ব্যবসায় যোগাযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) ব্যবহার (৮.১৭)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

12

Use of Information and Communication Technology (ICT) in Business Communication

আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় কার্যক্রম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদারের মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বৃহদায়তনের গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা বহুজাতিক কোম্পানির (MNCs) ওয়েবসাইট, ভিডিও কনফারেন্স বা মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার সবই আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আশীর্বাদ। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বা মাধ্যমকে নিম্নোক্ত ছকের সাহায্যে প্রকাশ করা যায়-

ক. আইসিটি-এর মৌখিক যোগাযোগ মাধ্যম (Oral Communication Medium of ICT)
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের মৌখিক যোগাযোগ সংঘটিত হয়। এ মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো হলো-

  • টেলিকনফারেন্সিং (Teleconferencing): টেলিকনফারেন্সিং ব্যবস্থায় টেলিফোনে একাধিক সংযোগ স্থাপন করার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত লোকজনকে সভায় যোগদান ও মতামত বিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক নির্দিষ্ট বিষয়ে টেলিফোনের মাধ্যমে এরূপ আলাপ-আলোচনা বা মতামত বিনিময় কনফারেন্সে রূপ লাভ করে। এতে একসাথে বহুসংখ্যক মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়।
  • ভিডিও কনফারেন্সিং (Video conferencing): ভিডিও কনফারেন্সিংও এক ধরনের টেলিকনফারেন্সিং ব্যবস্থা।
    এখানে টেলিভিশন বা মনিটরের পর্দায় কনফারেন্স বা মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা পরস্পরের মুখোমুখি হন ও কথোপকথনে অংশ নেন। এ ব্যবস্থায় টেলিফোন লাইনের সাহায্যে ইমেজ ট্রান্সমিট প্রক্রিয়ায় মনিটর বা টেলিভিশনের পর্দায় যোগাযোগে অংশগ্রহণকারীদের ছবি দেখানো হয়।
  • ওয়েব ক্যামেরা (Web camera): ওয়েব ক্যামেরা বলতে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত এক
    ধরনের ডিজিটাল সম্মুখমুখী (Front-facing) ক্যামেরাকে বোঝায়। এ ধরনের ক্যামেরার সাহায্যে বার্তা প্রেরক ও প্রাপক উভয়ই জীবন্ত ছবি দেখার মাধ্যমে কথা-বার্তা বলতে পারেন। এছাড়া এর সাহায্যে ছবি (Image) ও ভিডিও চিত্র আপলোড, ডাউনলোড করে আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ করা যায়।
  • মাল্টিমিডিয়া (Multimedia): মাল্টিমিডিয়া বলতে বহুবিধ মিডিয়া বা মাধ্যমের সমন্বিত প্রযুক্তিকে বোঝায়। এ প্রযুক্তির মধ্যে লিখিত শব্দ, চিত্র (Image), জীবন্ত ছবি (Animation), অডিও, ভিডিও প্রভৃতি প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকে। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষাণীয় বিষয় সহজে বোঝাতে মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়
