নেতৃত্ব (ষষ্ঠ অধ্যায়)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

2k
Please, contribute by adding content to নেতৃত্ব.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সহযোগিতা ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি
পরিকল্পনার উৎকর্ষসাধন
কর্তৃত্বপরায়ণতা হ্রাস পায়
সবকটি

Concept of Leadership

তাশফিন আহমেদ একজন উৎপাদন ব্যবস্থাপক। তার অধীনে ৫ জন সহকারী ব্যবস্থাপক, ১৫ জন সুপারভাইজার ও ৩০০ জন কর্মী নিয়োজিত আছেন। তিনি তাদের কাজের সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেন। সময়মতো প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সবার সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন। সবার কাজকর্ম তদারকিও করেন। উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে তিনি সবাইকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সব সময় আন্তরিক রাখেন। ফলে, প্রতিষ্ঠানটি উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় তাশফিন আহমেদ তার প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের ভূমিকা পালন করছেন, তা-ই নেতৃত্ব। অর্থাৎ, নেতৃত্ব হলো দলীয় সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মপ্রচেষ্টাকে কৌশলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

নেতৃত্ব বলতে মূলত নেতার বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়। এর মাধ্যমে তিনি কোনো দল বা গোষ্ঠীর আচরণকে প্রভাবিত করতে পারেন। ইংরেজি 'Leadership' শব্দটির আভিধানিক সদস্য বা অনুসারীদের প্রভাবিত অর্থ হচ্ছে নেতৃত্ব। ইংরেজি 'Lead' থেকে 'Leadership' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। 'Lead'করার কৌশল শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পথ দেখানো (To guide), পরিচালনা করা (To conduct), প্ররোচিত করা (To persuade), প্রভাবিত করা (To influence) প্রভৃতি।

দল বা গোষ্ঠীর আচরণ ও কাজকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকে নেতৃত্ব বলে। এ দায়িত্ব পালনকারীই হলেন নেতা। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক তার অধীনস্থ কর্মীদের কাজকে লক্ষ্য অর্জনের দিকে পরিচালনা করেন। এজন্য ব্যবস্থাপককেও ক্ষেত্রবিশেষে নেতা বলা যায়। এভাবে, যিনি পরিবার চালান তাকে পরিবারের নেতা বলা যায়।
সুতরাং, নেতৃত্ব বলতে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সদস্য বা কর্মীদের পরিচালনা করার কৌশলকে বোঝায়। এর মাধ্যমে সদস্যরা তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত হন। তাছাড়া এর দ্বারা সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা হয়।

  • যুক্তরাষ্ট্রের ভান্ডারবাল্ট বিশ্ববিদ্যালয়-এর ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক রিচার্ড এল, ডাফ্ট (Rechard L. Daft) বলেন, 'Leadership is the ability to influence people toward the attainment of organizational goal.' অর্থাৎ 'প্রতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে লোকজনকে প্রভাবিত করার সামর্থ্যই হলো নেতৃত্ব।'
  • investopedia.com অনুযায়ী, 'Leadership is the ability of a company's management to set and achieve challenging goals, take swift and decisive action, outperform the competition and inspire others to perform well.' অর্থাৎ, 'প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা ও অর্জন, দ্রুত ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া, প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যাওয়া এবং অন্যদের সুন্দরভাবে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতাকে নেতৃত্ব বলে।'
  • searchio.techtarget.com অনুযায়ী, 'Leadership is the ability of an individual or a group of individuals to influence and guide followers or other members of an organization.' অর্থাৎ, 'নেতৃত্ব বলতে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ দ্বারা তাদের অনুসারী বা প্রতিষ্ঠানের অন্য সদস্যদের প্রভাবিত করা ও নির্দেশনাদানের যোগ্যতাকে বোঝায়।'

অতএব, দলের কর্মী বা সদস্যদের প্রভাবিত করে তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য কাজে লাগানোর কৌশলকে নেতৃত্ব বলে।

নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Importance of Leadership

সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে অধীনস্থ বা অনুসারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত হয়। ব্যবস্থাপক তথা নেতাকে ঘিরেই প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হয়। সঠিক নেতৃত্বের ওপরই নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য।
এছাড়াও নেতৃত্ব নিম্নোক্ত কারণে গুরুত্বপূর্ণ-

  • লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা (Helping to achieve the goal): নেতৃত্ব একটি কৌশল। এর মাধ্যমে দলীয় সদস্যরা তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত হয়। তাই, প্রতিষ্ঠানে যোগ্য নেতৃত্বের ফলে জনশক্তির সব কর্মপ্রচেষ্টা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হতে পারে। এতে লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়।
  • দলীয় প্রচেষ্টা জোরদারকরণ (Enhancing group effort): ব্যক্তি ও দলীয় প্রচেষ্টাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে
    পরিচালনা করাই নেতার মূল কাজ। এটি নির্ভর করে নেতার গুণ ও কাজের দক্ষতার ওপর। নেতৃত্বের মান দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ও দলবন্ধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। নেতার সঠিক নেতৃত্ব কৌশলের মাধ্যমেই সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই, দলব্য প্রচেষ্টা জোরদারকরণে দক্ষ নেতৃত্ব অপরিহার্য।
  • সহযোগিতা বৃদ্ধি (Increasing cooperation): কর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। কার্যকর নেতৃত্ব সংগঠনের অভ্যন্তরে সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। একে ঘিরেই জনশক্তি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় কাজ করে থাকে।
  • ঐক্য সৃষ্টি (Creating unity): লক্ষ্য অর্জনে সবাই একমত হওয়াকে ঐক্য বলে। ব্যবস্থাপনার অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানের জনশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে পরিচালনা করা। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া কখনও প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নেতৃত্ব থাকলে নেতাকে ঘিরে কর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করে থাকে
  • সুষ্ঠু সমন্বয় (Proper coordination): একজন যোগ্য নেতা তার কর্মীদের প্রকৃতি, যোগ্যতা, চাহিদা প্রভৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকেন। ফলে কীভাবে, কাকে, কোন দায়িত্ব কতটুকু দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নেতা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেন। তাই, নেতৃত্বের কৌশল ব্যবস্থাপনাকে যথাযথভাবে কর্তৃত্ব অর্পণে সহায়তা করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের কাজে সুষ্ঠু সমন্বয় সহজ হয়।
  • দক্ষতা বৃদ্ধি (Increasing efficiency): সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয় না করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করার সামর্থ্যকে দক্ষতা বলে। যোগ্য নেতৃত্ব প্রাতিষ্ঠানিক সব কাজের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। এটি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে জনশক্তির সব কর্মপ্রচেষ্টাকে ধাবিত করে বলে কাজে গতি বাড়ে।
  • উৎসাহ সৃষ্টি (Creating inspiration): ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান কাজ হলো কর্মীদের দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে কাজ করিয়ে নেওয়া। যোগ্য নেতৃত্বের ফলে অধীনস্থ কর্মীরা কাজ করতে সব সময়ই উৎসাহবোধ করে। ফলে, তাদের মনোবলও বাড়ে। তাছাড়া, তাদের উচ্চ মনোবল উত্তম কাজের পরিবেশ সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • পরিবর্তনে সহায়তা (Help to change): পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে মিল রেখে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া নেতার অন্যতম দায়িত্ব। এজন্য তাকে অনেক সময় পরিকল্পনা ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হয়। তবে যেকোনো পরিবর্তন অধীনস্থরা সহজে মেনে নিতে পারে না। যোগ্য নেতৃত্ব সেক্ষেত্রে কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সহজেই পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই বলা যায়, ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নেতৃত্ব। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সব সময় লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত রাখা যায়। তাই, প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য কার্যকর নেতৃত্ব একান্ত জরুরি।

নেতৃত্ব -মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Types or Pattern of Leadership

নেতৃত্বের ধরন বলতে নেতৃত্ব দেওয়ার বিভিন্ন উপায় বা পদ্ধতিকে বোঝায়। নেতার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, অধীনস্থদের যোগ্যতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও কাজের কৌশলে পার্থক্য থাকায় নেতৃত্বের ধরনেও পার্থক্য দেখা যায়। এগুলোর ভিত্তিতে নেতৃত্বকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়-

ক. ক্ষমতাভিত্তিক নেতৃত্ব (Power based leadership): নেতা তার অনুসারী বা সদস্যদের ওপর কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা
প্রয়োগের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তিনি উক্ত কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা কীভাবে বা কতটুকু প্রয়োগ করবেন, তার ওপর ভিত্তি করে নেতৃত্বকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

  • স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব (Autocratic leadership): যে নেতৃত্বে নেতা সব ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত করে
    এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে নেতা যা ভালো মনে করেন, তা-ই করে থাকেন। তিনি কাজের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না। এক্ষেত্রে, নেতা কর্মীদের ভয়-ভীতি দেখানো ও শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে কাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। কর্মীরা এরূপ নেতৃত্বকে সন্তুষ্টচিত্তে নিতে পারেন না। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এরূপ নেতৃত্ব সাময়িকভাবে কার্যকর প্রতীয়মান হলেও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের নেতৃত্বকে নিরুৎসাহিত করা হয়। Genghis Khan, Napoleon Bonaparte, Muammar Gaddafi, Idi Amin, Bashar al-Assad" প্রমুখ ব্যক্তি এরূপ নেতৃত্ব দানের জন্য ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আছেন।
  • পিতৃসুলভ নেতৃত্ব (Paternalistic leadership): যে নেতৃত্বে নেতা কর্মীদের ওপর বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হলেও
    পিতার মতো সদয় ও কল্যাণকামী হয়ে থাকেন, তাকে পিতৃসুলভ নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে নেতা কর্মীদের মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে চেষ্টা করেন। স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের উন্নত ও ইতিবাচক সংস্করণই হলো পিতৃসুলভ নেতৃত্ব। এরূপ নেতৃত্বেও কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এক্ষেত্রে নেতা তার কাজের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না। শ্রমিক আন্দোলন নিরসনে এরূপ নেতৃত্ব বেশ ফলদায়ক। Henry Ford, Fidel Castro, Nelson Mandela প্রমুখ ব্যক্তি এরূপ নেতৃত্বদানের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন।
  • গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব (Democratic leadership): যে নেতৃত্বে নেতা সব কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত না রেখে সদস্য বা কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে কাজ পরিচালনা করেন, তাকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পরামর্শমূলক নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি মূলত স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিপরীত। এ নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করা হয়। তাই এরূপ নেতৃত্বের প্রতি কর্মীরা সন্তুষ্ট থাকেন এবং মনোবল বাড়ে। এতে কর্মীদের মনে স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় থাকে। অধীনস্থ কর্মীরা অধিক দক্ষ ও যোগ্য হলে এরূপ নেতৃত্ব বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। আধুনিক বিশ্বে এরূপ নেতৃত্ব অনেক তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। George Washington, Abraham Lincon, Jimmy Carter, Larry Page (Google), Muhtar Kent (Coca-Cola) প্রমুখ ব্যক্তি এরূপ নেতৃত্বদানের মাধ্যমে সফলতা বয়ে এনেছেন।

https// future of working.com/11-famous-autocratic-leaders

Online.stuedu/democratic-participative-leadership

  • মুক্ত বা লাগামহীন নেতৃত্ব (Free-rein or laissez faire leadership): লাগামহীন নেতৃত্বে নেতা কর্মীদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিজে কর্মবিমুখ থাকেন। তিনি কর্মীদের প্রতি সুনির্দিষ্টভাবে আদেশ-নির্দেশ দেন না বা কাজে হস্তক্ষেপ করেন না। এক্ষেত্রে কর্মীরা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করে থাকেন। এরূপ নেতৃত্বে নেতা শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করে। দিয়ে নিজে দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন। উক্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা থাকে না। নেতার অবহেলা ও কর্মবিমুখতার কারণে এরূপ নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রায় সব সময়ই বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। এছাড়া কর্মীরা অনেক সময় স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। কর্মীরা কী কাজ করবেন, কীভাবে করবেন সে সিদ্ধান্ত নেতা নেন না, কর্মীরাই ঠিক করেন। নেতা তার অনুসারীদের দ্বারা নেওয়া সিদ্ধান্তের অনুমোদন দেন মাত্র। Herbert Hoover, Ronald Regan, Steve Jobs, Queen Victoria* প্রমুখ ব্যক্তি এ ধরনের নেতৃত্বের উদাহরণ রেখে গেছেন।
    নিচের চিত্রের মাধ্যমে নেতৃত্বে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু উপস্থাপন করা হলো-

খ. আনুষ্ঠানিকতাভিত্তিক নেতৃত্ব (Formality based leadership): একটি প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোতে নেতার অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকতার বিচারে নেতৃত্বকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়

  • আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Formal leadership): প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোগত পদমর্যাদা থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যে নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তাকে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসারে এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার অধীনস্থ কর্মীর নেতা হিসেবে গণ্য হন। সাংগঠনিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বলেই এরূপ নেতা অধীনস্থদের পরিচালনা করেন এবং অধীনস্থরা ঊর্ধ্বতনকে মানতে বাধ্য থাকেন।.কোম্পানির চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, ক্লাবের সেক্রেটারি, দলের প্রেসিডেন্ট, দেশের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনায়ক প্রমুখ ব্যক্তি তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যে নেতৃত্ব প্রদান করেন, তা আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে বিবেচিত হয়।
  • অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Informal leadership): সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে যে নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়, তাকে অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে। বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে অনেক লোক একত্রে কাজ করে। এরূপ অনেক ক্ষেত্রে গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জন্মস্থান, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ইচ্ছা- অনিচ্ছা প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। এরূপ নেতৃত্বের কোনো বিধিবদ্ধ কর্তৃত্ব না থাকলেও কর্মীদের ওপর নেতাদের যথেষ্ট প্রভাব দেখা যায়।
  • অনেক ক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানের একজন সৎ, ধার্মিক, বয়োজ্যেষ্ঠ, জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছ থেকে যেকোনো ঊর্ধ্বতন, অধস্তন বা সহকর্মী পরামর্শ নিয়ে থাকেন। আবার আত্মীয়তা বা পারিবারিক সম্পর্কের কারণেও কারও কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া বা আলাপ-আলোচনা করা হয়। এগুলো অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বের উদাহরণ।

গ. প্রেষণাভিত্তিক নেতৃত্ব (Motivation based leadership): নেতা নেতৃত্ব দেওয়ার সময় সদস্যদের মাঝে
বিভিন্নভাবে উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি করে থাকেন। অধীনস্থরা এ উৎসাহের কারণে নেতার নেতৃত্ব অনুসরণে নিয়োজিত হন। এ উৎসাহ সৃষ্টির পদ্ধতির ভিত্তিতে নেতৃত্বকে নিম্নোক্তভাবে ভাগ করা যায়-

  • ইতিবাচক নেতৃত্ব (Positive leadership): নেতা যখন কর্মীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে নেতৃত্ব দেন, তাকে ইতিবাচক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে কর্মীদের কাজের প্রশংসা করা হয় এবং স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের আর্থিক বা অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। এরূপ নেতৃত্ব অধীনস্থ কর্মীদের মাঝে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • নেতিবাচক নেতৃত্ব (Negative leadership): এ ধরনের নেতৃত্ব ইতিবাচক নেতৃত্বের বিপরীত হয়ে থাকে। এতে নেতা তার অধীনস্থ কর্মীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে অথবা শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে জোর করে কাজ করিয়ে থাকেন। এটি সাময়িকভাবে কার্যকর বলে মনে হলেও এর ফলে অনেক সময় কর্মীদের মনোবল ও কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এর মাধ্যমে শ্রম ঘূর্ণায়মানতাও বাড়ে।

ঘ. দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক নেতৃত্ব (Outlook based leadership): নেতা তার নেতৃত্ব দেওয়ার সময় কোন বিষয়কে প্রাধান্য বা গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার ভিত্তিতে নেতৃত্বকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়-

  • কর্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Function oriented leadership): যে নেতৃত্বে নেতা কর্মীর চেয়ে কাজকে বেশি প্রাধান্য
    দেন, তাকে কর্মকেন্দ্রিক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে নেতা মনে করেন, কাজ সম্পাদনই মূল বিষয়। এজন্য নেতা সব সময় কর্মীদের কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন এবং সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজ আদায়কেই সাফল্য মনে করেন। অর্থাৎ, কর্মীদের থেকে বেশি কাজ আদায়কেই নেতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
  • কর্মীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Employee oriented leadership): যে নেতৃত্বে নেতা কাজের পাশাপাশি কর্মীদের মানসিক দিকটি বিবেচনা করেন, তাকে কর্মীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব বলে। এ নেতৃত্বে নেতা সহানুভূতির সাথে কর্মীদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন, এক্ষেত্রে কর্মীদেরকে সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ, এরূপ নেতৃত্বে কর্মীর কল্যাণের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উপসংহারে বলা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উল্লিখিত বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব দেখা যায়। একজন সফল নেতা পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন এবং তার প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী নেতৃত্বের ধরন অনুসরণ করে থাকেন

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Autocratic Leadership

জনাব আমিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তিনি সব সময় কর্মীদের ওপর কাজ চাপিয়ে দেন। তিনি কর্মীদের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেন না। ফলে কর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়।
উক্ত ঘটনায় জনাব আমিন স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। যেখানে কর্মী বা অধীনস্থদের মতামত না নিয়ে নেতা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলেও সদস্যদের মনোবল কমে যায়। এতে একমুখী যোগাযোগ করা হয়। এটি কর্মীদের কাছে সাধারণত গ্রহণযোগ্য হয় না। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া এর ব্যবহার খুব বেশি কার্যকর হয় না। স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • নেতা সব ক্ষমতা নিজের কাছে কুক্ষিগত রাখেন এবং সব সিদ্ধান্ত একাই নেন;
  • নেতা কর্মীদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য পাওয়ার আশা করেন;
  • নেতা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করেন না;

এরূপ নেতৃত্বে কর্মীদের ওপর চাপ ও ভয়-ভীতি দেখানোর মাধ্যমে কাজ আদায়ের চেষ্টা করা হয় প্রভৃতি।

অতএব, যে নেতৃত্বে নেতা সব কর্তৃত্ব নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত রাখেন এবং সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Democratic Leadership

জনাব আজিজ একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বিভাগের এজিএম। তিনি সব সময় বিক্রি বাড়াতে চান। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের বিক্রি ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেন। সে অনুযায়ী তিনি তাদের নির্দেশনা দেন। উক্ত ঘটনায় জনাব আজিজ গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন।

সিদ্ধান্ত নেওয়ায় যেখানে কর্মীদের মতামত নেওয়া হয়, তা হলো গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব। এক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যয় হলেও কর্মীদের মনোবল বাড়ে। এতে দ্বিমুখী যোগাযোগ চালু থাকে। এটি কর্মীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। এজন্য গণতান্ত্রিক নেতৃত্বই উত্তম। আধুনিক যুগে এর ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা হলো-

  • নেতা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অধীনস্থ কর্মীদের মতামতকে যথেষ্ট মূল্য দিয়ে থাকেন;
  • নেতা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অধীনস্থ কর্মীদের সাথে পরামর্শ করেন;
  • নেতা সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব কুক্ষিগত না রেখে কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব অধীনস্থ কর্মীদের দেন;
  • কর্মীদেরকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে কাজ আদায় করেন না;
  • গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে কর্মীরা নিজেদের যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে সমর্থ হন;
  • এরূপ নেতৃত্বে অনুসারী/অধীনস্থরা অভাব-অভিযোগ এবং চাওয়া-পাওয়ার যথাযথ মূল্য পেয়ে থাকেন প্রভৃতি।
    নিচে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে যোগাযোগের ধরন চিত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হলো-

অতএব, যে নেতৃত্বে নেতা সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন ও কাজ পরিচালনা করেন, তাকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে।।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Differences between Autocratic and Democratic Leadership

যে নেতৃত্বে নেতা সব ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত রাখেন এবং নিজে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। অন্যদিকে, যে নেতৃত্বে নেতা সব কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত না রেখে অধীনস্থদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে কাজ পরিচালনা করেন, তাকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে।
নিচে স্বৈরতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো-

পার্থক্যের বিষয়স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বস্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব
১. প্রকৃতিনেতা সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিজের কাছে রাখেন।নেতা ক্ষমতা, কর্তৃত্ব হস্তান্তর করেন। কিন্তু চূড়ান্ত দায়-দায়িত্ব তার কাছে রাখেন।
২. দৃষ্টিভঙ্গিএরূপ নেতৃত্ব Douglas McGregor-এর Theory X-এর অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।Y-এর অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়। এক্ষেত্রে Douglas McGregor-এর Theory
৩. উপযোগিতাআধুনিক ব্যবস্থাপনায় স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব উপযুক্ত মনে করা হয় না।আধুনিক ব্যবস্থাপনায় গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. প্রেষণাএতে প্রেষণার উপাদান হচ্ছে ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তি প্রদান।এতে সামাজিক ও আত্মমর্যাদার চাহিদা পূরণ করা হয় বলে কর্মীরা অনুপ্রাণিত হন।
৫. কর্মীদের মনোবলপ্রভাব ফেলে। এরূপ নেতৃত্ব কর্মীদের মনোবলের ওপর বিরূপএক্ষেত্রে কর্মীদের মনোবল ও কর্মস্পৃহা বেড়ে যায়।
৬. সিদ্ধান্ত গ্রহণএক্ষেত্রে নেতা অধীনস্থদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে নেতা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অধীনস্থদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন।
৭. যোগাযোগএতে নিম্নগামী যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান।এতে দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান।
৮. মূল্যায়ননেতা তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে কর্মীদের প্রশংসা বা তিরস্কার করেন।নেতা বস্তুনিষ্ঠভাবে কর্মীদের প্রশংসা বা তিরস্কার করেন।
৯. সৃজনীশক্তির বিকাশএরূপ নেতৃত্বে সৃজনীশক্তি বিকাশের সুযোগ থাকে না।গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে সৃজনীশক্তি বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয়।
১০. তত্ত্বাবধানএরূপ নেতৃত্বে তত্ত্বাবধানের চেয়ে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়।এক্ষেত্রে আদেশ ও পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মীদের দ্বারা কাজ আদায় করা হয়।
১১. ভীতি প্রদর্শনএরূপ নেতৃত্বে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অধীনস্থদের কাছে কর্তৃত্ব হস্তান্তর করা হয়।গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে কর্মীরা কোনো কাজে ভয় পান না। তারা কাজকে নিজের মনে করেন।
১২. কর্তৃত্ব অর্পণস্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বে নেতা কর্তৃত্ব হস্তান্তর করতে চান না।এরূপ নেতৃত্বে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অধীনস্থদের কাছে কর্তৃত্ব হস্তান্তর করা হয়।

অতএব বলা যায়, স্বৈরতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে পরস্পর বিপরীতমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Paternalistic Leadership

জনাব শাহীন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মালিক। তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কর্মীদের কঠোর শাসনের মধ্যে রাখেন। তবে কাজ আদায় শেষে তিনি কর্মীদের স্নেহ-ভালোবাসা দেন। উৎপাদন বিভাগের একজন শ্রমিক আহত হলে তিনি চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন। তার কর্মকাণ্ডে কর্মীরা তার ওপর সন্তুষ্ট। উল্লিখিত ঘটনায় জনাব শাহীন পিতৃসুলভ নেতৃত্ব প্রদর্শন করছেন।

পিতৃসুলভ নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেতার হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে এবং তিনি কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন না। তবে এক্ষেত্রে নেতা তার কর্মীদের প্রতি যথেষ্ট সদয় আচরণ করেন এবং তাদের অভাব অভিযোগ বিবেচনা। করেন। এক্ষেত্রে কর্মীরা বেশ বাধ্যগত থাকেন ও কঠোর পরিশ্রমী হন। তাই এরূপ নেতৃত্ব বেশ কার্যকর হয়ে থাকে। জাপানে পিতৃসুলভ নেতৃত্ব সফলতার সাথে ব্যবহার হয়ে আসছে।

  • en.wikipedia.org অনুযায়ী, 'The way a paternalistic leader works is by acting as a father figure by taking care of their subordinates as a parent would.' অর্থাৎ, 'পিতৃসুলভ নেতা বাবার মতো আচরণের মাধ্যমে অধীনস্থদের তদারকির ক্ষেত্রে একজন পিতা চরিত্রে অভিনয় করে কাজ করে থাকেন।'

চিত্রের মাধ্যমে এরূপ নেতৃত্বে যোগাযোগের ধরন দেখানো হলো-

অতএব, যে নেতৃত্বে নেতা সদস্যদের ওপর কাজের দায়িত্ব দিয়ে নিজে কর্মবিমুখ থাকেন, তাদের আদেশ-নির্দেশ দেন না বা কাজে হস্তক্ষেপ করেন না এবং কর্মীরা ইচ্ছামতো কাজ করেন, তাকে লাগামহীন/অবাধ/ মুক্ত নেতৃত্ব বলে।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Laissez-fair or Free-rein Leadership

দেশের বিভিন্ন স্থানে জনাব ফয়সালের অনেকগুলো বিক্রয়কেন্দ্র আছে। তিনি বছরের শুরুতে বিক্রির টার্গেট নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু টার্গেট কীভাবে অর্জিত হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেন না, বরং তা কর্মীদের ওপর ছেড়ে দেন। তাছাড়া সারা বছর তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন।

উক্ত ঘটনায় জনাব ফয়সাল লাগামহীন বা মুক্ত নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন।
লাগামহীন নেতৃত্বে নেতা সদস্যদের হাতে অধিকাংশ কর্তৃত্ব দিয়ে থাকেন এবং তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এখানে কার্যত নেতা নিজেকে কর্মী ও কর্ম থেকে দূরে রাখেন। এজন্য এরূপ নেতৃত্ব সাধারণত কার্যকর হয় না। যেখানে কর্মীরা যথেষ্ট দক্ষ-অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল, সেখানে এ ধরনের নেতৃত্ব বেশ কার্যকর হয়ে থাকে। ১৯৩৯ সালে মনোবিজ্ঞানী লেউইন (Lewin), লিপ্পিট (Lippitt) ও হোয়াইট (White) লাগামহীন নেতৃত্বের ধারণা প্রবর্তন করেন।

