প্রেষণার গুরুত্ব (৭.৪)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

Importance of Motivation

শুধু নির্দেশ পেয়েই কর্মীরা কাজ করে না। বরং, তাদের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহও তৈরি করতে হয়। কাজের প্রতি কর্মীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব নয়। কারণ, যন্ত্রের মতো মানুষকে সহজে ব্যবহার করা যায় না। একজন মানুষ শারীরিকভাবে উপযোগী হলেও মানসিকভাবে কাজের জন্য সব সময় প্রস্তুত না-ও থাকতে পারে। কর্মীকে সঠিকভাবে উৎসাহিত করতে পারলে তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজ করানো যায়। নিচে প্রেষণার গুরুত্ব বর্ণনা করা হলো-

সহজে লক্ষ্যর্জন (Easy achievement of goal): কর্মীদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ আদায় করিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেষণার বিকল্প নেই। প্রেষণার ফলে তাদের কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যায়। ফলে তারা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা প্রভৃতির সুষ্ঠু ব্যবহার করে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির কাজ সম্পাদনের মাত্রা তার সামর্থ্য, জ্ঞান ও প্রদত্ত প্রেষণার ওপর নির্ভর করে। এটি একটি গাণিতিক সূত্র দিয়ে দেখানো যায়। আর তা হলো-

P=M (A+K)

এখানে, P = Performance (কাজ সম্পাদন);

M = Motivation (প্রেষণা);

A = Ability (সামর্থ্য);

K = Knowledge (জ্ঞান)।

অর্থাৎ, প্রেষণার মাধ্যমে ব্যক্তির শক্তি ও সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।

  • কর্মপ্রচেষ্টা সর্বোচ্চকরণ (Maximizing effort): উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাবে কর্মীরা তাদের সামর্থ্য পূর্ণমাত্রায়
    ব্যবহার করতে পারে না। কাজ সম্পাদনে স্বতঃস্ফূর্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হয় না। প্রেষণা প্রক্রিয়ায় কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের মধ্যে কাজ করার ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে তোলা হয়। এভাবে, প্রেষণার মাধ্যমেই কর্মীদের কর্মপ্রচেষ্টা সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করা যায়।
  • কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি (Creation of eagerness to work): প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে প্রেষণা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রেষণার উদ্দেশ্য হলো কর্মীকে কাজে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত করা। এর মাধ্যমে কর্মীদের অভাব-অভিযোগ, দাবি-দাওয়া ও আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হয়। ফলে কর্মীরা লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। এতে অসন্তোষ নিরসন হয় ও কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।
  • সহজ তত্ত্বাবধান (Easy supervision): কর্মীদের সঠিকভাবে প্রেষণা দিলে কাজের প্রতি তাদের একাগ্রতা ও মনোযোগ বেড়ে যায়। ফলে তাদেরকে নিবিড়ভাবে তদারক করার প্রয়োজন হয় না। শুধু নির্দেশনা দিলেই সে অনুযায়ী কাজ সম্পাদনের দিকে তারা এগিয়ে যেতে পারে। এতে তত্ত্বাবধানজনিত ব্যয় কমে যায়।
  • সম্পর্কের উন্নয়ন (Development of relationship): প্রেষণা প্রক্রিয়ায় কর্মীদের আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করা হয় বলে কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ তৈরি হয়। এতে কর্মীরা বেশি উৎপাদনের চেষ্টা করে এবং শ্রমিক-মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হয়। এছাড়া, সঠিক শ্রম-ব্যবস্থাপনার ফলে তাদের মধ্যে উত্তম ও আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
  • মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার (Maximum utilization of human resources): মানবসম্পদ প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। প্রতিষ্ঠানের সফলতা মূলত মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। এজন্য প্রেষণা প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা দিয়ে কর্মীদের মনে কাজ করার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা হয়। এতে তাদের যোগ্যতার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
  • অপচয় হ্রাস (Minimizing wastage): প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজন পূরণ করা হয়। এতে তাদের কাজে সন্তুষ্টি ও আগ্রহ বেড়ে যায়। ফলে কর্মীদের মনোবল বাড়ে ও দক্ষতার উন্নয়ন হয়। এছাড়া, প্রেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কাজ করে। কাজ সম্পাদনে তারা বেশি যত্নবান হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানে শ্রম, সময় ও সম্পদের অপচয় বা অপব্যয় কমে যায়।
  • উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Increase in productivity): উপকরণ ও উৎপাদনের অনুপাতকে উৎপাদনশীলতা বলে। সঠিকভাবে প্রেষণা দেওয়ার ফলে কাজের প্রতি কর্মীদের আগ্রহ ও উৎসাহ বাড়ে। এতে তারা অল্প পরিশ্রমেই বেশি কাজ করতে পারে। এভাবে প্রেষণার মাধ্যমে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
  • দক্ষতা বৃদ্ধি (Increase in efficiency): অর্থ, সময়, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণ অপচয় না করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের সামর্থ্যকে দক্ষতা বলা হয়। নিজের ইচ্ছায় ও আনন্দের সাথে কাজ করলে, কর্মীদের কাজের দক্ষতা বাড়ে। তারা অল্প সময়ে ও কোনো কিছুর অপচয় না করে কাজ করে। ফলে প্রেষণার মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ে।
  • সহজ পরিবর্তন (Easy to change): কর্মীদের সঠিকভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা বেড়ে যায়। যেকোনো ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্তের প্রতি তারা অনুগত থাকে। ফলে কোনো পরিবর্তন (প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি, পদোন্নতির নতুন নীতিমালা, নতুন সংগঠন কাঠামো ও প্রশাসন পদ্ধতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অনেক সহজ হয়।
  • জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Development of living standard): কর্মীদের প্রেষণা দানের সুফল হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের পরিমাণ ও মুনাফা বাড়ে। ফলে পরোক্ষভাবে কর্মীদের গুরুত্ব, তাদের পারিশ্রমিক ও আয় বেড়ে যায়। এগুলো তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়।
  • আচরণের উন্নয়ন (Development of behaviour): প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের বিভিন্ন প্রকার আর্থিক ও অনার্থিক চাহিদা পূরণ করা হয়। অভাব পূরণ হয়ে গেলে তারা সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয়। এতে তাদের আচরণ আগের চেয়ে ইতিবাচক হয়। এভাবে প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের আচরণগত উন্নয়ন হয়ে থাকে।
  • শ্রম ঘূর্ণায়মানতা হ্রাস (Reducing labour turnover): কোনো নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের আসা-যাওয়ার (চাকরি ছেড়ে যাওয়া) অনুপাত বা হারকে শ্রম ঘূর্ণায়মানতা বলে। সাধারণত প্রেষণা পেলে কর্মীরা তাদের বর্তমান চাকরিতেই সন্তুষ্ট থাকে। তারা চাকরি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে আগ্রহী হয় না। তাই, কর্মীদের উপযুক্ত উপায়ে প্রণোদিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী ধরে রাখা সম্ভব হয়। এভাবে শ্রম ঘূর্ণায়মানতা কমে যায়।

উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রেষণার উদ্দেশ্য হলো কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা; যেখানে কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে প্রবল আগ্রহ, উদ্যম ও কৌতূহলের সাথে কাজ করতে পারে। প্রেষণার ফলে উচ্চ মনোবল, কাজের সন্তুষ্টি, দায়িত্ব সচেতনতা, আনুগত্য ও শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে যেকোনো জটিল কাজ সম্পাদনে কর্মীরা সচেষ্ট থাকে। এজন্য ব্যবস্থাপনাকে এ ব্যাপারে অনেক কৌশলী ও সচেতন হতে হয়।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...