কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও তা দূরীকরণের উপায় (৭.১১)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

10

Obstacles & Ways to Remove at Motivating the Employees

কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা (Obstacles to Motivate the Employees):
কর্মীদের কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের কাজের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হলো প্রেষণা। তবে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাকে নিম্নোক্ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়-

  • চাহিদার ভিন্নতা (Variation in needs): কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদা বলে। প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবিশেষে চাহিদায় ভিন্নতা দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানের সীমিত সম্পদের মাধ্যমে সবার চাহিদা পূরণ করা এবং সব কর্মীকে একই উপায়ে প্রেষণা দেওয়া যায় না। অপরদিকে চাহিদা অসীম। এক চাহিদা পূরণ হলে অন্য চাহিদার সৃষ্টি হয়। চাহিদার এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের কারণে সঠিক উপায়ে প্রেষণা দানে বাধা তৈরি হয়।
  • চাহিদার প্রকৃতি নির্ধারণে অসুবিধা (Problems at determining nature of needs): কর্মীরা কী চায় এবং কীভাবে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করে কাজে উৎসাহিত করা যায়, তা নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাহিদার প্রকৃত অবস্থা কেমন, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। এজন্য প্রেষণা প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে।
  • উৎপাদনের উপকরণের অপর্যাপ্ততা (Insufficient factors of production): শুধু প্রেষণা দিলেই উৎপাদন বাড়বে, এ ধারণা সঠিক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মী, উন্নত যন্ত্রপাতি, উৎকৃষ্ট কাঁচামাল প্রভৃতির যথাযথ সরবরাহ না থাকলে, শুধু প্রেষণা দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সফলতা আসে না।
  • আন্তরিকতার অভাব (Lack of cordiality): কর্মীদের প্রতি সহানুভূতি ও আন্তরিকতার অভাব এবং তাদের চাহিদা ও দাবি নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের অযোগ্যতা, উদ্যোগহীনতা প্রভৃতি সুষ্ঠু প্রেষণার কৌশল নির্ধারণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রেষণা অকার্যকর হয়ে যায়।
  • শ্রমিক সংঘের প্রভাব (Influence of trade union): কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী তথা শ্রমিক সংঘের নেতা ও সদস্যরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে অনর্থক সংঘাতে জড়িয়ে যায় বা অসহযোগিতামূলক আচরণ করে। এতে সঠিকভাবে প্রেষণার কৌশল নির্ধারণ এবং প্রয়োগ করা যায় না।
  • ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব (Effect of personal life): কর্মীর ব্যক্তিগত জীবন তথা প্রতিষ্ঠানের বাইরের বিভিন্ন ঘটনার ওপর কর্তৃপক্ষের তেমন কিছুই করার থাকে না। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রেষণা দেওয়া হলেও তা কর্মীকে কাজে উৎসাহিত করে না।
  • স্তরগত পার্থক্য (Hierarchical differences): নিম্ন স্তরের কর্মীর কাছে মৌলিক চাহিদাই গুরুত্বপূর্ণ। আবার উচ্চ স্তরের নির্বাহীর কাছে মৌলিক চাহিদার চেয়ে মান-মর্যাদা বা আত্মপ্রকাশের চাহিদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। তাই কর্মীদের স্তরগত পার্থক্য প্রেষণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি করে।
  • ব্যক্তিক পার্থক্য (Personal differences): ব্যক্তিক স্বাতন্ত্র্যবোধের কারণে মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। এর প্রভাব চাহিদার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। জন্মগতভবে ও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার কারণে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হওয়ায় প্রেষণার কোনো সর্বজনীন কৌশল পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা যায় না। এতে প্রেষণা প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে যায়।
  • দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য (Differences in skill and experience): অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে কর্মীদের চাহিদা নির্ধারণ এবং প্রেষণার কার্যকর কৌশল নির্ধারণে অক্ষমতা দেখা যায়। এতে তারা কর্মীদের অভাব-অভিযোগ সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।
  • নেতিবাচক প্রেষণা (Negative motivation): নেতিবাচক প্রেষণা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর করা বেশ কষ্টকর বিষয়। কর্মীদের ভয়-ভীতির মাধ্যমে প্রেষিত করা অনেক সহজ। তবে এ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কার্যকর হলেও ভবিষ্যতে প্রতিকূল প্রভাব দেখা যায়। এজন্য সব সময় প্রেষণার ইতিবাচক কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করা উচিত।
  • অতএব, কর্মীদের প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত বাধা বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করতে পারলে তাদের কাছ থেকে বেশি কাজ আদায় সম্ভব হবে।'

কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের উপায় (Ways to Remove the Obstacles at Motivating the Employees):

প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দাবি বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ দূরীকরণে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে-

  • প্রেষণার উপযুক্ত কৌশল ব্যবহার (Using proper motivation a technique): আর্থিক কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রত্যাশা ও প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের মধ্যে অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে। অন্যদিকে অনার্থিক ও নেতিবাচক কৌশল প্রয়োগে নির্বাহীদেরকে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের পদমর্যাদা, বিশেষজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা, অবদান প্রভৃতি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হয়।
  • শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়ন (Developing labour-management relationship): শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নত হলে প্রেষণার অনেক বাধাই দূর করা সম্ভব। এ সম্পর্ক অনুকূল হলে প্রেষণা কার্যক্রম সফল হয়ে থাকে। মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিক হলে কর্মীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখবে।
  • কর্মী উন্নয়ন (Developing employees): প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের মেধা ও দক্ষতার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা তাদের সন্তুষ্টি বাড়িয়ে দেয়। কর্মীরা যখন দেখে প্রতিষ্ঠান তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন তারা দ্রুত উৎসাহিত হয়।
  • অনুকূল মানসিকতা সৃষ্টি (Creating favourable mentality): ভিন্ন মানসিকতার ফলে প্রেষণা দান প্রক্রিয়া
    সমানভাবে ফলপ্রসূ হয় না। কারণ, ভিন্নভাবে সব কর্মীর মানসিকতা নির্ধারণ করে প্রেষণা দান প্রক্রিয়া চলমান রাখা অসম্ভব হয়ে যায়। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ব্যবহার করা সম্ভব হলে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে প্রেষণা দিয়ে সহজেই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হয়।
  • নমনীয় মনোভাব সৃষ্টি (Creating flexible attitude): পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো বা মানিয়ে
    নেওয়াকে নমনীয়তা বলে। অনমনীয়তা বা অপরিবর্তনশীলতা প্রেষণা দান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মনোভাব সব সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অনুকূলে হওয়া আবশ্যক।
  • মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা (Establishing values and ethics): কর্মীরা সব সময়ই তাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ব করতে চায়। তারা আশা করে, মালিক ও ব্যবস্থাপনার লোকজন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ও ক্ষেত্রে মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করুক। এটি সম্ভব হলে কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবদান রাখতে চায়। তাই, প্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে তা প্রেষণা দেওয়ার পথকে সহজ করে।
  • প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা (Establishing organizational image): প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কর্মীদের হতাশ করে। এতে তারা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে চায়। পক্ষান্তরে বাজারে প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট সুনাম ও সুখ্যাতি থাকলে কর্মীরা তাদের কাজের মান আরও উন্নত করার চেষ্টা চালায়। কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উন্নত করতে সক্ষম হলে কর্মীরা সহজেই প্রণোদিত হয়ে থাকে।

সুতরাং, প্রেষণা কর্মীদের উৎপাদন বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও বিভিন্ন বাধার কারণে সব সময় তা কার্যকর হয় না।

প্রেষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিবন্ধকতা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা না হলে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা সম্ভব নয়।
পাশাপাশি প্রেষণা কর্মসূচিও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। এজন্য উল্লিখিত সম্ভাব্য প্রতিকারের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...