মাসলোর প্রেষণা তত্ত্ব (৭.৭)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

11

Motivation Theory of Maslow

অধ্যাপক আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলো (Abraham Harold Maslow) আমেরিকার একজন বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী এবং 'মানবীয় সম্পর্ক আন্দোলন' (Human Relation Movement) এর অন্যতম সংগঠক। তিনি প্রেষণা দানের একটি তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। এটি মাসলো'র চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Maslow's Need Hierarchy Theory) নামে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করে। নিচের দু'টি নীতির ওপর মাসলো'র তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত –

১. মানুষের চাহিদাগুলোকে গুরুত্বের ভিত্তিতে সাজানো যায়।

২. একটি অভাব পূরণ হয়ে গেলে নতুন আরেকটি অভাব পূরণের প্রয়োজন হয়।

১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে 'A Theory of Human Motivation' নামক গ্রন্থে তিনি চাহিদা সোপান তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। তার তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো-

  • প্রেষণার বিষয়টি মানুষের অভাব তথা চাহিদা পূরণের সাথে সম্পৃক্ত।
  • মানুষের পাঁচ স্তরের অভাব আছে। এক স্তরের অভাব পূরণ হলেই আরেক স্তরের অভাব দেখা দেয়।
  • এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক অভাব পূরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিকে প্রেষণা দেওয়া সম্ভব।
  • পূরণ হয়েছে এমন অভাব নয় বরং অপূরণকৃত অভাব প্রেষণার ক্ষেত্রে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।

মাসলো চাহিদা স্তরের প্রথম দুই স্তরের অভাবকে নিম্ন স্তরের অভাব (Lower-order needs) এবং পরবর্তী তিন স্তরের অভাবকে উচ্চ স্তরের অভাব (Higher-order needs) বলেছেন।

মানুষের অভাব অপরিসীম। এ অভাবের প্রকৃতি এতটাই বিচিত্র যে তা সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাসলো তাঁর গবেষণার মাধ্যমে মানবজীবনের অভাবগুলোকে প্রকৃতির ভিত্তিতে প্রধান পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো-জৈবিক চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা, সামাজিক চাহিদা, আত্মমর্যাদার চাহিদা ও আত্মপূর্ণতার চাহিদা। মাসলো মনে করেন, মানুষের জীবনে এ অভাবগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে দেখা দেয়। একটি অভাব পূরণ হওয়ার পর আরেকটি অভাব এসে উপস্থিত হয়। এ অভাবগুলো ধারাবাহিকভাবে মেটানোর ওপর কর্মীর প্রেষণা নির্ভর করে।
এ প্রসঙ্গে মাসলোর মক্তব্য হলো, একজন ব্যক্তির কোনো এক স্তরের অভাব পূরণের পর তার অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্তরের অভাব পূরণের জন্য প্রেষণা পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্বটি নিচে চিত্রসহ বর্ণনা করা হলো-

১. জৈবিক চাহিদা (Physiological needs): মানুষের বেঁচে থাকা তথা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপকরণের চাহিদাগুলোকে একসাথে জৈবিক চাহিদা বলে। মাসলোর তত্ত্বে সর্বনিম্ন স্তরে জৈবিক চাহিদার অবস্থান, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদানের সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, বাসস্থান, আলো-বাতাস, বিশ্রাম প্রভৃতি জৈবিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মীর জৈবিক চাহিদা বলতে বোঝায় পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক, কাজের পাশাপাশি বিশ্রামের ব্যবস্থা, কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রভৃতি। কর্মীর এসব চাহিদা পূরণের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্রে তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে উৎসাহিত করা যায়।

ধরা যাক, জনাব শামস্ একজন বেকার যুবক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় সাধারণভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে জরুরি ভিত্তিতে তার চাকরি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তিনি এমন চাকরিকেই উপযোগী মনে করবেন; যার মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা প্রভৃতির সুব্যবস্থা হয়। এজন্য তাকে প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় এমন একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে তিনি জৈবিক চাহিদার পরিতৃপ্তি অনুভব করবেন।

২. নিরাপত্তার চাহিদা (Safety needs): জৈবিক চাহিদা পূরণের পর কর্মীর মধ্যে নিরাপত্তার চাহিদা দেখা দেয়। সব
ধরনের বিপদ-আপদ, ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন প্রকার হুমকি, ভয়-ভীতি, পেশাগত অসুস্থতা, রোগ-ব্যাধি প্রভৃতি থেকে দূরে থেকে চাকরির স্থায়িত্ব বিধানের প্রয়োজনীয়তা হলো নিরাপত্তামূলক চাহিদা। এজন্য কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা বিধান, বিমা সুবিধা দেওয়া, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা দেওয়া, ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানের সুযোগ তৈরি প্রভৃতির মাধ্যমে কর্মীদের উৎসাহিত করা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা যায়।
উদাহরণ হিসেবে বর্ণিত জনাব শামস্ত্রে বিষয় ধরা যাক। জৈবিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর তিনি তার চাকরির স্থায়িত্ব ও অন্যান্য আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভাবতে থাকবেন। তিনি আশা করবেন যেন দীর্ঘদিন চাকরিটি করতে পারেন, সহজে চাকরি না চলে যায়, ভবিষ্যতের কোনো প্রয়োজন বা দুর্ঘটনায় যেন আর্থিক সহায়তা পান, চাকরি শেষে যাতে গ্র্যাচুইটি/পেনশন সুবিধা পান প্রভৃতি। তার নিয়োগকর্তা তাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারলে তিনি চাকরি ক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ অনুভব করবেন। এতে তিনি আগের চেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন।

