যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে (৮.১৬)

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র - ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

Ways to Remove the Barriers to Communication

যোগাযোগ বলতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা পক্ষের মধ্যে কোনো তথ্য, সংবাদ, ধারণা বা ভাবের আদান-প্রদানকে বোঝায়। কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু এরূপ প্রতিবন্ধকতা বা বাধা পরিপূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়। তবে যোগাযোগের উদ্দেশ্য অর্জনের স্বার্থে তা দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার জন্য নিচের ব্যবস্থাগুলো নেওয়া যায়-

  • সঠিক মাধ্যম নির্বাচন (Selecting proper media): উপযুক্ত মাধ্যম নির্বাচনের ওপর যোগাযোগের সাফল্য
    বহুলাংশে নির্ভর করে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার তথ্য বা সংবাদ গ্রহীতার ধরন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সাংগঠনিক প্রয়োজনের আলোকে উপযুক্ত মাধ্যম নির্বাচন করতে হয়। মাধ্যম বিবেচনায় লিখিত যোগাযোগ যেখানে উত্তম, সেখানে লিখিত মাধ্যমেই যোগাযোগ করা উচিত। আবার যেখানে সরাসরি সাক্ষাৎ করে আলোচনা করলে ভালো হয়, সেখানে মৌখিকভাবে যোগাযোগ করা আবশ্যক।
  • সহজ সংগঠন কাঠামো প্রতিষ্ঠা (Establishing easy organizational structure): প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামো জটিল হলে বা স্তরের সংখ্যা বাড়লে ওপর থেকে নিচে এবং নিচ থেকে ওপরে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় দেরি হয়। এতে ভুলের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। এজন্য সংগঠন কাঠামো সহজ-সরল করা প্রয়োজন, যাতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধা দূর করা সহজ হয় বা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়।
  • সুস্পষ্ট সাংগঠনিক নীতিমালা (Clear-cut organizational policy): সংগঠনে যোগাযোগ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। প্রতিষ্ঠানের সবাই নীতিমালা বুঝে তার যথাযথ অনুসরণ করলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সন্দেহ, দ্বিধা, অবিশ্বাস প্রভৃতি দূর করে কার্যকর যোগাযোগ প্রবাহ নিশ্চিত করা সহজ হয়।
  • কার্যকর শ্রবণ (Effective listening): যোগাযোগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার একটি প্রধান হাতিয়ার হলো কার্যকর শ্রবণ। যোগাযোগ গ্রহীতাকে অবশ্যই যোগাযোগকারীর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে। অন্যদিকে সংবাদ গ্রাহকের মতামতও সংবাদ প্রেরককে মনোযোগ সহকারে শুনে সংবাদ গ্রাহকের মনোভাবের সাথে পরিচিত হতে হবে। এভাবে যোগাযোগের বাধা বহুলাংশেই কমানো সম্ভব।
  • বার্তা গ্রহীতা সম্পর্কে ধারণা অর্জন (Ideas about receivers): যোগাযোগের সময় প্রেরক গ্রহীতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করে সে অনুযায়ী বার্তা বা সংবাদ উপস্থাপন করলে যোগাযোগ কার্যকর হয়। তাই যোগাযোগের সময় তথ্য বা সংবাদ গ্রহীতার পরিবেশ, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, মনোভাব, অনুভূতি প্রভৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে।
  • অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক (Informal relation): অনেক সময় তথ্য বা সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার সহযোগী হিসেবে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সফলতার সাথে ব্যবহার করা যায়।
  • উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার (Use of modern technology): আধুনিক ও উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে
    যোগাযোগকে বেশি সফল করে তোলা সম্ভব। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অনেক উন্নতি লাভ করেছে। এর মাধ্যমে যেকোনো স্থানে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা এবং যোগাযোগের বাধা অনেকাংশেই দূর হয়।
  • সহজ ও অর্থপূর্ণ শব্দের ব্যবহার (Use of easy and meaningful words): যোগাযোগ মৌখিক বা লিখিত যে মাধ্যমেই করা হোক না কেন, তথ্য বা সংবাদ প্রেরণকারীকে সহজ ও নির্দিষ্ট অর্থবাহী শব্দ ব্যবহার করতে হয়। কঠিন ও অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার যোগাযোগের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিতে পারে। এজন্য সংবাদ গ্রহীতা সহজেই বুঝতে পারেন এমন ভাষায় যোগাযোগ করা উচিত।
  • কর্মী সম্মেলন (Employee conference): প্রয়োজনে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের জন্য
    সম্মেলনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এরূপ সম্মেলনে পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগের উন্নয়নের ধারা চলমান রাখা সম্ভব হয়।
  • ফলাবর্তন (Feedback): যোগাযোগ প্রক্রিয়ার পরিপূর্ণতার জন্য শুধু সংবাদ, প্রেরণই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি ফলাবর্তনের মাধ্যমে সংবাদগ্রহীতার কাছে তথ্য বা সংবাদের বিষয়বস্তু স্পষ্ট হচ্ছে কি না, তা জানা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা চালু থাকলে প্রয়োজনবোধে প্রেরণকারী কর্তৃক প্রেরিত সংবাদের সংশোধন করা যায়।
  • কার্যকর যোগাযোগ পরিকল্পনা গ্রহণ (Taking effective communication plan): কার্যকর যোগাযোগ পরিকল্পনায় সাধারণত যোগাযোগের লক্ষ্যকে সামনে রাখা হয়। এক্ষেত্রে যোগাযোগ গ্রহীতার প্রয়োজন অনুযায়ী বক্তব্য তৈরি ও তা সঠিক মাধ্যমে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সমস্যাগুলোও বিবেচনায় আনা হয়। ফলে এ ধরনের পরিকল্পনার অধীনে যোগাযোগকে ফলপ্রসূ করা সহজ হয়।
  • যোগাযোগ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দান (Communication training): যোগাযোগকে দ্রুত, সহজ ও অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
  • ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (Development of management): কার্যকর যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন উপায়ে ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা যেতে পারে। এসবের মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ব্যবস্থায় নির্বাহীরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তদারকি করেন বলে যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থপূর্ণ হয়ে থাকে।
  • সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ (Determining definite goals): সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য যোগাযোগ করা হয়। একে অর্থবহ করে তোলার জন্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এছাড়া যোগাযোগের সময় ঐ লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতাও অবলম্বন করতে হবে।
  • শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন (Improvement of labour-management relationship): উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক যোগাযোগের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন করতে পারলে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হবে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও সার্থক হবে।
  • সুন্দর কর্মপরিবেশ (Good working environment): প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ সুন্দর হলে যোগাযোগ সঠিক ধারায় সংঘটিত হতে থাকে। আর এ পরিবেশ বাধাপ্রাপ্ত হলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। তাই কাজের পরিবেশ উন্নত করার প্রতি কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • কর্তৃত্বের স্তর হ্রাস (Reducing authority level): শিল্পকারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় সাংগঠনিক
    কাঠামো এবং তত্ত্বাবধান স্তর কমাতে হবে। এজন্য অপ্রয়োজনীয় সাংগঠনিক স্তর উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষত সেক্টর কর্পোরেশনগুলোর অপ্রয়োজনীয় সাংগঠনিক স্তর উঠিয়ে দেওয়ার জন্য সাংগঠনিক কাঠামো পুনরায় সাজাতে হবে। মোটকথা, কার্যকরভাবে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো এবং কর্তৃত্বের স্তরকে আরও সহজ-সরল করতে হবে।

সুতরাং, ওপরের ব্যবস্থাগুলো নিতে পারলে কার্যকর যোগাযোগের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা বা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...