Relevant Theories of Motivation
প্রেষণা কর্মীর আচরণ ও কর্মশক্তিকে প্রভাবিত করে লক্ষ্য অর্জনের দিকে পরিচালিত করে। এজন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীকে প্রেষণা দিতে আর্থিক ও অনার্থিক উদ্দীপকগুলোর প্রতি বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আধুনিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণার কারণে বিভিন্ন প্রেষণা তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। নিচে এ তত্ত্বগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১. চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Need hierarchy theory): কর্মীদের প্রেষণাদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলোর (Abraham Harold Maslow) চাহিদা সোপান তত্ত্ব। মাসলো তাঁর গবেষণার মাধ্যমে মানব জীবনের অভাবগুলোকে প্রকৃতির ভিত্তিতে পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো- জৈবিক, নিরাপত্তা, সামাজিক, আত্মমর্যাদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা। তিনি বলেছেন, মানুষের এ চাহিদাগুলো পর্যায়ক্রমে আসে। অর্থাৎ একটি চাহিদা পূরণ হলে আরেকটি চাহিদার সৃষ্টি হয়।
২. দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Two factors theory): অধ্যাপক ফ্রেডারিক হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীগণ প্রেষণা সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রবর্তন করেন, যা হার্জবার্গের দ্বি-উপাদান তত্ত্ব নামে পরিচিত। হার্জবার্গ ও তাঁর অনুসারীরা যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের কয়লাখনি এলাকায় একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে দেখা যায়, দু'ধরনের উপাদান কর্মীদের মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। সন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে প্রেষণামূলক এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণমূলক উপাদান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কর্মক্ষেত্রে এ দু'ধরনের উপাদান মূল্যায়ন প্রেষণা দেওয়ার জন্য গুরত্বপূর্ণ।
৩. ইআরজি তত্ত্ব (ERG theory): মাসলোর পাঁচ স্তরবিশিষ্ট চাহিদাকে তিনটি স্তরে ভাগ করে Clayton P. Alderfer প্রেষণার একটি নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন, যা ইআরজি তত্ত্ব (ERG Theory) নামে পরিচিত। (১) টিকে থাকার চাহিদা (E = Existence Needs), যা জৈবিক ও নিরাপত্তার চাহিদার সমন্বয়ে গঠিত। (২) সম্পৃক্ততার চাহিদা (R = Relatedness Needs), যা সামাজিক ও আত্মমর্যাদার চাহিদার সমন্বয়ে গঠিত। (৩) প্রবৃদ্ধির চাহিদা (G = Growth Needs), যা আত্মপ্রতিষ্ঠা বা আত্মপূর্ণতার চাহিদার অনুরূপ ।
৪. X ও Y তত্ত্ব (Theory of X and Y): ১৯৫৭ সালে ডগলাস মারে ম্যাকগ্রেগরের প্রকাশিত 'The Human Side of Enterprise' নামক গ্রন্থে কর্মীর মনোভাব সম্পর্কে দু'ধরনের তত্ত্ব উল্লেখ করেন। তিনি কর্মীদের প্রতি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সম্পর্কিত যে দু'টি তত্ত্ব দিয়েছেন, তা 'X ও Y তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
- তত্ত্ব X (Theory of X): এরূপ তত্ত্বে কর্মীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়-কর্মীরা কাজ অপছন্দ করে, সুযোগ থাকলে ফাঁকি দেয় এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। তারা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিবর্তন পছন্দ করে না। এ ধরনের কর্মীরা কম উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। আর্থিক সুযোগ-সুবিধাকেই তারা একমাত্র পাওনা মনে করে। তাই তাদের থেকে কাজ আদায়ে ভয় দেখানো, চাপ প্রয়োগ ও প্রয়োজনে শাস্তি দিতে হয়।
- তত্ত্ব Y (Theory of Y): এরূপ তত্ত্বে কর্মীদের সম্পর্কে ইতিবাচক ও উচ্চ ধারণা পোষণ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়- কর্মীরা কাজ পছন্দ করে এবং তারা নিজ উদ্যোগেই চলতে চায়। তারা দায়িত্ব নিতে চায়, কৃতিত্ব অর্জন করতে চায় এবং স্বীকৃতি পাওয়ারও প্রত্যাশা করে। এছাড়া সুযোগ পেলে কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিতে উত্তম পরামর্শও দিতে পারে। এ কারণে তাদের ওপর অহেতুক চাপ না দিয়ে কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া উচিত।
৫. প্রত্যাশা তত্ত্ব (Expectancy theory): মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর এইচ. ভূম (Victor H. Vroom) ১৯৬৪ সালে প্রত্যাশা তত্ত্বটি উদ্ভাবন করেন। দু'টি বিষয়ের ওপর এ তত্ত্ব নির্ভর করে- (ক) কর্মীরা কোন জিনিস কতটা পেতে চায়। (খ) প্রত্যাশিত জিনিস সে কতটা পেতে পারে। তিনি বিষয়টি সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন- যেখানে, M = Motivation (প্রেষণা), E = Expectancy (প্রত্যাশা), I = Instrumentality (কর্মের সাথে পুরস্কারের সম্পর্কের মাত্রা), V = Valence (আকর্ষণ)। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কর্মী কোনো লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যাশ্যায় কাজ করে এবং প্রণোদিত হয়। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য কর্মীর কাছে যত বেশি মূল্যবান হবে তত বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজে মনোনিবেশ করবে।
