# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মি. চৌধুরী বড় ফ্যাশন হাউজের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। দেশে বিদেশে বিভিন্ন স্থানে তাদের শোরুম রয়েছে। তিনি ঢাকার অফিসে বসেই বিভিন্ন স্থানে শোরুম কর্মকর্তাদের সাথে সভা অনুষ্ঠান করেন।
মি. হক বড় ব্যবসায়ী। বিশ্বের বেশ কটি দেশে তার ব্যবসায় প্রসারিত। মাঝে মধ্যেই তিনি বিদেশস্থ শাখা ম্যানেজারদের সাথে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সভা অনুষ্ঠান করেন। তিনি এতে বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছেন।
Concept of Communication
জনাব মাহমুদ একটি ডিজিটাল ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান-এর ব্যবস্থাপক। তিনি ব্যবসায়িক পণ্য সরবরাহের জন্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছে সংবাদ পাঠালেন। তার চাহিদামাফিক উৎপাদক ও আমদানিকারকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য পাঠালেন। জনাব মাহমুদ উক্ত পণ্যসামগ্রী বুঝে নিয়ে সরবরাহকারীদের কৃতজ্ঞতা জানালেন। উক্ত ঘটনায় বর্ণিত সংবাদ বিনিময়ের কাজকেই যোগাযোগ বলে অভিহিত করা হয়।
যোগাযোগ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Communication', যা ল্যাটিন 'Communis' শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর অর্থ হলো- Common বা সাধারণ। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়, এ সাধারণ বা কমন বিষয়টি কী? এ সাধারণ বিষয়টি কোনো শব্দ, তথ্য, ধারণা, বিষয় বা অন্য কিছুও হতে পারে। তাই যোগাযোগ বলতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কোনো সাধারণ বিষয়, ধারণা বা তথ্য বিনিময় করাকে বোঝায়।
সমাজবদ্ধ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সময়ই মানুষ অন্যের সাথে কোনো না কোনো প্রয়োজনে নানাভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। অর্থাৎ, মানুষের সব কাজের সাথে যোগাযোগ জড়িত। প্রতিটি ক্ষেত্রে একের সাথে অন্যের তথ্য বা ভাবের এ আদান-প্রদানই হলো যোগাযোগ। এ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। অনেকে শুধু টেলিফোন করা বা চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করাকে যোগাযোগ মনে করে। প্রকৃতপক্ষে যেকোনো উপায়ে যেমন: মুখোমুখি কথা বলা, টেলিফোনে কথা বলা, ফ্যাক্স বা ই-মেইল করা প্রভৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। আবার হাসি-কান্না, আকার-ইঙ্গিত, ভাব-ভঙ্গি, চোখের ইশারা, স্পর্শ, শব্দ বা কাজের মাধ্যমেও যোগাযোগ হতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সসিসকো বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক হেইঞ্জ ওয়েরিচ (Heinz Weihrich) এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক হ্যারন্ড কুঞ্জ (Harold Koontz) এর মতে, 'Communication is the transfer of information from a sender to a receiver, with the information being understood by the receiver.' অর্থাৎ, 'সংবাদ প্রেরকের কাছ থেকে সংবাদ প্রাপকের কাছে প্রাপকের উপলব্ধিযোগ্য তথ্য প্রেরণকে যোগাযোগ বলে।'
- ডব্লিউ. এইচ. নিউম্যান ও অন্যদের (W. H. Newman and others) মতে, 'Communication is an exchange of facts, ideas, opinions or emotions by two or more persons,' অর্থাৎ, 'যোগাযোগ হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কোনো ঘটনা, ধারণা, মতামত বা আবেগের বিনিময়।'
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন (Prof. Mohiuddin) এর মতে, 'Communication is the process of exchanging mutually understood meaning of information, ideas or thoughts between people to attain a given purpose.' অর্থাৎ, 'নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে একাধিক লোকের মধ্যে তথ্য, ধারণা বা চিন্তা-ভাবনার বোধগম্য অর্থ পারস্পরিক বিনিময় করার প্রক্রিয়াকে যোগাযোগ বলে।'
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে যোগাযোগের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়-

- যোগাযোগ প্রক্রিয়া একাধিক পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হয়;
- এতে অর্থপূর্ণ তথ্য, সংবাদ বা ভাবের আদান-প্রদান হয়;
- এতে নির্দিষ্ট মাধ্যম ব্যবহার করা হয়;
- এতে তথ্য বা সংবাদ উভয়পক্ষের কাছে বোধগম্য হতে হয়;
- ফলপ্রসূ যোগাযোগে প্রাপক প্রেরককে ফলাবর্তন দিয়ে থাকে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
(Communication Process)
প্রেরক প্রাপকের কাছে বার্তা বা তথ্য প্রেরণের ক্ষেত্রে অনুসরণকৃত ধারাবাহিক ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত পদক্ষেপের সমষ্টিকে যোগাযোগ প্রক্রিয়া বলে। অর্থাৎ, যোগাযোগ প্রক্রিয়া হলো একাধিক পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য অতিক্রম করা নির্দিষ্ট কিছু ধাপের সমষ্টি। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মৌলিক উপাদান হলো তিনটি- প্রেরক, সংবাদ ও প্রাপক।
নিচে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার উপাদান ও পদক্ষেপগুলো চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

- প্রেরক (Sender): যোগাযোগ প্রক্রিয়ার প্রথম উপাদান হলো প্রেরক বা যোগাযোগকারী
(Communicator)। যে বা যারা তথ্য বা সংবাদ অন্য কারও কাছে পাঠিয়ে দেন, তাকে প্রেরক বলা হয়। অর্থাৎ, যিনি তথ্য প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে দেন, তিনিই প্রেরক। যোগাযোগ প্রক্রিয়া মূলত প্রেরকই শুরু করেন এবং বার্তা প্রেরণের উদ্যোগ নেন। - ধারণার উন্নয়ন (Developing idea): যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় প্রথম পদক্ষেপ হলো ধারণার উন্নয়ন। এক্ষেত্রে প্রেরক বা
যোগাযোগকারী কী বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করবে, তা ঠিক করতে হয়। প্রেরক কী বিষয়ে, কখন, কোথায়, কীভাবে যোগাযোগ করতে চায়, তার একটি রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তাই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার এ স্তরকে পরিকল্পনা স্তরও বলা যায়। - প্রেরণযোগ্য করে সাজানো (Encoding): এ পর্যায়ে বিষয়গুলো বোধগম্য করে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। এনকোডিং বলতে সংবাদ এমনভাবে সাজানোকে বোঝায়, যাতে প্রাপক সহজে তা বুঝতে পারে। প্রাপক সহজেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারার জন্য প্রেরককে বিভিন্ন শব্দ, সংকেত, প্রতীক বা কোডের সাহায্যে সুশৃঙ্খলভাবে ও সহজ ভাষায় প্রেরণ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রাপকের গ্রহণ ক্ষমতা বিবেচনা করতে হয়।
- সংবাদ/বার্তা (Message): যোগাযোগকারী বা প্রেরক যে বাচনিক বা অবাচনিক বিষয়বস্তু
সংবাদ/বার্তাপ্রাপককে পাঠায়, তাকে বার্তা বলে। মূলত প্রেরক তার বিভিন্ন ধারণা প্রেরণযোগ্য করে সাজানোর মাধ্যমে যা তৈরি হয়, তাকেই সংবাদ বা বার্তা বলে। সংবাদকে ঘিরেই পুরো যোগাযোগ প্রক্রিয়া অবর্তিত হয়। তাই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মূল উৎস হলো সংবাদ। - মাধ্যম নির্বাচন (Selecting media): বার্তা প্রেরণের জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয়,
মাধ্যমযে উপায় অবলম্বন করে সংবাদ পাঠানো হয় তাকে মাধ্যম বলে। সাধারণত মৌখিক কথাবার্তা, চিঠি, মোবাইল, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ই-মেইল, পত্র-পত্রিকা প্রভৃতি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া শব্দ, ধ্বনি, সংকেত, প্রতীক, চিহ্ন, প্রেরকের ভাবভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব, পদমর্যাদা, নীরবতা প্রভৃতিও মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যোগাযোগকারীকে সংবাদ প্রেরণের জন্য সুবিধাজনক এক বা একাধিক মাধ্যম বাছাই করে নিতে হয়। - সংবাদ প্রেরণ (Transmitting message): মাধ্যম নির্বাচন করার পর প্রেরণকারী উক্ত মাধ্যম ব্যবহার করে বার্তাটি প্রাপকের কাছে প্রেরণ করে। সংবাদ প্রেরণের পর প্রাপকের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসা পর্যন্ত যোগাযোগ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবে মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত সাথে সাথেই প্রতিক্রিয়া আসে।
- শোরগোল / গোলযোগ / বাধা (Noise / Barriers): ফলপ্রসু যোগাযোগে সংবাদ বা বার্তা প্রাপকের কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। যেমন: ভাষাগত সমস্যা, শিক্ষাগত সমস্যা, উচ্চ শব্দ, যান্ত্রিক ত্রুটি প্রভৃতি। যোগাযোগে এ বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সাধারণত অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে থাকে। সংবাদকারীর তথ্য প্রাপকের কাছে না পৌঁছালে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হয় না। তাই প্রাপক ও প্রেরক উভয়কেই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়।
- প্রাপক (Receiver): প্রেরক কর্তৃক প্রেরিত তথ্য বা সংবাদ যে বা যারা গ্রহণ করে, তাকে প্রাপক বা বার্তাগ্রাহক বলে। যেকোনো ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ, দল বা প্রতিষ্ঠান প্রাপক হতে পারে। সংবাদ প্রেরণের পরেই প্রেরকের কাজ শেষ হয় এবং প্রাপকের কাজ শুরু হয়।
- সংবাদ গ্রহণ (Receiving message): যোগাযোগকারী যে সংবাদ প্রেরণ করে তা প্রাপক গ্রহণ করে। অনেক সময় প্রেরিত বার্তা বা সংবাদ বিভিন্ন ধরনের উপাদানের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত, বিকৃত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সংবাদটি প্রাপক গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হয়।
- অর্থোদ্ধার করে সাজানো (Decoding): প্রাপক কর্তৃক গৃহীত সংবাদের মানসিক বিন্যাস, উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা করাকে ডিকোর্ডিং বলে। সংবাদ পাওয়ার পর প্রাপক নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংবাদ উপলব্ধি করে। অতঃপর প্রকৃত অর্থ বোঝার চেষ্টা করে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। অনেক সময় একাধিক প্রাপক একই সংবাদের অর্থ ভিন্নভাবে বুঝে থাকে। অর্থাৎ, ব্যক্তি বিশেষে এর পার্থক্য হয়ে থাকে।
- সাড়া দান (Response): প্রাপক তথ্য বা সংবাদের অর্থ উদ্ধার তথা অনুধাবন করার পর সাড়া (গ্রহণ বা বর্জন) দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। যদি বর্জন করে তাহলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। আর গ্রহণ করলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া চালু রাখে।
- ফলাবর্তন (Feedback): প্রাপক কর্তৃক প্রাপ্ত সংবাদের বিপরীতে দেওয়া প্রতিক্রিয়াকে ফলাবর্তন ফলাবর্তন বলে। অর্থাৎ, যোগাযোগকারী বা প্রেরকের সংবাদের বিপরীতে প্রাপকের (তাৎক্ষণিকভাবে বা পরবর্তীতে) প্রত্যুত্তর বা সাড়া (Response) দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ফলাবর্তন (Feedback) বলে। কার্যকর যোগাযোগে ফলাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাপ্ত সংবাদের বিপরীতে প্রাপকের প্রতিক্রিয়া বা সাড়া দেওয়া
প্রেরক প্রাপকের পাঠানো প্রত্যুত্তর বা মনোভাব জানতে পারলেই যোগাযোগের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। এছাড়া ফলাবর্তনের মাধ্যমে ফলপ্রসূ বা কার্যকর যোগাযোগ সম্পন্ন হয়। এভাবে যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় বা চলতে থাকে। যোগাযোগে তথ্য বা বার্তার এরূপ উভয়মুখী প্রবাহকে দ্বিমুখী যোগাযোগ (Two-way communication) বলে। যোগাযোগ একমুখী (One-way) হবে না দ্বিমুখী (Two-way) হবে, তাতে ফলাবর্তনই নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
তাই বলা যায়, দৈনন্দিন জীবনে সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই আমরা উল্লিখিত পদক্ষেপ অনুসরণ করে থাকি। সচেতনতার সাথে এ পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলে কার্যকর যোগাযোগ সম্ভব হবে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Importance of Business Communication
ব্যবসায় যোগাযোগের মাধ্যমে এক বা একাধিক পক্ষের সাথে ব্যবসায় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পারস্পরিক সংবাদ বা ভাবের আদান-প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন পক্ষের পাশাপাশি বাইরের দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি বা পক্ষের সাথে যোগাযোগ রেখে ব্যবসায় কাজ পরিচালনা করতে হয়। বিভিন্ন পক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সবার পারস্পরিক খোঁজ-খবর বা তথ্যের আদান-প্রদান ছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ের তথ্য বিনিময় বা খোঁজ-খবর নেওয়ার কাজটি যোগাযোগের মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ও সার্থকভাবে করা হয়ে থাকে। নিচে ব্যবসায় যোগাযোগের গুরুত্ব বা ভূমিকা আলোচনা করা হলো-
- তথ্যের আদান-প্রদান (Exchange of information): প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপাত্ত ও
তথ্যের প্রয়োজন হয়। এগুলো দেশের মধ্যকার বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিখ্যাত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। - পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (Formulating and execution of plan): কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও উপাত্ত প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ফলে সহজে ও সময়মতো আদর্শ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়। আবার যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সাহায্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কাছে প্রণীত পরিকল্পনা যথাসময়ে পাঠিয়ে তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
- সমন্বয়সাধন ও সহযোগিতা (Coordination and cooperation): সার্বিক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধনের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে সহজে কাজ সম্পাদনে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মতামত পরস্পরের সাথে বিনিময় করা হয়। এতে প্রত্যেকে প্রত্যেককে জানে এবং সবার মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
- সমস্যার সমাধান (Problem solving): প্রতিযোগিতাপূর্ণ জটিল ব্যবসায় ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সমস্যার উদ্ভব হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে তথ্যাবলি বিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সমস্যা সমাধানসহ কঠিন কাজকে সহজ করে তোলে।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision making): ব্যবসায়ের বিভিন্ন বিষয়ে একজন ব্যবসায়ীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরিবেশ পরিস্থিতি পরিবর্তনের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও প্রয়োজন দেখা দেয়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়িক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেই মূলত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এভাবে যোগাযোগ সিদ্ধান্ত নেওয়াকে সহজ করে তোলে।
- নির্দেশনা প্রদান (Giving Direction): একজন ব্যবস্থাপককে প্রতিনিয়ত আদেশ, উপদেশ বা অনুরোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের লক্ষ্য অনুসারে কাজ করার জন্য পরিচালনা করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে যোগাযোগের মাধ্যমেই কর্মীদের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করার জন্য আদেশ বা নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিনিয়ত যোগাযোগ ছাড়া কর্মীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করানো সম্ভব হয় না। তাই যোগাযোগকে নির্দেশনার প্রাণ বলা হয়।
- দক্ষতা বৃদ্ধি (Increasing efficiency): সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টার অপচয় না করে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করার
সামর্থ্যকে দক্ষতা বলা হয়। সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবসায়ে কাজের দক্ষতা বাড়ায়। যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মীদের সঠিকভাবে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং কর্মীরাও সঠিকভাবে কাজ বুঝে নিতে পারে। এতে দায়িত্ব নেওয়া, দেওয়া কিংবা দায়িত্ব পালন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, যা দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। - লেনদেনের সহজ নিষ্পত্তি (Easy settlement of transactions): ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতা বা সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যা ও জটিলতা দূর করার জন্য যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে অনেক লেনদেনেরই সহজ নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
- প্রচারণা ও বিক্রয় বৃদ্ধি (Increasing publicity and sales): যোগাযোগ ব্যবস্থা পণ্যদ্রব্যের গুণাগুণ সম্পর্কে
প্রচার করে পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান ও সেবা সম্পর্কে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। ফলে প্রচার ব্যবস্থা আছে এমন প্রতিষ্ঠানের পণ্য বেশি পরিমাণে বিক্রি হয়ে থাকে। - তথ্য অনুসন্ধান ও গবেষণা (Searching information and research): ব্যবসায়ের পণ্য উন্নয়ন, পরিকল্পনা
প্রণয়ন, প্রতিযোগিতা মোকাবেলা প্রভৃতি প্রয়োজনে ক্রেতাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এগুলো সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। ফলে তথ্য অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ও উন্নয়নের কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়। - কর্মীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (Education and training of employees): কর্মীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও কাজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। ব্যবসায়ের কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য নতুন ও পুরোনো কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এ কাজগুলো যোগাযোগ ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হয় না।
- কর্মীদের প্রেষণা দান (Motivating employees): কর্মীদের কাজের ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করতে হয়। এসব কাজে তাদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখতে হয় ও বিভিন্নভাবে কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হয়। ফলে কর্মীরা অনার্থিক প্রেষণা পেয়ে থাকে এক্ষেত্রে যোগাযোগ অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
- দ্বন্দ্বের অবসান (Removing conflict): ফলপ্রসূ যোগাযোগ ব্যবস্থা লেনদেন এবং ব্যবসায়ে জড়িত সবার পক্ষের মধ্যে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে। ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সুসম্পর্ক তৈরি হয়। এতে তাদের মধ্যকার অবিশ্বাস, ভুল-বোঝাবুঝি, দ্বন্দ্ব, বিরোধ প্রভৃতি দূর হয়।
- শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক (Labour-management relationship): প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে শ্রম বিরোধ দেখা দেয়। এতে শিল্পের সন্তোষজনক বা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। যোগাযোগের মাধ্যমে শ্রমিক সংঘ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তাই বলা হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সুসম্পর্ক তৈরিতে সহায়তা করে।
- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International relationship): দক্ষ ও ফলপ্রসূ যোগাযোগে ব্যবসায় কার্যক্রম জাতীয়
সীমারেখা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যোগাযোগের মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজে তথ্য বা সংবাদ বিনিময় করা যায়। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও রক্ষা করা সম্ভব হয়। ফলে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।
উপসংহারে বলা যায়, সব ধরনের ব্যবসায়িক কর্মপ্রচেষ্টা কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে কার্যকর যোগাযোগের ওপরই ব্যবসায়ের সফলতা নির্ভর করে। তাই সঠিকভাবে যোগাযোগ ছাড়া ব্যবসায়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Types of Business Communication
প্রতিষ্ঠানের আকার, কাজের প্রকৃতি, তথ্যের প্রবাহ, ব্যাপ্তি প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে যোগাযোগ বিভিন্ন ধরনের হয়। প্রাপকের কাছে বার্তা প্রেরণ করতে কোন ধরনের পদ্ধতি বা উপায় অবলম্বন করা হবে তা নির্ভর করে প্রেরকের প্রয়োজন ও ইচ্ছা এবং প্রতিষ্ঠানের ধরনের ওপর। নিচে ছকের সাহায্যে যোগাযোগের প্রকারভেদ দেখানো হলো-

