# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মি. সরকার খুবই কষ্ট করে বড় হয়েছেন। লেখাপড়া শেষে চাকরি পেয়েছেন। বেতন-ভাতা ভালো। অনেকদিন একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এখানেই বাকি জীবন শেষ করতে চান। প্রতিষ্ঠানের অফিসার্স সমিতির নির্বাচন। তাকে অনেকেই নির্বাচনে দাঁড়াতে বলেছেন। কিন্তু তিনি এতে সায় দেননি। বলেছেন আরও অপেক্ষা করতে হবে।
Concept of Motivation
আলিফ মাহমুদ একটি পোশাক তৈরির কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপক। তার অধীনে প্রায় ২০০ জন কর্মী কর্মরত। তিনি প্রতিটি মেশিন অপারেটরের জন্য দৈনিক ১০০ একক পণ্য তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। এজন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় উপকরণও সরবরাহ করেন। কিন্তু চূড়ান্ত উৎপাদন কাজ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, প্রত্যেকে দৈনিক গড়ে মাত্র ৮০ একক পণ্য উৎপাদন করতে পেরেছেন। তিনি কর্মীদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সাপেক্ষে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এতে বেশির ভাগ কর্মীর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও কয়েকজনের দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় আগের মতোই

থেকে যায়। এবার তিনি নির্ধারিত মাত্রার নিচে উৎপাদনকারীদের বেতন কমিয়ে দেওয়ার নোটিশ দেন। ফলে প্রায় সবারই নির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হতে থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানটিও লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকে। উক্ত ঘটনায় আলিফ মাহমুদ তার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন তথা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা-ই প্রেষণার অন্তর্ভুক্ত।
প্রেষণা হলো কাউকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার একটি প্রক্রিয়া। ইংরেজি 'Motivation' শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ হলো প্রেষণা।” আর ল্যাটিন শব্দ 'Movere' থেকে ইংরেজি 'Motivation' শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো 'To move' বা চালনা করা। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কর্মীদের আচরণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করার কৌশলকে প্রেষণা বলে। কাজের প্রতি নিজস্ব আগ্রহ না থাকলে জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাও তাদের কাজের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেন না। কর্মীরা মানুষ, যন্ত্র নয়। তাদেরকে দিয়ে জোর করে সব সময় কাজ করানো যায় না। বরং, প্রেষণার মাধ্যমেই কর্মীদের মাঝে কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যায়। এটি হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, যা কোনো ব্যক্তির কর্মতৎপরতা বা ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে।
- যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক মার্টিন জে. গ্যানোন (Martin J. Gannon) এর মতে, 'Motivation basically means an individual's needs, desires and concepts that cause him or her to act in a particular manner.' অর্থাৎ, 'প্রেষণা বলতে মূলত ব্যক্তিবিশেষের প্রয়োজন, আকাঙ্ক্ষা ও ধারণাকে বোঝায়; যা তাকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে কাজ সম্পাদনে উৎসাহ দেয়।'
- যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক হ্যারল্ড কুঞ্জ এবং অন্যান্যদের (Harold Koontz and others)bমতে, 'Motivation is a general term applying to the entire class of drives, desires, needs, wishes and similar forces.' অর্থাৎ, 'প্রেষণা হলো একটি সাধারণ বিষয়; যা সব শ্রেণির তাড়না, ইচ্ছা, প্রয়োজন, আকাঙ্ক্ষা এবং এ জাতীয় শক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।'
ওপরের আলোচনা ও সংজ্ঞাগুলো থেকে প্রেষণা সম্পর্কে নিচের ধারণা পাওয়া যায়-
- প্রেষণা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়;
- এটি কতগুলো ধারাবাহিক কাজের সমষ্টি;
- এটি লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে;
- এটি কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে;
- এর দ্বারা কর্মীদের কাজের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়।
অতএব, কর্মীদের কাজের ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদের কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত বা উৎসাহিত করার প্রক্রিয়াকে প্রেষণা বলে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Characteristics of Motivation
প্রেষণা কর্মীদের যৌক্তিক আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। এটি কর্মীদের মনোবল এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতার সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়া ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার একটি মুখ্য কাজ হিসেবে এটি বিবেচিত। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় একটি অপরিহার্য কাজ হিসেবে এর নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ দেখা যায়-
- মানবসংশ্লিষ্ট বিষয় (Human related matter): ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজের মধ্যে প্রেষণা শুধু মানবীয়
উপাদানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব শ্রেণির নির্বাহী ও কর্মীদের নিয়ে ব্যবস্থাপনার প্রেষণামূলক কার্যক্রম চলতে থাকে। এক্ষেত্রে নির্বাহী ও কর্মীদের অভাব-অভিযোগ, আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দ, রুচি-অভিরুচি প্রভৃতি প্রেষণার মূল বিবেচ্য বিষয়। - মনস্তাত্ত্বিক বিষয় (Psychological matter): প্রেষণা কর্মীদের মনের সাথে সম্পর্কিত। এজন্য এটি মনোবিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য বিষয়। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সব সময় কর্মীদের মন-মানসিকতা সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। কোনো ব্যক্তি নিজের মনোভাব প্রকাশ না করলে, তাকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা হয়।
- অবিরাম প্রক্রিয়া (Continuous process): প্রেষণা একটি ধারাবাহিক বা অবিরাম ব্যবস্থাপকীয় কাজ। কর্মীদের
কাজের ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদেরকে সর্বদা প্রেষণা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, কর্মীদের চাহিদা বিবেচনা করে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সব সময়ই কোনো না কোনো প্রেষণামূলক কার্যক্রম চলমান রাখতে হয়। - লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Goal oriented): কর্মীদের দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করানো হয়। অন্যদিকে
কর্মীরাও তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করে। তাই, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ব্যবস্থাপকগণ কর্মীদের প্রয়োজন বিবেচনা করে সেগুলো মেটাতে সচেষ্ট থাকে। এভাবে প্রেষণা সব সময় প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিক লক্ষ্যকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে। - অভাবভিত্তিক (Wants based): ব্যক্তির মধ্যে অভাববোধ না থাকলে, প্রেষণার দরকার হতো না। কর্মীভেদে বিভিন্ন অভাব বিবেচনা করেই প্রেষণামূলক উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যার অর্থের প্রয়োজন, তাকে আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করতে হয়। আবার যার আত্মমর্যাদা ও সম্মান প্রয়োজন, তাকে অনার্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করতে হয়। এক্ষেত্রে কর্মীর যে বিষয়ের প্রয়োজন বা অভাব নেই এমন বিষয় দিয়ে উৎসাহিত করা যায় না।
- ইতিবাচক ও নেতিবাচক (Positive and negative): প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র অনুযায়ী প্রেষণা ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেকোনো ধরনের হতে পারে। কখনো কখনো কোনো ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করে প্রেষিত করতে হয়। আবার, কাউকে তিরস্কার ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করতে হয়।
- অনুমাননির্ভর (Prediction based): ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পাদনে উপকরণ ও সম্পদের মধ্যে মানবসম্পদ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল উপাদান বলে বিবেচিত। মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি, আচরণ, যোগ্যতা, কাজের প্রতি আগ্রহ ও একাগ্রতা প্রভৃতি সহজে ও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তাই, কর্মীদের প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে অনেকটা অনুমানের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়।
সুতরাং, প্রেষণা প্রাতিষ্ঠানিক কাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে কর্মীদের কর্মশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে। কর্মীদের মানসিক প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করে প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। আর এই মানসিক প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করার জন্য কর্মীদের বিভিন্নমুখী চাহিদা পূরণ করতে হয়।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Motivation Cycle
প্রেষণা একটি ধারাবাহিক বা অবিরাম প্রক্রিয়া। অভাবই হলো প্রেষণার মূল ভিত্তি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত কর্মীদের সব সময়ই বহুমুখী প্রয়োজন ও অভাব দেখা দেয়। এ অভাবসমূহ পূরণের লক্ষ্যে তাদের মধ্যে তাড়না সৃষ্টি হয়। কর্মীরা বিভিন্ন আচরণে তা প্রকাশ করে থাকে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের কাজ হলো কর্মীদের অভাব চিহ্নিত করে তা পূরণের ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে কর্মীরা ইতিবাচক আচরণে উদ্বুদ্ধ হয়। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ কাজটিকেই বলা হয় প্রেষণা।
অর্থাৎ, কোনো অভাববোধের প্রেক্ষিতে যে প্রেষণা প্রক্রিয়া শুরু হয় তা সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তির পর পুনরায় নতুন করে আরেকটি অভাবের সৃষ্টি হয়। এভাবে যে প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাকে প্রেষণা চক্র বলে। উক্ত চক্রে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ আছে। বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা বিশারদ এ চক্রকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এর কয়েকটি হলো-
| ব্যবস্থাপনা বিশারদ | প্রেষণা প্রক্রিয়ার ধাপ/পদক্ষেপ |
১. ডিসেঞ্জো এবং রবিন্স (Decenzo & Robbins) |
|
| ২. গ্রিফিন (Griffin) |
|
| ৩. টেরি এবং ফ্রাঙ্কলিন (Terry and Franklin) *৪ |
|
৪. ডনেলি এবং তার সহযোগীগণ (Donnelly and his Associates) |
|
ব্যবস্থাপনা বিশারদগণের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রেষণা চক্র বা প্রক্রিয়াটিকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করা যায়'
*২ David A. Decenzo and Stephen P. Robbins-Personnel/HRM, 3rd ed. New Delhi Prentice Hall of India. 1996, P-313.
*৩ Ricky W. Griffin-Management. P-475.
