Theories of Leadership
নেতার সফলতাই প্রতিষ্ঠানের সফলতা। তাই নেতৃত্ব কী বা নেতৃত্ব কী রকম হওয়া উচিত, এসব বিষয়ে বিভিন্ন দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। এর ফলে নেতৃত্ববিষয়ক অনেক তত্ত্বের সৃষ্টি হয়েছে। নিচে নেতৃত্ব-সম্পর্কিত বহুল প্রচলিত তত্ত্ব বা মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা হলো-
১. নেতৃত্বের গুণ বা বৈশিষ্ট্যভিত্তিক মতবাদ (Trait theory of leadership): নেতৃত্বের গুণ বা বৈশিষ্ট্যভিত্তিক মতবাদ কতকগুলো সনাতন বৈশিষ্ট্য ও ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, বংশানুক্রমিকভাবে নেতা জন্মগ্রহণ করেন। একজন নেতা জন্মগতভাবেই নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এটি নেতৃত্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম তত্ত্ব। এ তত্ত্বকে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হতো। প্রাচীনকালে গ্রিস ও রোমান গবেষকদের বিশ্বাস ছিল, "নেতা' গড়ে ওঠে না; নেতা জন্মলাভ করে"। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, যোগ্য নেতা হওয়ার জন্য যেসব গুণ থাকা দরকার তা হলো- উদ্যম, চারিত্রিক সরলতা ও সততা, কল্পনাশক্তি, দৃঢ়চেতা, সাহসিকতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, উদ্যোগী, সামাজিকতা, শক্তি, বিশ্বাস, যত্নশীল, উদারতা, সহযোগিতা প্রভৃতি।
২. নেতৃত্বের ঘটনা সাপেক্ষ/ পরিস্থিতি তত্ত্ব (Contingency/ situational theories of leadership): পরিস্থিতিবাদীদের মতে, কেবল কতিপয় গুণ আর নেতার কতগুলো ইতিবাচক আচরণই সফল নেতার সৃষ্টি করে না। তাদের মতে, পরিবেশ-পরিস্থিতিই নেতা সৃষ্টি করে। পরিস্থিতিভিত্তিক নেতৃত্ব তত্ত্বের মধ্যে প্রথম বিশদ মডেল উপস্থাপন করেন মনস্তত্ত্ববিদ Fred E. Fiedler। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল ব্যক্তিত্বের গুণাবলির দ্বারা কেউ নেতা হন না। নেতার সফলতা বা কার্যকারিতা নির্ভর করে নেতার অনুপ্রাণিতকরণের পদ্ধতি এবং নেতার জন্য পরিস্থিতি কতটা অনুকূল বা প্রতিকূল, এ দুই উপাদানের ওপর। নিচে উপাদান দুটি ব্যাখ্যা করা হলো-
- নেতৃত্বের ধরন (Leadership styles): ফ্রেড ফিডলার নেতৃত্বের দুটি ধরনের কথা উল্লেখ করেছেন-
(১) কার্যকেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Task oriented leadership) (২) সম্পর্ককেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Relation oriented leadership)। দুই প্রকারের নেতৃত্বের মধ্যে নেতা অবশ্যই যেকোনো এক ধরনের হবেন।
- পরিস্থিতিমূলক চলক (Situational variables): ফ্রেড ফিডলার-এর মতে, তিনটি চলক বা বিষয় সফল নেতৃত্বের ধরন নির্ধারণে সহায়তা করে। যথা- (১) পদসংক্রান্ত ক্ষমতা, (২) কার্য কাঠামো, (৩) নেতা-কর্মী সম্পর্ক। এ তিনটি চলক ইতিবাচক হলে কাজ পরিচালনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয় এবং সফলতার সাথে কর্মীদের লক্ষ্য অর্জনে পরিচালনা করা যায়।
৩.নেতৃত্বের লক্ষ্য অভিমুখী তত্ত্ব বা মতবাদ (Path-Goal theory of leadership): এ তত্ত্বটি সত্তরের দশকে Martin Evans & Robert House-এর গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে উদ্ভূত। এ তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো নেতা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন, উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করবেন, উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৌশল গ্রহণ করবেন। এ মতবাদে গবেষকদ্বয় ১৯৭৪ সালে নেতার চার ধরনের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ:
- নির্দেশনামুখী নেতৃত্ব (Directive leadership): নির্দেশনামূলক নেতৃত্বে নেতা অধস্তনদের কীভাবে কাজ করতে হবে তা নির্দেশ দেন ও তার প্রত্যাশা জানিয়ে দেন।
- সমর্থনমূলক নেতৃত্ব (Supportive leadership): এ তত্ত্বে অধস্তনদের প্রতি নেতার আচরণ বন্ধুত্বপূর্ণ ও
সহযোগিতামূলক। নেতাকর্মীদের প্রয়োজন/চাহিদার প্রতি সজাগ থাকেন, কল্যাণের ব্যবস্থা করেন এবং উত্তম কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এর ফলে অসন্তুষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়। - অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব (Participative leadership): যে নেতৃত্বে অধস্তনদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাকে অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব বলে। এরূপ নেতৃত্বে অধস্তনরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