ক. তথ্যপ্রবাহ অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication Based on Flow of Information)
প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন ও অধীনস্থ কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্য বা সংবাদ বিভিন্ন দিক থেকে প্রবাহিত হতে পারে। এ তথ্যের প্রবাহ অনুযায়ী যোগাযোগকে নিম্নোক্ত দু'ভাগে ভাগ করা যায়-
- উলম্ব যোগাযোগ (Vertical communication): সংগঠনের উচ্চ স্তর ও নিম্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে তথ্য প্রবাহের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হলে তাকে উলম্ব যোগাযোগ বলে। যেমন: মি. x একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ব্যবস্থাপক। তিনি তার বিভাগে পাঁচজন বিক্রয়কর্মী নিয়োগের জন্য মহাব্যবস্থাপক । এর কাছে একটি চাহিদাপত্র দেন। Y মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক Z কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এক্ষেত্রে X, Y ও Z এর মধ্যকার যোগাযোগকে উলম্ব যোগাযোগ বলা হয়। এটি নিম্নোক্ত তিনভাবে সংঘটিত হতে পারে-
- ঊর্ধ্বগামী যোগাযোগ (Upward communication): সংগঠনের অধীনস্থ কর্মীরা কোনো সংবাদ বা তথ্য নিয়ে
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে ঊর্ধ্বগামী যোগাযোগ বলে। সাধারণত তাদের মতামত, অভিযোগ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে থাকে। ওপরের উদাহরণে x এর চাহিদাপত্র Y এর কাছে দেওয়া হলো ঊর্ধ্বগামী যোগাযোগ। - নিম্নগামী যোগাযোগ (Downward communication): সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অধীনস্থ কর্মীদের নির্দেশ দান কিংবা কোনো তথ্য, সংবাদ বা অন্যান্য বিষয়ে যোগাযোগ করলে, তাকে নিম্নগামী যোগাযোগ বলে। সাধারণত এ ধরনের যোগাযোগই বেশি হয়ে থাকে। এতে জটিলতাও অনেক কমে যায়। ওপরের উদাহরণে Y প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য z কে যে নির্দেশ দিলেন, তা-ই নিম্নগামী যোগাযোগ।
- আড়াআড়ি বা কৌণিক যোগাযোগ (Cross/Diagonal communication): কর্তৃত্ব কাঠামো অনুসরণ না করে এক বিভাগের নির্বাহী বা কর্মী অন্য বিভাগের ভিন্ন স্তরের কোনো নির্বাহী বা কর্মীর (ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন) সাথে যোগাযোগ করলে তাকে আড়াআড়ি বা কৌণিক যোগাযোগ বলে। যেমন: মি. 'X' একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন ব্যবস্থাপক। অন্যদিকে মি. 'Y' একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। মি. 'X' ও মি. 'Y' এর মধ্যে সম্পাদিত যোগাযোগই হলো কৌণিক যোগাযোগ।
সমান্তরাল যোগাযোগ (Horizontal communication): সংগঠন কাঠামোর বিভিন্ন বিভাগে একই মর্যাদাভুক্ত বা স্তরের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের মধ্যে তথ্য বা সংবাদ বিনিময় হলে, তাকে সমান্তরাল যোগাযোগ বলে। যেমন: মি. 'X' একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। অন্যদিকে মি. 'Y' একই প্রতিষ্ঠানের বিপণন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। মি. 'X' ও মি. 'Y' এর মধ্যে সম্পাদিত যোগাযোগই হলো সমান্তরাল যোগাযোগ।
খ. আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication Based on Formality)
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে নিয়ম-নীতি ও সম্পর্কের ভিত্তিতেও যোগাযোগ হয়ে থাকে। আনুষ্ঠানিকতা বা সম্পর্ক অনুযায়ী যোগাযোগকে নিম্নোক্ত দু'ভাগে ভাগ করা যায়-
- আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ (Formal communication): প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ব্যবস্থাপত্র বা অফিসিয়াল নিয়ম-
কানুন, পদ্ধতি, আনুষ্ঠানিকতা প্রভৃতি অনুসরণ করে তথ্য বা বার্তা বিনিময় করাকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বলে।
যেমন: সাক্ষাৎকার, আবেদনপত্র, নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া প্রভৃতি। - অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ (Informal communication): প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকার নির্ধারিত নিয়ম-কানুন ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তথ্য বা বার্তা বিনিময় করাকে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বলে। যেমন: ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে আলাপ-আলোচনা, সব স্তরের কর্মীর একসাথে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, পাশাপাশি খেতে বসে খবর নেওয়া।
গ. মাধ্যম অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication Based on Media)
সংবাদ বা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে যোগাযোগকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়-
- শাব্দিক/বাচনিক যোগাযোগ (Verbal communication): প্রেরক প্রাপকের সাথে মৌখিক বা লিখিত শব্দ
ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে তাকে শাব্দিক বা বাচনিক যোগাযোগ বলে। বাচনিক যোগাযোগ নিম্নোক্ত দু'ধরনের হয়ে থাকে- - লিখিত যোগাযোগ (Written communication): যোগাযোগকারী বা বার্তা প্রেরক কোনো সংবাদ বা তথ্য প্রাপকের কাছে লিখিত কোনো মাধ্যমে প্রেরণ করলে, তা লিখিত যোগাযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন: চিঠি, প্রতিবেদন, বিজ্ঞপ্তি, সংবাদপত্র প্রভৃতি।
- মৌখিক যোগাযোগ (Oral communication): যোগাযোগকারী প্রাপকের সাথে কোনো তথ্য বা সংবাদ মৌখিকভাবে বা মৌখিক কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে যোগাযোগ করলে, তাকে মৌখিক বা ধ্বনিভিত্তিক যোগাযোগ বলে। যেমন: কথোপকথন, সরাসরি আলোচনা, বক্তৃতা, সভা, টেলিফোনে আলাপ প্রভৃতি।
- অবাচনিক/শব্দবহির্ভূত যোগাযোগ (Non-verbal communication): মৌখিক বা লিখিত কোনো ভাষা ব্যবহার না করে অঙ্গভঙ্গি, স্পর্শ, হাসি-কান্না, আকার-ইঙ্গিত, প্রতীক প্রভৃতি মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগ করাকে শব্দবহির্ভূত বা অবাচনিক যোগাযোগ বলে। এরূপ যোগাযোগ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যা নিম্নরূপ-
- মুখাবয়বের প্রকাশ (Facial expression): কথায় আছে, 'Face is the index of mind' অর্থাৎ, 'মুখাবয়ব বা
চেহারা মনের আয়না।' মানুষের মৌখিক অবয়বের গতি, অবস্থা বা সঞ্চালনের মাধ্যমে তার আবেগ, অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা, ভয়, ঘৃণা, আগ্রহ প্রভৃতি অবস্থা ফুটে ওঠে। - চক্ষু যোগাযোগ (Eye contact): যোগাযোগের ক্ষেত্রে চক্ষু যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ব্যক্তির তাকানোর ভঙ্গির মাধ্যমে তার অনুভূতি, উৎসাহ, শত্রুতা, আকর্ষণ প্রভৃতি প্রকাশ পায়।
- আকার-ইঙ্গিত (Gesture): আকার-ইঙ্গিত বলতে মানুষের হাত, পা, মাথা, বাহু প্রভৃতি দোলানো বা বিশেষ কায়দায় নাড়ানোকে বোঝায়। যেমন: দু'আঙ্গুলের 'V' চিহ্ন দ্বারা বিজয় বোঝানো হয়।
- অবয়ব ও পোশাক (Appearance and dress): অবয়ব ও পোশাক দ্বারা ব্যক্তির সাজসজ্জা ও পোশাক-পরিচ্ছদকে বোঝানো হয়। মানুষের পরিধেয় পোশাক, অলঙ্কারাদি প্রভৃতির মাধ্যমে সে কোন পেশার, তা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, অবয়ব ও পোশাক তার পরিচয়ের ঘোষণা দেয়।
- স্পর্শ (Touch): মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করার দ্বারাও বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ হয়। তবে এটি বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। আবার এ স্পর্শ সময়, অবস্থা বা বয়সের ওপর ভিত্তি করেও ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। যেমন: আলিঙ্গন বা জড়িয়ে ধরা, করমর্দন, আঘাত করা প্রভৃতি।
- নীরবতা (Silence): কথায় আছে, 'নীরবতা সম্মতির লক্ষণ'। মানুষের নীরবতা কোনো সংবাদের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বা নেতিবাচক অর্থ বহন করতে পারে। যেমন: শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের নীরবতার দ্বারা বোঝা যায়, তারা খুব মনোযোগের সাথে শিক্ষকের কথা শুনছে অথবা ক্লাসের বিষয়বস্তু কিছুই বুঝতে পারছে না।
- স্থান ও দূরত্ব (Place and distance): প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব ও স্থান যোগাযোগের ক্ষেত্রে। গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। যেমন: কারও আহ্বানে তার কাছে চলে আসায় একাত্মতা এবং দূরে চলে যাওয়ায় তার সাথে দ্বিমত পোষণ করা বোঝায়।
- শ্রবণ (Listening): অনেক সময় কথাবার্তা ও শব্দ শোনার দ্বারাও বিভিন্ন ধারণা বা অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন: রিংটোন, এলার্ম, হর্ন, কলেজের ঘণ্টা প্রভৃতি।
- স্বরতন্ত্রীয় ভাষা (Paralinguistic): স্বরতন্ত্রী সম্বন্ধীয় ভাষা বলতে মানুষের কণ্ঠের বা স্বরতন্ত্রের এমন সব শব্দকে বোঝায়, যা প্রকৃত ভাষা থেকে ভিন্ন। এসব শব্দ দ্বারাও ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন: চিৎকার, আর্তনাদ, গোঙানি, গুনগুন করা, হো হো করে হাসা বা অট্টহাসি দেওয়া প্রভৃতি।
- দৃশ্যমান যোগাযোগ (Visual communication): যোগাযোগের একটি আধুনিক পদ্ধতি হলো দৃশ্যমান
যোগাযোগ। এ ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান মাধ্যম বা কৌশল ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হয়। যেমন: মানচিত্র, গ্রাফ, স্লাইড, সংকেত প্রভৃতি। এর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বিষয় সহজেই উপস্থাপন করা যায়।
ঘ. ব্যাপ্তি অনুযায়ী যোগাযোগ (Communication Based on Wideness)
বিভিন্ন পক্ষের সাথে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যাপ্তি অনুযায়ী যোগাযোগকে নিম্নোক্ত দু'ভাগে বিভক্ত করা হয়-
- অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ (Internal communication): প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মরত বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে কোনো তথ্য বা সংবাদ বিনিময় হলে, তাকে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বলে।
- বাহ্যিক যোগাযোগ (External communication): প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাইরের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনো তথ্য বা সংবাদ বিনিময় করলে, তাকে বাহ্যিক যোগাযোগ বলে।
অন্যান্য যোগাযোগ (Other Communication Systems)
উল্লিখিত যোগাযোগ পদ্ধতি ছাড়াও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সচরাচর অন্য যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তা নিম্নরূপ-
গণযোগাযোগ (Mass communication): গণযোগাযোগ বলতে কোনো সংবাদ বা তথ্য নিদিষ্ট মাধ্যম ব্যবহার
করে বৃহৎ ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক ও বিক্ষিপ্ত শ্রোতামণ্ডলীর কাছে দ্রুত পৌছানোকে বোঝায়। এরূপ যোগাযোগে স্বল্প ও একই সময়ে এবং অল্প খরচে সবার কাছে বার্তা পৌছে যায়। এর প্রচলিত মাধ্যমগুলো হলো সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, চলচ্চিত্র প্রভৃতি। যেমন: ABC কোম্পানি সম্প্রতি একটি নতুন পণ্য উৎপাদন করে। তারা পণ্যটির প্রচারের জন্য টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেয়। ABC কোম্পানির এই বিজ্ঞাপন দেওয়াই হলো গণযোগাযোগ।
- ব্যক্তিগত যোগাযোগ (Personal communication): যোগাযোগকারী ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে অন্যান্য পক্ষের সাথে তথ্য বা সংবাদ বিনিময় করলে, তাকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বলে। এটি একক ব্যক্তির কোনো প্রয়োজনে করা হয়ে থাকে।
- আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ (Interpersonal communication): দুইজন স্বতন্ত্র ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক কোনো তথ্য, ধারণা বা অনুভূতি বিনিময় হলে, তাকে পারস্পরিক বা আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ বলে।
- অন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ (Intrapersonal communication): অন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ বলতে কোনো ব্যক্তি নিজের মনে মনেই কোনো তথ্য বা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, ধারণা, অনুভূতি, মূল্যায়ন প্রভৃতি করাকে বোঝায়। অনেক ক্ষেত্রে অবচেতনভাবেও এটি হয়ে থাকে।
- সাংগঠনিক যোগাযোগ (Organizational communication): প্রতিষ্ঠানকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য
অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন পক্ষের সাথে যে যোগাযোগ করা হয়, তাকে সাংগঠনিক যোগাযোগ বলে। সাধারণত দলিলপত্র প্রণয়ন, কাঠামোগত চিত্র নির্ধারণ, লক্ষ্য নির্ধারণ, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের যোগাযোগ করা হয়ে থাকে। যেমন; প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বিভাগের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বিক্রয় বাড়ানোর নতুন নির্দেশনা জারি করা। - প্রাত্যহিক যোগাযোগ (Routine communication): ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যাবলি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন তথ্য বা সংবাদ নিয়মিতভাবে অন্যান্য পক্ষের সাথে বিনিময় করা হলে, তাকে প্রাত্যহিক যোগাযোগ বলে। যেমন: নিয়মিত টেলিফোন করে খোঁজ-খবর নেওয়া, কাজের অগ্রগতি জানা, মেইল করা, শুভসকাল বা শুভ সন্ধ্যা লিখে মেসেজ পাঠানো।
- সামাজিক যোগাযোগ (Social media): ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক সাইট বা মাধ্যম ব্যবহার করে বন্ধুবান্ধব ও অন্যান্য লোকজনের সাথে যোগাযোগ করাকে সামাজিক যোগাযোগ বলে। যেমন: ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি।
সুতরাং, পরিবেশ-পরিস্থিতি, সময় প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে যোগাযোগ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যখন যে ধরনের যোগাযোগ বেশি উপযোগী তখন সে ধরনের যোগাযোগ পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of Written Communication
KY গ্রুপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আশিক মাহমুদ। তার অধীনস্থ মহাব্যবস্থাপকদের উদ্দেশ্যে তিনি পত্র ইস্যু করলেন। এতে তিনি নির্দেশ দিলেন যাতে সব মহাব্যবস্থাপক তাদের নিজ নিজ বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদাপত্র জমা দেন। উক্ত পত্র অনুযায়ী মহাব্যবস্থাপকগণ তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদাপত্র সঠিকভাবে লিখে প্রস্তুত করে জমা দিলেন। এরপর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেন। উক্ত ঘটনায় যে যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখা যায়, তাকে লিখিত যোগাযোগ বলা হয়।

