysis or PERT): একটি প্রকল্পের উপাদানগুলোকে বিভিন্ন অংশে (কাজ, ঘটনা, স্থায়িত্ব) ভাগ করে তাদের আন্তঃনির্ভরশীলতা ও আন্তঃসম্পর্ক দেখানোর জন্য প্রণীত নকশাকে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ বলে। সাধারণত PERT (Program Evaluation and Review Technique) এর মাধ্যমে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করা হয়। এটি বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে আধুনিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে একটি কাজের সাথে অন্যান্য কাজের আন্তঃসম্পর্ক দেখানো হয়। বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের শুরু ও শেষ হওয়ার মোট সময় একটি তালিকায় দেখানো হয়। সম্পাদনে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে এমন কাজগুলোকে সংযোগ করে টানা রেখা বা গতিপথকে সংকটময় পথ (Critical Path) গুরুত্ব আরোপ করে তালিকা অনুযায়ী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিচে চিত্রের সাহায্যে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণের একটি উদাহরণ দেখানো হলো-বলে। সংকটময় পথের ওপর ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পাদনে যে সময় লাগে তা নিম্নরূপ-

কাজঙ:
সময় (দিন)মার্চ ১০-মার্চ ১২ =৩মার্চ ১০-মার্চ ১২ =৩মার্চ ১৩-মার্চ ১৫=৩মার্চ ১৩-মার্চ ১৯ = ৭মার্চ ১৩ - মার্চ ১৯ = ৭মার্চ ২০ - মার্চ ২৩ = ৪মার্চ ২০ - মার্চ ২১ = ২মার্চ ২৪ - মার্চ ২৮ = ৫

উক্ত নেটওয়ার্ক অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাজ সম্পাদনের তিনটি ধারা নিম্নরূপ:

১. ক-গ-চ-জ→ (৩ + ৩ + ৪ + ৫) দিন = ১৫ দিন

২. খ-ঘ-ছ-জ→ (৩ + ৭ + ২ + ৫) দিন = ১৭ দিন

৩. খ-ঙ-চ-জ→ (৩ + ৭ + ৪ + ৫) দিন = ১৯ দিন (সবচেয়ে বেশি সময়)

এতে দেখা যাচ্ছে, ৩ নং ধারার কাজ সম্পাদনে সবচেয়ে বেশি সময় লাগবে। তাই এটিকেই বলা হবে সংকটময় পথ (Critical Path) বা সংকটময় পথ পদ্ধতি (Critical Path Method- CPM)। কর্তৃপক্ষকে উক্ত ধারার কাজ সম্পাদনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এর কারণ হলো- ঐ ধারাটির কাজ সম্পাদনে যে পরিমাণ সময় বেশি লাগবে সম্পূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নও তত দেরি হবে।

  • বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্তি বিশ্লেষণ (Analysis of return on investment) : প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের ওপর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মুনাফা প্রত্যাশা করে। তাই প্রাপ্ত মুনাফা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অনুযায়ী অর্জিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করতে পারে। বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্তি বিশ্লেষণের দু'টি সূত্র নিম্নরূপ:

মুনাফা-বিনিয়োগ অনুপাত = মোট মুনাফা/মোট বিনিয়োগ

শেয়ার প্রতি প্রাপ্ত মুনাফা অনুপাত =মোট মুনাফা/মোট শেয়ারের সংখ্যা

  • অনুপাত বিশ্লেষণ (Ratio analysis): এ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় বিবরণী (Income statement) ও উদ্বৃত্তপত্র (Balance Sheet) থেকে তথ্য নিয়ে বিভিন্ন অনুপাত নির্ণয় করা হয়। এ অনুপাতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো- চলতি অনুপাত, তারল্য অনুপাত, নিট মুনাফা অনুপাত, ঋণ-মূলধন অনুপাত প্রভৃতি।
  • সমচ্ছেদ বিন্দু বিশ্লেষণ (Break even point analysis): সমচ্ছেদ বিন্দু হলো এমন একটি বিন্দু বা অবস্থা যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রয় আয় ও মোট ব্যয়ের পরিমাণ সমান হয়। অর্থাৎ, মোট আয় মোট ব্যয়। একে 'No profit, no loss বিন্দুও বলা হয়ে থাকে। প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে কী পরিমাণ বিক্রি করতে হবে এবং বিনিয়োগের আয়ের পরিমাণ কী হবে তা সমচ্ছেদ বিন্দু বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়। বিক্রয়ের পরিমাণ এ বিন্দুর উপরে থাকলে প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জন করবে। আর নিচে হলে প্রতিষ্ঠানের লোকসান হবে। তাই BEP বিশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিচে চিত্রের সাহায্যে বিষয়টি দেখানো হলো-

সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যয়কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- স্থায়ী ব্যয় (Fixed cost) ও পরিবর্তনশীল ব্যয় (Variable cost)। স্থায়ী ব্যয় একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত স্থির (Fixed) থাকে। উৎপাদন হোক বা না হোক উক্ত ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে। এ ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হলো- কারখানার ভাড়া, কর্মকর্তাদের বেতন প্রভৃতি। অপরদিকে প্রতিষ্ঠানে কোনো উৎপাদন না হলে পরিবর্তনশীল ব্যয় শূন্য থাকে। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে উক্ত পরিবর্তনশীল ব্যয় এককপ্রতি সমান হারে বাড়তে থাকে। কাঁচামালের ব্যয়, মজুরি প্রভৃতি হলো পরিবর্তনশীল ব্যয়। নিচের সূত্রের সাহায্যে সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয় করা যায়-