- সাফল্য অর্জনমূলক নেতৃত্ব (Achievement oriented leadership): এ জাতীয় নেতৃত্বে নেতা অধস্তনদের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। তিনি কর্মীদের কাছ থেকে উচ্চমানের কাজ প্রত্যাশা করেন। এরূপ নেতৃত্বের ফলে কর্মীদের কাজে সফলতা বা অগ্রগতি আসে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং মনোবল বাড়ে।
৪. ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড নেতৃত্ব তত্ত্ব (Managerial Grid Approach): Robert R. Blake (রবার্ট আর, ব্লেক) ও Jane Moution (জেনি মশন) ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড তত্ত্বের উদ্ভাবক। তারা দেখেছেন, কয়েকজন নেতার মধ্যে উৎপাদনের মান কেমন হচ্ছে, লক্ষ্য কেন অর্জিত হচ্ছে না, উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায় প্রভৃতি বিষয়ে উদ্বেগ কাজ করে (Concern for production)। এজন্য তারা উৎপাদন ক্ষেত্রে উন্নতমানের নীতি, কৌশল, প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অন্যদিকে, কয়েকজন নেতা কর্মীরা কতটা সন্তুষ্ট, তাদের প্রত্যাশ্যা পূরণ, তাদের আন্তঃসম্পর্ক প্রভৃতি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন (Concern for people)। এক্ষেত্রে তারা উত্তম কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মীদের আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। Blake ও Moution এই দু'ধরনের আচরণের মধ্যে সমন্বয়ের উপায় তুলে ধরেছেন।
এক্ষেত্রে উদ্ভাবকদ্বয় কর্মী ও উৎপাদন দু'টি বিষয়ের ওপরই নেতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলেছেন। এজন্য নেতারা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ, পদ্ধতিগত উন্নয়নসহ কর্মীদের প্রয়োজন পূরণ ও সন্তুষ্টি অর্জনে সঙ্গতি বিধানের পরামর্শ দেন। এই সমন্বয় ব্যবস্থাই ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড তত্ত্ব নামে পরিচিত।
৫. নেতৃত্বের মোহনীয়/সম্মোহনী তত্ত্ব (The charismatic theory of leadership): নেতার মনোমুগ্ধকর শক্তির দ্বারা অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত করার প্রক্রিয়াকে মোহনীয় নেতৃত্ব বলে। Robert House সর্বপ্রথম ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মোহনীয় নেতৃত্ব তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন। তিনি মোহনীয় নেতার তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো: (১) মোহনীয় নেতা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হন; (২) নেতা স্বীয় বিশ্বাস ও নীতিতে সর্বদা দৃঢ় থাকেন। (৩) লোকদের প্রভাবিত করার জন্য আত্মপ্রত্যয়ী থাকেন। এ ধরনের নেতা অনুসারীদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেন ও তাদের কাজের ওপর আস্থা রাখেন।
৬. রূপান্তরী নেতৃত্ব তত্ত্ব (Transformational leadership approach): Bernard M. Bass এ তত্ত্বের প্রবক্তা। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, রূপান্তরী নেতৃত্ব হচ্ছে সাধারণ প্রত্যাশাকে পেছনে ফেলে কোনো বিশেষ দায়িত্ববোধকে অন্যের কাছে তুলে ধরা, নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে অনুপ্রাণিত করা। সাধারণত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন কিছু গ্রহণ করতে অধস্তনরা তাৎক্ষণিকভাবে রাজি থাকেন না। এতে পরিবর্তনের সাথে তাল মেলানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, নেতা পরিবর্তনকে সহজে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরিতে অধস্তনদের উদ্বুদ্ধ করেন। এজন্য অনেকে এরূপ নেতৃত্বকে উদ্দীপনামূলক নেতৃত্ব (Inspitrational leadership) নামেও অভিহিত করে থাকেন।
৭. নেতৃত্বের আদান-প্রদানভিত্তিক তত্ত্ব (Transactional theory of leadership): এ তত্ত্ব অনুযায়ী নেতা তার অনুসারীদেরকে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অবহিত করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করিয়ে নেন। এতে অনুসারীদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। এক্ষেত্রে নেতা কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সংগঠনকে কার্যকরভাবে ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন।
Read more