শব্দ ও বাক্য লিখে মনের ভাব প্রকাশ ও তথ্য বিনিময় করা হলে, তকে লিখিত যোগাযোগ বলে। এ যোগাযোগের সংবাদ পাঠ না করে মূল বিষয়বস্তু উপলব্ধি করা যায় না। এক্ষেত্রে যোগাযোগের ভাষা বা শব্দ অর্থপূর্ণভাবে লিখে উপস্থাপন ও প্রকাশ করা হয়।লিখিত যোগাযোগের মাধ্যম বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন: চিঠি, পত্রিকা, প্রতিবেদন, পুস্তক, ই-মেইল, এসএমএস বা ক্ষুদেবার্তা, নোটিশ, ব্লগ। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লিখিত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর উদ্দেশ্য, নীতিমালা, পরিকল্পনা, বাজেট, দলিলপত্র, নির্দেশনা প্রভৃতি মূল্যবান বিষয় লিখিত হওয়াই উচিত। নির্বাহী কর্মকর্তারা আদেশ-নির্দেশ লিখিতভাবে অধীনস্থ কর্মচারীদের পাঠান এবং অধীনস্থ কর্মচারীরাও তাদের বিভিন্ন সমস্যা, অভাব-অভিযোগ, ইচ্ছা-অনুভূতি লিখিতভাবে ব্যবস্থাপকের কাছে পেশ করতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যায়-এর অধ্যাপক রিকি ডব্লিউ. গ্রিফিন (Ricky W. Griffin) এর মতে, 'Written communication is the message that is encoded and transmitted in written form.' অর্থাৎ, 'লিখিত যোগাযোগ হলো বার্তা যা প্রেরণযোগ্য করে সাজানো হয় এবং লিখিত আকারে প্রেরণ করা হয়।'
- বভি এবং তার সহযোগীদের (Bovee and his associates) এর মতে, 'Written communication is the expression of ideas through words that are meant to be read.' অর্থাৎ, 'পড়তে হয় এমন শব্দের মাধ্যমে ধারণার প্রকাশকে লিখিত যোগাযোগ বলে।'
- রাজেন্দ্র পাল (Rajendra Pal) এবং কোরলাহাল্লি (Korlahalli) এর মতে, 'Everything that has to be written and transmitted in the written form falls in the area of written communication.' অর্থাৎ, 'যা কিছু লিখিত এবং লিখিত আকারে প্রেরিত, সবকিছুই লিখিত যোগাযোগের অন্তর্ভুক্ত।'
- সি. বি. মেমোরিয়া (C. B. Memoria) এর মতে, 'A written communication is always put into writing and generally used when the audience is at a distance or when a permanency of record is required.' অর্থাৎ, 'লিখিত যোগাযোগ সব সময়ই লিখিত হয়ে থাকে এবং সাধারণত শ্রোতা যদি দূরবর্তী কোনো স্থানে অবস্থান করে বা যদি কোনো স্থায়ী রেকর্ডের প্রয়োজন পড়ে তখন এটি ব্যবহৃত হয়।'
অতএব, একাধিক পক্ষের মধ্যে কোনো সংবাদ বা তথ্যের বিনিময় লিখিত শব্দ ও বাক্য দ্বারা সম্পাদিত হলে তাকে লিখিত যোগাযোগ বলে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Advantages of Written Communication
বিভিন্ন পক্ষের সাথে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের অন্যতম হাতিয়ার তথা মাধ্যম হলো লিখিত যোগাযোগ। যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যবহার করা যায়। নিচে লিখিত। যোগাযোগের সুবিধাসমূহ উল্লেখ করা হলো-
- স্থায়ী দলিল (Permanent record): লিখিত যোগাযোগের বিষয়বস্তুর স্থায়ী রেকর্ড রাখা যায়। তাই, পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগণ প্রয়োজনবোধে এটি পুনরায় ব্যবহার করতে পারেন।
- আইনগত ভিত্তি (Legality): যোগাযোগের বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে এবং এ ব্যাপারে আদালতে প্রমাণ দাখিল করতে হলে লিখিত যোগাযোগই উত্তম। এ যোগাযোগের আইনগত ভিত্তি থাকে। তাই এর দ্বারা আইনগত সহায়তা পাওয়া যায়।
- গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability): লিখিত যোগাযোগের স্থায়ী রেকর্ড রাখা যায়। যে কেউ ইচ্ছা করলেই এর তথ্য বিকৃত করতে পারে না। এছাড়া আদালতে এটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যায়'। এজন্য অন্যান্য যোগাযোগ পদ্ধতির চেয়ে এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
- সূত্র হিসেবে ব্যবহার (Use as reference): লিখিত যোগাযোগের বিষয়বস্তু স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এজন্য ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে এটি সূত্র (Reference) হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
- বিকৃতি রোধ (Reduce distortion): এ পদ্ধতিতে যোগাযোগের তথ্যাবলি কাগজ-কলমে লিখিতভাবে থাকে। ফলে তথ্য বিকৃতির এবং ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা কমে যায়।
- ভুল-ত্রুটি মুক্ততা (Free from error): লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে যোগাযোগকারী চিন্তা-ভাবনা করে যোগাযোগের বিষয়বস্তু লিখে থাকেন। ফলে এতে ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা কম থাকে।
- অপচয় হ্রাস (Reduce wastage): লিখিত যোগাযোগ অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও সময়ের অহেতুক অপচয় রোধ করে। অর্থাৎ, এটি একান্ত প্রয়োজনের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। এজন্য সচেতন যোগাযোগকারী দূরবর্তী -স্থানের লোকজনের সাথে লিখিত পদ্ধতিতে যোগাযোগ করে থাকেন।
- সহজ কর্তৃত্বার্পণ (Easy to delegate authority): কতৃত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে লিখিত যোগাযোগ খুবই কার্যকর। এর সাহায্যে কর্মীর ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায়িত্বের পরিসীমা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়।
- বাহুল্য বর্জন (Reduce numerousness): লিখিত যোগাযোগে মৌখিক যোগাযোগের মতো বেশি কথা বলার
সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়াদি বাদ দিয়ে কেবল মূল বক্তব্য তুলে ধরা হয়, যা প্রাপকের জন্য খুবই সুবিধাজনক। এতে যোগাযোগের কার্যকারিতা অনেক বেড়ে যায়। - কর্মচারীদের সুবিধা (Advantages for employees): অধীনস্থ কর্মীরা বিভিন্ন কারণে তাদের অভাব-অভিযোগের কথা প্রধান নির্বাহীর সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের জন্য লিখিত যোগাযোগ সবচেয়ে সুবিধাজনক। এতে কর্মীদের প্রয়োজন সঠিকভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।
- কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ (Controlling the employees): অধস্তনদের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণে মৌখিক যোগাযোগের তুলনায় লিখিত যোগাযোগ বেশি কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন কর্মীকে মৌখিক ধমকের চেয়ে লিখিত নোটিশ দিলে তা বেশি কার্যকর হয়ে থাকে।
অতএব, উপরিউক্ত কারণে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে লিখিত যোগাযোগ সব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Disadvantages of Written Communication
লিখিত যোগাযোগের ব্যাপক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এটি সমস্যামুক্ত নয়। অর্থাৎ, এতে কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। নিচে এর অসুবিধাসমূহ আলোচনা করা হলো-
- অধিক ব্যয়বহুল (More expensive): লিখিত যোগাযোগে খরচ বেশি হয়। এরূপ যোগাযোগের জন্য কাগজ, কালি, কলম, কম্পিউটার, ফটোস্ট্যাট মেশিন প্রভৃতি ব্যবহার বাবদ প্রতিষ্ঠানকে প্রচুর খরচ করতে হয়। এজন্য লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় বেড়ে যায়।
- তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (Instantaneous response): লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানা যায় না। এজন্য তথ্যের প্রেরককে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ হয়ে থাকে।
- পরিবর্তনে সমস্যা (Problem in alteration): লিখিত যোগাযোগের বিষয়বস্তু কোনো কারণে পরিবর্তন করতে হলে সমস্যা হয়। কারণ, এর পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়।
- লালফিতার দৌরাত্ম্য (Red-tapism): লিখিত সংবাদ বা তথ্য সনাতন রীতি অনুযায়ী লালফিতায় অফিসে নথিবন্দি করে রাখাকে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বলে। অনেক সময় সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অবহেলা ও অতিরিক্ত সাংগঠনিক স্তরের কারণে তথ্য যথাসময়ে বার্তাগ্রাহকের কাছে পৌছায় না, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নামে পরিচিতি।
- নিরক্ষর লোকদের সমস্যা (Problem for illiterate person): নিরক্ষর লোকদের সাথে লিখিত যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। এ যোগাযোগের বিষয়বস্তু তাদের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। এছাড়া এরূপ ক্ষেত্রে তাদের অন্যের সাহায্য নিতে হয়।
- সময়সাপেক্ষ (Time consuming): লিখিত যোগাযোগ বাবদ প্রতিষ্ঠানকে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয়। কারণ, তথ্য লিখিত আকারে পৌঁছাতে হলে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- গতিশীলতার অভাব (Lack of dynamism): যোগাযোগের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য অনেক সময় প্রেরিত
তথ্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়। লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহজে দেওয়া যায় না। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং যোগাযোগের গতিশীলতা কমে যায়। - প্রত্যক্ষ সম্পর্কের অভাব (Lack of direct relation): অনেক ক্ষেত্রে লিখিত যোগাযোগে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। ফলে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে না।
- দীর্ঘসূত্রতা (Sluggishness): লিখিত যোগাযোগে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রবর্তিত আনুষ্ঠানিকতা কড়াকড়িভাবে মেনে চলতে হয়। এতে যোগাযোগে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয় এবং কাজে ধীরগতি চলে আসে।
তাই বলা যায়, লিখিত যোগাযোগের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এর বহুবিধ অসুবিধা দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টার মাধ্যমে লিখিত যোগাযোগে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে একে সর্বোচ্চ কার্যকর করা সম্ভব।
কোন কোন অবস্থায় লিখিত যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি কার্যকর?
লিখিত যোগাযোগ বিভিন্ন কারণে মৌখিক যোগাযোগ থেকে উত্তম। কোনো জটিল ও দীর্ঘ বিষয় জানানোর ক্ষেত্রে লিখিত যোগাযোগ বেশি কার্যকর হয়। কারণ, এর মাধ্যমে যোগাযোগকারীর প্রদত্ত বার্তা প্রাপক বারবার পড়ে অনুধাবন করার সুযোগ পান। এছাড়া স্থায়ী রেকর্ড সংরক্ষণ এবং ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে কোনো তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ যোগাযোগ উত্তম। আবার, কোনো সংবাদ বিভিন্ন ব্যক্তি, স্থান বা গোষ্ঠীর কাছে একইভাবে প্রেরণের প্রয়োজন হলে মৌখিক যোগাযোগের চেয়ে লিখিত যোগাযোগই উত্তম বলে বিবেচিত হয়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Medium of Written Communication
লিখিত যোগাযোগ বিভিন্ন মাধ্যমে সম্পাদিত হয়ে থাকে। উপযুক্ত মাধ্যম নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ধরন, অবস্থান, আকার-আয়তন এবং ব্যক্তির মর্যাদা, অবস্থান, সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ের ওপর। নিচে লিখিত যোগাযোগের মাধ্যমগুলো উল্লেখ করা হলো-

ক. ব্যবস্থাপনার জন্য লিখিত যোগাযোগ মাধ্যম (Medium of written communication for management) প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার জন্য লিখিত যোগাযোগের মাধ্যমসমূহ নিম্নরূপ-
- বিশেষ ব্যবস্থাপনা বুলেটিন (Special management bulletin): বিশেষ ব্যবস্থাপনা বুলেটিনের সাহায্যে
ব্যবস্থাপকগণ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগঠনের নিম্ন স্তরে পাঠান। এটি লিখিত হওয়ার কারণে তথ্য বিকৃতির সম্ভাবনা খুব কম থাকে। এতে সঠিক নির্দেশনা সব স্তরে পৌঁছানো সহজ হয়। - ব্যবস্থাপনা সংবাদপত্র (Management newsletter): ব্যবস্থাপনা সংবাদপত্রের মাধ্যমে এর বিভিন্ন স্তরে
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদেরকে সংগঠনের বিভিন্ন বিষয় জানানো হয়। এ সংবাদপত্র সাধারণত সাপ্তাহিক, পাক্ষিক অথবা মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়। - নীতিবিষয়ক বিবরণী (Statement of policy): ব্যবস্থাপনা নীতিবিষয়ক বিবরণী ব্যবস্থাপনার জন্য সাধারণভাবে ব্যবহৃত একটি লিখিত যোগাযোগ পদ্ধতি। শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এরূপ নীতি-পদ্ধতি প্রণয়ন করে তা লিখিত আকারে প্রকাশ করে। ফলে সংগঠনের সব ব্যবস্থাপক তা পড়ে সে অনুযায়ী কাজ করে থাকেন।
- প্রতিবেদন (Report): কোনো বিষয় বা ঘটনা সম্পর্কে পরিচালিত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রাপ্ত ফলাফলের বিবরণীকে প্রতিবেদন বলে। উচ্চ স্তরের ব্যবস্থাপনার কাছে বিভাগীয় ব্যবস্থাপকরা সম্পাদিত কাজের ওপর প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। এক্ষেত্রে সাধারণত নির্দিষ্ট সময় বা মেয়াদ দেখে প্রতিবেদন প্রণয়ন ও দাখিল করা হয়।
- বিশেষ প্রকাশনী (Special publication): অনেক সময় কোনো বিশেষ সংবাদ তত্ত্বাবধায়কদের জানানোর জন্য বিশেষ প্রকাশনা প্রকাশ করে। এ ধরনের সংবাদের মধ্যে খরচ কমানোর পদ্ধতি, পণ্য উন্নয়ন ধারণা, অপচয় কমানোর পদ্ধতি, দুর্ঘটনা কমানোর উপায়, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
- নির্দেশনা পুস্তিকা (Handbook): অনেক সময় তত্ত্বাবধায়করা নির্দেশনা পুস্তিকা ব্যবহার করেন। এ ধরনের পুস্তিকায় কোম্পানির নীতি, কাজের পদ্ধতি, বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি, কাজের পরিমাপ পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ থাকে। নির্দেশনা পুস্তিকায় সব বিষয় সংক্ষিপ্ত আকারে দেওয়া থাকে এবং কর্মীরা সব সময় সাথে রাখে।
খ. কর্মচারীদের জন্য লিখিত যোগাযোগ মাধ্যম (Written communication media for employees)
ব্যবস্থাপকদেরকে তাদের অধীনস্থ কর্মীদের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। কর্মচারীদের সাথে সাধারণভাবে ব্যবহৃত লিখিত যোগাযোগ পদ্ধতিগুলো নিম্নরূপ-
- কর্মীদের জন্য নির্দেশনা পুস্তিকা (Handbook for employee): প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় কর্মচারীদের জানানোর জন্য নির্দেশনা পুস্তিকা প্রয়োজনীয় একটি দলিল। এ দলিলে কোম্পানির ইতিহাস, সাংগঠনিক রীতি-নীতি, কর্মীদের সুবিধা প্রভৃতির উল্লেখ থাকে।
- পঠন তাক (Reading rack): অনেক সময় কর্মচারীদের পাঠের অভ্যাস বাড়াতে প্রতিষ্ঠানের সুবিধাজনক বিভিন্ন স্থানে পঠন তাক স্থাপন করা হয়। এটি বিভিন্ন প্রকার বই, সাময়িকী প্রভৃতি দ্বারা সাজানো হয়। বিরতির সময় কর্মচারীরা এসব বই-পুস্তক পড়ে বিনোদন ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।
- কর্মচারী সংবাদপত্র (Employee newsletter): প্রতিষ্ঠানের সাফল্য, নতুন প্রকল্প, কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা, কর্মীদের প্রবন্ধ ও গল্প প্রভৃতি বিষয় জানানোর জন্য কর্মচারী সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা সংবাদ আদান-প্রদান হয়ে যায়।
- বুলেটিন বোর্ড (Bulletin board): সাধারণত বুলেটিন বোর্ড প্রতিষ্ঠানের এমন স্থানে স্থাপন করা হয় যেখানে প্রতিনিয়ত কর্মীরা মিলিত হয়। এ বোর্ডে বদলি, পদোন্নতি, নতুন কার্যপদ্ধতি প্রভৃতি প্রদর্শিত হয়।
- বেতন খাম (Pay-roll envelop): অনেক সময় প্রতিষ্ঠান কর্মীদের খামে ভরে বেতনের টাকা পরিশোধ করে। বেতন খামে বেতনের হিসাব, বেতন কর্তন বা সংযোজন প্রভৃতি লিখিত আকারে কর্মীদের জানানো হয়।
- অভিযোগ ও পরামর্শ বাক্স (Complain and suggestion box): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের সুবিধাজনক স্থানে অভিযোগ ও পরামর্শ বাক্স রেখে দেওয়া হয়। কর্মচারীরা এ বাক্সে তাদের অভিযোগ, ক্ষোভ, জিজ্ঞাসা, পরামর্শ প্রভৃতি দাখিল করে থাকে। এভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানানো হয়।
- স্মারকপত্র (Memorandum): অনেক প্রতিষ্ঠান বার্ষিক বেতন বাড়ানো, ছুটি সংক্রান্ত শর্তাবলি, শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি, পদোন্নতি বা বদলির আদেশ, সভার বিজ্ঞপ্তি প্রভৃতি স্মারকপত্রের মাধ্যমে কর্মচারীদের জানিয়ে দেয়।
- অভ্যন্তরীণ সার্কুলার (Internal circular); প্রতিষ্ঠান কোনো জরুরি বিষয় বা ঘটনা সাথে সাথে কর্মীদের জানানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সার্কুলার ব্যবহার করে থাকে।
গ. বাইরের বিভিন্ন পক্ষের সাথে লিখিত যোগাযোগ মাধ্যম (Medium of written communication with various external parties)
সংগঠনের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বাইরের বিভিন্ন পক্ষ (ক্রেতা, সরবরাহকারী, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রভৃতি) এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাধ্যমগুলো নিম্নরূপ-
- সাইনবোর্ড (Signboard): সাইনবোর্ড বলতে নির্দিষ্ট কোনো দৃশ্যমান বোর্ডকে বোঝায়; যা কোনো চিহ্ন, বিজ্ঞপ্তি বা বিজ্ঞাপনকে ধারণ করে। সাধারণত এগুলো রাস্তার পাশের কোনো দেয়ালে, গাছে বা খুঁটিতে ঝুলানো থাকে।
- দৈনিক পত্রিকা (Daily newspaper): দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বা কলাম লিখে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা সম্পর্কিত বিষয়াদি অন্যান্য পক্ষকে জানানো যায়।
এছাড়া বাইরের বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগের জন্য সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক সাময়িকী, পোস্টার, নিয়ন সাইন, ব্যানার, ফেস্টুন, ভিজিটিং কার্ড, ডায়েরি প্রভৃতি লিখিত মাধ্যম ব্যবহার করা হয়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of Oral Communication
MT ম্যানুফ্যাকচারিং লি.-এর উৎপাদন ব্যবস্থাপক লক্ষ করলেন, তার বিভাগের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশ উদাসীন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতির কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবহেলাও করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি কর্মীদের নিয়ে একটি জরুরি সাধারণ সভার আয়োজন করলেন। এজন্য তার পিএস-কে নির্দেশ দিলেন সব কর্মীকে উক্ত সভার সময় ও স্থানের ব্যাপারে জানাতে। উক্ত পিএস প্রতিটি সেকশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করলেন। এরপর কর্মীরা উপস্থিত হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী নির্দেশনামূলক বক্তৃতা দেন এবং কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