*৪ George R. Terry and Stephen G. Franklin-Principles of Management, 8th ed., Delhi, A. I. Τ. Β. S. 1994, P-299
*৫ James H. Donnelly, Jr., James L. Gibson and John M. Ivancevich-Fundamentals of Management, 8th ed., Boston IRWIN. 1992. P-309,
অভাব বা প্রয়োজন (Needs or Necessities): প্রেষণার মূল ভিত্তি কিংবা উৎস হলো অভাব বা প্রয়োজন অনুভব করা। মানুষ বা কর্মীদের জৈবিক অথবা মানসিক অসমতাজনিত কারণে কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়াকে অভাব বলে। মানুষ তার চাহিদা, প্রয়োজন বা অভাব পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের চাহিদার মধ্যে জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, সামাজিক চাহিদা, মর্যাদার চাহিদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা অন্তর্ভুক্ত। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ক্ষুধার্ত। এক্ষেত্রে তিনি খাদ্যের অভাব বোধ করছেন।

- তাড়না (Drives/Impulses): অভাব বা প্রয়োজনের কারণেই কর্মীদের মধ্যে তাড়না তৈরি হয়ে থাকে। অভাব পূরণে কর্মীর কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠাকে তাড়না বলে। কোনো ব্যক্তিকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখলে বোঝা যায়, সে কোনো না কোনো লক্ষ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়েছেন। আর এ লক্ষ্য অর্জনই তখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়। উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি যেকোনো কঠিন ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ নিতে সম্মত হন। যেমন: ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি ক্ষুধা অনুভব থেকে কর্মচঞ্চল বা অস্থির হয়ে ওঠেন।
- লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ (Goal oriented behaviour): তাড়না থেকে ব্যক্তি বা কর্মী লক্ষ্যাভিমুখী আচরণে উদ্বুদ্ধ হন। এ পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে কর্মীর আচরণ নির্ধারিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ, তাড়না থেকে কর্মী কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এরপর, ঐ লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য তিনি পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে থাকেন। যেমন: উল্লিখিত ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাবার রান্না করে বা কিনে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করবেন।
- উদ্দীপক প্রাপ্তি (Gaining incentives): প্রেষণার ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান হলো উদ্দীপক। প্রেষণা প্রক্রিয়ার এ পর্যায়ে কর্মী সুনির্দিষ্ট কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে অভাব পূরণে সক্ষম হন। এ অভাব পূরণই হলো কর্মীর মূল লক্ষ্য। এভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে কর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো চাওয়ার সমাপ্তি হয়। অর্থাৎ, কর্মীর একটি অতৃপ্ত চাহিদা পূরণ হয়। যেমন: খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি অভাব পূরণে সক্ষম হন।
- সন্তুষ্টি অর্জন (Satisfaction): অভাব পূরণের মধ্য দিয়েই মূলত সন্তুষ্টি আসে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন উদ্দীপক অর্থাৎ, সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীদের চাহিদা পূরণ করতে পারলেই তারা সন্তুষ্টি লাভ করে। এটিই হলো প্রেষণা চক্রের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে ব্যবস্থাপকদের করণীয় শেষ হয়। যেমন: ক্ষুধার্ত ব্যক্তিটি খাবার খাওয়ার পরে তার অভাব বা প্রয়োজন দূর হয় এবং পরিতৃপ্তি বা সন্তুষ্টি অনুভব করেন।
এক্ষেত্রে ক্ষুধার্ত ব্যক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার পাওয়ার পর নতুনভাবে তার খাদ্য বা অন্য কোনো জিনিসের অভাব দেখা দিবে। একইভাবে উল্লিখিত ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরায় প্রতিষ্ঠানে প্রেষণা চক্র চলমান থাকে। সাধারণত কর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন অভাব বা আকাঙ্ক্ষা দেখা দেয়। এরপর অভাবসমূহ পূরণের মাধ্যমে কর্মীদের মাঝে কাজ সম্পাদনের অনুকূল মানসিকতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে কর্মীদের মধ্যে আবার নতুন অভাবের সৃষ্টি হয় এবং ব্যবস্থাপককে ভবিষ্যৎ অভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উপায় নির্ধারণ করতে হয়। এভাবে চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অভাব থেকে মুক্তির জন্য তাড়না বোধ, লক্ষ্যাভিমুখী আচরণ এবং উদ্দীপকের মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভ করতে থাকে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Importance of Motivation
শুধু নির্দেশ পেয়েই কর্মীরা কাজ করে না। বরং, তাদের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহও তৈরি করতে হয়। কাজের প্রতি কর্মীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব নয়। কারণ, যন্ত্রের মতো মানুষকে সহজে ব্যবহার করা যায় না। একজন মানুষ শারীরিকভাবে উপযোগী হলেও মানসিকভাবে কাজের জন্য সব সময় প্রস্তুত না-ও থাকতে পারে। কর্মীকে সঠিকভাবে উৎসাহিত করতে পারলে তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজ করানো যায়। নিচে প্রেষণার গুরুত্ব বর্ণনা করা হলো-
সহজে লক্ষ্যর্জন (Easy achievement of goal): কর্মীদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ আদায় করিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেষণার বিকল্প নেই। প্রেষণার ফলে তাদের কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যায়। ফলে তারা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা প্রভৃতির সুষ্ঠু ব্যবহার করে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির কাজ সম্পাদনের মাত্রা তার সামর্থ্য, জ্ঞান ও প্রদত্ত প্রেষণার ওপর নির্ভর করে। এটি একটি গাণিতিক সূত্র দিয়ে দেখানো যায়। আর তা হলো-
P=M (A+K)
এখানে, P = Performance (কাজ সম্পাদন);
M = Motivation (প্রেষণা);
A = Ability (সামর্থ্য);
K = Knowledge (জ্ঞান)।
অর্থাৎ, প্রেষণার মাধ্যমে ব্যক্তির শক্তি ও সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।
- কর্মপ্রচেষ্টা সর্বোচ্চকরণ (Maximizing effort): উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাবে কর্মীরা তাদের সামর্থ্য পূর্ণমাত্রায়
ব্যবহার করতে পারে না। কাজ সম্পাদনে স্বতঃস্ফূর্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হয় না। প্রেষণা প্রক্রিয়ায় কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের মধ্যে কাজ করার ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে তোলা হয়। এভাবে, প্রেষণার মাধ্যমেই কর্মীদের কর্মপ্রচেষ্টা সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করা যায়। - কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি (Creation of eagerness to work): প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে প্রেষণা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রেষণার উদ্দেশ্য হলো কর্মীকে কাজে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত করা। এর মাধ্যমে কর্মীদের অভাব-অভিযোগ, দাবি-দাওয়া ও আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হয়। ফলে কর্মীরা লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। এতে অসন্তোষ নিরসন হয় ও কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।
- সহজ তত্ত্বাবধান (Easy supervision): কর্মীদের সঠিকভাবে প্রেষণা দিলে কাজের প্রতি তাদের একাগ্রতা ও মনোযোগ বেড়ে যায়। ফলে তাদেরকে নিবিড়ভাবে তদারক করার প্রয়োজন হয় না। শুধু নির্দেশনা দিলেই সে অনুযায়ী কাজ সম্পাদনের দিকে তারা এগিয়ে যেতে পারে। এতে তত্ত্বাবধানজনিত ব্যয় কমে যায়।
- সম্পর্কের উন্নয়ন (Development of relationship): প্রেষণা প্রক্রিয়ায় কর্মীদের আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করা হয় বলে কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ তৈরি হয়। এতে কর্মীরা বেশি উৎপাদনের চেষ্টা করে এবং শ্রমিক-মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হয়। এছাড়া, সঠিক শ্রম-ব্যবস্থাপনার ফলে তাদের মধ্যে উত্তম ও আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
- মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার (Maximum utilization of human resources): মানবসম্পদ প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। প্রতিষ্ঠানের সফলতা মূলত মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। এজন্য প্রেষণা প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা দিয়ে কর্মীদের মনে কাজ করার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা হয়। এতে তাদের যোগ্যতার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
- অপচয় হ্রাস (Minimizing wastage): প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজন পূরণ করা হয়। এতে তাদের কাজে সন্তুষ্টি ও আগ্রহ বেড়ে যায়। ফলে কর্মীদের মনোবল বাড়ে ও দক্ষতার উন্নয়ন হয়। এছাড়া, প্রেষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কাজ করে। কাজ সম্পাদনে তারা বেশি যত্নবান হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানে শ্রম, সময় ও সম্পদের অপচয় বা অপব্যয় কমে যায়।
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Increase in productivity): উপকরণ ও উৎপাদনের অনুপাতকে উৎপাদনশীলতা বলে। সঠিকভাবে প্রেষণা দেওয়ার ফলে কাজের প্রতি কর্মীদের আগ্রহ ও উৎসাহ বাড়ে। এতে তারা অল্প পরিশ্রমেই বেশি কাজ করতে পারে। এভাবে প্রেষণার মাধ্যমে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
- দক্ষতা বৃদ্ধি (Increase in efficiency): অর্থ, সময়, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণ অপচয় না করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের সামর্থ্যকে দক্ষতা বলা হয়। নিজের ইচ্ছায় ও আনন্দের সাথে কাজ করলে, কর্মীদের কাজের দক্ষতা বাড়ে। তারা অল্প সময়ে ও কোনো কিছুর অপচয় না করে কাজ করে। ফলে প্রেষণার মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ে।
- সহজ পরিবর্তন (Easy to change): কর্মীদের সঠিকভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা বেড়ে যায়। যেকোনো ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্তের প্রতি তারা অনুগত থাকে। ফলে কোনো পরিবর্তন (প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি, পদোন্নতির নতুন নীতিমালা, নতুন সংগঠন কাঠামো ও প্রশাসন পদ্ধতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অনেক সহজ হয়।
- জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Development of living standard): কর্মীদের প্রেষণা দানের সুফল হিসেবে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের পরিমাণ ও মুনাফা বাড়ে। ফলে পরোক্ষভাবে কর্মীদের গুরুত্ব, তাদের পারিশ্রমিক ও আয় বেড়ে যায়। এগুলো তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়।
- আচরণের উন্নয়ন (Development of behaviour): প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের বিভিন্ন প্রকার আর্থিক ও অনার্থিক চাহিদা পূরণ করা হয়। অভাব পূরণ হয়ে গেলে তারা সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হয়। এতে তাদের আচরণ আগের চেয়ে ইতিবাচক হয়। এভাবে প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদের আচরণগত উন্নয়ন হয়ে থাকে।
- শ্রম ঘূর্ণায়মানতা হ্রাস (Reducing labour turnover): কোনো নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের আসা-যাওয়ার (চাকরি ছেড়ে যাওয়া) অনুপাত বা হারকে শ্রম ঘূর্ণায়মানতা বলে। সাধারণত প্রেষণা পেলে কর্মীরা তাদের বর্তমান চাকরিতেই সন্তুষ্ট থাকে। তারা চাকরি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে আগ্রহী হয় না। তাই, কর্মীদের উপযুক্ত উপায়ে প্রণোদিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী ধরে রাখা সম্ভব হয়। এভাবে শ্রম ঘূর্ণায়মানতা কমে যায়।
উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রেষণার উদ্দেশ্য হলো কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা; যেখানে কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে প্রবল আগ্রহ, উদ্যম ও কৌতূহলের সাথে কাজ করতে পারে। প্রেষণার ফলে উচ্চ মনোবল, কাজের সন্তুষ্টি, দায়িত্ব সচেতনতা, আনুগত্য ও শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে যেকোনো জটিল কাজ সম্পাদনে কর্মীরা সচেষ্ট থাকে। এজন্য ব্যবস্থাপনাকে এ ব্যাপারে অনেক কৌশলী ও সচেতন হতে হয়।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Ways /Techniques to Motivate the Employees
প্রেষণা হলো কর্মীকে কাজের প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার প্রক্রিয়া। এটি ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং অভাববোধের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়। একজন ব্যক্তি যে উপায়ে প্রেষণা পায়, অন্য ব্যক্তি সে উপায়ে প্রেষণা না-ও পেতে পারে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য, কর্মীদের পদ ও যোগ্যতা বা ব্যবস্থাপনা দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে প্রেষণা দানের কৌশলও ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত নিম্নোক্ত উপায়ে কর্মীদের প্রেষণা দেওয়া হয়-

প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Ways /Techniques to Motivate Employees: Positive Motivation
ক. ইতিবাচক প্রেষণা (Positive Motivation): মাহবুব হাসান একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক। তার
অধীনে প্রায় একশজন কর্মী কর্মরত। তিনি তার অধীনস্থ কর্মীদের সব সময়ই উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে কাজ করান। কোনো কর্মী কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বা তার চেয়েও বেশি মাত্রায় কাজ করলে তার জন্য তিনি অতিরিক্ত বোনাস বা বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করেন। যারা নিয়মিতভাবে কাজের ভালো ফলাফল দেখিয়েছে, তাদের জন্য তিনি পদোন্নতিরও ব্যবস্থা করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় কর্মীদের কাজের প্রশংসা ও স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। কাজের ক্ষেত্রে তাদের একঘেয়েমি ভাব দূর করার জন্য কখনো কখনো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পিকনিকের ব্যবস্থাও করে থাকেন। তার দেওয়া এসব আর্থিক ও অনার্থিক সুযোগ-সুবিধার কারণে তার অধীনস্থ কর্মীরা সব সময় আন্তরিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে কাজ করে থাকে। মাহবুব হাসানের নেওয়া প্রেষণার এ কৌশলকে ইতিবাচক প্রেষণা বলে অভিহিত করা যায়। অর্থাৎ, কর্মীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেওয়ার মাধ্যমে প্রদত্ত প্রেষণাকে ইতিবাচক প্রেষণা বলে। এটি নিম্নোক্ত দু'ভাবে হতে পারে-

১. আর্থিক উপায় (Financial Means): হুমায়ুন কবির একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় যথেষ্ট পরিমাণে বেতন দিয়ে থাকে। উৎসব বোনাস ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ার ফলে কর্মীদের উৎসাহ বোনাসও দিয়ে থাকে। কর্মকর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি বিলাসবহুল আবাসন সুবিধাও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে থাকে। এছাড়া কর্মীদের ব্যক্তিগত অর্জনের ভিত্তিতে তাদের বেতনের মাত্রা বাড়ানো ছাড়াও পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ, কর্মীদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা উক্ত প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করে থাকে। এসব সুবিধার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে কর্মীরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে।
উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দেওয়া সুযোগ-সুবিধাকে প্রেষণা দানের আর্থিক উপায় বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
কর্মীদের বস্তুগত বা অর্থসংক্রান্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রেষণার যে কৌশল ব্যবহার করা হয়, তা-ই প্রেষণার আর্থিক উপায়। মানুষের অধিকাংশ অভাব বা চাহিদা অর্থের সাথে সম্পর্কিত। আর্থিক প্রেষণা কর্মীদের কাজের গতি বাড়ায়। প্রেষণা দানের কয়েকটি আর্থিক কৌশল বা উপায় নিচে বর্ণনা করা হলো-
- ন্যায্য পারিশ্রমিক (Fair remuneration): বিনিময়ের সবচেয়ে সহজ ও উত্তম একটি মাধ্যম হলো অর্থ। এটি
কর্মীদের দ্রুত কাজ করতে উৎসাহিত করে। তাই কর্মীদের তাদের পরিশ্রমের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও বেতন দিতে হবে। পারিশ্রমিক ও বেতনের পার্থক্যের ওপর কর্মীদের কাজের প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা, আগ্রহ-অনাগ্রহ প্রভৃতি নির্ভর করে। - বোনাস (Bonus): বিভিন্ন উপলক্ষে বেতন-ভাতার অতিরিক্ত যে অর্থ কর্মীদেরকে দেওয়া হয়, তা-ই হচ্ছে বোনাস। বোনাস কর্মীদের কাছে একটি বাড়তি পাওনা। এছাড়া তাদের উৎসাহ (Incentives) বোনাস দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে কর্মীরা কাজে বেশি মনোযোগী হয়।
- মুনাফার অংশ (Profit sharing): প্রেষণার একটি অভিনব পদ্ধতি হলো কর্মীদের মুনাফার অংশ দেওয়া। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অর্জিত মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ কর্মীদের দিয়ে থাকে। এর ফলে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে মনে করে এবং আরও বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য সচেষ্ট হয়।
- বেতনসহ ছুটি (Leave with pay): বেতনসহ ছুটি কর্মীদের কাজ করার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রশিক্ষণ, উচ্চ শিক্ষা, মারাত্মক অসুস্থতা প্রভৃতি কারণে কর্মীদের অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি ছুটির প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে বেতনসহকারে ছুটি দেওয়া হলে তারা কাজের প্রতি আরও বেশি আন্তরিকতা দেখিয়ে থাকে।
- চিকিৎসা সুবিধা (Medical facilities): কর্মীদের ও তাদের আত্মীয়স্বজনকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমেও উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করা যায়। এজন্য চিকিৎসক নিয়োগ বা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন অথবা কর্মীদের বেতনের সাথে চিকিৎসা ভাতা দিয়ে তাদের উৎসাহিত করা যেতে পারে।
- যাতায়াত ভাতা (Conveyance allowance): প্রেষণা দানের জন্য অনেক সময় যাতায়াত ভাতা নগদে দেওয়া বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের বিনামূল্যে পরিবহন ও যাতায়াত সুবিধা দেওয়া হয়। এতে কর্মীদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হয়। ফলে কর্মীরা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি আরও যত্নবান হয়ে থাকে।
- আবাসন সুবিধা (Accommodation facility): প্রেষণা দানের জন্য কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এলাকায়
বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে বাসস্থানের সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। এতে কর্মীদের দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াতের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হয়। ফলে তারা নির্বিঘ্নে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। - পুরস্কার (Reward): দক্ষ ও কর্মঠ কর্মীদের জন্য তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা উচিত। এতে কর্মীদের কাজের প্রতি আন্তরিকতা বাড়ে। এছাড়া তাদের দেখে অন্যরাও কাজে অনুপ্রাণিত হয়।
- পদোন্নতি (Promotion): কর্মীদের পদোন্নতি দেওয়া হলে তাদের দীর্ঘদিন একই কাজ বারবার করার ক্লান্তি দূর হয়। পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব ও মর্যাদা বাড়ার পাশাপাশি তাদের আয়ও বাড়ে। ফলে তাদের স্বচ্ছন্দময় জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হয়। এতে তারা কাজের প্রতি আরও বেশি আন্তরিক ও মনোযোগী হয়।
- শিক্ষার ব্যবস্থা (Education facility): প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী অর্থের অভাবে তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে না। তাই কর্মীদের কাজের প্রতি উৎসাহ এবং একাগ্রতা তৈরি করতে তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বা শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- আর্থিক নিরাপত্তা (Financial security): কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিকের সাথে তাদের ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে কাজের প্রতি তারা বেশি মনোযোগী ও আস্থাশীল হবে। এজন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশন স্কিম প্রভৃতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- বেতন বৃদ্ধি (Increasing salary): বছর শেষে বা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল বেতনের ওপর নির্দিষ্ট হারে বা নির্দিষ্ট পরিমাণে বেতন বাড়ালে তা কর্মীদের কাজ করার আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক হয়। তাই তাদেরকে উৎসাহিত করা এবং তাদের কাজের আগ্রহ ধরে রাখার লক্ষ্যে বার্ষিক বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
- ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ (Commodity supply at fair price): বিনামূল্যে বা ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহের ব্যবস্থা করলে কর্মীদের অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় হয়। এতে তারা দায়িত্বের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল ও আন্তরিক হয়ে উঠতে পারে। প্রতিরক্ষা ও পুলিশ বিভাগসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এর প্রচলন দেখা যায়।
- বিপদে সাহায্য (Help in crisis): কর্মীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজন ও বিপদে এককালীন অর্থ সাহায্য বা অগ্রিম বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের মমত্ববোধ তৈরি হয়। এতে তারা নিশ্চিন্তে ও উৎসাহের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ করতে পারে।
- ভ্রমণের সুযোগ (Tour facility): মাঝে মাঝে কর্মীদের জন্য দেশে-বিদেশে ভ্রমণের সুযোগ, ফ্যামিলি ড়ে, বনভোজন প্রভৃতির ব্যবস্থা করা উচিত। এতে তাদের কাজের প্রতি দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা একঘেয়েমি ভাব দূর হয়।
- নগর ও পাহাড়ি ভাতা (Urban and hill allowance): নগর জীবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক সময় কর্মীদের নগর ভাতা দেওয়া হয়। আবার, পার্বত্য এলাকায় বসবাস করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় সেখানে কর্মীরা যেতে চায় না। এজন্য তাদের বাড়তি ভাতা দেওয়ার মাধ্যমে উক্ত অঞ্চলগুলোতে থাকতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
- অগ্রিম বা ঋণ সুবিধা (Advance or loan facility): কর্মীরা অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সংকটে ভোগে। এ ধরনের প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে তা কর্মীদের মানসিক শক্তি বাড়াতে পারে। এজন্য চিকিৎসা, বাসস্থান, সন্তানদের শিক্ষা প্রভৃতি খাতে কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়া উচিত।
- বিমা সুবিধা (Insurance facility): কর্মীদের আর্থিক নিশ্চয়তা বাড়ানোর জন্য বিমা সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এতে কর্মীরা মানসিক দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদিত হয়ে কঠোর শ্রম দিয়ে যেতে পারবে। তাই দুর্ঘটনা বিমা, গোষ্ঠী বিমা প্রভৃতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের কাজের ক্ষেত্রে উৎসাহ বাড়ানো যায়। এতে নিয়োগকর্তার দায়ভারও অনেকাংশে কমে যায়।