৬. ন্যায় বা সমতা তত্ত্ব (Equity theory): প্রেষণার সমতা তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন আধুনিক মনোবিজ্ঞানী J. Stacy Adams। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কর্মী প্রাপ্ত পুরস্কারকে যথাযথ মূল্যায়ন করার জন্য কর্মপ্রচেষ্টা ও অবদানের সাম্য যাচাই করে। এছাড়া অন্য কর্মীর সাথে তার অবদান ও পুরস্কারের তুলনামূলক ন্যায্যতা বিচার করে। ন্যায় তত্ত্বের সূত্রটি নিম্নরূপ- ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার/ব্যক্তির অবদান=অন্য ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার/অন্য ব্যক্তির প্রাপ্ত পুরস্কার
সাধারণত ব্যক্তির অবদানের মাপকাঠি হলো- কর্মপ্রচেষ্টা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, কাজ সম্পাদনের পরিমাণ ও গুণ প্রভৃতি। আর পুরস্কার হিসেবে বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো- বেতন ও প্রান্তিক সুবিধাদি, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পুরস্কারসমূহ। ন্যায় তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রে অন্যের সাথে অবদান ও প্রাপ্ত ফলাফলের সমতা থাকতে হবে।
৭. লক্ষ্য নির্ধারণ তত্ত্ব (Goal setting theory): মার্কিন যুক্তারাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী Adwin Locke ১৯৬৮ সালে লক্ষ্য নির্ধারণ তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। এ তত্ত্বে ধারণা করা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করে। তাই ব্যবস্থাপককেও প্রথমে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পুরস্কারের প্রত্যাশায় কর্মীরা কাজ করবে।
৮. পুনঃশক্তি সঞ্চায়ন/শক্তিবৃদ্ধি তত্ত্ব (Reinforcement theory): মনোবিজ্ঞানী B. F. Skinner পুনঃশক্তি সঞ্চায়ন তত্ত্বের প্রবক্তা। এ তত্ত্ব অনুসারে কর্মীর আচরণকে ইতিবাচক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়, কর্মীর ওপর চাপ সৃষ্টি বা শক্তি প্রয়োগ না করেও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি, কাজের প্রশংসা ও পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীর কর্মশক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়। এতে কর্মীর মনোবল বাড়ে এবং কর্মী বেশি কাজ সম্পাদনে সচেষ্ট হয়।
৯. সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (Social learning theory): Albert Bandura নামক মনোবিজ্ঞানী এ তত্ত্বের উদ্ভাবক।
সামাজিক কার্যক্রম থেকে শিক্ষা লাভ করে আচরণের পরিবর্তন করাই এ তত্ত্বের মূল কথা। মানুষ সামাজিক জীব। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি অন্যকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন আচরণে অভ্যস্ত হয়। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে অন্য ব্যক্তি তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে সেভাবে আচরণ করতে শিখে। আদর্শ আচরণ পর্যবেক্ষণ করে মানুষ যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষা লাভ করে, তাকে সামাজিক শিক্ষণ বলে।.
১০. অর্জিত চাহিদা তত্ত্ব (Acquired needs theory): ডেভিড সি. ম্যাকক্লিল্যান্ড (David C. McClelland) হলেন
অর্জিত চাহিদা তত্ত্বের উদ্ভাবক। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, দীর্ঘ সময়ে জীবনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা থেকে মানুষের বিশেষ চাহিদার সৃষ্টি হয়। তাই সব মানুষের অভাব বা চাহিদার প্রকৃতি একরূপ নয়। এ তত্ত্বে মানুষের চাহিদাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
- কৃতিত্ব বা সাফল্য অর্জনের চাহিদা (Need for achievement): কৃতিত্ব বা সাফল্য অর্জনের চাহিদা বলতে প্রতিযোগিতাপূর্ণ কাজ করা এবং এরূপ কাজে সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনের আগ্রহকে বোঝায়।
- স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা (Need for affiliation): স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা বলতে অন্যের সাথে আন্তঃব্যক্তিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকে বোঝায়।
- ক্ষমতা প্রাপ্তির চাহিদা (Need for power): ক্ষমতা প্রাপ্তির চাহিদা বলতে অন্যের ওপর প্রভাব সৃষ্টি এবং নিজস্ব পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহকে বোঝায়।
ম্যাকক্লিল্যান্ডের মতে, কৃতিত্ব অর্জনের চাহিদা থাকে এমন ব্যক্তিরা ভালো ব্যবস্থাপক হতে পারে। যাদের মধ্যে স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা থাকে; তারা বিক্রয়, শিক্ষকতা, পরামর্শ দান প্রভৃতি কাজে ভালো করে। যারা ব্যক্তিগত ক্ষমতা পছন্দ করে, তারা প্রতিষ্ঠানের জন্য তেমন কল্যাণকর হয় না। তবে যারা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রত্যাশা করে, তারা প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠানে ভালো নেতৃত্ব দিতে পারে।
Read more