প্রশিক্ষণ পদ্ধতি : কাজের বাইরে প্রশিক্ষণ (৫.২১)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

Traning Methods of the job Training

খ. কাজের বাইরে প্রশিক্ষণ (Off the Job Training):

যে প্রক্রিয়ায় কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে তথা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মধ্যে ব্যস্ত না রেখে অন্য কোনো স্থানে বা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাকে কাজের বাইরে প্রশিক্ষণবলে। এরূপ প্রশিক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সম্পাদনকালীন দেওয়া হয় না। কাজ থেকে পৃথক করে এরূপ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কর্মীরা তাদের নির্দিষ্ট কাজ থেকে পৃথক হয়ে প্রথমে কোনো বিষয়ে শিক্ষালাভ করে। এরপর সেগুলোকে নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের চেষ্টা করে। এটি নিম্নোক্তভাবে হতে পারে-

  • বক্তৃতা পদ্ধতি (Lecture method): প্রশিক্ষণার্থীদের একত্রিত করে কোনো প্রশিক্ষক বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে দিয়ে বক্তৃতাদানের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাকে বক্তৃতা পদ্ধতি বলে। প্রশিক্ষণার্থীদের মনে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা প্রশিক্ষকের কাছ থেকে জেনে নিতে পারে। বিশেষ কোনো ঘটনা, ধারণা, নীতি, অভিব্যক্তি, তত্ত্ব বা সমস্যা সমাধানে দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি অধিক কার্যকর হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।

  • আলোচনা পদ্ধতি (Discussion method): ঊর্ধ্বতন নির্বাহীরা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রশিক্ষণার্থী বা অধীনস্থদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে শিক্ষাদান করার পদ্ধতিকে আলোচনা পদ্ধতি বলে। এতে একদিকে ঊর্ধ্বতন নির্বাহীরা অধীনস্থদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে। অপরদিকে অধীনস্থ কর্মীরাও নির্বাহীদের প্রত্যাশা, কাজের দিকনির্দেশনা প্রভৃতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পেতে পারে। কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া ও জটিল সমস্যা দূর করায় এটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কাজের ক্ষেত্রে উৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক কিছু জানার ও শেখার সুযোগ পায়। এটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • সেমিনার পদ্ধতি (Seminar method): অংশগ্রহণকারীদের পড়ালেখা বা শিক্ষাগত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নির্দিষ্ট লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন ও আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করাকে সেমিনার পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতি সাধারণত একদিনের জন্য হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উত্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের নিজ নিজ মতামতসহ আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে তারা মুক্তচিত্তে নিজেদের ধারণা ও জ্ঞানের আলোকে আলোচনা করে থাকে। সবশেষে সবার মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কার্যপত্র তৈরি করা হয়। নির্বাহী বা কর্মকর্তাদের ধারণাগত উন্নয়নে এরূপ পদ্ধতি খুবই কার্যকর। এটি একজন নিয়ন্ত্রক বা সুপারভাইজার পরিচালনা করে থাকেন। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি, আউটসোর্সিং, অনলাইনে আয় প্রভৃতি বিষয়ে সেমিনার হতে দেখা যায়।

  • অধিবেশন পদ্ধতি (Conference method): একজন সভাপতির নেতৃত্বে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে দলগত আলোচনা ও সভা করে মতামত ও ধ্যান-ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিকে অধিবেশন পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতি সাধারণত কয়েক দিনব্যাপী এবং ভিন্ন ভিন্ন পর্বে/সেশনে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সুপারভাইজার বা মধ্য পর্যায়ের নির্বাহীদের উন্নয়নের জন্য এরূপ পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এতে একসাথে অনেক প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিতে পারে। এরূপ পদ্ধতিতে আলোচ্য সূচি (Agenda) থাকে এবং সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীরা আগে থেকে নির্ধারিত বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেয়। এতে তারা বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা করে এবং নিজেরাই এগুলোর সমাধানের উপায় তুলে ধরে। একজন উচ্চ পর্যায়ের নির্বাহী অধিবেশনের কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করেন। এর মধ্যদিয়ে আলোচ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট মতামত গড়ে ওঠে। এটি তারা নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে থাকে। এভাবে এক পর্যায়ে নির্বাহীদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজস্ব চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়ে। ট্রেড কনফারেন্স, বিজনেস কনফারেন্স প্রভৃতি এরূপ পদ্ধতির
  • উদাহরণ।উপপ্রকোষ্ঠ পদ্ধতি (Vestibule method): কর্মী পরবর্তী সময়ে যে পরিবেশে কাজ করবে হুবহু সেই রকম একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে প্রশিক্ষক দ্বারা কর্মীকে কাজ শেখানোর পদ্ধতিকে উপপ্রকোষ্ঠ পদ্ধতি বলে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্বল্প সময়ের জন্য পরিচালিত হয়ে থাকে। এ পদ্ধতি অনুযায়ী নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে নেওয়া হয়। উক্ত কক্ষে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কলকব্জা, কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে কর্মীদের বাস্তব ধারণা দেয়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর করণীয় সম্পর্কে ধারণা লাভের ক্ষেত্রে এ প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বেশ উপযোগী।