উপরোক্ত ঘটনায় যে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে, তাকে মৌখিক যোগাযোগ বলা হয়। মৌখিক শব্দ ও ভাষার মাধ্যমে তথ্য বিনিময় ও মনের ভাব প্রকাশ করা হলে, তাকে মৌখিক যোগাযোগ বলে। এ যোগাযোগ সাধারণত সামনা-সামনি কথোপকথন, সভা, সাক্ষাৎকার, টেলিফোনে কথোপকথন প্রভৃতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সংবাদ প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সরাসরি তথ্য বিনিময় হয়। আধুনিক ব্যবসায় যোগাযোগের অধিকাংশই মৌখিকভাবে সংঘটিত হয়। এ পদ্ধতিতে যোগাযোগকারী বা বার্তা প্রেরক মৌখিক কথাবার্তা বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহীতা বা বার্তা প্রাপকের কাছে তার মনের ভাব, অনুভূতি, তথ্য বা সংবাদ প্রেরণ করে থাকে। আবার, গ্রহীতাও অনুরূপভাবে মৌখিক ভাষার মাধ্যমে প্রত্যুত্তর দেয়। এ যোগাযোগে মানুষের মুখের বচন বা কথাই হলো সংবাদের মূল বাহন। তাই একে বাচনিক যোগাযোগ নামেও অভিহিত করা হয়।
- বভি ও অন্যদের (Bovee and others) মতে, 'Oral communication expresses ideas through the spoken words.' অর্থাৎ, 'মৌখিক যোগাযোগ কথা বলার শব্দের মাধ্যমে ধারণা প্রকাশ করে থাকে।'
অতএব, দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে মৌখিক শব্দ ও ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ সংঘটিত হলে তাকে মৌখিক
যোগাযোগ বলে।
কোন কোন অবস্থায় মৌখিক যোগাযোগ বেশি কার্যকর?
মানুষ সব অবস্থায় এবং সব ক্ষেত্রে মৌখিক যোগাযোগের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে। প্রাপক বা শ্রোতা সামনা-সামনি উপস্থিত থাকলে এবং কোনো বিষয়ে অপর পক্ষের তাৎক্ষণিক জবাব পেতে আগ্রহী হলে, সেক্ষেত্রে মৌখিক যোগাযোগ বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। কারও সাথে দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে মৌখিক যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয়। বার্তা গ্রাহক বা শ্রোতার সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে মৌখিক যোগাযোগই উত্তম। প্রাপকের পড়া-লেখা জানা না থাকলে তার সাথে লিখিতভাবে যোগাযোগ করে কোনো সুফল পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে তথ্য বিনিময়ে মৌখিক যোগাযোগই উপযোগী পদ্ধতি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হলে এ যোগাযোগের বিশেষ প্রয়োজন হয়। তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি এড়িয়ে চলতে হলে এটিই ব্যবহারযোগ্য। অতএব, উল্লিখিত অবস্থায় মৌখিক যোগাযোগই বেশি কার্যকর।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Advantages of Oral Communication
আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও গতিশীল ব্যবসায় জগতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে মৌখিক যোগাযোগের বিকল্প নেই। এর উল্লেখযোগ্য সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ-
- তথ্যের বিকৃতি রোধ (Resist deformity of information): অনেক সময় মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে তথ্যের বিকৃতি হয়। কিন্তু এ বিকৃতি রোধের একটি সহজ উপায় হলো প্রত্যক্ষ মৌখিক যোগাযোগ বা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা। এতে সরাসরি আলোচনার ফলে ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ থাকে না।
- ভুল-ত্রুটি মুক্ত (Free from error): এরূপ যোগাযোগে কোনো ভুল-ত্রুটি ধরা পড়লে সাথে সাথে তা সমাধান করা যায়। ফলে নির্ভুলভাবে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। এতে যোগাযোগের কার্যকারিতা বাড়ে।
- নিরক্ষর ব্যক্তিদের জন্য সুবিধা (Advantages for illiterate persons): মৌখিক যোগাযোগ এমন একটি পদ্ধতি, যা সব ব্যক্তির জন্য সুবিধাজনক। ফলে লেখাপড়া জানে না এমন লোকের সাথেও এ পদ্ধতিতে সহজে যোগাযোগ করা যায়।
- অনানুষ্ঠানিক ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সৃষ্টি (Creation of informal and direct relation): মৌখিক যোগাযোগে তথ্যের প্রেরক ও প্রাপক পরস্পরের মন-মানসিকতা, ধ্যান-ধারণা, আচরণ প্রভৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারেন। ফলে প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা যোগাযোগের উন্নয়নে সহায়ক।
- সময়ের অপচয় রোধ (To hinder wastage of time): মৌখিক যোগাযোগে আধুনিক কলা-কৌশল বা প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত দূর-দূরান্তে তথ্য বিনিময় করা যায়। এতে মূল্যবান সময় অপচয় হয় না।
- ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা (Agreement in opinion): জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ একটি নির্দিষ্ট স্থানে একত্র হয়ে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সহজে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
- লালফিতার দৌরাত্ম্য হ্রাস (Reducing red-tapism): লিখিত যোগাযোগে প্রায়ই তথ্য ফাইলবন্দি হয়ে থাকে। কিন্তু মৌখিক যোগাযোগে তথ্যের এরূপ ফাইলবন্দি হওয়া বা লালফিতার দৌরাত্ম্য দেখা যায় না।
- প্রণোদনা (Motivation): মৌখিক যোগাযোগ মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা অধীনস্থ কর্মীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন এবং তাদের কাজে উদ্যোগী হতে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করেন। এতে কর্মীর প্রণোদনা ও কর্মী সন্তুষ্টি বেড়ে থাকে।
- তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (Immediate Response): মৌখিক যোগাযোগে বিশেষ করে সামনা-সামনি আলোচনায় গ্রাহকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানা যায়। এতে যোগাযোগকারী তার যোগাযোগের সফলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন এবং প্রয়োজনে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নিতে পারেন।
- বিরোধ নিষ্পত্তি (Settlement of dispute): সাংগঠনিক কোনো বিষয়ে কর্মীদের মধ্যে কর্মী ও কর্মকর্তার মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হলে মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে তা সহজেই নিষ্পত্তি করা যায়।
- মিতব্যয়ী (Economy): মৌখিক যোগাযোগের জন্য কাগজ, কালি, কলম শ্রমনির্ভর যন্ত্রপাতি বাবদ প্রতিষ্ঠানকে কোনো খরচ করতে হয় না। এতে সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যয় কমে আসে।
তাই বলা যায়, যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো তথ্য বা সংবাদ গ্রাহকের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। এ উদ্দেশ্যে মৌখিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Disadvantages of Oral Communication
মৌখিক যোগাযোগে বিভিন্ন সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও দেখা যায়। ফলে মৌখিক যোগাযোগের সহজ গতিধারা ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বাধার তৈরি হয়। নিচে মৌখিক যোগাযোগের অসুবিধা বা ত্রুটিগুলো উল্লেখ করা হলো-
- সংরক্ষণযোগ্য নয় (Not storable): মৌখিক যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা যায় না। প্রেরক ও. প্রাপক মৌখিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে তথ্য বিনিময় করেন, তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। এতে পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে যেকোনো পক্ষ তথ্যবিষয়ক কোনো কিছু অস্বীকার করলে কিছুই করার থাকে না।
- সময়ের অপচয় (Wastage of time): বিশেষ করে দলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে উপস্থিত লোকজন শুরুতেই বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনায় এতই মনোনিবেশ করেন যে, তারা মূল বিষয়কে অনেক সময় ভুলে যান। এতে যোগোযোগের জন্য প্রতিষ্ঠানের কাজের অনেক মূল্যবান সময় অপচয় হয়।
- অতি কথন ও গুজব (Excessive talk and rumor): মৌখিক যোগাযোগে অনেক সময় বক্তা মূল বিষয়ের সাথে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেন। এটি শ্রোতার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়। তাছাড়া এটি মুখে মুখে প্রচার হতে হতে গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বলা হয় মৌখিক যোগাযোগ দ্রুত গুজব ছড়ায়।
- প্রামাণ্য দলিল থাকে না (No authoritative documents): মৌখিক যোগাযোগের কোনো স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য রেকর্ড থাকে না। ফলে এ যোগাযোগের বিষয়কে আদালতে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
- তথ্যের অপব্যাখ্যা (Mal-explanation of information): মৌখিক আলোচনার বিষয়বস্তু ও গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো স্বার্থের জন্য অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে পারে। এতে সঠিক তথ্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- স্মরণশক্তির সীমাবদ্ধতা (Limitations of memory): মৌখিক যোগাযোগের বাণী সব সময় সংরক্ষণ করা যায় না। যোগাযোগে জড়িত পক্ষগুলো কিছু সময় তা স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মরণশক্তির সীমাবদ্ধতা আছে। একটি পর্যায়ে তার স্মৃতিভ্রম হয়। ফলে পরবর্তীতে মৌখিক যোগাযোগের তেমন কোনো কার্যকারিতা থাকে না।
- অস্বীকৃতিজনিত সমস্যা (Problems due to denial): অনেক সময় কিছু লোকজন নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে মৌখিক যোগাযোগের তথ্যকে অস্বীকার করে। সব সময় তথ্য সংরক্ষণ করা যায় না বিধায় এরূপ ক্ষেত্রে দোষীদের মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব হয় না। ফলে সঠিক তথ্য আড়ালেই থেকে যায়।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা (Problems at taking decision): মৌখিক যোগাযোগে প্রায়ই সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে উপস্থিত লোকজন বা শ্রোতামণ্ডলী বক্তাকে এমন সব প্রশ্ন করে যেগুলোর জবাব দিতে গিয়ে সিদ্ধান্ত। নিতে দেরি হয়। ফলে নতুন করে সমস্যার তৈরি হয়।
- অস্পষ্ট বক্তব্য (Inarticulate speech): বিশেষ করে একই সাথে অনেক লোকের উদ্দেশ্যে মৌখিকভাবে তথ্য
পরিবেশনের সময় বক্তার বক্তব্য সবার কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছায় না। এতে শ্রোতা বা গ্রাহক সঠিকভাবে তথ্য জানতে পারে না। ফলে যোগাযোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে পড়ে। - ব্যয়বহুল (Expensive): অনেক সময় মৌখিক যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়। দূরের শ্রোতা বা গ্রাহকদের আসা-যাওয়া ও থাকা-খাওয়ার জন্য প্রচুর খরচ করতে হয়।
- গোপনীয়তা ফাঁস (Disclosure of secracy): মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বক্তৃতা দেওয়ার সময় বক্তার অজান্তেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীতে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
উপসংহারে বলা যায়, মৌখিক যোগাযোগের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও উল্লিখিত অসুবিধাগুলো প্রতিকূল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এসব অসুবিধা দূর করে সতর্কতার সাথে মৌখিক যোগাযোগ করা আবশ্যক।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Medium of Oral Communication
মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমে যোগাযোগকারী তথা তথ্য প্রেরক ও প্রাপকের মধ্যে সরাসরি আলাপ-আলোচনা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়, যা নিচে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো-

ক. অযান্ত্রিক মাধ্যম (Non mechanical media)
মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া অন্যান্য মাধ্যম বা পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো-
সামনা-সামনি কথোপকথন (Face to face conversation): মুখোমুখি বা সামনা-সামনি
কথোপকথন মৌখিক যোগাযোগের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি। এরূপ যোগাযোগে প্রেরক এবং প্রাপক উভয়ই খুব কাছে থাকে এবং একে অপরকে দেখতে ও শুনতে পায়।
- সাক্ষাৎকার (Interview): সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর সাক্ষাৎকার
প্রদানকারীর সাথে সাক্ষাৎকার গ্রহীতার কথোপকথন হয়। এক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহীতা নির্দিষ্ট বিষয়ে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর মতামত জানার জন্য বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং সাক্ষাৎকার প্রদানকারী প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে তার মতামত ব্যক্ত করেন। এভাবে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে।

- বক্তৃতা (Speech): বক্তৃতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বা কোনো নেতা বা শিক্ষক তার অনুসারী বা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কোনো বিষয়, তথ্য, সংবাদ বা মতাদর্শ উপস্থাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন।

দলীয় আলোচনা (Group discussion): একই লক্ষ্য অর্জনে একাধিক ব্যক্তি মিলিত হলে তাকে দল বলা হয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনে বা সমস্যা সমাধানে দলীয় সদস্যরা তাদের নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করেন।

- আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কোর্স (Formal training course): প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর অন্যতম উপায় হলো প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বা বিশেষজ্ঞ নির্বাহী কর্মীদের হাতে-কলমে কোনো বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে থাকেন।
- সভা (Meeting): কোনো নির্দিষ্ট স্থানে কিছু সংখ্যক মানুষ কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য একত্র হলে, তাকে সভা বলে। ব্যবসায়ে বিভিন্ন ধরনের সভা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। যেমন: বিধিবদ্ধ সভা, বোর্ড সভা, বার্ষিক সাধারণ সভা। এগুলোর মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ হয়ে থাকে।
- সম্মেলন/সমাবেশ (Conference): সমাবেশের মাধ্যমে কোনো নির্বাহী নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন
করেন। এরপর কর্মীরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে সেগুলোর ওপর নির্বাহী আলোচনা-পর্যালোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত দেন। - পরামর্শ দান (Counselling): বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরামর্শ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু আছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মী বা শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত, পেশাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ কর্মীর বা শিক্ষকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে।
- উপদেষ্টা বোর্ড (Advisory board): সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক বা কর্মনায়করা অধীনস্থ কর্মীদের প্রয়োজনীয় মৌখিক উপদেশ-পরামর্শ দেওয়ার লক্ষ্যে একত্র হলে, তাকে উপদেষ্টা বোর্ড বলে। এ ধরনের বোর্ড নিজ নিজ অধীনস্থদের সাথে নিয়মিত সংযোগ রক্ষা করে এবং সভায় মিলিত হয়।
কমিটি বা পর্ষদ (Committee): কোনো উদ্দেশ্য অর্জন বা সমস্যা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে যে বিশেষ দল গঠন করা হয়, তাকে কমিটি বলে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের সাথে মৌখিক যোগাযোগ সম্পন্ন হয়।
ভাষণ (Lecture): শ্রেণিকক্ষে বা কর্মীদের শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর মৌখিক যোগাযোগ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থীদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপন করা যায়।

খ. যান্ত্রিক মাধ্যম (Mechanical media)
মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য, সংবাদ, ধারণা, মতামত প্রভৃতি দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়। বহুল ব্যবহৃত যান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নিম্নরূপ-
দূরালাপনী বা টেলিফোন (Telephone): দূরালাপনী বা টেলিফোন মৌখিক যোগাযোগ
সম্পাদনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। আগে স্থায়ী সংযোগ বিশিষ্ট টেলিফোন ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে মোবাইল ফোনের কারণে দূরালাপনী বা টেলিফোন কম ব্যবহার করা হয়।
- মোবাইল ফোন (Mobile phone): মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহারে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন
হাতের মুঠোয়। এর মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বা বিশ্বের যেকোনো দেশের যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা যায়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এক্ষেত্রে প্রেরক ও প্রাপক কম খরচে ও সহজে কথা বলতে ও তাৎক্ষণিক ফলাবর্তন বা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় মোবাইল বা সেলুলার ফোন সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে।

বেতার বা রেডিও (Radio): ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে জানানোর লক্ষ্যে রেডিওর মাধ্যমে সংবাদ পাঠানো হয়। তবে এটি একটি একমুখী যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে রেডিও ব্যবহার করে থাকে।

দূরদর্শন বা টেলিভিশন (Television): টেলিভিশনও জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছানোর
একটি কার্যকর যান্ত্রিক মাধ্যম। এর সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে চিত্রসহ মৌখিক বার্তা পৌছানো যায়। এটি বেশ আকর্ষণীয় ও বহুল প্রচলিত মাধ্যম।
- ইন্টারনেট (Internet): ইন্টারনেট হলো আন্তর্জাতিকভাবে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক; যা কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন বা স্যাটেলাইট এবং রেডিও সংযোগ ব্যবহার করে সংযুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলা যায়। বর্তমান যুগে ইন্টারনেটের সাহায্যে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে কম খরচে সহজে কথা বলা যায়। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত জনপ্রিয় অ্যাপস হলো-স্কাইপ, ভাইবার, ইমো প্রভৃতি। এরূপ ব্যবস্থা দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
- রেকর্ড প্লেয়ার (Record player): রেকর্ড প্লেয়ার মৌখিক যোগাযোগের আরেকটি যান্ত্রিক মাধ্যম। এ প্রক্রিয়ায় প্রেরক তার বক্তব্য রেকর্ড করে সিডি বা ক্যাসেটের মাধ্যমে প্রাপকের বরাবর পাঠিয়ে দেন। প্রাপক সুবিধাজনক সময়ে তা রেকর্ড প্লেয়ারে বাজিয়ে বক্তব্য বা তথ্য শুনে থাকেন।
- ভয়েস মেইল (Voice mail): কল না করে যান্ত্রিক উপায়ে মানুষের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকের কাছে পাঠানোর পদ্ধতিকে বলা হয় ভয়েস মেইল। মূলত প্রেরক কর্তৃক প্রয়োজনীয় কথা ধারণ করে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির মেইলে বা ইনবক্সে অবিকলভাবে পাঠিয়ে দেওয়াই হলো ভয়েস মেইল।