২. অনার্থিক উপায় (Non-financial Means): আরমান সিদ্দিক 'ভিক্টর লি.' নামক বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অনেক দিন ধরে কর্মরত। তার সৃজনশীল কার্যক্রম ও অভিনব কৌশলের সুবাদে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেশের সফল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তার অবদান বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ তাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাকে স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। এতে তিনি সম্মানবোধ করেন। উক্ত ঘটনায় আরমান সিদ্দিকের জন্য যা করা হলো, তা হলো অনার্থিক প্রেষণা।
অনেক সময় আর্থিক উপায়ে উৎসাহিত করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার মানবিক আচরণ এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে কর্মীদের অনুপ্রাণিত করা যায়। এগুলোকে প্রেষণার অনার্থিক কৌশল বলে অভিহিত করা হয়। মূলত এ ধরনের প্রেষণা কর্মীদের কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। প্রেষণার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি অনার্থিক কৌশল নিচে দেওয়া হলো-
- অনুকূল কার্য পরিবেশ (Favourable work environment): প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু, মনোরম, নিরিবিলি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ কর্মীর কাজ করার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে কর্মীরা বাধাহীনভাবে ও স্বচ্ছন্দে কাজ করে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ কর্মীদের আর্থিক সুবিধার চেয়েও বেশি উৎসাহিত করে।
- চাকরির নিরাপত্তা (Job security): সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চাকরির স্থায়িত্বহীনতা কর্মীর কাজের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে এবং মানসিক অশান্তি তৈরি করে। তাই কর্মীদের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের চাকরির নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। এতে কর্মীরা নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে কাজে মনোনিবেশ করতে পারে।
- কর্তৃত্ব প্রদান ও মূল্যায়ন (Delegate authority and evaluation): প্রত্যেক কর্মীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী
উপযুক্ত কাজে নিয়োগ করা উচিত। এছাড়া কর্মীদের সম্পাদিত কাজের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এতে কর্মীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ফলে সে পরবর্তী দায়িত্ব আরও দক্ষতার সাথে পালনে উৎসাহিত হয়। - উত্তম ব্যবহার (Good behaviour): ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে কর্মীদের সাথে সব সময় উত্তম আচরণ করা উচিত। যে ব্যবস্থাপক যত বেশি মানবিক আচরণ করেন, তিনি কর্মীদের মাধ্যমে তত বেশি কাজ আদায় করতে পারেন। তাই কর্মীদের সাথে সব ধরনের নেতিবাচক, অমানবিক ও রূঢ় আচরণ পরিহার করতে হবে।
- মত প্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of speech): কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের নিজস্ব মত নিতে হবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের আলোচনায় ও সিদ্ধান্ত নিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে।
- ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদান (Providing personal power): কর্মীদের অনার্থিক পদ্ধতিতে প্রেষণা দান করার অন্যতম উপায় হলো কাজের দায়িত্ব দেওয়ার সাথে তাদেরকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথাযথ ক্ষমতা দেওয়া। এভাবে দায়িত্বের সাথে যথাযথ কর্তৃত্ব পেলে তারা অনেক বেশি উৎসাহিত হয় ও সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রকাশ করে।
- সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক (Harmonious relationship): প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্ভাব এবং
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে কর্মীদের মন-মানসিকতার উন্নয়ন হয়। এতে তাদের মনোবল ও কাজের আগ্রহ বাড়ে। এজন্য প্রতিষ্ঠানের সবার সাথে সুষ্ঠু সম্পর্ক রক্ষায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সচেতন হতে হবে। - বিনোদন ও বিশ্রামের সুযোগ (Entertainment and rest facilities): একাধারে কাজ করলে কর্মীদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি হয়। এতে তাদের কাজের গতি ও ক্ষমতা কমে যায়। তাই কাজের মাঝে বিরতি ও বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে কর্মীরা পুনরায় উদ্যমে ও দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে পারবে।
- প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম (Institutional goodwill): সুপ্রতিষ্ঠিত, সুপরিচিত ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মনোবল স্বাভাবিক নিয়মেই বেশি থাকে। এরূপ প্রতিষ্ঠানে কাজের মাধ্যমে কর্মীর সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের সুনাম প্রেষণার অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে।
- প্রশিক্ষণের সুযোগ (Training facility): কর্মীদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য হাতে-কলমে শিক্ষা
পদ্ধতিকে প্রশিক্ষণ বলে। এর মাধ্যমে নতুন কাজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার সহজ হয় এবং মানসিক শান্তিও বাড়ে। এছাড়া দক্ষতার সাথে কাজ করলে একঘেয়েমি ভাব আসে না। - শুষ্ক পদোন্নতি (Dry Promotion): কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মীদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক বা সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও পদোন্নতি দেওয়া হয়ে থাকে। এ ব্যবস্থা শুষ্ক পদোন্নতি নামে পরিচিত। এতে প্রতিষ্ঠানের কোনো বাড়তি খরচ হয় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে এরূপ পদোন্নতির মাধ্যমে কর্মীরা অনেক বেশি উৎসাহিত হয়।
- প্রতিযোগিতা (Competition): কর্মীদের কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির মাধ্যমেও উৎসাহিত করা যায়। যেমন: পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয় কাজে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণ বাড়ানো যায়। এতে কর্মীদের উৎসাহও বাড়ে।
- পদ পরিবর্তন (Job rotation): পদ পরিবর্তন বলতে কর্মীদের এক পদ থেকে অন্য পদে স্থানান্তর করাকে বোঝায়। এর মাধ্যমে কর্মীদের সম্পর্কযুক্ত কাজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ে। তাদের বিভিন্ন পদে কাজ করতে দিলে একই কাজ বারবার করার একঘেয়েমি দূর হয়। এ পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট কাজে কর্মীদের দক্ষতা ও জ্ঞানের পরিধি এবং কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়ানো।
- কাজ সমৃদ্ধকরণ (Job enrichment): কাজ সমৃদ্ধকরণ বলতে মূলত কাজের পরিবর্তন ও উন্নয়নকে বোঝায়। কর্মীদের স্বীকৃতি, অগ্রগতি, উন্নয়ন ও দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকে, এমন কাজ করতে কর্মীরা বেশি উৎসাহিত হয়। তাই ব্যবস্থাপকদের প্রতিটি কাজ সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকা উচিত।
- নমনীয় শ্রমঘণ্টা (Flexible labour hour); কর্মীদের প্রেষণা দিতে নমনীয় শ্রমঘণ্টা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়া এবং কাজের চাপ অনুসারে কর্মঘণ্টায় তুলনা করা উচিত। এতে কর্মীরা ব্যক্তিগত জীবনও উপভোগ করার সুযোগ পায়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কর্মীদের মনোবল ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা (Democratic management): অধীনস্থ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা বলে। ক্ষেত্রবিশেষে স্বৈরতন্ত্র কার্যকর ও উপযোগী বিবেচিত হলেও বর্তমানে এ ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা হয়। এর পরিবর্তে সবার মতের ভিত্তিতে অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা প্রচলন করা উচিত। এতে কর্মীরা দীর্ঘ মেয়াদে উৎসাহিত ও কাজে আন্তরিক হয়।
- স্বীকৃতি ও প্রশংসা (Recognition and praising): কর্মীদের সাফল্যে তথা সুষ্ঠুরূপে কাজ সম্পাদনের প্রেক্ষিতে স্বীকৃতি ও প্রশংসার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে তারা আরও বেশি উৎসাহী হবে। আবার, তাদের দেখাদেখি অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে। এভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সকল কর্মীকেই প্রেষণা দেওয়া যায়।
- দায়িত্ব প্রদান (Giving responsibility): অনেক সময় নির্দিষ্ট কর্মীকে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিদান হিসেবে বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কর্মী আরও আন্তরিকতা ও উৎসাহের সাথে কাজ করে থাকে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Ways/Techniques to Motivate Employees: Negative Mo
খ. নেতিবাচক প্রেষণা (Negative Motivation): জনাব গোলাম কিবরিয়া 'কারকুন লি.'-এর মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। তার অধীনস্থ কর্মীরা সঠিকভাবে কাজ না করলে তিনি তাদের বকাঝকা করেন। কোনো কর্মী কাজে অবহেলা করলে তিনি বেতন কেটে রাখেন বা তার নামে অসন্তোষজনক রিপোর্ট দিয়ে থাকেন। আবার কেউ অনবরত কাজ ফাঁকি দিলে বা অবহেলা করলে তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী পদোন্নতি বন্ধ রাখেন। এছাড়া পদাবনতি, এমনকি বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অব্যাহতিও দিয়ে থাকেন। তার নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ফলে কর্মীরা সাধ্য অনুযায়ী সতর্কতার সাথে কাজ করে থাকে। এমনকি সবাই তাদের সর্বোচ্চ শ্রম প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করার চেষ্টা করে।

কর্মীদের দিয়ে কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে নেওয়া এ ধরনের পদক্ষেপই হলো নেতিবাচক প্রেষণা। অর্থাৎ, ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং মনের ওপর চাপ তৈরি করে কর্মীদের কাজে বাধ্য করার পদ্ধতিকে নেতিবাচক প্রেষণা বলে। কখনো কখনো ইতিবাচক উপায়ের চেয়ে নেতিবাচক উপায়ে প্রেষণা বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। নিচে নেতিবাচক প্রেষণার উপায়সমূহ আলোচনা করা হলো-
- তিরস্কার (Rebuke): দায়িত্বের প্রতি অবহেলার কারণে নির্বাহীর অধীনস্থের সাথে কঠোর হয়ে কথা বলাই তিরস্কার। অনেকে তিরস্কারকে অপমানজনক মনে করে। তাই কর্মীরা তিরস্কারের ভয়ে কাজের প্রতি অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়ে থাকে।
- পদাবনতি (Demotion): ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাবশত নিম্নমানের কাজের জন্য বা ধারাবাহিকভাবে কাজে ব্যর্থতার জন্য কর্মীকে তার নিজ পদ বা পদমর্যাদা থেকে নামিয়ে দেওয়াকে পদাবনতি বলে। প্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা থাকলে কর্মীরা কাজের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী, যত্নশীল ও আগ্রহী হয়।
- শাস্তি প্রদান (Punishment): বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকা, দেরি করে অফিসে আসা, কর্মক্ষেত্রে বারবার একই ভুল করা প্রভৃতির জন্য বেতন কমানো বা অন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে কর্মীদেরকে কাজের প্রতি আন্তরিক হতে দেখা যায়। এতে অনেক কর্মীরই কাজে গতি বেড়ে যায়।
- বরখাস্ত (Dismissal): দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলা বা প্রতিষ্ঠানের নীতিবহির্ভূত কোনো কাজ করার কারণে কর্মীকে সাময়িক এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়াকে বরখাস্ত বলে। এ ধরনের বিধান থাকলে
কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অনেক বেশি সজাগ হতে দেখা যায়। - ছাঁটাই (Lay-off): প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, কাজের অভাব, ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা প্রভৃতি কারণে কর্মী বাদ দেওয়াকে ছাঁটাই বলে। সাধারণত কর্মীদের কোনো ভুলের কারণে তাদের ছাঁটাই করা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কাজের প্রতি বেশি মনোযোগী করা হয়।
উপসংহারে বলা যায়, কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক-অনার্থিক এবং নেতিবাচক প্রেষণা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই নির্বাহীকে তার অধীনস্থদের প্রেষণা দেওয়ার জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Relevant Theories of Motivation