  • verywell.com অনুযায়ী 'Laissez-faire leadership is a type of leadership style in which leaders are hands-off and allow group members to make the decisions.' অর্থাৎ 'অবাধ বা লাগামহীন নেতৃত্ব হলো এমন এক নেতৃত্ব ব্যবস্থা যাতে নেতাদের হাত-গুটানো থাকে এবং দলের সদস্যদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।'

নিচে চিত্রের মাধ্যমে এরূপ নেতৃত্বে যোগাযোগের ধরন দেখানো হলো-

অতএব, যে নেতৃত্বে নেতা সদস্যদের ওপর কাজের দায়িত্ব দিয়ে নিজে কর্মবিমুখ থাকেন, তাদের আদেশ-নির্দেশ দেন না বা কাজে হস্তক্ষেপ করেন না এবং কর্মীরা ইচ্ছামতো কাজ করেন, তাকে লাগামহীন/অবাধ/ মুক্ত নেতৃত্ব বলে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Theories of Leadership

নেতার সফলতাই প্রতিষ্ঠানের সফলতা। তাই নেতৃত্ব কী বা নেতৃত্ব কী রকম হওয়া উচিত, এসব বিষয়ে বিভিন্ন দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। এর ফলে নেতৃত্ববিষয়ক অনেক তত্ত্বের সৃষ্টি হয়েছে। নিচে নেতৃত্ব-সম্পর্কিত বহুল প্রচলিত তত্ত্ব বা মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১. নেতৃত্বের গুণ বা বৈশিষ্ট্যভিত্তিক মতবাদ (Trait theory of leadership): নেতৃত্বের গুণ বা বৈশিষ্ট্যভিত্তিক মতবাদ কতকগুলো সনাতন বৈশিষ্ট্য ও ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, বংশানুক্রমিকভাবে নেতা জন্মগ্রহণ করেন। একজন নেতা জন্মগতভাবেই নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এটি নেতৃত্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম তত্ত্ব। এ তত্ত্বকে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হতো। প্রাচীনকালে গ্রিস ও রোমান গবেষকদের বিশ্বাস ছিল, "নেতা' গড়ে ওঠে না; নেতা জন্মলাভ করে"। এ তত্ত্বে মনে করা হয়, যোগ্য নেতা হওয়ার জন্য যেসব গুণ থাকা দরকার তা হলো- উদ্যম, চারিত্রিক সরলতা ও সততা, কল্পনাশক্তি, দৃঢ়চেতা, সাহসিকতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, উদ্যোগী, সামাজিকতা, শক্তি, বিশ্বাস, যত্নশীল, উদারতা, সহযোগিতা প্রভৃতি।

২. নেতৃত্বের ঘটনা সাপেক্ষ/ পরিস্থিতি তত্ত্ব (Contingency/ situational theories of leadership): পরিস্থিতিবাদীদের মতে, কেবল কতিপয় গুণ আর নেতার কতগুলো ইতিবাচক আচরণই সফল নেতার সৃষ্টি করে না। তাদের মতে, পরিবেশ-পরিস্থিতিই নেতা সৃষ্টি করে। পরিস্থিতিভিত্তিক নেতৃত্ব তত্ত্বের মধ্যে প্রথম বিশদ মডেল উপস্থাপন করেন মনস্তত্ত্ববিদ Fred E. Fiedler। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল ব্যক্তিত্বের গুণাবলির দ্বারা কেউ নেতা হন না। নেতার সফলতা বা কার্যকারিতা নির্ভর করে নেতার অনুপ্রাণিতকরণের পদ্ধতি এবং নেতার জন্য পরিস্থিতি কতটা অনুকূল বা প্রতিকূল, এ দুই উপাদানের ওপর। নিচে উপাদান দুটি ব্যাখ্যা করা হলো-

  • নেতৃত্বের ধরন (Leadership styles): ফ্রেড ফিডলার নেতৃত্বের দুটি ধরনের কথা উল্লেখ করেছেন-

(১) কার্যকেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Task oriented leadership) (২) সম্পর্ককেন্দ্রিক নেতৃত্ব (Relation oriented leadership)। দুই প্রকারের নেতৃত্বের মধ্যে নেতা অবশ্যই যেকোনো এক ধরনের হবেন।

  • পরিস্থিতিমূলক চলক (Situational variables): ফ্রেড ফিডলার-এর মতে, তিনটি চলক বা বিষয় সফল নেতৃত্বের ধরন নির্ধারণে সহায়তা করে। যথা- (১) পদসংক্রান্ত ক্ষমতা, (২) কার্য কাঠামো, (৩) নেতা-কর্মী সম্পর্ক। এ তিনটি চলক ইতিবাচক হলে কাজ পরিচালনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয় এবং সফলতার সাথে কর্মীদের লক্ষ্য অর্জনে পরিচালনা করা যায়।

৩.নেতৃত্বের লক্ষ্য অভিমুখী তত্ত্ব বা মতবাদ (Path-Goal theory of leadership): এ তত্ত্বটি সত্তরের দশকে Martin Evans & Robert House-এর গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে উদ্ভূত। এ তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো নেতা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন, উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করবেন, উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৌশল গ্রহণ করবেন। এ মতবাদে গবেষকদ্বয় ১৯৭৪ সালে নেতার চার ধরনের আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা নিম্নরূপ:

  • নির্দেশনামুখী নেতৃত্ব (Directive leadership): নির্দেশনামূলক নেতৃত্বে নেতা অধস্তনদের কীভাবে কাজ করতে হবে তা নির্দেশ দেন ও তার প্রত্যাশা জানিয়ে দেন।
  • সমর্থনমূলক নেতৃত্ব (Supportive leadership): এ তত্ত্বে অধস্তনদের প্রতি নেতার আচরণ বন্ধুত্বপূর্ণ ও
    সহযোগিতামূলক। নেতাকর্মীদের প্রয়োজন/চাহিদার প্রতি সজাগ থাকেন, কল্যাণের ব্যবস্থা করেন এবং উত্তম কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এর ফলে অসন্তুষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়।
  • অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব (Participative leadership): যে নেতৃত্বে অধস্তনদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাকে অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব বলে। এরূপ নেতৃত্বে অধস্তনরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
  • সাফল্য অর্জনমূলক নেতৃত্ব (Achievement oriented leadership): এ জাতীয় নেতৃত্বে নেতা অধস্তনদের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। তিনি কর্মীদের কাছ থেকে উচ্চমানের কাজ প্রত্যাশা করেন। এরূপ নেতৃত্বের ফলে কর্মীদের কাজে সফলতা বা অগ্রগতি আসে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং মনোবল বাড়ে।

৪. ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড নেতৃত্ব তত্ত্ব (Managerial Grid Approach): Robert R. Blake (রবার্ট আর, ব্লেক) ও Jane Moution (জেনি মশন) ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড তত্ত্বের উদ্ভাবক। তারা দেখেছেন, কয়েকজন নেতার মধ্যে উৎপাদনের মান কেমন হচ্ছে, লক্ষ্য কেন অর্জিত হচ্ছে না, উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায় প্রভৃতি বিষয়ে উদ্বেগ কাজ করে (Concern for production)। এজন্য তারা উৎপাদন ক্ষেত্রে উন্নতমানের নীতি, কৌশল, প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অন্যদিকে, কয়েকজন নেতা কর্মীরা কতটা সন্তুষ্ট, তাদের প্রত্যাশ্যা পূরণ, তাদের আন্তঃসম্পর্ক প্রভৃতি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন (Concern for people)। এক্ষেত্রে তারা উত্তম কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মীদের আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। Blake ও Moution এই দু'ধরনের আচরণের মধ্যে সমন্বয়ের উপায় তুলে ধরেছেন।
এক্ষেত্রে উদ্ভাবকদ্বয় কর্মী ও উৎপাদন দু'টি বিষয়ের ওপরই নেতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলেছেন। এজন্য নেতারা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ, পদ্ধতিগত উন্নয়নসহ কর্মীদের প্রয়োজন পূরণ ও সন্তুষ্টি অর্জনে সঙ্গতি বিধানের পরামর্শ দেন। এই সমন্বয় ব্যবস্থাই ব্যবস্থাপকীয় গ্রিড তত্ত্ব নামে পরিচিত।

৫. নেতৃত্বের মোহনীয়/সম্মোহনী তত্ত্ব (The charismatic theory of leadership): নেতার মনোমুগ্ধকর শক্তির দ্বারা অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত করার প্রক্রিয়াকে মোহনীয় নেতৃত্ব বলে। Robert House সর্বপ্রথম ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মোহনীয় নেতৃত্ব তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন। তিনি মোহনীয় নেতার তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো: (১) মোহনীয় নেতা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হন; (২) নেতা স্বীয় বিশ্বাস ও নীতিতে সর্বদা দৃঢ় থাকেন। (৩) লোকদের প্রভাবিত করার জন্য আত্মপ্রত্যয়ী থাকেন। এ ধরনের নেতা অনুসারীদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেন ও তাদের কাজের ওপর আস্থা রাখেন।

৬. রূপান্তরী নেতৃত্ব তত্ত্ব (Transformational leadership approach): Bernard M. Bass এ তত্ত্বের প্রবক্তা। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, রূপান্তরী নেতৃত্ব হচ্ছে সাধারণ প্রত্যাশাকে পেছনে ফেলে কোনো বিশেষ দায়িত্ববোধকে অন্যের কাছে তুলে ধরা, নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে অনুপ্রাণিত করা। সাধারণত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন কিছু গ্রহণ করতে অধস্তনরা তাৎক্ষণিকভাবে রাজি থাকেন না। এতে পরিবর্তনের সাথে তাল মেলানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, নেতা পরিবর্তনকে সহজে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরিতে অধস্তনদের উদ্বুদ্ধ করেন। এজন্য অনেকে এরূপ নেতৃত্বকে উদ্দীপনামূলক নেতৃত্ব (Inspitrational leadership) নামেও অভিহিত করে থাকেন।

৭. নেতৃত্বের আদান-প্রদানভিত্তিক তত্ত্ব (Transactional theory of leadership): এ তত্ত্ব অনুযায়ী নেতা তার অনুসারীদেরকে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অবহিত করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করিয়ে নেন। এতে অনুসারীদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং খারাপ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়। এক্ষেত্রে নেতা কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সংগঠনকে কার্যকরভাবে ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Qualities of a Good/Ideal Leader

দলের সদস্যদের প্রভাবিত করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাকে বলা হয় নেতা। একজন আদর্শ নেতাই পারেন কর্মীদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে। তাই, একজন আদর্শ বা সফল নেতা হতে হলে একজন ব্যক্তিকে বহুগুণের অধিকারী হতে হয়। Robert J. Allion উত্তম নেতার নিম্নোক্ত ৫টি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন-

  • নির্ভরযোগ্যতা (Reliability): নেতাকে একজন প্রকৃত তথা খাঁটি মানুষ (Real Man) হতে হবে। তাকে এমন হতে হবে যেন সবাই তাকে বিশ্বাস করে এবং তার ওপর নির্ভর করতে পারে।
  • নৈতিক চরিত্র (Morality): সফল নেতৃত্বের জন্য নেতাকে অবশ্যই উন্নত মনোবল ও নৈতিকভাবে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তবেই তিনি অনুসরণীয় হতে পারবেন।
  • দূরদৃষ্টি (Foresightness): ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করার ক্ষমতা বা কল্পনাশক্তি থাকা নেতার একান্ত প্রয়োজন। তাই, নেতাকে সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী হতে হবে।
  • ইচ্ছাশক্তি (Willingness): একজন নেতার অবশ্যই সাহসিকতা ও উৎসাহের সাথে কাজ করার ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। এ অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে।
  • জ্ঞানসম্পন্ন (Knowledgeable): নেতার বিচক্ষণ, গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তিনি কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারবেন।

এছাড়াও একজন উত্তম বা আদর্শ নেতাকে নিচের গুণাবলির অধিকারী হতে হয়-

ক. পেশাগত গুণাবলি (Professional Qualities): নেতাকে তার কর্মক্ষেত্রে সব সময় তৎপর থাকতে হয়। প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষভাবে তাকে পেশাগত কাজের সাথেই জড়িত থাকতে হয়। তাই তার নিচের পেশাগত গুণ থাকা প্রয়োজন