- ভিভিও আলোচনা সভা (Video conferencing): ভৌগোলিকভাবে বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত বিভিন্ন ব্যক্তি বা দলের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের একটি আধুনিক পদ্ধতি হলো ভিডিও কনফারেন্সিং। এ পদ্ধতিতে ভৌগোলিকভাবে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত ব্যক্তিরা উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিসজ্জিত আলাদা কক্ষে বসে ভিডিওর সাহায্যে পরস্পরকে দেখতে এবং কথা-বার্তা শুনতে পারে।
- টেলিফোনে আলোচনা সভা (Tele conferencing): টেলিকনফারেন্সিং অনেকটা ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মতো। তবে এক্ষেত্রে একাধিক যোগাযোগকারী একে অপরকে দেখতে পায় না, শুধু কথা শুনতে পায়।
উপসংহারে বলা যায়, বিভিন্ন যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক মৌখিক মাধ্যমে মৌখিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পাদন হয়। তবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী সবচেয়ে উত্তম মৌখিক যোগাযোগ মাধ্যমটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Functions of Communication
যোগাযোগ হলো একাধিক ব্যক্তি বা পক্ষের মধ্যে কোনো তথ্য, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা বা ভাবের আদান-প্রদান। এক্ষেত্রে শুধু যে তথ্য, সংবাদ বা ধ্যান-ধারণার বিনিময় হয়, তা নয়। এতে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। যোগাযোগের বিভিন্ন কার্যাবলির মধ্যে নিম্নলিখিত কার্যাবলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ-
- সংবাদ অবহিতকরণ (Informing messages): যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কাজ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা
প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য, ভাব, চিন্তা-চেতনা বা অনুভূতিকে সংবাদ আকারে উপস্থাপন করা। এক্ষেত্রে সংবাদ বা তথ্য লিখিত, মৌখিক অথবা আকার-ইঙ্গিতে বার্তা গ্রাহকের কাছে তুলে ধরা হয়। বার্তা গ্রাহক বার্তা প্রেরকের প্রেরিত তথ্য বা ভাব যখন বুঝতে পারে, তখনই যোগাযোগ কাজ সম্পন্ন হয়। - প্রণোদনা (Persuasion): যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মীদের কাজে উৎসাহিত করে বা প্রেষণা দিয়ে ব্যবস্থাপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা হয়। অধীনস্থ কর্মীরাও যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের কর্মস্থলের সমস্যা সম্পর্কে মতামত ও পরামর্শ জানানোর জন্য ব্যবস্থাপকের কাছে যায়।
- পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (Formulating and executing plan): যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য, উপাত্ত, মতামত বা মনোভাব বিনিময় করা হয়। এ ব্যবস্থা সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হয়। আবার, ব্যবস্থাপকদেরকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবায়নকারী তথা শ্রমিক-কর্মীদের তত্ত্বাবধায়ন করতে হয়। অর্থাৎ, যোগাযোগের মাধ্যমে পরিকল্পনার সঠিকভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হয়।
- সমস্যার সমাধান (Problem solving): প্রতিষ্ঠানে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করা যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সংগঠনের কাজের ধারায় বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যা দূর করার জন্য সংগঠন কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত লোকজনের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবে সমস্যার সমাধান করাও যোগাযোগের একটি কাজ।
- কার্য মূল্যায়ন (Job evaluation): যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি, প্রণীত কর্মপরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, পরামর্শ ও কর্মসূচি অনুযায়ী সম্পাদিত হচ্ছে কি না; সে সম্পর্কিত তথ্যাদি বিনিময় করে। এরপর তা যাচাই করে এবং অর্জিত কার্যফলের পরিমাপও মূল্যায়ন করে থাকে। তাই কার্য মূল্যায়নও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
- মতামত গঠন (Forming opinion): যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের ধারণা ও যুক্তি তুলে ধরা যায় এবং ব্যাপক জনমত তৈরি করা যায়। এভাবে বার্তা প্রেরক মতামত গঠন করে বার্তা গ্রাহককে নির্দিষ্ট পথে চলতে উৎসাহিত করে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠান সহজে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision making): ব্যবসায়ের প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত তথ্যের প্রয়োজন হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাকে ব্যবসায়ের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকে।
- সমন্বয়সাধন ও সহযোগিতা (Coordination and cooperation): যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা হয়। এছাড়া, 'যোগাযোগের মাধ্যমে এক বিভাগ অন্য বিভাগকে বা এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে তথ্য বিনিময় বা পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। এভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে সমন্বয় ও সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।
- সুসম্পর্ক সৃষ্টি (Creating good relationship): পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করা ব্যবসায়ের সফলতার জন্য অপরিহার্য। কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবসায় সংগঠনের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক তৈরির পথ দেখিয়ে দেয় এবং তার উন্নতি বিধান করে।
- অনুকূল মনোভাব সৃষ্টি (Creating favourable attitude): অনুকূল মনোভাব কাজের প্রতি উৎসাহ তৈরি করে। আর প্রতিকূল মনোভাব কাজে নিরুৎসাহিত করে ও নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। সাধারণত কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির প্রতি বা কোনো কাজের প্রতি কোনো কারণ ছাড়াই কৌতূহলী হয় না। তাই কারও মনোভাব অনুকূলে আনার জন্য যথাযথভাবে উৎসাহিত করতে হয়। এ কাজটি যোগাযোগের মাধ্যমেই করতে হয়।
- সামাজিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা (Establishing social network): সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তি একে অন্যের সুখ-দুঃখ প্রকাশ করে, যা সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে যোগাযোগের ফলে সব জায়গায় উত্তম সম্পর্ক দেখা যায়।
- উত্তম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা (Establishing best management system): প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি উত্তম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তর ও কাজের মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয়সাধনের ব্যবস্থা করে। ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সব দুর্বলতা কাটিয়ে একটি উত্তম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গঠিত হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়।
- পণ্য ও সেবাকর্মের প্রচার (Publicity of product and service): যোগাযোগ ভোক্তাদের কাছে পণ্য ও সেবা প্রচারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে পণ্য কিনতে আকৃষ্ট করে। এজন্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সিনেমা স্লাইড, প্রাচীরপত্র, সাইনবোর্ড প্রভৃতি যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে।
- প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি তৈরি (Creating organizational image): বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে
প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এর ভাবমূর্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। সব প্রতিষ্ঠানই যোগাযোগের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে। এভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের অনুকূল ভাবমূর্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। - শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়ন (Developing labour management relationship): লক্ষ্য অর্জনে উত্তম শ্রম- ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উপস্থিতি অপরিহার্য। যোগাযোগের দ্বারা প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও ব্যবস্থাপকরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। ফলে তাদের মধ্যকার অবিশ্বাস ও সন্দেহ দূর হয় এবং পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির সমাধান হয়। এভাবে উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
- আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন (Establishing international relationship): বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের মূলে আছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক তথ্য ও ভাবের বিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করে থাকে। এভাবে বিশ্বগ্রাম (Global Village) ধারণারও সম্প্রসারণ হচ্ছে।
সুতরাং, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করে আসছে। যোগাযোগ ছাড়া মানুষের শুধু অর্থনৈতিক কাজই নয়, বরং সবকিছুই অচল।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Barriers to Communication
তামিম আজাদ চট্টগ্রামে অবস্থিত 'বিভূই ইন্টারন্যাশনাল'-এর উৎপাদন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। একদিন তিনি তার কর্মীদের একটি আলোচনা সভায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তবে আলোচনা কক্ষটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় যানবাহন চলাচলের বিকট শব্দে ও রাস্তায় চলাচলরত লোকজনের কোলাহলের কারণে আলোচনা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। ফলে তার গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথাই কর্মীরা স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিলেন না। আবার, অনেক কর্মীই স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যন্ত। তাদের পক্ষে তামিম আজাদের সব কথা বুঝতেও সমস্যা হচ্ছিল। এছাড়া তিনি আলোচনায় অনেক টেকনিক্যাল ও বিদেশি শব্দ ব্যবহার করায় সবার কাছে তা বোধগম্যও হচ্ছিল না। অপরদিকে বেশ কিছু শ্রমিক তার ওপর অখুশি থাকায় উক্ত আলোচনা সভায় যথেষ্ট অমনোযোগীও ছিল। আবার তামিম আজাদ 'কর্মীরা অনেক কিছুই জানে ও বোঝে' মনে করে কোনো কোনো বিষয় অতি সংক্ষেপে বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কর্মীদের সেসব বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা না থাকায় পুরো বিষয়টি তাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় কোনো কর্মী তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাচ্ছিল না। এসব সমস্যার কারণে তামিম আজাদের দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা সফল হয়নি।
উপরোক্ত ঘটনায় তামিম আজাদ একটি মৌখিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তার এ যোগাযোগে সঠিকভাবে সংবাদ ও তথ্য সরবরাহে যেসব বিষয় বাধাগ্রস্ত করে তোলে, সেগুলোকে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা বলা হয়।
দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে কোনো তথ্য, সংবাদ, ধারণা, মতামত প্রভৃতি বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় পক্ষের কাছে বিষয়টি সমানভাবে বোধগম্য হলে, তাকে কার্যকর বা ফলপ্রসূ যোগযোগ বলে। অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের তথ্য বা বিষয়টি কোনো না কোনো কারণে বিকৃত, ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যেতে পারে। এ কারণগুলোই হলো যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা।
- ড. সুরুজ কুমার দেবনাথ (Dr. Suruj Kumar Debnath) এর মতে, 'Barriers of communication means obstacles to the process of communication,' অর্থাৎ, 'যোগাযোগের বাধা বলতে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতাসমূহকে বোঝায়।'
- সি. বি. মেমোরিয়া (C. B. Mamoria) এর মতে, 'Communication, when it is impeded and does not reach the receiver, is often some what ineffective, and the impediments are known as barriers.' অর্থাৎ, 'যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হলে এবং প্রাপকের কাছে না পৌঁছালে তা কিছুটা অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং এরূপ বাধাকে প্রতিবন্ধকতা বলা হয়।'
যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি নিচের চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়-

অতএব, যেসব উপাদান বা বিষয়ের কারণে যোগাযোগের স্বাভাবিক তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত, বিকৃত বা ধ্বংস হয়, তাকে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা বলে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Barriers to Effective Communication
কার্যকর যোগাযোগের পথে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা বাধা তৈরি হতে পারে।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়, যা নিম্নরূপ-

