নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ (১০.৫)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

11

Steps of Controlling

ব্যবস্থাপনা কার্যাবলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশেষ কাজ হলো নিয়ন্ত্রণ। ব্যবস্থাপনার সব স্তরে, সব কাজে ধারাবাহিক ও অবিরামভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার প্রথমে পরিকল্পিত টার্গেট বা আদর্শমান প্রতিষ্ঠা করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করা হয়। এরপর আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা করে পার্থক্য বা বিচ্যুতি আছে কি না, যাচাই করা হয়। কোনো প্রকার ঘাটতি বা বিচ্যুতি না থাকলে পরবর্তী সময়ে একই পরিকল্পনা বা কিছুটা বড় পরিসরের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। কিন্তু পার্থক্য বা বিচ্যুতি বের হলে বিচ্যুতির কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিচে আদর্শ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার ধাপ, উপাদান বা পদক্ষেপগুলো চিত্রের সাহায্যে দেখানো হলো-

আদর্শমান প্রতিষ্ঠা (Establishing standard): ব্যবস্থাপনা কাজের শুরুতে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আদর্শমান হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা কাঙ্ক্ষিত কার্যফল প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো আদর্শমান নির্ধারণ বা মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা। আদর্শমান এমন একটি মানদণ্ড, যার আলোকে কাজের প্রকৃত ফলাফল পরিমাপ করা হয়। এটি সংখ্যা, ওজন, আয়, ব্যয়, সময়, ঘণ্টা, একক, পরিমাণ, গ্রেড বা আর্থিক মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে। আদর্শমানই নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি। এটি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা সম্ভব হয় না। তবে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী আদর্শমানের পার্থক্য হয়। যেমন:

  • উৎপাদনের ক্ষেত্রে আদর্শমান সংখ্যা, গুণ ও সময়ভিত্তিক হতে পারে।
  • ব্যয়ের ক্ষেত্রে আদর্শমান প্রত্যক্ষ ব্যয় (Direct cost) ও পরোক্ষ ব্যয় (Indirect cost) হতে পারে।
  • বিনিয়োগের আদর্শমান মোট বিনিয়োগ, সম্পদের পরিমাণ ও ব্যবহার প্রভৃতি হতে পারে।
  • প্রতিবছর ২০% হারে উৎপাদন বাড়ছে। তাই ২০% উৎপাদন বাড়ানোর টার্গেট আদর্শমান হতে পারে।
  • প্রতিষ্ঠানে যে বাজেট তৈরি করা হয় তা-ও আয়-ব্যয়ের আদর্শমান হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • ধরা যাক, একজন শ্রমিককে সপ্তাহে ৪০০ একক পণ্য উৎপাদন করতে হবে। তাহলে এটিও একটি আদর্শমান।

  • প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ (Measuring actual performance): এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময় শেষে বাস্তবে কতটুকু কাজ সম্পাদন হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করে ফলাফল বের করা হয়। বিভিন্নভাবে সম্পাদিত কাজ পরিমাপ করা যায়। যেমন: সিই সম্পাদিত কাজের মৌখিক ও লিখিত বিবরণ পর্যালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ করা, তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রযুক্তি ও সার্কিট ক্যামেরার ব্যবহার।
আদর্শমানপ্রকৃত কার্যফল পরিমাপ
একজন শ্রমিককে সপ্তাহে ৪০০ একক পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এটি একটি আদর্শমান।উল্লিখিত শ্রমিক সপ্তাহে ৩৮০ একক পণ্য উৎপাদন করেছে। এটি প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ।
  • আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা (Comparing actual performance with the standard): প্রকৃত বা সম্পাদিত কাজ পরিমাপের পর এর সাথে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা বা আদর্শমানের তুলনা করা হয়। এ তুলনার মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পরিমাপ এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল বা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বিচ্যুতি থাকলে তার পরিমাণ কতটুকু, তা চিহ্নিত করা হয়। যেমন: একটি বিভাগের সাপ্তাহিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বা আদর্শ হলো ৪০০ একক। কিন্তু সপ্তাহ শেষে প্রকৃত কার্যফল পরিমাপ করে দেখা যায়, উৎপাদন হয়েছে ৩৮০ একক। অতএব, বিচ্যুতি হয়েছে (৪০০-৩৮০) একক = ২০ একক। এখানে, বিচ্যুতি = আদর্শমান প্রকৃত কার্যফল। এক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি না থাকলে বা ফলাফল সন্তোষজনক হলে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয় না। তবে অবস্থার প্রেক্ষিতে বা প্রকৃত কার্যফল বেশি হলে। আদর্শমানকে আরও বাড়িয়ে পুনঃনির্ধারণ করা যেতে পারে।
  • বিচ্যুতির কারণ শনাক্তকরণ (Identifying the cause of deviation): নির্ধারিত আদর্শমানের সাথে সম্পাদিত প্রকৃত কার্যফলের সাথে তুলনা করে যে পার্থক্য বের হয়, তাকে বিচ্যুতি বলে। নিয়ন্ত্রণের এ পর্যায়ে আদর্শমানের সাথে প্রকৃত কার্যফলের তুলনা করে বিচ্যুতি পাওয়া গেলে তার কারণ শনাক্ত করা হয়। এ বিচ্যুতি অনেক কারণে হতে পারে। যেমন: ভুল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, কর্মচারীদের অনুপস্থিতি ও অদক্ষতা, দুর্বল তদারকি, নিম্নমানের কাঁচামাল, প্রশিক্ষণের অভাব, অনুন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, অনুপযুক্ত কাজের পরিবেশ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি।
  • সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ (Taking corrective action): নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পর্যায়ে চিহ্নিত বিচ্যুতি বা ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেসব কারণে ভুল-ত্রুটি বা বিচ্যুতি হয়েছে সেসব কারণ দূর করার জন্য ব্যবস্থা নিতে হয়। প্রয়োজনে পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজাতে হয়। উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনও হতে পারে। পাশাপাশি সংগঠিতকরণ, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, সমন্বয়সাধন, প্রেষণা এমনকি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন হওয়া আবশ্যক কেন?

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য হলো নিরবচ্ছিন্নতা (Continuity)। পরিবর্তনশীল পরিবেশ, পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কোনো পরিবর্তন, উদ্দেশ্যের পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিরামহীন (Continuous) না হলে আদর্শমানের (Standard) সাথে প্রকৃত কার্যফলের (Performance) ব্যাপক বিচ্যুতি (Deviation) দেখা দিতে পারে। ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন হওয়া আবশ্যক।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...