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (Decision making ability): নেতাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তার সিদ্ধান্তের ওপরই দলীয় কার্যক্রম নির্ভর করে। তাই দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেতার একটি অতি প্রয়োজনীয় গুণ। এর মাধ্যমে একজন নেতা যেকোনো পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করতে সক্ষম হন।
  • প্রভাবিত করার ক্ষমতা (Influencing ability): নেতাকে প্রতিষ্ঠানের বা দলের সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। তাই তার দলের অন্যান্য সদস্য বা ব্যক্তিকে প্রভাবিত ও প্ররোচিত করার ক্ষমতা থাকতে হয়।.
  • যোগাযোগে দক্ষতা (Communication skill): নেতাকে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বিভিন্ন পক্ষের সাথে সব সময়
    যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। এজন্য যোগাযোগ স্থাপনে নেতার দক্ষতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে অনেক কঠিন কাজের বা অনেক জটিল সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে যায় বা ভুল-বোঝাবুঝি দূর হয়।
  • কারিগরি জ্ঞান (Technical knowledge): বর্তমান উন্নত প্রযুক্তির যুগে নেতার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের কারিগরি জ্ঞান থাকা আবশ্যক। অন্যথায়, তিনি সঠিকভাবে কাজ পরিচালনা করতে পারবেন না। এছাড়া, নেতাকে তার অধীনস্থদের কাজও তত্ত্বাবধান করতে হয়। কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞ না হলে তার পক্ষে সঠিক তত্ত্বাবধান সম্ভব নয়।
  • শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা (Education and experience): শিক্ষা মানুষের জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটায়। তাই নেতাকে শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া, শিক্ষিত লোকের নেতৃত্ব সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। আবার, নেতৃত্বে সফলতার জন্য অভিজ্ঞতারও বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।
  • সাংগঠনিক জ্ঞান (Organizational knowledge): সফল নেতা হতে হলে তাকে অবশ্যই যোগ্য সংগঠক হতে
    হবে। অর্থাৎ, তার সংগঠিত করার যোগ্যতা থাকতে হবে। যোগ্য সংগঠক যেকোনো পরিস্থিতিতেই নেতৃত্ব দিতে পারেন। এছাড়া, তাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব বণ্টন ও সুকৌশলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভ্যস্ত ও কৌশলী হতে হবে।

খ. মনস্তাত্ত্বিক গুণাবলি (Psychological Qualities): নেতৃত্ব একটি চিন্তন ও মননশীল কাজ। তাই, নেতৃত্বে
সাফল্য অর্জন করতে হলে একজন আদর্শ নেতাকে অনেক ধরনের মানসিক গুণের অধিকারী হতে হয়, যা নিম্নরূপ-

  • আত্মবিশ্বাস (Self-confidence): নিজের সক্ষমতার ওপর আস্থা বা বিশ্বাস থাকাকে আত্মবিশ্বাস বলে। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো কাজে নেতার অবশ্যই নিজের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস নেতার মনোবলকে বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া আত্মবিশ্বাস যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
  • দূরদর্শিতা (Prudence): ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উপলব্ধি ও অনুমান করার সামর্থ্যকে দূরদর্শিতা বলে। এটি আদর্শ নেতার একটি বড় গুণ। এ গুণের মাধ্যমে নেতা সময়ের উপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। এতে তিনি করণীয় আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে পারেন। ফলে তিনি সহজেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন। তাই একজন নেতাকে দূরদর্শী গুণের হতে হয়।
  • বুদ্ধিমত্তা (Intelligence): আদর্শ নেতাকে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হতে হয়। কারণ অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে তাকে কাজ করতে হয়। তাই, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার সাথে নেতাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
  • সাহসিকতা (Couragiousness): নেতা কাজের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূলতা ও সমস্যা মোকাবিলা করে দলকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। কাজেই সাহসী না হলে তার পক্ষে এরূপ কাজ করা সম্ভব নয়। তাই, আদর্শ নেতাকে সাহসিকতার সাথে যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ ও বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।
  • ধৈর্যশীলতা (Patience): বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন ব্যক্তির মন রক্ষা করে নেতাকে কাজ করতে হয়। অধীনস্থদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি, চিন্তা-ভাবনা, রুচিবোধ, আচার-আচরণে অনেক ভিন্নতা দেখা দেয়। নেতাকে এসব কিছু ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করতে হয়। কাজেই নেতার ধৈর্যশীল হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
  • ঝুঁকি ও দায়িত্ব গ্রহণ (Undertakeing risk and responsibility): নেতাকে মধ্যম পন্থার ঝুঁকি ও সংশ্লিষ্ট সব
    ব্যাপারে যেকোনো দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হয়। ঝুঁকি ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা নেতার জন্য মানানসই নয়। এমনকি অধস্তন কর্মীদের ব্যর্থতার দায়ভারও নেতাকেই বহন করতে হয়। নেতা যত বেশি ঝুঁকি ও দায়িত্ব নিতে সক্ষম হবেন, তত বেশি নেতৃত্বের বিকাশ হবে।

    গ. শারীরিক গুণাবলি (Physical Qualities): একজন নেতাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং বিভিন্ন কাজে সব সময় অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই একজন আদর্শ নেতার নিচের শারীরিক গুণগুলো থাকা উচিত-

  • সুস্বাস্থ্য (Good health): নেতাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। তাই, তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হলে সাংগঠনিক দায়িত্ব সব সময় সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না।
  • পরিশ্রমী (Industry): প্রতিষ্ঠান বা দলের স্বার্থে নেতাকে সারাদিন পরিশ্রম করতে হয়। তাই তাকে অলস হলে চলবে না বরং কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত হতে হবে। প্রয়োজনে যেকোনো সময় যেকোনো কাজে ছুটে যেতে হবে। তাই, আদর্শ নেতাকে নিরলস পরিশ্রমী হতে হয়।
  • সুদর্শন (Handsome): সুদর্শন চেহারা নেতার একটি বিশেষ ঐচ্ছিক গুণ। কেননা মানুষ সৌন্দর্যের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সৌন্দর্য মানুষকে আনন্দ দেয়। নেতা যদি আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী হন, তাহলে তার নেতৃত্ব খুব সহজেই অধীনস্থ কর্মীরা মেনে নিতে পারেন। এতে নেতৃত্বদানও সহজ হয়।

ঘ. নৈতিক গুণাবলি (Ethical Qualities): নেতাকে তার দলের সবাই অনুসরণীয় মনে করেন। তাই তাকে সব। সময় নৈতিকতার অনুশীলন করতে হয়। সফল ও কার্যকর নেতৃত্বের জন্য নেতার নিচের নৈতিক গুণ থাকা প্রয়োজন

  • সততা ও সহযোগিতা (Honesty and Cooperation): সততা নেতার একটি প্রয়োজনীয় এবং মহৎ গুণ। সততা ও সহযোগিতামূলক আচরণ করলে নেতার প্রতি কর্মীদের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হয়। আর এর অভাবে নেতার ওপর আস্থা হারিয়ে তার নেতৃত্ব অকার্যকর ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
  • দায়িত্বশীলতা (Responsibility): প্রতিষ্ঠান বা দলের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে নেতার সঠিকভাবে কাজ সম্পাদনের ওপর। এজন্য তার যথেষ্ট দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া, তিনি যদি তার দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাহলে তার কর্মীরা আরও বেশি অবহেলার সুযোগ পাবে।
  • দেশপ্রেম (Patriotism): স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। দেশ, দল ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা নেতার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। তাই, 'ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়' এ আদর্শকে বিবেচনায় এনে এবং তার বাস্তব প্রয়োগ করে নেতাকে তার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
  • বিচার ক্ষমতা (Judgement power): অন্যায়, অবিচার, পক্ষপাতিত্ব প্রভৃতির ঊর্ধ্বে উঠে নেতাকে সুবিচার করতে হবে। অন্যথায় তার নেতৃত্ব সুদূরপ্রসারী সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। কারণ নেতার কাছ থেকে সঠিক বিচার না পেলে, কর্মীরা কাজের ক্ষেত্রে হতাশ হয়ে পড়ে ও তাদের মনোবল ভেঙে যায়। এতে কাজের ক্ষমতা কমে যায়।
  • সময়ানুবর্তিতা (Punctuality): আদর্শ নেতা হতে হলে তাকে অবশ্যই সময়ের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। যথাসময়ে কাজ সম্পাদনে তাকে সচেষ্ট থাকতে হবে। 'সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়'- এ নীতির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তবেই তার পদক্ষেপ কার্যকর হবে। অন্যথায় সঠিক পদক্ষেপও ব্যর্থ হবে।
  • ন্যায়পরায়ণতা (Justice): নেতার ন্যায়পরায়ণতা তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। তাই নেতাকে অবশ্যই পক্ষপাতিত্ব না করে সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি ন্যায়পরায়ণ না হলে তার কোনো কাজেই কর্মীরা আস্থা রাখতে পারবেন না এবং নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়বে।

ঙ. অন্যান্য গুণাবলি (Other Qualities): উল্লিখিত গুণগুলো ছাড়াও নেতাকে প্রাসঙ্গিক আরও কিছু গুণের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। এগুলো তাকে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এগুলো হলো-

  • পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান (Knowledge about environment): নেতাকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে
    পদক্ষেপ নিতে হয়। তাকে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই, প্রতিষ্ঠানের বা দলের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ সম্পর্কে তাকে পুরোপরি ধারণা রাখতে হয়। তবেই তার মাধ্যমে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ সম্ভব হবে।
  • অনুসারীদের সম্পর্কে জ্ঞান (Knowledge about followers): নেতা তার অনুসারীদের মাধ্যমেই কার্যক্রম
    পরিচালনা করে থাকেন। তাই অনুসারীদের মানসিকতা, যোগ্যতা, রুচিবোধ প্রভৃতি বিষয়ে তাকে ভালোভাবে ধারণা রাখতে হবে। এতে তার অনুসারীদের যোগ্যতা কাজে লাগানো সহজ হবে। অর্থাৎ, অনুসারীদের সম্পর্কে সঠিক ও সার্বিক জ্ঞান থাকলে তাদের দ্বারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজ সম্পাদন করানো যাবে।
  • বাকপটুতা (Oratory): প্রতিষ্ঠান ও দলের স্বার্থ রক্ষার্থে নেতাকে বিভিন্ন মানসিকতার লোকের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের সাথেও সব সময় সংযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তাগিদে নেতাকে যথেষ্ট বাকপটু হতে হবে। অন্যথায় দলীয় স্বার্থ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
  • খাপ খাওয়ানোর সামর্থ্য (Adaptation ability): নেতাকে বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে চলতে হয়।
    অনেক প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তাকে সবার সাথে তাল মিলিয়ে বা খাপ খাইয়ে চলা লাগে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট অনেক পক্ষের সাথে বিরূপ সম্পর্কের সৃষ্টি হবে। এতে করে দলীয় লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
  • বংশ মর্যাদা (Parentage): উচ্চ বংশীয় লোকজন সহজেই লোকসমাজে পরিচিত ও আস্থাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই, বংশ মর্যাদা নেতাকে সহজেই সফলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি নেতার একটি ঐচ্ছিক গুণ।
  • মোহনীয় ক্ষমতা (Charismatic power): সদস্যদের যে বিশেষ ক্ষমতা বা শক্তি দ্বারা আকৃষ্ট ও অভিভূত করে নেতা আদেশ-নির্দেশ, পালনে প্রভাবিত করে, তাকে মোহনীয় বা সম্মোহনী শক্তি বলে। নেতা যদি সম্মোহনী শক্তির অধিকারী হন তাহলে খুব সহজেই সদস্যদের প্রভাবিত করতে পারেন।

সবশেষে বলা যায়, এসব গুণের সমন্বয়ে একজন নেতা কার্যকর ও ফলপ্রসূ নেতৃত্বদানের মাধ্যমে আদর্শ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেন। তাই নেতাকে এ ব্যাপারে অর্থাৎ এসব গুণ অর্জনে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Functions of Leader

নেতার কাজ হলো তার সদস্যদের লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা। এজন্য নেতাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অধীনস্থদের স্বার্থও রক্ষা করতে হয়। তাই তাকে নিচের কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয়-

ক. মুখ্য কার্যাবলি (Basic Functions)

নেতা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে নিচের মৌলিক কাজগুলো করেন-

  • নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন (Formulating policy and plan): সাংগঠনিক কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন
    করার জন্য নেতাকে আগে থেকেই নীতিমালা তৈরি ও পরিকল্পনা করতে হয়। কে, কখন, কোন কাজ কীভাবে সম্পাদন করবেন, তা শুরু থেকেই নির্ধারণ করতে হয়। তাই, সময়মতো সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এতে ভুল হলে সব কাজেই ভুল থেকে যাবে।
  • সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ (Determining organizational structure): প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজ সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নেতাকে যথাযথ সংগঠন কাঠামো নির্ধারণ করতে হয়। তাই তাকে সাংগঠনিক লক্ষ্য, অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যাবলি শনাক্ত করতে হয়। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের দায়িত্ব-কর্তব্য সংজ্ঞায়িতকরণ ও বণ্টন, কর্মীদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ প্রভৃতি কাজ করতে হয়।
  • উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন (Selecting proper employees): প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে যোগ্য কর্মী আবশ্যক। এই কর্মী খুঁজে বের করার দায়িত্ব নেতাকেই পালন করতে হয়। এজন্য নেতা বিভিন্ন উৎস থেকে কর্মী সংগ্রহ করে তাদের মধ্য থেকে যোগ্য কর্মী নির্বাচন করে মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করে থাকেন।
  • নির্দেশনা দান (Directing): নেতার কাজ হলো অধীনস্থ কর্মীদের কর্মপ্রচেষ্টাকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত করা। কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় আদেশ-নির্দেশ, পরামর্শ দিতে হয়। নেতার কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েই কর্মীরা কাজে নিয়োজিত হন। তাই, কর্মী বা অনুসারীদের নির্দেশনাদান নেতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
  • যোগাযোগ রক্ষা (Maintaining communication): সফল নেতৃত্বের লক্ষ্যে নেতাকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন পক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। একজন নেতাকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের সাথে সব সময় যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, আদেশ-নির্দেশ প্রদান, কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন প্রভৃতি কাজ করতে হয়। তাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা নেতার অন্যতম কাজ।
  • তত্ত্বাবধান (Supervision): প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক বা নেতার অধীনে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী কাজ করে। নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কাজ করছে কি না, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তদারকি ও তত্ত্বাবধান করতে হয়। যথাযথ তদারকির মাধ্যমে তাদের কাজের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
  • সমন্বয়সাধন (Coordination): সাংগঠনিক উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধনের দায়িত্ব নেতাকেই পালন করতে হয়। নেতা সব কাজের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। এভাবে নেতা সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করেন।
  • পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা (Arrangement of reward and punishment): নেতা তার কর্তৃত্বের বলে অধস্তন কর্মীদের সাফল্য বা ভালো কাজের পুরস্কার দেন। আবার ব্যর্থতা বা মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। মূলত পুরস্কার দেওয়া ও শাস্তিদান নেতার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ, যা তিনি কাজ আদায়ে প্রয়োগ করেন।
  • মধ্যস্থতাকরণ (Mediation): নেতা তার অনুসারী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকেন। তার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অনেক জটিল সমস্যারও সহজ সমাধান হয়ে থাকে বা ভুল-বোঝাবুঝি দূর হয়। তাই, প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করাও নেতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
  • নিয়ন্ত্রণ (Controlling): গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হচ্ছে কি না, তা দেখাও নেতার দায়িত্ব। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হলে তার কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় সংশোধনীমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও নেতাকেই নিতে হয়।

খ. আনুষঙ্গিক কার্যাবলি (Assistancy Functions)
উল্লিখিত কার্যাবলি ছাড়াও নেতাকে প্রাসঙ্গিক আরও অনেক কাজ সম্পাদন করতে হয়। এসব আনুষঙ্গিক কার্যাবলি নেতার নেতৃত্বকে সফলতা দেয়। এগুলো হলো-

  • দলীয় প্রচেষ্টা জোরদারকরণ (Maximizing group effort): দলীয় প্রচেষ্টা বাড়ানোর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠান তার
    লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। এজন্য কর্মীদের মধ্যে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক তথা পারস্পরিক সম্পর্ক বাড়ানোর দরকার হয়। এতে দলগত প্রচেষ্টা উন্নয়নের মাধ্যমে নেতা প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে থাকেন।
  • উৎসাহ সৃষ্টি (Creating inspiration): প্রত্যেকের মধ্যে কাজ করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা আছে। এ সুপ্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলার জন্য নেতাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। এজন্য বিভিন্ন প্রণোদনা, উদ্দীপনা বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে নেতাকে তার কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হয়।
  • নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (Ensuring security): নেতাকে তার কর্মীদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করতে হয়। যথাযথ কাজের পরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা থেকে জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতির মাধ্যমে নেতা কর্মীদের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করে থাকেন।
  • কার্য পরিবেশ সৃষ্টি (Creating work environment): কর্মীদের জন্য সুষ্ঠু ও অনুকূল কাজের পরিবেশ সৃষ্টি
    করাও নেতার আনুষঙ্গিক কাজের মধ্যে অন্যতম। এটি ছাড়া অনুসারীদের ওপর কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও লক্ষ্যের দিকে আগানো সম্ভব হয় না। তাই, যেকোনো উপায়েই হোক নেতাকে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
  • অবহিতকরণ (Informing): প্রতিষ্ঠান এবং অনুসারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে নেতার অনুসারীদেরকে নিয়মিত অবহিত করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিধি-নিষেধ অনুসারীদের জানিয়ে দেওয়া নেতার একটি নৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব বলে বিবেচিত।
  • অনুসারীদের সম্পর্কে ধারণা (Knowledge about followers): একজন আদর্শ নেতার অপরিহার্য দায়িত্ব হলো অনুসারীদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা। অধীনস্থদের চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ সম্পর্কে নেতা অবগত থাকলে তাদেরকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে পরিচালনা করা তার জন্য সহজ হয়।
  • আস্থা অর্জন (Creating trust): নেতাকে অবশ্যই কর্মীদের মধ্যে নিজের সম্পর্কে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। কর্মীরা নেতার প্রতি আস্থাশীল হলে নেতার যেকোনো নির্দেশনাই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করবেন। এজন্য নেতাকে তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও কাজকর্ম দ্বারা আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
  • বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ (Settlement of dispute): প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে অনেক কারণেই বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এরূপ বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্বও নেতাকে পালন করতে হয়। এর ফলে অনুকূল কাজের পরিবেশ তৈরি হয়। উপসংহারে বলা যায়, নেতা হলেন একটি সংগঠনের মূল সঞ্চালক। তার কার্যকর নেতৃত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে। এজন্য নেতাকে উল্লিখিত কাজগুলো সম্পাদন করতে হয়।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Problems to Develop Leadership

মানুষ পরিচালনা করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। আর মানুষ তথা কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়া বা পরিচালনার এ কঠিন কাজটি নেতাকেই করতে হয়। অধীনস্থ কর্মীদের পরিচালনায় নেতাকে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা, নেতার নিজস্ব দুর্বলতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অধীনস্থ কর্মীসংক্রান্ত সমস্যা প্রভৃতি বিষয়ও কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নেতা সাধারণত যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তা নিচে তুলে ধরা হলো-

ক. প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা (Institutional Problems)

নেতৃত্বের বিকাশ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম-নীতি, কাঠামোগত জটিলতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, কার্য-পরিবেশগত সমস্যা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অপর্যাপ্ততা অনেক ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিচে প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য সমস্যাসমূহ তুলে ধরা হলো-

  • পরিবেশগত বাধা (Environmental obstacle): প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান সব সময় অনুকূল থাকে না। সংগঠনের বিশৃঙ্খলামূলক অবস্থা বিরাজ করলে নেতা কখনো সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেন না। এর ফলে, যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন নেতাও তার যোগ্যতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন।
  • উপকরণের স্বল্পতা (Shortage of factors): উৎপাদনের উপকরণ যথা: শ্রম, মূলধন, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি প্রভৃতি যদি সহজলভ্য হয়, তাহলে নেতার নেতৃত্বদান সহজ হয়। কিন্তু, বাস্তবে এসব উপকরণ যথাসময় যথাস্থানে না পাওয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এতে নেতৃত্বের বিকাশেও বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়।
  • সুষ্ঠু নীতির অভাব (Lack of proper policy): কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানের নীতি-পদ্ধতিও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে থাকে। কিন্তু, এ নীতি-পদ্ধতি নেতার পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। ফলে কার্যকর নেতৃত্ব বাধাগ্রস্ত হয়।
  • নেতা নির্বাচনের সমস্যা (Problems of selecting leader): সফল নেতৃত্ব বিকাশে সর্বগুণে গুণান্বিত যোগ্য নেতার প্রয়োজন। যোগ্য নেতার অভাবে কর্মীদের ঠিকমতো পরিচালনা করা যায় না। কর্মীরা অযোগ্য নেতাকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণও করেন না। কিন্তু, বাস্তবে যোগ্য নেতা খুঁজে পাওয়া বা নির্বাচন করা সব সময় সম্ভব হয় না।
  • কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অস্পষ্টতা (Vague in authority and responsibility): আদেশ দেওয়ার বৈধ ক্ষমতা হলো কর্তৃত্ব; আর কাজ সম্পাদনের দায়বদ্ধতাকে বলা হয় দায়িত্ব। নেতাকে সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করেই নেতৃত্ব দিতে হয়। অনেক সময় সংগঠন কাঠামোতে কর্মীদের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব এবং এর সীমারেখা যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত বা বণ্টন করা থাকে না। এতে কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায় না। এ ধরনের অস্পষ্টতার কারণে সুষ্ঠু নেতত বাধাগ্রস্ত হয়।

খ. নেতার ব্যক্তিগত সমস্যা (Leader Related Problems)

ব্যক্তি হিসেবে মানুষ সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়, এটি সর্বজনস্বীকৃত। তাই, নেতার ব্যক্তিগত ত্রুটি বা দুর্বলতাও অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বিকাশে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যথা:

  • নেতার অদক্ষতা (Inefficiency of leader): নেতা তার অনুসারী বা অধীনস্থদের পরিচালনা করে থাকেন। তাদের
    যথাযথভাবে পরিচালনা করার জন্য নেতার শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, শিল্প-সম্পর্ক বিষয়ক জ্ঞান থাকতে হয়। তবে বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে একজন নেতার সার্বিক জ্ঞান ও পারদর্শিতা না-ও থাকতে পারে। তাই এক্ষেত্রে নেতার অদক্ষতা সফল নেতৃত্বের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
  • পক্ষপাতিত্ব (Partiality): কোনো ব্যক্তি, দল বা জিনিসের প্রতি অনুচিত পছন্দ বা অনুমোদনকে পক্ষপাত বলে। অধীনস্থ কর্মীদের প্রতি নেতাকে সব সময় নিরপেক্ষ আচরণ প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু কোনো কোনো নেতার কাজ বণ্টনে বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের দল, মত ও এলাকার কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে দেখা যায়। এতে বঞ্চিত কর্মীরা নেতার আদেশ-নির্দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মান্য করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
  • আবেগ ও অহংকার (Emotion and arrogance): পরিস্থিতি বা সম্পর্ক থেকে উৎপন্ন চরম মানসিক অনুভূতিকে আবেগ বলা হয়। অনেক সময় কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুসরণ না করলে বা নেতার আদেশ-নির্দেশ না শুনলে নেতা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। এতে নেতৃত্বের কার্যকারিতা কমে যায়। আবার নেতার অতিমাত্রায় ক্ষমতা অনেক সময় অহংকারের জন্ম দেয়। এতে অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব সাফল্য পায় না।
  • দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা (Tendency to avoid responsibility): অনেক নেতা শুধু ক্ষমতাকে উপভোগ করতে চান। ক্ষমতার পাশাপাশি দায়িত্ব নেওয়ার যে মানসিকতা থাকা দরকার, তা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। এরূপ নেতা নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে থাকেন। এতে অন্য কর্মীদের নেতা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় এবং তার নেতৃত্ব মেনে নিতে চায় না। এভাবে নেতা তার নেতৃত্বের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেন।
  • অদূরদর্শিতা (Rocklessness): নেতা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অধীনস্থদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেন। তবে অহেতুক বা বিনা প্রয়োজনে নির্দেশ দিলে কর্মীদের কাছে নেতা হাস্যকর ব্যক্তিতে পরিণত হন। এতে নেতৃত্বের গতি থাকে না। এর ফলে অনেক সময় জরুরি নির্দেশনাও কর্মীরা এড়িয়ে চলেন।

গ. অধীনস্থ কর্মীসংক্রান্ত সমস্যা (Subordinate Related Problems)

সফল নেতৃত্বের বিকাশে শুধু নেতার গুণই যথেষ্ট নয় বরং অধীনস্থ বা অনুসারীদের যোগ্যতা এবং অযোগ্যতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে অধীনস্থদের বিভিন্ন অযোগ্যতাও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নেতার নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে। যেমন:

  • অধীনস্থদের অদক্ষতা (Inefficiency of subordinates): দক্ষ কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়া যত
    সহজ, অদক্ষ কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া তত সহজ নয়। তাছাড়া অদক্ষ কর্মী নেতার আদেশ-নির্দেশ ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। তাদের অনেকের মধ্যে কাজ করার ব্যাপারে আন্তরিকতার অভাবও দেখা যায়। তাই, অধস্তন কর্মীদের অদক্ষতা নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা।
  • অন্ধ অনুসরণ (Blindly following): কখনো নেতার অদক্ষতা, অযোগ্যতা বা অনভিজ্ঞতার কারণে তার নির্দেশনা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। তবে নেতার প্রতি অনুসারীদের অন্ধবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নেতার জারিকৃত ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশনাও অধস্তন কর্মীরা পালন করে থাকেন। এতে হিতে বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হয়।
  • শ্রদ্ধাবোধের অভাব (Lack of respectiveness): নেতার প্রতি অনুসারীদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু, কখনও কখনও অনুসারীরা নেতার নেতৃত্ব মানতে চান না বা নেতার প্রতি যথাযথ আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ দেখান না। ফলে নেতার প্রত্যেক কথাই তাদের কাছে গুরুত্বহীন বলে মনে হয়। এতে নেতৃত্বের বিকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।
  • তোষামোদি প্রবণতা (Tendency to flattery): কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু কর্মী দেখা যায়, যারা নেতার অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায় সব সময় নেতার আশপাশে থাকেন। বিনা কারণে তোষামোদি করেন। এভাবে অনেক সময় নেতার অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হন। এ কারণে এ ধরনের কর্মীদের সাথে নীতিমান কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে, সফল নেতৃত্বও বাধাগ্রস্ত হয়।
  • মানসিকতার ভিন্নতা (Mental differences): বিভিন্ন অঞ্চল ও মতাদর্শের কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে একত্রে কাজ করতে হয়। এরূপ এলাকাগত ও আদর্শগত পার্থক্যের কারণে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে অনেক দল বা উপদল তৈরি হয়। কখনও কখনও এদের অবস্থান এতটাই অনড় ও অটল হয় যে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নেতার নেতৃত্বও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