  • মোবাইল ফোন (Mobile phone): টেলিফোনের আরেকটি জনপ্রিয় ও আধুনিক সংস্কার হলো মুঠোফোন, মোবাইল ফোন, সেল ফোন বা সেলুলার ফোন। তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমানে মোবাইলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্যাটেলাইট পদ্ধতিতে তারবিহীন ব্যবস্থায় যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। এ ফোনের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর সাথে তারের কোনো সংযোগ থাকে না। এতে ফোন সেটকে সব সময় সাথে নিয়ে চলাচল করা যায়। কথা বলা বা তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও ভিডিও কনফারেন্স রেকর্ডিং, সংক্ষিপ্ত বার্তা বিনিময়, গান শোনা, ইন্টারনেট, রেডিও ও টেলিভিশনের বিকল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে মোবাইলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।
  • দূরালাপনী বা টেলিফোন (Telephone): টেলিফোন বা দূরালাপনীর সাহায্যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোর এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এবং উচ্চ স্তর ও নিম্ন স্তরে সহজে ও দ্রুততার সাথে তথ্য বা সংবাদ বিনিময় করা যায়। একইভাবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও টেলিফোনের ব্যাপক ব্যবহার হয়। এতে স্থানগত দূরত্ব অভাবনীয় মাত্রায় কমেছে।
  • ভয়েস মেইল (Voice mail): যান্ত্রিক উপায়ে মানুষের কণ্ঠস্বর হুবহু ধারণ ও প্রেরণ করার প্রক্রিয়াকে ভয়েস মেইল বলে। এ পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার চিপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে তথ্য প্রেরণকারীর কন্ঠস্বরকে ডিজিটাল কোডে রূপান্তর করে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সংরক্ষণকৃত তথ্য গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়। গ্রাহক তার সুবিধাজনক সময়ে মেইল বক্সে ডায়াল করে প্রেরিত তথ্য শুনতে পারে।
  • দূরদর্শন বা টেলিভিশন (Television): টেলিভিশন বা দূরদর্শনের মাধ্যমে স্থির বা গতিশীল ইমেজ এবং শব্দকে বার্তা গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়। এরপর এটি পর্দায় বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে পুনরায় উৎপন্ন হয়। এক্ষেত্রে সংবাদ গ্রাহক সংবাদ প্রেরকের বার্তা শোনার পাশাপাশি তাকে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে দেখতেও পারেন।
  • বেতার বা রেডিও (Radio): তারবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ম্যাগনেটিক তরঙ্গকে শব্দে রূপান্তর করা হয়। বেতারের মাধ্যমে বার্তা গ্রাহক বার্তা প্রেরকের সংবাদ বা বার্তা শুনে থাকে। কিন্তু গ্রাহক কোনো প্রতিক্রিয়া (Reply) দিতে পারে না। অসংখ্য প্রাপকের সাথে এর মাধ্যমে এক সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
  • টেলিগ্রাম (Telegram): লিখিত যোগাযোগের বার্তা অনেক সময় জরুরি ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বার্তা গ্রাহকের কাছে প্রেরণের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বার্তার বিষয়বস্তু টেলিগ্রাম আকারে টেলিগ্রাফ অফিসের মাধমে প্রেরণ করা হয়। ব্যয়বহুল ও প্রাচীন এ পদ্ধতির মাধ্যমে বার্তার বিষয়বস্তু অতি সংক্ষেপে লিখতে হয়। তবে আধুনিক ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ও ফোনের জগতে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে।