ক. সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা (Organizational barriers): কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংগঠন ও সংগঠন
কাঠামোর মধ্যে যেসব বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, সেগুলোর সমষ্টিই হলো সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতা। নিচে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক প্রতিবন্ধকতার বর্ণনা দেওয়া হলো-
- নেতিবাচক সাংগঠনিক পরিবেশ (Negative organisational climate): প্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনোভাবে সৃষ্ট নেতিবাচক পরিবেশ প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন পক্ষের প্রতি এরূপ নেতিবাচক মনোভাব কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে।
- সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব (Lack of proper policy): যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট নীতিমালার যথাযথ অনুসরণের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যোগাযোগ পরিবেশ। প্রতিষ্ঠানে নীতিমালার অভাব থাকলে ঐ সংগঠনের কর্মীরা যোগাযোগের সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়। এতে যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতার তৈরি হয়।
- অতিরিক্ত কর্তৃত্ব স্তর (Excess authoritative layers): সাংগঠনিক স্তর বেশি থাকলে সার্থক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তা একটি মারাত্মক বাধা হিসেবে কাজ করে। বেশি স্তরবিশিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোতে কোনো তথ্য শীর্ষ স্তর থেকে নিম্ন স্তরে অথবা নিম্ন স্তর থেকে শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়.।
- বৈষম্য (Discrimination): অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের একই পদমর্যাদাভুক্ত কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা বা বৈষম্য হতে দেখা যায়। ফলে কর্মীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়। আর এরূপ বৈষম্য পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
- পদমর্যাদার পার্থক্য (Differences at status): পেশাগত অবস্থান, স্তর বা অবস্থাকে পদমর্যাদা বলে। একই প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি এবং দুর্বল চিত্তের বা সহজ-সরল ধরনের অধীনস্থদের মাঝে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পদমর্যাদার পার্থক্য অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
খ. ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা (Personal barriers): কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংবাদ প্রেরক এবং প্রাপকের ব্যক্তিগত বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে, যা যোগাযোগকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। যোগাযোগের এসব উপাদানকে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা বলে। নিচে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো-
- ব্যক্তিত্বের পার্থক্য (Differences in personality): ব্যক্তিত্ব বলতে কোনো ব্যক্তির মাঝে থাকা স্বতন্ত্র কিছু ধ্যান- ধারণা ও বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। বিভিন্ন ব্যক্তির এরূপ ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণে যোগাযোগে বাধা তৈরি করে।
- প্রত্যক্ষণগত পার্থক্য (Difference in perception): কোনো বিষয়কে নিজের মতো করে দেখা, শোনা, বোঝা বা ব্যাখ্যা করার সামর্থ্যকে প্রত্যক্ষণ বলা হয়। প্রত্যক্ষণগত ভিন্নতার কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়কে একেকজন একেকভাবে বুঝে নেয়। ফলে এ ধরনের পার্থক্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
- অবিশ্বাস ও সন্দেহ (Mistrust and suspection): প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিভিন্ন ব্যক্তি বা পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ দেখা দিতে পারে। এতে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে। ফলে যোগাযোগে তাদের অনীহা সৃষ্টি হয়।
- অমনোযোগিতা (Inattention): অনেক ক্ষেত্রে সংবাদের বিষয়বস্তুতে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ার কারণে প্রাপক উক্ত সংবাদ যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। অসুস্থতা, অতিরিক্ত কর্মভারগ্রস্ততা, সংবাদের প্রতি অনাগ্রহ, পারিবারিক কোনো সমস্যা প্রভৃতি প্রাপকের অমনোযোগিতা তৈরির কারণ।
- পূর্ব ধারণার সাধারণ প্রয়োগ (Stereotyping): পূর্ব ধারণার সাধারণ প্রয়োগ বলতে কোনো সাধারণ বিষয়ে জনগোষ্ঠীর আগে থেকে বিদ্যমান ধারণাকে বোঝায়। এর সাধারণ প্রয়োগ যোগাযোগকে ব্যাহত করে।
গ. ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা (Linguistic barriers): যোগাযোগের প্রধান বাহন হলো ভাষা। যোগাযোগের ক্ষেত্রে
ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় ভাষাগত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এতে যথাযথভাবে তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। যোগাযোগের ভাষা সম্পর্কিত এসব সমস্যাজনিত উপাদানকে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা বলে। নিচে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার বর্ণনা দেওয়া হলো-
- স্থানীয় ভাষার ব্যবহার (Use of local language): প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা অনেক সময় বিভিন্ন এলাকার হয়ে
থাকে। যেমন: সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল প্রভৃতি এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় ভাষা প্রচলিত, যা অন্য এলাকার লোকদের জন্য দুর্বোধ্য। এসব আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কার্যকর যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। - মিশ্র ভাষার ব্যবহার (Use of mixed language): বিশ্বে অসংখ্য ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একই সাথে বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। যেমন: অনেক সময় কেউ বাংলায় কথা বলতে গিয়ে কথার মাঝে ইংরেজি ও হিন্দি শব্দ ব্যবহার করেন। এতে যোগাযোগের কার্যকারিতা কমে যায়।
- পারিভাষিক শব্দের ব্যবহার (Use of technical word): বিভিন্ন বিষয়ে বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়, যা শুধু উক্ত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিভাষাগুলো ব্যবহার করলে অনেকের কাছে তা দুর্বোধ্য হয়। যেমন: কারেন্ট (বিদ্যুৎ), অপারেশন (অস্ত্রোপচার) প্রভৃতি।
- অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার (Use of uncommon words): কিছু কিছু অপ্রচলিত শব্দ আছে যা সঠিক কিন্তু সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। এসব শব্দের ব্যবহার অনেক সময় যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। যেমন: বায়ুসখা (আগুন), শবদাহ (মৃতদেহ পোড়ানো), বনেদি (ব্যবসায়ী) প্রভৃতি।
- সাংকেতিক ভাষার ব্যবহার (Use of cant): কোনো লিখিত বা মৌখিক ভাষার পরিবর্তে ইশারা-ইঙ্গিতের সাহায্যে তথ্য বিনিময়কে সাংকেতিক ভাষা বলে। অনেক ক্ষেত্রে সহজ-সরল বা অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিসম্পন্ন কর্মী সাংকেতিক ভাষা বঝতে সক্ষম হন না। এতে প্রদত্ত তথ্য প্রাপক পর্যন্ত সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
ঘ. অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা (Other Barriers): কার্যকর যোগাযোগে তথ্য বিনিময়ে উল্লিখিত উপাদানসমূহ ছাড়া আরও কিছু বিষয় বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা নিচে আলোচনা করা হলো-
- তথ্যভারাক্রান্ত অবস্থা (Information overloaded condition): তথ্য ভারাক্রান্ত অবস্থা বলতে তথ্য জমতে
জমতে স্তূপ সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়, যা যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে একই সময়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া হলে সে ব্যক্তি তথ্যভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, যা যোগাযোগে বাধা তৈরি করে। - ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশ (Faulty expression): প্রেরক কর্তৃক সংবাদ বা বার্তার ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশও যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করে। অস্পষ্ট ও জটিল বাক্যের ব্যবহার, তথ্যের অসংলগ্ন প্রকাশ, যোগাযোগ ধারণার ভুল সংকলন প্রভৃতি কারণে যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় তথ্যের ত্রুটিপূর্ণ প্রকাশ হয়ে থাকে।
- লালফিতার দৌরাত্ম্য (Red tapism): তথ্য বা সংবাদ সনাতন রীতি অনুযায়ী লালফিতা দ্বারা অফিসে নথিবন্দি করে রাখাকে লালফিতার দৌরাত্ম্য বলে। আবার, সরকারি কর্মচারী কর্তৃক কাজে অবহেলা ও প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সাংগঠনিক স্তরের কারণে তথ্য যথাসময়ে বার্তা গ্রাহকের কাছে পৌছায় না। এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নামে পরিচিত। এর ফলে যেগাযোগ কাজ ধীরগতিতে তৈরি হয়।
- আংশিক যোগাযোগ (Partial communication): প্রেরক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য বা সংবাদ সম্পূর্ণ প্রেরণ না করে আংশিক প্রেরণ করলে তা বোধগম্য না-ও হতে পারে। ফলে এটি কার্যকর যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করে।
উপসংহারে বলা যায়, কার্যকর যোগাযোগে তথ্য বা সংবাদ প্রবাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধে ভালোভাবে ধারণা নিয়ে তা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারলে যোগাযোগকে আরও ফলপ্রসূ করা সম্ভব হবে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Ways to Remove the Barriers to Communication
যোগাযোগ বলতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা পক্ষের মধ্যে কোনো তথ্য, সংবাদ, ধারণা বা ভাবের আদান-প্রদানকে বোঝায়। কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু এরূপ প্রতিবন্ধকতা বা বাধা পরিপূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়। তবে যোগাযোগের উদ্দেশ্য অর্জনের স্বার্থে তা দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার জন্য নিচের ব্যবস্থাগুলো নেওয়া যায়-
- সঠিক মাধ্যম নির্বাচন (Selecting proper media): উপযুক্ত মাধ্যম নির্বাচনের ওপর যোগাযোগের সাফল্য
বহুলাংশে নির্ভর করে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার তথ্য বা সংবাদ গ্রহীতার ধরন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সাংগঠনিক প্রয়োজনের আলোকে উপযুক্ত মাধ্যম নির্বাচন করতে হয়। মাধ্যম বিবেচনায় লিখিত যোগাযোগ যেখানে উত্তম, সেখানে লিখিত মাধ্যমেই যোগাযোগ করা উচিত। আবার যেখানে সরাসরি সাক্ষাৎ করে আলোচনা করলে ভালো হয়, সেখানে মৌখিকভাবে যোগাযোগ করা আবশ্যক। - সহজ সংগঠন কাঠামো প্রতিষ্ঠা (Establishing easy organizational structure): প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামো জটিল হলে বা স্তরের সংখ্যা বাড়লে ওপর থেকে নিচে এবং নিচ থেকে ওপরে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় দেরি হয়। এতে ভুলের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। এজন্য সংগঠন কাঠামো সহজ-সরল করা প্রয়োজন, যাতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা দূর করা সহজ হয় বা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়।
- সুস্পষ্ট সাংগঠনিক নীতিমালা (Clear-cut organizational policy): সংগঠনে যোগাযোগ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। প্রতিষ্ঠানের সবাই নীতিমালা বুঝে তার যথাযথ অনুসরণ করলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সন্দেহ, দ্বিধা, অবিশ্বাস প্রভৃতি দূর করে কার্যকর যোগাযোগ প্রবাহ নিশ্চিত করা সহজ হয়।
- কার্যকর শ্রবণ (Effective listening): যোগাযোগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার একটি প্রধান হাতিয়ার হলো কার্যকর শ্রবণ। যোগাযোগ গ্রহীতাকে অবশ্যই যোগাযোগকারীর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে। অন্যদিকে সংবাদ গ্রাহকের মতামতও সংবাদ প্রেরককে মনোযোগ সহকারে শুনে সংবাদ গ্রাহকের মনোভাবের সাথে পরিচিত হতে হবে। এভাবে যোগাযোগের বাধা বহুলাংশেই কমানো সম্ভব।
- বার্তা গ্রহীতা সম্পর্কে ধারণা অর্জন (Ideas about receivers): যোগাযোগের সময় প্রেরক গ্রহীতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করে সে অনুযায়ী বার্তা বা সংবাদ উপস্থাপন করলে যোগাযোগ কার্যকর হয়। তাই যোগাযোগের সময় তথ্য বা সংবাদ গ্রহীতার পরিবেশ, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, মনোভাব, অনুভূতি প্রভৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে।
- অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক (Informal relation): অনেক সময় তথ্য বা সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সহযোগী হিসেবে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সফলতার সাথে ব্যবহার করা যায়।
- উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার (Use of modern technology): আধুনিক ও উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে
যোগাযোগকে বেশি সফল করে তোলা সম্ভব। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অনেক উন্নতি লাভ করেছে। এর মাধ্যমে যেকোনো স্থানে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা এবং যোগাযোগের বাধা অনেকাংশেই দূর হয়। - সহজ ও অর্থপূর্ণ শব্দের ব্যবহার (Use of easy and meaningful words): যোগাযোগ মৌখিক বা লিখিত যে মাধ্যমেই করা হোক না কেন, তথ্য বা সংবাদ প্রেরণকারীকে সহজ ও নির্দিষ্ট অর্থবাহী শব্দ ব্যবহার করতে হয়। কঠিন ও অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার যোগাযোগের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিতে পারে। এজন্য সংবাদ গ্রহীতা সহজেই বুঝতে পারেন এমন ভাষায় যোগাযোগ করা উচিত।
- কর্মী সম্মেলন (Employee conference): প্রয়োজনে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের জন্য
সম্মেলনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরূপ সম্মেলনে পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগের উন্নয়নের ধারা চলমান রাখা সম্ভব হয়। - ফলাবর্তন (Feedback): যোগাযোগ প্রক্রিয়ার পরিপূর্ণতার জন্য শুধু সংবাদ, প্রেরণই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি ফলাবর্তনের মাধ্যমে সংবাদগ্রহীতার কাছে তথ্য বা সংবাদের বিষয়বস্তু স্পষ্ট হচ্ছে কি না, তা জানা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা চালু থাকলে প্রয়োজনবোধে প্রেরণকারী কর্তৃক প্রেরিত সংবাদের সংশোধন করা যায়।
- কার্যকর যোগাযোগ পরিকল্পনা গ্রহণ (Taking effective communication plan): কার্যকর যোগাযোগ পরিকল্পনায় সাধারণত যোগাযোগের লক্ষ্যকে সামনে রাখা হয়। এক্ষেত্রে যোগাযোগ গ্রহীতার প্রয়োজন অনুযায়ী বক্তব্য তৈরি ও তা সঠিক মাধ্যমে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সমস্যাগুলোও বিবেচনায় আনা হয়। ফলে এ ধরনের পরিকল্পনার অধীনে যোগাযোগকে ফলপ্রসূ করা সহজ হয়।
- যোগাযোগ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দান (Communication training): যোগাযোগকে দ্রুত, সহজ ও অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
- ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (Development of management): কার্যকর যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন উপায়ে ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা যেতে পারে। এসবের মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ব্যবস্থায় নির্বাহীরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তদারকি করেন বলে যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থপূর্ণ হয়ে থাকে।
- সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ (Determining definite goals): সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য যোগাযোগ করা হয়। একে অর্থবহ করে তোলার জন্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এছাড়া যোগাযোগের সময় ঐ লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতাও অবলম্বন করতে হবে।
- শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন (Improvement of labour-management relationship): উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক যোগাযোগের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন করতে পারলে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও সার্থক হবে।
- সুন্দর কর্মপরিবেশ (Good working environment): প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ সুন্দর হলে যোগাযোগ সঠিক ধারায় সংঘটিত হতে থাকে। আর এ পরিবেশ বাধাপ্রাপ্ত হলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। তাই কাজের পরিবেশ উন্নত করার প্রতি কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে।
- কর্তৃত্বের স্তর হ্রাস (Reducing authority level): শিল্পকারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় সাংগঠনিক
কাঠামো এবং তত্ত্বাবধান স্তর কমাতে হবে। এজন্য অপ্রয়োজনীয় সাংগঠনিক স্তর উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষত সেক্টর কর্পোরেশনগুলোর অপ্রয়োজনীয় সাংগঠনিক স্তর উঠিয়ে দেওয়ার জন্য সাংগঠনিক কাঠামো পুনরায় সাজাতে হবে। মোটকথা, কার্যকরভাবে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো এবং কর্তৃত্বের স্তরকে আরও সহজ-সরল করতে হবে।
সুতরাং, ওপরের ব্যবস্থাগুলো নিতে পারলে কার্যকর যোগাযোগের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা বা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Use of Information and Communication Technology (ICT) in Business Communication
আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় কার্যক্রম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদারের মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বৃহদায়তনের গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা বহুজাতিক কোম্পানির (MNCs) ওয়েবসাইট, ভিডিও কনফারেন্স বা মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার সবই আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আশীর্বাদ। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বা মাধ্যমকে নিম্নোক্ত ছকের সাহায্যে প্রকাশ করা যায়-

ক. আইসিটি-এর মৌখিক যোগাযোগ মাধ্যম (Oral Communication Medium of ICT)
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের মৌখিক যোগাযোগ সংঘটিত হয়। এ মৌখিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো হলো-
- টেলিকনফারেন্সিং (Teleconferencing): টেলিকনফারেন্সিং ব্যবস্থায় টেলিফোনে একাধিক সংযোগ স্থাপন করার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত লোকজনকে সভায় যোগদান ও মতামত বিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক নির্দিষ্ট বিষয়ে টেলিফোনের মাধ্যমে এরূপ আলাপ-আলোচনা বা মতামত বিনিময় কনফারেন্সে রূপ লাভ করে। এতে একসাথে বহুসংখ্যক মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়।
- ভিডিও কনফারেন্সিং (Video conferencing): ভিডিও কনফারেন্সিংও এক ধরনের টেলিকনফারেন্সিং ব্যবস্থা।
এখানে টেলিভিশন বা মনিটরের পর্দায় কনফারেন্স বা মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা পরস্পরের মুখোমুখি হন ও কথোপকথনে অংশ নেন। এ ব্যবস্থায় টেলিফোন লাইনের সাহায্যে ইমেজ ট্রান্সমিট প্রক্রিয়ায় মনিটর বা টেলিভিশনের পর্দায় যোগাযোগে অংশগ্রহণকারীদের ছবি দেখানো হয়। - ওয়েব ক্যামেরা (Web camera): ওয়েব ক্যামেরা বলতে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত এক
ধরনের ডিজিটাল সম্মুখমুখী (Front-facing) ক্যামেরাকে বোঝায়। এ ধরনের ক্যামেরার সাহায্যে বার্তা প্রেরক ও প্রাপক উভয়ই জীবন্ত ছবি দেখার মাধ্যমে কথা-বার্তা বলতে পারেন। এছাড়া এর সাহায্যে ছবি (Image) ও ভিডিও চিত্র আপলোড, ডাউনলোড করে আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ করা যায়। - মাল্টিমিডিয়া (Multimedia): মাল্টিমিডিয়া বলতে বহুবিধ মিডিয়া বা মাধ্যমের সমন্বিত প্রযুক্তিকে বোঝায়। এ প্রযুক্তির মধ্যে লিখিত শব্দ, চিত্র (Image), জীবন্ত ছবি (Animation), অডিও, ভিডিও প্রভৃতি প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকে। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষে বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষাণীয় বিষয় সহজে বোঝাতে মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়
- মোবাইল ফোন (Mobile phone): টেলিফোনের আরেকটি জনপ্রিয় ও আধুনিক সংস্কার হলো মুঠোফোন, মোবাইল ফোন, সেল ফোন বা সেলুলার ফোন। তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমানে মোবাইলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্যাটেলাইট পদ্ধতিতে তারবিহীন ব্যবস্থায় যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। এ ফোনের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর সাথে তারের কোনো সংযোগ থাকে না। এতে ফোন সেটকে সব সময় সাথে নিয়ে চলাচল করা যায়। কথা বলা বা তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও ভিডিও কনফারেন্স রেকর্ডিং, সংক্ষিপ্ত বার্তা বিনিময়, গান শোনা, ইন্টারনেট, রেডিও ও টেলিভিশনের বিকল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে মোবাইলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।
- দূরালাপনী বা টেলিফোন (Telephone): টেলিফোন বা দূরালাপনীর সাহায্যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোর এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এবং উচ্চ স্তর ও নিম্ন স্তরে সহজে ও দ্রুততার সাথে তথ্য বা সংবাদ বিনিময় করা যায়। একইভাবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও টেলিফোনের ব্যাপক ব্যবহার হয়। এতে স্থানগত দূরত্ব অভাবনীয় মাত্রায় কমেছে।
- ভয়েস মেইল (Voice mail): যান্ত্রিক উপায়ে মানুষের কণ্ঠস্বর হুবহু ধারণ ও প্রেরণ করার প্রক্রিয়াকে ভয়েস মেইল বলে। এ পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার চিপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে তথ্য প্রেরণকারীর কন্ঠস্বরকে ডিজিটাল কোডে রূপান্তর করে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সংরক্ষণকৃত তথ্য গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়। গ্রাহক তার সুবিধাজনক সময়ে মেইল বক্সে ডায়াল করে প্রেরিত তথ্য শুনতে পারে।
- দূরদর্শন বা টেলিভিশন (Television): টেলিভিশন বা দূরদর্শনের মাধ্যমে স্থির বা গতিশীল ইমেজ এবং শব্দকে বার্তা গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়। এরপর এটি পর্দায় বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে পুনরায় উৎপন্ন হয়। এক্ষেত্রে সংবাদ গ্রাহক সংবাদ প্রেরকের বার্তা শোনার পাশাপাশি তাকে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে দেখতেও পারেন।
- বেতার বা রেডিও (Radio): তারবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ম্যাগনেটিক তরঙ্গকে শব্দে রূপান্তর করা হয়। বেতারের মাধ্যমে বার্তা গ্রাহক বার্তা প্রেরকের সংবাদ বা বার্তা শুনে থাকে। কিন্তু গ্রাহক কোনো প্রতিক্রিয়া (Reply) দিতে পারে না। অসংখ্য প্রাপকের সাথে এর মাধ্যমে এক সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
- টেলিগ্রাম (Telegram): লিখিত যোগাযোগের বার্তা অনেক সময় জরুরি ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বার্তা গ্রাহকের কাছে প্রেরণের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বার্তার বিষয়বস্তু টেলিগ্রাম আকারে টেলিগ্রাফ অফিসের মাধমে প্রেরণ করা হয়। ব্যয়বহুল ও প্রাচীন এ পদ্ধতির মাধ্যমে বার্তার বিষয়বস্তু অতি সংক্ষেপে লিখতে হয়। তবে আধুনিক ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ও ফোনের জগতে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে।
খ. আইসিটি-এর লিখিত যোগাযোগ মাধ্যম (Written Communication Medium of ICT)
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহারের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের লিখিত যোগাযোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অনেক মাধ্যম ব্যবহৃত হয়, যা নিচে আলোচনা করা হলো-
- সামাজিক সাইট (Social site): যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে একটি সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করা হয়, তাকে সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট বলে। এখানে যেকোনো ব্যক্তি সদস্য বা বন্ধু হয়ে তার ধ্যান-ধারণা, মতামত, কাজ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। যেমন: ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস।
- ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং (Instant messaging): ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং বা চ্যাটিং (Chatting) হলো এক ধরনের
তাৎক্ষণিক (Real time) ও লিখিত বার্তানির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের মতামত বা তথ্য একে অপরকে জানিয়ে থাকে। - ব্লগ (Blog): ব্লগ হলো ওয়েবসাইটের একটি পেজ যেখানে সমসাময়িক নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে যেকোনো ব্যক্তি তার মতামত ও হালনাগাদ (Updated) তথ্য দিয়ে থাকে। যেমন: ক্লাসে লেখালেখি করে অনেক ব্যক্তি তাদের মতামত ও ধ্যান-ধারণা প্রচার করে থাকে।
- ই-মেইল (E-mail): ই-মেইল অর্থ ইলেকট্রনিক মেইল (Electronic Mail)। এ ব্যবস্থায় কম্পিউটারের সহায়তায় বিশ্বের যেকোনো স্থানে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চিঠিপত্র, ছবি, ভিডিও-অডিও প্রভৃতি আদান-প্রদান করা যায়। এটি ব্যবহারের জন্য কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ই-মেইল ঠিকানার প্রয়োজন হয় (যেমন: sarif7kira@yahoo.com, hazrat@dcc.edu.bd)। কোনো সংবাদ বা তথ্য পাঠাতে হলে তা টাইপ করে ঐ যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপকের ই-মেইল ঠিকানায় প্রেরণ করা হয় এবং মুহূর্তেই তা পৌঁছে যায়।
- ওয়েবসাইট (Website): ওয়েবসাইট হলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অসংখ্য ওয়েব পেজের সম্মিলন, যা বিভিন্ন ধরনের নথি (File), দলিল (Document), চিত্র (Image), অডিও-ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদ ধারণ করে থাকে। এসব তথ্যভাণ্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। সংবাদ গ্রাহক তার প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট ব্যবহার করে ওয়েবসাইট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময় করে থাকেন।
- ইন্টারনেট (Internet): ইন্টারনেট হলো বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমষ্টি; যা কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন বা স্যাটেলাইট এবং রেডিও সংযোগ ব্যবহার করে পরস্পর সংযুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রেরণ সহজেই করা যায়।
- ইন্ট্রানেট (Intranet): ইন্ট্রানেট হলো ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি কৌশল। এর মাধ্যমে কোনো সংগঠনের মধ্যেই তথ্য আদান-প্রদান এবং নেটওয়ার্ক অপারেটিং সীমাবদ্ধ রাখা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্রয়োজনে ইন্টানেট তৈরি করে থাকে।
- এক্সট্রানেট (Extranet): এক্সট্রানেটও ইন্টারনেট প্রযুক্তির একটি বিশেষ কৌশল এবং ইন্ট্রানেট প্রযুক্তির একটি বর্ধিত রূপ। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায় ও শিক্ষাসংক্রান্ত উদ্দেশ্যে নিজস্ব সাইটে প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। এতে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
- ফ্যাক্স (Fax): ফ্যাক্স (Fax) শব্দটি ইংরেজি ফ্যাক্সিমিলি (Facsimile) শব্দ থেকে এসেছে। ফ্যাক্স হলো এক ধরনের ইলেকট্রিক টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্র। এ যন্ত্রের সাহায্যে স্ক্যানকৃত (Scanned) ও প্রিন্ট করা কোনো সংবাদ, তথ্য, চিত্র, নকশা, চার্ট, ফর্মুলা প্রভৃতি হুবহু সহজে ও নির্ভুলভাবে মুহূর্তের মধ্যে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো যায়। এক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য বা সংবাদের আদান-প্রদান হয়ে থাকে।
- টেলেক্স (Telex): টেলেক্সের মাধ্যমে সংবাদ বা তথ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো যায়। এ যন্ত্রে কী-বোর্ড থাকে। সংবাদ প্রেরক ব্যবসায়সংক্রান্ত বা অন্য কোনো সংবাদ এ যন্ত্রে টাইপ মেশিনের মতো টাইপ করে মুদ্রিত আকারে প্রাপকের কাছে সাথে সাথে পৌঁছাতে পারেন। টেলেক্স যন্ত্রে প্রেরক যে সংবাদ বা তথ্য টাইপ করবেন, হুবহু মুদ্রিত লেখা একই সময়ে প্রাপকের যন্ত্রেও মুদ্রিত হবে। প্রাপকের যন্ত্রে প্রেরিত সংবাদ পৌছেছে কি না, তা-ও উক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে বোঝা যায়।
অতএব, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যোগাযোগ ক্ষেত্রে আইসিটির বহুবিধ ব্যবহার ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। এর উন্নয়ন ও বিকাশের সাথে যোগাযোগের পরিধি ও ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of Internet
ইন্টারনেট হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বিত একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। অর্থাৎ, এটি এমন একটি নেটওয়ার্ক বিস্তার প্রক্রিয়া যার সাথে অনেক কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সংযোগ থাকে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের কম্পিউটার থেকে অন্য প্রান্তের অন্য কম্পিউটারে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য দ্রুত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রেরণ করা যায়। ফলে খুব কম সময়ে ও খরচে মানুষ বিশ্বের সমগ্র তথ্য বা সংবাদ সহজে জানতে ও বিনিময় করতে পারে।

