প্রেষণা চক্র (৭.৩)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

Motivation Cycle

প্রেষণা একটি ধারাবাহিক বা অবিরাম প্রক্রিয়া। অভাবই হলো প্রেষণার মূল ভিত্তি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত কর্মীদের সব সময়ই বহুমুখী প্রয়োজন ও অভাব দেখা দেয়। এ অভাবসমূহ পূরণের লক্ষ্যে তাদের মধ্যে তাড়না সৃষ্টি হয়। কর্মীরা বিভিন্ন আচরণে তা প্রকাশ করে থাকে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের কাজ হলো কর্মীদের অভাব চিহ্নিত করে তা পূরণের ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে কর্মীরা ইতিবাচক আচরণে উদ্বুদ্ধ হয়। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ কাজটিকেই বলা হয় প্রেষণা।

অর্থাৎ, কোনো অভাববোধের প্রেক্ষিতে যে প্রেষণা প্রক্রিয়া শুরু হয় তা সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তির পর পুনরায় নতুন করে আরেকটি অভাবের সৃষ্টি হয়। এভাবে যে প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাকে প্রেষণা চক্র বলে। উক্ত চক্রে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ আছে। বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা বিশারদ এ চক্রকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এর কয়েকটি হলো-

ব্যবস্থাপনা বিশারদপ্রেষণা প্রক্রিয়ার ধাপ/পদক্ষেপ

১. ডিসেঞ্জো এবং রবিন্স

(Decenzo & Robbins)

  • অতৃপ্ত চাহিদা (Unsatisfied need);
  • উদ্বেগ (Tension);
  • তাড়না (Drives);
  • আচরণ অনুসন্ধান (Search behaviour);
  • লক্ষ্য অর্জন (Goal achievement);
  • সন্তুষ্টি বা তৃপ্তি অর্জন (Need satisfaction) এবং
  • উদ্বেগ হ্রাস (Reduction of tension)।
২. গ্রিফিন (Griffin)
  • অভাব বা ঘাটতি (Need or deficiency);
  • সন্তুষ্টি বা তৃপ্তি অর্জনের উপায়সমূহ অনুসন্ধান (Search for ways to satisfy need);
  • অভাব পূরণ বা সন্তুষ্টি বা তৃপ্তি অর্জনের আচরণ নির্ধারণ (Choice of behaviour to satisfy need);
  • সন্তুষ্টি অর্জন মূল্যায়ন (Evaluation of need satisfaction);
  • ভবিষ্যৎ অভাব নির্ধারণ ও সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় অনুসন্ধান (Determination of future needs and search/choice for satisfaction);
  • অতৃপ্ত চাহিদা (Unsatisfied need);
  • লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ (Goal directed behaviour) এবং
  • সন্তুষ্টি অর্জন (Need satisfaction)।
৩. টেরি এবং ফ্রাঙ্কলিন (Terry and Franklin) *৪
  • ব্যক্তিক চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা (Personal need or desire);
  • তাড়না (Drives) এবং
  • লক্ষ্য (Goals)1

৪. ডনেলি এবং তার

সহযোগীগণ (Donnelly and his Associates)

  • অতৃপ্ত চাহিদা (Unsatisfied need);
  • লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ (Goal directed behaviour) এবং
  • সন্তুষ্টি অর্জন (Need satisfaction) ।

ব্যবস্থাপনা বিশারদগণের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রেষণা চক্র বা প্রক্রিয়াটিকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করা যায়'

*২ David A. Decenzo and Stephen P. Robbins-Personnel/HRM, 3rd ed. New Delhi Prentice Hall of India. 1996, P-313.

*৩ Ricky W. Griffin-Management. P-475.

