Barriers to Effective Communication
কার্যকর যোগাযোগের পথে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা বাধা তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়, যা নিম্নরূপ-

ক. সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা (Organizational barriers): কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংগঠন ও সংগঠন
কাঠামোর মধ্যে যেসব বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, সেগুলোর সমষ্টিই হলো সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা। নিচে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতার বর্ণনা দেওয়া হলো-
- নেতিবাচক সাংগঠনিক পরিবেশ (Negative organisational climate): প্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনোভাবে সৃষ্ট নেতিবাচক পরিবেশ প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন পক্ষের প্রতি এরূপ নেতিবাচক মনোভাব কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে।
- সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব (Lack of proper policy): যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট নীতিমালার যথাযথ অনুসরণের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যোগাযোগ পরিবেশ। প্রতিষ্ঠানে নীতিমালার অভাব থাকলে ঐ সংগঠনের কর্মীরা যোগাযোগের সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়। এতে যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতার তৈরি হয়।
- অতিরিক্ত কর্তৃত্ব স্তর (Excess authoritative layers): সাংগঠনিক স্তর বেশি থাকলে সার্থক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তা একটি মারাত্মক বাধা হিসেবে কাজ করে। বেশি স্তরবিশিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোতে কোনো তথ্য শীর্ষ স্তর থেকে নিম্ন স্তরে অথবা নিম্ন স্তর থেকে শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়.।
- বৈষম্য (Discrimination): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের একই পদমর্যাদাভুক্ত কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা বা বৈষম্য হতে দেখা যায়। ফলে কর্মীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়। আর এরূপ বৈষম্য পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
- পদমর্যাদার পার্থক্য (Differences at status): পেশাগত অবস্থান, স্তর বা অবস্থাকে পদমর্যাদা বলে। একই প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি এবং দুর্বল চিত্তের বা সহজ-সরল ধরনের অধীনস্থদের মাঝে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পদমর্যাদার পার্থক্য অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
খ. ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা (Personal barriers): কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংবাদ প্রেরক এবং প্রাপকের ব্যক্তিগত বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে, যা যোগাযোগকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। যোগাযোগের এসব উপাদানকে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা বলে। নিচে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো-
- ব্যক্তিত্বের পার্থক্য (Differences in personality): ব্যক্তিত্ব বলতে কোনো ব্যক্তির মাঝে থাকা স্বতন্ত্র কিছু ধ্যান- ধারণা ও বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। বিভিন্ন ব্যক্তির এরূপ ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণে যোগাযোগে বাধা তৈরি করে।
- প্রত্যক্ষণগত পার্থক্য (Difference in perception): কোনো বিষয়কে নিজের মতো করে দেখা, শোনা, বোঝা বা ব্যাখ্যা করার সামর্থ্যকে প্রত্যক্ষণ বলা হয়। প্রত্যক্ষণগত ভিন্নতার কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়কে একেকজন একেকভাবে বুঝে নেয়। ফলে এ ধরনের পার্থক্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
- অবিশ্বাস ও সন্দেহ (Mistrust and suspection): প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তি বা পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ দেখা দিতে পারে। এতে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে। ফলে যোগাযোগে তাদের অনীহা সৃষ্টি হয়।
- অমনোযোগিতা (Inattention): অনেক ক্ষেত্রে সংবাদের বিষয়বস্তুতে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ার কারণে প্রাপক উক্ত সংবাদ যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। অসুস্থতা, অতিরিক্ত কর্মভারগ্রস্ততা, সংবাদের প্রতি অনাগ্রহ, পারিবারিক কোনো সমস্যা প্রভৃতি প্রাপকের অমনোযোগিতা তৈরির কারণ।
- পূর্ব ধারণার সাধারণ প্রয়োগ (Stereotyping): পূর্ব ধারণার সাধারণ প্রয়োগ বলতে কোনো সাধারণ বিষয়ে জনগোষ্ঠীর আগে থেকে বিদ্যমান ধারণাকে বোঝায়। এর সাধারণ প্রয়োগ যোগাযোগকে ব্যাহত করে।