ঘ. অন্যান্য সমস্যা (Other problems)

নেতৃত্বের সফল প্রয়োগ ও বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লিখিত সমস্যাসমূহ ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। যেগুলোকে নেতৃত্বের বাধা সৃষ্টিকারী উপাদান বলা যায়। যেমন:

  • রাজনৈতিক প্রভাব (Political influence): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়াও জাতীয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব, কর্মীদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি প্রভৃতি প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সফল প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নেতা তার কাজের ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েন।
  • সামাজিক-সাংস্কৃতিক অসামঞ্জস্যতা (Socio-cultural imbalanceness): কর্মীদের নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মধ্যে মিল রাখা না গেলে নেতৃত্ব কার্যকর করা যায় না। আর প্রতিষ্ঠান, নেতা এবং অনুসারীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিল ও সমতা ছাড়া সফল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারে সুষ্ঠু সমন্বয় সম্ভব হয় না।
  • প্রযুক্তিগত সমস্যা (Technological problem): নেতৃত্ব প্রয়োগে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করলেও কখনও কখনও তা সমস্যাও তৈরি করে। একজন নেতা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারলে তিনি অনুসারীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন না। এতে নেতৃত্বের কার্যকারিতা কমে যায়।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural climate): অনেক সময় দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক কারণে অস্বাভাবিক
    কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে, প্রতিষ্ঠানে বা সমাজে নেতৃত্ব বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এসব পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি সংস্থা ও এনজিও নেতৃত্বে এগিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাই বলা যায় যে, নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত সমস্যাগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষপটে সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই, উক্ত সমস্যাগুলো দূরে রাখতে পারলে প্রতিষ্ঠানের সফলতা অর্জন খুবই সহজ হয়।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Ways to Remove the Problems to Develop Leadership

প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে নেতৃত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও সফল ও কার্যকর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা দেখা যায়। নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে উক্ত সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব-

  • . সংগঠনে বা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা;
  • লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সব রকমের উপকরণ যথাসময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা;
  • প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের জন্য যোগ্য নেতা নির্বাচনে সচেষ্ট থাকা;
  • প্রতিষ্ঠানের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিক মাত্রায় ও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা;
  • বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নেতাকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে গড়ে তোলা;
  • আবেগ ও অহংকার নিবারণ করে সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, সমতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা;
  • অধীনস্থদের সব দায়-দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নেতাকে মানসিকভাবে তৈরি থাকা;
  • কর্মীদেরকে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে কাজের প্রতি ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা;
  • কর্মীদের প্রচেষ্টা সর্বোচ্চকরণের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা;
  • তাদের নেতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আনুগত্যপরায়ণ করে তোলার চেষ্টা করা;
  • তাদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সব ধরনের চেষ্টা চালানো;
  • নেতৃত্বের বিকাশের জন্য সব রাজনৈতিক ও পেশিশক্তিকে কৌশলে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা;
  • পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সামাজিক রীতি-নীতি বিবেচনা করে নেতৃত্বের কৌশল অবলম্বনে সচেষ্ট থাকা;
  • নেতৃত্বের সব স্তরে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

অতএব, নেতৃত্ব হলো মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারকরণের প্রক্রিয়া বিশেষ। এটি অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। এক্ষেত্রে নানা বাধা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। তবে, নেতাকে অনেক কৌশল অবলম্বন করে উক্ত সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলেই কেবল নেতৃত্ব সাফল্য পাবে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Direction

তাওশিন আহসান একটি স্বনামধন্য উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাপক। তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। অতঃপর তার অধীনস্থ সবার করণীয় সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেন। দৈনিক কী পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে তার খোঁজ-খবর রাখেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধানের উপায় বলে দেন। সপ্তাহ শেষে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সবাইকে সাধুবাদ জানান। কখনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না

হলে অনুপ্রেরণা দিয়ে সবাইকে আরও বেশি কাজ করতে উৎসাহিত করেন। এভাবে তিনি সবাইকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সবার সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটিকে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। জনাব তাওশিনের কাজগুলো নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।

ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় কর্মীসংস্থানের পর নিয়োজিত কর্মীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় নির্দেশনার। এটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অধীনস্থ কর্মীদের করণীয় বিস্তারিতভাবে জানানোর প্রক্রিয়া। আদেশ, উপদেশ, পরামর্শ, উৎসাহ দান, অনুপ্রেরণা, তিরস্কার, অনুসরণ (Follow-up) প্রভৃতি নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। এটি সর্বদা নিম্নগামী। তাছাড়া ব্যবস্থাপনায় এটি জোড়া মই শিকল নীতি অনুসরণ ও দ্বিমুখী যোগাযোগ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে নির্বাহী তার অধীনস্থদের লক্ষ্য অর্জনে পরিচালিত করেন। ব্যবস্থাপনা কার্যাবলির মধ্যে সেতুবন্ধ 'হিসেবে কাজ করে নির্দেশনা। ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নির্ভর করে নির্দেশনার ওপর। ব্যবস্থাপনার সব স্তরে নির্দেশনা প্রবাহিত হয়। আমরা কোথায় আছি এবং কোথায় যেতে চাই, এ দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে নির্দেশনা।

  • অধ্যাপক মার্শাল ই. ডিমক (Prof. Marshall E. Dimok) বলেন, 'The heart of administration is directing function which involves determining the courses, giving orders and instructions for providing dynamic leadership.' অর্থাৎ, 'নির্দেশনা হলো প্রশাসনের হৃৎপিন্ড, যা কর্মপন্থা নির্ধারণ, আদেশ ও নির্দেশ দেওয়া এবং গতিশীল নেতৃত্বদানের সাথে জড়িত।
  • জে. এল. মেসি (J. L. Massie) বলেন, 'Direction is the process by which actual performance of subordinates is guided toward the common goals.' অর্থাৎ, 'নির্দেশনা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অধীনস্থদের প্রকৃত কার্যক্রমকে সাধারণ লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া হয়।'

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে নির্দেশনার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়-

  • নির্দেশনা হলো প্রশাসনের হৃৎপিণ্ডস্বরূপ;
  • নির্দেশনা সবসময় উপরের স্তর থেকে আসে;
  • পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও লক্ষ্য অর্জনের সাথে নির্দেশনা জড়িত এবং
  • এর মাধ্যমে কাজ সম্পাদনে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়।

অতএব, লক্ষ্য অর্জনে কর্মীদের করণীয় কাজ সম্পর্কে অবহিত করা, আদেশ-উপদেশ ও পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালিত করার কাজকে নির্দেশনা বলে।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Features or Qualities of a Good Direction

নির্দেশনার মাধ্যমে অধীনস্থদের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করা হয়। উত্তম বা আদর্শ নির্দেশনার বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলি নিচে আলোচনা করা হলো-

  • সহজবোধ্যতা (Easy to understand); নির্দেশনা অবশ্যই স্পষ্ট ও সহজ-সরল হওয়া উচিত। এটি অস্পষ্ট হলে,
    কর্মীরা তা নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে। এ কারণে অস্পষ্ট বা জটিল বাক্য পরিহার করা উচিত। নির্দেশনা স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হলে, সেখানে ভুল ব্যাখ্যার আশঙ্কা কমে যায়।
  • পূর্ণাঙ্গতা (Completeness): পূর্ণাঙ্গতা একটি উত্তম নির্দেশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেক সময় আংশিক নির্দেশনা দিয়ে বা বক্তব্য শেষ না করে ধরে নেওয়া হয়, কর্মীরা তা বুঝে নেবে। কিন্তু এমন নির্দেশনা কখনই ভালো ফল বয়ে আনে না। তাই, নির্দেশনার বক্তব্য অবশ্যই পরিপূর্ণ হওয়া উচিত।
  • যৌক্তিকতা (Logicality): নির্দেশনা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন। যে কাজ এক মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা সে কাজ এক সপ্তাহে সম্পাদন করার নির্দেশনা অযৌক্তিক। তাই, নির্দেশনা দেওয়ার সময় কর্মীদের শক্তি, সামর্থ্য, প্রাপ্ত সময় এবং প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যকে বিবেচনায় রাখতে হয়।
  • সংক্ষিপ্ততা (Brevity): উত্তম নির্দেশনা যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা বক্তব্য এখানে পরিহার করা হয়। একটি দীর্ঘায়িত নির্দেশনা যেমন বিরক্তির, তেমনি কর্মীরা তা সঠিকভাবে মনে রাখতে পারে না। এ কারণে নির্দেশনা যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত।
  • সময়ানুবর্তিতা (Punctuality): নির্দেশনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সময়ানুবর্তিতা। কথায় আছে- 'সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ে দশ ফোঁড়'। অর্থাৎ, সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। তাই, যে সময়ে নির্দেশ দিলে কাজ হবে সে সময়ে নির্দেশ দেওয়া উচিত। অন্যথায় তা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
  • সুনির্দিষ্টতা (Specificness): নির্দেশনা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত। এতে কর্মীরা নির্দেশনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে কাজ করতে পারেন। আর নির্দেশনায় অস্পষ্টতা থাকলে কর্মীরা তাদের করণীয় সম্পর্কে বিভ্রান্তির মধ্যে থাকেন।
  • গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability): যে নির্দেশনা কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় কর্মীরা তা বাস্তবায়নে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেন। এ কারণে নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
  • ধারাবাহিকতা (Continuity): নির্দেশনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। একটি নির্দেশনা বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্দেশনা প্রস্তুত রাখতে হয়। এছাড়া, পূর্বের নির্দেশনার সাথে পরবর্তী নির্দেশনার মিল রাখতে হয়।
  • লক্ষ্যকেন্দ্রিক (Goal oriented): ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত ফলকে লক্ষ্য বলা হয়। বিশেষ কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নির্দেশনা দিতে হয়। নির্দেশনার বক্তব্যে অবশ্যই যেন উদ্দেশ্যের প্রতিফলন হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
  • লিখিত নির্দেশনা (Written instruction): নির্দেশনা লিখিত হওয়া উচিত। এটি লিখিত হলে সেখানে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা তথ্য বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

সুতরাং, যেকোনো নির্দেশনাকেই উত্তম নির্দেশনা বলা যায় না। একটি নির্দেশনাকে উত্তম নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করতে হলে ওপরের গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি থাকতে হবে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Improtance of Direction

ধরা যাক, একটি ট্রেন কোনো স্টেশনে থেমে আছে। যাত্রার সময়ও হয়ে গেছে। উক্ত স্টেশনের গার্ড বাঁশি বাজালেন বা সবুজ সংকেত দেখালেন। অতঃপর ট্রেনটি যাত্রা শুরু করল। আবার, অন্য আরেকটি দৃশ্যে একটি ফুটবল খেলার মাঠে দুই দল খেলোয়াড় প্রস্তুত। রেফারির বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে খেলা আরম্ভ হয়ে গেল। গার্ডের বাঁশি বাজানো বা সবুজ সংকেত দেখানো এবং রেফারির বাঁশি বাজানো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।

একইভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানের উপায়-উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও কর্মীদের সুসংগঠিত করা সত্ত্বেও সবকিছুই স্থির বলে মনে হবে যতক্ষণ না ব্যবস্থাপক নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনা পাওয়ার পরই প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। এ থেকেই অনুমান করা যায়, কোনো সংগঠিত কার্যক্রমে নির্দেশনাই মূলত গতির সঞ্চার করে। তাই, এটি হলো একটি প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। এটি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার কোনো কাজই নির্দেশনা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই মার্শাল ই. ডিমক (Marshall E. Dimok) নির্দেশনাকে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার হৃৎপিণ্ড বলে অভিহিত করেছেন। নিচে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরা হলো-

  • লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা (Help to achieve the goal): প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে সঠিক নির্দেশনা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের করণীয় কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানানো হয়। সঠিক নির্দেশনার ফলে প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে উদ্দেশ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এর সুবাদে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়। এভাবে নির্দেশনা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে।
  • পরিকল্পনা বাস্তবায়ন (Implementation of the plan): নির্দেশনার মাধ্যমে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। কোন কাজ কখন, কীভাবে সম্পাদন করতে হবে সে বিষয়ে ব্যবস্থাপকগণ কর্তৃক কর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। তাছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেয়েই কর্মীরা কাজ শুরু করেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্যই কর্মীরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে থাকেন। অর্থাৎ, এটি জারির পর সংগঠনের সব ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি হয়।
  • কর্মীদের সম্পর্ক ও মানোন্নয়ন (Development of relation and quality of the employees): কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ ও ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এভাবে, পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। অপরদিকে, নির্দেশনার অর্থ কেবল আদেশ দেওয়াই নয়। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে সঠিক দিকনির্দেশনা, পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা পেয়ে কর্মীদের কাজের মান ও দক্ষতা বাড়ে।
  • নেতৃত্বের বিকাশ (Development of leadership): কর্মীদের আচরণ কী হবে এবং কার কী দায়িত্ব তা নির্দিষ্ট
    করার ক্ষেত্রে নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার, নির্দেশনা দিতে গিয়ে কর্মীদের কীভাবে পরিচালনা করবে একজন নির্বাহী সে বিষয়টিও আয়ত্ত করতে পারেন। এভাবে প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। নির্দেশনা মূলত বাস্তবায়নসংক্রান্ত কাজ। সঠিক নির্দেশনার ওপর ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কাজ যেমন- পরিকল্পনা প্রণয়ন, সংগঠিতকরণ, কর্মীসংস্থান প্রভৃতির সাফল্য নির্ভর করে।
  • ঐক্য সৃষ্টি (Creation of unity): প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানে
    নিয়োজিত লোকবল ঐক্যবদ্ধ করে পরিচালনা করা। প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনার মান উন্নত হলে অধীনস্থ কর্মীরা একতাবদ্ধ হয়ে নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। তাই, প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা উত্তম হলে অধীনস্থদের ঐক্য ও সংঘবদ্ধতাও মজবুত হয়।
  • নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা (Establishing discipline): ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় থাকা জরুরি। নির্দেশনা উত্তম হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন। এ অবস্থায় কারও পক্ষে পথভ্রষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-শৃঙ্খলার বিরোধী কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না।
  • দক্ষতার উন্নয়ন (Development in efficiency): সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টার অপচয় না করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করার সামর্থ্যকে দক্ষতা বলে। নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় অধীনস্থদের করণীয় কাজ কীভাবে সহজে করতে পারে তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে কর্মীরা পরোক্ষভাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার প্রশিক্ষণ লাভ করেন। কার্যকর নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীরা কাজ সম্পাদনের উপায়, সঠিক সময় প্রভৃতি সম্পর্কে আগে থেকে জেনে থাকেন। ফলে তারা সুশৃঙ্খলভাবে ও নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন।
  • পরিচালনায় সহায়তা (Helping in operation): প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নির্দেশনা থাকলে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের
    মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সমঝোতা সৃষ্টি হয়। ফলে, প্রতিষ্ঠানে উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক তৈরি হয়। সঠিক নির্দেশনার ফলে কাজ সম্পাদনসংক্রান্ত খুঁটিনাটি সব বিষয়ে কর্মীদের জানা হয়ে যায়। এতে কর্মীরা নিয়মমাফিক কাজে সব সময় নিয়োজিত থাকেন। তাই, উর্ধ্বতন নির্বাহীদের পক্ষে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সহজ হয়।
  • সঠিক মূল্যায়ন ও সমন্বয় (Proper evaluation and coordination): প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এর কার্যাবলির মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করাও জরুরি। সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীদের কাজ সহজে মূল্যায়ন করা যায়। নির্দেশনার মাধ্যমে কর্মীদের দায়িত্ব কী ছিল ও তা কতটুকু পালন করা হয়েছে, তা জানা যায়। আবার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ ও কর্মীদের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন সহজ হয়।
  • কার্যকর নিয়ন্ত্রণ (Effective control): সঠিক নির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। এর মাধ্যমে
    অধীনস্থদের কাজে ভুল-ত্রুটির পরিমাণ কমে যায়। তাছাড়া, নির্বাহীরা সব সময় সচেতনভাবে খেয়াল রাখেন বলে কাজে বিচ্যুতি হলে তা সাথে সাথে ধরা পড়ে। ফলে, তা দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব হয়। এভাবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান (Proper supervision): নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় অধীনস্থদের কাজ লক্ষ্য অনুযায়ী ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হয়। আর নিয়মিত তদারকির ফলে কর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকেন। তাই, নির্দেশনার মাধ্যমে সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান করা সহজ হয়।
  • ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ (Ensuring continuity): নির্দেশনা হলো অবিরাম প্রক্রিয়া। লক্ষ্য অর্জনে প্রদত্ত
    নির্দেশনার কার্যকারিতা থাকতে থাকতেই পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে কাজের গতি বন্ধ হওয়া বা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এভাবে, কার্যপ্রবাহ তৈরির মাধ্যমে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা সহজ হয়।

উপসংহারে বলা যায়, নির্দেশনা হলো ব্যবস্থাপনার একটি প্রধান কাজ। এটি ছাড়া ব্যবস্থাপকীয় সব কর্মপ্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। তাই, ব্যবস্থাপককে তার অধীনস্থদের সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তা কার্যকর করতে হবে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Methods or Techniques of Direction

প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কর্মীদের মূল লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করা আবশ্যক। আর এজন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু, কার্যকর ও সময়োপযোগী নির্দেশনা। কার্যকরভাবে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য যেসব পদ্ধতি বা কৌশল অবলম্বন করা হয়ে থাকে তা হলো-

  • আদর্শ বা নির্ধারিত নির্দেশনা (Standard or fixed direction): যে নির্দেশনা আগেই নির্ধারণ করা থাকে এবং
    প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থরা বারবার তা অনুসরণ করেন, তাকে আদর্শ নির্দেশনা পদ্ধতি বলে। প্রতিষ্ঠানের কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদর্শ নির্দেশনা দেওয়া থাকে। বিভিন্ন ধরনের অবস্থা মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় উল্লিখিত অবস্থা পুনরায় সৃষ্টি হলেই কর্মীরা নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ করে থাকেন।
  • তত্ত্বাবধায়নমূলক নির্দেশনা (Supervisory direction): যে নির্দেশনায় নেতা সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাজ
    দেখাশোনা করে অধীনস্থদের পরামর্শ দেন ও কাজ করিয়ে নেন, তাকে তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে নির্দেশনা বলে। এক্ষেত্রে কোনো ভুল হলে তা সাথে সাথেই শুধরে দেওয়া যায়। সাধারণত প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার, শাখা ব্যবস্থাপক, ফোরম্যান প্রভৃতি নিম্ন স্তরের ব্যবস্থাপকরা তত্ত্বাবধায়ক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
  • যোগাযোগভিত্তিক নির্দেশনা (Communicative direction): নেতা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা, সেমিনার, টেলিফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট, ই-মেইল, চিঠিপত্র প্রভৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে যে নির্দেশনা কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাকে যোগাযোগভিত্তিক নির্দেশনা বলে। এ ধরনের নির্দেশনার সাথে প্রতিষ্ঠানের সব স্তরের ব্যবস্থাপকরা জড়িত থাকেন। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশের ফলে এরূপ যোগাযোগ বর্তমানে কার্যকর ও সহজ হয়েছে।
  • নেতৃত্বভিত্তিক নির্দেশনা (Leadership oriented direction): নেতৃত্বের প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত নির্দেশনাকে নেতৃত্বভিত্তিক নির্দেশনা বলে। নেতৃত্বের প্রকৃতি অনুযায়ী এরূপ নির্দেশনা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যেমন-
  • স্বৈরাচারী নির্দেশনা (Autocratic direction): এক্ষেত্রে নেতা সব ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত রেখে অধীনস্থদের দিয়ে কাজ আদায়ে ভয়-ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করেন। এতে তিনি কোনো বিষয়ে অধীনস্থদের চিন্তা-ভাবনা, মতামত ও পরামর্শের গুরুত্ব দেন না। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এরূপ নির্দেশনাকে নিরুৎসাহিত করা হয়।
  • পিতৃসুলভ নির্দেশনা (Paternalistic direction): যে নির্দেশনায় নির্দেশদাতা বা ব্যবস্থাপক বাবার মতো স্নেহ-ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে প্রভাব সৃষ্টি করে অধীনস্থদের কাছ থেকে কাজ আদায় করেন, তাকে পিতৃসুলভ নির্দেশনা বলে। এক্ষেত্রে অধীনস্থরা নির্দেশদাতা বা ঊর্ধ্বতনের প্রতি অনেক বেশি আনুগত্যপরায়ণ থাকেন। ফলে, যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে অধীনস্থরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নির্দেশনা পালন করেন।
  • পরামর্শমূলক নির্দেশনা (Consultative direction): অধীনস্থদের সাথে আলাপ-আলোচনা বা পরামর্শ করে নির্দেশনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করাকে পরামর্শমূলক নির্দেশনা বলে। এ নির্দেশনায় অনুসারীদের অংশগ্রহণ থাকার কারণে তারা সহযোগিতামূলক মনোভাব পোষণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকেন। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এরূপ নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।।
  • মুক্ত বা লাগামহীন নির্দেশনা (Free-rein direction): লাগামহীন নির্দেশনা পদ্ধতিতে নির্বাহী অধীনস্থদের
    ওপর কোনো কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন না, বরং তাদের ওপরই কর্তব্য পালনের সব ভার দিয়ে নিজে কর্মবিমুখ থাকেন। নির্দেশদাতার এরূপ কর্মবিমুখতার কারণে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
  • কারণ ব্যাখ্যাকরণমূলক নির্দেশনা (Cause explainatory direction): যে পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপক বা নির্বাহী কাজ শুরুর আগেই অধীনস্থদের কাছে নির্দেশনার কারণ ব্যাখ্যা করেন, তাকে কারণ ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনা বলে। এতে অধীনস্থরা কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে এটি অনেক বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়।
  • একনায়কত্ব নির্দেশনা (Dictatorship direction): একনায়কত্ব নির্দেশনায় একজন নির্বাহীর আদেশ বা নির্দেশ তার অনুসারীরা বিনা বাক্যে মেনে চলতে বাধ্য থাকেন। এক্ষেত্রে নির্বাহীর একক সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। সামরিক ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। স্বেচ্ছাচারিতার প্রবণতা এক্ষেত্রে বেশি থাকে।
  • বিশেষ শিক্ষাদানমূলক নির্দেশনা (Special teaching direction): বিশেষ শিক্ষাদানমূলক নির্দেশনা অনুযায়ী
    অধীনস্থদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা ঊর্ধ্বতন সম্পর্কে সামান্যতম অসন্তোষ প্রকাশ বা দ্বিমত পোষণ না করেন। নির্বাহীরা ধীরে ধীরে এ কৌশলের সাহায্যে উদ্দেশ্য অর্জনে অধীনস্থদের আগ্রহী করে তোলেন। অধীনস্থরা এক্ষেত্রে অনেকটাই অন্ধভক্ত বা অন্ধ বিশ্বাসের পর্যায়ে চলে আসেন।

তাই বলা যায়, উপরিউক্ত বিভিন্ন পদ্ধতি বা কৌশল অবলম্বন করার মাধ্যমেই অধীনস্থদের নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। এগুলো থেকে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সাংগঠনিক সংস্কৃতি বিবেচনা করে নির্দেশনার পদ্ধতি নির্বাচন করতে হয়।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Concept of Consultative Direction

একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান এক মাসের মধ্যে পণ্য সরবরাহের একটি বড় ধরনের ফরমায়েশ পায়। উক্ত ফরমায়েশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে উক্ত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাপক মান নিয়ন্ত্রক ও যন্ত্র উপদেষ্টাকে সাথে নিয়ে উৎপাদন কর্মীদের সাথে আলোচনায় বসেন। ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের উপায়-উপকরণের পর্যাপ্ততা, কর্মীদের শক্তি-সামর্থ্য, প্রাপ্ত সময়, সুযোগ-সুবিধা, কার্য সম্পাদন কৌশল প্রভৃতি বিষয়ে সবার সাথে পরামর্শ করেন। উক্ত পরামর্শে সব কর্মী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের জন্য একমত হন। অতঃপর উক্ত পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মীদের নির্দেশনা দেন। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, কর্মীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে উৎফুল্লতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি তাদের কাজের ব্যাপারে তেমন কোনো তাগিদও দিতে হচ্ছে না।

উক্ত ঘটনায় যে ধরনের নির্দেশনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাকেই পরামর্শমূলক নির্দেশনা বলা হয়। যে পদ্ধতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দেওয়ার আগেই নির্দেশনার বিষয় বাস্তবায়ন কৌশল, সময়, সুবিধা-অসুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধীনস্থ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেন, তাকে পরামর্শমূলক নির্দেশনা বলে। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অধীন নির্দেশনা পদ্ধতি বা কৌশল হলো পরামর্শমূলক নির্দেশনা। এ পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষ নির্দেশ বাস্তবায়ন বা নির্দেশ পালনের সাথে যারা জড়িত, তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেন এবং তাদের গঠনমূলক চিন্তাধারা ও সুচিন্তিত মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এটি ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ প্রবাহ তৈরি করে। এক্ষেত্রে নির্দেশনা দেওয়ার আগে বা দেওয়ায় সময় নির্দেশনা পালন ও বাস্তবায়নকারীদের সাথে পরামর্শ করে নির্দেশনা দেন, তাই একে পরামর্শমূলক নির্দেশনা বলে। এ নির্দেশনা পদ্ধতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, নির্দেশনা রূপায়নে অধীনস্থদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এ প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক কর্মী তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত মতামত প্রকাশের সুযোগ পান। এর ফলে পরবর্তীকালে উক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাকে নতুন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