সমচ্ছেদ বিন্দু (BEP) =স্থায়ী ব্যয়/এককপ্রতি বিক্রয়মূল্য – এককপ্রতি পরিবর্তনশীল ব্যয়

  • বেঞ্চমার্কিং (Benchmarking) : বেঞ্চমার্কিং হলো একটি কৌশল, যার মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কীভাবে বেশি মানসম্পন্ন পণ্য বা সেবা উৎপাদন করছে তা জেনে সে অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদন করা হয়। এ কৌশলে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানের পণ্যমানকে নিজেদের পণ্যের জন্য আদর্শমান হিসেবে ধরে নিজস্ব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
  • গ্যান্ট চার্ট (Gantt chart): আমেরিকান প্রকৌশলী হেনরি লরেন্স গ্যান্ট (Henry Laurence Gantt) ১৯১৭ সালে গ্যান্ট চার্ট উদ্ভাবন করেন। কাজকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে প্রতিটি উপকাজ বা বিভক্ত অংশ সম্পাদনের শুরু ও শেষ সময় এবং অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রেখাচিত্রের সাহায্যে দেখানোকে গ্যান্ট চার্ট বলে। এর মাধ্যমে একটি প্রকল্পের কাজকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করা হয়। এরপর প্রতিটি কাজের জন্য কত সময়ের প্রয়োজন, তা রেখাচিত্রে উপস্থাপন করা হয়। উক্ত রেখাচিত্রকে গ্যান্ট চার্ট বলা হয়। এই চার্ট ব্যবহার করে সহজে যেকোনো কাজ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পাদন সহজ হয়। নিচে একটি স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পের গ্যান্ট চার্ট দেখানো হলো-

মিতব্যয়ী ফরমায়েশ পরিমাণ (Economic order quantity): প্রতিষ্ঠানের মজুদ মাল নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো মিতব্যয়ী ফরমায়েশ পরিমাণ (EOQ) নির্ধারণ। এ পদ্ধতিতে সেই পরিমাণ পণ্যের ফরমায়েশ (Order) করা হয়, যাতে ফরমায়েশ ব্যয় (Ordering cost) ও বহন ব্যয় (Carrying cost) কমার সাথে সাথে মোট ব্যয়ও (Total cost) কম হয়। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে উৎপাদন কাজ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রকার পণ্য মজুদ রাখে। মজুদের সাথে বিভিন্ন ধরনের খরচ জড়িত, যা মুনাফার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তাই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত মজুদ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রয়োজনের চেয়ে কম মজুদও প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই EOQ কৌশলের সাহায্যে মিতব্যয়ী ফরমায়েশের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। ফলে মজুদ পণ্যের ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। EOQ নির্ণয়ের সূত্রটি হলো:

সুতরাং বলা যায়, নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা যায়। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধামতো কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া সহজ হয়।

  নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Various Types of Controlling System in Business Organization

প্রতিষ্ঠানে সচরাচর ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-

  • কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ (Structural control): লক্ষ্য অর্জনে সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন উপাদান পরিকল্পনা
    অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করাকে কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বলে। নির্ধারিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সাংগঠনিক কাঠামোর উপাদান কীভাবে কাজ করে, তা নির্ণয়ে এটি ব্যবহৃত হয়। কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ দু'প্রকার।
    যথা:

    i. আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ (Bureaucratic control): কর্মীদের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য নিয়ম-নীতি, আদর্শ, পদ্ধতি এবং আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হলো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। এটি কঠোর আইন-কানুন এবং অনমনীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সফলতার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কর্মীদের অংশগ্রহণের তেমন সুযোগ থাকে না।

    ii. মূল্যবোধভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ (Value based control): সাংগঠনিক আদর্শ, মূল্যবোধ, প্রত্যাশিত আচরণ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে অনানুষ্ঠানিক নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হলো মূল্যবোধভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। একে বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralized) নিয়ন্ত্রণও বলা হয়। সাধারণত কর্মীদের আনুগত্য বাড়ানোর জন্য এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরূপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কর্মী নিজেকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

  • কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ (Strategic control); কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ সংগঠনের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের সুযোগ-সুবিধা ও নিজেদের শক্তিসমূহকে সর্বাধিক কাজে লাগানোর সাথে জড়িত। এর সাহায্যে প্রতিষ্ঠানের নেওয়া রণনীতিগুলোকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ সহায়তা করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
  • কার্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ (Functional control): কার্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ব্যবসায় সংগঠনের বিভিন্ন কাজ সম্পাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ নিয়ন্ত্রণে বাজেট, কর্মসূচি ও উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কৌশল ব্যবহার করা হয়।
  • উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ (Production control): উৎপাদনের কাম্যমাত্রা ও গুণগত মান বজায় রাখার জন্য দক্ষতার সাথে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ সংযোজন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা ও সংশোধনীর ব্যবস্থা নেওয়াকে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ বলে।
  • আর্থিক নিয়ন্ত্রণ (Financial control): এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ও কোন খাতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অতএব বলা যায়, ব্যবসায় সংগঠনে বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রচলন আছে। এসব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এতে সাফল্য অর্জন সহজ হয়।

  নিয়ন্ত্রণ  - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...