প্রেষণা কর্মীর আচরণ ও কর্মশক্তিকে প্রভাবিত করে লক্ষ্য অর্জনের দিকে পরিচালিত করে। এজন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীকে প্রেষণা দিতে আর্থিক ও অনার্থিক উদ্দীপকগুলোর প্রতি বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আধুনিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণার কারণে বিভিন্ন প্রেষণা তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। নিচে এ তত্ত্বগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১. চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Need hierarchy theory): কর্মীদের প্রেষণাদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলোর (Abraham Harold Maslow) চাহিদা সোপান তত্ত্ব। মাসলো তাঁর গবেষণার মাধ্যমে মানব জীবনের অভাবগুলোকে প্রকৃতির ভিত্তিতে পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো- জৈবিক, নিরাপত্তা, সামাজিক, আত্মমর্যাদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা। তিনি বলেছেন, মানুষের এ চাহিদাগুলো পর্যায়ক্রমে আসে। অর্থাৎ একটি চাহিদা পূরণ হলে আরেকটি চাহিদার সৃষ্টি হয়।
২. দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Two factors theory): অধ্যাপক ফ্রেডারিক হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীগণ প্রেষণা সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রবর্তন করেন, যা হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব নামে পরিচিত। হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীরা যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের কয়লাখনি এলাকায় একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে দেখা যায়, দু'ধরনের উপাদান কর্মীদের মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে প্রেষণামূলক এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কর্মক্ষেত্রে এ দু'ধরনের উপাদান মূল্যায়ন প্রেষণা দেওয়ার জন্য গুরত্বপূর্ণ।
৩. ইআরজি তত্ত্ব (ERG theory): মাসলোর পাঁচ স্তরবিশিষ্ট চাহিদাকে তিনটি স্তরে ভাগ করে Clayton P. Alderfer প্রেষণার একটি নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন, যা ইআরজি তত্ত্ব (ERG Theory) নামে পরিচিত। (১) টিকে থাকার চাহিদা (E = Existence Needs), যা জৈবিক ও নিরাপত্তার চাহিদার সমন্বয়ে গঠিত। (২) সম্পৃক্ততার চাহিদা (R = Relatedness Needs), যা সামাজিক ও আত্মমর্যাদার চাহিদার সমন্বয়ে গঠিত। (৩) প্রবৃদ্ধির চাহিদা (G = Growth Needs), যা আত্মপ্রতিষ্ঠা বা আত্মপূর্ণতার চাহিদার অনুরূপ ।
৪. X ও Y তত্ত্ব (Theory of X and Y): ১৯৫৭ সালে ডগলাস মারে ম্যাকগ্রেগরের প্রকাশিত 'The Human Side of Enterprise' নামক গ্রন্থে কর্মীর মনোভাব সম্পর্কে দু'ধরনের তত্ত্ব উল্লেখ করেন। তিনি কর্মীদের প্রতি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সম্পর্কিত যে দু'টি তত্ত্ব দিয়েছেন, তা 'X ও Y তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
- তত্ত্ব X (Theory of X): এরূপ তত্ত্বে কর্মীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়-কর্মীরা কাজ অপছন্দ করে, সুযোগ থাকলে ফাঁকি দেয় এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। তারা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিবর্তন পছন্দ করে না। এ ধরনের কর্মীরা কম উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। আর্থিক সুযোগ-সুবিধাকেই তারা একমাত্র পাওনা মনে করে। তাই তাদের থেকে কাজ আদায়ে ভয় দেখানো, চাপ প্রয়োগ ও প্রয়োজনে শাস্তি দিতে হয়।
- তত্ত্ব Y (Theory of Y): এরূপ তত্ত্বে কর্মীদের সম্পর্কে ইতিবাচক ও উচ্চ ধারণা পোষণ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়- কর্মীরা কাজ পছন্দ করে এবং তারা নিজ উদ্যোগেই চলতে চায়। তারা দায়িত্ব নিতে চায়, কৃতিত্ব অর্জন করতে চায় এবং স্বীকৃতি পাওয়ারও প্রত্যাশা করে। এছাড়া সুযোগ পেলে কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিতে উত্তম পরামর্শও দিতে পারে। এ কারণে তাদের ওপর অহেতুক চাপ না দিয়ে কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া উচিত।
৫. প্রত্যাশা তত্ত্ব (Expectancy theory): মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর এইচ. ভূম (Victor H. Vroom) ১৯৬৪ সালে প্রত্যাশা তত্ত্বটি উদ্ভাবন করেন। দু'টি বিষয়ের ওপর এ তত্ত্ব নির্ভর করে- (ক) কর্মীরা কোন জিনিস কতটা পেতে চায়। (খ) প্রত্যাশিত জিনিস সে কতটা পেতে পারে। তিনি বিষয়টি সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন- যেখানে, M = Motivation (প্রেষণা), E = Expectancy (প্রত্যাশা), I = Instrumentality (কর্মের সাথে পুরস্কারের সম্পর্কের মাত্রা), V = Valence (আকর্ষণ)। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কর্মী কোনো লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যাশ্যায় কাজ করে এবং প্রণোদিত হয়। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য কর্মীর কাছে যত বেশি মূল্যবান হবে তত বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজে মনোনিবেশ করবে।
৬. ন্যায় বা সমতা তত্ত্ব (Equity theory): প্রেষণার সমতা তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন আধুনিক মনোবিজ্ঞানী J. Stacy Adams। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কর্মী প্রাপ্ত পুরস্কারকে যথাযথ মূল্যায়ন করার জন্য কর্মপ্রচেষ্টা ও অবদানের সাম্য যাচাই করে। এছাড়া অন্য কর্মীর সাথে তার অবদান ও পুরস্কারের তুলনামূলক ন্যায্যতা বিচার করে। ন্যায় তত্ত্বের সূত্রটি নিম্নরূপ- ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার/ব্যক্তির অবদান=অন্য ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার/অন্য ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার
সাধারণত ব্যক্তির অবদানের মাপকাঠি হলো- কর্মপ্রচেষ্টা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, কাজ সম্পাদনের পরিমাণ ও গুণ প্রভৃতি। আর পুরস্কার হিসেবে বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো- বেতন ও প্রান্তিক সুবিধাদি, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পুরস্কারসমূহ। ন্যায় তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রে অন্যের সাথে অবদান ও প্রাপ্ত ফলাফলের সমতা থাকতে হবে।
৭. লক্ষ্য নির্ধারণ তত্ত্ব (Goal setting theory): মার্কিন যুক্তারাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী Adwin Locke ১৯৬৮ সালে লক্ষ্য নির্ধারণ তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। এ তত্ত্বে ধারণা করা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করে। তাই ব্যবস্থাপককেও প্রথমে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পুরস্কারের প্রত্যাশায় কর্মীরা কাজ করবে।
৮. পুনঃশক্তি সঞ্চায়ন/শক্তিবৃদ্ধি তত্ত্ব (Reinforcement theory): মনোবিজ্ঞানী B. F. Skinner পুনঃশক্তি সঞ্চায়ন তত্ত্বের প্রবক্তা। এ তত্ত্ব অনুসারে কর্মীর আচরণকে ইতিবাচক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়, কর্মীর ওপর চাপ সৃষ্টি বা শক্তি প্রয়োগ না করেও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি, কাজের প্রশংসা ও পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীর কর্মশক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়। এতে কর্মীর মনোবল বাড়ে এবং কর্মী বেশি কাজ সম্পাদনে সচেষ্ট হয়।
৯. সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (Social learning theory): Albert Bandura নামক মনোবিজ্ঞানী এ তত্ত্বের উদ্ভাবক।
সামাজিক কার্যক্রম থেকে শিক্ষা লাভ করে আচরণের পরিবর্তন করাই এ তত্ত্বের মূল কথা। মানুষ সামাজিক জীব। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি অন্যকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন আচরণে অভ্যস্ত হয়। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে অন্য ব্যক্তি তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে সেভাবে আচরণ করতে শিখে। আদর্শ আচরণ পর্যবেক্ষণ করে মানুষ যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষা লাভ করে, তাকে সামাজিক শিক্ষণ বলে।.
১০. অর্জিত চাহিদা তত্ত্ব (Acquired needs theory): ডেভিড সি. ম্যাকক্লিল্যান্ড (David C. McClelland) হলেন
অর্জিত চাহিদা তত্ত্বের উদ্ভাবক। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, দীর্ঘ সময়ে জীবনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা থেকে মানুষের বিশেষ চাহিদার সৃষ্টি হয়। তাই সব মানুষের অভাব বা চাহিদার প্রকৃতি একরূপ নয়। এ তত্ত্বে মানুষের চাহিদাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
- কৃতিত্ব বা সাফল্য অর্জনের চাহিদা (Need for achievement): কৃতিত্ব বা সাফল্য অর্জনের চাহিদা বলতে প্রতিযোগিতাপূর্ণ কাজ করা এবং এরূপ কাজে সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনের আগ্রহকে বোঝায়।
- স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা (Need for affiliation): স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা বলতে অন্যের সাথে আন্তঃব্যক্তিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকে বোঝায়।
- ক্ষমতা প্রাপ্তির চাহিদা (Need for power): ক্ষমতা প্রাপ্তির চাহিদা বলতে অন্যের ওপর প্রভাব সৃষ্টি এবং নিজস্ব পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহকে বোঝায়।
ম্যাকক্লিল্যান্ডের মতে, কৃতিত্ব অর্জনের চাহিদা থাকে এমন ব্যক্তিরা ভালো ব্যবস্থাপক হতে পারে। যাদের মধ্যে স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা থাকে; তারা বিক্রয়, শিক্ষকতা, পরামর্শ দান প্রভৃতি কাজে ভালো করে। যারা ব্যক্তিগত ক্ষমতা পছন্দ করে, তারা প্রতিষ্ঠানের জন্য তেমন কল্যাণকর হয় না। তবে যারা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রত্যাশা করে, তারা প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠানে ভালো নেতৃত্ব দিতে পারে।
Motivation Theory of Maslow
অধ্যাপক আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলো (Abraham Harold Maslow) আমেরিকার একজন বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী এবং 'মানবীয় সম্পর্ক আন্দোলন' (Human Relation Movement) এর অন্যতম সংগঠক। তিনি প্রেষণা দানের একটি তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। এটি মাসলো'র চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Maslow's Need Hierarchy Theory) নামে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করে। নিচের দু'টি নীতির ওপর মাসলো'র তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত –
১. মানুষের চাহিদাগুলোকে গুরুত্বের ভিত্তিতে সাজানো যায়।
২. একটি অভাব পূরণ হয়ে গেলে নতুন আরেকটি অভাব পূরণের প্রয়োজন হয়।
১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে 'A Theory of Human Motivation' নামক গ্রন্থে তিনি চাহিদা সোপান তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। তার তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো-
- প্রেষণার বিষয়টি মানুষের অভাব তথা চাহিদা পূরণের সাথে সম্পৃক্ত।
- মানুষের পাঁচ স্তরের অভাব আছে। এক স্তরের অভাব পূরণ হলেই আরেক স্তরের অভাব দেখা দেয়।
- এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক অভাব পূরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিকে প্রেষণা দেওয়া সম্ভব।
- পূরণ হয়েছে এমন অভাব নয় বরং অপূরণকৃত অভাব প্রেষণার ক্ষেত্রে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।
মাসলো চাহিদা স্তরের প্রথম দুই স্তরের অভাবকে নিম্ন স্তরের অভাব (Lower-order needs) এবং পরবর্তী তিন স্তরের অভাবকে উচ্চ স্তরের অভাব (Higher-order needs) বলেছেন।
