(Communication Process)
প্রেরক প্রাপকের কাছে বার্তা বা তথ্য প্রেরণের ক্ষেত্রে অনুসরণকৃত ধারাবাহিক ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত পদক্ষেপের সমষ্টিকে যোগাযোগ প্রক্রিয়া বলে। অর্থাৎ, যোগাযোগ প্রক্রিয়া হলো একাধিক পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য অতিক্রম করা নির্দিষ্ট কিছু ধাপের সমষ্টি। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মৌলিক উপাদান হলো তিনটি- প্রেরক, সংবাদ ও প্রাপক।
নিচে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার উপাদান ও পদক্ষেপগুলো চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

- প্রেরক (Sender): যোগাযোগ প্রক্রিয়ার প্রথম উপাদান হলো প্রেরক বা যোগাযোগকারী
(Communicator)। যে বা যারা তথ্য বা সংবাদ অন্য কারও কাছে পাঠিয়ে দেন, তাকে প্রেরক বলা হয়। অর্থাৎ, যিনি তথ্য প্রাপকের কাছে পাঠিয়ে দেন, তিনিই প্রেরক। যোগাযোগ প্রক্রিয়া মূলত প্রেরকই শুরু করেন এবং বার্তা প্রেরণের উদ্যোগ নেন। - ধারণার উন্নয়ন (Developing idea): যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় প্রথম পদক্ষেপ হলো ধারণার উন্নয়ন। এক্ষেত্রে প্রেরক বা
যোগাযোগকারী কী বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করবে, তা ঠিক করতে হয়। প্রেরক কী বিষয়ে, কখন, কোথায়, কীভাবে যোগাযোগ করতে চায়, তার একটি রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তাই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার এ স্তরকে পরিকল্পনা স্তরও বলা যায়। - প্রেরণযোগ্য করে সাজানো (Encoding): এ পর্যায়ে বিষয়গুলো বোধগম্য করে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। এনকোডিং বলতে সংবাদ এমনভাবে সাজানোকে বোঝায়, যাতে প্রাপক সহজে তা বুঝতে পারে। প্রাপক সহজেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারার জন্য প্রেরককে বিভিন্ন শব্দ, সংকেত, প্রতীক বা কোডের সাহায্যে সুশৃঙ্খলভাবে ও সহজ ভাষায় প্রেরণ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রাপকের গ্রহণ ক্ষমতা বিবেচনা করতে হয়।
- সংবাদ/বার্তা (Message): যোগাযোগকারী বা প্রেরক যে বাচনিক বা অবাচনিক বিষয়বস্তু
সংবাদ/বার্তাপ্রাপককে পাঠায়, তাকে বার্তা বলে। মূলত প্রেরক তার বিভিন্ন ধারণা প্রেরণযোগ্য করে সাজানোর মাধ্যমে যা তৈরি হয়, তাকেই সংবাদ বা বার্তা বলে। সংবাদকে ঘিরেই পুরো যোগাযোগ প্রক্রিয়া অবর্তিত হয়। তাই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মূল উৎস হলো সংবাদ। - মাধ্যম নির্বাচন (Selecting media): বার্তা প্রেরণের জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয়,
মাধ্যমযে উপায় অবলম্বন করে সংবাদ পাঠানো হয় তাকে মাধ্যম বলে। সাধারণত মৌখিক কথাবার্তা, চিঠি, মোবাইল, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ই-মেইল, পত্র-পত্রিকা প্রভৃতি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া শব্দ, ধ্বনি, সংকেত, প্রতীক, চিহ্ন, প্রেরকের ভাবভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব, পদমর্যাদা, নীরবতা প্রভৃতিও মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যোগাযোগকারীকে সংবাদ প্রেরণের জন্য সুবিধাজনক এক বা একাধিক মাধ্যম বাছাই করে নিতে হয়। - সংবাদ প্রেরণ (Transmitting message): মাধ্যম নির্বাচন করার পর প্রেরণকারী উক্ত মাধ্যম ব্যবহার করে বার্তাটি প্রাপকের কাছে প্রেরণ করে। সংবাদ প্রেরণের পর প্রাপকের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসা পর্যন্ত যোগাযোগ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবে মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত সাথে সাথেই প্রতিক্রিয়া আসে।