*৪ George R. Terry and Stephen G. Franklin-Principles of Management, 8th ed., Delhi, A. I. Τ. Β. S. 1994, P-299

*৫ James H. Donnelly, Jr., James L. Gibson and John M. Ivancevich-Fundamentals of Management, 8th ed., Boston IRWIN. 1992. P-309,

  • অভাব বা প্রয়োজন (Needs or Necessities): প্রেষণার মূল ভিত্তি কিংবা উৎস হলো অভাব বা প্রয়োজন অনুভব করা। মানুষ বা কর্মীদের জৈবিক অথবা মানসিক অসমতাজনিত কারণে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়াকে অভাব বলে। মানুষ তার চাহিদা, প্রয়োজন বা অভাব পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের চাহিদার মধ্যে জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, সামাজিক চাহিদা, মর্যাদার চাহিদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা অন্তর্ভুক্ত। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ক্ষুধার্ত। এক্ষেত্রে তিনি খাদ্যের অভাব বোধ করছেন।

  • তাড়না (Drives/Impulses): অভাব বা প্রয়োজনের কারণেই কর্মীদের মধ্যে তাড়না তৈরি হয়ে থাকে। অভাব পূরণে কর্মীর কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠাকে তাড়না বলে। কোনো ব্যক্তিকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখলে বোঝা যায়, সে কোনো না কোনো লক্ষ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়েছেন। আর এ লক্ষ্য অর্জনই তখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়। উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি যেকোনো কঠিন ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ নিতে সম্মত হন। যেমন: ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি ক্ষুধা অনুভব থেকে কর্মচঞ্চল বা অস্থির হয়ে ওঠেন।
  • লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ (Goal oriented behaviour): তাড়না থেকে ব্যক্তি বা কর্মী লক্ষ্যাভিমুখী আচরণে উদ্বুদ্ধ হন। এ পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কর্মীর আচরণ নির্ধারিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ, তাড়না থেকে কর্মী কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এরপর, ঐ লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য তিনি পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে থাকেন। যেমন: উল্লিখিত ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাবার রান্না করে বা কিনে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করবেন।
  • উদ্দীপক প্রাপ্তি (Gaining incentives): প্রেষণার ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান হলো উদ্দীপক। প্রেষণা প্রক্রিয়ার এ পর্যায়ে কর্মী সুনির্দিষ্ট কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে অভাব পূরণে সক্ষম হন। এ অভাব পূরণই হলো কর্মীর মূল লক্ষ্য। এভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে কর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো চাওয়ার সমাপ্তি হয়। অর্থাৎ, কর্মীর একটি অতৃপ্ত চাহিদা পূরণ হয়। যেমন: খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি অভাব পূরণে সক্ষম হন।
  • সন্তুষ্টি অর্জন (Satisfaction): অভাব পূরণের মধ্য দিয়েই মূলত সন্তুষ্টি আসে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন উদ্দীপক অর্থাৎ, সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীদের চাহিদা পূরণ করতে পারলেই তারা সন্তুষ্টি লাভ করে। এটিই হলো প্রেষণা চক্রের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে ব্যবস্থাপকদের করণীয় শেষ হয়। যেমন: ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি খাবার খাওয়ার পরে তার অভাব বা প্রয়োজন দূর হয় এবং পরিতৃপ্তি বা সন্তুষ্টি অনুভব করেন।

এক্ষেত্রে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার পাওয়ার পর নতুনভাবে তার খাদ্য বা অন্য কোনো জিনিসের অভাব দেখা দিবে। একইভাবে উল্লিখিত ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরায় প্রতিষ্ঠানে প্রেষণা চক্র চলমান থাকে। সাধারণত কর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন অভাব বা আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। এরপর অভাবসমূহ পূরণের মাধ্যমে কর্মীদের মাঝে কাজ সম্পাদনের অনুকূল মানসিকতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে কর্মীদের মধ্যে আবার নতুন অভাবের সৃষ্টি হয় এবং ব্যবস্থাপককে ভবিষ্যৎ অভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উপায় নির্ধারণ করতে হয়। এভাবে চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অভাব থেকে মুক্তির জন্য তাড়না বোধ, লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ এবং উদ্দীপকের মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভ করতে থাকে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...