সর্বপ্রথম ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা মাত্র চারটি কম্পিউটারের সাহায্যে গড়ে তুলেছিলেন অভ্যন্তরীণ এক যোগাযোগ ব্যবস্থা। উক্ত ব্যবস্থাটি আর্পানেট (Arpanet) নামে পরিচিত ছিল। এ আর্পানেট ব্যবস্থা থেকেই পরবর্তীতে ইন্টারনেট ধারণার উদ্ভব হয়। ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বের মানুষ প্রথম পরিচিত হয় ইন্টারনেট প্রযুক্তির সাথে। বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালের ৬ জুন ইন্টারনেট ব্যবহার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
ইন্টারনেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো- ইন্টারনেটে থাকা প্রতিটি কম্পিউটার একটি অপরটির সাথে তথ্য বিনিময় করতে পারা। পেছনের দিনের কম্পিউটারের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের দিকে কম্পিউটারের নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা ছিল না। প্রতিটি মেশিন আলাদা আলাদা প্রস্তুতকারী কোম্পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃত ছিল এবং কেউই অন্য মেশিনের ভাষা বুঝতে সক্ষম ছিল না। কম্পিউটারগুলো শুধু সেই প্রোগ্রামগুলোই চালাতে পারতো, যা বিশেষভাবে নিদিষ্ট কম্পিউটারের জন্য লেখা হতো। ই-মেইল এবং চ্যাটের মতো জিনিসগুলো ছিল তখন অসম্ভব।
এই বিষয়টির সমস্যার সমাধান করেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জনক ব্রিটিশ পদার্থবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী জন টিম বার্নার্স লি। তিনি আশির দশকের শেষ নাগাদ তথা ১৯৮৯ সালে www উদ্ভাবন করেন। এর দ্বারা সব কম্পিউটারের মধ্যে কথা বলা সহজ হয়ে যায়। কম্পিউটারগুলো একটি প্রমিত বা সাধারণ যোগাযোগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। তিনি তথ্য শেয়ার করার জন্য যে সাধারণ ভাষার প্রচলন করেন তার নাম HTML (Hyper Text Transfer Protocol |
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব হলো মূলত ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি এপ্লিকেশন মাত্র।
- businessdictionary.com অনুযায়ী, 'Internet is a means of connecting a
computer to any other computer anywhere in the world via dedicated routers and services.' অর্থাৎ, 'ইন্টারনেট হলো এক কম্পিউটার থেকে বিশ্বের যেকোনো স্থানের অন্যান্য কম্পিউটারের মধ্যে নিবেদিত রাউটার ও সেবার দ্বারা সংযোগ স্থাপন করার উপায়।'
অতএব, ইন্টারনেট হলো বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমন্বিত রূপ; যা কম্পিউটার, টেলিফোন লাইন বা স্যাটেলাইট/ রেডিও সংযোগ ব্যবহার করে রাউটার ও সার্ভারের মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত থাকে।
www কী?
World Wide Web (বিশ্ব বা ছড়ানো তথ্য জালিকা)-কে সংক্ষেপে www হিসেবে অভিহিত করা হয়। একে থ্রি ডব্লিউ (3W) ওয়েবও বলা হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত হাইপার টেক্সট ডকুমেন্টগুলো নিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়া ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব নামে পরিচিত। হাইপার লিংকের সাহায্যে ওয়েব ব্রাউজারের মাধ্যমে ওয়েব পৃষ্ঠা দেখা যায়, যা টেক্সট, চিত্র, ভিডিও ও অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া সমৃদ্ধ হতে পারে।
Uses/Advantages of Internet
যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ইন্টারনেট তথ্যের আদান-প্রদান কাজে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এর ব্যবহারের পরিধি বেড়েছে। নিচে ইন্টারনেটের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার বা সুবিধা আলোচনা করা হলো-
- তথ্য বিনিময় (Exchange of information): ইন্টারনেট বর্তমানে তথ্য বিনিময়ের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে
ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেকোনো সময়ে তথ্য বা সংবাদ দ্রুততার সাথে প্রেরণ করা যায়। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কভুক্ত যেকোনো কম্পিউটারে তথ্য বিনিময় করা যায়। - তথ্য আহরণ ও সংরক্ষণ (Collect and store of information): তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার বা মহাসমুদ্র হলো ইন্টারনেট। বিশ্বের যেকোনো বিষয়ের ওপর নতুন ও পুরাতন তথ্যাবলি ইন্টারনেটে সংরক্ষণ করা হয়। ব্যবহারকারী অসংখ্য অনলাইন ডেটাবেজ থেকে ওয়েবসাইটে ব্রাউজ করে প্রয়োজনীয় তথ্য কম্পিউটারে দেখতে পারেন এবং নিজের কম্পিউটারে সংরক্ষণ (Save) করতে পারেন। আবার, ব্যবহারকারী উক্ত তথ্য প্রয়োজন মতো প্রিন্ট করতে পারেন।
- সম্প্রদায় গঠন (Forming community): ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মতবাদ বা দলের লোকজন মিলে অনলাইন কমিউনিটি গঠন করে থাকেন। এসব অনলাইন কমিউনিটি বা সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে বিভিন্ন ধরনের তথ্য শেয়ার করে থাকেন। এভাবে বিশেষ সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
- বিভিন্ন ধরনের সেবা (Different type of services): বর্তমানে ইন্টারনেটের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন: অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং (অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা), চাকরি খোঁজা, কর্মী সংগ্রহ, টিকিট কেনা, হোটেল বুকিং সেবা, চিকিৎসা সেবা প্রভৃতি।
- শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহার (Uses in education): ইন্টারনেট শিক্ষামূলক তথ্য সংগ্রহ ও জ্ঞান অর্জনের একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম। ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে বিশ্বের যেকোনো বড় লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে বিভিন্ন বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়।
- গবেষণা ক্ষেত্রে (In research): বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ উন্নয়নের বিভিন্ন দিক বা অন্যান্য বিষয় নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেন। তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ইন্টারনেট থেকে এসব প্রয়োজনীয় তথ্য খুব সহজে ও কম সময়ে খুঁজে বের করা যায়।
- বিনোদনের ক্ষেত্রে (In entertainment): ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের খেলা, গান, সিনেমা, ভিডিও প্রভৃতি দেখা ও শোনা সহজ হয়েছে। যেমন- ইন্টারনেটের ফলে বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি সহজেই লর্ডসে অনুষ্ঠিত খেলা দেখতে পারে বা নিউইয়র্কের ওপেন এয়ার কনসার্ট উপভোগ করতে পারে।
- অনলাইন মিডিয়া (Online media): আজকাল পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন প্রভৃতি কাগজে মুদ্রণের পাশাপাশি
অনলাইনেও প্রকাশিত হয়। ফলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই মানুষ সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন প্রভৃতি পড়তে পারে। এমনকি দূরের কোনো লাইব্রেরির বইও পড়তে পারে। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন রেডিও, টেলিভিশন চ্যানেল উপভোগ করার সুযোগ পায়। - ই-মেইল ও চ্যাট (E-mail and chat): ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ইন্টারনেট সংযোগকারী
মানুষের সাথে ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য বা সংবাদ আদান-প্রদান করা যায়। এছাড়া এর মাধ্যমে প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব বা কাছের আত্মীয়ের সাথে অনলাইন চ্যাটের (Chat) মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য ও ভাবের বিনিময় করা যায়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Disadvantages of Internet
ইন্টারনেট ব্যবহারের বহুবিধ সুবিধা থাকলেও এর বেশ কিছু সমস্যা আছে। সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহার না হলে এর দ্বারা ক্ষতিই বাড়তে থাকে। নিচে ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা বা অসুবিধাগুলো উল্লেখ করা হলো-
- অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য (Unexpected information): ইন্টারনেট সংযোগ থাকায় অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য এসে কম্পিউটারে জমা হয়। এসব অপ্রয়োজনীয় তথ্য কম্পিউটারের সংরক্ষণ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে এবং এর গতি কমিয়ে দেয়। এতে কম্পিউটার পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসুবিধা তৈরি হয়।
- ব্যক্তিগত তথ্য চুরি (Theft of personal information): অনেক সময় হ্যাকাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবৈধ ও অযাচিতভাবে অন্য কম্পিউটারে প্রবেশ করে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে।
- ভাইরাস হুমকি (Virus threat): ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেকে ক্ষতিকর কম্পিউটার ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। এসব ভাইরাস কম্পিউটারকে ক্ষতিগ্রস্ত, অচল বা বিধ্বস্ত (Crash) করে দিতে পারে।
- ব্যয়বহুল (Costly): ইন্টারনেট সংযোগ সামগ্রিকভাবে বেশ ব্যয়বহুল। এর নেটওয়ার্ক ফি, যন্ত্রপাতি কেনার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি হয়ে থাকে। ফলে এটির ব্যবহার অনেকের সামর্থ্যের বাইরে থাকে।
- সম্প্রদায় গঠন (Forming community): ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন সম্প্রদায়, গ্রুপ ও বন্ধু-বান্ধব তৈরি হয়। ফলে তাদের সময় দিতে গিয়ে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে। পরিবারের সদস্যরা (বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রী) এটিকে মেনে নিতে পারেন না। ফলে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়।
- নৈতিক অবক্ষয় (Ethical deterioration): অনেক সময় ইন্টারনেটের সাহায্যে ব্যক্তিগত চিত্র ও ভিডিও আদান-প্রদান করা হয়, যা যুব সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
- ক্ষতিকর ব্যবহার (Harmful use): বিভিন্ন ধরনের গেম ডাউনলোড করা, অনলাইনে জুয়া খেলা প্রভৃতি অহেতুক বা ক্ষতিকর কাজে ইন্টারনেটের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
অতএব, নিঃসন্দেহে ইন্টারনেট মানবজাতির জন্য একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার। এর বহুমুখী ব্যবহার ও সুবিধা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। এর সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে পারলে এটি মানুষের জন্য আরও বেশি সুবিধাজনক হবে
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of Fax
ইংরেজি 'ফ্যাক্সিমিলি (Facsimile)' শব্দ থেকে ফ্যাক্স (Fax) শব্দটি এসেছে। এটি এক ধরনের ইলেকট্রনিক টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্র। ফ্যাক্সকে টেলিকপিং (Telecopying) যন্ত্রও বলা হয়। বার্তা বা সংবাদ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মাধ্যম হিসেবে ফ্যাক্স অনেক আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটির সংবাদ ধারণ ও প্রেরণ করার ক্ষমতা আছে। এ যন্ত্রের এক প্রান্তে অবস্থিত সিলিন্ডারের গায়ে প্রেরিতব্য কোনো বস্তুর ইমেজ বা প্রতিকৃতি রাখা হলে অপর প্রান্তে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান্ড হয়ে ঐ ইমেজের হুবহু প্রতিলিপি (Copy) মুদ্রিত (Printed) হয়। প্রতিটি ফ্যাক্সের নির্ধারিত নম্বরের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ফ্যাক্স করা হয়। ফ্যাক্স মেশিনের সাহায্যে যেকোনো ধরনের তথ্য, ডেটা, সংবাদ, ছবি কিংবা কোনো লিখিত বক্তব্য হুবহু প্রতিকৃতি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ করা যায়। এর মাধ্যমে অতি সহজে, নির্ভুলভাবে ও মুহূর্তের মধ্যে সংবাদের বিষয়বস্তু পাঠানো সম্ভব হয়।

অতএব, ইলেকট্রিক টেলিকমিউনিকেশন যে যন্ত্রের সাহায্যে কোনো সংবাদ, তথ্য, চিত্র, নকশা, চার্ট, ফর্মুলা প্রভৃতি স্ক্যান (Scan) ও প্রিন্ট (Print) করে হুবহু নির্ভুলভাবে মুহূর্তের মধ্যে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো হয়, তাকে ফ্যাক্স বলে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of E-mail
ইলেকট্রনিক মেইল (Electronic mail) এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ই-মেইল। ই-মেইল বলতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি কম্পিউটার বা মোবাইল থেকে অন্য কম্পিউটারে চিঠিপত্র, সংবাদ বা তথ্য, ইমেজ, ভিডিও প্রভৃতি আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এটি ব্যবহারের জন্য কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হয়। এছাড়া প্রেরক
ও প্রাপকের ই-মেইল ঠিকানা আবশ্যক। কোনো সংবাদ বা তথ্য পাঠাতে হলে তা টাইপ প্রাপকের ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানো হয়। এর জন্য প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের ঠিকানায় বিশেষ ধরনের সাংকেতিক ভাষা করে ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়। যেমন: hazrat@dcc.edu.bd, sarif7kira@yahoo.com i
অতএব, কম্পিউটার/মোবাইল ব্যবহার করে ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় কোনো ডিজিটাল সংবাদ বা তথ্য আদান-প্রদান করার প্রক্রিয়াকে ই-মেইল বলে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Elements or Contents of E-mail
ই-মেইলের মাধ্যমে সংবাদ বিনিময়ে কম্পিউটার, মডেম, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সংবাদ প্রেরক ও প্রাপক উভয়ের সুনির্দিষ্ট ই-মেইল ঠিকানার প্রয়োজন পড়ে। একটি ই-মেইলে সংবাদের নিচের উপাদানসমূহ থাকা প্রয়োজন-
১. টু (To): এখানে ই-মেইল সংবাদ প্রাপকের নাম ও তার ই-মেইল ঠিকানা লেখা হয়।
২. সিসি (Cc): Cc অক্ষরদ্বয় ইংরেজি "Courtesy copy"-এর আদ্যক্ষর। নির্দিষ্ট প্রাপক ছাড়া সংবাদ যদি অন্য কারও কাছে পাঠানো হয় তার নাম ও ই-মেইল ঠিকানা এ শিরোনামের অধীনে লেখা হয়।
৩. বিসিসি (Bec): Bcc অক্ষরত্রয় ইংরেজি "Blind courtesy copy"-এর আদ্যক্ষর। যে সংবাদ মূল প্রাপকের কম্পিউটারে দেখানো হয়, তাকে এ "Blind courtesy copy"-এর প্রাপকের ঠিকানা দেখানো হয় না। অর্থাৎ সংবাদের মূল প্রাপককে সংবাদটি অন্য আর কারও কাছে পাঠানো হলো সে সম্পর্কে অজ্ঞাত রাখা হয়।