গ. ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা (Linguistic barriers): যোগাযোগের প্রধান বাহন হলো ভাষা। যোগাযোগের ক্ষেত্রে
ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় ভাষাগত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এতে যথাযথভাবে তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। যোগাযোগের ভাষা সম্পর্কিত এসব সমস্যাজনিত উপাদানকে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা বলে। নিচে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার বর্ণনা দেওয়া হলো-
- স্থানীয় ভাষার ব্যবহার (Use of local language): প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা অনেক সময় বিভিন্ন এলাকার হয়ে
থাকে। যেমন: সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল প্রভৃতি এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় ভাষা প্রচলিত, যা অন্য এলাকার লোকদের জন্য দুর্বোধ্য। এসব আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কার্যকর যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। - মিশ্র ভাষার ব্যবহার (Use of mixed language): বিশ্বে অসংখ্য ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একই সাথে বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। যেমন: অনেক সময় কেউ বাংলায় কথা বলতে গিয়ে কথার মাঝে ইংরেজি ও হিন্দি শব্দ ব্যবহার করেন। এতে যোগাযোগের কার্যকারিতা কমে যায়।
- পারিভাষিক শব্দের ব্যবহার (Use of technical word): বিভিন্ন বিষয়ে বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়, যা শুধু উক্ত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিভাষাগুলো ব্যবহার করলে অনেকের কাছে তা দুর্বোধ্য হয়। যেমন: কারেন্ট (বিদ্যুৎ), অপারেশন (অস্ত্রোপচার) প্রভৃতি।
- অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার (Use of uncommon words): কিছু কিছু অপ্রচলিত শব্দ আছে যা সঠিক কিন্তু সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। এসব শব্দের ব্যবহার অনেক সময় যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। যেমন: বায়ুসখা (আগুন), শবদাহ (মৃতদেহ পোড়ানো), বনেদি (ব্যবসায়ী) প্রভৃতি।
- সাংকেতিক ভাষার ব্যবহার (Use of cant): কোনো লিখিত বা মৌখিক ভাষার পরিবর্তে ইশারা-ইঙ্গিতের সাহায্যে তথ্য বিনিময়কে সাংকেতিক ভাষা বলে। অনেক ক্ষেত্রে সহজ-সরল বা অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিসম্পন্ন কর্মী সাংকেতিক ভাষা বঝতে সক্ষম হন না। এতে প্রদত্ত তথ্য প্রাপক পর্যন্ত সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
ঘ. অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা (Other Barriers): কার্যকর যোগাযোগে তথ্য বিনিময়ে উল্লিখিত উপাদানসমূহ ছাড়া আরও কিছু বিষয় বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা নিচে আলোচনা করা হলো-
- তথ্যভারাক্রান্ত অবস্থা (Information overloaded condition): তথ্য ভারাক্রান্ত অবস্থা বলতে তথ্য জমতে
জমতে স্তূপ সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়, যা যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে একই সময়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া হলে সে ব্যক্তি তথ্যভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, যা যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। - ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশ (Faulty expression): প্রেরক কর্তৃক সংবাদ বা বার্তার ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশও যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করে। অস্পষ্ট ও জটিল বাক্যের ব্যবহার, তথ্যের অসংলগ্ন প্রকাশ, যোগাযোগ ধারণার ভুল সংকলন প্রভৃতি কারণে যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় তথ্যের ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশ হয়ে থাকে।
- লালফিতার দৌরাত্ম্য (Red tapism): তথ্য বা সংবাদ সনাতন রীতি অনুযায়ী লালফিতা দ্বারা অফিসে নথিবন্দি করে রাখাকে লালফিতার দৌরাত্ম্য বলে। আবার, সরকারি কর্মচারী কর্তৃক কাজে অবহেলা ও প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সাংগঠনিক স্তরের কারণে তথ্য যথাসময়ে বার্তা গ্রাহকের কাছে পৌছায় না। এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নামে পরিচিত। এর ফলে যেগাযোগ কাজ ধীরগতিতে তৈরি হয়।
- আংশিক যোগাযোগ (Partial communication): প্রেরক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য বা সংবাদ সম্পূর্ণ প্রেরণ না করে আংশিক প্রেরণ করলে তা বোধগম্য না-ও হতে পারে। ফলে এটি কার্যকর যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করে।
উপসংহারে বলা যায়, কার্যকর যোগাযোগে তথ্য বা সংবাদ প্রবাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধে ভালোভাবে ধারণা নিয়ে তা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারলে যোগাযোগকে আরও ফলপ্রসূ করা সম্ভব হবে।
Read more