মানুষের অভাব অপরিসীম। এ অভাবের প্রকৃতি এতটাই বিচিত্র যে তা সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাসলো তাঁর গবেষণার মাধ্যমে মানবজীবনের অভাবগুলোকে প্রকৃতির ভিত্তিতে প্রধান পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো-জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, সামাজিক চাহিদা, আত্মমর্যাদার চাহিদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা। মাসলো মনে করেন, মানুষের জীবনে এ অভাবগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে দেখা দেয়। একটি অভাব পূরণ হওয়ার পর আরেকটি অভাব এসে উপস্থিত হয়। এ অভাবগুলো ধারাবাহিকভাবে মেটানোর ওপর কর্মীর প্রেষণা নির্ভর করে।
এ প্রসঙ্গে মাসলোর মক্তব্য হলো, একজন ব্যক্তির কোনো এক স্তরের অভাব পূরণের পর তার অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্তরের অভাব পূরণের জন্য প্রেষণা পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্বটি নিচে চিত্রসহ বর্ণনা করা হলো-
১. জৈবিক চাহিদা (Physiological needs): মানুষের বেঁচে থাকা তথা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপকরণের চাহিদাগুলোকে একসাথে জৈবিক চাহিদা বলে। মাসলোর তত্ত্বে সর্বনিম্ন স্তরে জৈবিক চাহিদার অবস্থান, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদানের সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, বাসস্থান, আলো-বাতাস, বিশ্রাম প্রভৃতি জৈবিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মীর জৈবিক চাহিদা বলতে বোঝায় পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক, কাজের পাশাপাশি বিশ্রামের ব্যবস্থা, কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রভৃতি। কর্মীর এসব চাহিদা পূরণের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্রে তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে উৎসাহিত করা যায়।
ধরা যাক, জনাব শামস্ একজন বেকার যুবক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় সাধারণভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে জরুরি ভিত্তিতে তার চাকরি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তিনি এমন চাকরিকেই উপযোগী মনে করবেন; যার মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা প্রভৃতির সুব্যবস্থা হয়। এজন্য তাকে প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় এমন একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে তিনি জৈবিক চাহিদার পরিতৃপ্তি অনুভব করবেন।

২. নিরাপত্তার চাহিদা (Safety needs): জৈবিক চাহিদা পূরণের পর কর্মীর মধ্যে নিরাপত্তার চাহিদা দেখা দেয়। সব
ধরনের বিপদ-আপদ, ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন প্রকার হুমকি, ভয়-ভীতি, পেশাগত অসুস্থতা, রোগ-ব্যাধি প্রভৃতি থেকে দূরে থেকে চাকরির স্থায়িত্ব বিধানের প্রয়োজনীয়তা হলো নিরাপত্তামূলক চাহিদা। এজন্য কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা বিধান, বিমা সুবিধা দেওয়া, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা দেওয়া, ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানের সুযোগ তৈরি প্রভৃতির মাধ্যমে কর্মীদের উৎসাহিত করা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা যায়।
উদাহরণ হিসেবে বর্ণিত জনাব শামস্ত্রে বিষয় ধরা যাক। জৈবিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর তিনি তার চাকরির স্থায়িত্ব ও অন্যান্য আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভাবতে থাকবেন। তিনি আশা করবেন যেন দীর্ঘদিন চাকরিটি করতে পারেন, সহজে চাকরি না চলে যায়, ভবিষ্যতের কোনো প্রয়োজন বা দুর্ঘটনায় যেন আর্থিক সহায়তা পান, চাকরি শেষে যাতে গ্র্যাচুইটি/পেনশন সুবিধা পান প্রভৃতি। তার নিয়োগকর্তা তাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারলে তিনি চাকরি ক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ অনুভব করবেন। এতে তিনি আগের চেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন।
৩. সামাজিক চাহিদা (Social needs): সামাজিক চাহিদা বলতে সমাজে মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্ব, স্নেহ-মমতা, প্রীতি- ভালোবাসা প্রভৃতির চাহিদাকে বোঝায়। এ পর্যায়ে কর্মী তার পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন নির্বাহী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মিলেমিশে চলতে চায়। তাই সামাজিক অধিকার, সংঘবদ্ধতা, সহকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, বন্ধুত্ব, আন্তরিকতা প্রভৃতি সামাজিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। কর্মীদের এসব চাহিদা পূরণ না হলে তারা কাজের ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। একপর্যায়ে তারা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে অসহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিবাদ ও নেতিবাচক আচরণ করে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনাব শামস্ তার জৈবিক ও নিরাপত্তার অভাব পূরণের পর নিজেকে বিভিন্ন সামাজিকতায় আবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা বোধ করবেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সংঘবদ্ধভাবে চলাফেরা করে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায়ে আগ্রহী হবেন। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উচিত হলো- দলবদ্ধভাবে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনার অনুশীলন ও সবার সাথে মেলামেশার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এতে জনাব শামস্ সঠিকভাবে কাজ করতে থাকবেন।
৪. আত্মতৃপ্তির চাহিদা (Esteem needs): সমাজে বসবাসরত বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীদের
থেকে মান-মর্যাদা, সম্ভ্রম ও প্রতিপত্তি, খ্যাতি প্রভৃতির দিক দিয়ে নিজেকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আত্মতৃপ্তির চাহিদা বলে। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব অনুযায়ী ওপরে বর্ণিত তিন ধরনের চাহিদা পূরণের পর এ পর্যায়ে আত্মমর্যাদার চাহিদা দেখা দেয়। এ ধরনের চাহিদাকে আবার দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
ক. আত্মমর্যাদার চাহিদা: আত্মবিশ্বাস অর্জন, স্বাধীনতা লাভ, সামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রকাশ, জ্ঞান অর্জন প্রভৃতির চাহিদা।
খ. সুখ্যাতিজনিত চাহিদা: প্রশংসা, স্বীকৃতি, পদমর্যাদা, সহকর্মীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন প্রভৃতির চাহিদা।
উল্লিখিত তিন স্তরের চাহিদা পূরণের পর, জনাব শামস্ত্রে সম্মান ও মর্যাদার চাহিদা পূরণের প্রয়োজন দেখা দেবে। তিনি তার কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিক স্বীকৃতি, মান-মর্যাদা, প্রতিপত্তি ও খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করবেন। এজন্য কর্তৃপক্ষকে তার যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তিনি আগ্রহের সাথে কাজে নিয়োজিত থাকেন।
৫. আত্মপ্রতিষ্ঠা/আত্মপূর্ণতার চাহিদা (Self actualization needs): কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব ইচ্ছা সম্পূর্ণভাবে অর্জন, উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আত্মপূর্ণতার চাহিদা বলে। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্বে এটি মানব চাহিদার সর্বশেষ বা সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থিত। এ পর্যায়ে উন্নীত ব্যক্তি সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়া, শিল্প-সাহিত্যে অবদান, সমাজসেবা প্রভৃতি কাজ করে। এর মাধ্যমে সে নিজের সৃজনশীলতা ও বিশেষ গুণের বিকাশ ঘটিয়ে অমরত্ব লাভে সচেষ্ট হয়। তাই আত্মপূর্ণতার চাহিদা ব্যক্তির সর্বোচ্চ বা সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ও যোগ্যতার সাথে সম্পৃক্ত, যা তাকে উত্তম মানুষ হতে সহায়তা করে। চাহিদার এ স্তরে কর্মীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ, উচ্চ মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ কাজ, ব্যক্তিক অগ্রগতির সুযোগ প্রভৃতির মাধ্যমে প্রেষণা দেওয়া যায়। বাস্তবে মানুষের এ স্তরের চাহিদা কখনও সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয় না।
প্রথম চার ধরনের চাহিদা পূরণের পর জনাব শামস্ সমাজে বা পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে চাইবেন। অর্থাৎ, এ পর্যায়ে তিনি অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করবেন। এ স্তরের চাহিদার কোনো শেষ নেই। এক্ষেত্রে কাজে আরও উৎসাহী করতে কর্তৃপক্ষকে জনাব শামস্ত্রে সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তার ব্যক্তিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়। তবে একটি পর্যায়ে জনাব শামসের চাহিদা নতুনভাবে সৃষ্টি হবে এবং তার এ স্তরের চাহিদা অপূর্ণই থেকে যাবে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Criticism of Motivation Theory of Maslow
বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও ব্যবহৃত তত্ত্ব হওয়া সত্ত্বেও মাসলোর 'চাহিদা সোপান তত্ত্ব' নিম্নোক্তভাবে সমালোচিত হয়েছে-
- অভাবই মানুষ তথা কর্মীদের আচরণের একমাত্র নির্ধারক নয়।
- মাসলো মানবজীবনে চাহিদার যে পর্যায়ক্রমিক স্তর দেখিয়েছেন, 'তা সব দেশ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একই রূপ না-ও হতে পারে।
- এ তত্ত্বে বলা হয়েছে, এক স্তরের চাহিদা পূরণ হলে কর্মীর মধ্যে পরবর্তী স্তরের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। মাসলোর এ বক্তব্য সব দিক থেকে সঠিক নয়। বাস্তবে একজন কর্মীর মধ্যে কখনো কখনো একাধিক চাহিদা একই সময়ে উদ্ভব হতে পারে।
- মানুষের মধ্যে চাহিদার তীব্রতা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কোনো জরুরি অবস্থায় চাহিদার এ সোপানগুলো অনুসরণীয় না-ও হতে পারে।
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কারণে মাসলোর তত্ত্বটি সবার ওপর সমানভাবে কার্যকর হয় না। আবার, ব্যক্তিভেদে চাহিদার প্রকৃতি ও ধারাবাহিকতা এক রকম হয় না। প্রাথমিক পর্যায়েই কোনো কর্মী উচ্চ স্তরের অভাব বোধ করতে পারে। তাই চাহিদার যে ধারাবাহিকতা মাসলো দেখিয়েছেন, তা সব সময় সঠিক হয় না।
- কর্মীদের সন্তুষ্টি পরিমাপের কোনো সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। তাই এটি পরিমাপ করে সে অনুযায়ী সব সময় সঠিক ব্যবস্থাপকীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায় না।
- মাসলোর প্রেষণা তত্ত্বটি ব্যাপক গবেষণাসমৃদ্ধ নয়। বরং এটি অনেকটাই তাত্ত্বিক বিষয়।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, মানুষের অভাব পূরণের মাধ্যমেই তাকে প্রেষণা দেওয়া হয়ে থাকে। এ অভাবগুলোকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে এগুলোর ভিত্তিতে কর্মীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা যায়। তাই আব্রাহাম মাসলোর উক্ত তত্ত্বটির অনেক সমালোচনা থাকলেও এটি বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয়।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Motivation Theory of Herzberg
অধ্যাপক ফ্রেডারিক আরভিং হার্জবার্গ (Frederick Irving Herzberg) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ ১৯৫৯ সালে প্রেষণা সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। এটি হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Herzberg's Two Factors Theory) নামে পরিচিত। এ তত্ত্ব প্রবর্তনের লক্ষ্যে হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীগণ যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের কয়লাখনি এলাকায় একটি গবেষণা কাজ পরিচালনা করেন। এ গবেষণায় ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন হিসাবরক্ষক ও প্রকৌশলীর মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি ও উৎপাদনশীলতার সম্পর্কের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এ সাক্ষাৎকারে দু'টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। প্রথম প্রশ্নটি ছিল, 'আপনার কাজে কখন আপনি সম্পূর্ণভাবে স্বস্তি অনুভব করেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন কি?' দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল, 'আপনার কাজে আপনি কখন অস্বস্তি অনুভব করেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন কি?'