৪. বিষয় (Subject); এ শিরোনামের অধীনে প্রেরিত পূর্ণ সংবাদের একটি সংক্ষিপ্ত শিরোনাম উপস্থাপন করা হয়। এটি সংবাদ প্রাপকের কম্পিউটারের Mail box অথবা Message box-এ দেখানো হয়। এটির সাহায্যে সংবাদ প্রাপক প্রেরিত সংবাদ এবং এর প্রেরক সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
৫. সংযোজন (Attachment): সংবাদ প্রেরক যদি সংবাদের সাথে বাড়তি কোনো File বা Doccument সংযুক্ত করতে চায়, তবে এ শিরোনামের অধীনে তা উল্লেখ করা হয়।
৬. বার্তা (Message): প্রেরকের সংবাদ এ শিরোনামের অধীনে লেখা হয়। সংবাদ ই-মেইলের প্রধান অংশ। এ অংশ প্রেরক ইচ্ছা করলে সম্পূর্ণ সংবাদ লিখে প্রেরণ করতে পারে অথবা ই-মেইলে সংযুক্ত File বা Document-এর সূত্র উল্লেখ করতে পারে।
৭. প্রেরণ (Send); বার্তা লেখার কাজ শেষ হলে উপরে বা নিচে যে Send অপশন থাকে, সেখানে ক্লিক করতে হয়। অতঃপর, সাথে সাথে বার্তা প্রাপকের মেইল বক্সে চলে যায়। নিচে চিত্রের সাহায্যে ই-মেইলের বিভিন্ন উপাদান দেখানো হলো-
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Concept of Teleconference
টেলি (Tele) শব্দের অর্থ হলো দূরত্ব এবং কনফারেন্স (Conference) শব্দের অর্থ হলো সমাবেশ, সম্মেলন বা আলোচনা সভা। অর্থাৎ, টেলিফোনের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত দুই বা ততোধিক মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার প্রক্রিয়া হলো টেলিকনফারেন্স। এটি আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এক 'অনন্য সংযোজন। এর মাধ্যমে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে বা দেশে থেকেও কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ ব্যবস্থায় একজন আরেকজনের কথার প্রতিক্রিয়াও সাথে সাথে দিতে পারে।

টেলিকনফারেন্স সাধারণত দুই প্রকারের হয়ে থাকে- অডিও কনফারেন্স ও ভিডিও কনফারেন্স। অডিও কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ শুধু মৌখিক কথা-বার্তা বিনিময় করে থাকে। অন্যদিকে ভিডিও কনফারেন্স-এ মিলিত ব্যক্তিবর্গ একে অন্যের কথা যেমন শুনতে পায়, তেমনি একে অন্যকে কম্পিউটারের পর্দায় স্পষ্টভাবে তাদের জীবন্ত ছবি (Live image) দেখতে পায়।
- businessdictionary.com-অনুযায়ী, 'Teleconferencing refers to audio or audio-visual meeting between geographically separated parties linked by telecommunications networks such as telephones or internet.' অর্থাৎ, 'টেলিকনফারেন্সিং বলতে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক যেমন টেলিফোন বা ইন্টারনেট দ্বারা সংযুক্ত ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পক্ষের মধ্যে অডিও বা অডিও-ভিজ্যুয়াল সভাকে বোঝায়।
- en.wikipedia.org-অনুযায়ী, 'A teleconference is the live exchange and mass articulation of information among several persons and machines remote from one another but linked by a telecommunications system.' অর্থাৎ, 'টেলিকনফারেন্স হলো টেলিযোগাযোগ পদ্ধতি দ্বারা সংযুক্ত বিভিন্ন দূরবর্তী ব্যক্তি ও যন্ত্রের মধ্যে * তথ্যের জীবন্ত বিনিময় ও ব্যাপক স্পষ্ট উচ্চারণ।'
অতএব, টেলিকনফারেন্স বলতে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিনির্ভর এমন এক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বোঝায়; যাতে সভায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা সত্ত্বেও সংযোগের মাধ্যমে এক সাথে সভা ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Uses of Teleconference
ক্রমবর্ধমান ব্যবসায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বব্যাপী টেলিকনফারেন্সের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। আধুনিক ব্যবসায়ে টেলিকনফারেন্সের ব্যবহার বা সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ-
- ব্যয় ও সময় বাঁচায় (Saving cost and time): টেলিকনফারেন্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর মাধ্যমে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী নির্বাহীদের যাতায়াত ব্যয় ও সময় বেঁচে যায়।
- শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহার (Use in educational sector): বর্তমানে উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্থাৎ, কলেজ-
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টেলিকনফারেন্স বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক উপাদান বিনিময়, পারস্পরিক আলোচনা প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। - প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন (Training and development): টেলিকনফারেন্স বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বর্তমানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবারকল্যাণ প্রভৃতি বিষয়ে উন্নয়ন কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
- উন্নত যোগাযোগ (Developed communication): টেলিকনফারেন্স তথা অডিও ও ভিডিও কনফারেন্স তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতি। এরূপ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থানের লোকজন অন্য যেকোনো স্থানের লোকজনের সাথে সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক সভায় মিলিত হয়ে যোগাযোগ করতে পারে।
- ব্যবসায়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ (Controlling in business activity): টেলিকনফারেন্স পদ্ধতিতে শীর্ষ নির্বাহীরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত অধীনস্থ নির্বাহীদের তত্ত্বাবধান করতে পারেন। এভাবে তারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রমের ওপর সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
চেহারা দর্শন সুবিধা (Face watching facility): টেলিকনফারেন্স ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরক এবং প্রাপক কম্পিউটার মনিটরের মাধ্যমে মুখোমুখি যোগাযোগের সুযোগ পায়। ফলে যোগাযোগের পক্ষসমূহ একে অন্যের চেহারার প্রকাশ, অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি অবাচনিক যোগাযোগের ভাষা দেখতে পারে।
Disadvantages of Teleconferencing
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহ টেলিকনফারেন্স থেকে বহুবিধ সুবিধা পেলেও এটি সীমাবদ্ধতার বাইরে নয়। নিচে টেলিকনফারেন্সের প্রধান প্রধান অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনা করা হলো-.
- প্রযুক্তি নির্ভরশীলতা (Technology dependancy): টেলিকনফারেন্স তথা অডিও-ভিডিও কনফারেন্স উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে এটি যেকোনো সময় প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অচল হয়ে যেতে পারে। এতে সভা আয়োজনে ব্যয় করা অর্থ, সময়, মেধা ও প্রচেষ্টা বিফল হতে পারে।
- ব্যয়বহুল যোগাযোগ ব্যবস্থা (Costly communication system): টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে কম্পিউটার, টেলিফোন, মাইক্রোফোন, মনিটর, ক্যামেরা প্রভৃতি সমৃদ্ধ একটি কক্ষে প্রবেশ করতে হয়। অত্যাধুনিক এসব যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ কক্ষের সংস্থাপন ও পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল কাজ। এর ফলে যোগাযোগের প্রস্তুতি সময় ও এককালীন খরচ অনেক বেড়ে যায়।
- বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন (Requirement of special knowledge): টেলিকনফারেন্সের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হলে অংশগ্রহণকারীদের কনফারেন্স পরিচালনার প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন, কলা-কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এরূপ বাস্তব জ্ঞান অনেকেরই থাকে না। এতে এর কার্যকারিতা কমে যায়।
- ঘনিষ্ঠতার অভাব (Lack of intimacy): প্রচলিত বা গতানুগতিক পদ্ধতিতে আয়োজিত সভায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে পক্ষগুলো কাছাকাছি অবস্থান করে ঘনিষ্ঠ হওয়া বা সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এতে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।
- নেটওয়ার্কের অসুবিধা (Network problem): অনেক সময় অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকতে পারে না অথবা নেটওয়ার্কে সমস্যা হতে পারে। অর্থাৎ, নেটওয়ার্ক সঠিকভাবে কার্যকর না থাকলে টেলিকনফারেন্সে যোগাযোগ সম্ভব হয় না। এতে সব প্রস্তুতিই ব্যর্থ হয়ে যায়।
তাই বলা যায়, নিঃসন্দেহে টেলিকনফারেন্স তথা অডিও-ভিডিও কনফারেন্স বর্তমান তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির একটি বিস্ময়কর অবদান ও জনপ্রিয় মাধ্যম। এ ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার ছোট-খাটো সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সফলভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Mobile
মোবাইল ফোন (Mobile phone) সাধারণত সেলুলার ফোন, সেল ফোন, হ্যান্ড ফোন, মুঠোফোন, প্রভৃতি নামে পরিচিত। এটি সহজে বহনযোগ্য এক ধরনের ছোট টেলিফোন, যা রেডিও ওয়েভ ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে টেলিফোন নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত থাকে। বেশির ভাগ মোবাইল ফোন বর্তমানে কথা বলা ও ক্ষুদ্র বার্তা বিনিময় বহুমুখী সেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বে সর্বপ্রথম ১৯৪৬ সালের ১৭ জুন সেন্ট লুইস (St. Louis) ও বেল টেলিফোন কোম্পানির মধ্যে মোবাইল কল করা হয়। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় প্রজন্ম (2nd Generation or 2G) প্রযুক্তির মাধ্যমে ফোন চালু হয় এবং ২০০১ সালে বিশ্বে তৃতীয় প্রজন্ম (3rd Generation or 3G) প্রযুক্তির মোবাইল চালু হয়, যার ডেটা ট্রান্সফার ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। ২০০৯ সালে থ্রিজি প্রযুক্তি মোবাইলে বড় ধরনের ডেটা স্থানান্তর ও ব্যান্ডউইডথ সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কারণে চতুর্থ প্রজন্মের (4th Generation or 4G) প্রযুক্তি সম্পন্ন মোবাইল উদ্ভব হয়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Process and Techniques of SMS
এসএমএস (SMS or Short Message Service) হলো শব্দ, বর্ণ বা চিহ্নের সাহায্যে লিখিত সংবাদ বিনিময় করা। এটি আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ক্ষুদে বার্তা সেবা বলতে মুঠোফোন ব্যবহার করে দেশ-বিদেশে নেটওয়ার্কের আওতায় অবস্থানরত অন্য ফোনে মুহূর্তের মধ্যে সরবরাহকৃত এক ধরনের সংক্ষিপ্ত বার্তাকে বোঝায় । বর্তমানে এসএমএস-এর মাধ্যমে যোগাযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

১৯৯২ সালের ৩ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের ভোডাফোন (Vodafone) জিএসএম (GSM) নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বের সর্বপ্রথম এসএমএস প্রেরণ করে। সীমা গ্রুপ-এর (Sema Group) নেইল পাপওয়ার্থ (Neil Papwarth) তার ব্যক্তিগত কম্পিউটার থেকে রিচার্ড জার্ভিসকে (Richard Jarviz) তার এসএমএস-এ লেখেন, 'Merry Christmas'। এসএমএস-এর বাণিজ্যিক প্রচলন শুরু হয় ১৯৯৩ সালে সুইডেনে এবং পরবর্তীতে ফিনল্যান্ডে। এসএমএস মূলত জিএসএম (GSM or Global System for Mobile Communications)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেখানে মোবাইল যোগাযোগ প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লিখিত সংবাদ আদান-প্রদান করা হয়। এসএমএস সেবার মাধ্যমে কোনো লিখিত বার্তা (Text Message) এক মোবাইল থেকে অন্য মোবাইলে পাঠানো (Send) হয়। এ লিখিত সংবাদ সাধারণত স্পেসসহ ১৬০ ক্যারেক্টারের বেশি হয় না।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Advantages of Using ICT in Business Communication
বর্তমানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি তথা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে তথ্য, সংবাদ, মতামত বা ভাব বিনিময়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠানেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে আইসিটি-এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয়। নিচে যোগাযোগে আইসিটি ব্যবহারের সুবিধা আলোচনা করা হলো-
- দ্রুত তথ্য বিনিময় (Quick exchange of information): আইটিসি এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো কাজের গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধি। ই-মেইল, ইন্টারনেট, মোবাইল প্রভৃতির মাধ্যমে মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোনো স্থানের প্রাপকের সাথে তথ্য বিনিময় করা যায়। এতে খরচ ও সময় দু'টোই কমানো সম্ভব হয়।
- গতিশীলতা (Mobility): আমদানি-রপ্তানি, ভ্রমণ ও পর্যটন এবং ব্যবসায়িক কাজে দেশ-বিদেশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ফ্যাক্স, ই-মেইল, ই-কমার্স প্রভৃতির মাধ্যমে সংবাদ আদান-প্রদান করে ব্যবসায়ে গতিশীলতা আনা যায়।
- বিপুল তথ্য সংরক্ষণ (Huge storage of information): আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। আবার ব্যবহারকারীর প্রয়োজনে সেসব তথ্য সংগ্রহ ও পরিবর্তন করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। এভাবে সমৃদ্ধ তথ্যভান্ডার তৈরি হতে থাকে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
- টেলিকনফারেন্স সুবিধা (Teleconference facility): আইসিটি-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও নির্বাহী
পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ তাদের কক্ষে বসেই সব কাজের খোঁজ-খবর নিতে পারেন। এর সহায়তায় তারা ব্যবসায়ের আয়-ব্যয়, কাজের বিবরণ প্রভৃতি কম্পিউটারে দেখতে পান। এছাড়া তারা নিজের অবস্থানে থেকেই ভিডিও কনফারেন্সিং-এর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা বা আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। - দূরত্বগত বাধা দূর (Removing distance barriers): তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের অসংখ্য মানুষের কাছে মুহূর্তেই তথ্য বা সংবাদ আদান-প্রদান করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ভৌগোলিক দূরত্বগত বাধা দূর করে যোগাযোগকে আরও সহজ করা সম্ভব হয়েছে।
- ব্যয় ও সময় হ্রাস (Reducing cost and time): তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো সংবাদ বা তথ্য কম সময়ের মধ্যে প্রেরণ করা যায়। এছাড়া তথ্য আগে থেকে কাঠামোবদ্ধ বা সংরক্ষিত থাকায় সেগুলোকে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করে প্রেরণের মাধ্যমে সময় ও অর্থ বাঁচানো যায়।
- বিশ্বব্যাপী কার্য পরিচালনা (Managing global operation): আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সারা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ব্যবস্থাপকরা ঘরে বা অফিসে বসেই সারা বিশ্বে ভিডিও কনফারেন্স, মোবাইল, স্কাইপ, ইন্টারনেট, ই-মেইল প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যবসায়িক কাজগুলো পরিচালনা করছেন।
- দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Quick decision making): কম্পিউটার বা মোবাইলে একটি ক্লিক বা প্রেস করার সাথে সাথে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। ফলে নির্বাহীরা মুহূর্তের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। এতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হয়।
- কায়িক শ্রম লাঘব (Reducing manual labour): ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে বর্তমানে
যোগাযোগবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারে শ্রম ও সময় অনেক কমেছে। যেকোনো সময় যেকোনো তথ্য সহজেই সংরক্ষিত ভান্ডার থেকে পাওয়া যায়। ফলে যোগাযোগের গতিশীলতা বেড়েছে।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Disadvantages of Using ICT in Business Communication
ব্যবসায় যোগাযোগে আইসিটি ব্যবহারের বিভিন্ন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এটি সম্পূর্ণভাবে ঝামেলামুক্ত নয়। ব্যবসায় যোগাযোগে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা বা অসুবিধা আছে, যা নিচে আলোচনা করা হলো-
- অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের অভাব (Lack of informal relationship): আইসিটি-এর সুবাদে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তথ্য বিনিময় কাজ নিজ নিজ অবস্থানে বা কক্ষের মধ্যে থেকেই করা হয়। ফলে কমকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ কমে যায়। এতে উভয় পক্ষই অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে
- গোপনীয়তার অভাব (Lack of secrecy): তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রেরিত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা খুবই কঠিন। অনেক সময় প্রতিযোগী ব্যবসায়ী বা শত্রুপক্ষ ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আড়ি পেতে বা হ্যাক করে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারে। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- ব্যয়বহুল (Costly): আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রায় সব উপকরণই বেশ ব্যয়বহুল। এতে এককালীন ব্যয় অনেক বেশি, যা অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নির্বাহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়া এগুলোর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ ব্যয়ও অনেক বেশি। এজন্য এটি সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে না।
- তথ্য বিনষ্টের সম্ভাবনা (Possibility of damaging information): আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর তথ্য সংরক্ষণ করা যায়, যা তথ্যভান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত হয়। কিন্তু এ তথ্য যেকোনো মুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটি বা ভাইরাসজনিত কারণে বা ভুল পরিচালনার কারণে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।
- বয়স্ক ও অশিক্ষিতদের জন্য সমস্যা (Problem for older and illiterate): তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি দিন দিন নতুন ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে আরও উন্নততর হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি বয়স্ক ও অশিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য আয়ত্ত করা খুবই কঠিন। তাই তাদের কাছে এটি অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়।
- ভাইরাস আক্রমণ (Virus attack): অনেক সময় ইন্টারনেট সংযুক্ত কম্পিউটার ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। ফলে কম্পিউটারের ডিস্কে সংরক্ষিত অনেক তথ্য মুছে যায় বা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এতে তথ্যের নির্ভরতা থাকে না এবং অনেক সময় তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে তথ্যগত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
- প্রযুক্তি নির্ভরশীলতা (Dependency on technology): প্রযুক্তির উন্নতির সাথে মানুষ দিন দিন প্রতিটি কাজে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে। বর্তমানে প্রায় সবকিছুই যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি কোনোভাবে নষ্ট বা অক্ষম হয়ে গেলে ব্যবহারকারীদের খুব সমস্যায় পড়তে হবে।'
- আইনগত ভিত্তিহীনতা (No legal validity): তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ এবং সেগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে কম্পিউটারে রেকর্ডকৃত অনেক তথ্যই আদালত কর্তৃক স্বীকৃত হয় না। এতে আইনগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই বলা যায়, ব্যবসায় যোগাযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে বিভিন্ন সুবিধা ও অসুবিধা বিদ্যমান। এ অসুবিধাগুলো দূর করা গেলে ব্যবসায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার অভাবনীয় কল্যাণ বয়ে আনবে। এছাড়া ব্যবসায় উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা যায়।
যোগাযোগ - মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more