- শোরগোল / গোলযোগ / বাধা (Noise / Barriers): ফলপ্রসু যোগাযোগে সংবাদ বা বার্তা প্রাপকের কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। যেমন: ভাষাগত সমস্যা, শিক্ষাগত সমস্যা, উচ্চ শব্দ, যান্ত্রিক ত্রুটি প্রভৃতি। যোগাযোগে এ বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সাধারণত অপ্রত্যাশিতভাবে হয়ে থাকে। সংবাদকারীর তথ্য প্রাপকের কাছে না পৌঁছালে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হয় না। তাই প্রাপক ও প্রেরক উভয়কেই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়।
- প্রাপক (Receiver): প্রেরক কর্তৃক প্রেরিত তথ্য বা সংবাদ যে বা যারা গ্রহণ করে, তাকে প্রাপক বা বার্তাগ্রাহক বলে। যেকোনো ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ, দল বা প্রতিষ্ঠান প্রাপক হতে পারে। সংবাদ প্রেরণের পরেই প্রেরকের কাজ শেষ হয় এবং প্রাপকের কাজ শুরু হয়।
- সংবাদ গ্রহণ (Receiving message): যোগাযোগকারী যে সংবাদ প্রেরণ করে তা প্রাপক গ্রহণ করে। অনেক সময় প্রেরিত বার্তা বা সংবাদ বিভিন্ন ধরনের উপাদানের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত, বিকৃত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সংবাদটি প্রাপক গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হয়।
- অর্থোদ্ধার করে সাজানো (Decoding): প্রাপক কর্তৃক গৃহীত সংবাদের মানসিক বিন্যাস, উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা করাকে ডিকোর্ডিং বলে। সংবাদ পাওয়ার পর প্রাপক নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংবাদ উপলব্ধি করে। অতঃপর প্রকৃত অর্থ বোঝার চেষ্টা করে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। অনেক সময় একাধিক প্রাপক একই সংবাদের অর্থ ভিন্নভাবে বুঝে থাকে। অর্থাৎ, ব্যক্তি বিশেষে এর পার্থক্য হয়ে থাকে।
- সাড়া দান (Response): প্রাপক তথ্য বা সংবাদের অর্থ উদ্ধার তথা অনুধাবন করার পর সাড়া (গ্রহণ বা বর্জন) দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। যদি বর্জন করে তাহলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। আর গ্রহণ করলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া চালু রাখে।
- ফলাবর্তন (Feedback): প্রাপক কর্তৃক প্রাপ্ত সংবাদের বিপরীতে দেওয়া প্রতিক্রিয়াকে ফলাবর্তন ফলাবর্তন বলে। অর্থাৎ, যোগাযোগকারী বা প্রেরকের সংবাদের বিপরীতে প্রাপকের (তাৎক্ষণিকভাবে বা পরবর্তীতে) প্রত্যুত্তর বা সাড়া (Response) দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ফলাবর্তন (Feedback) বলে। কার্যকর যোগাযোগে ফলাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাপ্ত সংবাদের বিপরীতে প্রাপকের প্রতিক্রিয়া বা সাড়া দেওয়া
প্রেরক প্রাপকের পাঠানো প্রত্যুত্তর বা মনোভাব জানতে পারলেই যোগাযোগের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। এছাড়া ফলাবর্তনের মাধ্যমে ফলপ্রসূ বা কার্যকর যোগাযোগ সম্পন্ন হয়। এভাবে যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় বা চলতে থাকে। যোগাযোগে তথ্য বা বার্তার এরূপ উভয়মুখী প্রবাহকে দ্বিমুখী যোগাযোগ (Two-way communication) বলে। যোগাযোগ একমুখী (One-way) হবে না দ্বিমুখী (Two-way) হবে, তাতে ফলাবর্তনই নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
তাই বলা যায়, দৈনন্দিন জীবনে সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই আমরা উল্লিখিত পদক্ষেপ অনুসরণ করে থাকি। সচেতনতার সাথে এ পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলে কার্যকর যোগাযোগ সম্ভব হবে।
Read more