এতে দেখা যায়, দু'ধরনের উপাদান কর্মীদের মধ্যে কাজের প্রতি সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে প্রেষণামূলক (Motivational factors) এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান (Hygiene or Maintenance factors) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এজন্য এ তত্ত্বকে প্রেষণার দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Two Factors Theory) বলা হয়।
উল্লিখিত প্রশ্ন দু'টির উত্তর বিশ্লেষণ করে হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীরা মানুষের চাহিদাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এ দু'ধরনের উপাদানগুলো হলো-
ক. রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদান (Hygiene or Maintenance factors)
প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদান হলো কাজের সাথে সম্পৃক্ত আবশ্যকীয় উপাদান, যেগুলোর অনুপস্থিতি কর্মীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা যোগায় না। রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো হলো-
১. প্রতিষ্ঠানের নীতি ও প্রশাসন (Company policy and administration);
২. সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান (Perfect supervision);
৩. তত্ত্বাবধায়কের সাথে সম্পর্ক (Interpersonal relationship with supervisor);
৪. বেতন (Salary);
৫. কার্যপরিবেশ (Working environment);
৬. সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক (Relationship with peers and colleagues);
৭. ব্যক্তিগত জীবন (Personal life);
৮. অধস্তনদের সাথে সম্পর্ক (Relationship with subordinates);
৯. পদমর্যাদা (Status);
১০. নিরাপত্তা (Security) এবং
১১. আনুষঙ্গিক আর্থিক সুবিধা (Fringe benefits) ।
খ. প্রেষণা দানকারী উপাদান (Motivational factors or Satisfiers)
প্রতিষ্ঠানে যেসব উপাদানের উপস্থিতি কর্মীদের কাজ সম্পাদনে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করে, তাকে প্রেষণা দানকারী উপাদান বলে। এসব উপাদান কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। প্রেষণা দানকারী উপাদানগুলো উচ্চ স্তরের অভাব পূরণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এগুলো কাজকে কর্মীর কাছে আকর্ষণীয় ও পুরস্কারযোগ্য করে তোলে। প্রেষণা দানকারী উপাদানের উপস্থিতি কর্মীকে সন্তুষ্ট করে। তবে এগুলোর অনুপস্থিতিতে তারা অসন্তুষ্ট হয় না। বরং তারা নিরপেক্ষ থাকে এবং স্বাভাবিক গতিতে কাজ করে যায়। এ উপাদানগুলো হলো-
১. সাফল্য অর্জন (Achievement);
২. স্বীকৃতি (Recognition);
৩. দায়িত্ব (Responsibility);
৪. প্রতিযোগিতামূলক কাজ (Challenging work);
৫. ব্যক্তিক উন্নয়ন (Personal growth) এবং
৬. অগ্রগতি (Advancement) ।

হার্জবার্গের তত্ত্ব মতে, রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো অনুপস্থিতি কর্মীদের মাঝে অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে এবং এগুলোর উপস্থিতি তাদেরকে নিরপেক্ষ অবস্থায় রাখে। অর্থাৎ, এগুলোর উপস্থিতির ফলে কর্মীরা অনুপ্রাণিত হয় না। এটি চিত্রের মাধ্যমে দেখানো যায়-
হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্বের সমালোচনা (Criticism of Herzberg's Motivation Theory) হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্ব সম্পর্কে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ নিম্নোক্তভাবে সমালোচনা করেছেন –
- এটি নিতান্তই পদ্ধতিনির্ভর তত্ত্ব, যা বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য।
- এ গবেষণায় শুধু উচ্চ স্তরের কর্মীদের প্রেষণা প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে। তাই এটি নিম্ন স্তরের কর্মীদের সব ক্ষেত্রে ও পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়।
- এ তত্ত্বে, প্রেষণার উপাদানগুলো সঠিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। ফলে বেতন, কর্মপরিবেশ, পদমর্যাদা প্রভৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে, এগুলো যেকোনো স্তরের কর্মীদের প্রণোদিত করে থাকে।
- এ তত্ত্বে, প্রেষণার উপাদানগুলো সঠিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি। ফলে বেতন, কর্মপরিবেশ, পদমর্যাদা প্রভৃতিকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে, এগুলো যেকোনো স্তরের কর্মীদের প্রণোদিত করে থাকে।
অতএব, সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানগুলো পরস্পরবিরোধী নয় বরং এগুলো একটি অপরটির পরিপূরক। হার্জবার্গের পরামর্শ হলো- প্রতিষ্ঠানে প্রথমে রক্ষণাবেক্ষণকারী উপাদানে সমাবেশ ঘটাতে হবে, যাতে কর্মীদের মনে কোনো অসন্তুষ্টি না থাকে। এরপর তাদের প্রেষণা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রেষণা দানকারী উপাদানে ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Relationship between Motivational Theory of Maslow and Herzberg
কর্মীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজ আদায়ের জন্য সঠিক উপায়ে প্রেষণা দেওয়া অপরিহার্য। তবে এটি অত্যন্ত জটিল কাজ। এজন্য গবেষণার মাধ্যমে অনেক তত্ত্ব ও উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব ও হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব অন্যতম।
এ দু'টি তত্ত্ব চাহিদাকেন্দ্রিক (Need Theory) হওয়ায় প্রকৃতি, প্রয়োগ এবং উপযোগিতার দিক দিয়ে দু'টোর মধ্যে মিল পাওয়া যায়। নিচে মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব ও হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্বের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক উপস্থাপন করা হলো-
- মাসলোর তত্ত্বে মানবজীবনের সামগ্রিক চাহিদাকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোকে গুরুত্ব অনুসারে ধারাবাহিকভাবে নিচের দিক থেকে উপরের দিকে সাজানো হয়েছে। এ চাহিদাগুলো ধারাবাহিকভাবে পূরণে মানুষ আগ্রহী হয়ে থাকে।
অপরদিকে, হার্জবার্গের তত্ত্ব অনুযায়ী সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী ও অসন্তুষ্টিকারক এ দু'ধরনের পরিপূরক উপাদানকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কাজের প্রতি মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করে।
- মাসলোর তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত সব উপাদানই প্রেষণাকেন্দ্রিক। তবে হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্বের সব উপাদান
প্রেষণাকেন্দ্রিক নয়। এর কিছু উপাদান প্রেষণাকেন্দ্রিক হলেও অন্যগুলো রক্ষণাবেক্ষণমূলক। - মাসলোর তত্ত্বে বিভাজিত প্রয়োজনগুলো সব স্তরের কর্মীর মধ্যে দেখা গেলেও হার্জবার্গের তত্ত্বের বিভাজিত উপাদানগুলো অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্তরের কর্মীদের মধ্যে দেখা যায়।
- চাহিদা সোপান তত্ত্বে মানুষের মনোজাগতিক এবং বৈষয়িক চাহিদার প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে দ্বি-উপাদান তত্ত্বে, কর্মীদের মনোবলের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকেন্দ্রিক ও কর্মবহির্ভূত বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- মাসলো তাঁর প্রেষণা তত্ত্বে কাজ বিস্তৃতকরণের (Job Enlargement) ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পক্ষান্তরে, হার্জবার্গ তাঁর তত্ত্বে কাজ বিস্তৃতকরণের পাশাপাশি কাজ সমৃদ্ধিকরণের (Job Enrichment) কথাও বলেছেন।
- মাসলোর তত্ত্বে অর্থকে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে দেখানো হলেও হার্জবার্গের তত্ত্বে একে সংরক্ষণমূলক বা গৌণ উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
- চাহিদা সোপান তত্ত্ব অনুযায়ী কর্মীদের পর্যায়ক্রমিকভাবে সৃষ্ট অভাব পূরণের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করা যায়। অপরদিকে দ্বি-উপাদান তত্ত্ব অনুযায়ী শুধু প্রণোদনামূলক উপাদান কর্মীদের সন্তুষ্ট করে। আবার, রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান কর্মীদের অতিরিক্ত উৎসাহ না দিলেও এগুলোর অনুপস্থিতি তাদের অসন্তুষ্ট করে।
- সব শ্রেণির কর্মীর ওপর মাসলোর তত্ত্বের প্রয়োগ করা গেলেও হার্জবার্গের তত্ত্ব শুধু উচ্চ স্তরের কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে মনে করা হয়।
- মাসলোর তত্ত্বের আওতা ব্যাপক ও বিস্তৃত হলেও হার্জবার্গের তত্ত্বের আওতা বেশ সীমিত।
নিচের চিত্রের সাহায্যে মাসলো ও হার্জবার্গের তত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক উপস্থাপন করা হলো-

উপসংহারে বলা যায়, মাসলো এবং হার্জবার্গের প্রেষণা তত্ত্বের মধ্যে যতই সম্পর্ক বা পার্থক্য থাকুক না কেন, দু'টি তত্ত্বই প্রেষণার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাকেন্দ্রিক তত্ত্ব। মাসলোর তত্ত্বে যেকোনো স্তরের কর্মীদের অভাবকে প্রেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে হার্জবার্গের তত্ত্বে বলা হয়, কর্মীদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সব প্রতিষ্ঠানই সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে থাকে। এগুলো প্রেষণার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। তাই অর্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক চাহিদাকেও হার্জবার্গ গৌণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে তত্ত্ব দু'টির উদ্ভাবনী ইতিহাস প্রমাণ করে, হার্জবার্গের তত্ত্বটি মাসলোর তত্ত্বের একটি পরিমার্জিত রূপ। অর্থাৎ, মাসলোর তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই হার্জবার্গের তত্ত্ব উদ্ভাবন হয়েছে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Obstacles & Ways to Remove at Motivating the Employees
কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা (Obstacles to Motivate the Employees):
কর্মীদের কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের কাজের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হলো প্রেষণা। তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাকে নিম্নোক্ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়-
- চাহিদার ভিন্নতা (Variation in needs): কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবিশেষে চাহিদায় ভিন্নতা দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানের সীমিত সম্পদের মাধ্যমে সবার চাহিদা পূরণ করা এবং সব কর্মীকে একই উপায়ে প্রেষণা দেওয়া যায় না। অপরদিকে চাহিদা অসীম। এক চাহিদা পূরণ হলে অন্য চাহিদার সৃষ্টি হয়। চাহিদার এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের কারণে সঠিক উপায়ে প্রেষণা দানে বাধা তৈরি হয়।
- চাহিদার প্রকৃতি নির্ধারণে অসুবিধা (Problems at determining nature of needs): কর্মীরা কী চায় এবং কীভাবে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করে কাজে উৎসাহিত করা যায়, তা নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাহিদার প্রকৃত অবস্থা কেমন, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এজন্য প্রেষণা প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে।
- উৎপাদনের উপকরণের অপর্যাপ্ততা (Insufficient factors of production): শুধু প্রেষণা দিলেই উৎপাদন বাড়বে, এ ধারণা সঠিক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মী, উন্নত যন্ত্রপাতি, উৎকৃষ্ট কাঁচামাল প্রভৃতির যথাযথ সরবরাহ না থাকলে, শুধু প্রেষণা দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সফলতা আসে না।
- আন্তরিকতার অভাব (Lack of cordiality): কর্মীদের প্রতি সহানুভূতি ও আন্তরিকতার অভাব এবং তাদের চাহিদা ও দাবি নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের অযোগ্যতা, উদ্যোগহীনতা প্রভৃতি সুষ্ঠু প্রেষণার কৌশল নির্ধারণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রেষণা অকার্যকর হয়ে যায়।
- শ্রমিক সংঘের প্রভাব (Influence of trade union): কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী তথা শ্রমিক সংঘের নেতা ও সদস্যরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে অনর্থক সংঘাতে জড়িয়ে যায় বা অসহযোগিতামূলক আচরণ করে। এতে সঠিকভাবে প্রেষণার কৌশল নির্ধারণ এবং প্রয়োগ করা যায় না।
- ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব (Effect of personal life): কর্মীর ব্যক্তিগত জীবন তথা প্রতিষ্ঠানের বাইরের বিভিন্ন ঘটনার ওপর কর্তৃপক্ষের তেমন কিছুই করার থাকে না। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রেষণা দেওয়া হলেও তা কর্মীকে কাজে উৎসাহিত করে না।
- স্তরগত পার্থক্য (Hierarchical differences): নিম্ন স্তরের কর্মীর কাছে মৌলিক চাহিদাই গুরুত্বপূর্ণ। আবার উচ্চ স্তরের নির্বাহীর কাছে মৌলিক চাহিদার চেয়ে মান-মর্যাদা বা আত্মপ্রকাশের চাহিদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। তাই কর্মীদের স্তরগত পার্থক্য প্রেষণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি করে।
- ব্যক্তিক পার্থক্য (Personal differences): ব্যক্তিক স্বাতন্ত্র্যবোধের কারণে মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। এর প্রভাব চাহিদার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। জন্মগতভবে ও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার কারণে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হওয়ায় প্রেষণার কোনো সর্বজনীন কৌশল পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা যায় না। এতে প্রেষণা প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে যায়।
- দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য (Differences in skill and experience): অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে কর্মীদের চাহিদা নির্ধারণ এবং প্রেষণার কার্যকর কৌশল নির্ধারণে অক্ষমতা দেখা যায়। এতে তারা কর্মীদের অভাব-অভিযোগ সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।
- নেতিবাচক প্রেষণা (Negative motivation): নেতিবাচক প্রেষণা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা বেশ কষ্টকর বিষয়। কর্মীদের ভয়-ভীতির মাধ্যমে প্রেষিত করা অনেক সহজ। তবে এ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কার্যকর হলেও ভবিষ্যতে প্রতিকূল প্রভাব দেখা যায়। এজন্য সব সময় প্রেষণার ইতিবাচক কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করা উচিত।
- অতএব, কর্মীদের প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত বাধা বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করতে পারলে তাদের কাছ থেকে বেশি কাজ আদায় সম্ভব হবে।'
কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের উপায় (Ways to Remove the Obstacles at Motivating the Employees):
প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দাবি বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ দূরীকরণে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে-
- প্রেষণার উপযুক্ত কৌশল ব্যবহার (Using proper motivation a technique): আর্থিক কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রত্যাশা ও প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের মধ্যে অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে। অন্যদিকে অনার্থিক ও নেতিবাচক কৌশল প্রয়োগে নির্বাহীদেরকে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের পদমর্যাদা, বিশেষজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা, অবদান প্রভৃতি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হয়।
- শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়ন (Developing labour-management relationship): শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নত হলে প্রেষণার অনেক বাধাই দূর করা সম্ভব। এ সম্পর্ক অনুকূল হলে প্রেষণা কার্যক্রম সফল হয়ে থাকে। মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিক হলে কর্মীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখবে।
- কর্মী উন্নয়ন (Developing employees): প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের মেধা ও দক্ষতার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা তাদের সন্তুষ্টি বাড়িয়ে দেয়। কর্মীরা যখন দেখে প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন তারা দ্রুত উৎসাহিত হয়।
- অনুকূল মানসিকতা সৃষ্টি (Creating favourable mentality): ভিন্ন মানসিকতার ফলে প্রেষণা দান প্রক্রিয়া
সমানভাবে ফলপ্রসূ হয় না। কারণ, ভিন্নভাবে সব কর্মীর মানসিকতা নির্ধারণ করে প্রেষণা দান প্রক্রিয়া চলমান রাখা অসম্ভব হয়ে যায়। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যবহার করা সম্ভব হলে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে প্রেষণা দিয়ে সহজেই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হয়। - নমনীয় মনোভাব সৃষ্টি (Creating flexible attitude): পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো বা মানিয়ে
নেওয়াকে নমনীয়তা বলে। অনমনীয়তা বা অপরিবর্তনশীলতা প্রেষণা দান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মনোভাব সব সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অনুকূলে হওয়া আবশ্যক। - মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা (Establishing values and ethics): কর্মীরা সব সময়ই তাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ব করতে চায়। তারা আশা করে, মালিক ও ব্যবস্থাপনার লোকজন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ও ক্ষেত্রে মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করুক। এটি সম্ভব হলে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবদান রাখতে চায়। তাই, প্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে তা প্রেষণা দেওয়ার পথকে সহজ করে।
- প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা (Establishing organizational image): প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কর্মীদের হতাশ করে। এতে তারা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে চায়। পক্ষান্তরে বাজারে প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট সুনাম ও সুখ্যাতি থাকলে কর্মীরা তাদের কাজের মান আরও উন্নত করার চেষ্টা চালায়। কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উন্নত করতে সক্ষম হলে কর্মীরা সহজেই প্রণোদিত হয়ে থাকে।
সুতরাং, প্রেষণা কর্মীদের উৎপাদন বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও বিভিন্ন বাধার কারণে সব সময় তা কার্যকর হয় না।
প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিবন্ধকতা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা না হলে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব নয়।
পাশাপাশি প্রেষণা কর্মসূচিও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। এজন্য উল্লিখিত সম্ভাব্য প্রতিকারের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Relationship between Motivation and Productivity
প্রেষণা এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তথা ইতিবাচক ও নেতিবাচক সম্পর্ক আছে। কর্মীদের সঠিক মাত্রায় প্রেষণা দিতে পারলে তাদের মাধ্যমে মানসম্মত কাজ আদায় করা যায়। অন্যথায়, তাদের মাধ্যমে মানসম্মত কাজ করানো সম্ভব নয়। আর উৎপাদনশীলতা বলতে উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ ও উৎপন্ন দ্রব্যের অনুপাতকে বোঝায়।
অর্থাৎ, উৎপাদনশীলতা =উৎপাদন/উপকরণ
প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে হলে এর উপকরণের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এটি নির্ভর করে কর্মীদের দক্ষতা ও কাজের প্রতি আগ্রহের ওপর। উপযুক্ত প্রেষণার ওপর কর্মীদের কাজের প্রতি এরূপ উৎসাহ-উদ্দীপনা নির্ভর করে। প্রেষণা কর্মীদের কাজ সম্পাদনে আগ্রহী করে তোলে। কর্মী যতই দক্ষ ও অভিজ্ঞ হোক না কেন, তারা কাজের প্রতি আগ্রহী না হলে বেশি উৎপাদন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বলা যায়, প্রেষণার ফলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
কর্মীদের উপযুক্ত প্রেষণা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য উপায়-উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়। তাই প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে কর্মীদের কর্মক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদেরকে উৎসাহিত করা হয়।
প্রেষণা ও উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক নিম্নোক্ত তিনটি চিত্রের সাহায্যে দেখানো যেতে পারে-

তাই বলা যায়, উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে ব্যবহৃত মানবীয় ও অমানবীয় সব উপকরণের দক্ষ ব্যবহারের ওপর। আবার, উপকরণের দক্ষ ব্যবহার নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার সফলতার ওপর। অপরদিকে ব্যবস্থাপনা যত সফলভাবে কর্মীকে কাজে অনুপ্রাণিত করতে পারবে, কর্মীর উৎপাদনশীলতা তত বাড়বে। তাই প্রেষণা এবং উৎপাদনশীলতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Relationship between Motivation and Morale
কর্মীদের কর্মক্ষমতা পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদেরকে কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত বা উৎসাহী করাকে প্রেষণা বলে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠান ও কাজের প্রতি দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা স্বেচ্ছাকৃত মানসিক বা আবেগজনিত উদ্দীপনাকে মনোবল বলা হয়। মনোবল কর্মীদের কাজের সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রেষণা ও মনোবলের মধ্যে যোগসূত্র বা সম্পর্ক আছে। এ দু'টি বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য নিচে সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-
- এডউইন বি. ফ্লিপ্পো (Edwin B. Flippo) বলেন, 'Morale is a mental condition or attitude of individuals and groups which determines their willingness to co-operate.' অর্থাৎ, 'মনোবল হলো ব্যক্তিগত এবং দলগত মনের অবস্থা বা আচরণ, যা তাকে বা তাদেরকে কাজে সাহায্য দেওয়ার মাধ্যমে প্রেষণা দান করে।'
- উইলিয়াম জি. স্কট (William G. Scott) এর মতে, ‘প্রেষণা হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া বিশেষ, যা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য কর্মীদের মাঝে কাজ সম্পাদনের প্রতি উদ্দীপনা বাড়ায়।’ প্রেষণা ও মনোবলের মধ্যে যে সম্পর্ক দেখা যায় তা নিচে আলোচনা করা হলো-
- প্রেরণা দান (Giving inspiration): প্রেষণা ও মনোবল দু'টোই মানুষকে বিশেষ পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত আচরণ করতে প্রেরণা দেয়।
- মনের ওপর প্রভাব (Affect on mind): প্রেষণা ব্যক্তির মনোবল বাড়ায় আর মনোবল ব্যক্তির মানসিক শান্তি, সুস্থতা ও সন্তুষ্টির পরিচয় বহন করে।
- লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা (Role for achieving goal): প্রেষণা বিশেষ লক্ষ্য অর্জনে কাজের প্রচেষ্টাকে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে, মনোবল কাজের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে।
- সম্পর্কের প্রকৃতি (Nature of relation): সম্পর্কের প্রকৃতি বিবেচনায় প্রেষণা ও মনোবলের মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। উত্তম প্রেষণা কাজ সম্পাদনে কর্মীদের উৎসাহ বাড়ায়। আর কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়লে ধীরে ধীরে কর্মীদের মনোবলও বাড়ে।
- নির্ভরশীলতা (Dependency): প্রেষণা নির্ভর করে কর্মীর আর্থিক ও অনার্থিক প্রেষণামূলক উপাদানের ওপর। অপরদিকে মনোবল নির্ভর করে এসব উদ্দীপক প্রাপ্তির মাধ্যমে কাজের সন্তুষ্টির ওপর।
- কার্যসন্তুষ্টি (Job satisfaction): প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রেষিত হলে কাজের প্রতি তাদের সন্তুষ্টি বাড়ে এবং মনোবলও বেড়ে যায়।
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Increasing productivity): মনোবল বাড়ানোর জন্য প্রেষণা আবশ্যক। আর কর্মীদের মনোবল উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে।

সুতরাং, প্রেষণার মাধ্যমে কর্মীদেরকে উৎসাহিত করায় কাজের প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহের তৈরি হয়। আর কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়ার সাথে তাদের মনোবলও বাড়ে।
প্রেষণা - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more