  • ডব্লিউ. এইচ. নিউম্যান (W. H. Newman) বলেন, 'Consultative direction carries the idea of explaining why an instruction is issued one major step further.' অর্থাৎ, 'পরামর্শমূলক নির্দেশনা এমন এক ধারণা যা ইস্যু করার আগে এর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়।'
  • নিউস্ট্রম এবং ডেভিস (Newstrom and Davis) বলেন, 'Consultative management is a system of
    management in which employees are encouraged to think about issues and contribute their own ideas before managerial decisions are made.' অর্থাৎ, 'পরামর্শমূলক ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কর্মীদেরকে সমস্যা সম্পর্কে ভাবতে এবং তাদের নিজস্ব ধারণা দিয়ে অবদান রাখতে উৎসাহিত করা হয়।'

অতএব, নির্দেশনা বাস্তবায়নে জড়িত কর্মীদের সাথে মতবিনিময় বা পরামর্শ করে নির্দেশনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে নির্দেশনা জারি করাকে পরামর্শমূলক নির্দেশনা বলে।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Importance of Consultative Direction

পরামর্শমূলক নির্দেশনা কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি বা কৌশল হিসেবে স্বীকৃত। একক ব্যক্তির অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, যা এ পদ্ধতির মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। নিচে পরামর্শমূলক নির্দেশনার গুরুত্ব উপস্থাপন করা হলো-

  • উৎসাহ ও মনোবল বৃদ্ধি (Increasing inspiration and morale): পরামর্শমূলক নির্দেশনায় নির্বাহীরা কর্মীদের সাথে পরামর্শ করে নির্দেশনার বিষয়বস্তু ঠিক করেন। এরূপ নির্দেশনাকে কর্মীরা নিজেদের প্রণীত বলে মনে করেন। ফলে, কর্মীরা আনন্দের সাথে তা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। তাছাড়া, নির্বাহীর সাথে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে কর্মীদের মনোবল বাড়ে এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
  • কর্মীদের মানোন্নয়ন (Development of employee standards): মূলত কর্মীরাই মাঠ পর্যায়ের কাজের সাথে সরাসরি জড়িত থাকেন। তাই তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নির্দেশনার বিষয়বস্তু প্রস্তুত করা হলে, তা বেশি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হয়ে থাকে। অপরদিকে নির্বাহীর সংস্পর্শে এসে এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করে অধীনস্থরা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারেন। এতে কর্মীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতার উন্নয়ন ঘটে।
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা (Establishing democracy): পরামর্শমূলক নির্দেশনার মাধ্যমে নির্বাহী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। এক্ষেত্রে নির্বাহী এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি কর্মীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন। এতে একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের বিলোপ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • সহযোগিতার উন্নয়ন (Developing cooperation): নির্বাহী ও অধীনস্থদের পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের কারণে উভয়ের মধ্যকার দূরত্ব কমে যায়। এতে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হয়। ফলে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া এরূপ নির্দেশনার মাধ্যমে নির্বাহীদের প্রতি অধীনস্থদের শ্রদ্ধাবোধ ও আনুগত্য তৈরি হয়। এতে তাদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হতে থাকে।
  • প্রশিক্ষণের সুযোগ (Training facility): জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জনে হাতেকলমে শিক্ষা নেওয়াকে প্রশিক্ষণ বলে। প্রক্রিয়াগত কারণে পরামর্শমূলক নির্দেশনায় কর্মীরা অভিজ্ঞ নির্বাহীদের সাথে মতবিনিময়ের সুযোগ পান। এর মাধ্যমে তারা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারেন এবং পরে তা আন্তরিকতার সাথে কাজে লাগান। ফলে, এ ধরনের নির্দেশনার মাধ্যমে সহজেই প্রশিক্ষণ কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
  • উৎপাদন বৃদ্ধি (Increasing production): পরামর্শমূলক নির্দেশনা দ্বারা কর্মীদের মনোভাব ইতিবাচক ও
    সহযোগিতামূলক হয়। ফলে তারা উৎপাদনে বেশি মনযোগী হন। অনুকূল মনোভাব ও উৎসাহ নিয়ে কর্মীরা কাজ করায় তাদের উৎপাদন বাড়ে। তাছাড়া এরূপ নির্দেশনায় দক্ষতা বেড়ে যায়। ফলে কর্মসন্তুষ্টি ও উৎপাদন বেড়ে যায়।
  • সহজ নিয়ন্ত্রণ (Easy control): এরূপ নির্দেশনায় কর্মীরা আগে থেকেই মানসিকভাবে নির্দেশ পালনে প্রস্তুত থাকেন। সময়মতো কাজ শুরু করে তা দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ পান। এছাড়াও এতে ভুল-ত্রুটি কম হয় এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্মীরা অধিক অনুগত থাকেন। এতে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াও সহজ হয়।

তাই বলা যায়, পরামর্শমূলক নির্দেশনা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের মনোবল বাড়ানো, কর্মে উৎসাহ সৃষ্টি ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অর্জনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই, ক্ষেত্রবিশেষে এরূপ নির্দেশনার ব্যবহার বাড়ানো উচিত।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Advantages of Consultative Direction

আধুনিক ও সভ্য সমাজে মনে করা হয়, কর্মীরাও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাদেরও মতামত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরামর্শমূলক নির্দেশনার প্রচলন হয়েছে। এক্ষেত্রে কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে নির্দেশনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি উৎকৃষ্ট, যুগোপযোগী ও কার্যকর নির্দেশনা পদ্ধতি হিসেবে এর মাধ্যমে নিচের সুবিধাগুলো পাওয়া যায়-

  • কর্মীদের আগ্রহ তৈরি (Creating enthusiasm of employee): পরামর্শমূলক নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় অধীনস্থ কর্মীদের সুচিন্তিত পরামর্শ নেওয়া হয়। এতে কর্মীদের আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এরূপ সুযোগ থাকায় নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব, উদ্দীপনা ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায়।
  • পরিকল্পনার মানোন্নয়ন (Development of planning): পরামর্শমূলক নির্দেশনার মাধ্যমে নির্দেশনা তথা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে যারা এর সাথে সম্পৃক্ত তাদের সাথে পরামর্শ করা হয়। এর ফলে পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তা ধরা পড়ে। এভাবে পরিকল্পনার মান উন্নয়ন বা উৎকর্ষ সাধন করা যায়।
  • যোগাযোগের উন্নয়ন (Development of communication): এ পদ্ধতিতে নির্দেশনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ঊর্ধ্বতনও অধীনস্থদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। এতে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দেওয়া-নেওয়া ও মতবিনিময় হয়ে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
  • সম্পর্কোন্নয়ন (Development of relationship): পরামর্শমূলক নির্দেশনায় নির্বাহী ও অধীনস্থ সবাই একসাথে কাছাকাছি অবস্থানে থেকে আলোচনা করেন। এজন্য তাদের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বেড়ে যায়। তাছাড়া, ফলপ্রসূ যোগাযোগের কারণে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের মধ্যে দূরত্ব কমে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।
  • দক্ষতার উন্নয়ন (Development of efficiency): পরামর্শমূলক নির্দেশনা কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। এরূপ নির্দেশনায় নিজেদের অবদান রয়েছে বলে কর্মীরা এর সাফল্য নিশ্চিতকরণে নিজেদের সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহারের চেষ্টা করেন। এর ফলে তাদের দক্ষতা বাড়ে, যা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য অর্জনের দিকে নিয়ে যায়।
  • স্বেচ্ছাচারিতা হ্রাস (Reducing autocracy): এক্ষেত্রে নির্বাহীকে কর্মীদের সাথে পরামর্শ করে নির্দেশনার বিষয়বস্তু ও কাজ সম্পাদনের কৌশল-পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হয়। এতে অনেক সময় কর্মীদের মতামতকেই প্রাধান্য দিতে হয়। অর্থাৎ, এরূপ নির্দেশনার ফলে নির্বাহীদের একক ইচ্ছা অধীনস্থদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না
  • সহজ তত্ত্বাবধান (Easy supervision): কর্মীরা আগেই নির্দেশনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পান বলে কর্মীদের তত্ত্বাবধানে বেশি সময় ব্যয় করতে হয় না। আবার, কর্মীরা নির্দেশনার বিষয় সম্পর্কে আগে থেকে জানেন বলে কম সময়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারেন।
  • সহজ নিয়ন্ত্রণ (Easy to control): ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ বা আলোচনার মধ্য দিয়ে কর্মীরা কাজের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে জেনে যান। এতে পরবর্তী সময়ে কাজের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা কম থাকে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।

উপসংহারে বলা যায়, পরামর্শমূলক নির্দেশনা হলো একটি আধুনিক ও সফল নির্দেশনা পদ্ধতি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা সহজে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরামর্শমূলক নির্দেশনা অধিক কার্যকর।

 

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By

Limitations of Consultative Directions

পরামর্শমূলক নির্দেশনা একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হলেও এর বাস্তবায়নে বেশ কিছু জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। এজন্য এ ধরনের নির্দেশনা পদ্ধতি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে বা সব পরিস্থিতিতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সাধারণত এরূপ পদ্ধতিতে নিচের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়-

  • অবাধ্যতা সৃষ্টি (Creating insubordination): কর্মীদের অবাধ্য আচরণ প্রদর্শনের আশঙ্কা পরামর্শমূলক
    নির্দেশনার প্রধান অসুবিধা। নির্বাহীর সাথে আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগে তারা অনেক সময় নিজেকে নির্বাহীর সমকক্ষ ভাবতে থাকেন। এমনকি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে তাদের অধিকার আছে- এমন ধারণাও তারা পোষণ করতে পারেন। এ অবস্থায় নির্দেশনা বাস্তবায়নে বা পরিবর্তনে সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
  • সময় অপচয় (Waste of time): এটি একটি সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি। এতে ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থদের মধ্যে আলোচনায় অনেক সময় ব্যয় হয় অথবা দীর্ঘ আলোচনার পরও বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়। এতে নির্দেশনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে অযথা সময় ব্যয় হয়।
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা (Complexity in decision making): অনেক সময় অধীনস্থদের সাথে আলাপ-
    আলোচনার ক্ষেত্রে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের অবতারণা হয়ে থাকে। এর ফলে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং নির্দেশনা প্রক্রিয়াও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  • বিরূপ ধারণা (Adverse assumptions): পরামর্শমূলক নির্দেশনা অবলম্বনের ফলে কর্মীরা অনেক সময় নির্বাহীকে অদক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ তারা মনে করেন, নির্বাহীর দক্ষতার অভাব বলেই অধীনস্থদের সাথে আলোচনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এরূপ মানসিকতা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের পরিবেশকে নষ্ট করে দিতে পারে।
  • অধীনস্থদের অযোগ্যতা (Inefficiency of subordinates): অধীনস্থদের অযোগ্যতা বা অদক্ষতা পরামর্শমূলক
    নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যে বিষয়ে অধীনস্থদের সাথে আলোচনা করা হয়, সে বিষয়ে সব ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান বা চিন্তার গভীরতা থাকে না। ফলে তাদের কাছ থেকে সব সময় গঠনমূলক পরামর্শ পাওয়া যায় না। আবার, তাদের পরামর্শ পুরোপুরি উপেক্ষা করাও সম্ভব হয় না।
  • ব্যয়বহুল (Costly): পরামর্শমূলক নির্দেশনা মূলত একটি ব্যয়বহুল পদ্ধতি। এক্ষেত্রে আলোচনা সভা আহ্বান, সভা পরিচালনা প্রভৃতির জন্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যায়। বিভিন্ন পর্যায়ে আপ্যায়ন, সম্মানী দেওয়া ও অনেক সময় ব্যয় হয়। এতে সার্বিক ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে, অর্জনের চেয়ে খরচ বেশি হতে পারে।
  • তথ্য ফাঁস (Leakage of information): পরামর্শমূলক নির্দেশনার প্রক্রিয়াগত কারণে প্রতিষ্ঠানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। এভাবে কারও অসৎ উদ্দেশ্য বা অসতর্কতার কারণে প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতিযোগীদের কাছে প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
  • বাস্তবায়নে বিলম্ব (Delay in implementation): পরামর্শের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়ার আগে কর্মীদের উদ্দেশ্যে নির্দেশপত্র প্রণয়ন করতে হয়। এছাড়া প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান, প্রয়োজনে সংশোধনী আনা প্রভৃতি কাজের জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করতে হয়। এর ফলে নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতেই অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব হয়।

সুতরাং বলা যায়, পরামর্শমূলক নির্দেশনা বাহ্যিকভাবে সহজ, সুন্দর ও কার্যকর বলে মনে হলেও এর সফল বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। তাই এ ধরনের নির্দেশনা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহীকে অনেক বেশি কৌশলী হতে হয়।

 নেতৃত্ব - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...