  • ঘটনা পদ্ধতি (Case study method): প্রশিক্ষণার্থীদের কোনো একটি কেইস বা জটিল ঘটনা নিয়ে দলগতভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান তৈরির মাধ্যমে শিক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিকে ঘটনা বা কেইস স্টাডি পদ্ধতি বলে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল কর্তৃক প্রবর্তিত প্রশিক্ষণের এ পদ্ধতি বর্তমান বিশ্বে বেশ কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এটি একটি দলগত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। এতে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে কোনো ঘটনা উপস্থাপন করে তা পর্যালোচনা করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়। এভাবে বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নিতে নিতে কর্মীরা সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে থাকে। দলগতভাবে নির্বাহীদের উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর উপায় হিসেবে ঘটনা পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়। এরূপ প্রশিক্ষণের ফলে নির্বাহীদের চিন্তাশক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তাদেরকে অভিজ্ঞ করে তোলা যায়।

  • ওয়ার্কশপ/কর্মশালা পদ্ধতি (Work-shop method): প্রশিক্ষণার্থীদের কোনো একটি বিষয় বা কাজ নিয়ে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে উত্ত বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করাকে কর্মশালা পদ্ধতি বলে। অনেক সময় বড় অধিবেশনের একটি সেশনে বা অংশে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কর্মশালার সদস্য সাধারণত ৫০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এটি ২/৩ ঘণ্টা থেকে অর্ধদিবসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আগে থেকে নিবন্ধন করতে হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের সুপারিশ সঠিক না হলে প্রশিক্ষক নিজে বা সবার সাথে মতবিনিময় করে তা সংশোধনের দিকনির্দেশনা দেয়। এভাবে ধীরে ধীরে নির্বাহীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বাড়তে থাকে। নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ের নির্বাহীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বেশি কার্যকর হতে দেখা যায়।
  • নাট্যাভিনয় পদ্ধতি (Role playing method): কোনো বিশেষ কাজ সম্পাদন বা সমস্যা মোকাবিলায় কর্মী বা
    প্রশিক্ষণার্থীদের ভূমিকা কী হবে, তা নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করে শিক্ষা নেওয়াকে নাট্যাভিনয় বা ভূমিকা অভিনয় পদ্ধতি বলে। সাধারণত প্রশিক্ষণার্থীরাই এসব নাটকে অভিনয় করে। বিভিন্ন ঘটনা নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করে প্রশিক্ষণার্থীরা সহজেই এসব বিষয়ে ধারণা পেয়ে থাকে। এর মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো যায়। এভাবে তাদের ধারণাগত দক্ষতা বেড়ে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জিত হয়।
  • অনুভূতিপ্রবণ বা সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ পদ্ধতি (Sencitivity training method): উচ্চ পর্যায়ের নির্বাহীদের
    মানবীয় আচরণগত বিষয়ে মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে দলীয় গতিশীলতা, নিজস্ব আচরণ, আন্তঃব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য এবং দলগত ভূমিকা নিয়ে সচেতন করার পদ্ধতি হলো সংবেদনশীল পদ্ধতি। এটি একটি অবকাঠামোগত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, 'যাতে কোনো প্রশিক্ষক থাকে না। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের নির্বাহীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য একত্রিত করা হয়। এরপর তাদের সামনে মানবীয় আচরণগত কোনো সমস্যা উত্থাপন করে প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে বলা হয়। অবশেষে যার মতামত বেশি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় তার সাথে অন্যরা নিজেদের মতামতকে মিলিয়ে নেয়। এভাবে প্রত্যেকের চিন্তাশক্তি উন্নতির সাথে সাথে নিজের সম্পর্কে গড়ে ওঠা উঁচু কিংবা নিচু ধারণা (অহংবোধ) দূর হয়। এতে পুরোনো ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন হয়ে নতুন ধারণা ও মানসিকতার উন্নতি হতে থাকে।
  • অনলাইন বা ই-ট্রেনিং (Online or e-training): নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে না গিয়ে ইন্টারনেটে বা অনলাইনে
    কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিলে তাকে অনলাইন বা ই-ট্রেনিং বলে। ব্যবস্থাপকদের ব্যস্ততা বর্তমানে এতটাই বেড়েছে যে, তাদের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে সময় দেওয়া কঠিন। এজন্য ই-লার্নিং ও ই-ট্রেনিং ব্যবস্থাপক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বলা হয় ইলেকট্রনিক লার্নিং বা সংক্ষেপে ই-লার্নিং। ই-লার্নিং ও ই-ট্রেনিং বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এই প্রযুক্তি শিক্ষকের ভিডিও ক্লিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট ইচ্ছেমতো বারবার দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি ভিডিও কনফারেন্সিং প্রযুক্তির আবিষ্কার প্রকৃতপক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে দূরে রেখেও মুখোমুখি বসাতে পেরেছে। যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন: স্কাইপি, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি। তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় এসব যোগাযোগ মাধ্যম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেখানে নির্বাহীরা ভর্তি হয়। এতে বিভিন্ন নোট প্রাপ্তি, ক্লাস অনুষ্ঠান ছাড়াও নির্বাহীরা পর্যায়ক্রমে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এক্ষেত্রে ফলাফলের ওপর প্রশিক্ষণার্থীকে সনদও দেওয়া হয়।

    উপসংহারে বলা যায়, প্রশিক্ষণ হলো নিয়োজিত কর্মীদের উন্নত করার একটি প্রক্রিয়া। আর এজন্য উপরিউক্ত পদ্ধতিসমূহ সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী বা নির্বাহীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য কোন ধরনের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অধিক উপযোগী তা নির্ভর করে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু, প্রতিষ্ঠানের আকৃতি, প্রকৃতি, সামর্থ্য, কর্তৃপক্ষের মানসিকতা ও প্রশিক্ষণার্থীদের যোগ্যতার ওপর।

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...