খ. আইসিটি-এর লিখিত যোগাযোগ মাধ্যম (Written Communication Medium of ICT)
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহারের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের লিখিত যোগাযোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অনেক মাধ্যম ব্যবহৃত হয়, যা নিচে আলোচনা করা হলো-

  • সামাজিক সাইট (Social site): যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে একটি সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করা হয়, তাকে সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট বলে। এখানে যেকোনো ব্যক্তি সদস্য বা বন্ধু হয়ে তার ধ্যান-ধারণা, মতামত, কাজ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। যেমন: ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস।
  • ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং (Instant messaging): ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং বা চ্যাটিং (Chatting) হলো এক ধরনের
    তাৎক্ষণিক (Real time) ও লিখিত বার্তানির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের মতামত বা তথ্য একে অপরকে জানিয়ে থাকে।
  • ব্লগ (Blog): ব্লগ হলো ওয়েবসাইটের একটি পেজ যেখানে সমসাময়িক নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে যেকোনো ব্যক্তি তার মতামত ও হালনাগাদ (Updated) তথ্য দিয়ে থাকে। যেমন: ক্লাসে লেখালেখি করে অনেক ব্যক্তি তাদের মতামত ও ধ্যান-ধারণা প্রচার করে থাকে।
  • ই-মেইল (E-mail): ই-মেইল অর্থ ইলেকট্রনিক মেইল (Electronic Mail)। এ ব্যবস্থায় কম্পিউটারের সহায়তায় বিশ্বের যেকোনো স্থানে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চিঠিপত্র, ছবি, ভিডিও-অডিও প্রভৃতি আদান-প্রদান করা যায়। এটি ব্যবহারের জন্য কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ই-মেইল ঠিকানার প্রয়োজন হয় (যেমন: sarif7kira@yahoo.com, hazrat@dcc.edu.bd)। কোনো সংবাদ বা তথ্য পাঠাতে হলে তা টাইপ করে ঐ যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপকের ই-মেইল ঠিকানায় প্রেরণ করা হয় এবং মুহূর্তেই তা পৌঁছে যায়।
  • ওয়েবসাইট (Website): ওয়েবসাইট হলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অসংখ্য ওয়েব পেজের সম্মিলন, যা বিভিন্ন ধরনের নথি (File), দলিল (Document), চিত্র (Image), অডিও-ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদ ধারণ করে থাকে। এসব তথ্যভাণ্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। সংবাদ গ্রাহক তার প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যবহার করে ওয়েবসাইট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময় করে থাকেন।
  • ইন্টারনেট (Internet): ইন্টারনেট হলো বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমষ্টি; যা কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন বা স্যাটেলাইট এবং রেডিও সংযোগ ব্যবহার করে পরস্পর সংযুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রেরণ সহজেই করা যায়।
  • ইন্ট্রানেট (Intranet): ইন্ট্রানেট হলো ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি কৌশল। এর মাধ্যমে কোনো সংগঠনের মধ্যেই তথ্য আদান-প্রদান এবং নেটওয়ার্ক অপারেটিং সীমাবদ্ধ রাখা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রয়োজনে ইন্টানেট তৈরি করে থাকে।
  • এক্সট্রানেট (Extranet): এক্সট্রানেটও ইন্টারনেট প্রযুক্তির একটি বিশেষ কৌশল এবং ইন্ট্রানেট প্রযুক্তির একটি বর্ধিত রূপ। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায় ও শিক্ষাসংক্রান্ত উদ্দেশ্যে নিজস্ব সাইটে প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। এতে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
  • ফ্যাক্স (Fax): ফ্যাক্স (Fax) শব্দটি ইংরেজি ফ্যাক্সিমিলি (Facsimile) শব্দ থেকে এসেছে। ফ্যাক্স হলো এক ধরনের ইলেকট্রিক টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্র। এ যন্ত্রের সাহায্যে স্ক্যানকৃত (Scanned) ও প্রিন্ট করা কোনো সংবাদ, তথ্য, চিত্র, নকশা, চার্ট, ফর্মুলা প্রভৃতি হুবহু সহজে ও নির্ভুলভাবে মুহূর্তের মধ্যে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো যায়। এক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য বা সংবাদের আদান-প্রদান হয়ে থাকে।
  • টেলেক্স (Telex): টেলেক্সের মাধ্যমে সংবাদ বা তথ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো যায়। এ যন্ত্রে কী-বোর্ড থাকে। সংবাদ প্রেরক ব্যবসায়সংক্রান্ত বা অন্য কোনো সংবাদ এ যন্ত্রে টাইপ মেশিনের মতো টাইপ করে মুদ্রিত আকারে প্রাপকের কাছে সাথে সাথে পৌঁছাতে পারেন। টেলেক্স যন্ত্রে প্রেরক যে সংবাদ বা তথ্য টাইপ করবেন, হুবহু মুদ্রিত লেখা একই সময়ে প্রাপকের যন্ত্রেও মুদ্রিত হবে। প্রাপকের যন্ত্রে প্রেরিত সংবাদ পৌছেছে কি না, তা-ও উক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে বোঝা যায়।

অতএব, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যোগাযোগ ক্ষেত্রে আইসিটির বহুবিধ ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। এর উন্নয়ন ও বিকাশের সাথে যোগাযোগের পরিধি ও ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...