৩. সামাজিক চাহিদা (Social needs): সামাজিক চাহিদা বলতে সমাজে মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্ব, স্নেহ-মমতা, প্রীতি- ভালোবাসা প্রভৃতির চাহিদাকে বোঝায়। এ পর্যায়ে কর্মী তার পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন নির্বাহী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মিলেমিশে চলতে চায়। তাই সামাজিক অধিকার, সংঘবদ্ধতা, সহকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, বন্ধুত্ব, আন্তরিকতা প্রভৃতি সামাজিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। কর্মীদের এসব চাহিদা পূরণ না হলে তারা কাজের ক্ষেত্রে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। একপর্যায়ে তারা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে অসহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিবাদ ও নেতিবাচক আচরণ করে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনাব শামস্ তার জৈবিক ও নিরাপত্তার অভাব পূরণের পর নিজেকে বিভিন্ন সামাজিকতায় আবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা বোধ করবেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সংঘবদ্ধভাবে চলাফেরা করে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায়ে আগ্রহী হবেন। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উচিত হলো- দলবদ্ধভাবে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনার অনুশীলন ও সবার সাথে মেলামেশার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এতে জনাব শামস্ সঠিকভাবে কাজ করতে থাকবেন।

৪. আত্মতৃপ্তির চাহিদা (Esteem needs): সমাজে বসবাসরত বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও সহকর্মীদের
থেকে মান-মর্যাদা, সম্ভ্রম ও প্রতিপত্তি, খ্যাতি প্রভৃতির দিক দিয়ে নিজেকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আত্মতৃপ্তির চাহিদা বলে। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব অনুযায়ী ওপরে বর্ণিত তিন ধরনের চাহিদা পূরণের পর এ পর্যায়ে আত্মমর্যাদার চাহিদা দেখা দেয়। এ ধরনের চাহিদাকে আবার দু'ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
ক. আত্মমর্যাদার চাহিদা: আত্মবিশ্বাস অর্জন, স্বাধীনতা লাভ, সামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রকাশ, জ্ঞান অর্জন প্রভৃতির চাহিদা।
খ. সুখ্যাতিজনিত চাহিদা: প্রশংসা, স্বীকৃতি, পদমর্যাদা, সহকর্মীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন প্রভৃতির চাহিদা।
উল্লিখিত তিন স্তরের চাহিদা পূরণের পর, জনাব শামস্ত্রে সম্মান ও মর্যাদার চাহিদা পূরণের প্রয়োজন দেখা দেবে। তিনি তার কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিক স্বীকৃতি, মান-মর্যাদা, প্রতিপত্তি ও খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করবেন। এজন্য কর্তৃপক্ষকে তার যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তিনি আগ্রহের সাথে কাজে নিয়োজিত থাকেন।

৫. আত্মপ্রতিষ্ঠা/আত্মপূর্ণতার চাহিদা (Self actualization needs): কোনো ব্যক্তির সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী নিজস্ব ইচ্ছা সম্পূর্ণভাবে অর্জন, উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আত্মপূর্ণতার চাহিদা বলে। মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্বে এটি মানব চাহিদার সর্বশেষ বা সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থিত। এ পর্যায়ে উন্নীত ব্যক্তি সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়া, শিল্প-সাহিত্যে অবদান, সমাজসেবা প্রভৃতি কাজ করে। এর মাধ্যমে সে নিজের সৃজনশীলতা ও বিশেষ গুণের বিকাশ ঘটিয়ে অমরত্ব লাভে সচেষ্ট হয়। তাই আত্মপূর্ণতার চাহিদা ব্যক্তির সর্বোচ্চ বা সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ও যোগ্যতার সাথে সম্পৃক্ত, যা তাকে উত্তম মানুষ হতে সহায়তা করে। চাহিদার এ স্তরে কর্মীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ, উচ্চ মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ কাজ, ব্যক্তিক অগ্রগতির সুযোগ প্রভৃতির মাধ্যমে প্রেষণা দেওয়া যায়। বাস্তবে মানুষের এ স্তরের চাহিদা কখনও সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয় না।

প্রথম চার ধরনের চাহিদা পূরণের পর জনাব শামস্ সমাজে বা পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে চাইবেন। অর্থাৎ, এ পর্যায়ে তিনি অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করবেন। এ স্তরের চাহিদার কোনো শেষ নেই। এক্ষেত্রে কাজে আরও উৎসাহী করতে কর্তৃপক্ষকে জনাব শামস্ত্রে সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তার ব্যক্তিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়। তবে একটি পর্যায়ে জনাব শামসের চাহিদা নতুনভাবে সৃষ্টি হবে এবং তার এ স্তরের চাহিদা অপূর্ণই থেকে যাবে।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...